ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 2

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২

শেহজাদের প্রশ্নবাণে চেম্বারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরাটির আবহাওয়া আরেকটু ভারী হয়ে উঠলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে রোদসীর বিন্দুমাত্র ভাবান্তর হলো না। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার চশমার ফ্রেমটা তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে নিল। খুব শান্ত গলায় বলল,

"আপনি বোধহয় ভুল দেখছেন, স্যার। আমি পিটিশনার হিসেবে আমার নাম দিয়েছি, কেসটা আমার নয়। ডিভোর্সটা আমার বাবা-মায়ের। আমি চাই তারা আলাদা হয়ে যাক। লিগ্যালি।"

শেহজাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার মনে হলো, আজ তার সাথে সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। সেসবের চাপে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো হয়তো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সদ্য ল' পাশ করা মেয়ে হঠাৎ তার নিজের বাবা-মায়ের ডিভোর্স চাইছে কেন? আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সন্তান হলো বাবা-মায়ের ভাঙা সংসারের জোড়াতালি। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ সন্তানের দোহাই দেয়। আর এই মেয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই সংসার ভাঙতে চাইছে! ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

শেহজাদ ফাইলটা আরেকবার খুলল। হ্যাঁ, রোদসী ঠিকই বলেছে। ক্লায়েন্টের নামের জায়গায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা— জামিল ব্যাপারী এবং রুমানা খাতুন। ঠিক তার নিচেই পিটিশনার হিসেবে রুবাইয়াত রোদসীর নাম জ্বলজ্বল করছে।

"আপনি আপনার বাবা-মায়ের ডিভোর্স চাইছেন?" শেহজাদের গলা দিয়ে অস্ফুটে প্রশ্ন বের হলো। তার আশ্চর্য এখনো কমেনি।

"জি।"

"কেন? উনাদের মধ্যে কী সমস্যা?"

রোদসী এবার ভনিতা ছেড়ে সরাসরি শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যা শেহজাদের মতো তুখোড় আইনজীবীর বুকেও মৃদু কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। নিস্পৃহ গলায় বলল,

"সেটা আমি এখনই আপনাকে বলতে পারছি না, স্যার। যখন সময় আসবে, তখন আপনা থেকেই আপনি সবটা জানতে পারবেন। আপাতত আপনার কাজ হলো, পেপারস স্টাডি করা এবং কেসটা কোর্টে তোলা।"

শেহজাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বত্রিশ বছরের এই তরুণ বিগত বছরগুলোতে কোর্টের বারান্দায় বহু কিছু দেখেছে। কিন্তু এর আগে সে কখনোই এমন অদ্ভুত কন্যার মুখোমুখি হয়নি। মাত্র পাঁচ বছরের প্র্যাকটিসিং ক্যারিয়ার তার। এই পাঁচ বছরে সে প্রায় দেড়শোটি বড় বড় ক্রিমিনাল কেস লড়েছে, এবং সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এর সব-কটিতেই সে জিতেছে। তার সাকসেস রেট এখনো অবধি শতভাগ। এই জন্য জুনিয়র উকিলরা আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে কানাঘুষা করে। অনেকেই তাকে ক্রিমিনাল ল'য়ের জাদুকর বলে, অনেকে বা চরম অহংকারী। সে যে অহংকারী নয়, সে কথাও পুরোপুরি সত্য নয়।

অল্প বয়সে সফল হওয়া মানুষের মনে অহংকার জন্মানোটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যতোটা রটেছে, ততোটাও অহংবোধ জন্মায়নি। এইতো গত সপ্তাহে কেউ একটা ফেক ফটোকার্ড বানিয়েছে তার নামে। মজার বিষয় হলো, ঘন্টা দুয়েকের মাঝেই তা দেদারসে শেয়ার হয়েছে। টিম মেম্বাররা খেয়াল না করলে হয়তো এই ফটোকাড়ড নিয়ে আরও জলঘোলা হতো। সেখানে শেহজাদের ছবির সাথে মোটা কালিতে লেখা ছিল,

“আপনি দোষী না নির্দোষ, সেই হিসেব কষার সময় আমার নেই। আমি শুধু জানি, কেসটা আমাকে জিততে হবে।

আপনার পাপপূণ্যের হিসেব নিয়ে বসার মতো অফুরন্ত সময় আমার নেই, সেসব পরপারে হবে। এই পারে আমার সাথে শুধু এবং শুধুমাত্র জয়ের সম্পর্ক। এন্ড দ্যাটস ইট!”

যারপরনাই ভুয়া কথা। এমন কোনো কথা সে কখনোই বলেনি। মির্জা কামরুল হাসানের কেসটিকে সামনে রেখে ইচ্ছে করে এই তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের নামে মির্জা সাহেবের দারোয়ান আলীকে গ্রেফতার করেছে। ভদ্রলোকের একটি প্রতিবন্ধী পুত্র সন্তান আছেন, বউ মারা গেছে পুত্রটিকে জন্ম দিতে গিয়েই। দু’বেলা দুমুঠো খেয়েই তার জীবন চলছে। সেখানে এতো বড় শিল্পপতীকে দূর্বল শরীর নিয়ে এতোবার জখম করে মে’রে ফেলার কোনো শক্তপোক্ত কারণও নেই। তবু মিডিয়ায় একটা কিছু বলার জন্যই পুলিশ প্রাথমিকভাবে তার গায়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে। এসবের মাঝে বিপক্ষ দলীয় উকিল হিসেবে অ্যাডভোকেট মূর্তজার নাম উঠে আসায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াচ্ছে নানা রকমের জল্পনা কল্পনা। তারই প্রেক্ষিতে এই ভুয়া ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে যায়। বলা হয়, আলীর সাথে দেখা করার সময় এমন কথা বলেন অ্যাডভোকেট মূর্তজা। পরে অবশ্য মূর্তজার টিম মেম্বারদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সেই ভুয়া খবরটি সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের ঢাকা শহরের আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে দশতলার এই কর্পোরেট চেম্বারটা নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে। পুরো একদিকের দেয়াল জুড়ে ফ্লোর-টু-সিলিং সাউন্ডপ্রুফ কাঁচ, যেখান দিয়ে শহরের স্কাইলাইন দেখা যায়। বাহিরে থেকে বিল্ডিং টিতে তাকালে বেশ বড় বড় অক্ষরের ‘দ্য থার্ড আই' লেখা দেখতে পাওয়া যায়। ঘরের ভেতরে সেন্ট্রাল এসি, অটোমেটেড ব্লাইন্ডস, আর স্লিক ডিজাইনের মিনিমালিস্টিক ডেস্ক। শেহজাদ কাজের ব্যাপারে প্রচণ্ড খুঁতখুঁতে। আর এই খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্যই এখনো অবধি তার মনমতো কেউ হতে পারেনি।

কিন্তু এই মুহূর্তে সে বুঝতে পারছে, সামনে থাকা মেয়েটিকে তার ভালো লাগছে। ভালো লাগার কারণটাও যৌক্তিক। মেয়েটি কি আগে থেকেই সব খোঁজ খবর নিয়ে তবেই ইন্তাটারভিউ দিতে এসেছিলো? কে জানে? মির্জা সাহেবের কেসটি নিয়ে ওপর মহল থেকে ভালোই চাপ আসছে, সাথে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে মিডিয়া। এসবের চাপে একলা শেহজাদ উন্মাদ হয়ে উঠছে। এখনো অবধি সে কেসটির প্রথম হেয়ারিং এর প্রস্তুতি নিতে পারেনি। তার ওপর আগামী সপ্তাহে শেহজাদের বাবা-মায়ের ৩৫তম বিবাহবার্ষিকী। শেহজাদের বাবা এনায়েত মূর্তজা একজন রিটায়ার্ড জজ। অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ। তিনি চান তার পঁয়ত্রিশ বছরের সফল দাম্পত্য জীবনের উৎসবটা খুব বড় করে হোক। ক্যাটারিং থেকে শুরু করে ভেন্যু বুকিং, ইনভাইটেশন কার্ডের ডিজাইন—সব শেহজাদকে একা হাতে সামলাতে হচ্ছে। এই প্রচণ্ড মেন্টাল এবং ফিজিক্যাল প্রেশারের মধ্যে তার একজন দক্ষ অ্যাসিস্ট্যান্টের অতীব প্রয়োজন। রোদসী কি তার জন্য পার্ফেক্ট কেউ হবে?

শেহজাদ কিছু একটা বলতে চাইল, ঠিক তখনই তার চেম্বারের কাঁচের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। শব্দের তীব্রতায় শেহজাদ চমকে উঠলেও চমকাল না রোদসী। রোদসী ঘাড় নামিয়ে কিছুটা স্পেস দিতে চাইলো। তার কি এখন বেরিয়ে যাওয়া উচিত? পারমিশন না নিয়েই এমন হুড়মুড় করে চেম্বারে ঢোকা ব্যক্তিটির প্রাইভেসির খাতিরে তার হয়তো চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু হিসেবমতে, সে এখানকার এমপ্লয়ি। সেই দিক বিবেচনায়, ক্লায়েন্টের প্রাইভেসি তার জন্য নষ্ট হবে না।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশালদেহী মানুষ। বয়স ষাটের কাছাকাছি, গায়ের রং তামাটে, পরনে দামি কালো স্যুট। লোকটার চোখদুটো ভালো রকমের লাল। তিনি এমনভাবে হাঁপাচ্ছেন যেন এইমাত্র কোনো ম্যারাথন দৌড় শেষ করে এসেছেন। লোকটার নাম হাজি মোতালেব। সে কি কোনো এক সময়ে হজ করে এসে তার নামের সাথে হাজি শব্দ জুড়েছেন? নাকি নিজেকে ধার্মিক মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে এমন নাম, তা অবশ্য কেউ জানে না। শেহজাদের চেম্বারটা যে দশতলা কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে, মোতালেব সাহেব সেই পুরো বিল্ডিংয়ের মালিক। অত্যন্ত বদমেজাজি মানুষ হিসেবে এলাকায় তার দুর্নাম আছে। শেহজাদ সচারাচর তার সঙ্গ এড়িয়ে চলে। আজ হঠাৎ তার এমন আগমনে শেহজাদকে খানিকটা অপ্রস্তুত হতে দেখা গেলো। তার ইতস্তত ভাব আরো বাড়াতে তিনি দুম করেই বলে বসলেন,

"শেহজাদ! তোমাকে এখনই আমার সাথে একটু থানায় যেতে হবে!"

শেহজাদ ভুরু কুঁচকে সোজা হয়ে বসল। কৌতুহলী গলায় জানতে চাইল,

"থানায়? ইজ দেয়ার এনিথিং রং?”

মোতালেব সাহেব রোদসীর পাশের আচমকাই চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন। তাকে দেখে মনে হলো, রোদসী কোনো অদৃশ্য জীব, তাকে সে একদমই দেখতে পাচ্ছেন না। তাইতো নিজের সমস্যায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। বললেন,

"আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে, শেহজাদ। আমার ছোট ছেলেটা, বাবু...”

এতোটুকু বলেই তিনি থামলেন। অনুমতির তোয়াক্কা না করেই শেহজাদের সামনে থেকে ঢেকে রাখা গ্লাসের সমস্ত পানি ঢকঢক করে গিললেন। এতোক্ষণ তিনি উত্তেজনায় ঠিক করে কথা বলতে পারছিলেন না। পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে, কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললেন,

“ইয়ে মানে, ওরা কাল রাতে বন্ধুরা মিলে একটু মজা করছিল। বোঝোই তো! এই বয়সে মজা করবে না তো কখন করবে বলো?”

কথাটা বলেই তিনি তীর্যক দৃষ্টিতে রোদসীর দিকে চাইলেন। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে রোদসী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। শেহজাদের চেয়ারের দিকে কয়েক পা এগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। শক্ত গলায় বলল,

“ আমি স্যারের নতুন এসিস্ট্যান্ট।”

মোতালেব সাহেব এমন ভাবে হাত নাড়লেন, মনে হলো, রোদসী যেই হোক না কেন, তাতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অথচ এই মাত্র তিনি বড্ড কুৎসিত ইঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়েছিলেন।

"আসার পথে অন্ধকারে বুঝতে পারেনি। কীভাবে যেন গুলশান অ্যাভিনিউতে পুলিশের চেকপোস্ট ভেঙে আইল্যান্ডের সাথে গাড়ি লাগিয়ে দিয়েছে। সাথে সাথেই কতগুলো পুলিশ এসে বাবুকে ধরে নিয়ে গেছে। রাতারাতি ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ কেস দিয়ে চালান করে দিচ্ছে। তুমি একটু সামলাও ব্যাপারটা।”

শেহজাদের মনে হলো তার মাথার রগগুলো ছিঁড়ে যাবে। একে তো গত কয়েকদিনের মেন্টাল প্রেশার, মির্জা কামরুলের কেস, বাবা-মায়ের অ্যানিভার্সারির টেনশন, তার ওপর রোদসীর এই অদ্ভুত ডিভোর্স কেস। এখন ঠিক একই সময়ে আরেকটা জঞ্জাল এসে হাজির! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,

"মোতালেব সাহেব, আমি খুব দুঃখিত। আপনার দুর্দিনে আমি আপনাকে সহায়তা করতে পারছি না। এই কেসটা আমি নিতে পারছি না। আপনি কাইন্ডলি অন্য কোনো উকিল দেখুন।"

মোতালেব সাহেব যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।

"কী বলছো তুমি এসব! অন্য উকিল দেখব মানে? আমার ছেলে হাজতে বসে আছে, আর তুমি বলছো অন্য উকিল দেখতে? মশকরা করো আমার সাথে? কাজে না আসলে তোমার মতো লোকরে ভাড়া দেওয়ার লাভ কী? টাকা পয়সা দিব না তা তো বলিনি। যা চাইবা তাই দিবো। লাখ খানেক লাগলেও, না করব না। কিন্তু একবার ছেলেটার নামে কেস হয়ে গেলে, ওর ফিউচারটা শেষ হয়ে যাবে। বুঝতে পারছো তুমি?”

এবার শেহজাদের গলার স্বর এবার একটু চড়ল, "আপনি একটু ঠান্ডা হোন। বোঝার চেষ্টা করুন, আমার হাতে আসলে সময় নেই। সময় থাকলে টাকাটা কোনো ইস্যূ হতো না। সামনেই ফ্যামিলির একটা বড় ফাংশন। তার ওপর অলরেডি কিছু ক্রিটিক্যাল কেস চলছে। এই অসময়ে আপনার ছেলের কেস নেওয়ার মতো সময় কিংবা মানসিক অবস্থা আমার নেই। আ’ম রিয়েলি ভেরী সরি, আপনি এবার আসতে পারেন।"

কথাটা শোনার সাথে সাথে মোতালেব সাহেব পাগলের মতো আচরণ শুরু করলেন। একটিমাত্র ‘না’ শব্দে তার ভেতরের পাষবিক রূপটা বোধহয় বেরিয়ে এল। তিনি সজোরে ডেস্ক চাপড়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন,

"কী বললে? কী বললে তুমি আমায়? আসতে পারি? এই বিল্ডিংয়ের মালিক আমি, আর তুমি আমাকে আমার বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে যেতে বলছো? হাও ডেয়ার ইউ!”

শেহজাদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভদ্রতার সহিত বলল,

“ আপনি কিন্তু এবার অকারন সিনক্রিয়েট করছেন।”

"সিনক্রিয়েট করছি আমি? আমি? কে বের করবে আমায়? তুই? তুই আমাকে বের করবি?" মোতালেব সাহেব এবার তুই-তোকারিতে নেমে এলেন। অতিরিক্ত রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে।

"তোর উকিলগিরি আমি আজই বের করছি! তুই আজই এই অফিস ছাড়বি! প্রয়োজনে আমার কাজে লাগে না। আবার আমার বিল্ডিং এ থেকে আমায় বলে বের হতে। রাস্কেল কোথাকার!"

মোতালেব সাহেব হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গালাগাল শুরু করলেন। তাকে লিমিট ক্রস করতে দেখে শেহজাদ ইন্টারকমে রিসিপশনের সিকিউরিটি ডাকার জন্য বোতাম চাপতে চাইল। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা। মোতালেব সাহেব তার প্রচণ্ড রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে হাতের কাছে থাকা একটা ভারী মেটালিক ডেকোর-পিস তুলে নিলেন এবং চোখমুখ কুঁচকে সজোরে আছড়ে ফেললেন শেহজাদের ডেস্কের পাশের স্লিক কাঁচের সাইড-টেবিলটার ওপর।

বিকট শব্দে টেম্পারড গ্লাসটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল চেম্বারের কার্পেটের ওপর। চেম্বারের শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে একটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। শেহজাদের ধৈর্যের পারদ এবার তরতর করে নেমে গেলো। প্রফেশনালিজম ফেলে সেও মোতালেব সাহেবের কলার চেপে ধরতে উদ্যত হলো। পরিস্থিতির বেগতিক হাল দেখে রোদসী হুট করেই বলে উঠল,

"মোতালেব সাহেব, আপনি কি জানেন অন্যের প্রোপার্টি ড্যামেজ এবং একজন ল'ইয়ারকে তার চেম্বারে এসে ফিজিক্যাল থ্রেট দেওয়ার জন্য পেনাল কোডের ৪২৭ এবং ৫০৬ নম্বর ধারায় আপনার এই মুহূর্তেই জেল হতে পারে? এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আপনার ছেলে যেই সেলে বসে আছে, আপনাকেও ঠিক সেই সেলেই ঢোকানো যেতে পারে। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই খুব চমৎকার হবে, তাই না?"

রোদসী একদৃষ্টে মোতালেব সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে, তার টোপে কাজ হচ্ছে কিনা তা বুঝতে কয়েক পা এগিয়ে এলো সে। মোতালেব সাহেব হঠাৎ একটি অচেনা মেয়ের মুখে এমন আইনি হুমকি শুনে কিছুটা ভড়কে গেলেন। তার রাগের মাত্রাও কিছুটা নিচে নেমে এল। আমতা আমতা করে বললেন,

"আ-আমায় আইনের ভয় দেখাতে চাইছো?”

"জি না," রোদসী ধীর পায়ে মোতালেব সাহেবের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটি তার টোপ গিলে নিয়েছে, তাকে পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সহজ গলায় বলল, "আমি আপনাকে সাবধান করছি। আপনি রাগ দেখাচ্ছেন কারণ আপনি ভয় পেয়েছেন। আপনি হয়তো জেনে গেছেন, আপনার ছেলেকে আজ দুপুরের মধ্যেই কোর্টে চালান করে দেওয়া হতে পারে। যদি এমন হয়, তাহলে সে নির্ঘাত রিমান্ডে যাবে। পুলিশের বেধরক মার খেয়ে ঘটনা সত্য হোক বা মিথ্যা দায় তাকে স্বীকার করতেই হবে। তাই আপনি মরিয়া হয়ে উকিল খুঁজছেন। এই অবধি সব ঠিক আছে। কিন্তু নিজ স্বার্থে রাগের বশবর্তী এখন যা করছেন, তা ভুল। এতে আপনার ছেলের তো কোনো লাভ হবেই না, বরং আপনি নিজেও বিপদ পড়বেন।”

রোদসী শেহজাদের অনুমতি না নিয়েই হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, বলল, "আপনার ছেলের ফাস্ট ইনফরমেশন রিপোর্টের কপিটা আমাকে দিন। আগে কেসটা নেওয়ার মতো কিনা তা আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে।"

ততোক্ষণে রোদসীর কথার জালে মোতালেব সাহেব পুরোপুরি ধরাশায়ী। তিনি যন্ত্রের মতো হাতের কাগজগুলো এগিয়ে দিলেন। ইতিপূর্বের ঘটনার রেশ এখনো তার মাঝে বিদ্যমান। থেমে থেমেই তিনি বড় বড় শ্বাস ফেলছেন। উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছেন সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে।

কাগজপত্র নেড়েচেড়ে রোদসী আচমকাই একটি বোম ফাটালো। বলল,

“আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা আপনার ছেলের কেসটি নিচ্ছি এবং সেই সাথেই আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি, আগামীকাল সকালের সূর্য ওঠার আগেই এই কেস সলভ হয়ে যাবে।”

ব্যস্ত হাতে কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চরম দুঃসাহস নিয়ে সে তার বাকি কথা শেষ করল,

“আপনি এখন আসতে পারেন। কাল সকাল সকাল ছেলে বাড়ি ফিরবে, ভালোমন্দ রাঁধার আয়োজন করুন। আর হ্যাঁ, যাওয়ার সময় রিসিপশনে বলে যাবেন, এই কাঁচের টেবিলের দামটা যেন আগামী মাসের ভাড়ার সাথে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া হয়।"

মোতালেব সাহেব দ্বিরুক্তি করলেন না। এলোমেলো পা ফেলে কয়েক পা এগিয়ে আবার ফেরত এলেন। হাত বাড়িয়ে জোর করে একটা হ্যান্ডশেক করলেন শেহজাদের সাথে। অত্যন্ত নিচু গলায় জড়তা নিয়েই বললেন, “সরি শেহজাদ। ছোট ছেলেটা অনেক আদরের তো। তাই একটু বেশি রিয়েক্ট করে ফেলেছি। কিছু মনে করো না।”

তিনি চলে যাওয়ার পরেও শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে একভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। সে এখনো অবাক হয়ে রোদসীর দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা কী চমৎকারভাবে একটা আউট-অফ-কন্ট্রোল সিচুয়েশনকে এক নিমিষে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল! কিন্তু এসবের মাঝে সে তার অনুমতির তোয়াক্কা না করেই একটি কেস নিয়ে ফেলেছে। এভাবে কেস নেওয়া ছাড়াও এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেতো। একটু জলঘোলা হলে হতো, শুধু শুধু একটা বাড়তি কেসের প্রেশার এ্যাট লিস্ট এড হতো না। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে কিছু বলতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। বড় করে শ্বাস ফেলে সে চেয়ারে বসল। বাঁ হাতে ঘাড় মালিশ করে হয়তোবা রাগটুকু হজম করার চেষ্টা চালাল। তার দুশ্চিন্তা কমাতে এগিয়ে এলো রোদসী। টেবিলে থাকা এগ্রিমেন্ট পেপারে সিগনেচার করে সাবলীল গলায় বললো,

“পরিস্থিতির চাপে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর জন্য প্রথম দিনই ইন্টার্নশিপ বাতিল হয়েছে শুনলেও খুব একটা অবাক হবো না। তবে রিকুয়েষ্ট থাকবে টারমিনেশন লেটারটা আগামীকাল সকাল ন'টায় রেডি করবেন। তাহলে কেস ডিসমিস হওয়ার আনন্দে সেই লেটারটি অকার্যকর হওয়ার চান্সও কিছুটা বাড়বে।”

শেহজাদ হতভম্ব হলো। কিছু বলতে চাইল, তার আগেই রোদসী কয়েক পা এগিয়ে দূরত্ব ঘোঁচালো। আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,

“ট্রাস্ট মি! এই কেসটা আগামীকাল সকালে আপনার ঘুম ভাঙার আগেই সলভ হয়ে যাবে।”

____

বাইরের আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার। শেহজাদ চেম্বারে এসে দেখল রোদসী আগে থেকেই বসে আছে। তার চোখের নিচে হালকা কালি, বোঝা যাচ্ছে সারা রাত সে ঘুমায়নি। এতে শেহজাদের অবশ্য কিছু করার নেই। সে নিজে থেকেই গতকাল ঝামেলা কাঁধে নিয়েছে। এখন এই ঝামেলায় আটকে দিনরাত পস্তালেও শেহজাদের কিছুই যায় আসে না। গতকাল রোদসী তাকে জবাব দেওয়ার সুযোগও দেয়নি। মোতালেব সাহেবের দেওয়া কাগজ হাতে ছুটে গেছে কোথাও। এরপর আর অফিসেও আসেনি, যোগাযোগও করেনি। ব্যাপারটিতে তার এই ‘সব পারব’ মনোভাব শেহজাদের মোটেও পছন্দ হয়নি। শেহজাদ চেয়ার বসতেই রোদসী একটা ফাইল এগিয়ে বলে উঠল,

"গুড মর্নিং, স্যার! মোতালেব সাহেবের ছোট ছেলে এখন তার বাসায় ঘুমাচ্ছে। এ্যাজ আই সেইড, কেস ডিসমিসড।"

শেহজাদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে রোদসীর দিকে তাকাল। বলল,

"হোয়াট? ডিসমিসড?”

শেহজাদ পিঠ সোজা করে এগিয়ে বসল। তার চোখেমুখে অবিশ্বাস। বোকার মতো জানতে চাইল,

“ হাউ ইজ দ্যাট ইভেন পসিবল? স্পট অ্যারেস্ট, পজিটিভ অ্যালকোহল টেস্ট... পুলিশ ছাড়ল কীভাবে?"

রোদসী খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, "তেমন কোনো ম্যাজিক করিনি স্যার। জাস্ট টেকনিক্যাল ফল্টের সুযোগ নিয়েছি।”

“ টেকনিক্যাল ফল্ট? ব্রেথলাইজারে ফল্ট আছে তা আপনি জানলেন কী করে? আর প্রমাণ?”

“ আমি পুলিশের করা ব্রেথলাইজার টেস্টের মেশিনের সিরিয়াল নাম্বারটা চেক করেছি, স্যার। ওটা ছিল 'Alco-Sensor IV' পুরোনো মডেল। এই মডেলের একটা টেকনিক্যাল ফল্ট আছে। কেউ যদি ডায়াবেটিসের পেশেন্ট হয় এবং তার শরীরে কিটোন লেভেল হাই থাকে (Diabetic Ketoacidosis), তাহলে ওই মেশিন অ্যালকোহল না খেলেও পজিটিভ রিডিং দেয়।”

“ বাবুর ডায়বেটিস আছে?”

“ জি, আমি গত রাতে মোতালেব সাহেবের ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছ থেকে বাবুর পুরোনো মেডিকেল হিস্ট্রিটা বের করেছি। তার টাইপ-১ ডায়াবেটিক। পুলিশকে মেডিকেল রিপোর্ট হস্তান্তর করে বলেছি, তারা যদি এই মেশিনের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চার্জশিট দেয়, তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ফলস অ্যারেস্ট এবং মেডিকেল নেগ্লিজেন্সের কাউন্টার স্যু করব। ব্যস, সকালের মধ্যেই কেস ডিসমিসড।"

শেহজাদ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা সদ্য পাস করা মেয়ের মাথায় এতো নিখুঁতভাবে লুপহোল বের করার বুদ্ধি এল কীভাবে তা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। শেহজাদ কাজের চাপে গতকাল এই কেসটি নেওয়ার কথা কল্পনাও করেনি। মেয়েটি একপলক কাগজপত্র দেখে এতো বড় প্ল্যান কী করে সাজালো? সত্যি সত্যি এক রাতের মধ্যে পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে আইনি মারপ্যাঁচে বোকা বানিয়ে দিলো! ইম্প্রেসিভ!

রোদসী খুলে রাখা ল্যাপটপটা বন্ধ করে শেহজাদের দিকে তাকাল।

"আমি আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছি স্যার। আপনার ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ কেস আদালতে ওঠার আগেই ক্লোসড। এবার আমার বাবা-মায়ের ডিভোর্সের পিটিশনটা সাইন করার পালা। আজ বিকেলের মধ্যেই আমি এটা কোর্টে সাবমিট করতে চাই।"

শেহজাদ দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ পেল না। মেয়েটা তার কথা রেখেছে। এবার তার হয়ে কেস লড়াটা শেহজাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

___

ঢাকা ফ্যামিলি কোর্টের জায়গাটা শেহজাদের কাছে একেবারে অচেনা আর চরম অস্বস্তিকর। ক্রিমিনাল কোর্টের সেই পিনপতন নীরবতা, যুক্তিতর্ক আর গাম্ভীর্যতা এখানে নেই। চারদিকে মানুষের জটলা, ঘামের গন্ধ, সস্তা পারফিউমের উগ্র সুবাস। কান্নাকাটি, চিৎকার-চেঁচামেচি, উকিল আর দালালদের এলোপাথাড়ি দৌড়াদৌড়িতে চারিদিক অস্থির হয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দিকে নোংরা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করছে, আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাচ্চাগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্কগুলো এখানে এসে কেমন নোংরা আর বীভৎস রূপ ধারণ করে! শেহজাদের খুব দমবন্ধ লাগছে। তার গায়ে দামি কালো কোট, চোখে রোদচশমা। সে দাঁড়িয়ে আছে ৩ নম্বর এজলাসের বাইরে। তার পাশে শিরদাঁড়া একদম সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে রোদসী। তার দৃষ্টি স্থির।

একটু পরেই রোদসীর বাবা কোর্টে এসে পৌঁছাল। শেহজাদ দূর থেকেই তাদের খেয়াল করল। রোদসীর বাবা, জামিল ব্যাপারী। লোকটাকে দেখে শেহজাদ প্রথম দর্শনেই কিছুটা ধাক্কা খেল। অত্যন্ত সুদর্শন এবং মার্জিত চেহারার একজন মানুষ। মাথায় কাঁচাপাকা চুলগুলো খুব পরিপাটি করে আঁচড়ানো, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, পরনে দামি ব্র্যান্ডের শার্ট আর পারফেক্টলি আয়রন করা প্যান্ট। তার হাঁটার ভঙ্গিতেও একধরণের আভিজাত্য আছে। তাকে দেখে মনে হয় সমাজের খুব উঁচুতলার একজন শিক্ষিত এবং আদর্শ স্বামী।

রোদসীর মা রোদসীর সাথেই কোর্টে এসেছেন। ভদ্রমহিলাকে দেখেই শেহজাদ চমকে উঠেছিল। মহিলার বয়স খুব বেশি হলে পঞ্চাশ হবে, কিন্তু চেহারায় একটা অদ্ভুত জীর্ণতা। তার চেয়েও বড় কথা, তার চোখেমুখে একটা সার্বক্ষণিক, প্রাণঘা’তী আতঙ্ক খেলা করছে। তিনি বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, যেন তাকে কেউ তাড়া করেছে। শাড়ির আঁচলটা ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বারবার হাত দুটো কচলাচ্ছিলেন। এখন তাকে জোর করে সামনের বেঞ্চিতে বসানো হয়েছে। এই ডিভোর্স কেসটির মূল কারণ হয়তোবা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স-ই হবে।

জামিল ব্যাপারী খুব আত্মবিশ্বাসী পায়ে হেঁটে শেহজাদ আর রোদসীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। অবাক করা ব্যাপার হলো তিনি শেহজাদকে দেখে মোটেও ঘাবড়ালেন না। অমায়িক হেসে বললেন,

"আপনি নিশ্চয়ই অ্যাডভোকেট মূর্তজা? আপনার কথা অনেক শুনেছি। লোকে বলে, খুব নামকরা উকিল আপনি। পেপারেও অবশ্য দুদিন পরপর আপনার ছবি আসে, তরুণ বয়সেই বেশ হাই প্রোফাইল কেস হাতে পাচ্ছেন। মানতে হবে, সোনায় বাঁধানো কপাল নিয়ে জন্মেছেন।"

একটু থেমেই বললেন, "কিন্তু, আমি যতদূর জানি, আপনি তো ক্রিমিনাল ল'ইয়ার, হঠাৎ এই ফ্যামিলি কোর্টের মতো জঞ্জালে আসতে গেলেন কেনো?”

শেহজাদ কিছু বলার আগেই রোদসী ঠান্ডা গলায় বলল,

"উনাকে আমি এনেছি। আপনাদের ডিভোর্সের পিটিশন উনিই রেডি করেছেন এবং উনিই এই কেস লড়বেন।"

জামিল ব্যাপারী এবার মেয়ের দিকে তাকালেন। তার মুখের সেই অমায়িক হাসিটা এক সেকেন্ডের জন্যও সরছে না। এই ধরণের হাসির বেশিরভাগই হয় মিথ্যে। তিনিও কি নিজের মিথ্যে একটা মুখোশ তৈরি করছেন? মেয়ের থেকে চোখ সরিয়ে তিনি পুনরায় শেহজাদের দিকে তাকালেন। মিষ্টি গলায় বললেন,

"দেখুন উকিল সাহেব, আমার মেয়েটার মাথায় একটু গন্ডগোল আছে। ছোটবেলা থেকেই ওর মাথায় সমস্যা, সাইকোলজিক্যাল ইস্যু বলতে পারেন।”

“সাইকোলজিক্যাল ইস্যু?”

“ জি, দিনরাত শুধু হ্যালোসিনেশন করে। ওর কথায় কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। এমনিতে আমার স্ত্রীর আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। এই তো, আজ সকালেও সে নিজের হাতে আমার জুতো পালিশ করে দিয়েছে, কাল রাতেও যত্ন করে আমার পা ম্যাসাজ করে দিয়েছে। আসলে বয়স বাড়ছে তো, বাহিরে থেকে দেখতে ফিট লাগলেও ভেতর ভেতর নানা অসুখ। রাত হলেই বাতের ব্যথাটা বাড়ে। সারা রাত একটুও ঘুমাতে পারি না। তখন রুমাও আমার জন্য জেগে থাকে। এককথায় বলতে গেলে, আমরা খুবই সুখী, ছিমছাম একটা পরিবার।”

শেহজাদ কিছু বলছে না। সে ভদ্রলোকের চোখ দুটো পড়ার চেষ্টা করছে। হাসি দিয়ে যেই মুখোশ সে পড়তে চাচ্ছে তা চোখের সামান্য এদিক সেদিকেই খসে পড়বে। আপাতত লোকটিকে বোঝার জন্য তার চোখ পড়ার বিকল্প নেই।

“একটু আগেই জানলাম, কোর্টে আসতে হবে। এসব কেমন পাগলামি বলুন দেখি? মেয়েটা যে কী করে না! যে স্ত্রী তার স্বামীকে এত ভালোবাসে, দিনরাত এতো সেবা করে সে কি কখনো ডিভোর্স দিতে পারে বলুন? এসব কেস টেস আসলে আমার মেয়ের পাগলামি। আপনি খামোখাই এসবে জড়িয়ে সময় নষ্ট করছেন।”

কথাগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে খুব স্বাভাবিক শোনালেও শেহজাদ মূর্তজার চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলো না। একটা মানুষ তার স্ত্রীকে দিয়ে নিজের জুতো পালিশ করাচ্ছে, অথচ কথাটাকে সে ভালোবাসার মোড়কে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন এটা স্ত্রীর পরম ভক্তি! শেহজাদ স্পষ্ট দেখতে পেল, জামিল ব্যাপারী যখন অত্যন্ত মিষ্টি হেসে কথাগুলো বলছিলেন, তখন তার চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে চকচক করছিলো। এই চকচকে ভাব কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের হতে পারে না। ভদ্রলোকের এই মিষ্টি হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর রূপটা সে এক মুহূর্তেই ধরে ফেলেছে। মানুষটা বাইরে থেকে পরিপাটি হলেও ভেতরে ভেতরে সে একটা জল্লাদ। সে রোদসীর দিকে তাকাল। রোদসী সামনে দাঁড়ানো বাবা নামক লোকটিকে মন দিয়ে দেখছে। কী এতো দেখছে সে? এতোগুলো বছর পরেও কি তার নতুন কিছু দেখা বাকি আছে?

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন