ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 25

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২৫

সবকিছু এতো দ্রুত ঘটলো যে শেহজাদ ঠিক করে কিছুই বুঝে ওঠার সময় পেলো না। মেয়েটা হুট করেই পাগলের মতো চিৎকার করতে শুরু করে, খানিকক্ষণ পর দু হাতে কপালের দু'পাশ আর চোখদুটো ঢেকে ফেলে। শেহজাদের গাড়ি ততক্ষণে বাড়ির সামনে চলে এসেছে। তন্ময় হতভম্ব হয়ে বসে আছে। সেও বুঝতে পারছে না কী করবে। শেহজাদ সময় নিয়ে শীতল গলায় জানতে চাইলো,

“আগে এমন মাথা যন্ত্রণা উঠলে কী করতেন?”

রোদসী জবাব দিলো না। চোখমুখ কুঁচকে ম'রার মতো পড়ে রইলো। শেহজাদ ভড়কে গেলো। একটু সময় নিয়ে আবার ডাকলো তাকে। এবারো জবাব এলো না। সিটের সাথে এলিয়ে রাখা মাথাটা একটু একটু করে একপাশে হেলে পড়েছে। চোখ ঢেকে রাখা হাতটাও হুট করে দুর্বল হয়ে কোলের কাছে পড়লো। শেহজাদের মনে হলো, মেয়েটা জ্ঞান হারিয়েছে। কী সর্বনাশ! মাথাব্যথায় জ্ঞান হারানো! এটা স্বাভাবিক নাকি? এখন কি তাকে হাসপাতালে নেওয়া উচিত? নাকি বাড়ি গিয়ে আগে জ্ঞান ফেরানো উচিত? শেহজাদ জিজ্ঞাসু নয়নে তন্ময়ের দিকে তাকালো। যেন জানতে চাইলো, কী করা যায়? তন্ময় কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে বললো, “আন্টিকে কল করি?”

শেহজাদ হ্যাঁ, না কিছুই বললো না। তন্ময় ফরিদা বেগমকে কল করে নিচে ডাকলেন। তিনিই রোদসীকে ধরে কোনোমতে লিফট অবধি নিলেন। লিফটে তার দেহ লুটিয়ে পড়তে চাইলো। তাকে সামলাতে ফরিদা বেগমের ভালোই কষ্ট হলো। রোদসীর জ্ঞান একেবারেই নেই, ব্যাপারটা এমন নয়। সে টুকটাক হাঁটার চেষ্টা করছে। কিন্তু অজানা কারণে তার দেহ অসাড় হয়ে আসছে। একটু পর পর-ই সে দেহের সমস্ত ভার ছেড়ে পড়ে যেতে নেয়। ঘর অবধি নিয়ে রোদসীকে তিনি কোনোমতে শুইয়ে দিলেন। শেহজাদ কিছুক্ষণ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় সেদিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর তন্ময়কে ডাক্তার ডাকতে বলে নিজের ঘরের দিকে গেলো।

____

শেহজাদ কিছুতেই ধাতস্থ হতে পারছে না। তার কি একবার গেস্ট রুমে যাওয়া উচিত? ওদিকে কী হচ্ছে? ডক্টর সেই কখন ঢুকলেন, এখনো বের হলেন না কেন? এদিকে তাকেও স্যালাইন লাগাতে হবে, তন্ময় যাওয়ার পথে ডক্টরকে স্যালাইনটা সেট করে দিয়ে যেতে বলেছেন। এটা লাগালে আর ওই ঘরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে? না তো। শেহজাদ চোখেমুখে পানি দিয়ে বের হলো। তার টেবিলের ওপর রোদসীর চশমাটা রাখা আছে। মেয়েটার হাত ছুটে গাড়িতেই এটা পড়ে ছিলো। এটা ফেরত দেওয়ার অজুহাতে একবার ওই ঘরে গেলে কি খারাপ দেখাবে? সে তো শুধু দায়িত্ব থেকে চশমাটা পৌঁছে দেবে। এতে নিশ্চয়ই খারাপ লাগার কিছু নেই? অনেক ভেবে শেহজাদ এই সুযোগটি কাজে লাগালো। চোখমুখে পানি নিয়েই লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটলো গেস্ট রুমের দিকে। ঘরের কাছে যেতেই ডাক্তারের কথা শোনা গেল,

“আশা করছি, ঘন্টাখানেকের মাঝেই প্রেশার নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবুও না কমলে হসপিটালে এডমিট করতে হবে। আর হ্যাঁ, কয়েকদিন খাবারে লবণটা একটু এড়াতে হবে। প্রেশার কিন্তু ভয়ানক বেড়েছে।”

শেহজাদ ভেতরে ঢুকলো ডক্টর বের হওয়ার পর। হাতের চশমাটাকে ছুতো করে ইতস্তত গলায় জানতে চাইলো,

“কী হয়েছে?”

ফরিদা বেগম রোদসীর মাথার কাছে বসা। চাপা গলায় ধমকে উঠলেন তিনি, মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন,

“কাজের চাপে রেখে মেয়েটার প্রেশার বাড়িয়ে দিয়েছিস, এখন আবার জানতে চাচ্ছিস কী হয়েছে?”

শেহজাদ এবার সত্যি ভীষণ বিব্রত বোধ করলো। কেসের চাপে প্রেশার বেড়ে এমন কিছু হবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পরক্ষণেই মনে পড়লো, এই কেসটি শেহজাদ নেয়নি। রোদসী নিজে থেকে নিয়েছে। ব্যাপারটা মনে পড়তেই জোর গলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে চাইলো সে। শেষে কী একটা ভেবে সত্যটা বললো না। বাঁ হাত মুঠো করে শুকনো ঢোক গিলে বললো,

“সরি, বুঝতে পারিনি এমন হবে।”

ফরিদা বেগম এবারো কিছু বলতে চাইলেন। তার আগেই বসার ঘর থেকে তন্ময়ের ডাক পাওয়া গেলো। শেহজাদ বাধ্য হয়ে চশমাটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফিরে গেলো। গিয়ে দেখলো, তাকে স্যালাইন লাগানোর ব্যবস্থা চলছে, শেহজাদ বিরক্ত হলো। একটা স্যালাইন কম দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

___

রাতের খাবারের পর্বটা আজ খুব অনাড়ম্বর কেটেছে। শেহজাদ ভেজ স্যূপ খেয়েছে। তন্ময় আর এনায়েত মূর্তজা একাই টেবিলে বসে খাবার খেয়েছেন। ফরিদা বেগম তাদের সাথে বসেননি। তিনি রোদসীর জন্য জাউ ভাত রেঁধেছেন। রীতিমতো জোর করেই তাকে খাইয়ে দিয়েছেন। নিজে কোন ফাঁকে খেয়েছেন কে জানে? মনে হলো, খেতে হবে বলেই কোনোরকমে খাওয়ার পর্বটা চোকানো হলো।

এদিকে শোবার সময় দেখা গেলো, তন্ময় আজও নিচে বিছানা করেছে। শেহজাদ দু'বার তাকে উপরে উঠে শুতে বলেছে, ছেলেটা কথা শোনেনি। স্যারের সাথে এক বিছানায় ঘুমালে মনে হচ্ছে তার স্যালারি কাটা যাবে। ডক্টর যাবার সময় স্যালাইন লাগিয়ে গিয়েছেন। সেই স্যালাইন এখনো শেহজাদের হাতে স্যালাইন চলছে। সে ঘাড় কাত করে দেখলো আরও অর্ধেকটা স্যালাইন এখনো বাকি। সময় নিয়ে টপটপ একেকবিন্দু স্যালাইন র'ক্তে মিশছে। কতক্ষণে শেষ হবে কে জানে? তন্ময় অবশ্য এলার্ম দিয়েছে। উঠে স্যালাইন খুলবে সে। শেহজাদের চিন্তার কারণ নেই। অথচ অকারণ তার অস্বস্তি হচ্ছে। কয়েকবার এপাশ ওপাশ করেও ঘুম না আসায় সে ফোনটা হাতে নিলো। ঘড়িতে রাত দুটো বাজছে। এখনো গোটা রাত বাকি। ঘুমাতে হবে। জোরপূর্বক চোখ বুজলো সে।

ঘুম ঠিকঠাক আসার আগেই চোখের সামনে ভাসলো রোদসীর মুখ। মেয়েটি তেজী নয়নে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে যখন তখন চোখ থেকে আগুন বের করে সব ঝ'লসে দিবে সে। শেহজাদ হতভম্ব হয়ে চোখ মেললো। এটা কেমন দৃশ্য! চোখ বুজলে রোদসীর চেহারা কেন ভাসছে? মেয়েটি আজ সম্মুখ অপমান করাতেই কি অবচেতন মন তাকে নিয়ে ভাবছে? হ্যাঁ, তাই হবে বোধহয়। শেহজাদ বড় করে দু’বার শ্বাস ফেললো। এমন বিধ্বস্ত মানসিকতা নিয়ে আজ আর ঘুম হবে না। তার চেয়ে বরং জেগে থাকাই ভালো। শেহজাদ চোখ দুটো মেলে এবার জেগে থাকার পূর্ণ চেষ্টা করলো। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার সেই চেষ্টা বাজেভাবে ব্যর্থ হলো। মিনিট পাঁচেকের মাথায় তার চোখদুটো যেন আপনা থেকে বন্ধ হয়ে এলো। দৃশ্যপটে সেজে উঠলো রোদসী নামক অদ্ভুত একটি মেয়ের প্রতিচ্ছবি।

মেয়েটির পরনে নীল রঙের চমৎকার একটা শাড়ি। নীল শাড়িতে তাকে আকাশ আকাশ লাগছে। শেহজাদ কোনোরকম জড়তা ছাড়া তাকে দুচোখ ভরে দেখতে চাইলো। তাকে দেখতেই মনে হলো, নীল শাড়িতে মেয়েদের সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে। তাকালেই মনে হয়, চোখের সামনে বুঝি সুবিশাল আকাশ নেমে এসেছে। সেই আকাশে মেঘ জমে, রোদ উঠে, সাজে কতশত সব মোহনীয় ছবি। কিন্তু রোদসী ভিন্ন— তার আকাশে মেঘ জমে না, গুড়গুড় শব্দে তা মান-ও পোষে না। স্নিগ্ধতা সেথায় বৃষ্টি হয়ে নামে না। চোখেমুখে ঝলমল করে না বেহিসাবি রোদ্দুর। সাতরঙা স্বপ্নের সাথেও তার বোধহয় ভীষণ রকম আড়ি। সে মেঘহীন পরিষ্কার আকাশ হয়েও, অদ্ভুত। তাকে বোঝা যায় না, দু'চোখ ভরে দেখা যায় না। একটু তাকালেই মনে হয়, তার নীলাক্ততায় চোখ ঝলসে যাচ্ছে। কী ভীষণ তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসে। অথচ গলা অবধি পানি পান করেও সেই তেষ্টার নিবারণ হয় না। এ কেমন মরীচিকা! শেহজাদ দেখল, মেয়েটি শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। বেখেয়ালি মেয়েটির সেদিকে যেন কোনো নজর-ই নেই। সে এলোমেলো পা ফেলে কোথায় যেন হেঁটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে? কী আছে ওদিকে? শেহজাদ মন দিয়ে তার গমনপথ পর্যবেক্ষণ করলো। পরমুহূর্তেই রীতিমতো আঁতকে উঠলো। মেয়েটা খাদের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? শেহজাদ ভড়কে গেল, চড়া গলায় ডাকলো তাকে। মেয়েটি একবারও তার ডাকে সাড়া দিলো না। তার চোখের সামনেই সে ঝাঁপ দিলো। খুব কাছে থেকেই হারিয়ে গেলো এক গহীন অন্ধকারে।

শেহজাদ ধড়ফড় করে উঠে বসলো। বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো। শুকিয়ে আসা গলা ভেজাতে বালিশের পাশ থেকে পানির বোতল তুলে নিলো। বোতল হাতে নিলেও সাথে সাথেই সে পানি পান করলো না। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে পানির দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করলো, তার পানি খেতে ইচ্ছে করছে না। তার এই মুহূর্তে রোদসীকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। শেহজাদ ফোন হাতড়ালো। ঘড়িতে রাত দু’টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। এই মাঝরাতে তার এমন অদ্ভুত ইচ্ছে করছে কেন? মনে হচ্ছে, তাকে একঝলক না দেখলে আজ আর ঘুম হবে না। শেহজাদ ছটফট করে উঠলো। মনোযোগ সরানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো সে। কিছুতেই যেন কিছু হলো না। বেশ অনেকক্ষণ পর ফোন হাতে নিলে দেখা গেলো সবে ছয় মিনিট পেরিয়েছে। অথচ এই ছয় মিনিট তার মুখটা ভোলার চেষ্টায় তার হাঁসফাঁস লেগে গেছে। শেহজাদ কী ভেবে ক্যানোলা থেকে স্যালাইনের নলটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো। উসকোখুসকো চুলে ছুটলো বাবার ঘরের দিকে। এনায়েত মূর্তজা মাঝরাতে দরজা ধাক্কানোর শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে এলেন। দেখলেন দরজায় শেহজাদ দাঁড়িয়ে। এতো রাতে সে এখানে? তার অসুস্থ লাগছে না তো? পেটের সেলাই আবার খুলে টুলে গেছে নাকি? তার হতভম্বতা কাটার আগেই শেহজাদ জানতে চাইলো,

“প্রেমে পড়লে কি মানুষ পাগল হয়ে যায়?”

এনায়েত মূর্তজা কতক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন। হয়তো ছেলের প্রশ্ন ঠিকঠাক বুঝতে পারলেন না। অবশ্য বোঝার কথাও না৷ মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে প্রেমপাঠ নেওয়ার মতো পুত্র শেহজাদ নয়। জবাব না পেয়ে শেহজাদ শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,

“কী হলো বলছো না কেন?”

এনায়েত মূর্তজা ড্রয়িং রুমের দেয়ালে জ্বলজ্বল করা ঘড়ির দিকে তাকালেন। এই অসময়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে ছেলে এই প্রশ্ন করছে কেন? শেহজাদ বাবার মুখের সামনে হাত নাড়লো। বোধহয় মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইলো। এনায়েত মূর্তজা ছেলের উদ্বিগ্ন মুখপানে তাকিয়ে বলে ফেললেন,

“পাগলামি হলো প্রেমে পড়ার শেষ লক্ষণ।”

“মানে?”

“মানে একদম লাস্ট স্টেজ। এরপর আর এর কোনো চিকিৎসা নেই।”

শেহজাদ সেই কথা বুঝলো না। অসহ্য হয়ে জানতে চাইলো,

“তাহলে উপায়?”

এনায়েত মূর্তজার মনে হলো, তার কাঠখোট্টা ছেলেটা প্রেমজালে পুরোদস্তুর ফেঁসে গেছে। এবার আর পরিত্রাণের উপায় নেই। তিনি দু'পা এগিয়ে এসে বুকের বাঁ পাশে তর্জনী তাক করলেন। বললেন,

“সানন্দে প্রেম রোগের য'ন্ত্রণা ভোগ করা।”

শেহজাদ বাঁ হাতে কপাল ঘঁষলো। তার অস্থির লাগছে। সে কি সত্যি সত্যি রোদসীর প্রেমে পড়েছে? না, না — এটা কী করে হয়? সারা দুনিয়া রেখে অ্যাসিসট্যান্টের প্রেমে কেন পড়তে যাবে? শেহজাদ অস্থিরতা কমাতে দরজার সামনের ছোট্ট জায়গাতেই কপালে হাত ঘষে পায়চারি করতে শুরু করলো। এনায়েত মূর্তজা ছেলেকে ঘরে ঢোকালেন। বাতি জ্বালিয়ে পা দুটো গুটিয়ে আয়োজন করে বসলেন, জিজ্ঞেস করলেন,

“এই রোগের জীবাণু লাগালি কী করে?”

শেহজাদ শক্ত চোখে বাবার দিকে তাকালো। বিরক্ত হয়ে বললো,

“কী তখন থেকে রোগ রোগ করছো? জানতে মন চেয়েছে, তাই জানতে চেয়েছি। কোনো সমস্যা?”

এনায়েত মূর্তজা হাই তুললেন। ডান হাতে ছেলের এলোমেল চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বললেন,

“আরও কিছু জানতে মন চাচ্ছে? লাইক সিম্পটমস?”

শেহজাদ বাবার হাতটা সরিয়ে দিলো। জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

“না।”

এনায়েত মূর্তজা ছেলের ফোলা চোখে তাকিয়ে হাসি আটকালেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সিম্পটমস সব তার মাঝেই দৃশ্যমান। তবু ব্যাপারটা না বোঝার ভান করলেন তিনি। সহজ গলায় বললেন,

“আচ্ছা।”

শেহজাদ বিছানা থেকে নেমে ঠান্ডা গলায় বললো,

“ঘুমাও।”

বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো। এনায়েত মূর্তজা তাকে আটকালেন না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, শেহজাদ এখন গেস্ট রুমের দিকে যাবে। ধারণা মেলাতে তিনি দরজা আটকানোর বাহানায় বাহিরে উঁকি দিলেন। প্রায় সাথে সাথেই চওড়া হাসিতে তার অধরযুগল উন্মুক্ত হলো।

শেহজাদ কড়া নাড়ার আগেই ফরিদা বেগম তটস্থ হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। পথে শেহজাদকে পেয়ে বাহু চেপে ধরলেন। একবারও জানতে চাইলেন না, মাঝরাতে এ ঘরের সামনে আসার কারণ। তার চোখেমুখে কীসের এক আত’ঙ্ক। শেহজাদ জিজ্ঞাসু নয়নে মায়ের দিকে তাকালো। ফরিদা বেগম কোনোরকম তাকে টেনে নিলো ঘরের ভেতর। শেহজাদ কৌতুহল নিয়ে তাকাতেই দেখলো রোদসী উন্মাদের মতো আচরণ করছে। ঘরের মাঝ বরাবর এলোমেলো হাঁটছে আর দু’হাতে চুলগুলো খামছে ধরছে বারংবার। তার বোধ হয় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। থেমে থেমেই বড় বড় শ্বাস নিয়ে সে শ্বাসক্রিয়া স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। শেহজাদ খেয়াল করলো, মেয়েটির হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থেকেও সে প্রচুর ঘামছে। কী হয়েছে তার? এমন করছে কেন? কানে আসছে মায়ের উতলা স্বর,

“হুট করেই ঘুম ভেঙে গেলো। দেখি জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম ঘুম টুম ভেঙেছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই হঠাৎ এমন করতে শুরু করেছে।”

তার কথা শেষ হতেই রোদসী হুট করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। দুহাতে বুক চেপে চিৎকার করে উঠলো সে। শেহজাদ তুরন্ত ছুটে গিয়ে তার সাথে কথা বলতে চাইলো। দেখলো মেয়েটা পাগলের মতো কাঁদছে। শেহজাদ কয়েক সেকেন্ড তার র'ক্তিম মুখশ্রীতে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললো,

“মা, উনার প্যানিক এট্যাক হচ্ছে।”

ফরিদা বেগম প্যানিক এট্যাক কী তা চেনেন না। এই সমস্যায় কী করতে হয়, তাও জানেন না। তাও তিনি মেয়েটির হাত দুটো ধরে বারবার বলতে লাগলেন,

“কী হচ্ছে মা? কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? বলো…”

শেহজাদ দ্রুত হাতে জানলাটা পুরোপুরি খুলে দিলো। কিছুটা দূরে টেবিল ফ্যানটা চালিয়ে শীতল গলায় বললো,

“রোদসী? রোদসী? শুনতে পাচ্ছেন? উঠে বসুন। শুয়ে থাকলে শ্বাস আটকে যাবে। উঠে বসুন প্লিজ।”

রোদসী তার সেই কথা শুনলো না। ফরিদা বেগম নিজেই তাকে ঠেলে আধশোয়া করলেন। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,

“খুব কষ্ট হচ্ছে, মা? এইতো! এক্ষুনি ঠিক হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরো।”

শেহজাদ খেয়াল করলো, চোখের সামনে রোদসীকে এভাবে দেখে তার যেন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। প্যানিক এট্যাকের সময় কী যেন করতে হয়? রোদসীর চিৎকারে ততোক্ষণে এনায়েত মূর্তজা আর তন্ময়ও উঠে এসেছে। এনায়েত মূর্তজা শেহজাদকে ধমকে বললেন,

“ভিড় করিস না, বাতাস আসা যাওয়ার জায়গা রাখ।”

বেশ কয়েক মিনিট সময় নিয়ে শান্ত হলো রোদসী। ফরিদা বেগমের বুকে লেপ্টে কাঁদতে কাঁদতেই তার শরীর অসাড় হয়ে এলো। ফরিদা বেগম টের পেলেন, মেয়েটা জ্ঞান হারিয়েছে। কী এক মমতায় তিনি আঁকড়ে রাখলেন তাকে। তার বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। কয়েক মিনিটে মনে হচ্ছে, কয়েক বছর কেটেছে। কী হয়েছে মেয়েটার? কেন হয়েছে? এমন কি ওর প্রায়-ই হয়?

জ্ঞান হারানোর দরুন রোদসীর শরীর শিথিল হয়ে এলো। শেহজাদ টেবিল ফ্যানটা এগিয়ে দিলো, পর্যাপ্ত বাতাস পেলে শ্বাস নিতে কষ্ট কম হবে। তন্ময় দরজার সামনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে আসলে বুঝতে পারছে না, তার কী করা উচিত। ফরিদা বেগম মেয়েটিকে বুকে আগলে বসে আছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ক্রমাগত। তন্ময় ইতস্তত করে সেখান থেকে সরে এলো। পরপর বাকি পুরুষরাও বসার ঘরে চলে গেলো।

এনায়েত মূর্তজা শেহজাদের পাশেই বসে আছেন। তার চোখ-মুখ গম্ভীর। ফরিদা বেগম একা-ই মেয়েটার জ্ঞান ফেরানোর অপেক্ষায় আছে। মনে হচ্ছে, একটু পরেই ফজরের আজান দিবে। তন্ময় থেকে থেকে হাই তুলছে। গতরাতেও ঠিক করে ঘুম হয়নি তার। মনে হচ্ছে আজ-ও আর হবে না। এনায়েত মূর্তজা একদৃষ্টে মেঝেতে কিছু একটা দেখছেন। হয়তো গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছেন। সময় নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন,

“মেয়েটার কাউন্সেলিং করানো দরকার।”

শেহজাদের কান অবধি সেই স্বর পৌঁছালো না। সে ভাবছে ভিন্ন কথা। আচ্ছা? রোদসীর হুট করে এমন প্যানিক এট্যাক হলো কেন? কী হয়েছে আজ? শেহজাদ মনে করার চেষ্টা করলো। হাসপাতাল থেকে ফেরার পথেই মেয়েটা অস্বাভাবিক আচরণ করেছে, তারপর হঠাৎ প্রেশার বেড়ে যাওয়া আর এখনকার প্যানিক এট্যাক। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, সমস্যাটা হাসপাতালেই কোথাও হয়েছে। কী একটা ভাবনায় বুঁদ হয়ে শেহজাদ আচমকা তার বাঁ হাতের কবজির ব্যান্ডেজটা খুলতে শুরু করলো। ভারি গলায় তন্ময়কে জিজ্ঞেস করলো,

“আজ হাসপাতালে কী হয়েছে, তন্ময়?”

তন্ময় চমকালো খানিকটা। তাকে ইতিউতি করতে দেখে শেহজাদ প্রশ্নটা আরেকটু সহজ করলো।

“রোদসীর সাথে হাসপাতালে কিছু হয়েছে?”

তন্ময় তৎক্ষনাৎ না বোধক মাথা নাড়লো। ওই কয়েকঘন্টা সে শেহজাদকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। রোদসী ম্যাডামের সাথে কিছু হয়ে থাকলেও তা তার জানার কথা নয়। শেহজাদ পুনরায় জানতে চাইলো,

“উনি হাসপাতালে কখন গিয়েছেন?”

“শুরু থেকেই। অফিসের নিচেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। হয়তো কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আমাদের নিচে নামতে দেখে সেখান থেকেই তিনি সঙ্গ দিয়েছেন।”

শেহজাদ ঠোঁট দুটো সরু করে ভাবতে বসলো। মনে হচ্ছে, রোদসী ছাড়া এই কথা আর কেউ ঠিক করে বলতে পারবে না। শেহজাদ ততোক্ষণে হাতের ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলেছে। কী ভেবে মুঠোভরা ব্যান্ডেজটা শক্ত করে চেপে ধরলো সে। কাটখোট্টা গলায় জানতে চাইলো,

“জামিল ব্যাপারীর আপডেট কী?”

তন্ময় বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। হয়তো হঠাৎ জামিল ব্যাপারীর প্রসঙ্গ আসার ব্যাপারটা সে ঠিক বুঝতে পারেনি। তাইতো অস্ফুটে জানতে চাইলো,

“হুঁ?”

শেহজাদ হুট করেই উঠে দাঁড়ালো। পকেট হাতড়ে ফোন বের করে দ্রুত খুঁজতে শুরু করলো বিশেষ কোনো নাম্বার। এনায়েত মূর্তজা চট করেই তার হাতটা ধরে ফেললেন। বললেন,

“সময় দেখ। এই সময়ে কাকে কল করছিস?”

শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। নিরেট গলায় বললো,

“সামওয়ান ইম্পর্টেন্ট।”

_____

রোদসী কিছুতেই গতরাতের অস্বস্তি থেকে বের হতে পারছে না। সকালে ঘুম ভেঙে নিজেকে সে মেঝেতে আবিষ্কার করেছে। ফরিদা বেগমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলো সে। একটু ভাবতেই গতরাতের স্মৃতি ধীরে ধীরে দৃশ্যপটে তরতাজা হয়ে উঠেছে। অস্বস্তি আর জড়তায় তার গলদেশ ভার হয়ে আছে। ওয়াশরুমে ঢুকে সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো সে। বাহির থেকে ফরিদা বেগমের উৎকণ্ঠিত স্বর শুনতে পাওয়ায় তাকে বের হতে হলো। বের হতেই ভদ্রমহিলা দু'হাতের আঁজলায় তার মুখটা তুলে ধরলেন। মায়া নিয়ে জানতে চাইলেন,

“খারাপ লাগছে?”

“না। ঠিক আছি, এখন।”

বসার ঘরে নাস্তার উদ্দেশ্যে যেতেই কানে এলো সশব্দে বাজতে থাকা এক খবর।

“অ্যাডভোকেট মূর্তজার বিপক্ষ উকিল আলমগীর কবির তার কেসটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নারীকে হেয় মনে করা এমন নিচু মনের কারো হয়ে তিনি কেস লড়বেন না। তবে কি অ্যাডভোকেট মূর্তজার সামনে হার নিশ্চিত জেনেই তার এই সিদ্ধান্ত? নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো ঘটনা?”

তন্ময় দ্রুত ফোন বের করে কয়েকটি চ্যানেল স্ক্রল করলো। হয়তো খবরটা সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত হতে চাইলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এতে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে। একদল ইতিমধ্যেই আলমগীর কবিরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানাটানি করতে শুরু করেছেন। বলা হচ্ছে, উকিল সাহেব মনে হয় বউয়ের ভয়ে ডি'ভোর্স কেস ছেড়ে দিচ্ছেন। তন্ময় ফিক করে হেসে ফেললো। উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,

“স্যার, আলমগীর কবির এমন মাঝপথে কেস ছেড়ে দিলেন! এবার তো মনে হচ্ছে দ্বিতীয় শুনানির আগেই এই কেসটাও আপনার পকেটে।”

শেহজাদ তার এই কথার পিঠে কিছুই বললো না। তার দৃষ্টি ঘরে মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ধারালো চোখে টিভিতে তাকিয়ে আছে। ভালো খবর শুনেও এমন শোণিত নয়নে তাকিয়ে আছে কেন সে? ফরিদা বেগম নাস্তার প্লেট টেবিলে রাখতে এসে দেখলেন, রোদসী তখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। তাকে টেবিলে আসতে তাড়া দিলেন তিনি। ব্যস্ত পায়ে ছুটলেন জুস বানাতে। রোদসী ধীরপায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। টিভির খবর ততোক্ষণে ভিন্ন প্রসঙ্গে বদলে গেছে। অথচ মেয়েটির মাথা থেকে তা একদম সরেনি। বসতে বসতেই সে শেহজাদের দিকে তীর্যক প্রশ্ন ছুঁড়লো,

“আপনার কী মনে হয়? আলমগীর কবির হঠাৎ কেসটা ছেড়ে দিলেন কেন?”

শেহজাদ চোখ সরিয়ে কমলার খোয়া ছাড়ানোতে পূর্ণ মনোযোগ দিলো। ইচ্ছে করে সহজ জবাব অনেকটা ঘুরিয়ে বললো,

“আপনি যেখানে, আমিও সেখানে। যা আপনি জানেন না, তা আমি জানবো কী করে?”

রোদসী শ্লেষাত্মক হাসলো। লোকটা চতুর ভাবে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলো। এমন ভাব করলো যেন সে কিছুই জানে না। অথচ রোদসীর মনে হচ্ছে শেহজাদ সবটা আগে থেকে জানে। না জানলে তার চোখেমুখে কিছু অন্তত প্রতিক্রিয়া ভাসতো। রোদসী কী একটা বুঝে আকষ্মিক বলে উঠলো,

“শুধু শুধু নোংরা রাজনীতি করছেন, স্যার। এসবের তো কোনো প্রয়োজন ছিলো না।”

তন্ময় বিষম খেলো। সুযোগ পেলেই রোদসী ম্যাডাম বেফাঁস সব কথা বলেন। ভাগ্যিশ আজ এনায়েত মূর্তজা রান্নাঘরে আছেন। বাবা হয়ে ছেলের এমন সম্মুখ অপমান নইলে সইতেন কেমন করে? শেহজাদ রাখ ঢাক করলো না। ছোট্ট করে বললো,

“আচ্ছা।”

তার 'আচ্ছা' শব্দে রোদসীর থেকে বেশি উতলা হলো তন্ময়। সে আশ্চর্য নিয়ে জানতে চাইলো,

“স্যার! আপনি আলমগীর কবিরকে কেসটা ছাড়তে বলেছেন?”

তার চোখে মুখে ছলকে পড়ছে অবিশ্বাস। এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিপরীতে শেহজাদকে দেখা গেলো একেবারেই বিকারহীন। তিনি শুনতে পেলেন না নাকি? তন্ময় একই প্রশ্ন আবারো করলো। এবার জবাব এলো রোদসীর তরফ থেকে।

“যে সত্যি বলতে জানে না, তার কাছে সত্যি জানতে চাওয়াটা বোকামি।”

রোদসীর কথা শেষ হওয়ার আগেই কলিংবেলের শব্দ পাওয়া গেলো। তন্ময় প্রসঙ্গ রেখে দরজা খুলতে ছুটলো। ফিরে এলো চরম অবিশ্বাস নিয়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

“স্যার, অ্যাডভোকেট আলমগীর কবির এসেছেন। সাথে তার স্ত্রী-সন্তানও আছেন।”

চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 25 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন