#অভিমানে তুমি
#লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০১
জীবনের পয়ত্রিশ বছর পার হলো আমার। পার হলো পয়ত্রিশটা বসন্ত। জীবন থেমে থাকেনি আমার। বহমান নদীর স্রোতের মতে এগিয়ে গেল সামনে। জীবন বদলিয়েছে। সময় রং পাল্টিয়েছে। আদুরী অবুঝ মায়া হয়ে উঠেছে বুঝদার। ভিষণ বুঝদার ও আদর্শ হাইস্কুলের টিচার। আজ বৃহস্পতিবার বার। স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হলেও অফিসিয়াল কাজ সেরে বের হতে হতে প্রায় চারটা বেজে গেল আমার। আকাশটা মেঘলা। হয়তো বৃষ্টি হবে। গায়ে আমার চাপা রঙ্গের শাড়ি। কাঁধে সাধারণ ব্যাগ। বাস্তব সংগ্রামী জীবনের লড়াই করা এক দুর্দান্ত নারী আজ আমি। জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে আজ এই জায়গায় আমি। আত্মসম্মান নিয়েই বেঁচে আছি নিজের পরিবারকে নিয়ে। স্কুল গেইট ধরে রাস্তায় বের হলাম। ঝঞ্ঝাট ব্যস্ত নগরী। শব্দ তুলে রিক্সার, সিএনজি, অটো, চলাচল করছে। আমি রাস্তা ধরেই দাঁড়ালাম। রিক্সার প্রয়োজন। দিনটাও ভালো নেই। যেকোনো সময় তুমুল বৃষ্টি হতে পারে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাত ঘড়ির সময়টা দেখে নিলাম। হালি রিক্সার পাচ্ছি না। এমন পরিস্থিতিটাও নতুন না আমার জন্য। তাই অধৈর্য্য হলাম না। বরং ধৈর্য ধরেই দাঁড়িয়ে রইলাম। অধৈর্য, রাগ, জেদ, চঞ্চলতা, দুঃখ প্রকাশ করা আরও আঠারো বছর আগে সেই কিশোরী বয়সেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার রাগ দেখানো মানুষ নেই। তাই রাগটাও নেই। শান্তই থাকলাম। আমি ধৈর্য নিয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করার মধ্যেই কারও উপস্থিত টের পেলাম নিজের পাশে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল আসাদ সাহেবকে। আমাদের স্কুলের বর্তমান প্রিন্সিপাল। তবে বয়সটা হয়তো আমার থেকে দুই তিন বছরের বেশি হবে। আমার একসাথে প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করছি। সেই সুবাদে ভালো সক্ষতা উনার সাথে আমার। আমাদের পুরাতন হেডমাস্টারের জায়গায়টা উনি পেয়েছেন বছর দুয়েক হলো। যায় হোক! আমি হালকা ইতস্তত বোধ করলাম উনার গাঢ় দৃষ্টিতে। নিজের ইতস্তত কাটাতে আলতো হেঁসে প্রথমে প্রশ্ন করলাম।
---" কি ব্যাপার স্যার? আজ রাস্তায় দাঁড়ালেন যে? গাড়ি কোথায় আপনার?
উনার হালকা নড়েচড়ে আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকাল। মেঘের আছন্ন আকাশটা দেখে একটু করে বললেন...
---" আজ গাড়িতে চড়তে ইচ্ছা করছে না। আপনার সাথে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি পলাশে ভিজতে মন চাচ্ছে। আপনার হাতটা ধরার সুযোগ তো দিলেন না আমায়। পাশে দাঁড়ালো সুযোগটা তো পাবো মনে হয়?
আমি পুনরায় হাসলাম। উনার মনের অনূভুতি আমি সম্মান করি। কিন্তু সম্মতি দেয় না। উনি আমাকে বিগত পাঁচ বছর ধরেই এসব বলে আসছে। বাড়িতে বেশ কয়েকবার বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়ে ছিল। বাবা মা ভাই রাজি হয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হয়নি সবসময়ের মতো। কি করে হবো? আমি তো আজও কারও বউ। হোক সে আমায় চাই না। তারপরও তো আমি তার বউ। ডিভোর্স তো আজও আমাদের মধ্যে হয়নি। ডিভোর্স যদি হতো। তারপরও আমি দ্বিতীয় বিয়ে কখনোই করতাম না। আমার মনে একজনের বসবাস। তার সাথে সংসার করতে পারিনি। তো কি হয়েছে? বউ হয়েছি। আজও আছি। ব্যাস এটাই যথেষ্ট আমার জন্য। ভালোবাসলে যে পূরণতা পেতে হবে, এমন তো কথা নেই তাই না। আমার সংসার অপূর্ণতায় থাক। তারপরও অন্য কারও সাথে না জড়াক আমার জীবন। ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে হাতে নিলাম। বৃষ্টি নামবে যেকোনো সময়। উনার দিকে না ভরাট গলায় বললাম...
---" আপনার ঠান্ডা লাগবে স্যার বাসায় যান। আর দ্রুত বিয়ে করার চেষ্টা করবেন অবশ্যই। আমার আশায় থাকবে না স্যার। এটা আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি। আমি বিবাহিত! আমি কারও বউ। আমার ডিভোর্স হয়নি।
পাশ থেকে কানে এলো উনার অধৈর্য গলায় সুর। উনি বললেন..
---" তাহলে কোথায় আপনার স্বামী? বিগত দশ বছরে একটা বারও জন্য দেখিনি তাকে আপনার পাশে? তাহলে আমি কেন মানব আপনার বিয়েটা? কিশোরী বয়সের একটা ছেলেখেলার বিয়েকে কেন এখনো মনে ধরে আছেন আপনি? আর কত অপেক্ষা করব? অনেক তো হল অপেক্ষার খেলা। এবার চলুন না আমরা বিয়ে করে নেয়। আমার সমস্যা নেই আমার আগে একটা বিয়ে হয়েছিল এতে।
---" কিন্তু আমার সমস্যা আছে আসাদ সাহেব। ভিষণ বাড়াবাড়ি রকমের সমস্যা আছে। তাই বলছি আপনি বিয়ে করে নিন। আমার ধৈর্য মাত্রা প্রখর। আমি এই জীবনের দ্বিতীয় পুরুষের সাথে নিজেকে জোড়াবো না। কক্ষনোই না। বয়স অর্ধেক পার হলো। বাকিটা এমনই এমনই পার হয়ে যাবে। এখন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি শুধু। আমার কিশোরী বয়সটা যখন অপেক্ষায় গেল বাকিটাও চলে যাবে। তাকে আমার প্রয়োজন নেই যেমন। ঠিক তেমনই আমার দ্বিতীয় পুরুষেরও প্রয়োজন নেই। আশা করছি আপনি এবার অন্তত বুঝবেন। বৃষ্টিতে ভিজবেন না স্যার, বাসায় চলে যায়। আসি।
উনাকে রেখেই ছাতা মাথায় এগোলাম সামনে। পিছনে ফিরলে হয়তো দেখতে পারবো উনার অসহায় মুখখানা। কিন্তু আমি ঘুরে দেখলাম না। পর পুরুষের উপর মায়া দেখানো হারাম। তাছাড়া উনার কষ্ট বুঝতে গেলে নিজের কষ্ট বেড়ে যাবে দ্বিগুণ। আমার কষ্ট বুঝানোর মতো মানুষ নেই। এই সংগ্রামী দুনিয়াতে লড়াই করতে করতে আজ আমি একা। সবাই থেকেও বজ আমার কেউ নেই। আমার চারপাশে চোখ বুলালে অনেক গুলো সুখী মানুষ দেখতে পায় আমি। তাই তাদের সুখটা নষ্ট করি না নিজের কষ্ট ভারাক্রান্ত কাহিনি শুনিয়ে। কি লাভ? চলুক না যেভাবে যেটা চলছে, সেই ভাবেই। ঝড়ঝাপটায় কাক ভেজা হয়ে পৌছালাম বাসায়। পরপর কয়েক বার বাসার কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল নিদ্রিতা। আরিফ ভাইয়ার ছোট মেয়ে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ভিষণ চঞ্চল হরিণী। অনেকটা আমার কিশোরী বয়সের চঞ্চলতা ওর মাঝে দেখতে পায় আমি। দেখতেও নাকি অনেকটা আমার মতোই হয়েছে সবাই বলে। আমারও তাই মনে হয়। কারণ আমাদের মাঝে দুটো জিনিসের বেশ মিল। আমাদের বংশগত চুল আর চোখ দুটো। আমি হাসলাম। নিদ্রিতা আমার পেট জড়িয়ে ধরতেই বাঁধা দিলাম আমি। কিন্তু শুনলো না ওহ আমার কথা। সে আমার ঝাপটে পেট জড়িয়ে ধরবেই। হলো তাই। আমার সাথে নিদ্রিতাও ভেজলো। আমি প্রসন্ন গলায় বললাম...
---" আমার নিদু মনটা আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে। কি হয়েছে আম্মু?
আমার কথায় বেশ আদুরী হয়ে উঠল নিদ্রিতা। আমার পেট জড়িয়ে মাথা তুলে তাকাল আমার দিকে। ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে উৎফুল্ল গলায় বলল...
---" মেজু ফুপি আসবে সবাইকে নিয়ে কাল।
নিদ্রিতার কথায় আমিও ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলাম। ওর কপালের ছোট চুল গুলো গছিয়ে টেলে দুপাশে দিতে দিতে বললাম...
---" বাহ! বেশ ভালো কথা। তা তুমি কিভাবে জানলে?
---" আম্মু বলেছে। মামা আসবে নাকি মেজু ফুপি আর আদ্র, রাতুল ভাইয়াকে নিয়ে কাল। কেন তুমি জানো না ফুপিমা?
---" না। আমাকে কেউ জানায় নি তো আম্মু।
---" তুমি তো স্কুলের ছিলে জানবে কিভাবে? আমি কিছুক্ষণ আগেই জেনেছি। তাই সবার আগে তোমাকে জানালাম।
আমি ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুর করলাম নিদ্রিতার কপালে।
আমার রংহীন জীবনে আলো মেলে হলো আমার বাচ্চারা। নিজের নয় আরিফ ভাইয়া আর ফিহা ভাবির সন্তানদের কথা বলছি। তাদের দু'টো ছেলে, একটায় মেয়ে। প্রহর, রাফাত, নিদ্রিতা। প্রহর সবে মাত্র কলেজ শেষ করল। এখনো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়নি। রেজাল্ট আউট হয়নি তাই। রাফাত ক্লাস টেনে পড়ছে। তিনজনই আমি বলতে পাগল। বর্তমানে তাদের ঘিরেই আমার একাকীত্বের গোছানো সংসার। যখন আমাকে আদুরে সহিত ফুপিমা বলে ডাকে তখন শুনতে চমৎকার লাগে। মনে হয় কোথায় আমি একা? এইতো আমি পূর্ণতা নারী। একাকীত্ব নেই আমার। আমি আর কথা বাড়ালাম না। দরজা লাগিয়ে সোজা নিজের রুমে গেলাম। শাড়িটা পাল্টিয়ে চেঞ্জ করলাম। সাধারণ থ্রি পিস পড়লাম। স্কুলে গেলে শাড়ি পড়া হয় আমার। নয়তো বাসায় থ্রি পিসই পড়ে থাকি। আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি আমার। পেট ক্ষুধা থাকলেও এই অসময়ে আর খেলাম না। একটু মায়ের রুমে যাওয়া প্রয়োজন। তাই ফ্রেশ হয়েই মায়ের রুমে গেলাম প্রথমে৷ বাবা মারা গেছে আর বছর তিনেক আগেই। সেই থেকে মাও বেশ অসুস্থ থাকে আজকাল। আমাদের বাড়িটাও আগের মতো নেই। আরিফ ভাই বেশ বড় করে পুনরায় বানিয়েছে। ভাইয়ের ব্যবসাটাও বড় করেছে। তিনি এখনো চট্টগ্রাম থাকেন। তবে সাপ্তাহ সাপ্তাহ বাসায় ফিরে আসে। ফিহা ভাবিকে আজও ভাই নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারল না। ভাবির এক কথা সেই এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। তবে তাদের বড় ছেলে প্রহর বর্তমানে ভাইয়ের সাথেই থাকে৷ অবসর সময় হওয়ায় বাবার ব্যবসার কাজে হিসাব রাখে সে। আমি আলতো হাতে মায়ের রুমের দরজা টেলে ভিতরে ঢুকলাম। মা আছড়ের নামাজ শেষ করে উঠছেন। আমাকে দেখেই তিনি দীর্ঘ শ্বাস যেন ফেললেন। হয়তো অনুতাপে কারণে। আমি মনে নিলাম না বিষয়টি। মা আমাকে হাতে ইশারা নিজের কাছে ডাকলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। পাশে দাড়াতেই বললেন বসতে। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসতে বসতে আম্মু কপাল চেক করলাম জ্বর আছে কিনা। না নেই। আমি আম্মুর সামনে বিছানায় বসে বললাম...
---" দুপুরে খেয়েছিলে আম্মু?
---" হুমম। তুই খেয়েছিস?
সত্যিটা চেপে মিথ্যাটাই বললাম..
---" হুমমম।
---" মনে হয়না। তুই আবারও মিথ্যা বলছিস আমাকে। তোর মুখটা শুকনো লাগছে কেন? সত্যি করে বল খেয়েছিস কিছু?
রোজকার প্রশ্ন আম্মুর এই গুলো। মা মনে হয় এমনই হয়। আমার শত কষ্ট মাঝে একটু সুখ এনে দিতে চাই মা। আমাকে হাসি খুশি দেখতে চাই। আমার না বলা চাপা কষ্টটা কমাতে চাই। আমি আম্মু কথা উত্তর দিলাম না। বরং পাল্টা প্রশ্নে বললাম...
---" তুমি দুপুরের মেডিসিন খেয়েছিলে আম্মু?
আমার কথার উত্তর আমার আম্মুও দেয়নি। বরং নিজ ভাষায় বলল...
---" আমাদের একটা ভুলের শাস্তি আর কত নিজেকে দিবি তুই। তোর সংসার তোর বাবা দেখে মতে পারলো না। আমিও হয়তো যেকোনো দিন মারা যাব। তার আগে কি তোর একটা সংসার দেখে মরতে পারবো না রিক্তা? আর কত মরিচীকা পিছনে পড়ে থাকবি। এবার নাহয় বিয়ে করে নে না মা। আমরা তোকে সুখী সংসারী দেখতে চাই। এটা কি আমাদের অপরাধ। আর কত কষ্ট করে ধুঁকে ধুঁকে মরবি। এবার সবকিছুর শেষ কর না মা। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও বিয়েটা করে নে তুই।
আম্মুর চোখে কষ্টের অশ্রু কণা স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি। কিন্তু আমি কাঁদলাম না। কারণ আমি কাঁদলে বা কষ্ট পেলে সে আরও বেশি কাঁদবে। আজ আমি দূর্বল নয়। কষ্ট কষ্ট শক্ত পাথর নেয় নারী আমি। সহজে কান্না কি আমায় মানায়। মা তো রোজই বলে আমাকে বিয়ে করতে। এটা আর নতুন কি? আমি আম্মুর দু'হাতে টেনে নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে সূক্ষ্ণ হেঁসে বললাম...
---" আমি কিন্তু বিবাহিত আম্মু। একজন বিবাহিত মেয়ের স্বামী থাকা শর্তেও দ্বিতীয় বিয়ে হারাম আমাদের ইসলামের। তুমি জানো না।
---" কিসের হারাম? তোর স্বামী আজ আঠারো বছর ধরে তোর খবর নেই না। দেখা-সাক্ষাৎ, যোগাযোগ, কথা বলা কিচ্ছু নেই তোদের মাঝে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তিন মাসের বেশি যোগাযোগ বন্ধ বা আলাদা থাকলে তাদের সম্পর্ক বিছিন্ন হয়ে যায়। স্বামী স্ত্রী আর থাকে না। সেই সুবাদে তোদের সম্পর্কও নেই। তারপরও দরকার পড়লে আমরা তোর ডিভোর্সের ব্যবস্হা করবো। আয়নকে দিয়ে ঐ বাড়ির ছেলের থেকে তোর ডিভোর্সের সই নিব। তুই শুধু বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যা।
মায়ের রোজকার পাগলামোতে সম্মতি দিলাম না। বরং কথা ঘুরিয়ে বললাম...
---" শুনলাম কাল নাকি জুই আসবে?
---" হুমমম। লন্ডন থেকে এক দিন আগেই ফিরেছে ওরা। তাই কাল আসবে আমাদের সবাইকে দেখতে। আয়ন নাকি এবার বাংলাদেশেই সেটেল। ওদের দুই ছেলেকেও নাকি বাংলাদেশের সেটেল করবে। দুপুর অনেক্ক্ষণ কথা হলো আমাদের সাথে। তোর খুঁজও করেছিল জুই। আমি বলেছি তুই স্কুলে আসিস। এবার ওরা আসলে কিছু দিন থাকবে। আমি কিন্তু এবার আয়ন আসলে তোর ডিভোর্সের বিষয়ে কথা বলবো। যেভাবেই হোক ঐ বাড়ির ছেলে থেকে এবার আমি তোর ডিভোর্স নিব। অনেক ছেলে খেলা হয়েছে আর না। আমি তোকে এবার সংসারী করবো।
মায়ের কথায় আমি হেসে ফেললাম। আম্মু আর আম্মুর পাগলামো। সত্যি পারেও বটে। আমি হেসে বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বললাম।
---" তোমার মেয়ে বুড়ি হয়ে গেছে আম্মু। তার এখন বিয়ের বয়স নেই। পার হয়ে গেছে। তোমার মেয়ে এখন পয়ত্রিশ বছরের বুড়ি। তোমার বুড়ি মেয়ের জন্য জামাই পাওয়া যাবে না আম্মু। কেউ বিয়ে করবে না। তাই বিয়ের চিন্তা বাদ দাও। আমি ভালো আছি তোমাদের সাথে। আর কি চাই আমার। আমি এখন ডিভোর্সের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি না। তুমি শুয়ে পড়ো। আমি রুমে যাচ্ছি। কিছু ইংলিশ সিট তৈরি করতে হবে স্টুডেন্টের জন্য। তুমি রেস্ট নাও। আসি।
কথা গুলো বলেই দরজা দিকে পা বাড়ালাম। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে কেঁদে উঠবো আমি। আমার অচেতন মনটাকে বুঝাতে পারবো না। এমনিই গলা ধরে আসছে কান্না। বারবার ঢুক গিলে কান্নাটা থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। তখনই পিছনে থেকে শুনা গেল আম্মুর কান্না ভেজা গলার স্বর...
---" ঐ বাড়ির ছেলে নাকি বাংলাদেশেই থাকছে কয়েক বছর ধরে। তার দাদা-দাদি মারা যাওয়ার পর নাকি বাংলাদেশ চলে এসেছিল। শুনলাম! সেও নাকি এখনো বিয়ে করেনি। একাই আছে। জুই বলেছে। ফিহা নাকি বিষয়টি আগে থেকেই জানতো। তোকে বলতে ভয় পাচ্ছিল।
আমার পা থেমে গেল। স্থির হলাম। আর থামাতে পারলাম না নিজের নিষেধ কান্না গুলোকে। ঝরঝর করে অবুঝের মতো বেয়ে পড়লো গাল গড়িয়ে। আমি ঠোঁট কামড়িয়ে কান্নার শব্দ আটকালাম। মাকে শুনতে দিলাম না। শুধু ভেজা গলায় কোনো রকম বললাম...
---" হুমম
আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত পদে চলে আসলাম নিজের রুমে। দরজার লাগিয়ে সোজা চলে গেলা ভেজা বারান্দায়। তেজি বৃষ্টি ফোটা মূহুর্তেই আমার গা ছুঁয়ে দিল। আমি ভিজতে লাগলাম। চোখের পানির সাথে বৃষ্টি পানি মিলে গেল। আলাদা করা গেল না আর। তেজি বৃষ্টি সাথে সাথে আমার চেপে রাখা কান্নাটাও প্রকাশ পেল। কিশোরী মতো ঝরঝরে করে শব্দ করে কেঁদে উঠলাম। ফুপিয়ে কেঁদে উঠে ভেজা ফ্লোরে বসে পড়লাম। আমার সংসারি জীবনের ইতি ঘটে ছিল সেই সতেরো বছর বয়সেই। আমার সংসার করা হয়নি উনার(রিদ) সাথে। পাশাপাশি থাকার স্বপ্নটাও স্বপ্নই রইয়ে গেল। এক কালবৈশাখী ঝড়ে মতো সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল আমার জীবনে। উনার সাথে ভুল বুঝাবুঝির হওয়ার পর আর ফিরা হয়নি আমার খান বাড়িতে। উনিও(রিদ) আমায় নিতে আসেনি। একটা বার দেখতেও আসেনি। যোগাযোগ করেনি। চোখের দেখাটাও পযন্ত আমি পায়নি উনার। তবে দাদা-দাদি বেশ কয়েক বার আমকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল বাবা দেয়নি আমাকে। আমারও ফেরা হয়নি। এমনই এমনই
বিগত আঠারো বছর পার হলো আমার উনাকে ছাড়া। প্রথম এক বছর আমি সুইসাইড পযন্ত করতে গিয়েছিল বেশ কয়েক বার উনার জন্য মানসিক চাপে। ছোট ছিলাম বলে উনাকে(রিদ) হারানোর ব্যথাটা নিতে পারিনি। আজও মেনে নিতে পারিনা। আজও আমার বালিশ ভিজে অশ্রু কর্ণায়। আমার আশেপাশে সবাই সংসার করছে আমি ছাড়া। জুই আয়ন ভাইয়ার সাথে সংসারী হয় আমার খান বাড়ি থেকে ফিরে আসার এক বছর পরই। তারপর দুজনই পারি জমায় লন্ডনে। এই যাবত লন্ডনেই কাটিয়েছে এতো গুলো বছর। তবে প্রতি বছর সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে এসে আমাদের দেখে যেত। বাবা অনেক চেয়েছিল আমাকে সংসারী করতে কিন্তু পারেনি। কারণ উনি বাংলাদেশে ছিলা না বলে ডিভোর্স নিতে পারেনি আমার। কোথায় ছিল তাও কেউ সঠিক ঠিকানা জানতো না। ঠিকানা বিহীন হওয়ায় আমাদের ডিভোর্স হয়নি এখনো। আমি ও খুব করে চাইতাম আমার ডিভোর্স না হোক। আমার নাম উনার নামের সাথে জড়িয়ে থাকুক আমৃত্যু পযন্ত। আমার স্বামী হয়ে। তাই হলো। অনেকটা বছর পযন্ত উনার খুঁজ ছিল না। আমার পড়াশোনা শেষ হলো। নিজের পায়ে দাঁড়াতে স্কুলের জবটা নিলাম। জীবনের অনেকটা সময় পার হলো। হঠাৎ একদিন কানে আসলো দাদাজান মারা গেছেন। কিন্তু দেখা হলো না আমার কারণ তিনি দেশের বাহিরের ছিলেন। দেশে কবে আনলো আমাকে কেউ জানাল না৷ আমি দাদাজানের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ছিলাম একমাস পর। তারপর দাদীর মৃত্যুর সংবাদ পেলাম পাঁচ বছর আগে। ভাগ্য আমার দাদীকেও শেষ দেখা হলো না। আমি দেখতে গিয়েছিলাম কিন্তু পথে মধ্যেই আমার হঠাৎ এক্সিডেন্ট হওয়ায় আর দেখা হয়নি। প্রায় এক সাপ্তাহ পা ভেঙে হসপিটালের ছিলাম। এমনই এমনই করে আমার আর খান বাড়িতে ফেরা হয়নি। উনার(রিদ) কথা কেউ ভুল করেও আমার সামনে বলে না। আমি কষ্ট পাব বলেই সবাই উনাকে(রিদ) নিজের আলোচনা করে না আমার সামনে। তবে আজকে মার কথায় বুঝলাম। উনি বিগত পাঁচ বছর ধরেই একা একা থাকছেন খান বাড়িতে। আচ্ছা! উনার কি আমার কথা একটা বারের জন্যও মনে হয়না? উনার একটা কিশোরীর বউ রেখে গেছিল। সেটাও কি ভুলে গেছে সে? আমি নেই বলে কি উনি সুখে আছে নাকি কষ্ট পাচ্ছে আমার মতো করে? নাকি আমার থেকেও বেশি কষ্টে আছেন উনি? সত্যি কি আছে? নাকি আমার ভ্রম। কষ্ট থাকলে তো আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। সংসার করতো। আজকে সবার মতো করে আমাদের সংসারেও সন্তান থাকতো। আমি নিতাম। জোর করে হলেও নিতাম। কিন্তু কিছু হলো না আমার। আমি শূন্যে পড়ে রইলাম। আমার আত্মসম্মান আর উনার জেদ দুটোই বহাল থাকলো আমাদের জীবনে। যার ফলে ধ্বংস হলো আমাদের সুখটা। দিন শেষে উনিও একা থাকল আমাকেও রাখল। জীবনের বাকিটা জীবন হয়তো এইভাবে কাটাতে হবে উনাকে ছাড়া। আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। উনাকে বলতে ইচ্ছা করছে, কেন আপনি আমাকে নিতে আসলেন না। কেন এতো জেদ ধরে রাখলেন। কেন আমার জীবন থেকে আঠারোটা রংহীন বসন্ত হারাতে দিলেন। কেন আমাকে নিলেন না। আমি তো আজও ভালোবাসি আপনাকে। ঠিক ততটাই ভালোবাসি যতোটা কিশোরী বয়সে বাসতাম। আমি আজও কুমারীনি হয়ে আছি আপনার জন্য। আপনার অল্প স্পর্শ আজও লেগে আছে আমার শরীরে। বিলীন হতে দেয়নি। তাহলে কেন আপনি আমার ভালোবাসকে দেখছেন না। কেন? আমার অপরাধ কি ক্ষমার অযোগ্য ছিল না মিস্টার ভিলেন? সত্যি ছিল না?
কান্না করতে করতে ভেজা ফ্লোরে ঘুমিয়ে পড়লাম। কয়টা বাজে সময়ের খেয়াল নেই। তীব্র ঠান্ডা কেঁপে কেঁপে উঠে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আমার। ফ্লোর থেকে উঠে বসলাম। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শরীরও টনটন ব্যথা লাগছে। আজ দুবার ভেজা হলো আমার। এই বয়সে এসে বাচ্চামোটা যেন নিজেরই খাপছাড়া লাগছে। ক্লান্ত শরীরে উঠে দাঁড়ালাম। ভেজা কাপড় পাল্টিয়ে পুনরায় তাতে কালো একটা শাড়ি পড়লাম। বৃষ্টি দিন শাড়ি পড়তে ভালো লাগে তাই। হাত মুখ ধুয়ে আয়ন তাকাতেই চমকে উঠলাম। চোখ মুখ ভিষণ ফুলে আছে। যেকেউ বলে দিবে আমি অনেকটা কান্না করেছি। এই অবস্থায় বাহিরে যাওয়া যাবে না। সবাই বুঝে যাবে আমি কান্না করেছি। কিন্তু ক্ষুধাও পেয়েছে অনেক। তারপরও বের হলাম না। অসুস্থ শরীরটা নিয়ে বসলাম পড়ার টেবিলে বই খাতা মেলে, সিট তৈরি করতে হবে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমাটা পড়ে নিলাম। আজকাল চোখেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে হয়তো বাড়ন্ত বয়সে জন্য। আমার মনোযোগ সহকারে কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটিয়ে তুমুল শব্দের বেজে উঠল আমার ফোন বেচারা। মনোযোগ নষ্ট হতেই কপাল কুঁচকে তাকালাম বইয়ের সামনে রাখা ফোনটির দিকে। আননোন নাম্বার। কপাল কুচকে আসে আমার এই অসময়ে আননোন নাম্বার দেখে। কে ফোন করবে আমাকে। প্রথমে ভাবলাম ধরবো না। পরে মনে হয়লো স্কুলের কাজে হয়তো কোনো ফোন হতে পারে। হাতে কলমটি রেখে ফোনটি রিসিভ করে কানে ধরতেই উদ্বিগ্ন কন্ঠের স্বরে থেমে গেলাম আমি। কন্ঠের স্বর কেঁপে উঠলো আমার পরিচিত গলা শুনে। ফোনের ওপাশ থেকে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল...
---" ভাবি! ভাবি প্লিজ আপনি ফিরে আসুন এবার। ভাই ভালো নেই আপনাকে ছাড়া। এতোটা বছর কেন অপেক্ষা করালেন ভাইকে। কেন ফিরছেন না আপনি খান বাড়িতে ভাইয়ের কাছে। ভাবি! ভাই প্রচুর অসুস্থ। আপনাকে খুঁজছে বেহুশ হয়েও। ডাক্তার, ওষুধ কোনো কিছুই কাজে দিচ্ছে না। অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। প্লিজ ভাবি আপনি এবার ফিরে আসুন। হ্যালো ভাবি! আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো?
( ছোটগল্প এটা। আগমী পবে শেষ হবে)
#ছোটগল্প
.
চলবে..