#বনজোছনা
৪৫.
সাকিনের সাথে সকালে হাঁটতে যাওয়াটা ফাবিহার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফজর পড়ে সে বেশ আয়োজন করেই আবার ঘুমুতে যেত। একদিন সাকিন কী মনে করে নামাজ পড়ে রুটিন ভেঙে বাড়িতে এলো। ফাবিহাকে বলল, “হাঁটতে যাবে নাকি?”
তার মুখে ‘না’ চলেই এসেছিল। চারপাশে শীতের আমেজ ছড়িয়ে গেছে। বাতাসে কুয়াশার গন্ধ। গ্রাম বলে কী না কে জানে, ঠান্ডাটা বড় বেশি! ফজরের হিমেল বাতাসে দু’চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। দুজন মানুষের বাড়িতে কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আলস্যকে জড়িয়ে খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেয় ফাবিহা। কিন্তু সেদিন মনে হলো, একবার নাহয় ঘুরেই আসা যাক। পরে বুঝেছিল, সেটা ছিল তার জীবনের অন্যতম সুন্দর সিদ্ধান্ত।
গ্রামের অলিগলি বেশ ভালোভাবেই চেনা হয়ে গেছে সাকিনের। কখনও ছাত্রদের খোঁজে, কখনও বা নিজের মনে ঘুরতে ঘুরতেই জায়গাটা হাতের তালুর মতো নখদর্পণে চলে এসেছে। ফজরের পর দিনটা যখন একটু একটু করে ঘোমটা খোলে, তখন তার সৌন্দর্যকে পৃথিবীর বাইরের কিছু বলে মনে হয়। কোনো কিছুর সাথেই সে কোমল বাতাসের, শিশিরের ঘ্রাণের তুলনা হয় না। তুলনা হয় না ভেজা ঘাসের সৌন্দর্যের, ধান ক্ষেতের গন্ধের, নিঃসীম নীরবতার। সেই সৌন্দর্যটুকু মুঠোয় ভরে দিন শুরু করতে পারলে বড় ভালো লাগে। মনটা ভীষন শান্ত থাকে।
সেই ভালো লাগাটা ফাবিহার সাথে ভাগ করে নিতেই ওকে সঙ্গে নেয়া। সাকিন সজনে গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। পাশেই জোড়া কামিনীর গাছ লাগিয়েছে। এই ভোরে ওর সদ্য ফোঁটা ফুলগুলো দেখলে মনে হয় ঘন অরণ্যে খণ্ড খণ্ড শুভ্র বরফ। এর মাঝেই ফাবিহা বেরিয়ে এলো।
সাকিন তার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, “একটা চাদর নিতে।”
ফাবিহা আবার ভেতরে গেলো। নিজে চাদর জড়িয়ে সাকিনের জন্যেও নিয়ে নিল। সাকিন সাধারণত চাদর নেয় না। হাঁটতে শুরু করলে তার অসম্ভব গরম লাগে। তবু নিষেধ করল না।
হাঁটতে হাঁটতে ফাবিহা বলল, “একটা প্রশ্ন করব?”
“করো।”
“আমার চিঠিটা আপনি রেখে দিয়েছিলেন কেন?”
“ফেলে দেয়া উচিত ছিল?” একটু হাসল সাকিন।
“না, তা না। তবে রেখে দেয়ার কোনো কারণও তো ছিল না।”
সাকিন কাঁধ ঝাঁকাল, “কী জানি? ফেলে দেয়ার কথা মনে হয়নি। সেদিনই ওখানে রেখেছিলাম। আর খোলা হয়নি।”
“একবার পড়েই সব মনে আছে?” ফাবিহা অবাক হয়ে বলল। সাকিন উত্তর দিলো না।
“আপনার যদি অন্য কারো সাথে বিয়ে হতো? সে তো চিঠিটা দেখত।”
“দেখত।” স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল সে। “তাতে কী হতো? এটা কি প্রেমপত্র নাকি!” সাকিনকে হাসতে দেখে বেজায় লজ্জা পেলো ফাবিহা।
মুখ ঘুরিয়ে বলল, “হয়েছে! বুঝেছি!”
ফেরার পথে এক ভদ্রমহিলা ফাবিহাকে ডাকলেন। সাকিন আস্তে করে বলল, “যাও, ছাত্রের মা।” ফাবিহা এগিয়ে গেল। সাকিন ভাবল ফাবিহাকে বেশ কয়েকজনের সাথে পরিচয় করানো দরকার। এক বছর যে মুরুব্বীর বাড়িতে ছিল, সে বাড়ি থেকে একবার ঘুরিয়ে আনা দরকার।
ছাত্রের মায়ের বয়স বেশি নয়। তিনি খুব আগ্রহ করে নিজের বাড়িতে পোষা একটা মুরগি ফাবিহাকে দিলেন। সে প্রায় আঁতকে উঠে বলল, “না না…!”
মহিলা শুনলেন না, “না করবেন না ম্যাডাম! স্যার এতদিন একা থাকত, দিলেও নেয় নাই। এখন আপনি আসছেন, স্যারেরে রান্না করে খাওয়াবেন। ন্যান না!”
ফাবিহা অসহায় চোখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাকিনের দিকে তাকালো। সে ইশারা করতেই ভয়ে ভয়ে মুরগিটা হাতে নিলো। কীভাবে যেন এটাকে বেঁধে রেখেছে। তবু মুখটা তো বন্ধ নয়। চিৎকার করতে করতে পাখা ঝাপটানো শুরু করলে ফাবিহা প্রায় দৌঁড়ে সাকিনের কাছে এসে সেটা হাতবদল করে বাঁচল। পেছন ঘুরে দেখল মহিলা নিজের মতো করে উঠান ঝাড় দিতে শুরু করেছেন।
সে বলল, “কেমন হলো!”
“কেমন হলো?” মুরগিটা বেশ কায়দা করে ধরেছে সাকিন।
“এই যে…এভাবে মুরগিটা নেয়া কি ঠিক হলো?”
“ভুলটা কোথায়?”
“টাকা-পয়সা দেয়া হলো না। একদম খালি হাতে এসেছি!” আফসোস করে বলল সে।
সাকিন শান্ত কণ্ঠে বলল, “আমার কাছে আছে।”
“তাহলে দিচ্ছেন না কেন!” অবাক হলো ফাবিহা।
সাকিন হাঁটতে শুরু করল, “এসো।”
“টাকাটা..?”
একহাতে মুরগি ধরে আর এক হাতে ফাবিহার হাত টান দিলো সাকিন। সকালের রোদ কুয়াশার চাদর ছিন্ন-ভিন্ন করে দিচ্ছে। চাষা ধানের আগাছা পরিষ্কার করছে জীবনের সমস্ত মনোযোগ একত্রিত করে। খেঁজুর গাছের কাঁধে কলসি দেখে সাকিন বলল, “খেঁজুরের রস খাবে?”
ফাবিহা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নটা চট করে ধরতে পারল না।
“কী?”
“খেঁজুরের রস, খাবে?”
“এখন পাওয়া যায়?”
“না। আগে থেকে বলে রাখব। খেয়েছ কখনও?”
“না। বাদুড় নাকি ইয়ে করে দেয়..!” নাক কুঁচকে বলল ফাবিহা। পরক্ষণেই মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, “আপনি তাহলে কলেজে যাওয়ার সময় উনাকে টাকাটা দিয়ে দিয়েন!”
“সবকিছুর দাম দিতে হয় না ফাবিহা। উনি ভালোবেসে জিনিসটা দিয়েছেন। টাকা দিয়ে তুমি সেটার দাম মেটাতে পারবে? উল্টো অপমান হবে। সবকিছুর আর্থিক মূল্য থাকতে হবে এটা তো জরুরি না! তুমি কিন্তু তাকে একটা ধন্যবাদও দাওনি!”
ফাবিহা ভীষণ লজ্জা পেলো। কখনও উপহার নিয়ে তো সে অভ্যস্ত নয়।
বিব্রত কণ্ঠে বলল, “সরি, মনে ছিল না।”
“আমাকে সরি বলে কী লাভ?”
“তাহলে কী করব?”
সাকিন খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “এটা যেদিন রান্না করবে, সেদিন তাকেও একটু দিও। সাথে ধন্যবাদ বলে দিও। এটা সম্ভবত ভালো ফিডব্যাক হবে।”
বুদ্ধিটা ফাবিহার দারুণ পছন্দ হলো। আজীবন সবকিছুর বিনিময়ে দিয়ে তার অভ্যেস। সেটাতেই নিজের মান বজায় থাকে বলে ভেবে এসেছে, জেনে এসেছে। তাই আজ হঠাৎ এই উপহার উষ্ণ হৃদয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। মনে হয়েছে— ঋণী হয়ে গেলাম! অথচ সে জানে না, কিছু সম্পর্ক এমন তুচ্ছ ঋণ দিয়েই শুরু হয়।
সেদিনই মুরগিটা রান্না করল সে। রান্না করার ফাঁকে ফাঁকে সাকিনের ডায়েরি পড়তে থাকল। শুরু থেকে পড়তে শুরু করেছে। সাকিন বাড়িতে থাকলে তার সামনে পড়তে একটু লজ্জা লজ্জা লাগে। তাই ফাঁকা বাড়িতেই আয়েশ করে পড়ে। আজ প্রায় অর্ধেকে এসে তার পড়া থেমে গেলো। স্তব্ধ চোখে ওই দুটো পাতাই বারবার পড়তে থাকল সে ।
“আজ যখন ফাবিহাকে ভিড়ের মাঝে অপমান করা হচ্ছিল, আমি ওর জায়গায় নিজেকে খুঁজে পেলাম। অনেকগুলো দিন আগে, এমন তীক্ষ্ণ বাক্য, বিষ দৃষ্টি আমার দিকেও ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল। আমার হারানোর কিছু ছিল না। বাবা-মায়ের অমর্যাদার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু ফাবিহা প্রাণপণে চেষ্টা করছিল, ফরিদ চাচাকে এসব থেকে দূরে রাখার জন্য। পারেনি। মানুষের মুখ একবার খুলে গেলে তা বন্দুকের চেয়েও ভয়ানক হয়ে ওঠে।”
এটুকু পড়েই সাকিনের একটা নাম্বার ‘Observer’ লিখে সেভ করল ফাবিহা। পরের পৃষ্ঠায় তার জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিল।
সেখানে পাপড়ির ঘটনার কিছু আধ খ্যাঁচড়া কথা লেখা আছে। অথচ ফাবিহার বুঝতে এতটুকু কষ্ট হলো না ঘটনাটা ঠিক কী ঘটেছিল। এবং এরই মাধ্যমে আরেকটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলো সে।
বিয়ের পরপর সবাই তার সাথে নিজে থেকে কথা-বার্তা বললেও পাপড়ি মেয়েটা একেবারেই চুপচাপ ছিল। যতবার দেখেছে— ঘরের এক কোণেই ওকে পেয়েছে। ফাবিহা ভেবেছিল ও বোধহয় ইরফানের মতোই অন্তর্মুখী স্বভাবের। নতুন মানুষ বলে তাকে ঘাটানোটাও উচিত মনে করেনি। আজ এই ক্ষণে কারণটা উদঘাটন করতে পারল।
সাকিন দুপুরে খেতে এসে ডায়েরির খোলা পৃষ্ঠাটা নীরবে দেখল। কিছু বলল না।
ফাবিহা সেই তরকারি একটা বক্সে দিয়ে দিলে সাকিন বলল, “তুমিও চলো।”
বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিলো সে।
ভদ্রমহিলা ভাবতেও পারেননি স্যারের বউ তরকারি নিয়ে একেবারে তার বাড়ি অবধি চলে আসবে। তিনি বারংবার বলে গেলেন, “আপনি আবার এসব নিয়ে আসতে গেলেন ক্যান? এইটুক একটা মুরগি! নিজেরাই হয় না! কী অবস্থা দেখেন দেখি!” অথচ তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। ফাবিহার মনে হলো সকালে সাকিনকে দেয়া নামটা একেবারে সার্থক!
ফেরার পথে সাকিন বলল, “তুমি চাইলেই পাপড়ির থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারো। এটা ওকে নিজের কাছে অপরাধী বানাবে। আবার চাইলে ওর সাথে সুন্দর একটা সম্পর্কও তৈরি করতে পারো। যাকে আঘাত করা হয়, সে-ই যদি ঘায়ে মলম দেয়, এর চাইতে তীব্র অনুশোচনা আর কোনো কিছুতেই হয় না।”
ফাবিহা চুপ করে শুনল। বলল, “আপনার মামা বিয়েতে এসেছিল?”
“না।”
“কেন?”
“মামা জেলে।” নির্বিকার কণ্ঠে বলল সাকিন।
ফাবিহা তাজ্জব হয়ে তাকালো, “কী!”
সাকিনকে আর কিছু বলতে না দেখে বেশ বিরক্ত হলো ফাবিহা। বলল, “আপনি হুট করে এমন সাইলেন্ট হয়ে যান কেন! সব সময় এমন চুপ থাকতে ভালো লাগে?”
“কিছু বলাটা অনেক বেশি রিস্কি! কী বলতে কী বলি, কে কী মনে করে! তারচেয়ে চুপ থাকা অনেক সহজ!”
ফাবিহা বিরক্ত চোখে তাকালো।
“উনি জেলে কেন জানতে পারি?”
“পারো।” মাথা নাড়ল সাকিন। বাড়িতে চলে এসেছে তারা। ঢুকতে ঢুকতে বলল, “এক ডাকসাইটে মাস্তানের সাথে একটা কলিশন হয়েছে। সেটায় সেফ থাকতে আমাকে মাঝখানে রেখেছিলেন। এগুলো প্রমাণ হওয়ার পর আর বাইরে থাকতে পারলেন না। তোমাকে বলা হয়নি, আমি কিন্তু এক দিন থানায় ছিলাম। জেলে অবশ্য না!”
তার স্বাভাবিক কণ্ঠ শুনে ফাবিহা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে কী সহজ একটা বিষয়। যেন একটু ঝগড়া হয়েছিল। ব্যস, আর কিচ্ছু না!
শেষে সাকিনের হাসিটা দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বলল, “এটা আগে বলেননি কেন?”
সাকিন ঘরে ঢুকতে যেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আফসোস করে বলল, “ওহ হো! একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আগে বললে কি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে?”
“ভেবে দেখতাম।” উল্টো জবাব দিলো সে।
“কিন্তু কে যেন বিয়ের পরদিন নোট দিয়েছিল ‘Maybe I was waiting for this day for a decade!’” রহস্য করে বলল সাকিন।
ফাবিহা নিজের জায়গায় জমে গেল। এই নোট সে দিয়েছিল ঠিক। কিন্তু সেটা তো সব ফ্রেন্ডদের থেকে হাইড করা। তার মানে সাকিনকে হাইড করা হয়নি! তার চোখ কোটর ছাড়াল। তাহলে তো সাকিন আজকের নোটও দেখেছে! কোনোদিকে না তাকিয়ে, চোখ-মুখ খিচে দৌঁড়ে ঘরে ঢুকল ফাবিহা। শুনতে পেলো সাকিন পাশ থেকে বলছে,
“A random dream and a random man,
Collided so often
And made a new star”
বিয়ের এই প্রায় মাস ছুঁই ছুঁই বয়সে সাকিনকে প্রথমবার শব্দ করে হাসতে শুনল। কিন্তু কী বিব্রতকর অবস্থা! সামনে যেয়ে হাসিটা যে দেখবে সেই সাহস তার নেই। মনে হচ্ছে চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ে গেছে। বিয়ের পর থেকে সে কিছু চুরি না করেও চোর হয়ে যাচ্ছে! কী লজ্জা! কী লজ্জা!
খেতে বসেও শান্তি পাচ্ছিল না ফাবিহা। যদিও সে বিষয়ে সাকিন আর কিছু বলেনি, কিন্তু সে নিজেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে।
সাকিন খেয়াল করে বলল, “আরে খাও খাও! এসব কোনো বিষয় না।”
ফাবিহা অতিষ্ঠ হয়ে বলল, “ধুর! আপনি চুপ থাকেন তো! কথা বলা লাগবে না! দয়া করে চুপ থাকেন!”
—
আদিলের মতো একই কথা মামীও বললে বিষয়টা বেশ গুরুত্বের সাথেই নিলো সাকিন। পাপড়ির এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বিয়ের সুর উঠল। ছেলে পাশের গ্রামের। ইলেকট্রনিক্সের বেশ বড় দোকান আছে তার। সমস্যা হলো, ঘরে সৎ মা। তাই দেখেই মেয়ের মায়েরা পিছিয়ে যায়। পাপিয়া পেছালেন না। কমতি তার নিজেরও আছে। শুধু ছেলেটা ভালো হলেই হলো।
আরেকটু খোঁজার ইচ্ছে থাকলেও পরের মাসে আদিলের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা থাকায় গুছিয়ে ওঠার সুযোগ পেলো না সাকিন। পাপিয়া নিজেও চাইছিলেন না বিষয়টা পাঁচকান হোক। কানে-মুখে কথা শুরু হলেই বিয়েটা ভেস্তে যাবে। এমনিতেই সাকিনের সাথে মিলিয়ে পাড়ায় একটা রটনা রটে আছে পাপড়ির নামে। তাই বিয়েটা তিনি অন্য জায়গা থেকে দিতে চাচ্ছিলেন। কাজেই বিয়ের ভেন্যু হলো সাকিনের বাড়ি।
ছেলে সাকিন নিজেই খুঁজেছে। তার কাছে এও বলেছে মানুষ তাকে আর পাপড়িকে নিয়ে যে একটা গুঞ্জন ছড়িয়েছে। কারণটা খোলাসা করেনি। আকরামের কথা বলতেই ছেলে বুঝে নিয়েছে একটা ঘটনার লেজুড় জুড়ে যে মানুষ আরও কথা বানিয়েছে। তার ভাবনা মিথ্যে না হলেও পুরোপুরি যে সত্য নয় সেটা আর বলল না সাকিন।
প্রথম প্রথম ফাবিহা পাপড়িকে খুব একটা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলেও তাকে ভালো করে দেখার পর বেশ খানিকটা নরম হয়েছে। মেয়েটা সবসময় নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে। সাকিন না বললেও সে বুঝতে পারল পাপড়ি আসলে সাকিনকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী কোনো চিন্তা ভাবনা করেনি। সে স্রেফ নিজের জন্য একটা সার্টিফিকেট চেয়েছিল। নারীত্বের সার্টিফিকেট। আর সেটা এমন মানুষের হাত ধরেই পেলো যাকে সে নিজের স্বেচ্ছাচারিতার কাটায় জর্জরিত করে ফেলেছিল।
সাকিন যখন তাকে বলল, “দোয়া করি পাপড়ি, খুব ভালো থাক!”
তখন কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। সেই কান্না পরিবারের সাথে বিচ্ছেদের নয়, নতুন জীবনের শঙ্কায় নয়। নিজের হাতে নিজের শরীরে দেয়া এমন দাগের জন্য, যা বহু কান্নার জলেও কখনও নিঃশেষ করা সম্ভব হবে না।
বিদায়ের সময় ফাবিহা তাকে জড়িয়ে ধরল। স্নেহ ভরা কণ্ঠে বলল, “কিছু ভুল জীবনের নতুন রাস্তা বানায়। সব ভুলকে অভিশাপ ভাবতে নেই পাপড়ি!” পাপড়ির কান্না তাতে বরং বাড়ল।
বিয়ের ঝামেলার ভেতরে ফাবিহার মাথায় একটা পোকা ঢুকেছে। পাপড়ির রেজিস্ট্রি এখন করা হয়নি। তবুও জন্মতারিখ নিয়ে কী যেন একটা ঝামেলা হয়েছিল। সে সময় তার হুট করে মনে হলো, সাকিন কি তার জন্মতারিখ জানে? যদিও সে কখনও জন্মদিন পালন করেনি— তবু মনে হলো সাকিন যদি তার জন্মতারিখ না জানে তাহলে সে অসম্ভব কষ্ট পাবে। অবচেতন মন আশা করছিল, তার জীবনের অর্ধেক যে, সেই মানুষটা তার সম্পর্কে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তথ্যগুলোও নখদর্পণে রাখবে। না-ই বা শুভেচ্ছা জানালো, অন্তত এটুকু জানুক, ফাবিহার জন্মদিনটা কবে!
সেদিন রাতেই সে সাকিনকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আমার জন্মদিন কবে— আপনি জানেন?”
সাকিন সহসাই উত্তর দিলো না। ফাবিহা ভাবল সে আসলে জানেই না।
মন খারাপের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সে সময় সাকিন বলল, “ফুলের তো কোনো জন্মদিন হয় না!”
ফাবিহা বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো। খুব করে বলতে চাইলো, “আমার সাথে এসব ডিপ্লোম্যাটিক উত্তর দিয়ে পার পাবেন না! জানেন না এজন্য কথা ঘোরাচ্ছেন, সেটা ভালোই বুঝতে পারছি!”
অথচ ফাবিহা কিচ্ছু বলতে পারল না। একটা শব্দও না। মানুষটা কথা বলে না। যখন বলে, তখন তাকে একেবারে বোবা বানিয়ে ছাড়ে।
ঠিক তার পরেরদিন খবর এলো। সাকিনের চার মাস মেয়াদী ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্সের ডাক এসেছে।
চলমান~
(শেষের পথে…)