ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর কারণে বেঁচে আছি

পর্ব 11

লেখক: সাদিয়া ইমু

💗তোর কারণে বেঁচে আছি 💗

পর্ব ১১: মাহিরার প্রত্যাবর্তন ও রক্তের সম্পর্কের শেষ সত্য

রাত তখন প্রায় এগারোটা।

জিহাদের হাতে ধরা চিঠিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নওশিন। চিঠির শেষের নামটা বারবার পড়ছে সে— মাহিরা!

নওশিনের মা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

— মাহিরা বেঁচে আছে! আমি জানতাম, একদিন সে ফিরে আসবে।

নওশিন অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

— মা, মাহিরা কে? তুমি তো বলেছিলে, সে তোমার ছোট বোন!

মহিলা চোখ মুছলেন।

— শুধু আমার ছোট বোন নয়, নওশিন। তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওর নাম।

জিহাদ এবার সামনে এগিয়ে এল।

— আন্টি, আর কিছু লুকাবেন না। এতদিন ধরে সবাই আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলেছে। এবার পুরো সত্যটা জানতে চাই।

নওশিনের মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— সব সত্য আমারও জানা নেই। তবে একটা কথা জানি, মাহিরা যেদিন হারিয়ে গিয়েছিল, সেদিন হাসপাতালের সেই দুই শিশুর পরিচয় বদলানোর রহস্যও হারিয়ে গিয়েছিল।

ওভি এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর থেকে লেখা—

“পুরোনো রেকর্ডরুমে যাওয়ার আগে নিজের পরিচয়টা জেনে নিও। কারণ তোমাদের চারজনের মধ্যে একজন নিজের পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানে না।”

ওভি মেসেজটা পড়ে থমকে গেল।

ইমু তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী হয়েছে?

ওভি ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।

— কিছু না। পরে বলছি।

কিন্তু তার চোখের অস্বস্তি ইমুর নজর এড়াল না।

পুরোনো হাসপাতালের রেকর্ডরুম

রাত বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।

চারজন পুরোনো হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল। নওশিন, জিহাদ, ইমু আর ওভি।

হাসপাতালটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকছে। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা।

জিহাদ নওশিনের হাত শক্ত করে ধরে বলল,

— ভয় পেও না। যাই হোক, আমি তোমার পাশে আছি।

নওশিন মৃদু হেসে বলল,

— তোমার নিজের জীবনই তো বিপদে। তারপরও আমাকে বাঁচাতে ছুটে আসো কেন?

জিহাদ তার চোখের দিকে তাকাল।

— কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্যটা তুমি। আর তোমাকে হারানোর ভয়টাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়।

ইমু পাশ থেকে বলে উঠল,

— তোমরা দুজন একটু পরে রোমান্স করো। আগে এই ভূতের হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করি!

ওভি হেসে বলল,

— ভয় পাচ্ছ নাকি?

ইমু চোখ বড় করে তাকাল।

— আমি ভয় পাই না। তবে তোমাকে একা রেখে যেতে চাই না।

ওভির মুখের হাসিটা মুহূর্তে বদলে গেল। সে ইমুর হাত ধরে বলল,

— আমিও তোমাকে হারাতে চাই না।

ঠিক তখনই রেকর্ডরুমের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—

— এসেছ অবশেষে!

চারজন একসঙ্গে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের মাঝখানে সাদা শাড়ি পরা একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। চুলগুলো এলোমেলো, মুখে বয়সের ছাপ। কিন্তু চোখ দুটো পরিচিত।

নওশিনের মা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,

— মাহিরা!

নারীটি ধীরে ঘুরে তাকালেন।

— আপা!

দুই বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। অনেক বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল।

নওশিন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

— তাহলে আপনিই মাহিরা?

মাহিরা নওশিনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন। তারপর তার মুখে হাত রেখে বললেন,

— আমার ছোট্ট নওশিন! কত বড় হয়ে গেছিস!

নওশিন পিছিয়ে গেল।

— আপনি আমাকে চেনেন?

মাহিরার চোখ ভিজে উঠল।

— তোকে আমি জন্মের পর থেকেই চিনি। কিন্তু তোকে নিজের কাছে রাখতে পারিনি।

পরিচয়ের রহস্য

মাহিরা টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ফাইল রাখলেন।

— এই ফাইলের ভেতরে সেই রাতের আসল হাসপাতালের রিপোর্ট আছে। যে রাতে তোদের জন্ম হয়েছিল।

জিহাদ ফাইলটা খুলল।

ভেতরে দুটি জন্মের রিপোর্ট, একটি নার্সের স্বীকারোক্তি এবং দুটি শিশুর ছবি।

নওশিন ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল।

একটি ছবির নিচে লেখা— “শিশু: নওশিন।”

অন্যটির নিচে— “শিশু: মেহের।”

মাহিরা বললেন,

— সেই রাতে হাসপাতালে দুটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। একটি আমার মেয়ে মেহের, আর অন্যটি তোমার মায়ের মেয়ে নওশিন। কিন্তু হাসপাতালের আগুন আর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে একজন নার্স শিশুদুটির পরিচয় বদলে দেয়।

ইমু অবাক হয়ে বলল,

— তাহলে নওশিন আর মেহেরের পরিচয় বদলে গিয়েছিল?

মাহিরা মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই কাজটা শুধু সম্পত্তির জন্য করা হয়নি। এর পেছনে আরও বড় উদ্দেশ্য ছিল।

জিহাদ প্রশ্ন করল,

— কে করেছিল?

মাহিরা ধীরে ধীরে বললেন,

— জিহাদের বাবা সব জানতেন। কিন্তু তিনি একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে আরও একজন ছিল।

— কে? — জিহাদ উত্তেজিত হয়ে উঠল।

মাহিরা ফাইল থেকে একটি ছবি বের করলেন।

ছবিতে জিহাদের বাবা, নওশিনের বাবা এবং একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে। নার্সটির মুখে অদ্ভুত হাসি।

মাহিরা ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,

— এই নার্সই দুই শিশুর পরিচয় বদলেছিল। আর তাকে টাকা দিয়েছিল তোমাদের পরিবারেরই একজন।

জিহাদ অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

— আমাদের পরিবারের কে?

মাহিরা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের বাতিগুলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে গুলির শব্দ হলো!

নওশিন চিৎকার করে উঠল।

— জিহাদ!

কয়েক সেকেন্ড পর জরুরি আলো জ্বলে উঠল। দেখা গেল মাহিরা মেঝেতে পড়ে আছেন। তাঁর কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে।

জিহাদ দ্রুত তাঁর কাছে ছুটে গেল।

— কে গুলি করল?

মাহিরা কষ্টে হাত তুলে দরজার দিকে দেখালেন।

দরজার সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে।

কালো পোশাক, মুখে মাস্ক।

লোকটি ধীরে ধীরে মাস্ক খুলল।

তাকে দেখে জিহাদ যেন পাথর হয়ে গেল।

— মা!

জিহাদের মা!

তিনি শান্ত গলায় বললেন,

— জিহাদ, এবার সবকিছু শেষ করতে হবে।

জিহাদ অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

— মা, তুমি মাহিরাকে গুলি করলে?

জিহাদের মা কোনো উত্তর দিলেন না। বরং নওশিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— মেয়েটাকে এখান থেকে সরিয়ে নাও। ওর জানা উচিত নয়, ও আসলে কার মেয়ে!

নওশিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

— আমি কার মেয়ে? আমার পরিচয় কী?

জিহাদের মা ধীরে ধীরে বললেন,

— তুমি আমার...

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাহিরা চিৎকার করে উঠলেন,

— না! জিহাদ, ওর কথা বিশ্বাস করিস না! নওশিন তোর মা-বাবারই মেয়ে। কিন্তু তোর জন্মের রাতের সত্যটা এখনো বলা হয়নি!

সবাই স্তব্ধ।

জিহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— মা, তাহলে আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল?

জিহাদের মা এবার কাঁদতে শুরু করলেন।

— সেদিন হাসপাতালে শুধু দুই শিশুর পরিচয় বদলায়নি, জিহাদ। সেদিন আরেকটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। সেই শিশুটিকে সবাই মৃত ভেবেছিল।

ওভি হঠাৎ পিছিয়ে গেল।

তার হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে গেল।

কারণ ফোনের স্ক্রিনে আবার একটি মেসেজ এসেছে—

“ওভি, তুই যাকে এতদিন নিজের পরিবার ভেবেছিস, তারা তোর আসল পরিবার নয়।”

ওভি কাঁপা গলায় বলল,

— তাহলে... আমি কে?

ঠিক তখনই মাহিরা শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বললেন,

— ওভিই সেই তৃতীয় শিশু!

চারদিকে নীরবতা নেমে এল।

ইমু অবিশ্বাসের চোখে ওভির দিকে তাকিয়ে রইল।

জিহাদ মায়ের হাত ধরে চিৎকার করে বলল,

— মা! সত্যি করে বলো, ওভি কে?

জিহাদের মা চোখ বন্ধ করে বললেন,

— ওভি তোমার...

কথা শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতালের বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

আর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অচেনা মানুষ ফোনে বলল,

— পরিকল্পনা সফল। এবার চারজনকে আলাদা করে দিতে হবে। কারণ ওরা যদি একসঙ্গে থাকে, তাহলে আসল অপরাধী ধরা পড়ে যাবে।

লোকটি ফোন কেটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

চলবে...

পর্ব ১২-তে:

ওভির আসল পরিচয় কী? সে কি জিহাদের ভাই? নাকি তার পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর সত্য? আর জিহাদের মা কেন এত বছর সবকিছু গোপন রেখেছিলেন?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন