🖤 তোর কারণে বেঁচে আছি 🖤
ধরন: রোমান্টিক থ্রিলার, রহস্য, বন্ধুত্ব ও আবেগ
পর্ব ১৩ — ৩০৭ নম্বর লকারের রহস্য ও নওশিনের বাবার প্রত্যাবর্তন!
রাত তখন প্রায় দুইটা।
পুরোনো হাসপাতালের রেকর্ডরুমে দাঁড়িয়ে আছে নওশিন আর ইমু। দুজনের চোখেই আতঙ্ক। একদিকে জিহাদ আর ওভি পুলিশের হাতে বন্দি, অন্যদিকে মাহিরা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।
নওশিনের হাতে শক্ত করে ধরা ছোট্ট একটি চাবি। চাবির গায়ে লেখা ৩০৭।
ইমু নওশিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নওশিন, এখন আমাদের কী করা উচিত?
নওশিন চোখের পানি মুছে বলল,
— আগে ৩০৭ নম্বর লকার থেকে প্রমাণটা বের করতে হবে। তারপর জিহাদ আর ওভিকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে।
ইমু মাথা নাড়ল।
— আমি তোর সঙ্গে আছি। যা-ই হোক, আমরা একসঙ্গে সব সত্য বের করব।
পুরোনো লকারের ভেতরে
রাত আড়াইটার দিকে তারা হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডরুমে ফিরে এল।
নওশিন চাবি দিয়ে ৩০৭ নম্বর লকার খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি, কয়েকটি ছবি এবং একটি ছোট পেনড্রাইভ রাখা ছিল।
নওশিন ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় লেখা দেখতে পেল—
“আমার মেয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকুও হয়তো আমি পাব না। কিন্তু একদিন সত্য সামনে আসবেই।”
নিচে নাম লেখা— নওশিনের বাবা, আরমান হোসেন।
নওশিন কাঁপা হাতে ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
— ইমু! এটা আমার বাবার হাতের লেখা! বাবা সত্যিই বেঁচে আছে!
ইমু অবাক হয়ে বলল,
— কিন্তু তোর বাবা বেঁচে থাকলে এতদিন তোদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি কেন?
নওশিন ডায়েরির পরের পাতাটা খুলল।
সেখানে লেখা—
“আমার মৃত্যুর খবরটা মিথ্যা ছিল। আমাকে যারা মেরে ফেলতে চেয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
নওশিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— তাহলে বাবা নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য মৃত্যুর নাটক করেছিলেন!
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা শব্দ হলো।
কেউ একজন ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
ইমু ঘুরে তাকিয়ে চিৎকার করল,
— কে ওখানে?
অন্ধকার থেকে একজন পুরুষ বেরিয়ে এল।
মুখে দাড়ি, মাথায় কালো টুপি।
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
— নওশিন!
নওশিনের বুক কেঁপে উঠল।
— বাবা!
লোকটি এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল।
অনেক বছরের জমে থাকা কান্না দুজনের চোখ দিয়ে ঝরে পড়ল।
নওশিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— বাবা, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আমাকে একবারও দেখতে ইচ্ছে করেনি তোমার?
আরমান মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— মা, প্রতিদিন তোকে দেখার ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু তোকে বিপদে ফেলতে চাইনি।
নওশিন অভিমান করে বলল,
— আমার কাছ থেকে এত বড় সত্য লুকালে কেন?
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কারণ তোর জীবনের সঙ্গে এমন একটা রহস্য জড়িয়ে আছে, যেটা জানলে তুই নিজের কাছের মানুষদেরও বিশ্বাস করতে পারবি না।
ওভির আসল বাবার পরিচয়
ইমু এবার প্রশ্ন করল,
— আঙ্কেল, ওভির আসল বাবা কে? জিহাদের মা বলেছেন, ওভি তাঁর সন্তান।
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা ছবিগুলো বের করলেন।
একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন জিহাদের বাবা, একজন আরমান এবং অন্যজন অচেনা এক ব্যক্তি।
আরমান ছবির তৃতীয় ব্যক্তির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,
— এই মানুষটাই ওভির আসল বাবা।
নওশিন ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
— কিন্তু উনি কে?
আরমান নিচু গলায় বললেন,
— উনি হলেন রাশেদ খান। শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একজন।
ইমু অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে ওভির জন্মদাতা বাবা রাশেদ খান?
আরমান মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, জিহাদের বাবা আর রাশেদ খান মিলে সেই রাতে হাসপাতালের শিশু বদলের পরিকল্পনা করেছিলেন।
নওশিন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
— কিন্তু কেন?
আরমান বললেন,
— সম্পত্তির জন্য। রাশেদ খানের নিজের সন্তানকে অন্য পরিবারের কাছে বড় হতে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে।
ইমু বলল,
— তাহলে ওভির এতদিনের পরিবার কিছুই জানত না?
— ঠিক তাই।
জেলের ভেতরে দুই ভাই
অন্যদিকে জেলের একটি ছোট ঘরে পাশাপাশি বসে আছে জিহাদ আর ওভি।
ওভি দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
— জানিস জিহাদ, কখনো ভাবিনি জীবনের এক রাতে নিজের পরিচয়টাই হারিয়ে ফেলব।
জিহাদ বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বলল,
— তুই আমার বন্ধু ছিলি, আছিস, থাকবি। রক্তের সম্পর্ক জানার পরও তোর প্রতি আমার ভালোবাসা বদলাবে না।
ওভি মুচকি হেসে বলল,
— তাহলে একটা কথা বলি?
— বল।
— ইমুকে অনেক ভালোবাসি রে। ওকে ছাড়া থাকতে পারব না।
জিহাদ হেসে বলল,
— তাহলে জেল থেকে বের হয়েই ওকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নে!
ওভি হেসে উঠল।
কিন্তু তাদের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
হঠাৎ একজন পুলিশ অফিসার এসে বললেন,
— জিহাদ! তোমার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।
জিহাদ অবাক হয়ে বলল,
— কে?
পুলিশ অফিসার উত্তর দিলেন,
— তোমার মা।
জিহাদ উঠে দাঁড়াল।
মায়ের মুখে নতুন স্বীকারোক্তি
জিহাদের মা সামনে এসে দাঁড়াতেই জিহাদ বলল,
— মা, তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছ? মাহিরাকে গুলি করার ভিডিওটা মিথ্যা, তাই না?
জিহাদের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— হ্যাঁ বাবা। ভিডিওটা সাজানো। কিন্তু তোমাকে একটা সত্য জানাতে এসেছি।
— কী সত্য?
— ওভি শুধু আমার সন্তান নয়। ওর জন্মের সময় আমি ওকে নিজের কাছে রাখতে পারিনি। কারণ ওর জন্মের সঙ্গে এমন একজন মানুষের সম্পর্ক আছে, যার নাম শুনলে তুইও অবাক হয়ে যাবি।
ওভি সামনে এগিয়ে বলল,
— আমার বাবার নাম রাশেদ খান, তাই না?
জিহাদের মা চমকে উঠলেন।
— তুমি এটা কীভাবে জানলে?
ওভি বলল,
— সব সত্য জেনে গেছি।
জিহাদের মা মাথা নিচু করে বললেন,
— তাহলে আরেকটা সত্য শোনো। রাশেদ খান এখনো তোমাকে খুঁজছে। কারণ তার কাছে এমন একটি দলিল আছে, যেখানে তোমার নামের পাশে আরও একজনের নাম লেখা।
জিহাদ প্রশ্ন করল,
— কার নাম?
জিহাদের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— নওশিনের নাম!
শেষ মুহূর্তের ভয়ংকর ফোনকল
ঠিক তখনই নওশিনের ফোনে একটি ভিডিও কল এল।
স্ক্রিনে দেখা গেল রাশেদ খানকে।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
— কেমন আছো, নওশিন? বাবাকে ফিরে পেয়ে নিশ্চয়ই খুব খুশি?
নওশিন রেগে বলল,
— আপনি আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছেন! কেন করেছেন এসব?
রাশেদ খান হেসে বললেন,
— কারণ তোমরা এখনো জানো না, তোমাদের জন্মের আসল রহস্য কী!
আরমান ফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— রাশেদ! এবার আর পালাতে পারবে না।
রাশেদ খান ঠান্ডা গলায় বললেন,
— আরমান, তুমি এখনো বেঁচে আছো দেখে ভালো লাগল। তবে একটা কথা মনে রেখো, তোমার মেয়েকে বাঁচাতে চাইলে কাল সকাল দশটার মধ্যে পুরোনো জমিদারবাড়িতে চলে এসো।
নওশিন চিৎকার করে বলল,
— সেখানে গেলে কী হবে?
রাশেদ খান মুচকি হেসে বললেন,
— সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
কথাটা বলেই তিনি কল কেটে দিলেন।
নওশিন ভয়ে বাবার হাত শক্ত করে ধরল।
আরমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মা, কাল যা-ই ঘটুক, তুই ভয় পাবি না।
ঠিক তখনই ইমুর ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর থেকে লেখা—
“নওশিনকে বিশ্বাস করিস না। কারণ ও নিজেও জানে না, ওর জন্মের রাতে আসলে কী হয়েছিল।”
ইমু মেসেজটা পড়ে নওশিনের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— নওশিন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কী?
— তুই কি নিশ্চিত, তোর বাবা সত্যিই তোর আসল বাবা?
নওশিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আরমান হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,
— ইমু! এই প্রশ্ন করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?
সবাই অবাক হয়ে আরমানের দিকে তাকাল।
কারণ তাঁর চোখে তখন স্পষ্ট ভয়।
চলবে...
পর্ব ১৪-তে:
১. নওশিনের আসল বাবা কে?
২. রাশেদ খান কেন নওশিনকে খুঁজছে?
৩. জিহাদ ও ওভি কি জেল থেকে মুক্তি পাবে?
৪. ইমু কি ওভির পরিবারের সত্য মেনে নিতে পারবে?
৫. আরমান কেন ইমুর প্রশ্নে এত ভয় পেলেন?