#বনজোছনা
২.
ঘুমটা গাঢ় হয়ে এসেছিল। পূর্ণ এক মিনিট ডুব দিয়ে থাকা ফাবিহার আজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু কোনোদিনই সে ছত্রিশ সেকেন্ডের বেশি থাকতে পারেনি। অথচ আজ মনে হচ্ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে ডুবে আছে, ডুবেই আছে।
ঠিক কতক্ষণ পর সে সাঁতরে উঠল—বলতে পারবে না। নদীর যে গভীরতায় সে ডুবে ছিল—সেখানে কোত্থেকে একটা ট্রলার ছুটে আসছে। কি মুশকিল! ফাবিহা যেদিকে যায়, ট্রলারটাও সেদিকেই মোড় নেয়। অসহ্য বিরক্তিতে তার ঘুমটা পাতলা হয়ে এলো এবং তার পরপরই সে বুঝতে পারল ওটা আসলে ট্রলারের শব্দ নয়। দরজায় কেউ সর্বশক্তি দিয়ে কড়াঘাত করে চলেছে।
ফাবিহার মাথা ঘুরছিল। কোনওরকমে সে দরজা খুলল। ওপাশেই নূরজাহান আগুন চোখে তাকিয়ে আছেন।
“তোর আক্কেলটা খালি দেখি! ছেলেটাকে সিমির কাছে বসিয়ে নাক ডেকে ঘুমাতে গেছিস। লজ্জা লাগল না তোর? ছি ছি! ও তো ভাববে বিয়ের পরেও তুই এমন করবি।”
ফাবিহা বিছানায় ফিরে এলো। তার ব্রোকার এবং ওয়ার্নিকের এলাকা এখনও জেগে ওঠেনি। তাই সে কথাবার্তা শুনলেও উত্তরের জন্য কিছু খুঁজে পাচ্ছে না।
“অ্যাই ফাবিহা!”
“হুঁ!” নূরজাহান এগিয়ে আসতেই ফাবিহা তার কোমর জড়িয়ে ধরে আরেক দফা ঘুমের প্রস্তুতি নিলো। তার শাড়ি থেকে কচকো সাবানের গন্ধ আসছে।
“খবরদার আবার ঘুমাবি না!” বলেই স্বর নিচু করলেন নূরজাহান। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে বললেন, “সজীবের সাথে এমন ক্যাট ক্যাট করিস কেন তুই? তোর মনে কী চলছে আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না ফাবিহা! বিয়ে নিয়ে একদম মশকরা করবি না বলে দিলাম!”
ফাবিহা আরেকটু মুখ ডোবালো। ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলল, “কেমন করছি?”
“জানিস না মনে হচ্ছে! ছেলে মানুষ কিন্তু ক্যাট ক্যাট করা মেয়েদের পছন্দ করে না।”
“অপরিচিত একটা ছেলের সাথে ক্যাট ক্যাট না করলে কেমন করব? ডগ ডগ?” ফাবিহা সন্তুষ্ট হলো। তার সেরিব্রামের ওয়ার্নিকের এলাকা চমৎকার ভাবে কাজ করছে। অসাধারণ সব শব্দ খুঁজে পাচ্ছে সে।
ঠাস করে মেয়ের পিঠে একটা চড় বসালেন নূরজাহান। কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললেন, “সবেতেই তোর ফাজলামি! অপরিচিত হতে যাবে কোন দুঃখে? জন্মের থেকেই পরিচিত। এমন করিস না মা! তোর খালা শুনলে কী বলবে?” তার কণ্ঠ নরম হয়ে এলো।
ফাবিহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মানুষের চেহারায় লাচ্ছা পরোটার চাইতেও বেশি ভাঁজ থাকে। জন্ম থেকে ওই খোলসটা চিনে কোনও লাভ নেই।
নূরজাহান তাগাদা দিলেন, “যা ওঠ, সজীব বসে আছে। কোথায় নাকি ঘুরতে যাবি তোরা? সন্ধ্যার আগে আগে চলে আসিস।”
ফাবিহা চট করে তাকালো। সজীব এখনও বসে আছে মানে কী? মনে হচ্ছে আংটি ফেরত দেয়ার বিষয়টাও সে বেমালুম চেপে গেছে। অথচ পাঁচকান করার জন্যই ঘটনায় ঘটিয়েছে ফাবিহা। সোজা হয়ে বসে সে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু আসেনি এখনও?”
“এসেছে, খেয়ে কোচিংয়ে গেছে।”
ফাবিহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আপিল করার মানুষও নেই। কাজেই রায় কার্যকর করতে সে বাধ্য।
বাথরুমে যেতে যেতে সে বলল, “ঘরে যে-ই আসে তার কাছে আমাদের নামে একটা করে নালিশ ঠুকে দিবা না, আম্মু। জিনিসটা খুবই বিশ্রী দেখা যায়।”
নূরজাহানের মুখ অন্ধকার হয়ে এলো, “কার কাছে নালিশ করেছি আমি?”
“তোমার কথা বলার স্টাইলই ওইরকম। তাই বললেও বুঝতে পারো না। সেদিন বাইরে থেকে কে না কে আসলো, তুমি ঠাস করে বলে দিলা—ভাইয়া সারাদিন ঘরে উদাম গায়ে ঘুরে বেড়ায়। বেড়াক, চায় বোরখা পরে ঘুরুক—পছন্দ না হলে তুমি ভাইয়ার সাথে বলবা। বাইরের মানুষের সাথে কী? আজকে আবার সজীব ভাইকে বললা—আমি সারা বিকেল গড়াগড়ি করি। গড়াগড়ি করি চায় উল্টো হয়ে ঝুলে থাকি—এটা শুনে সে কী করবে?” ফাবিহার চেহারার ভাঁজে ভাঁজে বিরক্তি। পেছনে না ঘুরেই সে বাথরুমের দরজা লাগিয়ে দিলো।
বেরিয়ে মা-কে পেলো না সে। গোসল করে তার মেজাজ কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে। নূরজাহানের ঘরে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে টুপ করে গালে চুমু খেলো ফাবিহা। ঘাড়ে মাথা রেখে বলল, “সরি আম্মু, রাগ করেছ?”
নূরজাহান রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “আমার রাগারাগি দিয়ে কার কী?”
“তোমার রাগারাগিই তো সব!” বলে আরেকটা চুমু খেলো সে।
“আহ! কী শুরু করেছিস! যা তো!”
“শোনো আম্মু, আমার কোনো কাজ ভালো না লাগলে তুমি আমাকে এসে বলবা, দুই চারটা মারতেও পারো। কিন্তু বাইরের মানুষের সামনে এসব বলবা না। আচ্ছা?”
নূরজাহান এই পর্যায়ে ক্ষেপে গেলেন, “সজীবকে সবটা সময় বাইরের মানুষ বলিস কেন?”
ফাবিহা সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে গেলো।
নূরজাহান পেছন থেকে বললেন, “ শাড়ি পরে সুন্দর করে সেজে যা।”
ফাবিহা মায়ের কথা শুনল এবং খুঁজে খুঁজে তার রং চটে যাওয়া একটা জামা পরে ফেলল।
সিমি তাকে দেখে বলল, “ছোট আপা, আজকেও কি টাইট দিবেন?”
“দেখি।” ভাবুক কণ্ঠে বলল ফাবিহা।
সিমি চারপাশে তাকিয়ে কণ্ঠ নিচু করে ফিসফিস করল, “সজীব ভাইয়ের মোবাইলে কয়েকটা মেয়ের মেসেজ দেখছি আমি। পটানো কথাবার্তা বলে। হবু বউয়ের বাড়িতে বসে আরেক মেয়ের কাছে মেসেজ দেয়—তোমার হাসিটা অস্থির!”
মুখ ভেংচি দিয়ে বলল সিমি। এমন চটকদার তথ্য ফাবিহাকে চমৎকৃত করতে পারল বলে মনে হলো না। সে কেবল বলল, “হুঁ।” সিমির খুব মন খারাপ হলো। সে একদিন ছোট আপাকে অসম্ভব চমকে দিতে চায়।
বসার ঘরে যেতেই সজীব দু-কান ছড়িয়ে হাসল। বলল, “ঘুম কেমন হয়েছে?”
“চমৎকার!” ফাবিহার ঠোঁটেও হাসি। এ যাত্রায় সজীবকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখালো। সে ভেবেছিল তাকে বসে থাকতে দেখে এবং সবকিছু স্বাভাবিক দেখে ফাবিহা হয়তো চমকে যাবে। তেমন কিছুই হলো না। ফাবিহাই বরং স্বাভাবিকভাবে কথা বলে তাকে চমকে দিল। আধা ঘণ্টার মাঝে তারা রেস্টুরেন্টে চলে গেলো।
*****
সাকিনের ঘরে একটি মাত্র জানালা। ভেন্টিলেটরের এক হাত নিচের সে জানালাটাও দু ফুট বাই তিন ফুটের ছোট্ট একটা বাক্সের মতো। ঘরটা নাকি শুরুতে বিশেষ করে মহিলাদের জন্য বানানো হয়েছিল । বাইরে থেকে কেউ যেন ভেতর ঘরের মহিলাদের দেখতে না পায় সেজন্যই এই অবস্থা। খারাপ না, তবে এতে ঘরের চেহারাটা কিম্ভুতকিমাকার হয়ে গেছে। দৈর্ঘ্য প্রস্থে আরেকটু বাড়ালেই চলত। ঘরটাকে এখন নেহায়েত গুদাম বলে মনে হয়। সাকিন সেখানকার অকেজো দ্রব্য।
দুপুরে খেতে এসে বিছানায় একটু পিঠ লাগিয়েছিল সে। সাধারণত তার দুপুরের খাওয়াটা দোকানেই হয়। তবে আজ মামাতো ভাই আদিলের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আছে বলে খাবারটা দোকানে আসেনি। আর সাকিন খেতে এসে আটকে গেছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।
তার টেলিস্কোপের মতো জানালা দিয়ে একটা মরা গাছ দেখা যায়। সে গাছের ডালগুলো দেখতে ভয়ংকর। ভয়ংকর মরা গাছটাই দখল করে নিয়েছে আগাছার দল। মগডালে গাছের নিজস্ব কোনো পাতা নেই। ওর শেকড় থেকে শিখর পর্যন্ত পরাশ্রয়ীর বিস্তার। দূর থেকে দেখলে বোধ হয় ওরকম পান পাতার মতো পাতাগুলো যেন কারো হাত, আঁজলা ভরে জল নিয়ে ডাকছে মিষ্টি হেসে।
গাছটার ডালগুলো দৃষ্টিকটু ভাবে কালো হয়ে গেছে। সাকিনের ধারণা—মৃত বলেই ওটার রং ওরকম। আশেপাশে ওই রঙের কোনো গাছ নেই। খররৌদ্র মধ্যাহ্নে ওটার অবয়ব বড় চোখে লাগে। আজ, এই নিঃশব্দের ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে গাছটা ভিজে এক সা হয়েছে। জলগুলো ওর গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু শুষে নেয়ার শক্তি তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। বৃষ্টিবিন্দুর দান করা চকচকে রূপটাও তার সৌন্দর্য বর্ধন করতে পারছে না। তার গায়ে হেলান দিয়ে থাকা আগাছাগুলোই কেবল খিলখিলিয়ে হেসে মৃদু মৃদু পলক ফেলে যাচ্ছে।
সাকিন চোখ ফেরাল। তার হাতে আরণ্যক। এই আরণ্যকের ভেতরটা ভিন্ন। এখানে বন-জঙ্গল নেই, কেবল ঝোপ-ঝাড়। দিনের বেশিরভাগ সময় সে এই ঝোপ-ঝাড়ের সাথেই কাটায়। ওই ঝোপের আড়ালে তার জীবনগতি মসৃণ করার একটা পথ সে পেয়েছে। সে পথের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে আজ দেড় বছর ধরে। নামার জন্য ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও তার চেহারা দেখে সেসব বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই।
সেসময় দরজার ওপাশ থেকে পাপিয়া ডাকলেন।
সাকিন দরজা খুলল।
“পাপড়িকে একটু রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে আয় তো। বৃষ্টির জন্য রিকশা পাচ্ছে না।”
সাকিন উঠে গেলো। পাপড়ি ঘাড়ে ব্যাগ নিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে ছাতা মেলে দিলো। বাড়ি থেকে একটু দূরে আসতেই ঝুপ করে ছাতা বন্ধ করে দিলো পাপড়ি। হুড়মুড়িয়ে সাকিনের ছাতার নিচে ঢুকে পড়ল। সাকিন ঠান্ডা চোখে তাকালো।
পাপড়ি হেসে বলল, “আবহাওয়াটা সুন্দর না?”
বৃষ্টি বাড়ছে। এক পলক আকাশের দিকে দেখে নিজের ছাতাটা পাপড়ির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বড় বড় পায়ে এগিয়ে গেলো সাকিন। দূরে একটা রিকশা দেখা যাচ্ছে। রিকশাটা ঠিক করে দিলো সে।
পাপড়ি চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এলো। থমথমে কণ্ঠে বলল, “তুমি আমাকে বারবার অপমান করতেছ, সাকিন ভাই।”
“রিকশায় ওঠ। এসএসসি শেষ হলে অপমানের সংজ্ঞা জেনে নিস। ওঠ।”
পাপড়ি কটমট করে তাকিয়ে রইলো। উঠে বসে বলল, “ভাড়া দিয়ে দিবা না?”
“টাকা আনিনি আমি।” স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল সাকিন।
“আনো নাই নাকি টাকাই নাই? পকেটে টাকা না থাকলে এত ভাব আসে কই থেকে? সাকিন ভাই! আমাকে নিষেধ করলে কিন্তু কেস খাবা!”
পাপড়ির শাসানি উপেক্ষা করে সাকিন রিকশাওয়ালাকে বলল, “আগান মামা।”
রিকশা চলতে শুরু করলে সে ফিরতি পথ ধরল। এরই মাঝে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেকেন্ডের মাঝেই কাকভেজা হয়ে গেলো সাকিন। ছাতা খুলে আর লাভ নেই। বহুদিন পর বৃষ্টিকে অনুভব করতে করতে হাঁটতে শুরু করল সে।
ইদানীং পাপড়ি অনেক শক্ত কথা বলে। সেসব শুনে তার মেরুদণ্ডে ব্যথা হয়। কথার বিষ লিটমাস পেপারের মতো তার জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। অথচ উল্টো ঘুরে দুটো জবাব দেবে—সে যোগ্যতা তার নেই। সাকিন আকাশের দিকে তাকায়। বৃষ্টির তোপে চোখ মেলে রাখা দায়।
*****
রেস্টুরেন্টের নাম Freeze। কী ফ্রিজ হয় এখানে কে জানে। সজীব বোধহয় তাদের বিয়ে বিয়ে খেলাটা ফ্রিজ করার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে। তবু যাক, জায়গাটা খারাপ নয়। কৃত্রিম লেকের সাথে লাগোয়া কাঁচের দেয়াল। তাকালে লেকের ওপাশের সোনালু ফুলের দুলুনি চোখে পড়ছে । তার পাশে ছোট্ট একটা পত্রলেখার গাছ। ওর লাল পাতাগুলো যেন দিনের আলোয় রোড লাইটের কাজ করছে।
“ফাবিহা! ফ্রাইড রাইস অর্ডার দিচ্ছি। আর কিছু নেবে তুমি?”
ফাবিহা পত্রলেখার থেকে চোখ সরালো না, “আমি ফ্রাইড রাইস নেব না। শুধু চিকেন বল।”
“আরে শুধু চিকেন বল খেয়ে কোনো মজা আছে নাকি! রাইসের সাথে খাও। সাথে কোক আর কফি তাই তো! ওকে ডান!” ওয়েটারকে অর্ডার দিয়ে দিলো সজীব। আঙুল দিয়ে সে টেবিলে শব্দ করে যাচ্ছে। সাথে গুনগুন করছে—সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে…!
“এই যে ফাবিহা!” তুড়ি মারল সজীব। “এদিকে তাকাও দেখি। উডবি সামনে রেখে রাস্তায় এত কী?”
ফাবিহা ধীরে-সুস্থে তাকালো।
সজীব চমৎকার ভঙ্গিতে হাসল, “তুমি যে আংটি নিয়ে একটা ডিজাস্টার করেছ—এটা কিন্তু আমি চাইলেই চাচীকে বলতে পারতাম। তোমার অসম্মান হবে বলেই বলিনি।” গর্বের হাসি হাসল সজীব।
তার বড় চাচি ফাবিহার ছোট খালা। তিনিই তাদের বিয়ের ঘটক। মূলত সজীব বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর থেকেই তাকে মনে মনে ফাবিহার জন্য ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি।
ফাবিহা হবার পর মাসখানেক তাকে দুধ খাইয়েছিলেন তিনি। সেই দুধের ঋণ শোধ করতে ফাবিহাকে এক বছর আগে এই প্রস্তাবে রাজি হতে হলো—যখন সজীব পড়া শেষ করে উচ্চপদের বেসরকারি চাকরিতে যোগ দিলো।
সে সময় সজীবের প্রতি স্রেফ পরিচিত ছাড়া আলাদা কোনো অনুভূতি ছিল না ফাবিহার। মূলত সে জোর করে কোনো অনুভূতি তৈরির চেষ্টা করেনি। স্রোতের সাথেই নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে। তবে ইদানীং সে স্রোত অনুভূতির ছককে কেবলই নিম্নমুখী করে চলেছে। ঠিক আর কতদিন ফাবিহা সহ্য করতে পারবে—সে জানে না।
ওয়েটার খাবার দিয়ে গেলে ফাবিহা শুধু চিকেন বলটা খেলো। তাকে ফ্রাইড রাইসের প্ল্যাটারে হাত না দিতে দেখে অন্য দিনকার মতোই ওটা টেনে নিলো সজীব। খেতে খেতে বলল, “খাবার শেয়ার করলে নাকি ভালোবাসা বাড়ে? আগে আগে ভালোবাসা বাড়িয়ে রাখা উচিত, কী বলো? এখন ইনভেস্ট করলে পরে সুদে-আসলে ফেরত পাওয়া যাবে।”
আর কিছু না জমলেও সজীব খুব জমিয়ে খেলো। তবে বিল দেয়ার সময় এবার ভিন্ন পথ ধরল ফাবিহা। বেশিরভাগ সময় তার ভাগের বিল সে নিজেই মিটিয়ে এসেছে। আজ সে মেন্যুকার্ডের ভেতর শুধু চিকেন বলের বিল রাখল। সজীব দিলো তার ভাগের ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাই আর কোকের বিল।
ওয়েটার কার্ড নিয়ে বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, “স্যার বাকিটা…”
সজীব টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে বলল, “দেয়া হয়েছে। চেক করুন।”
“সরি স্যার..এখানে একটা ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাই, কফি আর কোকের প্রাইস নেই।”
সজীব ভুরু কুচকে ফাবিহার দিকে তাকালো।
ফাবিহা দুগাল ছড়িয়ে হেসে বলল, “আপনার বিলটা আপনার দেয়া উচিত না সজীব ভাই? বিল শেয়ারিংএ উডবিদের মাঝে ভালোবাসা বাড়ে নাকি জানা নেই।”
সজীব বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো। অন্যদিন সে খেলেও ফাবিহার নামে অর্ডার করা খাবারের বিল ফাবিহাই দিত। প্রথমদিকে সে জোর করে বিল দিয়ে চাইলেও ফাবিহা শক্ত কণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে আজকের এই অপদস্থতার মানে কী?
ওয়েটারকে বিদায় দিয়ে সজীব শীতল কণ্ঠে বলল, “এসবের মানে কী?”
“কোন সব?” ফাবিহার নিষ্পাপ কণ্ঠ।
“একদম নাটক করবে না!” টেবিলে চাপড় মার্ল সজীব। ফাবিহা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলো।
“প্রথমদিকে আমি বিল দিতে চাইতাম। তুমি সম্মানের রানী, পরপুরুষের টাকায় খেতে তোমার আতেঁ ঘা লাগে। বেশ, তোমার বিল তুমিই দাও। তবে আজকের নাটকটা কেন করলে?”
ফাবিহা সহসাই কোনো কথা বলল না। তার শীতল চাহনি সজীবকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল। দুজনার মাঝে কেবল সজীবের ফোঁস ফোঁস নিশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
অস্বস্তিকর নীরবতাকে ভঙ্গ করে, ফাবিহা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “অপরিচিত, অর্ধ পরিচিত এবং কনফিউজড পরিচিতদের থেকে আমি ট্রিট নিতে অভ্যস্ত নই। আমার বিল আমি বহন করতে পছন্দ করি। এ পর্যন্ত আপনার সাথে অসংখ্যবার রেস্টুরেন্টে এসেছি। ইচ এন্ড এভরি টাইম, আমি যেটা অর্ডার করতে চাই সেটার সাথে আরও এক ঝুড়ি খাবার অর্ডার দেন আপনি। সরি টু টেল ইউ, নিত্যদিন হাজার হাজার টাকা গচ্চা দেয়ার মতো সম্পদ আমার নেই। আমার ইনকাম খুবই সীমিত।”
সজীবের মুখটা লাল হয়ে আসছে। সে রাগ দমিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বলল, “চলো বের হই।” সে উঠে দাঁড়ালো।
ফাবিহা খুশি খুশি গলায় বলল, “এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ক্লিয়ার থাকা উচিত, তাই না সজীব ভাই?”
সজীব উত্তর না দিয়ে তাকে রিকশায় উঠিয়ে দিল কিন্তু সে উঠল না। ফাবিহার মনে হলো এর চেয়ে চমৎকার বিকেল আর দুটি হয় না।
বসন্তের হাওয়ায় উড়ে বাড়ি ফিরল ফাবিহা। কিন্তু বসার ঘরে ফরিদ আহমেদ এবং নূরজাহান বেগমের কথা কাটাকাটি দেখে থেমে গেলো। এগিয়ে যেয়ে বলল, “কী হয়েছে বাবা?”
ফরিদ আহমেদকে দেখে মনে হলো ডুবন্ত অবস্থায় একটা খড়কুটো পেয়েছেন। তিনি মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “বল দেখি মা! রিজভী ভাইয়ের থেকে ত্রিশ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। সে টাকার যে সুদ দিতে হবে এটা তো ঘুণাক্ষরেও উচ্চারণ করেনি। এখন ফেরত দিতে চাচ্ছি, ত্রিশ হাজার নেবে না। দুই বছরে সুদ মিলিয়ে নাকি আশি হাজার টাকা হয়েছে!” বলতে বলতে ফরিদ আহমেদের গলা কেঁপে উঠল।
“সুদ যে দিব না এটা তো আগেই বলেছিলাম আমি।” দিশেহারা শোনালো তার কণ্ঠস্বর।
ফাবিহা মায়ের দিকে তাকালো। নূরজাহান ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, “সুদী কারবার যে লোক করে, সে এমনি এমনি টাকা দেবে—এটা তোর আব্বু বিশ্বাস করল কীভাবে?”
ফাবিহা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার মনে হলো স্বপ্নে দেখা সেই নদীটা সে আবার দেখতে পাচ্ছে। সে নদীর পানি কুচকুচে কালো। ডুব দিয়ে আর উঠতে পারছে না ফাবিহা। ওই পানিতেই হাবুডুবু খাচ্ছে সে।
চলমান.
(Check this out 🌷
https://www.facebook.com/share/p/1EYSbCk1M2/)#বনজোছনা
১২. (শেষাংশ)
প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় চারপাশে অন্ধকার দেখছে ফাবিহা। এক ঘণ্টা আগে সিমিকে বলেছে একটু তেল দিয়ে দিতে। তা মহারানীর দেখা নেই। তিনি কোন কাজে এত ব্যস্ত হয়েছেন ফাবিহা জানে না। টিকতে না পেরে সে আরেকবার ডাক দিলো, “সিমি!” এবারের ডাকটা একটু জোরে হয়েছে। সিমির ধুপধাপ পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এ মেয়েটা নিঃশব্দে হাঁটতে পারে না। ঘড়ির দিকে তাকালো সো। সাড়ে দশটা বেজেছে। সেকেন্ড ক্লাসটাও মিস গেলো।
“জী, ছোট আপা?”
“তোকে কখন ডেকেছি আমি?”
সিমি জিভ কাটল। কুণ্ঠিত স্বরে বলল, “সরি ছোট আপা! খালাম্মার কাজ করছিলাম।”
ফাবিহা ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “একটু তেল গরম করে নিয়ে আয়।”
দুই মিনিটের মাঝেই হাজির হলো সিমি। ফাবিহা তার উরুতে মাথা রেখে বলল, “কী এমন কাজ করছে তোর খালাম্মা?”
“কাঁথা পাতলো।”
“নতুন আরেকটা?” ফাবিহার ভুরু কুচকে এলো।
“জী।” নরম হাতে ফাবিহার কপাল টিপে দিলো সিমি। আরামে চোখ বন্ধ করলেও মাথাটা টিকটিক করতে থাকল।
নূরজাহান গত তিনমাসে প্রায় উন্মাদের মতো সেলাই শুরু করেছেন। মেশিনে তো চলছেই, পাশাপাশি কাঁথার অর্ডারও নিচ্ছেন। কাঁথায় কষ্ট বেশি, সে তুলনায় এদিকে মজুরি কম। দুই হাজারের উপরে কেউ দিতে চায় না। অথচ একটা কাঁথা শেষ করতে ঘাড়, পিঠ ব্যথায় টনটন করতে শুরু করে।
তার এমন কাজে বাড়ির সকলেই বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। ফাবিহা তো সহ্য না করতে পেরে একদিন বলেই ফেলল, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছো আম্মু? এভাবে সেলাই শুরু করলা কেন?” তখন রাত বারোটা বত্রিশ। নূরজাহানের সেলাই মেশিন তখনও ঘুমায়নি।
নূরজাহান উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। ফরিদ আহমেদ নিজেও জিজ্ঞেস করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। তিনি নিজেও চিন্তায় থাকেন। কোচিংয়ের ছাত্র সংখ্যা হু হু করে কমছে। পঞ্চাশ জনের মাঝে প্রায় তিরিশ জনই চলে গেছে। তবু বেতনটা দিয়ে গেলেও একটা স্বান্তনা থাকত। ওদের সবারই প্রায় এক মাসের হাজারখানেক করে টাকা বাকি। অনেকের তো দু-তিন মাসেরও বাকি। তিনি শক্ত করে কোনোদিন টাকা চাইতে পারেন না। বড় লজ্জা লাগে। নিজে ছাত্রজীবনে আর্থিক কষ্টে ভুগেছেন। ওই পথে থেকে পড়াশোনা চালানো যে কী কঠিন সেটা তাকে ভেঙে বোঝাতে হয় না। তাই বাকির খাতার নামগুলো দেখলে তার উল্টো মায়া লাগত।
কিন্তু সে ছেলেগুলোই যখন তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে অন্য কোচিংয়ে পরিয়ে যায়—যেখানে মাসের শুরুতেই টাকা দেয়া নিয়ম—তখন বুক চেরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া ব্যতীত ফরিদ আহমেদের আর কিছু করার থাকে না। সে বাকির খাতার মাধ্যমেই তিনি হাফ খরচা হয়ে যাচ্ছেন। কাজেই কমজোর ফরিদ—স্ত্রীর মুখ থেকে একটা শব্দও উদ্ধার করতে পারেননি।
জীবন বাজি রেখে সেলাই করার বিপরীতে যে ঘটনা ঘটেছে তা খুবই স্পষ্ট। আজকাল নূরজাহান চোখে কম দেখছেন। কোমর আর ঘাড় ব্যথার কথা তো বাদই রইলো। হাবভাব দেখে ফাবিহার শক্ত সন্দেহ হয়েছিল তার ডায়বেটিস হয়েছে। কিন্তু তিনি চেকআপে যেতে নারাজ। দুনিয়া উল্টে গেলেও ডাক্তারের কাছে ধর্না দেবেন না। একবার হাসপাতালে গেলে নাকি কেউ আর সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারে না। বাহির থেকে কোনো রোগ চোখে না পড়লেও ফিনাইলের ওই গন্ধে ভেতরে ভেতরে মানসিক শক্তি ক্ষয়ে যায়। কাজেই তাকে কোনোভাবেই তার সিদ্ধান্ত থেকে টলানো গেলো না।
কিন্তু এই এত বছরে হঠাৎ করেই কেন তার শখটা পাগলামিতে রূপ নিলো—এই রহস্য কেউ উদ্ধার করতে পারল না।
“আপনার ফোন বাজে, ছোট আপা!”
ফাবিহার চটক ভাঙল। ফোন হাতে নিতেই স্ক্রিনে সজীবের নাম জ্বলজ্বল করে উঠল। না ধরার কোনো উপায় নেই। গতকাল ফোন ধরেনি বলে সোজা নূরজাহানের কাছে কল করে নালিশ দিয়েছে। যত্তসব পাগল-ছাগল!—বিড়বিড় করে খানিকটা ক্ষোভ মিটিয়ে কল রিসিভ করল ফাবিহা। ওপাশ থেকে সজীবের বকবকানি শুনে মুহূর্তেই নির্জীব হয়ে গেলো সে।
সজীবের বকবক শুনে তার মাথা ব্যাথা আরো বাড়ল। চোখ খিচে বন্ধ করে পড়ে রইলো সে।
সিমির খুব কষ্ট হয়। ছোট আপা যে সজীব ভাইকে মোটেই পছন্দ করে না এটা সে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে। তার সজীব ভাইকে খুব একটা খারাপ লাগে না। দেখতে সুন্দর আছে। কথাবার্তাও খারাপ না। মানুষ মাপার জন্য তার একটা বিশেষ ছাঁকনি আছে।
সে মূলত একজন কাজের মানুষ। যে কাজের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে—সে মানুষের ভালো পাল্লা বেশি বলেই বলে সিমির অভিজ্ঞতা। সজীব ভাইও তার সাথে ভালো ব্যবহার করে। তবে ছোট আপা যেহেতু পছন্দ করে না—তার মানে অবশ্যই কোনো একট গণ্ডগোল আছে। এমনি এমনি মানুষ অপছন্দ করা ছোট আপার স্বভাব না।
ফাবিহার মনটা ঘোরানোর উদ্দেশ্যে সিমি বলল, “ছোট আপা?”
“হুঁ।” চোখ বন্ধ করেই উত্তর নিলো ফাবিহা।
“জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ কী বলেন তো?”
“জানিনা সিমি। একেকজনের জীবনে একেকটা কাজ কঠিন। এই যে তুই তুড়ি মেরে রান্না করে ফেলতে পারিস —এটাই অনেকের জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ।”
সিমি একটু লজ্জা পেলো। ছোট আপা কারো প্রশংসাই সরাসরি করেন না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে করলেও সে বুঝে যায়। রান্নার লোক রান্না করবে—এতে আবার প্রশংসার কী আছে? কিন্তু ছোট আপা করে। যখন করে সিমির ইচ্ছে হয় আপাকে একটু জড়িয়ে ধরতে। তবে সেটা করা হয় না। সামাজিক শ্রেণীভেদের বেড়ি পেরিয়ে উরুতে রাখা ফাবিহার বুঝে মাথা রাখা যায় না।
“কিন্তু আমার কাছে কোন জিনিস কঠিন জানেন?”
“তোর কাছেও কঠিন কিছু আছে?”
“আছে। নামাজ পড়া।”
“কী বলিস!” ফাবিহা তাকালো। “কেন?”
“সূরা পড়া শুরু করলেই দুনিয়ার সঅঅব কথা মনে পড়ে, ছোট আপা। কোন তরকারিতে কবে লবণ কম দিয়েছি, হলুদ বেশি দিয়েছি, কবে মাথায় শ্যাম্পু দিয়ে ভুলে গিয়েছি। সঅঅব! তারপর দেখি কত রাকাত পড়ছি এটাই মনে নাই। মাঝে মাঝে সিজদাহ একটা কম দেই, মাঝে মাঝে আবার বেশি দেই। কী যে বিরক্ত লাগে, ছোট আপা! আমার নামাজ আমারই পছন্দ হয় না, আল্লাহর পছন্দ হবে কীভাবে!”
ফাবিহা হেসে আবার চোখ বন্ধ করল। সিমি তার মাথায় হাত দিলেই ঘুম জেঁকে ধরে। আরাম আরাম কণ্ঠে সে বলল, “সিমি, ধর আমি তোর সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলছিস। জীবন-মরণ সমস্যা। কিন্তু বলতে বলে পাঁচবার হাই তুললাম, চোখ চুলকালাম, মাথা চুলকলাম, ওড়না ধরে টানাটানি করলাম, কোন নখে কতটুকু ময়লা দেখলাম—তখন কি তোর মনে হবে আমার কথা গুরুত্বপূর্ণ?”
নাক-মুখ কুঁচকে সিমি বলল, “ছোট আপা, কথা বলার সময় যারা হাই তোলে তাদের আমি দুই চোখে দেখতে পারি না। পাগল-ছাগল! কোনো আদব কায়দা জানে না! একবার এক মিস্ত্রী আমাকে বলতে আসছে—চলো সিমি, বিয়ে করি! এই কথা বলতে যেয়ে তিনবার হাই তুলছে। জায়গায় ওই লোককে ডিলিট করে দিয়েছি ছোট আপা।”
“খুব ভালো করেছিস সিমি। কিন্তু দেখ, তুই আমি নামাজ পড়ার সময় ঠিক ওই কাজগুলোই করি।”
সিমির চঞ্চল হাত থেমে গেলো।
ফাবিহা বলে যাচ্ছে, “দোয়া করি আমাকে ভুল পথে চালিও না আল্লাহ, অভিশাপের পথে চালিও না—এই কথা বলতে যেয়ে তিনবার হাই তুলি। বলি যে আমি শুধু তোমার ইবাদত করি, আর তাকিয়ে থাকি জায়নামাজের নকশার দিকে। সিজদাহ আমরা ভুলব না আর কে ভুলবে বল?”
সিমি আস্তে আস্তে আবার কপাল টিপতে শুরু করল। ছোট আপা এই বিষয়টা কীভাবে জানল সে জানে না। কিন্তু একটা খাটি সত্যি কথা হলো—নামাজে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই তার একশ একবার হাই আসে। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার!
সে ক্ষীণ কন্ঠে বলল, “তাহলে কী করব?”
“মনের নড়াচড়া আটকানো কঠিন। তারচেয়ে একটা সহজ কাজ করতে পারিস।”
“কী কাজ?”
“শরীরের নড়াচড়া কমাবি। চুলকিয়ে মরে গেলেও হাত সরাবি না, দাঁতে দাঁত চেপে হাই বন্ধ করবি, যেদিকে তাকিয়ে নামাজে দাঁড়াবি শেষ পর্যন্ত ওইদিকেই তাকিয়ে থাকবি।”
“আচ্ছা।”
“তোকে এগুলো কেন বললাম, বল তো?”
“জানিনা ছোট আপা।”
ফাবিহা উঠে বসল। খোলা চুল হাত খোপা করে বলল, “কারণ আমিও একই রোগের রোগী। তোকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে আমি নিজেই যদি না মানি তখন তো নিজের কাছেই নিজের লজ্জা লাগবে। সেই লজ্জা থেকেও যদি একটু শোধরাই, তাই বললাম।”
সিমি নির্নিমেষে তার ছোট আপার ঘামে ভেজা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়—সত্যিই এটা তার ছোট আপা, তাদের একটা বড় আপাও আছে। একসাথে থাকে না বলেই বড় আপাকে খুব একটা দেখা যায় না।
তাদের আলোচনার মাঝেই আচমকা নূরজাহানের আর্তনাদ শোনা গেলো। বহুদিন পর। ফাবিহা লাফ দিয়ে উঠে ঘর ছাড়ল। নূরজাহান মেঝেয় ফ্যাকাশে চেহারায় বসে আছেন। পাশেই তার বাটন ফোন গড়াগড়ি খাচ্ছে। ফাবিহা তার কাছে বসে কাঁধে হাত রেখে বলল, “কী হয়েছে, আম্মু?”
“ফাবিহা!” ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে ডাকলেন নূরজাহান।
“হ্যাঁ, বলো!” ফাবিহা আরেকটু এগিয়ে গেলো।
“আমি যদি কোনো ভুল করি, তুই আমাকে মাফ করবি না?”
ফাবিহার কপাল কুচকে এলো, “হঠাৎ এই কথা কেন?”
কলেজে থাকাকালীন সময়ের ঘটনা। একবার এক ঘটক মহিলা কাঁঠালের আঠার মতো পিছু নিয়েছিল। মেয়েকে না জানিয়েই নূরজাহান পাত্র পক্ষকে আসতে বলে দিয়েছিলেন। ওরা আসার আগে আগে তিনি তাকে হুবহু এই কথাটাই বলেছিলেন। তবে এখন তো সে পথ বন্ধ। পরিবারের ভেতরে বাইরে সবার কাছেই সে সজীবের নামের সাথে জুড়ে গেছে। ফাবিহা ঘটনা বোঝার চেষ্টা করল।
নূরজাহানের ঠোঁট শুকিয়ে মরুভূমি হয়েছে। গলায় তিনি কোনো জোর পাচ্ছেন না। ফাবিহার হাত দুটো ডুবন্ত মানুষের মতো করে আঁকড়ে ধরে বললেন, “আমাকে মাফ করে দিস মা!”
“আশ্চর্য! হয়েছে কী বলবে তো!”
নূরজাহান শূন্য চোখে তাকালেন।
“বলো আম্মু!”
হঠাৎ তিনি সিমিকে ডাক দিলেন, “ভাত বসিয়ে দে সিমি। তোর খালু খেতে আসবে।” খুব সাধারণ ঘটনা। তবে নূরজাহানকে প্রচণ্ড অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। তিনি উঠতে গেলে খপ করে তাকে আটকে দিলো ফাবিহা। সে অসম্ভব বিরক্ত। কয়েক মাস আগেও তিনি এমন করেছিলেন। চোখমুখ শুকিয়ে অর্ধেক কথা বলে বসে থাকেন। সে প্রথম প্রথম খুব ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তার টালবাহানায় সেসব বিরক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আজ তাকে সব বলতেই হবে। শক্ত কণ্ঠে ফাবিহা বলল, “কী হয়েছে, তোমাকে বলতেই হবে আম্মু!”
নূরজাহান বড় করুন কণ্ঠে বললেন, “মা রে! আজকের দিনটা আমাকে রেহাই দে। এই দিন আমার জীবনে আর আসবে না।” বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন তিনি। ফাবিহা হতভম্ব হয়ে গেলো।
সে দিনটা খুব উৎসব উৎসব ভাব নিয়ে কাটল। ভালো-মন্দ রান্না করলেন নূরজাহান। বিকেলে সবাই মিলে গল্প হলো।।মায়ের আকুতিতে দুপুরের ঘটনা বাবার কান অবধি পৌঁছুতে পারল না ফাবিহা। সন্ধ্যার পর ফরিদ আহমেদ আবৃত্তি ধরলেন। বহুদিন পর খালি গলায় গান গাইলেন। আসর ভঙ্গ হলো নূরজাহানের চোখের জলে। ফরিদ আহমেদ তার দিকে তাকিয়ে আমুদে ভঙ্গিতে গাইছেন— আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো। আমার পড়বে মনে, কাছে দূরে যেখানেই থাকো…!
—
ফরিদ আহমেদ বেরিয়ে যাওয়ার পর ফাবিহা গোছগাছ করে নিলো। কিছুদিন বাইরে ঘোরাঘুরি পর ফারদিন আবার গুহাবাসী হয়েছে। তার হাব-ভাব কেউই বুঝতে পারছে না। যে যা বলে মুখে কুলুপ এঁটে শোনে, কিন্তু কাজের বেলায় যেই কে সেই। ফেইনলা সেমিস্টার ড্রপ দেয়ার পর থেকে বাবা তার সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। সজীব তাকে বলেছিল পড়াশোনা করতে না চাইলে কাজে ঢুকিয়ে দেবে। ফারদিন ঠান্ডা কণ্ঠে কেবল বলেছে, “বাপকে দিয়ে পারিসনি এখন বরকে দিয়ে আমাকে হাত করতে চাচ্ছিস?”
সে কথার পর আর ফারদিনকে ঘাটায়নি ফাবিহা। বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আসে। মনে হয়—যা ইচ্ছে করুক! যার যার জীবন! কিন্তু পরক্ষণেই মনটা হু হু করে ওঠে। তার একটা মাত্র ভাই, এভাবে চোখের সামনে নিজের জীবনটা ধ্বংস করে ফেলছে। সে কি চাইলেই চুপ থাকতে পারে!
সিমিকে ডেকে সে বেরিয়ে যেতে চাইলে সিমি শুকনো কণ্ঠে বলল, “আজকে না গেলে হয় না ছোট আপা?”
“কালকে একবার যাইনি। প্রতিদিন মিস দিলে আমাকে আর পরীক্ষায় বসতে দেবে না। তাছাড়া আজকে থাকবই বা কেন!” জুতো পরতে পরতে বলল সে।
“খালাম্মা কেমন যেন করছে।” সিমির কণ্ঠে ভীতির স্পষ্ট ছাপ।
ফাবিহার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো, “কী শুরু করছে আম্মু! কিছু বলবে না তাহলে মানুষ বুঝবে কীভাবে? পেটের ভেতর কথা রেখে দুই দিন পরপর ফিট খাওয়ার মানে কী?”
ফাবিহা চলেই যাচ্ছিল। সিমি তার হাত ধরে বলল, “যাবেন না ছোট আপা!” তার চোখ ছলছল করছে।
ফাবিহা কড়া কণ্ঠে বলল, “কী হয়েছে তুই জানিস তাই না?” সিমি মুখ নামালো।
“বলবি না?”
“খালাম্মা নিষেধ করছে।”
ওকে একটা বিকট ধমক থেকে বাঁচালেন ফাবিহার ছোট মামা। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে খোলা দরজা দিয়ে প্রায় দৌঁড়ে ঢুকলেন। ফাবিহা অবাক হয়ে বলল, “তুমি! এভাবে আসলা কেন? কী হয়েছে?”
লোকমান বেজায় ক্ষেপে গেলেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “দুনিয়া উথাল-পাথাল করে তোরা তো ফূর্তি করছিস! আহাম্মক! তোর মা কই? ডাক!” ধমকে উঠলেন তিনি। ফাবিহা আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছিল না। সিমিই উপযাচক হয়ে ছুটে গেলো। নূরজাহান প্রায় টলতে টলতে এলেন। ছোট ভাইকে দেখেই কেঁদে ফেললেন তিনি।
ফাবিহা অতিষ্ঠ হয়ে বলল, “কী হয়েছে কেউ বলবে আমাকে!”
“তুই জানিস না!” লোকমান অবাক হয়ে বললেন।
“না।”
“তোর মা যে বেঁচে আছে এই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় কর। দুলাভাই কই?”
“কলেজে। তুমি বলবা কী হয়েছে?”
ভদ্রলোক এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন। ভেবে বললেন, “যেতে যেতে বলছি চল।”
“কোথায় যাবো?”
“কলেজে।”
রাস্তায় নেমে কোলে পৌঁছানোর আগেই ফাবিহা যা শুনল তাতে তার মন হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। কোথাও আঁকড়ে ধরার মতো কিছু নেই। সে বলল, “এগুলো সব বাবাকে বলবা?” তার কথা আটকে আটকে আসছিল।
লোকমান নিশ্বাস ছাড়লেন, “আর উপায় কী?”
ফাবিহার প্রচণ্ড ভয় হলো—এসব শুনলে ফরিদ আহমেদ যদি স্ট্রোক করে বসেন!
কলেজে যেয়ে ফরিদ আহমেদের ঘনিষ্ঠ এক কলিগকে ধরলেন লোকমান। তাকে বিস্তারিত বলে অনুরোধ করলেন ঘটনাটা যতটা সহজভাবে ফরিদের কাছে বলা যায় ততটাই যেন তিনি বলেন।
কলিগ ভদ্রলোক বিচলিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, “লোকমান ভাই, আমারই প্রেশার বেড়ে গেছে। আর ফরিদ ভাই…” কথা শেষ করলেন না তিনি।
ফাবিহা লোকমানের সাথে বাড়িতে ফিরে এলো। লাঞ্চ বিরতিতে ফরিদ আহমেদ হাস্যোজ্বল মুখে বাড়ি ফিরলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই হাঁক ছেড়ে বললেন, “নূরজাহান! তোমার জন্য মেহমান নিয়ে এসেছি!”
ভদ্রলোক তাকে ডাইনিংয়ে যেতে দিলেন না। বসার ঘরে বসতেই ভেতর থেকে লোকমান বেরিয়ে এলেন। ফরিদ অবাক হয়ে বললেন, “কখন এসেছ তুমি!”
লোকমান উত্তর দিলেন না।
কলিক লোকটি বললেন, “ফরিদ ভাই, একটা কথা আছে।”
“বলে ফেলেন। কী রে মা! তুই ভার্সিটি যাস নি? মাথা ব্যাথা এখনও আছে নাকি!” লোকমানের পেছনে ফাবিহাকে দেখে বললেন ফরিদ। ফাবিহা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার প্রচণ্ড মাথা ঘুরছে।
“ভাই, রিজভীর থেকে আপনি যে ত্রিশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, সেটার কথা কি মনে আছে?”
“থাকবে না কেন! ওইটা তো শোধ হয়ে গেছে আরও ছয় মাস আগেই।”
কলিগ নিশ্বাস ছাড়লেন। তারপর আস্তে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
•
ঘটনার শুরু আব্দুর রহমানের মৃত্যুর মাধ্যমেই।
রিজভী হুমকি দিয়েছিল কলেজে যেয়ে হয় ফরিদ আহমেদের থেকে টাকা উদ্ধার করবে নয়তো তার একটা হেস্তনেস্ত করে আসবে। এ হুমকিতে ফরিদ আহমেদ মোটেও টললেন না। শেষ চাল হিসেবে রিজভী ফোন দিলো নূরজাহানের কাছে। তার ভয় না পাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এক সপ্তাহ আগেই এই ঋণ পরিশোধ নিয়ে রিজভীর সাথে এক লোকের কথা কাটাকাটি হয়। মুখ থেকে সে তর্ক হাত অবধি পৌঁছে যায় এবং রিজভীর লোকেরা তাকে মারতে মারতে আধমরা বানিয়ে ফেলে। সে লোক এখন বেঁচে আছে ক্র্যাচের উপর ভর করে। কাজেই নূরজাহান ভয় পেয়ে তার কাছে আরও কিছু সময় চাইলেন।
কিন্তু রিজভীর এক কথা। সে আর এক দিনও সময় দেবে না। যেকোনোভাবেই হোক, আজকেই তার টাকা লাগবে। শেষ কলটা সে দিলো কলেজে যেয়ে। দুনিয়াদারি ভুলে নূরজাহান ছুটলেন প্রতিবেশী নার্গিসের কাছে। হাত পেতে যখন সুদের পঞ্চাশ হাজার টাকা নিলেন—তখন তার চোখে-মুখে স্বামীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা।
রিজভীর টাকা শোধ হলো। ফরিদ জানলেন তার তিরিশ হাজারেই খাতা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু কেবল নূরজাহানই জানতেন—খাতাটা ওখানেই খোলা হয়েছে।
পঞ্চাশ হাজারের বোঝা মাথায় নিয়ে নূরজাহান স্থির থাকতে পারলেন না। তাকে তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। প্রতি মাসে কমপক্ষে দশ হাজার টাকা দিয়ে তিন মাসের মাঝে সম্পূর্ণ শোধ করতে হবে। নার্গিস চুপচাপ বসে রইলেন না। ফরিদ আহমেদ যে সময় বাড়িতে থাকেন সে সময় এসে ঘুরঘুর করতে শুরু করলেন। এক মাস সময়ের বিনিময়ে নূরজাহানকে এ কথা কিনতে হলো—নার্গিস তাদের বাড়ির কাউকে এ টাকার বিষয়ে কিছু জানাবেন না। মাঝখানে সিমি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জেনে গেলো।
ফলে নূরজাহানের হাতে রইলো দুই মাস। সুদের ঋণ বেড়ে যখন ষাট হাজার হয়েছে।
সেলাই করে মাত্র পাঁচ হাজার পরিশোধ করতে পারলেন তিনি। নার্গিসের তাগাদা বাড়তে থাকলো। দুই মাস পুরো হতে যখন আর মাত্র দুদিন বাকি তখন নার্গিস একটা উপায় বললেন। তাকে দু’লাখ টাকা ঋণ তুলে দিলে তিনি সময় কিছুটা বাড়িয়ে দেবেন। দিকভ্রান্ত নূরজাহান তাই করলেন। জানতেন না ওটাই তার কাল হবে।
মাসের মাথায় যখন আননোন নাম্বার থেকে টাকার তাগাদা দেয়া হলো—সেদিন তিনি জানালেন নার্গিস টাকাটা নিয়েছে বটে। কিন্তু ঋণ যেহেতু নূরজাহানের নামে তোলা হয়েছে কাজেই পরিশোধ তাকেই করতে হবে। তিনি নার্গিসের কাছে গেলেন। নার্গিস পত্রপাঠ তাকে এই বলে বিদায় করল যে—কোনো দুই লাখ টাকা তিনি নেননি। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে, খা খা রোদ্দুর মাথায় নিয়ে নূরজাহান আবিষ্কার করলেন নার্গিসকে দুই লাখ টাকা দেয়ার কথা একটা কাক-পক্ষীও জানে না।
বালুঘড়িতে সময় ফুরোতে লাগলো। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো সুদের টাকা। নার্গিসের কাছে ঋণ বাড়তে বাড়তে আশি হাজার হলো। ওদিকে দুই লাখ সুদ সমেত ছাড়াল তিন লাখের পাহাড়।
একমাস যাবার পরও যখন নূরজাহান এক কানাকড়িও দিতে পারলেন না তখন তিন লাখের সে সমিতি তাকে পুলিশের হুমকি দিলোম। বুকের ভেতর ঋণের এই বিষাক্ত পাহাড় নিয়ে তিনি গুমড়ে মরছিলেন। নিরুপায়, উদ্ভ্রান্ত নূরজাহান এই ঋণ শোধ করতে তিনটে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের কিস্তি নিলেন। এক ধাক্কায় তিন লাখ তো মিটলো কিন্তু বিপরীতে খুলে গেলো আর তিনটে ঝুড়ি। সে ঝুড়িতে কেবল টাকা ফেলতে হয়, কিন্তু কোনোদিন তা ভরে না। কেননা তার তলায় রয়েছে সুদ নামের বিশাল ছিদ্র।
সময়ের সাথে ঊর্ধ্বশ্বাসে পাল্লা দিয়ে সুদ বাড়ছিল। সাথে বাড়ছিল নূরজাহানের কিস্তির সংখ্যা। ছয় মাসের মাথায়তিন থেকে সে সংখ্যা আটে যেয়ে পৌঁছালো। নূরজাহান বুঝতে পারছিলেন তিনি চোরাবালিতে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ঋণের নামে যে খাতায় তিনি নাম লিখিয়েছেন তার থেকে নাম মোছানোর পূর্ব শর্তই হলো আরও দুটো খাতায় নাম লেখানো। না পারছিলেন এ বোকামির খবর কাউকে বলতে, না পারছিলেন সহ্য করতে। শেষমেশ এ বিশাল চোরাবালি যখন তাকে গলা অবধি ডুবিয়ে ছাড়ল তখন তিনি ফোন দিলেন ছোট ভাইকে।
•
ফরিদ আহমেদ যেন কথাগুলো বুঝতে পারলেন না। নির্বোধের মতো বললেন, “এখনও ঋণ আছে?”
“জী।” লোকমান মাথা নাড়লেন।
“কতগুলো কিস্তি?”
একটু থেমে লোকমান বললেন, “এগারোটা।”
“কত টাকা?”
“আট…আট লাখ সত্তর হাজার।”
ফরিদের মনে হলো তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
চলমান~