ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 1

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে অসম্ভব সব কথা বলতে পারে। কথাগুলো তারা এমনভাবে বলে যেন এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কিছুই হতে পারে না। এই যেমন কেউ হয়তো খুব শান্ত গলায় এসে বলল, "ভাই, আজ দুপুরে আমি সূর্যটা গিলে খেয়েছি। একটু পানি দেবেন? গলা শুকিয়ে গেছে।" শোনার পর মনে হবে, সত্যিই তো, সূর্য গিলে খেলে গলা শুকিয়ে যাওয়াই তো স্বাভাবিক! পানি দেওয়া উচিত। কিন্তু আস্ত একটা সূর্য কেউ কী করে গিলে খেতে পারে? এটা কি আদৌ সম্ভব? যারপরনাই অসম্ভব কথা সহজ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা এই মানুষগুলো আসলে ভয়ানক। বিনা নোটিশেই তারা সামনের মানুষটিকে ঝটকা দিয়ে যায়।

অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা তার বিশাল টেবিলের ওপাশে বসে থাকা মেয়েটির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির নাম রুবাইয়াত রোদসী। বলা বাহুল্য, মেয়েটির নামের মধ্যে একধরণের কাব্যিক ব্যাপার আছে। তবে মেয়েটার চেহারায় বা আচার-আচরণে কোনো কাব্য নেই। সে বসে আছে মেরুদণ্ড সোজা করে। পরনে হালকা গোলাপী রঙের কূর্তি, গলায় ঝুলছে স্কার্ফ, চোখে একটি মাঝারি গড়নের ফ্রেম, কাঁধে একটা লম্বা ব্যাগ। মেয়েটা এমনভাবে বসে আছে যেন সে এইমাত্র ভাজা মাছ উল্টে দেওয়ার আবদার করতে চেয়েছে, অথচ একটু আগেই সে একটা অস্বাভাবিক কাণ্ড করেছে। তার সেই অদ্ভুত কথার জেরে শেহজাদের মনে হয়েছে তার কানের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করানোটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।

বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসেবে সময়টা এখন ভাদ্রমাস। অথচ দুপুর দুপুর আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে তারা মনের সুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গ দিচ্ছে মাতাল হাওয়া। শেহজাদের চেম্বারটা দশতলায়। এখান থেকে শহরের একটা বড় অংশ দেখা যায়। জানালার কাঁচ ভেদ করে যে মৃদু আলোটুকু ভেতরে আসছে, তা আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিত দিতে মরিয়া। শেহজাদের মাথার ওপর একটা পুরনো আমলের সিলিং ফ্যান ঘুরছে। যদিও তার ঘরে এসি চলছে, তবু সে সারাক্ষণ ফ্যান চালিয়ে রাখে। সে এসি এবং ফ্যান একসাথে চালাতে পছন্দ করে। তার মতে, এসির হাওয়া হলো মৃত হাওয়া, আর ফ্যানের বাতাস সেই মৃত হাওয়াকে ঘরের ভেতর তাড়িয়ে বেড়ায়। তাতে করে ঘরটা জীবন মরণের এক উচ্ছ্বাসে সরগরম থাকে। ওসব আদতে অলস মস্তিষ্কের নিজস্ব যুক্তি। আসল কথা হলো, বড়লোকেরা শুধু সুযোগ খোঁজে। রোজই তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিজেদের বড়লোকী দেখিয়ে বেড়াতে চায়। নয়তো এমন চমৎকার আবহাওয়ায় এসি আর ফ্যান একত্রে চালিয়ে রাখার কোনো মানে নেই।

শেহজাদ তার সামনের পেপারওয়েটটা একটু ঘুরিয়ে গলা খাঁকারি দিল। শান্ত গলায় বলল, "মিস রোদসী, আপনি কি আপনার শর্তটা আরেকবার বলবেন? আমার মনে হয় আমি ঠিক শুনতে পাইনি। বয়সের সাথে সাথে মানুষের শ্রবণশক্তি কমে। আমারো বোধহয় এখন থেকেই তেমনটা হচ্ছে।”

রোদসী বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। চশমার ফাঁক দিয়ে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় বলল,

"আপনার শ্রবণশক্তি একদম ঠিক আছে, স্যার। আমি যা বলেছি, আপনি ঠিক তাই শুনেছেন। তবুও আপনার সুবিধার্থে আমি আরেকবার বলছি। আমার শর্ত একটাই। আপনার আন্ডারে ইন্টার্নশিপ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার প্রথম কেস হতে হবে একটি ডিভোর্স কেস। এবং আপনাকে এই কেসটা আজই নিতে হবে। আপনি রাজি থাকলে আমি আজ থেকেই জয়েন করব, আর রাজি না থাকলে আমি এই মুহূর্তেই উঠে চলে যাব। সিদ্ধান্ত এখন আপনার।"

শেহজাদের কুঁচকে যাওয়া ভুরুযুগল এবার আরেকটু মিলিত হলো। এই মেয়ের সমস্যা কী? গত পরশু যখন সে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল, তখন তো তাকে এমন বদ্ধ উন্মাদ মনে হয়নি! শেহজাদের হাতে এই মুহূর্তে একটা মাথা নষ্ট করা হাই-প্রোফাইল ক্রিমিনাল কেস। শহরের এক নামকরা শিল্পপতির মার্ডার মিস্ট্রি। শিল্পপতি মির্জা কামরুল হাসানকে তার নিজের ফার্মহাউসে খুন করা হয়েছে। সাতবার স্ট্যাব করা হয়েছে লোকটাকে, অথচ কোথাও কোনো রক্তের ছিটেফোঁটা নেই, কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। পুলিশ, মিডিয়া, ক্ষমতাবান মহল—সবাই এই কেসের দিকে শকুনির মতো তাকিয়ে আছে। এই জট পাকানো কেসটা সামলাতে শেহজাদের একজন তুখোড় অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার।

বিগত দশ দিনে সে প্রায় তেরোজন ইন্টার্নি করতে আসা ছেলেমেয়েকে অকপটে বের করে দিয়েছে। এদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দিক থেকে শেহজাদের চিন্তাভাবনার ঠিক বিপরীতে অবস্থান করছিল। তাদের একজন, আইনের বইয়ের বাইরে বাস্তব দুনিয়ার আর কোনো খবর রাখে না। তাকে শেহজাদ জিজ্ঞেস করেছিল, "মানুষ কেন খুন করে?" ছেলেটা পেনাল কোড আউড়াতে শুরু করেছিল। শেহজাদ তাকে বিদায় করেছে। আরেকজন মার্ডারের ক্রাইম সিনের ছবি দেখেই বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছিল শেহজাদের টেবিল। শেষে এই ঘর তিনঘন্টা লাগিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। কী বিচ্ছিরি ব্যাপার! আরেকজন তো এতো বেশি কথা বলতে শুরু করলো যে বিশ মিনিটেই শেহজাদকে মাথাব্যথার ঔষধ নিতে হয়েছে। এদের মাঝে আরেকজন ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং, সে আসলে কেডি পাঠক হতে চায় তাই তার ল জয়েন করা। একেক জাতের উদ্ভট পাগল দেখে শেষে বিরক্ত হয়ে সবাইকেই শেহজাদ বাদ দিয়েছে।

কিন্তু এই রোদসী মেয়েটা ছিল ব্যতিক্রম। গত পরশু ইন্টারভিউ বোর্ডে মেয়েটার সার্টিফিকেট, তার গুছিয়ে কথা বলার ধরন, লজিক এবং উপস্থিত বুদ্ধি শেহজাদকে রীতিমতো মুগ্ধ করেছিল। শেহজাদ তাকে একটি কাল্পনিক মার্ডার সিনারিও দিয়ে সমাধান করতে বলেছিল। মেয়েটা মাত্র তিন মিনিটে এমন একটা নিখুঁত থিওরি দাঁড় করিয়েছিল যা শেহজাদকেও শেষ পর্যন্ত ভাবিয়ে তুলেছিল। শেহজাদ ভেবেছিল, যাক! অবশেষে একটা কাজের মেয়ে পাওয়া গেল। এর ব্রেন শার্প। সাধারণত মেয়েদের চোখে থাকে মায়া কিন্তু এই মেয়েটির দৃষ্টিতে অদ্ভুত শীতলতা আছে, একপলক তাকিয়েই মনে হয়েছে এমন ঠান্ডা মস্তিষ্কই ক্রিমিনাল ল'ইয়ার হওয়ার প্রথম শর্ত।

মেয়েটি আজ জয়েনিংয়ের দিন সকালে দেরি করে চেম্বারে এসেছে। শেহজাদ অবশ্য তাতে কিছু মনে করেনি। ঢাকা শহরের জ্যামে পরিকল্পনা মতো সঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছাতে পারাটাই আশ্চর্যের। আবার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় টিকে গিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে বেশী সময় ঘুমিয়ে কাটানোও নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাই সে তাকে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই জয়েনিং লেটারের হার্ডকপি এগিয়ে দিয়েছিলো। বিপরীতে মেয়েটা এসব কেমন পাগলামি শুরু করেছে? ক্রিমিনাল স্পেশালিস্টের নিকট ডিভোর্স কেস নিয়ে আসা পাগলামি বৈ কিছুই নয়। শেহজাদের একবার মনে হলো, সেদিন হয়তো রোদসীর কোনো যমজ বোন তার বদল ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল। নয়তো রাতারাতি একটা মানুষের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এভাবে কীভাবে বদলে যায়? নাকি সত্যিই মেয়েটার কোনো সাইকোলজিক্যাল সমস্যা আছে?

শেহজাদ টেবিলের ড্রয়ার টেনে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। গত তিন রাত সে ঘুমায়নি। মির্জা কামরুল হাসানের কেসটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে লাইটার জ্বালালো। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, "দুঃখিত, এই মুহূর্তে আমার এটার ভীষণ প্রয়োজন। আশা করি, সুশীলদের মতো আপনি ধূমপান অপছন্দ করেন না।”

"জি না, যেখানে অন্যের ক্ষতি করার অধিকার মানুষের জন্মগত, সেখানে আপনি নিজের ক্ষতি করছেন। আপনি নিজের ফুসফুস পুড়িয়ে আনন্দ পাচ্ছেন, এতে আমার অপছন্দ করার কী আছে!"

রোদসীর নির্বিকার জবাবে শেহজাদ কি অল্প একটু চমকাল? নাকি মেয়েটির থেকে সে এমন কোনো জবাবই আশা করেছিল? শেহজাদ বোধহয় ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে হাসল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অত্যন্ত গুছিয়ে বলল, "দেখুন মিস রোদসী, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমি ডিভোর্স স্পেশালিস্ট নই। আমি একজন ক্রিমিনাল ল'ইয়ার। মার্ডার, কিডন্যাপিং, হোয়াইট কলার ক্রাইম— এসব আমার এরিয়া। রক্ত, লাশ, ফরেনসিক রিপোর্ট, পোস্টমর্টেম— এগুলো নিয়ে আমার কারবার। স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা না হলে তারা ফ্যামিলি কোর্টে যায়, আমার কাছে আসে না। আমার চেম্বারে নির্যাতিতা স্ত্রী কিংবা অসহায় স্বামীর জায়গা নেই।"

"আমি জানি, স্যার।"

"জেনেও আপনি এই শর্ত দিচ্ছেন? একজন ক্রিমিনাল ল'ইয়ারকে বলছেন ডিভোর্স কেস লড়তে?"

"জি।"

"কারণটা কী জানতে পারি? এত কেস থাকতে ডিভোর্স কেস কেন নিতে হবে? আপনি তো ল পাশ করেছেন। আপনার নিশ্চয়ই জানা উচিত, এই ফিল্ডটা কতটা বিস্তৃত। সেখানে আপনি শুরুতেই একটা ডিভোর্স কেস নিয়ে পড়ে আছেন কেন?"

রোদসী একটুও সময় নষ্ট করল না। চটপট বলে উঠল, "কারণ এটাই আমার ড্রিম।"

শেহজাদ এবার থতমত খেয়ে গেল। হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে নিলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ। খানিকটা ঝুঁকে এসে অবিশ্বাসের সুরে বলল, "ডিভোর্স? ডিভোর্স আপনার ড্রিম? লাইক সিরিয়াসলি? মানুষের ড্রিম, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। আর আপনার ড্রিম ডিভোর্স?"

রোদসী চমকে উঠল। বলে কী এই লোক? তার ড্রিম ডিভোর্স হতে যাবে কেন? খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই নাকি যে, জনে জনে সবার সংসার ভাঙবে সে? নিজেকে সামলে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল, "না স্যার, ডিভোর্স আমার ড্রিম না। এই কেসটা আমার ড্রিম। আমি চাই আপনি এই কেসটা লড়ুন, আর আমি আপনার সাথে এই কেসে অ্যাসিস্ট করি। এটা আমার জীবনের একটা লক্ষ্য বলতে পারেন।"

"অসম্ভব," শেহজাদ এবার কঠিন গলায় নাকচ করল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই বদ্ধ কামরার চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। একটু থেমেই বলল, "আমি আমার ক্যারিয়ারে কখনো ডিভোর্স কেস নিইনি, আর নেবও না। আমার হাতে এসবের জন্য সময় নেই। তাছাড়া, আমি এখানে সমাজসেবা করার জন্য বসে নেই। আপনি চাইলে আসতে পারেন। আপনার ইন্টার্নশিপের কোনো দরকার আমার নেই। আপনি অন্য কোনো ল'ইয়ার খুঁজে নিন। ঢাকায় ডিভোর্স স্পেশালিস্টের অভাব নেই।"

রোদসী চেয়ার ছেড়ে উঠল না। তার চেহারায় হতাশার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। সে ব্যাগ হাতড়ে সাবলীল ভঙ্গিতে একটা নীল ফাইল শেহজাদের টেবিলে এগিয়ে দিল। অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় বলল, "স্যার, আমি জানি আপনার হাতে এখন মির্জা কামরুল হাসানের মার্ডার কেসটা আছে। আপনি হয়তোবা বিগত বেশ কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুমাননি।”

শেহজাদ ডান দিকের ভুরুটা সামান্য উঁচিয়ে জানতে চাইল, “আর তাই আমার বাড়তি ঝামেলা হিসেবে আপনার কেসটাও নিয়ে নেওয়া উচিত, তাই তো?”

রোদসী ভড়কাল না। নিজের মতো করে বলল, “আপনার চোখ লাল, কোটরের নিচ দিকে কালি জমছে। ডেস্কের ডানদিকের অ্যাশট্রেতে এগারোটা সিগারেটের টুকরো প্রমাণ করছে আপনি প্রচণ্ড স্ট্রেসের ভেতর আছেন। শুধু তাই নয়, আপনি অকারণ ডান হাত দিয়ে বারবার কপাল ঘষছেন, এটা মানুষ শুধু তখনই করে যখন সে কোনো কারণে প্রশ্নজটে পুরোপুরি ডুবে যায়। যার পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায়, আপনার এখন এমন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার যে আপনার হয়ে এভিডেন্সগুলো ক্রস-চেক করে আপনার কাজের ভার কমাবে। আপনি ইতিমধ্যেই অজানা কারণে আগের তেরোজন ইন্টার্নকে বাদ দিয়েছেন। অর্থাৎ আপনার হাতে এখন আমার শর্ত মানা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অপশনও নেই, মিস্টার মূর্তজা।”

শেহজাদের কপালের রেখা মিলিয়ে গেল। মেয়েটার অবজারভেশন ক্ষমতা সাংঘাতিক। শেহজাদ নিজেও একজন চমৎকার অবজার্ভার, তবে এই মেয়ে এতো কম সময়ে তাকেই এভাবে অবজার্ভ করে ফেলবে তা সে কল্পনাও করেনি।

রোদসী আবার বলতে শুরু করেছে, "আমি আপনাকে আপনার হাই-প্রোফাইল ক্রিমিনাল কেসে সাহায্য করবো। দিন-রাত খাটবো। মির্জা কামরুলের কেসের এমন কিছু ফাঁকফোকর আমি আপনাকে বের করে দেব, যা পুলিশও এখনো টের পায়নি। বিনিময়ে আমি শুধু চাই, আপনি আমার এই ডিভোর্স কেসটায় লড়বেন। এটা একটা বার্টার সিস্টেমের মতো ভাবতে পারেন স্যার। আপনি আমাকে সময় দেবেন, আমি আপনাকে সময় দেব। আপনি আমার ড্রিম পূরণ করবেন, আমি আপনার কেস সলভ করতে সাহায্য করব।"

শেহজাদ মূর্তজা জীবনে অনেক অদ্ভুত মানুষের পাল্লায় পড়েছে, কিন্তু এমন লজিক্যাল এবং জেদি মানুষের পাল্লায় খুব কমই পড়েছে। যুক্তির দিক থেকে মেয়েটা তাকে চারদিক থেকে আটকে ফেলছে। শেহজাদ বুঝতে পারছে, এই মুহূর্তে তার সত্যিই রোদসীর মতো একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অ্যাসিস্ট্যান্ট খুব প্রয়োজন। যে পুলিশ ফাইলের স্তূপ থেকে ছোট ছোট ভুল বের করে আনতে পারবে। তা ছাড়া, রোদসী যে ডিভোর্স কেসটার কথা বলছে, সেটা এমন কী আর কঠিন কাজ হবে? বড়জোর দু-তিনটে হেয়ারিং। ফ্যামিলি কোর্টে একটু দৌড়াদৌড়ি। রোদসী নিজেই হয়তো পেপারওয়ার্কগুলো করে রাখবে, শেহজাদ শুধু কোর্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলবে। এর বেশি তো কিছু নয়!

শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রয়োজনের তাগিদ মানুষকে দিয়ে অনেক কিছুই করায়। আজ থেকে বছর কয়েক আগে হলে সে হয়তো মেয়েটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। কিন্তু এখন সে পরিণত। সে জানে কখন কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয়। মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত তৈরি করে সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে একবার তাকাল। সাধারণ একটা নীল রঙের ফাইল। উপরে কালো মার্কার দিয়ে কিছু একটা লেখা।

শেহজাদ রোদসীর দিকে তাকিয়ে বলল, "ঠিক আছে। আমি আপনার শর্তে রাজি। আপনি আজ থেকেই জয়েন করছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, মির্জা কামরুলের কেসে আপনার কোনো ভুল আমি বরদাশত করব না।"

রোদসীর মুখে অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ফাইলটা শেহজাদের দিকে আরেকটু এগিয়ে দিয়ে বলল, "থ্যাংক ইউ, স্যার। আমার কোনো কাজে আপনি খুঁত ধরতে পারবেন না, এই গ্যারান্টি আমি আজই আপনাকে দিচ্ছি। ফাইলের ভেতর ক্লায়েন্টের ডিটেইলস দেওয়া আছে। আপনি একটু পড়ে দেখতে পারেন।"

শেহজাদ হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিল। ফিতা খুলে ফাইলের প্রথম পৃষ্ঠাটা উল্টালো। বাইরে ততক্ষণে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে, বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছে কাঁচের জানালায়। শেহজাদ ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা নামটা দেখল। একবার নয়, পর পর তিনবার পড়ল সে নামটা। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে আস্তে করে ফাইলটা বন্ধ করল। তারপর চশমা খানিকটা ঠিক করে আশ্চর্য গলায় প্রশ্ন করল—

"মিস রোদসী, ফাইলে ক্লায়েন্টের জায়গায় আপনি কি ভুল করে নিজের নাম লিখেছেন? নাকি এটা আপনারই কেস? আপনি কি তবে আপনার নিজের ডিভোর্স কেস আমাকে দিয়ে লড়াতে চান?"

চলবে…

#তবুও_জোছনা_নামে

#বর্ণপ্রিয়া

#পর্ব_১

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন