সেবাপ্রকাশনীর প্রতি সেই পুরনো ভালোবাসা থেকেই এবার আমার হাতে এসেছে তাদের আরও একটি দুর্দান্ত অনুবাদ গ্রন্থ—
'দ্য বন্ডম্যান' (The Bondman)।
১৮৯০ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক হল কেইন-এর এই কালজয়ী সৃষ্টিটি সেবা প্রকাশনী যেভাবে আমাদের পাঠকদের সামনে নিয়ে এসেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আইসল্যান্ডের বরফশীতল পরিবেশ আর আইল অব ম্যান-এর রহস্যময় পটভূমিতে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসের গল্প।
"প্রতিশোধের আগুন নাকি ক্ষমার প্রশান্তি—শেষ পর্যন্ত জয় হয় কার?"
এটি কেবল একটি সাধারণ গল্প নয়; বরং মানুষের ভাগ্য, হৃদয়ের টান, তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা আর শেষ পর্যন্ত আত্মত্যাগের এক মহাকাব্যিক লড়াই। মানবিক সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন যারা পছন্দ করেন, তাদের বুকশেলফে সেবা প্রকাশনীর এই বইটি থাকা আবশ্যিক।
পুরোনো দিনের ক্লাসিক সাহিত্যের এক অদ্ভুত জাদু আছে, যা বর্তমানের ব্যস্ত সময়েও মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি আর রোমাঞ্চ এনে দেয়। এক কাপ গরম কফি আর হাতে সেবার 'দ্য বন্ডম্যান'—গল্পটা পড়তে পড়তে না হয় একটু অতীত থেকেই ঘুরে আসা যাক! ⏳☕
#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০১
প্রথম প্রকাশ: ২০০১
এক
সমুদ্রের তীরে রেইকিয়াভেক শহর। সেই শহরের প্রান্তে সমুদ্রের উপকূলে জেলেদের গ্রাম। ছোট ছোট কুঁড়ে, এখানে ওখানে তালিপটি, চারপাশে দৈন্যের ছাপ। সরু সরু, কর্দমাক্ত পথ, অপরিষ্কার, পিচ্ছিল। বাতাসে সমুদ্রের নোনা জল আর মাছের আঁশটে গন্ধ।
গ্রামের বাইরে একা দাঁড়িয়ে একটা ভাঙা কুঁড়ে। সেই কুঁড়ের উঠানে বসে প্রতিদিন আইডার* পালক পরিষ্কার করে একটি মেয়ে। হাত চালিয়ে দ্রুত শেষ করার মতো কাজ নয় এটি। জালে ঘেরা একটি গোলকের সাহায্যে পালক পরিষ্কার করতে হয়। জালের ফুটোর ভেতর দিয়ে সাবধানে পালকগুলো ঢুকিয়ে দিতে হয়, টেনে বের করতে হয় জালের অন্যপাশ দিয়ে। একবারে টানলে ভেঙে যায় পালকগুলো, টেনে বের করতে হয় একটি একটি করে। ধৈর্য লাগে। সারাদিনে আয় হয় বড়জোর ছয় পেনি। ওই দিয়েই মেয়েটির খাওয়া-পরা চলে। বাচ্চা ছেলেটার খরচও চলে টেনেটুনে।
এখনও যৌবন ফুরিয়ে যায়নি র্যাচেলের, একবার তাকালেই বোঝা যায় এই কিছুদিন আগেও সে রীতিমতো সুন্দরী ছিল। চেহারা থেকে এখনও আভিজাত্যের ছাপ দূর হয়ে যায়নি। অচেনা লোকেদের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে কেন ওর মতো একটি মেয়ে এই দারিদ্র্যের মাঝে অবহেলায় পড়ে আছে।
তবে রেইকিয়াভেক শহরে খুব কম লোকই আছে যারা র্যাচেলের ইতিহাস জানে না। বড় বংশের মেয়ে র্যাচেল। ওর বাবা এখনও এই শহরের কর্তাব্যক্তি, তাঁর প্রতাপে বাঘে-মোষে এক ঘাটে জল খায়। জর্গেন জর্গেনসেন তাঁর নাম। ডেনমার্কের রাজার প্রিয়ভাজন এই ভদ্রলোক আইসল্যান্ড দ্বীপের গভর্নর।
তাহলে র্যাচেলের কেন এই করুণ হাল?
দোষ যদি দিতেই হয় তাহলে র্যাচেল আর তার বাবা, দু’জনকেই দিতে হবে। জর্গেনসেন ভাল একটি পাত্রের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন। ডেনমার্কেরই একজন মন্ত্রী তিনি। বড় বংশের সন্তান। উপাধি কাউন্ট। বিত্তবান প্রতিপত্তিশালী লোক। সব দিক থেকেই সুপাত্র, কিন্তু বয়সে র্যাচেলের তুলনায় একটু বেশি। প্রায় চল্লিশ। তাছাড়া চেহারাও তাঁর বিশেষ সুবিধের নয়। লোকমুখে শোনা যায় তিনি অসুস্থ। র্যাচেল রাজি হলো না এই বিয়েতে।
রাজি হলো না, কারণ আরেকজনকে মন দিয়েছে সে। তার মনের মানুষ গ্রীক দেবতাদের মতো পুরুষালী সৌন্দর্যে অতুলনীয়। সাড়ে ছয় ফিট দীর্ঘ, পেশীবহুল শরীর। র্যাচেল এরই গলায় মালা দিল বাবার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও।
আভিজাত্য গর্বে অন্ধ জর্গেনসেন মেয়ের ব্যবহারে এতই আঘাত পেলেন যে আদরের মেয়েকে দূরে ঠেলে দিতেও দ্বিধা করলেন না। তবে তাঁর আপত্তির জোরাল কারণ ছিল।
র্যাচেলের পছন্দের স্টিফেন ওরি দেখতেই যা সুন্দর, আসলে তার আর কোন গুণ নেই। বিদ্যা, বুদ্ধি, খেটে খাওয়ার আগ্রহ কিছুই নেই তার মধ্যে। অত্যন্ত দরিদ্র লোক সে, কিন্তু নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্যে পরিশ্রম করতে রাজি নয়। খায় বুড়ি মায়ের ঘাড়ে চেপে। আইসল্যান্ডের উপকূলে ভাঙা জাহাজ আর নৌকোর প্রচুর কাঠ পাওয়া যায়, তার মা সমুদ্রের তীরে কাঠ কুড়িয়ে সেই কাঠ চেরাই শেষে বিক্রি করে সংসার চালায়, ছেলের আয়েস বিলাসের খরচ জোগায়। ছোটবেলা থেকেই স্টিফেন ওরি কর্মবিমুখ। মায়ের আদরে মাথাটা তার বিগড়ে গিয়েছিল ছোটবেলাতেই, সেই থেকে আজও সে মায়ের রোজগারেই বসে বসে খেয়ে আসছে। এখন র্যাচেল তার রূপে মজে বিয়ে করে বসায় হাতে একেবারে যেন স্বর্গ পেল ওরি। গভর্নরের মেয়ে! গভর্নর যত রাগই দেখাক একমাত্র সন্তানকে তো আর ফেলে দিতে পারবে না। আসতেই হবে তাকে ওরির কাছে। ওরির একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ব্যবস্থা মানে কোন কাজ নয়, বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। ঘরজামাই করে নেবে না লোকটা ওকে? ব্যস, তাহলেই তো নিশ্চিন্তে বাকি জীবন পায়ের ওপর পা তুলে খাওয়ার একটা উপায় হয়ে গেল।
স্টিফেনের মতো একই চিন্তা যে র্যাচেলের মাথাতেও খানিকটা ছিল না তা নয়। ভেবেচিন্তেই স্টিফেনকে বিয়ে করার সামান্য ঝুঁকিটুকু নিয়েছিল ও। কিন্তু অচিরেই ভেঙে গেল দু’জনের ভুল। এতদিন র্যাচেল বাবার চরিত্রের নরম দিকটাই দেখেছে কেবল, এবার ক্রমশ টের পেল বাবা কতটা কঠোর। জর্গেনসেনের জেদ অনমনীয়, জেদ বজায় রাখার প্রয়োজনে নিষ্ঠুর হতেও দ্বিধা করেন না তিনি। আইসল্যান্ডের আপামর জনসাধারণ জানত প্রশাসক হিসেবে তিনি কতটা নৃশংস, জানত না শুধু র্যাচেল। এবার সে বুঝল বাবা কতটা নৃশংস। প্রয়োজনে তিনি যে পিশাচের মতো আচরণ করতে পারেন সেটা র্যাচেল অনুভব করতে শুরু করল এতদিনে। জর্গেন জর্গেনসেন র্যাচেলকে ত্যাজ্য করে দিলেন। তিনি থাকেন সরকারী প্রাসাদে আরাম আয়েসে, তাঁর কন্যা থাকে সমুদ্রের উপকূলে জেলেগ্রামে, একটা পর্ণ কুটিরে। সেই কুটিরের ভাড়া পর্যন্ত স্টিফেন দেয় না, কারণ তার টাকা নেই। বিয়ের সময় র্যাচেলের গায়ে যে অলঙ্কার ছিল তাই বেচে ঘর ভাড়া চালিয়ে যাচ্ছে র্যাচেল।
বাবার চেয়ে কম জেদী নয় ও। নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে এটা এমন কী অপরাধ যে একেবারে ত্যাজ্য করে দিতে হবে! ঠিক আছে বাবা যদি এই চেয়ে থাকেন তো বেশ, কখনও কোনদিনও বাবার কাছে করুণাপ্রার্থী হয়ে ফিরে যাবে না ও। যত কষ্টই হোক হার মানবে না কিছুতেই।
লোকের মুখে মুখে ক্রমশ সমস্ত আইসল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ল এই ঘটনা। শহরের একপ্রান্তে আছে ঐশ্বর্যশালী ক্ষমতাবান গোঁয়ার বাবা, অন্যপ্রান্তে জেলেগ্রামের দুঃসহ পরিবেশে ভাঙা কুঁড়েতে অর্ধাহার অনাহারে ছিন্নবসনে সেই বাবারই একমাত্র সন্তান।
দিন যায় মাস যায় বছর গড়িয়ে যায়, বাবা-মেয়ের সম্পর্ক আর জোড়া লাগে না।ইতিমধ্যে সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে র্যাচেলের সমস্ত গহনাই বিক্রি হয়ে গিয়েছে, অথচ স্টিফেনের তবু টনক নড়ে না। শেষে উদাসীন স্টিফেন গ্রাম থেকে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। স্টিফেনের খরচ তো বুড়িই চিরকাল চালিয়েছে, এখন ওর বউয়ের খরচটাও চালাক না কেন!
বুড়ি তার ধার দিয়েও গেল না। পাড়াগাঁয়ের দজ্জাল মেয়েমানুষ সে, ছেলেকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে এতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু ছেলের বউ তো আসলে শত্রু ছাড়া আর কিছুই নয়! জেলেগ্রামে এসে র্যাচেল আর স্টিফেনের কুঁড়েতেই উঠল বুড়ি, কিন্তু বিষ নজরে দেখতে লাগল র্যাচেলকে। এখন আর র্যাচেলের গায়ে দামী গহনা নেই, এখন টানাটানির সংসারে সে তো একটা বোঝা। উঠতে বসতে র্যাচেলকে সে খুঁচিয়ে চলল।
একদিন আর সইতে না পেরে স্বামীর সামনে কেঁদে ফেলল র্যাচেল। বলল,
‘ওগো, একটা কিছু করো, এভাবে তো আর চলছে না। বলো আর কতকাল চলবে এভাবে?’
এসব কাকুতি মিনতি আর নরম কথায় আগে কখনোই কান দেয়নি স্টিফেন, কিন্তু এবার বলল,
‘কাজ একটা আছে। পয়সা আসবে খারাপ না। কিন্তু কাজটা শুরু করতে হলে হাতে কিছু টাকা লাগবে। গ্রামে একটা মাছধরা নৌকো বিক্রি হচ্ছে। যদি টাকা থাকত তাহলে ওটা কিনে মাছ ধরে বাজারে বেচে ভালই রোজগার হতো।’
বউয়ের দিকে তাকাল স্টিফেন, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
‘মাছ ধরাটা আমি ভাল পারি। নৌকোটা হাতে পেলে কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের চেহারা পাল্টে ফেলতে পারতাম।’
র্যাচেলের কাছে টাকা-পয়সা কিছুই নেই, তবু জিজ্ঞেস করল,
‘কত টাকা? নৌকো কিনতে কত লাগবে?’
‘ষাট ক্রাউন,’ বলল স্টিফেন।
বলার সুরটা এমন যেন ষাট ক্রাউন কিছুই নয়, পথে ঘাটে যেখানে সেখানে পাওয়া যায় হাত বাড়ালেই।
হতাশ হয়ে গেল র্যাচেল। ষাট ক্রাউন? যার এক ক্রাউনও নেই সে ষাট ক্রাউন পাবে কোথায়? কোথায় পাওয়া যাবে ষাট ক্রাউন? কিন্তু নৌকো কিনতে হলে ওই পরিমাণ টাকা যে খুবই দরকার!
র্যাচেলকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাগ করে চলে গেল স্টিফেন। টাকা যখন নেই তো খামোকা কেন ওকে বিরক্ত করছে র্যাচেল?
একা একা ভাবতে লাগল র্যাচেল, কোথায় পাবে ষাট ক্রাউন। তারপর একসময় কুটির ছেড়ে বেরিয়ে এলো ও, হাঁটতে লাগল ধীর পায়ে। দুই ঘণ্টা পর যখন ফিরল তখন আর চেনা যায় না ওকে। মাথা ভরা সোনালী চুল ছিল ওর, এখন আর সে চুল নেই। চুলের বদলে নিয়ে এসেছে ষাট ক্রাউন। এক ইহুদি পরচুলাওয়ালা মাঝে মাঝেই রেইকিয়াভেক শহরে আসে কোপেনহেগেন থেকে। গরীব ঘরের মেয়েরা মাথার চুল বেচে তার কাছে। র্যাচেল জানত পরচুলাওয়ালা এখন রেইকিয়াভেক শহরে। তার কাছে গিয়ে দরদাম করে এই ষাট ক্রাউন পেয়েছে। কোমর সমান সোনালী চুলের ঘন গোছা দেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে পরচুলাওয়ালা। এর অর্ধেক দামও এর আগে কখনও দেয়নি সে কোন মেয়েকে।স্টিফেন বাড়ি ফিরতেই সমস্ত অর্থ তার হাতে তুলে দিল র্যাচেল। বলল,
‘দেরি না করে নৌকোটা কিনে ফেলো, নাহলে বিক্রি হয়ে যেতে পারে।’
আজকাল র্যাচেলকে যেন দেখেও দেখে না স্টিফেন, চুলহীন র্যাচেলকে সে যেন লক্ষ্যই করল না। টাকা নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। ফিরল সে রাত দুপুরে টলতে টলতে। মদ খেয়ে আর জুয়া খেলে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে সমস্ত টাকা।
‘একি করলে তুমি!’
তার কথা শুনে হাহাকার করে উঠল অভাগিনী র্যাচেল।
‘মাথার চুল বিক্রি করে তবেই আমি...’
কথা শেষ করতে পারল না র্যাচেল, ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দিল স্টিফেন। কোন লজ্জা বা দুঃখবোধ কাজ করল না তার ভেতরে। দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
‘হারামজাদী, চুল বিক্রি করেছিস তাতে বাহাদুরির কি আছে! স্বামীর জন্যে স্ত্রীরা নিজেদেরও বেচে দেয়, আর তুই চুল বেচেই গর্ব করছিস!’
চড় খেয়ে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল র্যাচেল। স্টিফেন তার দিকে ফিরেও তাকাল না, সেই রাত দুপুরে আবার বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। পরদিন জেলেগ্রামে সবাই বলাবলি করতে লাগল, স্টিফেন ওরি গত রাতে একটা ইংরেজ জাহাজে খালাসির চাকরি নিয়েছে। আজকে সকালে সেই জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে গেছে স্টিফেন ওরিকে নিয়ে।
স্টিফেনের বুড়ি মা যখন এই কথা শুনল, ছেলের দেশত্যাগের জন্যে র্যাচেলকেই দায়ী করল সে। গালাগাল করেও তার রাগ কমল না, শেষে বলল,
‘বেরিয়ে যা, হারামজাদী, আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা এক্ষুণি! আমার ছেলের জন্যেই তোকে এখানে রেখেছিলাম, সেই ছেলেকে যখন তুই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাছভাজা করে দেশ ছাড়া করলি, তখন তোর আর থাকার কোন অধিকার নেই আমার বাড়িতে।’
র্যাচেলকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল বুড়ি।
‘দূর হয়ে যা, হারামজাদী!’
বাড়ি নিজের একথা বলতে পারে বুড়ি। শুরুতে বাড়ির ভাড়া র্যাচেলই দিত, কিন্তু তার শেষ গহনাও বিক্রি করে দিয়েছে অনেকদিন হলো। গত দুই বছর ধরে কুটিরের ভাড়া স্টিফেনের বুড়ি মাকেই দিতে হচ্ছে।
র্যাচেল তো পথে নামল, কিন্তু যাবে কোথায়?
এখন শীতকাল। বরফ পড়ছে অবিরাম। চারদিক সাদা হয়ে আছে। একটা আশ্রয় না পেলে দু’ঘণ্টাও বাঁচবে না র্যাচেল, স্রেফ জমে মারা যাবে। এভাবে নিঃস্ব হতভাগ্যের মতো রাস্তায় পড়ে মরাই কি নিয়তি গভর্নরের মেয়ের?
না, তা নয়। আশ্রয় মিলে গেল। বিশপ জন পিটারসেন, আইসল্যান্ডের ধর্মাধ্যক্ষ, রেইকিয়াভেকেই থাকেন। গভর্নর জর্গেনসেনের মেয়েকে ভালমতোই চেনেন তিনি, গোপনে খোঁজখবরও যে রাখেন না তা নয়। মেয়েটাকে স্নেহ করতেন তিনি। জেলেদের মুখে যখন শুনলেন র্যাচেলকে তার শাশুড়ি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, আপাতত গ্রামেরই এক জেলের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে র্যাচেল, তখন গোপনে দেখা দিলেন তিনি। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে র্যাচেলকে বললেন,
‘একটা কুঁড়ে আছে সমুদ্রের ধারে। ভাঙাচোরা, তবে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে একেবারেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তুমি ওখানে থাকতে পারো, র্যাচেল।’
কিছুদিন আগে এক গরীব জেলে মারা গিয়েছে। মারা যাওয়ার আগে বা কিছু অতি সামান্য সম্পত্তি ছিল সেসব গীর্জায় দান করে গিয়েছে। কুঁড়েটা তারই। এখন ওটা গীর্জার সম্পত্তি, কাজেই বিশপের কথার ওপর কথা বলার কেউ নেই। সেখানেই গিয়ে উঠল র্যাচেল।
আজ বেশ কয়েক বছর হলো সেখানেই আছে র্যাচেল। স্টিফেন চলে যাওয়ার চার মাস পরে একটা ছেলে হয় তার। ছেলের নাম জেসন রেখেছে র্যাচেল। সেই জেসনকে বুকে আঁকড়েই বেঁচে আছে বেচারী। আইডার পালক পরিষ্কার করে সামান্য যে ছয় পেনি ও রোজগার করে দৈনিক, তাই দিয়েই কোনরকমে দিন চলে ওদের।
মাতাল অবস্থায় ঝোঁকের মাথায় জাহাজের খালাসির চাকরিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল স্টিফেন ওরি। তার মতো অলস লোকের সাধ্য নেই খালাসির কাজ করে। খালাসিদের সারাদিনে দু’দণ্ড বিশ্রাম নেবার উপায় নেই। সর্বক্ষণ রক্তচক্ষু মেটদের নজর থাকে তাদের ওপর। কাউকে একটু আনমনা হয়ে আকাশের দিকে তাকাতে দেখলেই হয়েছে, নির্ঘাত তাকে মাস্তুলে তুলে দেবে দড়িদড়া ঠিক আছে কিনা দেখার জন্যে।
কাউকে বসে থাকতে দেখলেই বলবে,
‘ঘোলের ভেতর নেমে গিয়ে তেলের পিপেগুলো পরীক্ষা করে দেখো। একটা একটা করে পিপে সরিয়ে ঝাঁট দেবে তলায়, ঝুল যাতে না থাকে, খবরদার!’
মাত্র কয়েকদিন এই হাড়ভাঙা খাটুনি খেতেই অস্থির হয়ে উঠল স্টিফেন। হাঁফ ধরে গেল। মনে হলো এইভাবে যদি পরিশ্রম করতে হয় তাহলে মরেই যাবে সে। ফন্দি আঁটতে লাগল কিভাবে পালাবে।
সুযোগ এসে গেল কয়েক দিন পরেই। জাহাজ তখন ম্যান দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। রাত দুপুরে সমুদ্রে ঝাঁপ দিল স্টিফেন, সাঁতরে তীরে উঠল। ম্যান দ্বীপের কোন কিছু চেনে না সে, সৈকতে রাত না কাটিয়ে হাঁটতে লাগল। সকালে লুকিয়ে পড়ল একটা জঙ্গলে। লুকানোর কারণ আছে, চুক্তিবদ্ধ খালাসি সে, পালিয়েছে টের পেলেই জাহাজ থামিয়ে তীরে লোক পাঠাবে ক্যাপ্টেন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। ইংরেজ জাহাজ থেকে পালিয়েছে সে, আবার ম্যান দ্বীপও ইংল্যান্ডেরই একটা অংশ, ক্যাপ্টেনের কোন অসুবিধাই হবে না তাকে পাকড়াও করে নিয়ে যেতে।
সারাদিন সেই জঙ্গলেই লুকিয়ে থাকল স্টিফেন। গত রাতে খেয়েছে, তারপর থেকে আর কিছু পেটে পড়েনি, রাতে সাঁতার কেটে তীরে উঠেছে, হেঁটেছে তারপর বহুক্ষণ, খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে তার। বিকেলে আর থাকতে পারল না স্টিফেন, চারপাশ দেখে নিয়ে সাবধানে পথ চলতে লাগল। সন্ধের সময় বড় একটা খামার বাড়ির সামনে পৌঁছুল। কেউ নেই আশেপাশে। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পেল বড় একটা ঘর, সুন্দর করে সাজানো। আগুনের ধারে একা বসে আছেন এক প্রৌঢ়, গভীর চিন্তায় মগ্ন। শান্ত সমাহিত সৌম্য চেহারা প্রৌঢ়ের,দেখলেই বোঝা যায় ভাল মানুষ।
মনের মাঝে ভরসা পেল স্টিফেন, সাহায্য প্রার্থীকে ফিরাবেন না এই ভদ্রলোক। জানালায় কয়েকবার টোকা দিল ও। জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক, স্টিফেনকে দেখে ভ্রূ কুঁচকালেন, জানতে চাইলেন কে ও।
বিপদে পড়ে গেল স্টিফেন। আইসল্যান্ডের ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষা জানা নেই ওর। ম্যান দ্বীপের ভাষা ইংরেজি। বুদ্ধি বের করে ফেলল ও, একবার ঠোঁটে হাত, আবার পেটে হাত দিয়ে কয়েকবার দেখাল, বোঝাতে চাইল ক্ষুধার্ত সে।
ভদ্রলোক বুঝলেন। স্টিফেনের ভাগ্য ভাল যে আপাতত বাড়িতে এই ভদ্রলোক ছাড়া আর কেউ নেই। তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, এমনকি দাসদাসীরাও গির্জায় গেছে। কোন ধর্মীয় কারণে নয়, গির্জার উঠান খোলামেলা বলে গ্রামের কি একটা সামাজিক উৎসবের আয়োজন হয়েছে গির্জায়, তাই ভদ্রলোক আর যাননি।
ভদ্রলোকের স্ত্রী-পুত্র বাড়িতে থাকলে স্বাভাবিক ভাবেই নানা রকম প্রশ্ন করত, কোথা থেকে এসেছে স্টিফেন, সে কোন পলাতক কয়েদী নয় তো, যাবেই বা কোথায়, পেশা কি—ইত্যাদি প্রশ্ন উঠত। তারা কেউ নেই, প্রৌঢ় এসব প্রশ্নের ধারকাছ দিয়েও গেলেন না। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোর অভ্যেসটা তাঁর একেবারেই নেই। প্রয়োজনটুকু তিনি বুঝলেন, এই বিদেশি লোকটা ক্ষুধার্ত, তাঁর বাড়িতে এসে খাবার চাইছে, সাধ্য থাকলে তাকে সাহায্য করা উচিত।
স্টিফেনকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলেন তিনি। ডিনার শেষ হয়ে গিয়েছে, রান্নাঘরে অবশিষ্ট খাবার রাখা ছিল, তাই স্টিফেনকে খেতে দিলেন। পরিবেশন করলেন নিজে।
গোগ্রাসে খেল স্টিফেন। খাওয়া শেষে চোখ পিট পিট করে মাথার পাশে হাত রেখে বুঝিয়ে দিল এখন সে একটু ঘুমাতে চায়। ইংল্যান্ডের খামারবাড়িগুলোতে নিম্নশ্রেণীর অভ্যাগতদের জন্যে থাকার ব্যবস্থা থাকে আস্তাবলের ভেতরে। মাচার ওপর খড় বিছিয়ে বিছানা করা থাকে, রাতে কেউ থেকে গেলে ওখানেই শোয়। আস্তাবলের ভেতরেই তাদের জন্যে কম্বলও থাকে।
সেখানেই স্টিফেনকে নিয়ে গেলেন প্রৌঢ়। শোওয়ার পাঁচ মিনিটের মাথায় নাক ডাকতে লাগল স্টিফেনের।
আধঘণ্টা পর সেই বাড়িতে হাজির হলো চারজন লোক। নাবিকের পোশাক পরনে তাদের। ইংরেজিতে কথা বলছে। সবাই খুব উত্তেজিত।
‘এখানে একটা বিদেশি লোক এসেছিল?’
‘দৈত্যাকার একটা লোক।’
‘দেখেছেন নতুন কাউকে, লম্বা-চওড়া?’
একটা কথারও জবাব দিলেন না ভদ্রলোক, পাল্টা প্রশ্ন করতে লাগলেন,
‘কি করেছে সে? কোন্ জাহাজের নাবিক তোমরা?’
জবাব দিল নাবিকদের দলনেতা। জানাল চুক্তিবদ্ধ খালাসি পালিয়েছে তাদের জাহাজ থেকে। ধরতে পারলে ক্যাপ্টেন তাকে চাবকে ছাল ছাড়াবেন।
‘সে এদিকে এসেছে এমন অনুমান করছ কেন?’ জানতে চাইলেন ভদ্রলোক।
সৈকতের বালিতে তার পায়ের ছাপ পাওয়া থেকে শুরু করে জঙ্গলে
স্টিফেনের আত্মগোপন, ওদের অনুসরণ করে আসা ইত্যাদি জানাল নাবিকরা। বলল,
‘সমুদ্রের দিক থেকে এলে এটাই প্রথম লোকালয়, কাজেই লোকটা সম্ভবত এখানেই আসবে।’ ভদ্রলোকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল দলনেতা। ‘তাকে আপনি দেখেছেন?’
‘দেখেছি,’ এতক্ষণে স্বীকার করলেন ভদ্রলোক।
‘গতরাতে এসেছিল। আশ্রয় না দেওয়ায় জঙ্গলেই বোধহয় রাত কাটিয়েছে। তাকে খুঁজে বের করতে হলে দিনের আলোয় খুঁজতে হবে। রাতে আমার এখানে খেয়েদেয়ে তোমরা বরং সকালে খুঁজতে শুরু কোরো।’
পরামর্শ পছন্দ হলো নাবিকদের। রাতের আঁধারে স্টিফেন ওরিকে খুঁজে পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে। তাছাড়া বিনে পয়সায় রাতের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে যাচ্ছে, এই সুযোগ ছেড়ে দেওয়া সমীচীন মনে করল না নাবিকদের নেতা। সকালে উঠে স্টিফেন ওরির পিছু ধাওয়া করলেই চলবে। এই ভদ্রলোক বলছেন কাল রাতে এদিক দিয়ে গেছে ওরি। তারমানে ঠিক পথেই আছে তারা। বিশ্রাম নিয়ে সকালে রওনা হলে কোন অসুবিধা নেই। ইংরেজি ভাষা জানে না ওরি, অচেনা এই ম্যান দ্বীপে কারও সাহায্য না নিয়ে কতক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে?
ভদ্রলোকের দাসদাসীরা ফিরতে শুরু করেছে গির্জার অনুষ্ঠান দেখে। তাদেরই একজনকে ডেকে নাবিকদের খাবার দেবার আদেশ দিলেন প্রৌঢ়। সারাদিন স্টিফেনের পিছু ধাওয়া করে নাবিকরা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, খাবার আসতেই দেরি না করে পেটপুজোয় মন দিল তারা।
খাওয়া শেষ হতে তাদের দলনেতা বলল,
‘আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। আমরা কৃতজ্ঞ আপনার আতিথেয়তা পেয়ে। অনেক করেছেন আপনি আমাদের জন্যে। রাতটুকু থাকার ব্যবস্থাও কি করে দেবেন? তাহলে আর রাতে আমাদের আশ্রয় খুঁজতে যেতে হয় না। বোঝেনই তো, অপরিচিত জায়গা, রাত-বিরেতে...’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,’ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন ভদ্রলোক। পথ দেখালেন নাবিকদের। তবে আস্তাবলে নিয়ে গেলেন না, বাইরের দিকে নতুন একটা ঘর তুলছেন, সেটা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
শেষ রাতে ঘুম ভাঙল ভদ্রলোকের। নাবিকরা যে-ঘরে আছে সেখানে চলে এলেন তিনি, গভীর মনোযোগে শুনলেন তাদের নিঃশ্বাসের আওয়াজ। অঘোরে ঘুমাচ্ছে সবাই। এবার আস্তাবলে চলে এলেন তিনি, স্টিফেনকে ঘুম থেকে তুলে চুপি চুপি তাকে নিয়ে নাবিকদের ঘরের জানালায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি কি বলতে চান বুঝে গেল স্টিফেন। সঙ্গে তলোয়ার নিয়ে এসেছে নাবিকরা, স্টিফেনকে জ্যান্ত না পেলে মৃত্যুই নিয়ে যাবে ক্যাপ্টেনের কাছে। পালাতে যদি হয় তো এখনই মোক্ষম সময়, ভোর হয়ে গেলে আর সহজে পালাতে পারবে না স্টিফেন।
পথে নামার আগে তার হাতে একটা পুটুলি তুলে দিলেন ভদ্রলোক। ওতে সামান্য খাবার আছে, আজকের দিনটা চলে যাবে। ভদ্রলোকের বদান্যতায় পাষণ্ড স্টিফেনের মন ভিজে গেল। একবার মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখিয়ে আঁধার রাতের নির্জন পথ ধরে পা বাড়াল সে, গন্তব্য নিজেরও জানা নেই।
নাবিকরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চারপাশের এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কোথাও স্টিফেন নেই। দুপুরের পর আবার সমুদ্রের দিকে ফিরে চলল তারা। কাল সকালেই জাহাজ ছেড়ে যাবে আবার। তার আগেই তাদের জাহাজে ফিরতে হবে।
পরদিন সকালে জাহাজটা ম্যান দ্বীপ থেকে নোঙর তুলে রওনা হয়ে গেল, বিপদ কাটল স্টিফেনের। কোন পিছু টান নেই ওর। ম্যান দ্বীপে নতুন করে জীবন শুরু করতে কোন বাধাও নেই। খাটতে সে নারাজ, কিন্তু ম্যান দ্বীপে বিনা খাটুনিতেও পয়সা রোজগারের বন্দোবস্ত আছে। চোরাকারবারীদের স্বর্গরাজ্য এই দ্বীপ। অল্প খাটুনিতেই যথেষ্ট আয় করা যায়। কয়েকদিন যেতে না যেতেই চোরাকারবারীদের দলে ভিড়ে গেল স্টিফেন। বেশ ভালই আয় করতে লাগল সে।
পৃথিবী ছোট জায়গা, যে যাই বলুক। রেইকিয়াভেকের সমুদ্রতীরের জেলেগ্রামে বসেও আইসল্যান্ডের এক চোরাকারবারীর কাছে স্টিফেনের খবর পেল তার উপেক্ষিতা স্ত্রী র্যাচেল। জানল ম্যান দ্বীপে আবার একটা বিয়ে করেছে তার স্বামী। দ্বিতীয়পক্ষে তার ছেলেও হয়েছে একটি।
দুই
শত দুঃখ অবহেলা সয়েও এতদিন মনের জোর হারায়নি র্যাচেল, কিন্তু স্বামীর এই বিশ্বাসঘাতকতায় একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল ভেতরটা ওর। যে ধর্মে ওর অগাধ বিশ্বাস সেই ধর্মের বিধিনিষেধ অমান্য করে ওর নারীত্বকে স্টিফেন অবহেলা করেছে, এটা কোনমতেই মন থেকে মেনে নিতে পারল না। শরীর ভেঙে গেল র্যাচেলের, বার বার অসুখে পড়তে লাগল। বুঝতে পারল বেশিদিন আর বাঁচবে না ও। এই করুণ নিয়তি মেনেও নিল, মনটাকে প্রস্তুত করতে লাগল আসন্ন মৃত্যুর জন্যে। অপেক্ষা করতে লাগল, কবে আসবে মৃত্যু, ওকে মুক্তি দেবে সারাজীবনের অবহেলা, অপমান, আর মর্মযাতনা থেকে।
এতদিন র্যাচেলই যেভাবে হোক পরিবার চালিয়েছে, এখন সেটা প্রায় অসম্ভব ওর জন্যে। নিজের জন্যে কোন চিন্তা নেই র্যাচেলের, যত চিন্তা ছেলে জেসনের জন্যে।
এই একটি মাত্র ছেলে তার, জেসন। বয়স প্রায় পনেরো হতে চলল ওর। কিন্তু কে বলবে তা! রূপের দিক দিয়ে ওর বাবা স্টিফেনকেও ছাড়িয়ে যায় জেসন। দৈহিক আকৃতিও দেখার মতো। পুরো সাড়ে ছয় ফিট সে এই পনেরো বছর বয়সেই। তেমনি তার শক্তি। লোকে অবাক হয়ে যায় তাকে দেখলে, মনে মনে বলে,
‘বাইবেলের সেই স্যামসন আবার ফিরে এলো কি নতুন করে?’
একটা কথা প্রচলিত আছে, দৈহিক বৃদ্ধি আশাতীত হলে বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে
যায় মানুষের। এই কথা জেসন যেন ভুল প্রমাণিত করেছে। এই বয়সেই ইংরেজি ভাষায় তার যথেষ্ট দখল। পরিচয় না দিলে কথা শুনে কেউ বুঝতে পারবে না সে ইংরেজ নয়। বিশপ জনের ল্যাটিন স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনাও করেছে জেসন। আরও করত, পয়সা থাকত যদি। খুবই মেধাবী ছেলে জেসন, বিশপ জন ওর মা র্যাচেলকেও স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেছেন সবসময়, ওকেও খুবই সমাদরে দেখেন।
পড়াশোনা, মাছ ধরা, আইডারের বাসা থেকে ডিম তুলে আনা এই সব কাজেই এতদিন ব্যস্ত ছিল জেসন, মায়ের শরীর দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে দেখে এবার সে সিদ্ধান্ত নিল বাড়ির দায়িত্ব নেয়া তার কর্তব্য।
একদিন জেসন মাকে বলল,
‘মা, এখন থেকে পরিশ্রমের কোন কাজ করার আর দরকার নেই তোমার, আমি বড় হয়ে গেছি, এখন থেকে আমিই সংসার চালাব।’
অবাক হয়ে গেল র্যাচেল। চোখ বড় বড় করে দেখল ছেলেকে। কবে তার ছোট্ট সোনামণি এভাবে বড়দের মতো করে কথা বলতে শিখল?
মাত্র পনেরো বছর বয়স জেসনের, ও আর কী সংসার চালাবে। সংসার চালানোর মতো পরিপক্ব জ্ঞানবুদ্ধি ওর এই বয়সে থাকার কথা নয়।
আপত্তি করল র্যাচেল, কিন্তু কোন কথা শুনতে রাজি নয় জেসন। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কখন যেন মায়ের অজান্তে সত্যি সত্যি বড় হয়ে গেছে ও। নিজেই মাছ ধরে জেসন, বাজারে বেচে, মুনাফার টাকা দিয়ে বাজার করে, তারপর রেঁধে খাওয়ায় মাকে।
এরকম সোনার টুকরো ছেলের মা হয়ে সব দুঃখ ভুলে যেতে পারত র্যাচেল। কিন্তু র্যাচেলের মনে কোন শান্তি নেই। ধিকি ধিকি আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছে ওর হৃদয়। একটা কথাই শুধু বার বার ঘুরে ফিরে ভাবে ও। কি সেই কথা?
প্রতিশোধ! ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিতে হবে।
স্নেহশীলা কোমলমতি র্যাচেল সংসারের অনলে জ্বলে জ্বলে পরিণত হয়েছে এক প্রতিহিংসাপরায়ণা দানবীতে। আর সব দুঃখ কষ্ট অপমান মেনে নিতে পারত ও, কিন্তু স্টিফেনের বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেয়া অসম্ভব। ধর্মের অনুশাসন স্টিফেন তো ভেঙেইছে, অপমান করেছে র্যাচেলের নারীত্বকে। স্ত্রীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করেছে ওকে!
যতক্ষণ জেগে থাকে নিজের রোষানলে নিজেই দগ্ধ হয় র্যাচেল। সে আগুনের তাপে তারই জীবনীশক্তি শুকিয়ে আসে। যত দুর্বল হয়ে পড়ছে র্যাচেল, ততই স্টিফেনের ওপর ক্রোধ বাড়ছে তার।
এদিকে জেসন বুঝেছে তার মা আর বেশিদিন বাঁচবে না। বিছানা ছেড়ে প্রায় উঠতেই পারে না আজকাল।
একদিন র্যাচেল ছেলেকে ডেকে বিছানার পাশে নিয়ে এলো। জেসনকে বসতে বলে তার হাত ধরল। গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করল যতক্ষণ সাধ্যে কুলাল। তারপর ভেজা স্বরে বলল,
‘বাবা জেসন, আমার একটা অনুরোধ রাখতে হবে তোমাকে।’
‘অনুরোধ কেন বলছ,
মা?’ বলল জেসন,
‘তোমার কথা আমার কাছে
বাইবেলের বাণীর মতোই পালনীয় যা বলবে করব। মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা তো সন্তানের কর্তব্য।’
‘কিন্তু আমি তোমাকে খুব কঠিন একটা কাজ করতে বলব, বাবা,’
উত্তেজিত হয়ে অনেক কষ্টে বিছানায় উঠে বসল র্যাচেল।
‘তুমি হয়তো শিউরে উঠবে সেকথা শুনে, হয়তো পিছিয়ে যেতে চাইবে, বলবে তোমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমার তাতে চলবে না, জেসন। আমি যা বলব তা করতে হবে তোমাকে, যত আপত্তিকরই মনে হোক আমার আদেশ, যদি তুমি পালন না করো সে-আদেশ তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে না।’
ছেলের হাতটা ধরল র্যাচেল। করুণ সুরে বলল,
‘কথা দাও, জেসন, আমি যা বলব করবে?’
‘মা, আমি জানি অন্যায় কোন কিছু করতে তুমি আমাকে বলবে না,’ বলল জেসন নিশ্চিন্ত গলায়।
‘আমি তোমাকে চিনি, মা। তুমি যা করতে বলবে নির্দ্বিধায় করব আমি।’
‘তাহলে ঈশ্বরের নামে শপথ করো।’
‘বেশ। ঈশ্বরের নামে শপথ নিলাম। তোমার কথা আমি ঈশ্বরের আদেশ বলে মনে করব, পালন করব দ্বিধাহীন চিত্তে।’
‘ঈশ্বরের শপথ?’
‘ঈশ্বর সাক্ষী।’
স্বস্তির শ্বাস ফেলল র্যাচেল। বলল,
‘তোমার বাবা স্টিফেন ওরির কথা তুমি তো শুনেছ, জেসন। আমি কখনও কিছু না বললেও মানুষের মুখে নিশ্চয়ই অনেক কথাই তোমার জানা হয়েছে। সে যে কতখানি অমানুষ, কত দুর্ব্যবহার আর অন্যায় সে যে করেছে আমার সঙ্গে এসব তোমার অজানা নেই নিশ্চয়ই?’
‘আমি জানি, মা,’
মুখ নিচু করে বলল জেসন।
ফুঁপিয়ে উঠল র্যাচেল। ‘আমাকে মারত ও।’
অস্ফুট একটা আওয়াজ বেরল জেসনের গলা থেকে। বুকটা যেন ফেটে গেল মায়ের দুঃখে।
‘তবুও আমার মনে কোন দুঃখ ছিল না,’ বলে চলল র্যাচেল।
‘তোমার বা আমার প্রতি কোন দায়িত্বই সে পালন করেনি, তবু মনের জোর হারাইনি। কিন্তু যখন খবর পেলাম ম্যান দ্বীপে আছে সে, আবার বিয়ে করেছে, একটা ছেলেও হয়েছে সেই ঘরে, মনটা ভেঙে গেল আমার। হ্যাঁ, আমি বেঁচে থাকতেই আবার বিয়ে করেছে তোমার বাবা। গির্জায় গিয়ে পাদ্রির সামনে দাঁড়িয়ে বাইবেলের বাণী উচ্চারণ করে বিয়ে করেছে ও।’
শেষ দিকে ভেঙে গেল র্যাচেলের গলা।
ধর্মভীরু ছেলে জেসন, মায়ের কথায় কাঁপন দিল। হাহাকার করে উঠতে ইচ্ছে হলো ওর। বুকটা যেন ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে গেল মায়ের অপমানে। কোনদিন যে বাবার স্নেহ ও পায়নি তার নিষ্ঠুরতা রাগান্বিত করে তুলল ওকে।
‘তোমার বাবার দ্বিতীয় বিয়ের খবর শোনার পর থেকে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি আমি,’ ধীর গলায় বলল র্যাচেল।
‘জানি আর বেশিদিন আমি বাঁচব না। সেজন্যেই তোমাকে আজকে বলছি এসব। আমার একটা শেষ ইচ্ছে আছে তোমার প্রতি, তা-ই আজকে তোমায় বলব।
* আইডা, মেরু প্রদেশের বৃহদাকার হাঁস।
চলবে.....
#TheBondman #HallCaine #CClassicLiterature
#ShebaProkashoni #BookRecommendation #BookLover #বাংলাবুকগ্রাম