ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 1

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
১.
শান্ত চেহারায় পত্রিকার দিকে তাকিয়ে আছে সাকিন। তার সেন্ট পার্সেন্ট মনোযোগ পত্রিকার দু’নম্বর পাতায়। পত্রিকা হাতে নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠা না পড়েই সে সরাসরি দু’নম্বর পৃষ্ঠায় চলে যায়। এখানকার সব আর্টিকেল শুরু হয় কাটা মাথা নিয়ে। মাথাটা আরেক পৃষ্ঠায় রাখা হয়েছে। এই পৃষ্ঠায় শুধু দেহটা দেখা যাচ্ছে। শুধু ওটুকু দেখে মাথার ধরন আন্দাজ করাটা একটু শক্ত বটে। তবে এই শক্ত কাজটা বেজায় পছন্দ করে সাকিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিরোনাম এবং ঘটনার সূচনা নিয়ে তার প্রেডিকশন মিলে যায়। বাস্তব জীবনে শক্ত কাজ ভাঙার সাধ্যি নেই বলেই হয়তো অবচেতন মন ওই কাজটুকু করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে।

তবে আজ ধূসর কাগজের লেখাগুলো তার মনোযোগের ক্ষুদ্রাংশও ধরে রাখতে পারছে না । এখন বাজে সকাল সাড়ে আটটা। ভোর পাঁচটায় উঠে খানিকটা ছোটাছুটির পর সাড়ে সাতটার সময় ক্ষুধাটা একেবারে চাগাড় দিয়ে ওঠে। তখন এক কাপ চা খেলে অবশ্য আরও তিন ঘণ্টা অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায়। তবে সমস্যা হলো আজ সেই উপোস ভাঙার চা-টা পাওয়া যায়নি। তাতে সাকিন ভেবেছিল রুটির পর্বটা বোধহয় ন’টা থেকে ট্রান্সফার হয়ে আটটায় আসবে। সেটাও হয়নি। ক্ষুধায় তার প্রেডিকশন ভুল হচ্ছে। পত্রিকার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে নিজের পেটের ভেতরকার মিছিল-মিটিংয়ের হট্টগোল শুনছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পত্রিকার ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেজে চলেছে ওখানে।

দোকানে যাবার জন্য ধীরে-সুস্থে তৈরি হলো সাকিন। কালো ফিতার হাত-ঘড়িটা পড়ার সময় নিত্য করা প্রতিজ্ঞাটা আরেকবার নবায়ন করে নিলো। জীবনের প্রথম ইনকাম দিয়ে সে একটা চমৎকার ঘড়ি কিনবে। তখন কিন্তু অচল এই ঘড়িটা মোটেও ফেলে দেবে না। এই ঘড়ির সময় থেমেছে আরও তিন বছর আগে। সাবিহাকে ওর বরের হাতে তুলে দিয়ে এসে সাকিন দেখে ঘড়ির সময় কোন ফাঁকে যেন বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও রকমেই তাকে আর চালানো গেলো না। সে জেদ ধরে পড়ে রইলো পুরোনো সময়ের চৌকাঠে।
সেই চৌকাঠে বসে সাকিন দুনিয়া দেখেছে, মানুষ চিনেছে। কাজেই ওটাকে ফেলে দেয়ার মানে হয় না। সুন্দর করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা যেতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটা দর্শনীয় বস্তু হবে।

নয়টা বেজে গেলেও যখন ডাক পড়ল না—তখন সাকিন নিজেই এগিয়ে গেলো। তার ঘরটা বাড়ির বাইরের দিকে, বারান্দার সাথে। আর ওদিকে রান্নাঘর বাড়ির একদম কোণায়, তার সাথেই লাগোয়া খাবার ঘর।

সাকিন রান্নাঘরে বলতে গেলো, “মামী, এখনও খাবার রান্না হয়নি?”
অথচ সে বলল, “মামী, আমি বের হচ্ছি।”

পাপিয়া বেগম রুটি বেলতে বেলতে বিরস কণ্ঠে বললেন, “যা। বিসমিল্লাহ বলে বের হ।”

পাপড়ি মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে গ্যাসের চুলায় রুটি সেকছে। একটা ঝুড়িতে রাখল। অন্যদিন সাকিনের খাবারটা গুছিয়ে দিলেও আজ তার ভেতরে তেমন হাব-ভাব দেখা গেলো না। গত রাতেও সে সাকিনকে খাবার দেয়নি। এবং সাথে সাথেই সাকিনের মনে পড়ল গত রাতে আসলে সে খায়ইনি। তৎক্ষণাৎ মাথাটা ঘুরে উঠল। পত্রিকার শিরোনাম মেলানোর মতো করে এই ঘটনার শিরোনাম এবং উপসংহার মিলিয়ে ফেলল সে। পরশুর পর পাপড়ি তাকে বেড়ে খাওয়াবে—এমন আশা করাটাই বোকামি হয়েছে। সেই বোকামিটাই করে ফেলেছে সাকিন।

পাপিয়া বেগম তাড়া দিলেন, “কাজে-কামে দেরি করে যাওয়া উচিত না। যা তাড়াতাড়ি যা।”

সাকিন উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। এই বাড়িতে থাকতে তাকে ভাড়া হিসেবে কাগজের নোট দিতে হয় না। দিতে হয় সম্মতি। সকল কথার ধ্রুব জবাব—হ্যাঁ।
কাজেই সম্মতি দিয়ে সে ফার্মেসির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

•

আকরাম খান মোটামুটি ধরনের উকিল। তবে ইদানীং লোকমুখে শোনা যাচ্ছে তিনি নাকি খুব ডাকসাইটে হয়ে উঠেছেন। তার প্রমাণ হলো—দশ মিনিটের মিটিংয়ের জন্য তাকে তিন হাজার টাকা ফিস দিতে হয়। সেই ফিস নিয়ে পাড়া-মহল্লায় প্রচুর ফিসফিসানি হচ্ছে।

পুরোনো আমলের সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দের ভেতরেই উপরোক্ত তথ্যগুলো সগোতিক্ত করে বলছিলেন নাজিম সাহেব, ফার্মেসির হর্তা-কর্তা।
সাকিনের মনবিয়োগী দৃষ্টি তখন আরণ্যকের পাতায়। এই সাতাশ বছরের জীবনে বইটা কত অসংখ্যবার সে পড়েছে—তার হিসেব নেই। আরও কতবার পড়বে— সেটাও অজানা। কিন্তু কোনোবারই বইটা শেষ করেনি সে। কোনোদিন যে করবে—সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

সাকিন পড়ে গেলো,
“আমি এমন কত লোকের কথা জানি, যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে বটে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ভোঁতা—এখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ পায় না।”

“এই যে! সাকিন মিয়া!”
সাকিন দৃষ্টি সরালো। ভদ্রলোক কি তার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করেছিল? এমন উত্তর-উত্তর চোখে তাকিয়ে আছে কেন?
“বলো দেখি, দুই হাতে টাকা কামানির পরেও এই ফার্মেসি দেয়ার দরকার কী? শুধু শুধু..”
সাকিন মনে মনে বলল, “কালো টাকা সাদা করার জন্য।” অথচ তার মুখ বন্ধ।
নিজাম উত্তর না পেয়ে খুব একটা অসন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না। মাঝে মাঝেই তিনি ফার্মেসি নিয়ে যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করে থাকেন। তার মৌখিক স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই ফার্মেসিতে গোত্তা মেরে বসে থেকে তার জীবনটা ডিইউজড হয়ে গেছে। সাকিন কখনও শুধরে দিয়ে বলেনি—ওটা ডিইউজড নয়, আনইউজড হবে।

ফার্মেসির দায় দায়িত্ব এই ষাটোর্ধ্ব লোকটার উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন আকরাম খান। মাসে মাসে কেবল কিছু টাকা তাকে বুঝিয়ে দিলেই হয়। দু’হাতে কামাই করছেন মূলত নাজিম সাহেব।

চোখে ঘোলা দেখছিল সাকিন। ডেস্ক থেকে সিভিটের একটা পাতা টেনে নিয়ে ভাবল মুখটাকে ব্যস্ত রাখা যাক। নাজিম জিভে কামড় দিয়ে পাতাটা টেনে নিয়ে বললেন, “এমন কইরো না বাপ! মানুষের আমানত, কঠিন জিনিস।”
মানিব্যাগের কোণায় পড়ে থাকা একটিমাত্র পঞ্চাশ টাকার নোটের কথা চিন্তা করে চুপ করে রইলো সাকিন।

বছর চল্লিশ-পঞ্চাশের এক লোক দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। নাজিম তাকে ডেকে বললেন, “কই যান ভাই?”
চোখ মুখ কুঁচকে ভদ্রলোক বললেন, “পেটের বেদনায় মরতেছি। ডাক্তারের কাছে যাই।”
মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে নাজিম বললেন, “আরে হুদাহুদি ডাক্তার ক্যান? গেলেই পাঁচশ টাকা নাই। ওষুধ দেই, নিশ্চিন্তে খান। ডাক্তার তো এইসবই খাইতে কয়।”
পাঁচশ টাকা বাঁচানোর আনন্দে সম্ভবত ভদ্রলোকের পেটের পীড়া অর্ধেক কমে গেলো। কেননা তার চোখ মুখের ভাঁজ সমান হয়ে এসেছে। সে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে ফার্মেসির সাদা তাকের দিকে।

“আগে এন্টারসিড খান। কাজ না হলে আরেক পাক দিয়ে যাবেন। সমস্যা কী? এখানে তো আর ভিজিট লাগবে না।”
ভদ্রলোক খুশি মনে বিল দিয়ে চলে গেলেন। সাকিন শান্ত চোখে দেখল টাকাগুলো সুড়ুৎ করে নাজিম সাহেবের পকেটে ঢুকে পড়েছে। আহা! মুনাফিক টাকা! আমানত বোঝে না।

পকেটে ফোন ভাইব্রেট করছে। স্ক্রিনে সাবিহার নাম। ফোন ধরেই সে আগে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া খেয়েছিস?”
“হুঁ।” মিথ্যেটা বলতে খুব কষ্ট হলো সাকিনের। তার একটিমাত্র বোন। এই বোনটাকেও ঠুলি পরিয়ে রাখতে মোটেই ভালো লাগে না।
“কী খেয়েছিস?”
“সকালে যা খাই।” সাকিন হাসপাতাল গেটের দিকে তাকালো। একটা অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। এই সাত সকালেই মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে! সেখানে তার না খাওয়াটা কোনো দুর্ঘটনার কাতারে পড়ে?
সাকিন কথা ঘোরাবার প্রয়োজন অনুভব করল। অনবরত মিথ্যা বলার মানে হয় না।
“তুই খেয়েছিস?”
সাবিহা উত্তর দিল না। সে বুঝতে পারল সাকিন খায়নি। এজন্যই তার খাওয়ার খবর নিচ্ছে। নয়তো এ বিষয়ে সাকিনের মোটেই আগ্রহ নেই। তাকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়—কে কোন বেলায় কী খেয়েছে—এটা এত জিজ্ঞেস করার কী আছে?
“খেয়েছি।” ধরা গলায় বলল সাবিহা। অথচ সাকিন সেটা ধরতে পারল না।
সাকিন জিজ্ঞেস করল, “রিফাত কী করছে?”
“মুখে আঙুল ঢুকিয়ে আ উ করছে। এই ভাইয়া!” সাবিহার কণ্ঠ হঠাৎ করেই নেমে গেলো।
“বল।”
“পাপড়ি কিছু করেছে নাকি?”
সাকিন সতর্ক হলো, “কী করবে?”
“সত্যি কথা বলবি! ওকে ফোন দিলাম চোদ্দবার। ধরার নাম-গন্ধ নেই। এমনি দিন তো আপা আপা করে মুখে ফ্যানা তোলে।”
সাকিন ঠোঁট কামড়ালো। বলল, “এতেই তোর মনে হয়েছে ও কিছু করেছে?”
“আলবৎ! ফোন না ধরে আমার উপর রাগ দেখাচ্ছে। যদিও ওর রাগের ধার ধারি না, কিন্তু আমার উপর যেহেতু রাগ দেখাচ্ছে তোকেও নিশ্চয়ই ছেড়ে দেয়নি। কী করেছে বল তো? খবরদার মিথ্যা বলবি না ভাইয়া! খাওয়া নিয়ে একটা মিথ্যা বলেছিস, কিছু বলিনি। এখন বল ও তোকে খেতে দেয়নি কেন?”

সাকিন শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, “তোর গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেয়া উচিত ছিল। মানুষের নিশ্বাস গুণেই বলে দিতে পারিস কার মাথায় কী চলছে।” দোকান থেকে বের হতে হতে বলল সাকিন। নিজাম সাহেব বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছেন। দোকান থেকে বের হওয়া তিনি মোটেই পছন্দ করেন না।

সাবিহা দুঃখিত কণ্ঠে বলল, “তোরা হতে দিলি কই? ইন্টার পরীক্ষাটা দেয়া শেষ করতে পারলাম না ওমনি ধরে কবুল বলিয়ে দিলি।”
“আচ্ছা আমি রফিক ভাইকে বলব, আপনার বউ বিয়ে করে খুবই কষ্টে আছে। আপনি..”
কথা শেষ করতে দিলো না সাবিহা, “খবরদার এসব বলবি না ভাইয়া!” অথচ তার কণ্ঠে লজ্জা লজ্জা ভাব। মুহূর্তেই সেটা পাল্টে সে বলল, “খোলাসা করে বল তো কী হয়েছে।”
সাকিন খানিকক্ষণ ইতস্তত করল। বিষয়টা বলতে তার অসম্ভব লজ্জা লাগছে। সে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মেহগনি গাছের নিচে। মেহগনি পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ উঁকি দিচ্ছে। ওদিকে তাকিয়ে কপাল চুলকে গলা খাঁকারি দিলো সাকিন।
পাপড়ির সাফাই গেয়ে বলল, “ওর বয়সটাই এমন। ছোট মানুষ, স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে সারাদিন নাটক-সিনেমা দেখে আর উপন্যাস পড়ে পড়ে এই অবস্থা হয়েছে।”
সাবিহা তাজ্জব কণ্ঠে বলল, “ও তোকে প্রোপোজ করেছে নাকি!”
“আরে ধুর ধুর!” তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করল সাকিন। লজ্জায় তার গলা বন্ধ হয়ে আসছে।
“ঘুরতে যেতে চায়, এটা-সেটা খাওয়ার আবদার নিয়ে আসে। আমি তো বুঝতে পারছিলাম কী হচ্ছে। সারাক্ষণ চোখের সামনে আমাকেই দেখছে তো, দুদিন না থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
সাবিহা কিছুক্ষণ কথা বলল না। প্রায় পনের সেকেন্ড পর তার কথা শোনা গেলো।
“তুই তো ওর পক্ষে মাগনা ওকালতি করে যাচ্ছিস। আমি বুঝতে পারছি কাহিনী আরও কিছু হয়েছে। বলছিস না যখন জোর করব না। কিন্তু শুনে রাখ ভাইয়া—ওকে মায়া করে, দয়া করে কোনোভাবেই আশকারা দিবি না। দরকার হলে আমার এখানে চলে আয়। তাও খবরদার নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না।”

ফোন কেটে যাবার পরও সাকিন আরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। মামাতো বোন প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে এজন্য সাকিন যতটা না লজ্জা পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি লজ্জা পাচ্ছে নিজ অস্তিত্বের জন্য।
পাপড়ি যখন লজ্জা লজ্জা কণ্ঠে বলল, “সাকিন ভাই, তুমি চাইলেই কিন্তু আমরা এমনভাবে রিকশায় ঘুরতে পারি।” টিভিতে তখন নায়ক-নায়িকার রিকশাভ্রমন দেখাচ্ছিল।
সাকিন উত্তর না দিয়ে ঘরে চলে গেলো। রাতে খাবার দিতে যেয়ে পাপড়ি আবার বলল, “আমার উত্তর কিন্তু দিলা না।”
সাকিন শান্ত কন্ঠে বলল, “ঘরে যা পাপড়ি। মন দিয়ে পড়াশোনা কর।” তার কণ্ঠ সবসময়ই শান্ত থাকে।
পাপড়ি খুব রেগে গেলো, “ভাব দেখাইতেছ? এত কীসের ভাব তোমার? আমার বাপের খাও-পর, আমি যে তোমাকে সুযোগ দিছি এইটাই তো তোমার ভাগ্য!”
সাকিন ফের শান্ত কন্ঠে বলল, “ঘরে যা পাপড়ি।”
পাপড়ি অপমানে লালচে মুখ দিয়ে ঘরে চলে গেলো। এরপর থেকেই সাকিনের খাওয়া-দাওয়া এক প্রকার বন্ধ। কারণ পাপড়িই তার খাবার দিয়ে যেত।

সাকিন সে রাতে ঘুমুতে পারেনি। লজ্জায়-অপমানে তার চোখ জোড়া জ্বলছিল। সেসব কথা তো আর ছোট বোনকে বলা যায় না!

দোকানে ফেরার আগে মোবাইল বের করল সাকিন। কোত্থেকে যেন ফ্রি ওয়াই-ফাই কানেক্ট হয়েছে। নির্দিষ্ট একটা ওয়েবসাইটে ঢুকে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এলো সে। বছর দেড়েক ধরে সে নিজের উপর একটা এক্সপেরিমেন্ট করছে। সেটা কবে শেষ হয় কে জানে!

*****

রোদ্দুর বলছে ভাদ্র মাস, অথচ পঞ্জিকায় শ্রাবণ। মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ফলে সে মাসের গুনতি ভুল করছে। যখন যেমন আচরণ করার কথা—করছে ঠিক তার উল্টোটা। বর্ষায় পৃথিবী সাজবে জলরঙে, তার গায়ে থাকবে কদমের সুবাস। অথচ চারদিকে তাকিয়েও একটা কদম গাছ খুঁজে পেলো না ফাবিহা। মাথার উপরে একটা অপুষ্টিতে ভোগা ফুরুশ গাছ ওর ন্যাড়া মাথা দুলিয়ে হাসছে। যেন বলছে—গাছ কেটে মরুভূমি বানিয়ে তুমি ছায়া খুঁজতে এসেছো, চাঁদু! তামাশার শেষ দেখিয়ে ছাড়ব তোমায়! এসো হাওয়া খাও, আধুনিক হাওয়া।

ফাবিহার মনে হলো সে সমস্ত কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। এই যে গাছটা কিটকিটিয়ে হাসছে—জ্বালা ধরে যাচ্ছে ওর গায়ে। রোদ্দুরের তোপের তোয়াক্কা না করে সে এগিয়ে গেলো। পরপর পাঁচটা ক্লাস তার মাথায় জ্যাম ধরিয়ে দিয়েছে।

খানিক এগিয়ে যেতেই দেখা গেলো প্রকাণ্ড এক কৃষ্ণচূড়া গাছ। ওর লাল থোকাগুলো রোদের রংকে ছাপিয়ে রাস্তাটা রক্তলাল বানিয়ে দিয়েছে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ফাবিহা থমকে দাঁড়িয়ে সে রঙের বিস্ময় দেখে গেলো।

তার খুব জানতে ইচ্ছে হয়— মানুষের যন্ত্রণায় এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীর রূপ সহ্য করাই মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেমন ছিল আদম-হাওয়া’র (আলাইহিমুস সালাম) পৃথিবী? আনকোরা সে ধরণীর অসহ্য সুন্দর রূপ তারা কীভাবে সহ্য করেছিলেন?
জানা হয় না। পৃথীবির প্রথম দম্পতি সে বিষয়ে কোনো নথি রেখে যাননি। রেখে গেছেন এক ঝাঁক মানুষ—যারা পৃথিবীকে ছিবড়ে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে ব্যস্ত।

গাছপালার সবুজ রং দেখতে দেখতে ফাবিহার মাথার জ্যাম ছাড়ছিল। বাড়িতে ঢুকতেই আবার জ্যাম বাঁধতে শুরু করল। জিরো পয়েন্টের জ্যাম—কখন ছাড়বে ঠিক নেই। সাথে নিরবচ্ছিন্ন হর্নের শব্দ। ফাবিহার ইচ্ছে হলো নিজের মাথাটা হাতুড়ি দিয়ে পিষতে।

সজীব হেসে বলল, “কেমন আছো ফাবিহা?”
ফাবিহা হাসল না। মেঘলা আকাশের মতো গুম হয়ে বলল, “ভালো আছি, সজীব ভাই। আপনি কেমন আছেন?” লোকটার নাম সজীব। অথচ ওকে দেখলেই ফাবিহা নির্জীব হয়ে যায়।
সজীবের হাসি বাড়ল, “এখনও ভাই বলো কেন?”
ফাবিহা উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না।
সজীব উত্তর না পেয়ে পরের প্রশ্নে চলে গেলো, “আজকে বিকেলে ফ্রি আছো তো? কাছেই নতুন একটা রেস্টুরেন্টে চালু হয়েছে। কালকে রাতেই ফেসবুকে ডিসকাউন্ট দেখলাম। কাপলদের জন্য আবার স্পেশাল! চলো ঘুরে আসি।” তার ঠোঁটে হাসি ধরছে না।

ফাবিহা কিছু বলার আগেই নূরজাহান ভেতর থেকে ট্রে হাতে আসতে আসতে বললেন, “ফ্রি না থাকলেও হবে। এমনিতেই তো সারা বিকেল গড়াগড়ি দিয়ে কাটায়।” লেবুর শরবত সজীবের হাতে তুলে দিলেন তিনি। গ্লাসের গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরছে।

ফাবিহার মনে হলো কেউ তার মাথায় ভিসুভিয়াসের লাভা ঢেলে দিচ্ছে। সেই লাভা গড়িয়ে গড়িয়ে তার মাথা থেকে ঘাড়-গলা বেয়ে সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
মায়ের দিকে উত্তপ্ত চোখে তাকালো সে। এই বাইরের লোকটার সামনে তাকে নাকাল করে নূরজাহান কী মজা পান কে জানে। যে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে আসবে—তার কাছেই কি ফাবিহার নামে দুটো নালিশ করতে হবে?

“বসো, একটু আলাপ করি। ওর জন্য শরবত আনেননি আন্টি?” সজীব নূরজাহানের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
নূরজাহান বললেন, “ও যে এখন আসবে সেটা তো জানতাম না। শরবত খাবি তুই? আচ্ছা, বস আমি আনছি।”
ফাবিহার মোটেই বসার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু নূরজাহান সজীবের পেছনে দরজার কাছে যেয়ে তাকে চোখ রাঙালেন। ফাবিহা না বসা অবধি তিনি গেলেন না। অগত্যা ফাবিহাকে বসতেই হলো।

“দিনকাল কেমন যাচ্ছে তোমার?”
“ভালো।”
“সেদিন হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিলাম। মেসেজ ডেলিভার হলো, তাও সিন করলে না কেন?” সজীবের কণ্ঠের সজীবতা হারিয়ে গেলো।
ফাবিহা জানালার দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলল, “চেক করা হয়নি।”
“করনি কেন? আমার মেসেজ কি তোমার কাছে জরুরি মনে হয় না? হাতের আংটিও দেখি খুলে রেখেছ! কী সমস্যা তোমার?”
সেই ক্ষণে নূরজাহান এলে কথা থামালো সজীব। হাসিমুখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ফাবিহার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যাব আন্টি।”
ফাবিহা নিশ্চিত জানে এটা সজীবের নাটক। এখন নূরজাহান ওকে থাকার জন্য সাধবেন, আর তারপরই সে লাফ দিয়ে রাজি হয়ে যাবে।

হলোও তাই।
নূরজাহান আঁতকে ওঠার মতো করে বললেন, “না না! এই ভরদুপুরে যাওয়া হচ্ছে না! দুটো ডাল-ভাত খেয়ে জিরিয়ে নাও। বিকেলে ওকে কোথায় নিয়ে যাবে যাও। তারপর ফেরত যেও। আহা! আর কথা শুনছি না। আমি রান্না বসিয়ে দিয়েছি। গল্প করো তোমরা।”
এসব আদিখ্যেতা ফাবিহার মোটেই সহ্য হলো না।

নূরজাহান চলে যেতেই সজীব পুরোনো রূপে ফিরে গেলো। কণ্ঠে কাঠিন্যতা ঢেলে বলল, “বলো, মেসেজের রিপ্লাই দাও না কেন?”
“আপনি তো রিলস পাঠানো ছাড়া কোনো কাজের মেসেজ দেন না, সজীব ভাই। প্রথম কথা আমি রিলস দেখতে পছন্দ করি না, দ্বিতীয় কথা রিলসের রিপ্লাই কী দিতে হয় আমি জানি না। এজন্য মেসেজ দেখি না।”
সজীবের মুখে রাগ ফুটে উঠল। সেটা চেপে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল সে।
“তোমার পড়াশোনার কী অবস্থা? কোন ইয়ারে যেন তুমি?”
“সেকেন্ড ইয়ার, ফাইনাল সেমিস্টার।” চায়ে চুমুক দেয়ার মতো করে শরবত খেলো ফাবিহা। ভেতর ঘরে একটু উঁকি দিলো। সিমি কোথায় কে জানে। ওকে এখানে গছিয়ে দিয়ে লোপাট হওয়ার চিন্তা করল ফাবিহা।
“দ্রুত অনার্সটা শেষ করে ফেলো তো! আর কতদিন এভাবে থাকবো!” আফসোস করে বলল সজীব।
ফাবিহা শীতল কণ্ঠে বলল, “আপনি চাইলেই তো আর এভাবে থাকতে হয় না। এই থাকাথাকির বিষয়টাও তো আপনার ইচ্ছেতেই হচ্ছে।”
“আরে ধুম করে বিয়ে করে ফেললেই হয় নাকি! একটা বোঝাপড়ার বিষয় আছে না? এখন কিছুদিন একসাথে থাকলেই না বুঝতে পারব তোমার আমার জমবে কি না। বিয়ের পর ছাড়াছাড়ির চাইতে বিয়ের আগে আংটি খুলে ফেলা বহুত সোজা।”
ফাবিহা চমৎকার ভঙ্গিতে হাসল, “ঠিক বলেছেন।” বলে ব্যাগের ভেতরে হাত ঢোকালো সে। তিন আনার সোনার আংটিটা বের করে তার আর সজীবের মাঝের টেবিলে রেখে বলল, “যখন আপনার মনে হবে বিয়ে বিয়ে খেলাটা জমে উঠেছে—তখন আংটিটা পরব, সজীব ভাই। জমাজমির আগে এটা আপনার কাছেই থাকুক কেমন?”
সজীবের বিস্ফোরিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে ফাবিহা ঝলমলে কণ্ঠে ডাকল, “সিমি! অ্যাই সিমি!”
সিমি মনে হয় তৈরিই ছিল। সেকেন্ডের মাঝে ছুটে এসে দরজায় দাঁড়ালো সে। ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ফাবিহা ওকে বলল, “তোর সজীব্ভাইকে একটু পাখা দিয়ে বাতাস কর তো। বেচারা গরমে টিকতে পারছে না।”

কোনোদিকে না তাকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল ফাবিহা। অভ্যস্ত হাতে একটানে স্কার্ফ খুলে বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ল। থ্রি-পিসটা ঘেমে গায়ের সাথে লেগে আছে। তবুও ফাবিহার মনে হলো বুকের উপর থেকে জগদ্দল পাথর সরে গেছে। সে কল্পনা করার চেষ্টা করল—সে একটা নদীতে সাঁতার কাটছে। টলটলে স্বচ্ছ সে নদীর পানি। পানিতে রোদ ঝিলিক দিচ্ছে, কিন্তু মোটেও গরম লাগছে না। দু-একটা বক একটু পরপর ওড়াউড়ি করছে। দৃষ্টির ত্রি-সীমানায় আর কেউ নেই। নদীর ঠান্ডা পানিতে ডুব-সাঁতার খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ফাবিহা। আচ্ছা এই নদীর নাম কী? ইছামতী নাকি ময়ূরাক্ষী?

গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ফাবিহা দেখল একটা বক ছলাৎ করে ঠিক তার সামনেই পড়ে গেলো। বক স্বচ্ছন্দে নদীতে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু এই বকটা ভাসতে পারল না। মানুষের কণ্ঠে রোদন করতে করতে ডুবে গেলো। ঘুমের মাঝেই ফাবিহার ভুরু কুঁচকে এলো।

চলমান.

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন