#বনজোছনা
৪৬.
দুপুরে খেতে এসে ফাবিহাকে খবরটা জানালো সাকিন। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “সামনের সপ্তাহে একটা ট্রেনিং আছে।”
ফাবিহা ছোট্ট একটা বাটিতে ডাল উঠিয়ে দিল। সাকিনের ডাল খাওয়ার ধরন খানিকটা অদ্ভুত। ভাতের সাথে খায় না। ভাত শেষ হলে ডালটুকু চুমুক দিয়ে খায়।
বাটি এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “কলেজেই?”
“না। সদরে।”
“কতদিন হবে?”
“চার মাস।”
“তাহলে তো কষ্ট হয়ে যাবে। প্রতিদিন যাওয়া-আসা.. অনেক সময়ের ব্যাপার!” নিজের প্লেট টেনে নিলো সে।
সাকিন এক মুহূর্ত থামল, “যাওয়া-আসা না তো। একেবারে যেতে হবে।”
ফাবিহার হাত থেমে গেলো, “বুঝলাম না।”
“চারমাস সদরেই থাকতে হবে।” শান্ত কণ্ঠে বলল সাকিন।
ফাবিহা আর একটা কথাও বলতে পারল না। একটা অব্যক্ত অভিমান তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সাকিন চার মাসের জন্য থাকবে না— এটা এমনভাবে বলছে যেন কোনো বিষয়ই নয়! তার মানে ফাবিহার থেকে দূরে থাকতে তার একটুও কষ্ট হবে না। তার পরিপক্ব, বাস্তববাদী মন মুহূর্তেই ছেলেমানুষী জেদে ভরপুর হয়ে গেল। সাকিন যদি এত নির্বিকার থাকতে পারে তবে সে-ও নিজের ভেতরটা দেখিয়ে খেলো হবে না। ভালো থেকে দেখিয়ে দেবে। অথচ নিজের ভেতরের ভাঙনটা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল সে। সেটাকে চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে গেল।
নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “ওহ! ভালো তো!”
সাকিন এক পলক তাকে দেখল।
বাকিটা দিন সাকিনের সাথে বলার মতো আর কিছু খুঁজে পেলো না ফাবিহা। সে যদি চুপচাপ থেকে এত ভালো থাকতে পারে তবে ফাবিহাও থাকবে। অথচ ভেতরে ভেতরে সে এই ভেবে কষ্ট পাচ্ছিল যে এই চারটা মাস সে কোথায় থাকবে, কীভাবে থাকবে সেটা একবারও বলার প্রয়োজন বোধ করল না সাকিন। তার অভিমান পাল্লা দিয়ে বাড়ল।
রাতে ঘুমানোর সময় সাকিন জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্রিয় রং কী?”
ফাবিহা অবহেলা ভরা কণ্ঠে বলল, “কোন প্রেক্ষিতে সেটার ওপর ডিপেন্ড করে।”
“তবুও, আছে না কিছু রং, দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়?”
ফাবিহা উদাস কণ্ঠে বলল, “আকাশী। একদম হালকা নীল। শরতের আকাশের রং।”
চোখ বন্ধ করল সে। বলল না ওই রংটা দেখলেই তার সাকিনের কথা মনে পড়ে। ঠিক তার মতোই স্নিগ্ধ। নাম যে মানুষের ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলে সেটা এতদিন শুনেছিল। আজ চাক্ষুষ দেখে নিলো। সাকিন অর্থ শান্ত, স্থির। আদতেই তাই। এতটাই স্থির যে তার স্থিরতাই ফাবিহাকে অস্থির করে তোলে।
ঘুম থেকে উঠে সে আস্তে-ধীরে নামাজ পড়ল। তারপর কুরআন নিয়ে বসল এই নিয়তে যে টানা এক ঘণ্টা পড়বে। এর মাঝে সাকিন এসে দেখল ফাবিহা তখনও তৈরি হয়নি। তার তিলাওয়াত শেষ করার জন্য অপেক্ষা করল সাকিন।
ঠিক ঠিক এক ঘণ্টাই পড়ল ফাবিহা। শেষ করে উঠে ওড়না গোছাতে গোছাতে বলল, “আজকে হাঁটতে যাবো না।”
সাকিন কেবল একবার তাকালো, “ওহ! আচ্ছা।” বলে সে নিজেই উঠে চলে গেল। ফাবিহার শান্ত মেজাজটা মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। কেন যাবে না— এটা একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করল না? যেই নীরবতাই ফাবিহার সবচেয়ে পছন্দের ছিল, সেটাই আজ তার কাছে সবচেয়ে অসহ্যকর হয়ে দাঁড়ালো।
রাগটা দমাতে নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত করার প্রয়োজন ছিল। আর তখনই মনে পড়ল এতগুলো দিন ডায়েরি বানানোর কাজে খুব হেলাফেলা করেছে সে। দিনে একবার মেসেজ চেক করেছে। বলা বাহুল্য ওই একবারের দেখায় শুধু দামটুকুই জানানো হয়, অর্ডার কনফার্ম আর করা হয় না। ফলে এই লেট রেসপন্সের কারণে বেশ কিছু কাস্টমার ছুটে গেছে। যেটা আগের ফাবিহা কস্মিনকালেও ভাবতে পারত না।
আজ অনেকখানি সময় নিয়ে সে সব মেসেজের রিপ্লাই দিলো। বহুদিন পর নতুন ডায়েরির ছবি পোস্ট করল। তারপর সরঞ্জাম নিয়ে বসল। ঘন মন খারাপের ডুবে থাকা মন নিয়ে একটা লেদারের ডায়েরি বানাতে শুরু করল সে।
যাবার আগের দিন সকালে সাকিন ফাবিহাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কি কিছু হয়েছে?”
ফাবিহার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলে, “এতদিনে এই কথাটা মনে হলো?” কিন্তু সে নিজেকে চমৎকারভাবে সামলে নিলো। অবাক কণ্ঠে বলল, “কই না!”
“ওহ! আর নোট-টোট দিচ্ছ না, তাই বললাম আর কি!”
ফাবিহা আগুন চোখে তাকালো। নিষ্পাপ মুখ দেখে কেউ বলতে পারবে এই ভদ্রলোক যে কেমন খোঁচা দিতে পারে?
সে-ও উল্টো বলল, “দিলেও আপনি আর দেখতে পাবেন না!”
“আচ্ছা আচ্ছা!” যেন সবকিছু বুঝে ফেলেছে। ফাবিহা মনে মনে ভেংচি দিল। তার ইচ্ছে হলো সাকিনের টুটি চেপে ধরতে। কেন হলো সেটাও বুঝতে পারল না সে।
সাকিন গুরুতর ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা শোনো। আমি কালকে সকালে যাওয়ার সময় তোমাকে ওই বাড়িতে রেখে যাবো। এখানে একা থাকার দরকার নেই।”
ফাবিহা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “রেখে আসতে হবে কেন? আমি নিজেই যেতে পারি। প্রতিদিনই যাই। কাজ গুছিয়ে একাই চলে যাব। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।”
এই এতগুলো কথার বিপরীতে সাকিন কেবল বলল, “আচ্ছা।” তাতে ফাবিহার উত্তপ্ত মেজাজের পারদ আরও এক ডিগ্রি বাড়ল। সামনে থাকলে কিছু না করলেও অন্তত বলে ফেলতে পারে এই ভয়ে দ্রুত প্রস্থান নিলো সে। রাগে অন্ধ হয়ে যেতে যেতেও নিজেকে সামলে নিলো। এখন অন্ধ হলে সমস্যা। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ডায়েরি বানাচ্ছে। নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ সেদিকে ঘুরিয়ে দিলো।
রাত হলে তার রাগগুলো হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল সূর্যের আলোর সাথে। সে জায়গায় ঠায় নিলো জমাট বাঁধা কুয়াশার মতো এক খণ্ড বিষাদ। লোকটা কাল সকালেই চলে যাবে। যদিও বলেছে মাঝে মাঝে আসার চেষ্টা করবে। কিন্তু ছুটির তো কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ফের কবে দীঘির মতো শান্ত ওই চোখদুটো দেখতে পারবে কে জানে? ভাবতেই ফাবিহার বুকের ভেতর হু হু করে উঠল। চেয়েও চোখ জোড়া শুকনো রাখতে পারল না সে। ঝাপসা চোখেই সাকিনের ট্রলি গুছিয়ে দিলো। সে জানে এই লোকটার কী লাগবে। তার জরুরীভাবে প্রয়োজন এক ব্যাগ কথা। তিনি তো জানেন না, কথার অভাবে এদিকে একটা মানুষ পুড়ে মরছে।
সে রাতে সাকিনের ফিরতে অন্যান্য দিনের চেয়েও বেশি দেরি হলো। ফিরে এসে মুখ বন্ধ ব্যাগের পাশে মুখ বন্ধ ফাবিহাকে দেখে কিছুই বলতে পারল না সে। ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথেই রাত পেরিয়ে গেল।
ফজরের নামাজে যাওয়ার সময় সাকিন বলল, “আজও যাবে না?”
ফাবিহা বহু কষ্ট কান্না আটকালো। রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “যাবো।”
সাকিন ফিরে এসে দেখল ফাবিহার চোখ-মুখ ফোলা। আজীবনই সে স্বান্তনা জানানোর বিষয়ে আনাড়ি। আজ ফাবিহার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো— সে কেবল আনাড়ি নয়, একেবারে গণ্ডমূর্খ! পুরোটা পথ হাঁটতে হাঁটতে ফাবিহা নাক টেনে গেল। সাকিন একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না!
ফাবিহার বুকের নদীতে আরও ভাঙন ধরল। একটা কথা কি বলা যায় না? সে যে কাঁদছে এ তো কানার ভাই অন্ধও বুঝতে পারবে। অথচ তার পাশে হাঁটতে থাকা সুস্থ-সবল মানুষটা বুঝতে পারছে না। কিছু না বলুক, অন্তত হাতটা তো ধরতে পারে? নাকি হাতে ফোস্কা পড়েছে? বিয়ের রাতে একবার হাত ধরেই সব শখ মিটে গেছে?
আসন্ন বিরহ, জমাট বাঁধা দুঃখ আর অব্যক্ত অভিমান মিলেমিশে ফাবিহাকে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল!
পরের দুটো ঘণ্টা কাটল একেবারে মূক হয়ে। বের হবার সময় সাকিন কেবল আলতো করে একবার জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, “আসি, কেমন?”
ফাবিহা আর পারল না। এই লোক যখন তার মন বুঝছে না সেই আশায় থেকে থেকে এই ক্ষণটুকু হারিয়ে ফেলার মতো বোকামি সে করবে না। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সাকিন পড়ল অথৈ সাগরে। বিব্রত কণ্ঠে বলল, “আরে! এত কাঁদছ কেন?”
ফাবিহা তাকে ছেড়ে দিল। নাক টেনে বলল, “শখ করে।”
টেবিল থেকে লেদারের ডায়েরিটা এগিয়ে দিল। বলল, “আপনি যখন কুন্দকলি থেকে চলে আসবেন শুনছিলাম, তখন একটা দিতে চেয়েছিলাম।”
ডায়েরিটা নিলো সাকিন, “দিলে না কেন?”
“কখন চলে গেছেন, জানতেই পারলাম না!”
“সেটা দিলে কেমন হতো! অন্য কাউকে বিয়ে করলে দেখত না!”
ফাবিহা টলমল চোখ রাঙিয়ে তাকালো। বড় সুন্দর দেখালো সে দৃশ্য।
সাকিনের সাথে যাবে না বললেও তার সাথেই বের হলো ফাবিহা। তার মনে হচ্ছিল এই একলা বাড়িতে আর এক মুহূর্ত থাকলেও তার দম বন্ধ হয়ে যাবে।
নূরজাহান, সিমি, মনিরা, ফুপা সকলের থেকেই বিদায় নিলো সাকিন। ফারদিনের সাথে দেখা হলো না। সে কেমন যেন একটু দূরে দূরে থাকে।
যতক্ষণ সাকিনকে যেতে দেখা গেল, ফাবিহা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। ঝাপসা হতে হতে তার অবয়বটা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলে সে যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকল, মনে হলো তার খুঁটি আদলে অন্য জায়গায় গেড়ে এসেছে। মোটেই মন টিকছে না। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে রইলো সে।
খানিক বাদেই সিমি ছুটতে ছুটতে এলো। ফাবিহার হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিতেই সে বলল, “কী এটা?”
“সাকিন ভাই দিয়ে গেল!” হাঁফাতে হাঁফাতে বলল সিমি।
ফাবিহা ভুরু কুচকে তাকালো, “কখন?”
“এই মাত্র! আবার ফেরত আসছিল তো!”
ফাবিহা অবাক হয়ে গেল। কী পাগল লোক! এতখানি পথ যেয়ে আবার ফিরে এসেছিল?
“এখনও আছে?” ফাবিহা উঠে দাঁড়ালো।
“না, চলে গেছে।”
ফাবিহার উত্তেজনা থিতিয়ে এলো। কিন্তু সিমি অস্থির, “খুলে দেখেন না ছোট আপা! কী আছে ওখানে?”
শপিং ব্যাগের ভেতর আরেকটা মুখ বন্ধ সাদা ব্যাগ। সেটা খুলতেই বেরিয়ে এলো শরতের মেঘমুক্ত আকাশে স্বচ্ছ নীল রঙের একটা শাড়ি, একই রঙের দু-মুঠো কাচের চুড়ি। আর ছোট্ট একটা পাঞ্চ ক্লিপ। এটা দেখেই মনে পড়ল, তার ক্লিপটা গত পরশুই ভেঙে গেছে। মনাকাশে যেই মেঘগুলো অভিমান বুকে চেপে ঘুরছিল, তারা সহসাই উধাও হয়ে গেল।
শাড়ি খুলতেই বেরিয়ে এলো দুটো চিরকুট।
“আমার ব্যক্তিগত অমল নীল,
তোমার আকাশটা কেন মেঘলা, বুঝতে পারলাম না। যাওয়ার সময় এমন মুখটা দেখতে ভালো লাগছে না। আমার কোনো কাজে কষ্ট পেয়ে থাকলে— ক্ষমাপ্রার্থী।”
ফাবিহার দু’চোখে ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামতে চাইছিল। সেভাবেই সে দ্বিতীয় চিরকুটটা খুলল।
“এক বিহঙ্গমের চঞ্চু তার বিহঙ্গমীর ললাটে।”
সিমি সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “কী লেখা দেখি!” সে গলা বাড়াতেই ফাবিহা প্রায় লাফ দিয়ে উঠল। থতমত খেয়ে বলল, “কেন?”
“আপনি কান্নাকাটিও করছেন, লজ্জাও পাচ্ছেন, মিটমিট করে আবার হাসছেন! সাকিন ভাই আসলে কী লিখছে যে একসাথে সবই করা যায় সেটাই দেখতে চাচ্ছি।”
ফাবিহা কড়া কণ্ঠে বলল, “এতকিছু দেখা লাগবে না!”
জিনিসগুলো গোছাতে গেলে চোখে পড়ল সাকিনের পুরোনো ছোট্ট ডায়েরিটা। এটাতেই সে সবসময় লেখে। ফাবিহা দেখল কিছু কাগজ এখনও ফাঁকা। রেখে গেল কেন?
পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে একদম শেষ পাতায় দুটো লাইন চোখে পড়ল।
“A certain blue entered into my soul
and everything burned in that blue.
লাইন দুটো যদিও Henri Matisse এবং Pablo Neruda-র থেকে ধার করা, তবে অনুভূতিটা একেবারেই আমার নিজস্ব।”
হেসে ফেলল ফাবিহা। তার দেয়া নতুন ডায়েরিটা নিয়ে গেছে। বদৌলতে জমা দিয়ে গেছে পুরোনোটাকে। আদতে পুরো সাকিনকেই। ফাবিহা খুব করে চাইলো বোবা ওই লোকটার ওপর অসম্ভব রাগ পুষে রাখতে। যে কথা বলে না তার ওপরে রাগ করাই উচিত। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলে সে মোটেই রাগ করতে পারছে না। উল্টো বুকটা কেমন হাহাকার করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি তাকে একবার না দেখলেই নয়।
তক্ষুণি কেবল সাকিনকে আনহাইড করে একটা নোট দিলো সে,
“তাকে খুব কাছে চাই যে
কাছে এই তো ছিলে, এই বুঝি আর নেই!
তাকে দেয় পাহারা এক বেয়াড়া মন…”
দিনগুলোকে মনে হচ্ছিল গ্রীষ্মের দিন, শীতের রাত, বৈশাখের খা খা দুপুর অথবা আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণ। এত দীর্ঘ! এত প্রলম্বিত!
এই সময়ে খুব কাজ করল ফাবিহা। গ্রামের পথে-প্রান্তরে পাওয়া নাম না জানা হরেক রকম ফুল দিয়ে এবার ডায়েরি বানালো। কাস্টমার কমে গেলেও শূন্য হয়নি। কাজেই কিছু ইনকাম হলো।
স্যারের বউ হওয়ার সুবাদে তার কিছু পরিচিতি হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে স্কুলের মেয়েদের পড়ানোর প্রস্তাব এলো। নূরজাহান বললেন, “ফাঁকা বসে থেকে কী করবি? পড়া। সময়টাও কাটল, কিছু টাকাও এলো।”
সাকিনের সাথে পরামর্শ করে রোজ বিকেলে পড়ানো শুরু করল সে। তার সাথে খুব একটা কথা হয় না। বেচারা সারাদিন ট্রেনিং করে রাতে কাহিল হয়ে যায়। ফাবিহা নিজেই সময় বাড়ায় না। ছুটির দিনে যে একটু ভিডিও কলে কথা বলবে সেটাও হয়ে ওঠে না। এখানে নেটওয়ার্কের একেবারে যা তা অবস্থা। ফাবিহার মাথায় হঠাৎ ভূত চাপল— সে সাকিনকে চিঠি লিখবে। ঠিকানাও জেনে নিলো। পুরো পাঁচ পৃষ্ঠার একটা চিঠি লিখে ফেলল সে। শেষ করল একটা প্রশ্ন দিয়ে,
“আপনার ডায়েরিতে কিছু কবিতা লেখা দেখলাম। এর মাঝে আপনার সবচেয়ে পছন্দের কবিতা কোনটা?”
খুব দ্রুতই সেটা পোস্ট করে দিল ফাবিহা। রোজ ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করত সেটা পৌঁছেছে কি না। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে কেবল দীর্ঘই হচ্ছিল। ঠিক ঠিক সাত দিনের মাথায় চিঠিটা পৌঁছালে ফাবিহা অনুভব করল তার জীবনে প্রথম চিঠি দেয়া মানুষটাই তার স্থায়ী প্রাপকে পরিণত হয়েছে।
সাকিন নিজেও ফিরতি চিঠি পোস্ট করল। ফাবিহার অসংখ্য অনুরোধ সত্ত্বেও সে চিঠির ছবি তুলে তাকে দেখালো না। কিন্তু সপ্তাহ গড়িয়ে গেলেও চিঠি যখন পৌঁছাল না, ফাবিহা ভাবল সেটা বোধহয় হারিয়েই গেছে।
দশ দিনের মাথায় তার ভুল ভাঙিয়ে পত্র তার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। একলা দুপুরে, খুব গোপনে খাম খুলে ফাবিহা আশা করেছিল এক তাড়া কাগজের। কিন্তু সে আশা ভঙ্গ করে স্রেফ এক টুকরো কাগজ বেরুল। সেখানে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা,
“ফাবিহা ফরিদ”
ফাবিহা ভেবেছিল— অনেক কথা, খুব আলাপ, একগুচ্ছ বাক্য না হলে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় না। অথচ ওই চারটে মাসে সাকিন আরও চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু ফাবিহার মনের খাতায় জায়গা করে নিয়েছে ওই দুটো অক্ষরের সবচেয়ে ছোট চিঠিটা।
—
চারমাসে মোটে দু’বার বাড়ি আসার সুযোগ পেয়েছিল সাকিন। তবু সে দু’দিনের জন্য। বৃহস্পতিবার বিকেলে এসে শনিবার বিকেলে আবার দৌড় দিতে হয়েছে। তারপর ফাবিহাই বলেছে,
“এত কষ্ট করে আসতে হবে না।”
“ঠিক তো?” সাকিন উল্টো প্রশ্ন করেছিল।
শুকনো মুখে ফাবিহা বলেছিল, “এমন নাকে-মুখে আসার কী দরকার?”
“কে যেন সাইলেন্ট মোডে চলে যায়!”
“কে সাইলেন্ট মোডে যাবে? দুনিয়ার সবাই নরমাল। একমাত্র আপনিই সাইলেন্ট। সাইলেন্ট সাকিন!”
তারপর থেকে সিমি কেবল খোঁচাতো— “আমার সাইলেন্ট দুলাভাই কেমন আছে? মাঝে মাঝে ভাইব্রেট করে তো? নাহলে কিন্তু খুব সমস্যা ছোট আপা!”
সেই দীর্ঘ চার মাসের আজ সমাপ্তির দিন। ফাবিহা ভাবল এবার তাকে সারপ্রাইজ দেয়া যাক! ফারদিন কাপড় আনার কাজে প্রতি সপ্তাহেই সদরে যেত। সাকিনের ট্রেনিং শেষের দিন সে ফারদিনের সাথে শহরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ল।
বাসে আসতে আসতে কথা হয়েছে, আর ঘণ্টাখানেকের ভেতর সে বেরিয়ে আসবে। সেভাবেই ট্রেনিং সেন্টারের সামনে দাঁড়ালো ফাবিহা।
প্রথমে ভেবেছিল খুব বুদ্ধিমতীর মতো কাজ করেছে। গোটাকতক টিউলিপ বুকে জড়িয়ে একটা বিশাল বটগাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সাকিন বের হলেই চমকে দেবে। কিন্তু পরক্ষণে নিজেই চমকে গেল। এত মানুষ! ভিড়ে তার হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ফারদিন বাস থেকে নেমে অন্যদিকে চলে গেছে। একা একা আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সে অধৈর্য হয়ে গেল। সাকিনকে ফোনও দিতে পারল না। কোলাহল শুনলেই প্রশ্ন করবে। সারপ্রাইজ মাটি হতে দেয়া যাবে না।
জীবনে প্রথমবার নিকাব পরেছে ফাবিহা। গোল জামা ছেড়ে সাধারণ একটা বোরখা পড়েছে। অস্বস্তি না লাগলেও একটু অন্যরকম লাগছে। বারবার নিকাবে হাত চলে যাচ্ছে। একবার কথায় কথায় বুঝেছিল সাকিন এই বিষয়টা পছন্দ করে। পরে সে নিজেও ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। মুখ খোলা, ঢাকা দুই ধরনের মত থাকলেও এটাকেই তার যুক্তিযুক্ত লেগেছে।
আরও বিশ মিনিট পর সাকিনকে আসতে দেখা গেল। ফাবিহার বুক ধুকপুক করে উঠল। সাকিন কাছাকাছি আসতেই একদম তার সামনে যেয়ে দাঁড়াল সে। সাকিন ডানে সরে যেতে চাইলে সে-ও সেদিকে গেল। সাকিন সরাসরি চেহারার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুচকে বামে গেল। সাথে সাথে ফাবিহাও গেল।
সাকিন গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কী সমস্যা?”
ফাবিহা ফুলগুলো এগিয়ে দিয়ে প্রাঞ্জল স্বরে বলল, “কোনো সমস্যা নেই তো স্যার!”
সাকিন চমকে চোখের দিকে তাকালো, “ফাবিহা!” এক হাতে ফুলগুলো নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে তার হাত ধরল। “চিনতেই পারিনি!” তার কণ্ঠে বিস্ময়।
“কেমন লাগছে?” কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে।
“সুন্দর। কেমন আছো?”
ফাবিহা হাতের বাঁধন শক্ত করল, “খুব খুব ভালো!”
সাবিহার আবদার ছিল ফার যাওয়ার আগে তার ওখানে ঘুরে যেতে হবে। সেদিকে যেতেই ফাবিহা বলল তাদের পুরোনো সেই বাড়িটা একবার ঘুরে যাওয়ার তার ভীষণ ইচ্ছে। সেদিন বিকেলেই সাকিন তাকে নিয়ে বের হলো। রিকশা নেয়ার বদলে হেঁটেই সময়টা কাটালো।
ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ল ফাবিহা। সামনেই একটা জটলা দেখা যাচ্ছে। কৌতূহলবশত দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে এখানে?”
মহিলা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বললেন, “এই মহিলার ছেলে পালিয়ে গেছে। যে মেয়ের সাথে পালিয়েছে সেই মেয়ে নাকি মা-র চার ভরি গয়না, বিশ হাজার টাকা ক্যাশ নিয়ে পগার পার! ওই মেয়ের বাড়ির লোকজন এসেই মহিলাকে ধরেছে। ওরা বলছে মহিলা ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছে। টাকা-পয়সা পেয়ে আর মুখ খুলছে না!”
দশ বারোজন পুরুষের মাঝখানে যেই মহিলা অসহায়ের মতো কাঁদছে তাকে খুব ভালো করেই চেনে ফাবিহা। তার স্বামী নাকি গত বছর মারা গেছে। ফলে আগে-পরে আর কেউ নেই। দেখতে দেখতে তিনি রাস্তায় বসে পড়লেন। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ছেলে কোথায় গেছে আমি জানি না! আমাকে কিচ্ছু বলে যায়নি! আল্লাহর দোহাই আমাকে ছেড়ে দিন!”
এই মহিলাই একদিন ভরা বাড়িতে ফাবিহাকে বলেছিল, “একশ ঘাটের পানি খেয়ে সাধু সাজবি তো রাস্তায় নামিয়ে ইজ্জত দেখিয়ে ছাড়ব!”
আহ ইজ্জত!
মানুষ ক্রমেই বাড়ছে। ফাবিহা সাকিনের হাত ধরে এগিয়ে গেল। ফেরার আগে যিয়ারত করে এলো ফরিদ আহমেদের কবর। গোরস্থানের আশপাশে বেশ কিছু বিড়াল ঘুরঘুর করছিল। তাদের দেখে হুট করেই টিকটিকির কথা মনে পড়ল। এর মাঝে কি ও আছে? দু’বছরের পরিবর্তিত রূপ আন্দাজ করতে পারল না সে। ওর কথা মনে হলেই কেবল চোখে ভাসে ঠায় বসে থাকা একটা মূর্তি।
গ্রামে ফিরে সাকিন একেবারে আচমকা একটা প্রস্তাব দিলো। সে নাকি সিমির জন্য ছেলে দেখেছে।
ফাবিহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
“আমাদের কলেজের ইচ্ছা-দপ্তরী। ইচ্ছে হলে দপ্তরীর কাজ করে। সোহেলের মূলত ছোট একটা মুদি দোকান আছে। ওর বাবার দোকান ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর ও বসছে। মা-ও নেই। ছোট একটা বোন, ক্লাস থ্রি-তে পড়ে।”
“বয়স কত?”
“সতের আঠার হবে বোধহয়।”
প্রস্তাব নূরজাহানের খুব পছন্দ হলো। কিন্তু সিমি বেঁকে বসল। খালাম্মাকে একা রেখে সে কীভাবে যাবে?
কিন্তু যখন জানা গেল ছেলের পৈতৃক ভিটা বলে কিছু নেই, এক দূরাত্মীয়ের বাড়িতে কোনোরকমে খেয়ে-পড়ে থাকে— তখনই সাকিন করণীয় ঠিক করে ফেলল। নূরজাহানের সবচেয়ে কাছের বাড়িতে এক বৃদ্ধ দম্পতি থাকে। তাদের সাথে কথা বলে দুটো ঘর ভাড়া নিলো সাকিন। এই সমাধানে সিমিরও আর কিছু বলার রইলো না।
সিমি কোনোদিন ভাবেইনি বিয়ে তার কপালেও ছিল। কিন্তু দেখা গেল সবচেয়ে ধুমধাম করে তার বিয়েই হচ্ছে। মনে হচ্ছিল গ্রামে বিশাল চড়ুইভাতির আয়োজন হয়েছে। সাকিন মন ভরে খরচ করল। নূরজাহানও পিছিয়ে রইলেন না। ছোট্ট একটা আংটি গড়িয়ে দিলেন সিমিকে। ফাবিহা দিল একটা চেইন। সিমির গায়ে চড়ল সাবিহার কেনা টকটকে লাল লেহেঙ্গা। রফিকের জোরাজুরিতে তার ছোট্ট বরটি মাথায় টোপর পরতে বাধ্য হলো। সিমির মনে হলো এসব রূপকথার গল্প। সেই ছেলেবেলায় ফেলে আসা এক বাক্স ভর্তি পুতুলের গল্প।
তারপর থেকে সিমির রুটিন হলো এরকম— সকালে সোহেল বেরিয়ে গেলে ছোট্ট ননদকে স্কুলে পাঠিয়ে সে নূরজাহানের কাছে চলে আসে। সারাদিন ওখানেই থাকে এ রাতে সোহেল বাড়ি ফেরার সময় তাকে নিয়ে যায়। কখনও বা নূরজাহানই যেয়ে সিমির টোনাটুনির সংসারে বসেন। সিমি বায়না করেছে তাকে বিশাল একটা কাঁথা বানিয়ে দিতে হবে, যেন বর-বাচ্চা সবাইকে নিয়ে এক কাঁথায় থাকতে পারে। এ-ও বলে দিয়েছে, সে কোনো টাকা পয়সা দিতে পারবে না।
ওর সংসারটা দেখে নূরজাহানের চোখ জুড়িয়ে আসে। উপরে টিনের চাল, সেমি-পাকা ইটের দেয়ালে কাগজ দিয়ে নানানরকম নকশা বানিয়ে রেখেছে সিমি। চাদরটা হাতে সেলাই করা। বালিশের ওয়াড়ে ছোট্ট ফুল তুলেছে। নূরজাহান বুক ভরে দোয়া করেন, “খুব সুখে থাক মা! খুব সুখে থাক!”
কিন্তু সিমির বেজায় জ্বালা। তার বরটি বেজায় ভীতু। সেদিন রাতে একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছিল, তা তার নাকি অসম্ভব ভূতের ভয়। সে কথা শুনেই পাঁচ হাত লাফ দিয়ে কাঁথা মুড়িয়ে ঘুম দিলো। রাগে সিমির কান্না চলে আসে। কিন্তু সে হার মানার পাত্রী নয়। ঠিক ভুলিয়ে-ভালিয়ে সোহেলকে মেলায় নিয়ে যায়। তার বহুদিনের শখ নাগরদোলায় উঠবে। ওঠেও। কিন্তু ঘটনা ঘটে একদম চূড়ায় উঠে। নিচ দিকে তাকিয়ে এক চিৎকার দিয়ে সোহেল অজ্ঞান হয়ে যায়।
প্রায় কাঁদতে কাঁদতে এই দুঃখের কথা ফাবিহাকে বলছিল সিমি। তারা যাচ্ছে সিমির বাড়ির দিকে।
ফাবিহা হু হা করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে এলো।
সিমি ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলল, “হাসবেন না ছোট আপা! এটা মানুষ নাকি কলা গাছ বলেন তো?”
ফাবিহার হাসি যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল তেমন হঠাৎ করেই থেমে গেল। পাশ দিয়ে যেতে থাকা এক লোক হাসির শব্দ শুনে ফিরে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল। মনে পড়ল বহুদিন আগে সে সিমিকে বলেছিল, “এই মেয়ের বিরক্তিকর একটা স্বভাব আছে। রাস্তা-ঘাটে এমন জোরে হাসাহাসি শুরু করে! উফ! এর সাথে হাটলে আশেপাশের দশজন না চাইতেও চোখ ঘুরিয়ে তাকায়। বিরক্তিকর!”
যে সিমির সামনে একটা মেয়ের দোষ উন্মোচন করেছিল, সেই সিমির সামনেই ঠিক সেই দোষটি তার দিকে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। কিছু কিছু গুনাহের হিসেব বড় জটিল। মৃত্যুর আগেই, এই দুনিয়ায় তার কিছু ফল ভোগ করে যেতে হয়।
রফিক একেবারে চলে এসেছে। অবশ্য এখনও বাড়ির কাউকে জানায়নি। সবাই জানে সে বেড়াতে এসেছে। দুদিন পরই চলে যাবে।
এসে থেকেই দেখছে সাবিহার শরীরটা খারাপ। কয়েকবার বলেছে ডাক্তারের কাছে যেতে। কিন্তু সে শুনলে তো! না পেরে এবার রফিক ধমক দিয়ে উঠল।
“আমি বলেছি যাবা মানে যাবা! আর একটা কথাও শুনব না!”
সাবিহা উল্টো বলল, “যাবো না মানে যাবো না!”
“কেন? কী সমস্যা তোমার?” বিরক্ত হয়ে বলল রফিক।
“আমি জানি আমার কী সমস্যা।”
“তাই! জানো?”
“জানি।”
“কী? বলো দেখি!”
“ওইটাকে সমস্যা বলে না।” কাজ করতে করতে বলল সাবিহা। রফিক খানিকক্ষণ কথাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করল।
বুঝতে পেরেই তড়াক করে লাফ দিয়ে সাবিহাকে ধরে বলল, “কী বললে!”
“যা শুনেছ তাই বলেছি! কোথায় ফুপু হওয়ার জন্য বসে আছি!”
রফিক আনন্দে দিশেহারা হয়ে বাড়ি মাথায় করে ফেলল। অথচ হীরা কিছুই জানেন না। তিনি ছেলের পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে বললেন, “কী সমস্যা তোর? আমার বাড়িতে এমন হট্টগোল করা যাবে না।”
“এটা কি আমার বাড়ি না?” তাজ্জব হয়ে বলল রফিক।
“না। যে এই বাড়িতে থাকে না এটা তার বাড়ি না।”
“আমি তো একেবারে চলে এসেছি!”
টানা তিনমাস অসুস্থতা সহ্য করেও যে সাবিহা দূর্বল হয়নি সে এই একটা কথাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
হীরা চৌধুরী বাজখাঁই কণ্ঠে ছেলেকে ধমক দিলেন, “এই! কী করেছিস তুই!”
রফিক বলতে পারল না সে কী করেছে।
—
রাত নেমেছে অনেকক্ষণ আগে। এক প্রহর ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। প্রচণ্ড মাথাব্যথার চোটে আজ সাকিন আগে আগেই ঘুমিয়ে গেছে। মূলত তাকে ঘুম পাড়িয়েছে ফাবিহা। স্ত্রীর ধমক খেয়ে চোখ-মুখ অন্ধকার করে ঘুমাতে গেছে সে।
কিন্তু ফাবিহার চোখে ঘুম নেই। জেগে থেকে থেকে তার অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে ফরিদের লেদারের ডায়েরিটা টেনে নিলো সে। খুব কম লেখা হয়েছে। সব লেখা একবার পড়ে সে লিখতে শুরু করল।
“বাবা,
কেমন আছো?
জানি কোনো উত্তর পাবো না, তবে আমার বিশ্বাস— তুমি খুব ভালো আছো।
তুমি জানতে পারলে অসম্ভব খুশি হতে যে, তোমার পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ নিজেদের পথ খুঁজে পেয়েছে। শুধু পথ নয়, পেয়েছে যোগ্য সঙ্গীও।
আমি খুব সুখে আছি বাবা। সুখ মানে তো নিপাট খুশি নয়। দুঃখও সুখের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেটা নিয়েই আমি খুশি আছি। তোমাকে আনন্দের সাথে জানাচ্ছি শ্রাবণের মতো চমৎকার ছেলেটি তার বর্ষা খুঁজে পেয়েছে, আমি পেয়েছি আমার শিশির। ফুলটা ফুঁটতে সময় লাগলেও সে পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে ঠিক ঠিক তার ফুলদানির কাছে পৌঁছে গেছে। এলোমেলো পাজলটা দেড় বছরের মাথায় চমৎকারভাবে মিলে গেছে!
সেই চমৎকার ছেলেটি সিমির বিয়ে দিয়েছে বাবা। সিমি যে কী সুখে আছে! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয় ছোট্ট বেলার পুতুল বর-বউ!
ভাইয়ার হুশ ফিরেছে তোমার হুশ যাওয়ার পর। মাঝে মাঝেই মনে হয়, তুমি বোধহয় নিজের জীবনটা ভাইয়ার জীবনে ট্রান্সফার করে দিয়ে গেছ।
জানো বাবা, ভাইয়া কারো সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। ওর অনুশোচনা দেখলে ভেতরটা কষ্টে, যন্ত্রণায়, অক্ষম আক্রোশে ফেটে পড়তে চায়। শুধু মনে হয়, কেন আর কয়েকটা দিন আগে তুই চোখটা খুললি না ভাইয়া!
ফুপার কসমেটিক্সের দোকানের পাশেই একটা দোকান নিয়েছে ও। আম্মু ওকে কিছু টাকা ধার দিয়েছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই উঠে দাঁড়াবে। তারপর ইনশাআল্লাহ্ ওর বিয়েটাও দিয়ে দেব।
বাবা, সবাই এগিয়ে গেছে। সবার জীবনেই রং এসেছে। কিন্তু সেই একই জায়গায়, একই ভোরে আটকে গেছে আম্মুর জীবন। আম্মু সম্ভবত বেরিয়ে আসতেও চায় না। আমিও জোর করি না। কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরেই তো মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়!
‘নওরোজ’ বেশ চলছে। ছয় মাসে সেটার রয়্যালটি পায় আম্মু। পাঁচটা ভ্যানের টাকায় বেশ চলে যাচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ্।
বাবা! আমার আজীবন আফসোস থেকে যাবে, আমি কক্ষনো তোমাকে ভালোবাসি বলিনি! এদেশে মানুষ বোধহয় যাদের বেশি ভালোবাসে তাদেরই মুখ ফুটে সে কথাটা জানাতে পারে না।
ভালোবাসি বলার সুযোগটা যেহেতু হারিয়েছি, তাই এবার কাজে করে দেখানোর পালা। যে মানুষটা নেই, তাকে ভালোবেসে প্রমাণ দেয়া ঠিক কতখানি ভালোবেসেছিলাম।
বাবা, আমি হব তোমার কবরের পাশের সূরা ইয়াসিন, আমি হব তোমার যত্নে লাগানো ফলগাছ, যে মালির গুণ গাইবে তার অনুপস্থিতিতেও। সবাই তো বেশ মানুষ হয় বাবা, তোমাদের জন্য আমি না হয় শব্দই হলাম! ধরো হলাম, বনী ইসরাইলের ২৪ নাম্বার আয়াত।
রাতটা গভীর হয়ে এসেছে বাবা। প্রহর পেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। এগিয়ে আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন আমাদের আবার দেখা হবে। সে মিলনের কোনো বিচ্ছেদ নেই। ও বাবা! আমি যে ওই আশাতেই বেঁচে আছি!
ইতি
তোমার আত্মজা”
[বিঃদ্রঃ সুরা বনী ইসরাইল, ২৪: وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
"আর মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার ডানা অবনমিত করো এবং বলো, ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।’]
~সমাপ্ত~
(প্রিয় পাঠক! অনেকে অনুরোধ করেছিলেন অন্তত পঞ্চাশ অবধি যেতে। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, সে অবধি যেতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল তাতে গল্পের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।
খুব চেষ্টা করেছি, আমার সর্বোচ্চটা দিতে। ভালো যা কিছু এ গল্পে এসেছে, সবটুকু আমার রবের পক্ষ থেকে। খারাপটুকু আমার নফসের বহিঃপ্রকাশ। সেগুলো আল্লাহ আপনাদের মন থেকে মুছে দিন।
শেষ পর্যন্ত পাঁচশ’র কাছাকাছি পাঠক ছিলেন। আজ, এই বিদায় বেলায় সকলেই অন্তত একটা বাক্য হলেও বলে যাবেন— এই আশায় রইলাম।
অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা।)