#অভিমানে তুমি
#লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০২
---" ভাবি! ভাবি প্লিজ আপনি ফিরে আসুন এবার। ভাই ভালো নেই আপনাকে ছাড়া। এতোটা বছর কেন অপেক্ষা করালেন ভাইকে। কেন ফিরছেন না আপনি খান বাড়িতে ভাইয়ের কাছে। ভাবি! ভাই প্রচুর অসুস্থ। আপনাকে খুঁজছে বেহুশ হয়েও। ডাক্তার, ওষুধ কোনো কিছুই কাজে দিচ্ছে না। অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। প্লিজ ভাবি আপনি এবার ফিরে আসুন। হ্যালো ভাবি! আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো?
হৃদপিণ্ড চেপে থ মেরে বসে রইলাম। তৃষ্ণায় গলা ধুঁকছে। কথা বলার ভাষা যেন এক মূহুর্তেই লোভ পেল আমার। কিছু ভাবার বা করার অবকাশ পেলাম না। কথা বলারও জোর পাচ্ছিলাম না একটুও। বুকের সাথে গলাও কাপছে। আমি জমে যাচ্ছিলাম। মোটা ফ্রেমের চশমা ভিতর দিয়ে গাল ভিজে উঠল সাথে সাথেই। বুকটাও হু হু করে উঠল উনার জন্য। আমার চেপে রাখা কান্নাটা অবশেষে আর দমিয়ে রাখতে গিয়েও পারলাম না। শব্দ করেই কেঁদে উঠলাম। কাঁপা স্বরে বললাম...
' উনার.. উনার কি হয়েছে ভাইয়া?
' রিদ ভাইয়ের টাইফয়েড জ্বর হয়েছে ভাবি' বিগত এক সাপ্তাহ ধরে একিই অবস্থা। দিন দিন জ্বর মাত্রা আরও বাড়ছে। ডাক্তার, ঔষধ কিছু কাজ করছে না। এভাবে চললে ডাক্তার বলেছে ভাইয়ার অনেক বড়সড় ক্ষতি হতে পারে। এমনকি পেরালাইস্ট ও হতে পারে। প্লিজ ভাবি এবার অন্তত রাগ ছেড়ে চলে আসুন না ভাইয়ের কাছে। আর কত অপেক্ষা করবে ভাই আপনার জন্য? অনেক তো হলো এবার নাহয় ফিরে আসুন। আমরা সবাই আপনার অপেক্ষায় আছি।
বুক কেঁপে উঠলো আমার উনার বেহাল দশার কথা শুনে। আমারও মন এই মূহুর্তে উনার কাছে ছুটতে চাইছে। এক মূহুর্তের জন্য দীর্ঘ বছরের দূরত্বর কথাটা আমার মাথায় আসল না। শুধু আসল আমার এই মূহুর্তে উনার কাছে যেতে হবে। আমার উনাকে দেখতে হবে। উনি ভালো নেই। আমার উনার পাশে থাকা চাই। তাই উদ্বিগ্নতায় বললাম..
' ভাইয়া আমি এক্ষুনি আসছি উনার কাছে। রাতের গাড়ি ধরেই চলে আসব। প্লিজ আপনি উনার খেয়াল রাখুন। আমি আসছি।
ব্যস্ত স্বর শুনতে পারলাম তৎক্ষনাৎ আসিফ ভাইয়ার ফোনের ওপাশ থেকে।
' ভাবি আমি আপনার বাসার নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আপনাকে নিতে এসেই কল করেছিলাম। আপনি দ্রুত নেমে আসুন। তাড়াতাড়ি করে ভাইয়ের কাছে পৌছাতে হবে। ভাইকে আসার সময় ডক্টর নার্সদের হাতে রেখে এসেছি।
আর কিছু ভাবা হলো না আমার। আর না কোনো দিক তাকালাম। কিভাবে যে দৌড়ে সবাইকে ডিঙিয়ে ঘরে থেকে বের হলাম সেটা একমাত্র আমিই জানি। কারও ডাকে জবাবটা পযন্ত দেওয়ার হুশে ছিলাম না আমি। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ঘর থেকে রাস্তা বের হলাম। পাশেই দেখলাম সাদা একটি গাড়ি দাঁড়ানো। আসিফ ভাইয়া গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টির মধ্যে। আমি দৌড়ে সেদিকে যেতেই তিনি গাড়ির পিছনে দরজা খুলে দিলেন আমাকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে। আমি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম। আসিফ ভাইয়া সামনে ড্রাইভারের পাশে বসতেই গাড়িটি চলতে শুরু করল। বৃষ্টির পানিতে শাড়ি অনেকটাই ভিজে ঝবঝব হয়ে গেছে। হীম শীতল ঠান্ডাও লাগছে। কিন্তু তারপরও আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। অস্থিরতার সহিত গাড়ির ভিতরে ছটফট করছিলাম চাতক পাখির নেয়। দুই ঠোঁট চেপে কান্না করছিলাম নিঃশব্দে উনার জন্য। আজ এতো বছর পর হঠাৎ করে উনার জন্য এমন সংবাদ শুনবো। আশা করি নি। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে অনেকটা শব্দ করেই কেঁদে উঠলাম গাড়িতে। আরিফ ভাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন উনি জানতেন আমি এই মূহুর্তে উনার(রিদ) জন্য কান্না করবো। আসিফ ভাইয়া হতাশ গলায় বললেন...
' এতোটা ভালোবেসেও ভাইয়াকে এতো বছর নিজের থেকে কেন দূরে রেখেছিলেন ভাবি? কেন আরও আগে ফেরলেন না। তাহলে আজ অন্তত এতটা বছর দুজনের জীবন থেকে হারাতো না।
আমি ডুকরে কেঁদে উঠে বলি...
' আমি কি ফিরতে চাইনি ভাইয়া? নাকি উনি আমাকে নিতে আসেনি। একটাবার যোগাযোগ পয়ন্ত করেনি আমার সাথে। তাহলে আমি কিভাবে ফিরে যেতাম উনার কাছে।
আসিফ ভাই বললেন।
' আপনি নিজেই তো রিদ ভাইকে সকল যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ভাবি। সবকিছু জেদ তো শুধু আপনি করেছিলেন সেদিন। আপনি রিদ ভাইকে কসম দিয়ে সেদিন চলে গিয়েছিলেন বলে ভাই আপনার খুঁজ করে নি। পরিবার ছাড়া, আপনাকে ছাড়া এতোটা বছর দূরে দূরে থেকেছে শুধু আপনার জন্য। আপনি ভাইকে বাধ্য করেছিলেন দূরে থাকতে। তাহলে ভাই আপনাকে কিভাবে ফিরে নিয়ে যেত ভাবি? ফিরে ত আপনার আসার কথা ছিল ভাবি।
আমি চমকে উঠলাম। আমার জন্য উনি এতো বছর দূরে দূরে থেকেছেন। কিন্তু কেন? আমি স্বরণ করার চেষ্টা করলাম। আমার আর উনার লাস্ট দেখার ঘটনাটিকে। সেদিন আমাদের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শুরুটা উনি করেছিল। উনার রাগের শিকার আমি হয়েছিলাম। নরমাল সাধারণ একটি বিষয় নিয়েই প্রথমে আমাদের দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। আমার মুখে মুখে তর্ক করাটা, উনার পছন্দ হয়নি বলে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল সেদিন। আমিও অপমান আঘাত সহ্য করতে না পেরে সেদিন চলে এসেছিলাম আমাদের বাড়ি। আসার সময়ও উনাকে(রিদ) রাগের বশে অনেক কথায় শুনিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু উনি আমার কোন কথাটা ধরে এতোটা বছর অভিমান দেখিয়ে সবকিছু ছেড়ে দূরে থাকল। কি এমন কথা হতে পারে? না আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। তাই কম্পিত গলায় পুনরায় প্রশ্ন করলাম আসিফ ভাইয়াকে।
' আমি বাঁধ্য কিভাবে করব উনাকে? আমি নিজেই তো উনার অপেক্ষায় বসে ছিলাম। তাহলে?
সামনে থেকে আসিফ ভাইয়ার দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ কানে আসল আমার। তিনি আবারও হতাশ গলায় বলল...
' আঠারো বছর আগে না-হয় আপনি ছোট ছিলেন বুঝতে না বিষয় গুলো। কিন্তু বড় হওয়ার পর কেন বিষয় গুলো বুঝলেন না ভাবি? সেদিনের হওয়া ঝামেলা কথা গুলো কেন পুনরায় ভাবার চেষ্টা করলেম না? তাহলে উত্তর আপনি নিজেই পেয়ে যেতেন।
' মানে?
' আপনার মনে আছে ভাবি সেদিন আসার সময় আপনি রাগে কি বলে এসেছিলেন ভাইকে? আপনি ভাইকে কসম দিয়ে এসেছিলেন। যেন ভাই আপনার কাছে কখনো না যায়। যোগাযোগ না করে। যদি ভাই আপনার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে তাহলে আপনার মরা মুখ দেখবে। আপনি সুইসাইড করবেন। আপনার এই কথাকে ধরে ভাই আপনার সাথে এতো বছর যোগাযোগ করেনি। ভেবেছিল হয়তো আপনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবেন কিন্তু আপনি আসেন নি। ভাইও আপনার কসম ভেঙ্গে যোগাযোগ করতো না। দাদা-দাদীকেও আপনাদের বাসায় পাঠানো হলো। আপনি আসলেন না। বরং আপনার বাবা ডিভোর্স দিবে বললেন। এই জেদে ভাইয়াও আর বাংলাদেশ ফিরলো না৷ শুধু অপেক্ষা করছিল আপনার একটা বার খান বাড়িতে আসার। আপনি যদি সেচ্ছায় একটা বার খান বাড়িতে আসতেন তাহলে আপনার দেওয়া কসমও ভেঙ্গে যেত। ভাইও ফিরে আসতো আপনার কাছে। আপনি কখনোই আসলেন না। ভাই ভাবলো হয়তো আপনি বড় হয়ে বিষয়টি বুঝবেন। এবং চলে আসবেন তখনো আপনি আসলেন না৷ দাদা-দাদির মৃত্যুর সংবাদ পেয়েও আসলেন না। তারপরও থেকে ভাইও জেদ ধরে, আপনার অপেক্ষা ছেড়ে দেয়। আমরা সবাই ভেবেছিলাম ভাই হয়তো আপনাকে ভুলে গেছে। কিন্তু বিগত এক সাপ্তাহ বুঝলাম ভাই আপনাকে কখনো ভুলতেই পারেন নি। জ্বরে ঘোরে বারবার শুধু আপনার নামই নিচ্ছে সে। তাই ডক্টর বলেছে যে করেই হোক উনাকে ভাইয়ের কাছে নিতে। এতে যদি ভাই ভালো হওয়ার সম্ভবনা থাকে বেশি। এজন্য আজ আমি এখানে। আপনি জানতেন ভাই রাগী মানুষ তারপরও কেন সামান্য মেনে নিতে পারলেন না তাকে। ভাই তো অকারণে কিছু করে না। সেদিনও আপনার ভালো চিন্তা করেই আপনাকে থামাতে চেয়েছিল। আপনি বুঝতে না পারায় থাপ্পড় মেরেছিল। কিন্তু আপনি ভুল বুঝলেন। চলে গেলেন। ভাবি নিজের ভুল হয়তো একটা সময় বুঝতে পারবেন! তবে জীবন অনেক বড় একটা আফসোস থাকবে আপনার, কেন আপনি সামান্য কথা ধরে জীবনের আঠারোটা বছর হারালেন।
আসিফ ভাইয়ের কথায় মুখ চেপে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম। সত্যি আমি আফসোস সাগরে তলে যাচ্ছি। সামান্য একটু ভুল থেকে হারিয়ে গেল আমাদের জীবনের দীর্ঘ আঠারো বছরের গল্প। অনুতাপে অনুতাপে কলিজা জ্বলে উঠল আমার। হা হা করে করছে বুক। আর কত? আর কতটা জ্বললে আমার অনুতাপের গহীনতা কমবে? ভুল করেও আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তাহলে উনি? উনার কতটা কষ্ট হয়েছে এতোটা বছর পার করতে? কষ্ট আতনাদের চিৎকার করতে মন চাইছে। সিটে হেলিয়ে পড়ে ডুকরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠি। ততক্ষণে যতক্ষণ না খান বাড়িতে পোঁছাই৷ রাতের কয়টা বাজে আমার খেয়াল নেই। প্রাণপূর্ণ দৌড়ে পৌছালাম উনার(রিদ) রুমে। থমকানো ভঙ্গিতে জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লাম উনার অবস্থা দেখে। হাতের ক্যানোলা লাগানো। নিস্তেজ ভঙ্গিতে বিছানা ঘুমে আছে সটান হয়ে। রুমে দু'জন নার্স রয়েছে উনার তদারকি জন্য। আমি ধীর পায়ে উনার দিকে এগোলাম। উনার পাশের ফ্লোরে ধুপ করে বসে উনার হাতটা চেপে ধরে সশব্দে কেদে ফেলি। আমার কান্না চমকে উঠে দু'জন নার্স। আমার দিকে উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে নিষেধ করে বললেন।
' কে আপনি? উনার কি হন? এই ভাবে পেশেন্টের কাছে বসে কাদবেন না। উনাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কাল সকালের আগে উঠবে না। আপনি বাহিরে যান পেশেন্টের কাছ থেকে প্লিজ।
আমার ভাবান্তর হলো না৷ উনার হাতে কপাল ঠেকিয়ে অনুতাপ আরও ডুকরে কেঁদে উঠলাম। কারও কথা ভালো লাগছে না আমার। তখনই শুনা গেল আসিফ ভাইয়ের কথা। তিনি রুমে ঢুকে নার্সকে নিষেধ করলেন আমাকে কিছু বলতে। অল্প কিছু সময়ে মধ্যে তিনি নার্স দুটোকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন আমাদের দুজনকে একা রেখে। আমি নিস্তেজ ভঙ্গিতে বসে রইলাম বেশ অনেকক্ষণ। হঠাৎ কানে উনার মৃদু গোঙ্গানির শব্দ শুনে চমকে উঠে দ্রুত বিছানায় উনার সম্মুখে বসলাম। উনি হালকা স্বরে কিছু একটা বলছেন। আমি প্রথমে বুঝতে না পেরে আমার কান উনার মুখের সামনে নিলাম। জ্বরে তৃষ্ণাত্বের কাতর হয়ে পানি চাচ্ছে। আমি দ্রুত উঠে পাশের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে উনাকে ধরে বসাতে চাইলাম। উনার প্রশস্ত শরীর টেনে বসাতে বসাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। দূর্বলতায় উনি মাথা ছেড়ে বারবার ঢলে পড়ে যাচ্ছে। শরীরও প্রচন্ড রকমের গরম। জ্বরে ঘোরে চোখ দুটো পযন্ত খুলছে না। আমি এবার এগোলাম। উনার(রিদ) পাশে বসে খাটে হেলান দিয়ে দু'হাতে টেনে উনার মাথাটা আমার কাঁধে উপর রাখলাম। পাশ থেকে গ্লাস উঠিয়ে একটু একটু করে পানি খাওয়াতে লাগলাম উনাকে। উনার বেহাল দশা দেখে আমি ঠোঁট কামড়িয়ে নাক টানছিলাম কান্নায়। উনার যত্ন দরকার আপাতত। নিজের করা ভুলটা জীবন কখনো হয়তো পূর্ণ করতে পারবে না। তবে এবার বাকিটা জীবন আমি উনার সাথে থাকাতে চাই। উনি রাখতে না চাইলেও আমি জোরপূর্বকই থাকবো তার সাথে। যেহেতু অপরাধটা বড়। তাই ক্ষমাটা সহজে আশা করাও যাবে না। যতকিছু হোক না কেন এবার জীবন দ্বিতীয় বার উনাকে ছাড়ছি না আমি। আর না তাঁকে ছাড়াতে দিব। জানি রাগ দেখাবে কিন্তু আমাকেও শক্ত থাকতে হবে। হার মানা যাবে না। অর্ধ বয়সে এসে যদি বাচ্চামো করতে হয় করবো। তারপরও উনাকে আঁচলে বাঁধবো আমি। হাতে গ্লাসটা রাখতে মনে হলো উনি আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাচ্ছে কিছু বিরবির করতে করতে। আমি চমকে উঠলাম। পিঠে উপর গরম স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি থমকে তাকাতেই দেখলাম, উনার দূর্বল হাত দুটো দিয়ে আমাকে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। আমার গলায় মুখ ডুবিয়ে গরম উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে অস্পষ্ট স্বরে বলে...
---" ত তুমি.. এসেছ রিত? তোমার গায়ের ঘ্রাণ আমি পাচ্ছি কেন? সত্যি আছো নাকি নেই?
চেপে রাখা কান্নাটা বেড়িয়ে আসতে চাইছে বাঁধ ভেঙ্গে। গাল বেয়ে ধরধর করে নোনাজল গড়াচ্ছে। উনি এখনো আমার গায়ে ঘ্রাণ চেনে? এতো বছর পরও ভুলেনি? এতোটা ভালোবাসেন সে আমাকে? আর আমি? কান্না ভেজা গলায় কোনো রকম বললাম...
' হুম।
গরম দুটো হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম পিঠে আর পেটে। উনার মুখ আমার গলাতে। হয়তো আমাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছেন। আমি বিষয়টি বুঝতেই তিনি পুনরায় অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়...
' আমার কাছে ফিরতে এতোটা দেরি করলে কেন রিত? আমি অপেক্ষা করেছি তো তোমার।
উনার জ্বরে ঘোরের প্রতিটা কথা আমার কলিজায় বিষাক্ত তীরের মতো আঘাত করছে। আমি জানি উনি এই মূহুর্তে যা বলছেন সবকিছু জ্বরের ঘোরে বলছেন। সজ্ঞানে থাকলে কখনোই বলতো না। উল্টো আমাকে রুম থেকে এতক্ষণে বের করে দিতো। নিজের ভালোবাসাটা প্রকাশ করা তো দূর থাক। আজ অনেকটা দিন! অনেক বছর পর। তার স্পর্শ পাচ্ছি। তাকে দেখছি। তার গলার স্বর শুনতে পারছি। আমি অনুতাপে শিহরিত হয়ে ঝরঝর করে কেঁদে বললাম...
' আমি সরি। আমি সত্যিই সরি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও আমার কাছে নেই। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।
' তোমার একটু করে বুঝতে এতোটা বছর লেগে গেল রিত?
ফুপিয়ে কেঁদে চলছি আমি।
' সরি! সরি! সরি!
উনার আর কোনো কথা শুনলাম না আমি। আমার গলায় উনার ফেলে ঘন ঘন নিশ্বাসে বুঝলাম উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। উনার কষ্ট হচ্ছে ভেবে আমি উনাকে ধরে কোনো রকম টেনে বিছানায় শুয়াতে সক্ষম হলাম। উনার বয়স হলেও শরীরের ওজন কমেনি বিন্দু মাত্র। সেই প্রশস্ত জীম করা ফিটফাট শরীর এখানো আছে। মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে কিন্তু সৌন্দর্য কমেনি। জ্বরে কারণে মুখটা মলিন হয়ে আছে। দূর্বলতা মুখে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। আমার টানাটানি করে উনাকে বালিশে শুয়াতে উনি পুনরায় উঠে গেলেন। আমার দিকে তাকান। আমাকে নিজের মুখের সামনে দেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই তাকলো। ক্যানোলার দূর্বল হাতটা উঠিয়ে আমার গাল আলতো স্পর্শ করে বলল..
' আমাকে ঘুম পাড়িয়ে আবারও চলে যাবে তুমি?
আঁজলে দু'হাতে উনার(রিদ) মুখ চেপে ধরে পাগলের মতো ঠোঁট ছুঁয়ালাম উনার সারা মুখে। কপাল কপাল ঠেকিয়ে বললাম। 'যাবো না উনাকে ছেড়ে। আর কখনোই যাব না। সবসময় উনার পাশে থাকব এমনটাও আশ্বস্ত করলাম। দূর্বল চিত্রে উনি পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি উনার মাথার পাশে বসে খাটে হেলান সারাটা রাত পার করলাম। সকাল সাতটার দিকে ঘুম ভাঙ্গল আমার তাও নার্সের ডাকে। আমি হতভম্ব হয়ে বসে প্রথমেই খুঁজ করলাম উনার। পাশে তাকিয়ে দেখলাম না উনি এখনো ঘুমিয়ে আছেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। হাত বাড়িয়ে জ্বরটা চেক করলাম না তখনো বেশ জ্বরই আছে। আমি এবার ভয় পেলাম উনার জ্বর কমছে না দেখে। নার্স মেয়েটি উনার জ্বর মেপে একটা ইনজেকশন পুষ করল ক্যানোলা দিয়ে। উনাকে(রিদ) ডেকে তুলতে নিষেধ করলো নাস। বলল আরও কিছুক্ষণ ঘুমালে উনার জন্য নাকি ভালো হবে। আমি উনার মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। প্রায় নয়টা দিকে মনে হলো আমার বাসায় ফোন করে সবাইকে আমার অবস্থার কথা বলার দরকার। আস্তে করে উনার পাশ থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। উনার ফোনে থেকে ফোন করে বাসার সবার সাথে অনেক ক্ষণ কথা বললাম। সবাইকে জানালাম। আমি স্বামী ঘরে ফিরে এসেছি। এবার থেকে আমি এখানেই থাকবো। আমার কথায় সবাই খুশি হলো বিশেষ করে ফিহা আপু আর মা বেশি।
ফোনের কথা শেষ করে মনে হলো এবার গায়ের কাপড় গুলো চেঞ্জ করার দরকার। চেঞ্জ করলামও৷ পুনরায় শাড়ির পড়লাম। কাপড় গুলো পেলাম আমার রুমে। সেই আঠারো বছর আগে আমি যেমনটা রেখে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনটায় আছে সবকিছু। কবাটে জায়গায় কাপড় জায়গায়ই পেলাম। একটু নড়চড় পেলাম না। আমার আগের কাপড়ও শরীরে ফিট হয়েছে। কারণ আগের থেকে মোটা নয় শুকিয়ে গেছি৷ কিশোরী বয়সে আমি বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল স্বাস্থ্যবান ছিল। যেটা এখন নেই। আমার বয়স হয়েছে তবে মোটা হয়নি। কারণ টেনশনে টেনশনে অনেকটা শুকিয়ে গেছি। সবসময় ঠিকঠাক না খেতে খেতে। রাতের ভেজা কাপড় ছেড়ে গোসল করে কাবাট থেকে জলপাই রঙ্গা একটা জামদানী শাড়ি পড়ে নিলাম। কারণ কবাটে নরমাল কোনো শাড়ি না থাকায় জামদানী শাড়িটাই পড়তে হলো। তাছাড়া এই বয়সে সবার সামনে থ্রি পিস পড়ে হাটতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। সারাটা দিন গেল বেহাল লতায়। উনার জ্বরের তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। আমি সারাক্ষণ উনার পাশেই বসে ছিলাম। ডক্টর, নার্স, আসিফ ভাই ও ছিল। বিষয়টি নিয়ে সবাই চিন্তত। আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছে। তবে যেটা নতুন ঘটেছে সেটা হলো উনি সারাদিন আমার দিকে দূর্বল চোখে চেয়ে দেখে গেছেন। যতক্ষণ হুশে ছিল ততক্ষণ শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল এক দৃষ্টিতে। হয়তো জ্বরে ঘোরে আমার উপস্থিতিটাকে স্বপ্ন বা কল্পনা ভাবছেন। উনার দৃষ্টি বলছে উনি আমাকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। বিছানায় উনার পাশেই বসে ছিলাম। দিনে দুই বেলা করে সুপ বা উনার ঔষধ আমিই খাইয়ে দিতাম। কোনো কিছু আর নার্স বা ডক্টরের হাতে দিতাম না। আমার স্বামীর যত্ন এবার থেকে আমিই করবো। উনাকে বিছানায় বসিয়ে সুপ খাওয়ানো সময় তখনো তিনি আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। সুপ পুরোটাই খেল! মেডিসিনও খেল। পুনরায় শুয়ে দিলাম ঘুমানোর জন্য। কারণ জ্বরে তাপ অনেক বেশি ছিল। হাঁটা চলাচল করা মুসকিল। দুপুরে দিকের ঘুম ভাঙ্গে সন্ধ্যা সাতটায়। উনার শরীর ঘেমে উঠায় বুঝলাম জ্বর ছেড়েছে। দ্রুত ঘুম থেকে উনাকে তুলে খাটে হেলান দিয়ে শুয়ালাম। দূর্বলতায় কোনো রকম আমার দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল। উনার গায়ের টি-শার্ট খুলে ভেজানো কাপড়া দিয়ে উনার গা মুছে দিচ্ছলাম। কিন্তু উনার থেকে বেশি আমার হাত জোড়া কাঁপছিল। আমার কম্পিত হাতের দিকে উনার দৃষ্টি তাক করলেন হাল্কা কপাল কুঁচকে। হয়তো আমার কেঁপে উঠার কারণটা বুঝার চেষ্টা করছেন। আচ্ছা উনি কি এখনো আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না নাকি? আমার উনার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আমি দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে উনার গা মুছায় মনোযোগী হলাম। আজ এতো বছর পর উনার উম্মুক্ত বুক-পিঠ দেখলাম। ছুয়ে দিলাম। বয়স উনার পয়তাল্লিশ হলেও সৌন্দর্যের ঘাটতি নেই। বয়সের ছাপটাও বেশি বুঝা যাচ্ছে না। স্টং পার্সোনালিটি ব্যক্তি যাকে বলে। ফিট এন্ড ফাইন। আচ্ছা উনাকে তো বুড়ো লাগছে না। তাহলে কি আমি বুড়ি হয়ে গেলাম। পয়ত্রিশ বছরের কি মানুষ বুড়ি হয়ে যায়? উনার কাছে তো এখন আমাকেই বুড়ি লাগছে। আচ্ছা একবার বুড়ো বলে ডাকবো উনাকে? দেখব কি রিয়াকশন দেয়? ভাবনা অনুযায়ী বললাম..
' বুড়ো বয়সে এতো জ্বর বাঁধালেন কিভাবে?
আমার কথায় উনার উত্তর না পেয়ে কৌতুহল বশত আঁড়চোখে তাকালাম উনার দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। উনার চোখে মুখে বিরক্তির রাগ। হয়তো আমার বুড়ো বলাটা উনার পছন্দ হয়নি। আমার বেশ ভালো লাগলো এতো বছর পর উনার রাগ দেখে। আমি মজা না করে এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে বলি...
'আপনার জ্বর ভালো হচ্ছে না কেন?
আমার সোজা কথার উত্তর উনি সোজা ভাবে দিলেন না। বরং পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন...
' তুমি জড়িয়ে ধরছো না কেন?
আমি থমথমে খেয়ে বললাম..
' আমার জড়িয়ে ধরাতে আপনি ভালো হবেন?
উনি রাগী গলায় বললেন...
' বের হও আমার রুম থেকে। যাও!
আমি আমলে নিলাম না বিষয়টি। মাত্র তো শুরু হয়েছে। বাকিটা জীবন এটাই শুনতে হবে। নতুন কিছু না এসব। আমি কথা না বাড়িয়ে মনোযোগ সহকারে আগে উনার শরীর মুছে দিলাম৷ হাত পা মুছলাম৷ তখনো উনি বিরক্তি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। হয়তো আমার জড়িয়ে না ধরার জন্য অথবা আমাকে রুম থেকে বের হতে না দেখে। রাগ হচ্ছে। আমি আগে নিজের কাজ শেষ করলাম। উনার জ্বর নিয়ে ছেলেখেলা নয়। উনাকে পরিপাটি করে তারপর এসে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। আলতো করে উনার বুকে মাথা রাখলাম। এই বুকটা এতো বছর আমার জন্য খালি ছিল। আমি আমার জায়গায় ফিরতে দেরি করে ফেললাম। উনাকে(রিদ) অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম নিজের অজান্তে। অপরাধ বোধে পুনরায় কেঁদে উঠলাম আমি। উনার বুকে মাথা রেখেই ফুপিয়ে উঠলাম। আমার শরীরও মৃদু কাঁপছে কান্নায়। উনি সেটা বুঝতে পারছে তাই আমাকে নিজের দু'হাতে আঁজলে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। দূর্বলতায় উনার হাতও কাপছিল। কতটা সময় একে অপরের সাথে আলিঙ্গন করে বসে ছিলাম জানা নেই। হয়তো ঘন্টা দুয়েক। পুনরায় উনার শরীর গরম হতেই আমার হুশ ফিরে। দ্রুত উনার বুক থেকে উঠতে চাইলে 'উহুম' বলে উনি বাধা দেয়। উঠতে নিষেধ করে। কিন্তু আমি মানলাম না। জোর করে উঠে জ্বরটা চেক করলাম। সবর্নাশ পুনরায় গা কাপিয়ে জ্বর এসেছে তার। আমি দ্রুত কাবাট থেকে টি-শার্ট এনে উনাকে পড়িয়ে দিলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই সময় সাড়ে দশটার কাটায়। আমি চমকে উঠলাম নিজের বেখেয়ালতায় এতোটা সময় উনাকো খালি গায়ে রাখার জন্য পুনরায় জ্বর এসেছে। শিট! উনাকে শুয়ে গেলাম কিচেনে। কিচেনটা দেখেও কেঁপে উঠল অন্তর। এইতো সেই কিচেন। যেখানে দাদী আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি। পুরাতন স্মৃতি মনে হতেই আমার চোখে অশ্রু তইতই করে ভরে উঠল। আমি ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকিয়ে নিজের হাতে সুপ বানালাম। উনাকে খাইয়ে দিয়ে মেডিসিন খাওয়ালাম। বিছানা শুইয়ে দিয়ে রাতভর মাথায় জলপট্টি দিলাম। একটা সময় আমিও খাটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম উনার মাথায় হাত রেখে। শেষ রাতে বুঝতে পারলাম কেউ আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আমি চমকে উঠে বাঁধা দিতে চাইলে আমার নিশ্বাস আঁটকে আসার জোগাড় হয়। আমার ঠোঁট কারও দখলে। ঘুমের রেশ তখনো আমার কাটেনি পুরোপুরি। মুচড়া মুচড়ি করতেই বুঝলাম উনার ব্ল্যাঙ্কেট এর নিচে আমি। উনি আমার উপর। আমার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্হাপন করতে চাইছে। আমি আঁতকে উঠে উনাকে বাঁধা দিচ্ছিলাম। এইভাবে কোনো কিছু চাইনা আমি। উনি সজ্ঞানে নেই। জ্বরে ঘোরে আমাকে কাছে টেনে সকালেই মনে থাকবে না। সবকিছু ভুলে যাবে। আমি বাঁধা দিতেই উনি আমার হাতদুটো বিছানায় চেপে ধরে। আমার ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে গেল। উনার হাতের ছুঁয়া ও তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছিল। অনেকটা বছরের তৃষ্ণার্ত সেটা উনার প্রতিটা ছুঁয়াই প্রকাশ পাচ্ছিল। আমি দাঁতে দাঁত খিঁচে সহ্য করছিলাম সবটা। আর বাঁধা দিলাম না উনাকে। বেঠিক কোনো কিছুই হচ্ছে না আমদের মধ্যে। তাছাড়া উনার সাথে এখন জোড়াজুড়ি করলেও উনাকে থামাতে পারবো না উল্টো উনার আরও ক্ষতি হবে। দূর্বল শরীরে জ্বরটা আরও বাড়বে। তাই মেনে নিলাম উনাকে। উনার স্পর্শকে।
শেষ রাতের পর আমি আর ঘুমাই নি। সকাল হয়ে গিয়ে ছিল বলে। নিজের রুমে চলে আসলাম। গোসল করে লাল রঙ্গে একটা জামদানী শাড়ি পড়ে নিলাম। নিজেরই প্রচুর লজ্জা লাগছে। এই বয়সে এসে সবকিছু আবার নতুন লাগছে। উফ! নতুন বউ বউ ফিলিং আসছে। সত্যি কি তাই? উহুম! মোটেও না। বউ আমি পুরাতনই। শুধু ছুঁয়াটা নতুন। এজন্য হয়তো সবকিছু নতুন নতুন লাগছে। কিচেনে গেলাম উনার জন্য চিকেন সুপ করলাম। আর বাকি সাভেন্টেদের তাদের জন্য খাবার বানাতে বললাম। সুপ নিয়ে বের হতেই দেখলাম উনি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। আমি কপাল কুঁচকে তাকাতেই উনি এসে সোজা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসল। হালকা চেচিয়ে সাভেন্টের উদ্দেশ্য বলল 'ব্ল্যাক কফি' জন্য। কাল রাতেও এতো জ্বর ছিল আজ সকাল সকাল সুস্থ হয়ে গেল? সত্যিই সুস্থ হয়েছে নাকি জ্বর নিয়েই উঠে এসেছে? আমি এগিয়ে উনার সামনে সুপের বাটি রাখলাম। উনার কপালে হাত রেখে বুঝলাম উনিও গোসল করেছেন। অসময়ে গোসল করাটা ঠিক ছিল না উনার শরীরে জন্য তারপরও আমি কিছু বললাম না। কারণ গোসল করাটা ফরজ ছিল তাই। আমার কপালে হাত রাখতে বিরক্তি চোখে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাতেই অনেকটা ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো উনি। নিজের পাশে আমাকে দেখে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। আমি বুঝালাম বিগত দুই দিনের কথা উনার এখন মনে নেই। তাই হয়তো আমাকে এই মূহুর্তে দেখে চমকে উঠছেন। আমি সুপের বাটি উনার সামনে রাখলাম। নিজের জন্য কিচেন থেকে পাউরুটি আর জেল নিয়ে আসলাম। সাথে গরম কফিও। উনার পাশাপাশিই বসলাম। উনি তখনো আমার দিকে ভূত দেখার মতো করে অবিশ্বাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি রুটি মুখে তুলে বলে উঠলাম...
' আপনার এই ভাবে তাকানোতে আমি সত্য থেকে মিথ্যা হয়ে যাব না। আপনি চোখে ঠিকঠাকই দেখছেন। তাই আমার খাওয়ার দিকে নজর না দিয়ে নিজেরটা খান।
আমার সত্যিকার উপস্থিত বুঝতেই স্বামী আমার রেগে গেল মনে হয়। তাই কটমট করেই বললেন...
' কেন এসেছো তুমি এখানে?
একটু মজা করে বললাম..
' বুড়ো বয়সে আপনাকে বাবা বানাতে।
দ্বিগুণ রাগে কটমট করে বলল উনি(রিদ)..
' তোমাকে বাসায় কে ঢুকতে দিয়েছে?
কপাল কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম...
' নিজের বাড়ি! নিজের ঘর! নিজের স্বামী! আমার আবার কার পারমিশন লাগবে আজব। দুই দিন ধরে তো আপনি আমার সাথেই থাকছেন। এখন ভুলে বসে আছেন কেন?
চমকানো গলায় তৎক্ষনাৎ বলে...
' মানে?
' মানেটা এখন না এক দেড়মাস পরে বলতে পারবো। এখন শিওরিটি দিয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না মনে হয়।
আমার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন উনি। আমার কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে চমকে উঠার মতোন করে বললো...
' রাতে আমাদের মধ্যে কিছু..?
লজ্জায় বামে তাকিয়ে মুখ লুকালাম আমি। উনাকে শেষ করতে না দিয়ে বললাম..
' জ্বি অনেক কিছু।
স্তব্ধের নেয় তব্দা খেয়ে বসে থেকে হঠাৎ চেতে উঠে উনি বলেন।
' তুমি আমার অসুস্থতার ফায়দা উঠিয়েছ?
আমি অবাক হয়ে বললাম...
' আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! ছিঃ ছিঃ। আমি আর আপনার অসুস্থতার ফায়দা। তওবা! তওবা! ফায়দা তো আপনি আমার উঠিয়েছেন। বুড়ো হয়েও শরীরের তেজ কমেনি। সোজা জোড়াজুড়ি করলেন আমার সাথে। আমি নাহয় নার্স সেজে আপনার সেবা-যত্ন করতে চাইলাম। কিন্তু আপনি কি করলেন স্বামী হয়ে আপন করে নিলেন আমাকে। আচ্ছা তাও বুঝলাম! বউ বলে মাফ করলাম। কিন্তু এখন মিথ্যা অপবাদ রটাচ্ছেন আমার নামে। কি প্রমাণ আছে আমি আপনার ফায়দা উঠিয়েছি সেটা নিয়ে? বরং আমার কাছে প্রমাণ আছে আপনি আমার সাথে জোড়াজুড়ি করেছেন সেটা নিয়ে? বুড়ো বয়সেও তেজ কমেনি, দেখাব আপনার করা অগণিত দাগ গুলো? ছিঃ ছিঃ। এর থেকে তো আমিই ভালো। মানুষকে শিয়ালের মতোন কামড়ায় না। তাছাড়া আমি এখনো পযন্ত যোয়ান তো আছি। বুড়ো হয় নাই।
আমার মজা করা কথায় হঠাৎ রেগে উঠে গেলেন উনি। আমাকে কিছু না বলে চলে যেতে নিলে আমি পুনরায় পিছনে থেকে খুঁচা মেরে উনাকে বললাম...
' দেখুন এই বয়সে এসে এখন আমি আপনার সাথে বাচ্চামো করতে পারব না। তবে চাইলে আপনাকে বাচ্চার বাবা বানিয়ে দিতে পারব। আমি কিন্তু রাজি আছি আপনাকে এই বুড়ো বয়সেও বাবা বানাতে।
রাগী চোখে কটমট করে ঘুরে তাকালেন আমার দিকে। আমার বার বার বুড়ো বলাতে রেগে গেলেন উনি। চেতে উঠে বললেন...
'বুড়ো হবে তোমার বাপ। একদম বিটলামি করবা না আমার সাথে বলে দিলাম।
' আমার বাবা বুড়ো ছিল এখন তিনি নেই। সে মৃত। তাই এখন আপনি বুড়ো। তাছাড়া আপনার সাথে আমার পূব থেকে বিটলামির সম্পর্ক। বিয়াই বিয়াইন হিসাবে এতটুকু বিটলামি করা আমার প্রাপ্য। আপনি রাগ করবেন, করতে পারেন। বাঁধা দিব না। তবে আমি একা কেন আপনার রাগ সহ্য করবো? আমার সাথে চার-পাঁচটা সন্তান নিয়ে তারপর সবাই মিলে আপনার রাগ দেখবো ঝুট বেঁধে। বেশি না চারটা ছেলে একটা মেয়ে নিব শুধু কেমন?
আমার কথা চেতে গেলেন তিনি। আমার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই আমি দুই ঠোঁট চেপে হাসি আটকালাম। উনি আমার সাথে কথায় না পেরে রাগে ফুস ফুস করতে করতে চলে গেল রুমের দিকে। আমি পুনরায় পিছন থেকে চেচিয়ে বললাম।
' আরে শুনে যান না। পাঁচটা বাচ্চা, আগামী পাঁচ বছরে। দেরি করা চলবে না কিন্তু বলে দিলাম।
বিগত এক সাপ্তাহ ধরে উনার পিছনে পড়ে আছি। উঠতে বসতে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষমা করা তো দূর থাক। সোজা মুখে কথাটা পযন্ত বলছে না। উনি এখন সুস্থ। শরীর দূর্বলতা আছে কিন্তু জ্বর নেই। আমাকে উনার রুমে ঢুকতে দিচ্ছে না। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। অপরাধটাও বড় তাই ক্ষমাটা সহজে আশা করা যায় না। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, জীবনে যে কটা বছর হারিয়ে ফেলেছি সেটা আমি চাইলেও ফিরিয়ে দিতে পারবো না। আমার সেই ক্ষমতা নেই। কিন্তু এখন জীবনের বাকি দিন গুলো একসঙ্গে সুখে থাকতে চাই। একটা দিনও নষ্ট করতে চাই না। মান অভিমানে একে অপরকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই না। আমাকে শাস্তি অন্য ভাবে দিক। তারপরও আমাকে উনার আশেপাশে ভিড়তে দিক। হাল্কা পাতলা কথা অন্তত বলুক আমার সাথে। যেটা উনি কিছু করছে না। আমি হতাশ হলাম না। উনাকে মানিয়ে দম নিব তার আগে না। আমার চেষ্টা চালিয়ে যাব। সেজন্য আবারও গেলাম উনার রুমে। দেখলাম রুমের বাতি নিভিয়ে খাটে হেলান দিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমি দরজা লক করে উনার পায়ে কাছে গিয়ে বসলাম। ধীর হাতে উনার পা দুটো ধরলাম। উনি নড়াচড়া করলো না। বুঝলাম উনি সজাগ আছে। কিন্তু আমার সাথে কথা বলতে চাই না বলে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে আছে। দু'হাতে উনার পা দুটো ধরে কান্না ভেজা গলায় বলতে শুরু করলাম...
' আপনার হারিয়ে ফেলে দিন গুলোর ক্ষতি পূরণ আমি করতে পারবো না। সেই ক্ষমতা আমার নেই। সবকিছু ভুল বুঝাবুঝি থেকে হয়েছে। আপনি আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন আর আমি আপনার যাওয়ার। আপনাকে ছেড়ে আমি এক মূহুর্তের জন্য ভালো ছিলাম না। সারাক্ষণ আপনার অপেক্ষায় থাকতাম। কখন আপনি যাবেন সেই আশায় দিন পার হতো। আপনাকে ডিভোর্স আমি কখনোই দিতে চাই নি। দিতামও না। বাবা বললেও না। আমার আপনাকে কসম দেওয়ার কথা গুলোও ভুলে গেছিলাম। ছোট ছিলাম। সাথে রাগের মাথায় কি বলেছিলাম আপনাকে সেটা আমি পরদিনই ভুলে গেছিলাম। এখন আপনি বলুন যেটা মনে নেই সেখানে কিভাবে নিজের ভুল বুঝে ফিরে আসতাম আপনার কাছে। আপনার জন্য রোজ কাঁদেছি। একাকিত্বে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়েছি। আপনাকে নিরবে ভালোবেসে গেছি। কাউকে বলতে পারিনি আমার আপনাকে চাই। খুব করে চাই। সত্যি আমি বুঝতে পারিনি আপনি দাদা-দাদিকে পাঠাতেন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। আমি আপনার অপেক্ষায় বসে ছিলাম শুধু। দাদাজানের মৃত্যু সংবাদ আমি একমাস পর পেয়েছিলাম। আর দাদী মৃত্যু সংবাদ শুনে আসার সময় গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছিলাম। এক সাপ্তাহ হসপিটালের ছিলাম। তারপর আমি জানতাম না আপনি বাংলাদেশে থাকছেন বিগত পাঁচ বছর ধরে। যেদিন এখানে আসি সেদিনই জানতে পারলাম। তার আগে আমাকে কেউ কিছু বলেনি। আপনি ছাড়া সত্যি জীবন অচল। আমার প্রতিটা নামাজের মোনাজাতে থাকতেন আপনি। দোয়া করতাম আপনাকে ফিরে পাওয়ার। সংসার করার। প্লিজ আমাকে একটা সুযোগ দিন নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার জন্য। আমি আপনার অপরাধী তারপরও একটা সুযোগ চাচ্ছি। কথা দিচ্ছে জীবনের কখনো একটা মূহুর্তের জন্যও আপনাকে ছেড়ে যাব না আমি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন। সত্যি আমি আর এই দূরত্ব মেনে নিতে পারছিনা। অন্তত একটা সুযোগ চাই জীবনের বাকি দিন গুলো আমি আপনার সাথে কাটাতে। প্লিজ। আমাকে ক্ষমা করে দিন। প্লিজ।
কথা গুলো বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে উঠলাম আমি। সত্যি অপরাধ বোধ আমি নৃশংস হয়ে যাচ্ছি। উনার ক্ষমা না পেলে মরেও শান্তি পাবো না। মন ছটফটে উনার পা ধরে কেঁদে চলছি৷ কিন্তু উনার কোনো ভাবাবেগে নেই। কষ্টটা আরও বাড়লো আমার। আমি উনার দুপা আরও খানিকটা জোরে চেপে ধরে কাদতে কাঁদতে বললাম।
' নিজের অপরাধ বোধে ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব আমি। সত্যি বুঝতে পারিনি বিষয় গুলো এতটা জটিল হয়ে যাবে। যদি জানতাম মরে গেলে...
আমার কথা গুলো শেষ করার আগেই আচমকাই উনি আমাকে টেনে উনার বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলেন...
' উফ! তোমার এই প্যাচপ্যাচ করে কান্নায় আমার মাথা ব্যথা করছে। কান্না বন্ধ করো। নয়তো রুম থেকে বের করে দিব কিন্তু।
উনার জড়িয়ে ধরাতে বুঝলাম। উনার রাগ কমে এসেছে। হয়তো ক্ষমাও করে দিবেন এক সময়। বুকের মধ্যে শান্তি অনুভব করলাম। বহুদিন, বহুবছর পর। আমিও ঝাপটে দু'হাতে উনাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠে বললাম....
' আপনাকে সত্যিই এতো গুলা ভালোবসি আমি। অনেক ভালোবাসি।
' আমি কোনো ভালোবাসি টাসি না তোমাকে। বাসতে পারবোও না। নিঘার্ত ফেসে গেছি। এই বয়সে বউ পাবো না বলে এজন্য মেনে নিলাম তোমাকে। নয়তো কখনোই মানতাম না।
আমি হাসলাম। এই বয়সে বউ পাবে না তাহলে যোয়ান বয়সে বিয়ে করলেন না কেন? তাছাড়া উনি এই বয়সেও যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। ফিট এন্ড ফাইন। যেকোনো মেয়েই বিয়ে করতে চাইবে উনাকে। মোট কথা আমার জন্য তার এতো বছরের অপেক্ষাটা কখনোই মানবে না সে। যাকে বলে ত্যাড়া লোক।
আমি সম্মিত দিয়ে বললাম..
'আচ্ছা।
উনি পুনরায় ত্যাড়া কথায় বলল...
' শুনো মেয়ে, এই বয়সে আমি বাবা হতে পারবো না। মানুষ কি বলবে? আমার লজ্জা লাগে।
উনার কথায় ভিষণ লজ্জা পেলাম আমিও। লজ্জায় মরি মরি হয়ে উনার বুকে মুখ লুকিয়ে একটু করে বললাম...
' লজ্জা লাগলে লাগুক। আমি মা হবো।
উনার গলা তৎক্ষনাৎ শুনলাম না কিছু। প্রায় খানিক ক্ষণ পড়ে শুনলাম। উনি খুব ভেবে বললেন...
---" আচ্ছা তাহলে পাঁচটা না। দুটো সন্তান নিব কেমন? পাঁচটা নিলে মানুষ ভাববে আমি বুড়ো বয়সে পাগল হয়ে গেছি। সুন্দরী বউ পেয়ে হুশ নাই আমার। দুটো নিলে ভাববে! না আমি হুশেই আছি। তাই দুটো সন্তানই নিব কেমন।
আমি লজ্জায় নাক মুখ খিঁচে পড়ে রইলাম উনার বুকে। একটু করে বললাম...
' আচ্ছা।
[ সমাপ্ত ]