🖤 তোর কারণে বেঁচে আছি 🖤
পর্ব – ১০
জিহাদের বাবার ভয়ংকর স্বীকারোক্তি! নওশিনের জন্মের রাতের আসল রহস্য!
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
পুরোনো বাড়ির ঘরের মধ্যে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নওশিনের হাতে সেই পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা কথাগুলো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
"জিহাদের বাবা — আসল অপরাধী!"
জিহাদ কিছুতেই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না।
জিহাদ: এটা হতে পারে না! আমার বাবা কখনো এমন কিছু করতে পারেন না।
নওশিনের মা: তোমার বাবাকে তুমি যতটা ভালো করে চেনো, তাঁর অতীতটা ততটা চেনো না।
জিহাদ: আপনি আমার বাবার বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া কথা বলবেন না।
নওশিন: জিহাদ, প্লিজ! এখন ঝগড়া করার সময় না। আমাদের সত্যিটা জানতে হবে।
ঠিক তখনই জিহাদের ফোন আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা— বাবা কলিং।
জিহাদ ফোন রিসিভ করল।
জিহাদ: বাবা, তুমি কোথায়?
বাবা: বাড়িতে আছি। তুমি এখনই বাসায় চলে এসো।
জিহাদ: আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। নওশিনের জন্মের রাতে কী হয়েছিল?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর জিহাদের বাবা বললেন,
বাবা: সবকিছু জানতে চাইলে একা এসো। কাউকে সঙ্গে আনবে না।
জিহাদ: আমি একা আসব না। নওশিনও আমার সঙ্গে থাকবে।
বাবা: তাহলে সত্য জানার জন্য প্রস্তুত থেকো।
কল কেটে গেল।
---
অন্যদিকে — মেহেরের গোপন আস্তানা
একটি অন্ধকার ঘরে বসে আছে মেহের। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মধ্যবয়সী লোক।
লোকটি: ম্যাডাম, জিহাদ তার বাবার কাছে যাচ্ছে।
মেহের: খুব ভালো। এবার দুই পরিবারের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।
লোকটি: কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত, সব পরিকল্পনা ঠিকমতো হবে?
মেহের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
মেহের: আমি ষোলো বছর ধরে এই দিনের অপেক্ষা করেছি। এবার কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।
লোকটি: আর নওশিন?
মেহের: ওকে এখনই কিছু করবে না। ওকে নিজের জীবনের সত্য জানতে দাও। কখনো কখনো সত্য মিথ্যার চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়।
মেহের টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে দুজন ছোট্ট মেয়ে পাশাপাশি শুয়ে আছে।
মেহের ছবিটা দেখে ফিসফিস করে বলল,
মেহের: আমার বোন, এবার তোর সঙ্গে দেখা হবে।
---
জিহাদের বাড়ি
রাত এগারোটা।
জিহাদ, নওশিন, ইমু ও ওভি একসঙ্গে জিহাদের বাড়িতে পৌঁছাল।
জিহাদের বাবা ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। তাঁদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
বাবা: আমি তো বলেছিলাম, জিহাদ একা আসবে!
জিহাদ: বাবা, নওশিনের জীবন নিয়ে কথা হচ্ছে। ওর জানার অধিকার আছে।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
বাবা: ঠিক আছে। তাহলে সবাই বসো।
নওশিনের মা-ও কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে পৌঁছালেন।
দুজনের চোখাচোখি হতেই ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।
জিহাদের বাবা: তুমি এত বছর পর আবার ফিরে এলে?
নওশিনের মা: নিজের মেয়েকে আর কতদিন মিথ্যার মধ্যে রাখতাম?
জিহাদের বাবা: তুমি জানো না, এই সত্য প্রকাশ হলে কী হতে পারে!
নওশিন: আপনারা দুজনেই থামুন! আমি আর কোনো রহস্য শুনতে চাই না। শুধু জানতে চাই, আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল?
জিহাদের বাবা চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
বাবা: সেদিন হাসপাতালে একই সময়ে দুটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। একটি শিশু ছিল তোমার, আর অন্যটি ছিল মাহিরার।
নওশিন: মাহিরা কে?
নওশিনের মা চোখের পানি মুছে বললেন,
মা: মাহিরা ছিল আমার ছোট বোন।
সবাই অবাক হয়ে গেল।
নওশিন: তাহলে মেহের কে?
মা: মেহের হলো মাহিরার মেয়ে। অর্থাৎ সে তোর খালাতো বোন।
কথাটা শুনে নওশিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
নওশিন: কী! মেহের আমার বোন?
জিহাদের বাবা মাথা নিচু করে বললেন,
বাবা: হ্যাঁ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
জিহাদ: তাহলে আর কী লুকানো আছে?
জিহাদের বাবা: তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালের একজন নার্স ভুল করে দুটি শিশুর পরিচয় বদলে দেয়। কিন্তু সেটা কোনো সাধারণ ভুল ছিল না। কেউ ইচ্ছা করেই এই কাজ করেছিল।
ওভি: কে করেছিল?
জিহাদের বাবা: আমার ব্যবসায়িক অংশীদার। সে চেয়েছিল দুই পরিবারের সম্পত্তি দখল করতে। আর সেই পরিকল্পনায় সাহায্য করেছিল মেহেরের বাবা।
নওশিন: তাহলে এতদিন সবাই আমাকে কেন মিথ্যা বলেছে?
নওশিনের মা: কারণ সত্যিটা জানলে তোকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
নওশিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
নওশিন: আমি ছোটবেলা থেকে শুধু আমার মাকে খুঁজেছি। কেউ একবারও ভাবেনি, আমার কত কষ্ট হয়েছে!
জিহাদ নওশিনকে নিজের কাছে টেনে নিল।
জিহাদ: আমি আছি, নওশিন। তোমাকে আর একা লড়তে হবে না।
---
মেহেরের ফোন
হঠাৎ জিহাদের বাবার ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
তিনি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেহেরের কণ্ঠ শোনা গেল।
মেহের: কেমন আছেন, আঙ্কেল?
জিহাদের বাবা: মেহের! তুমি কী চাও?
মেহের: যা আমার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা ফেরত চাই।
জিহাদের বাবা: তোমার মা নিজের ইচ্ছায়...
মেহের চিৎকার করে উঠল।
মেহের: মিথ্যা বলবেন না! আমার মা নিজের ইচ্ছায় মারা যাননি। আপনারা সবাই মিলে তাঁকে শেষ করেছেন!
নওশিন ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহের আবার বলল,
মেহের: নওশিনকে জিজ্ঞেস করুন, তার জন্মের সময় হাসপাতালে আসলে কী হয়েছিল। আর জিহাদকে জিজ্ঞেস করুন, তার মা কেন এত বছর ধরে বিদেশে থাকেন!
জিহাদ অবাক হয়ে বলল,
জিহাদ: আমার মা? মায়ের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
মেহের হেসে বলল,
মেহের: কারণ তোমার মা-ই জানেন, সেই রাতে দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
কথাটা বলেই মেহের ফোন কেটে দিল।
---
রাত বারোটা — নতুন রহস্য
সবাই যখন মেহেরের কথায় হতবাক, ঠিক তখনই জিহাদের ফোনে একটি ভিডিও এল।
ভিডিও চালু করতেই দেখা গেল, একজন নারী একটি ঘরে বসে আছেন। তাঁর চোখে পানি।
জিহাদ চিৎকার করে উঠল,
জিহাদ: মা!
ভিডিওতে জিহাদের মা বললেন,
মা: জিহাদ, তুমি যদি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝবে আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারলাম না। তোমার জন্মের সময় আমি একটি ভয়ংকর ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের কারণে আজ দুটি পরিবার ধ্বংসের মুখে।
জিহাদ: মা! তুমি কোথায়?
মা: আমার কথা মন দিয়ে শোনো। নওশিনকে কখনো দোষ দেবে না। ও কিছুই জানে না।
নওশিন কাঁপা গলায় বলল,
নওশিন: আন্টি, আপনি কী বলতে চাইছেন?
ভিডিওতে জিহাদের মা আবার বললেন,
মা: নওশিনের জন্মের রাতে আমি যে শিশুটিকে নিজের সন্তান ভেবেছিলাম, সে আসলে...
ঠিক তখনই ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।
সবাই হতবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
জিহাদ বারবার ভিডিও চালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
ওভি দ্রুত খামটা তুলে নিল।
খামের ভেতরে একটি হাসপাতালের রিপোর্ট এবং একটি ছোট চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
"দুই শিশুর পরিচয় বদলানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একজনের পরিচয় কখনোই বদলায়নি। আসল সত্য জানতে চাইলে আগামীকাল রাত বারোটায় সেই হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডরুমে এসো।"
চিঠির নিচে একটি নাম লেখা—
মাহিরা।
নওশিন চিঠিটা হাতে নিয়ে কাঁদতে লাগল।
নওশিন: মা, মাহিরা যদি আমার খালা হয়, তাহলে তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কেন?
নওশিনের মা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
মা: কারণ মাহিরা মারা যায়নি!
সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল।
জিহাদ: কী!
মা: মাহিরা এত বছর ধরে বেঁচে আছে। আর সে-ই মেহেরকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল।
ঠিক তখনই বাইরে একটি গাড়ির শব্দ হলো।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে নওশিন দেখল, রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে মেহের।
মেহের ফোন কানে দিয়ে মুচকি হাসল।
মেহের: এবার দেখা হবে, আমার ছোট্ট বোন।
চলবে... 🖤
পর্ব ১১— মাহিরার ফিরে আসা! মেহের ও নওশিনের রক্তের সম্পর্কের ভয়ংকর সত্য এবং জিহাদের মায়ের লুকানো অপরাধ!