#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০২
বাবা হওয়ার পর থেকে স্টিফেন ভাবতে লাগল কি করে সানলককে মানুষ করে তোলা যায়। ভেবে ভেবে একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধিও এলো। চিন্তা ভাবনা করে স্টিফেন দেখল এছাড়া আর কোন উপায় নেই সানলককে মানুষ করার। ম্যান দ্বীপের গভর্নর অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদার অতি সজ্জন লোক। কোন শত্রু নেই তাঁর। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। দ্বীপের শাসনকর্তা ডিউক অভ অ্যাথল এদ্বীপে থাকেন না, মাঝে মাঝে যখন দু'একদিনের জন্যে আসেন, তখনও প্রশাসনের ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করেন না, অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদারের ওপর সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করে নিশ্চিন্তে আছেন তিনি।
এই অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদারকে জীবনে মাত্র একদিন দেখেছে স্টিফেন। অনেক বছর আগে সে যখন ইংরেজ জাহাজ থেকে পালিয়ে এই দ্বীপে উঠেছিল তখন এই ফেয়ারব্রাদারই তাকে খাবার দিয়েছিলেন, রাতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বাঁচিয়েছিলেন নাবিকদের হাত থেকে। সেজন্যে কৃতজ্ঞ নয় স্টিফেন। জীবনে কোনদিন কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেনি সে অন্তরে, কিন্তু কেমন একটা বিশ্বাস যেন জন্মে গেছে ওর, নিষ্পাপ শিশু সানলকের জন্যে ফেয়ারব্রাদারের কাছে ও যদি একটু আশ্রয় চায় তো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না ভদ্রলোক। গরীবের দুঃখে দুঃখী হয়ে বেতনের সিংহভাগটাই যিনি সাহায্যপ্রার্থীদের হাতে তুলে দেন তিনি সানলকের দায়িত্ব না নিয়ে পারবেন না।
সেই ইচ্ছেই রয়েছে স্টিফেনের। অ্যাডামের হাতে তুলে দেবে সানলককে। কিন্তু ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ সে করতে পারছে না। একপা এগোয় তো দু'পা পিছিয়ে যাচ্ছে স্টিফেন বারবার। সানলক ওর জীবনের আলো, সেই আলোকে অ্যাডামের হাতে তুলে দিলে অন্ধকার হয়ে যাবে ওর জীবনটা। গভর্নর ফেয়ারব্রাদার এই দ্বীপের গভর্নর, তারওপর অত্যন্ত ভদ্র এবং সম্মানিত লোক, তাঁর বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে দেখে আসবে ওর মতো এক চোরাকারবারী, এটা হয় না। দ্বীপের সবাই তাকে দুর্বৃত্ত বলেই জানে, ওর ঘন ঘন গভর্নরের বাড়ি যাওয়া আসা ভদ্রলোকের সুনামের জন্যে ক্ষতির কারণ হবে। তার চেয়েও বড় কথা সে গেলে খবর ছড়াবে, লিজা জেনে যাবে ছেলে কোথায় আছে। তা হতে দেয়া যাবে না। থাকুক। লিজা তার কুটিরে পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে, যা ইচ্ছে করুক নিজের জীবন নিয়ে, কিন্তু সানলকের জীবনে তার কোন প্রভাব স্টিফেন পড়তে দেবে না। সানলকের সঙ্গে ওর সম্পর্ক যত কম লোক জানে ততই ভাল।
সানলককে অ্যাডামের হাতে দিয়ে দেয়ার অর্থই হচ্ছে চিরতরে ওকে হারানো। এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হতেই পারে। তাই হয়েছে গত তিন-চার বছর। কিন্তু এবার আর গড়িমসি করে দেরি করবে না স্টিফেন। ভাল একটা প্রস্তাব পেয়েছে ও। বড় একটা চোরাচালানী চক্রের হয়ে কাজ করার সুযোগ এসেছে। বেশ কয়েক বছর তাকে নানা দেশে ঘুরতে হবে গোপন ব্যবসা নিয়ে। কবে ফিরবে, আদৌ ফিরতে পারবে কিনা কোনদিন, সবই অনিশ্চিত।
যাবে এই অভিযানে, মনস্থির করে ফেলেছে স্টিফেন। এত বড় সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না। যদি সে কাজ সেরে বেঁচে ফিরতে পারে তাহলে সঙ্গে প্রচুর টাকা-পয়সা নিয়েই ফিরবে। সেই টাকায় সানলককে কলেজে পড়াতে পারবে। ছেলে মানুষের মতো মানুষ হোক এটা আন্তরিক ভাবেই চায় স্টিফেন। প্রাথমিক লেখাপড়া অবশ্য সানলকের অভিভাবক অ্যাডামই শেখাবেন বলে আশা করছে ও। সানলককে অ্যাডাম কলেজেও পড়াবেন এটা আশা করা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, এটা স্টিফেন বোঝে। অ্যাডামের নিজেরই সাত ছেলে-মেয়ে, অনেক খরচ তাঁর, তাঁকে অর্থনৈতিক ভাবে আরও চাপের মুখে রাখার কোন ইচ্ছে নেই স্টিফেনের। নিজের ছেলের লেখাপড়ার খরচের ভার ও নিজেই নেবে। কয়েক বছর ব্যবসা করে যে-টাকা লাভ পাবে তাতে সানলকের পড়ার খরচ হয়ে যাবে। আইসল্যান্ডের বিশপ জনের ল্যাটিন কলেজের নাম ছাড়া আর কোন কলেজের নাম জানে না নিরক্ষর স্টিফেন। কাজেই ওখানেই ছেলেকে পড়তে পাঠাবে ঠিক করেছে ও।
মনস্থির করে নিল স্টিফেন। আর দেরি করা যায় না। চোরাচালানী চক্রের হোতা তাগাদা দিয়ে খবর পাঠিয়েছে, যেতে যদি হয় তো দু'একদিনের মধ্যেই রওয়ানা হতে হবে ওকে।
গভর্নর ফেয়ারব্রাদার সাধারণত র্যামজে শহরে তাঁর সরকারী বাসভবনেই বাস করেন। তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা অবশ্য থাকে লেণ্ডতে, তাঁর মস্ত খামার বাড়িতে। মাঝে মাঝে তিনি লেণ্ডতে বেড়াতে আসেন, দু'এক রাত কাটিয়ে যান এখানে। যেদিন জাহাজ থেকে পালিয়ে এখানে এসেছিল স্টিফেন, সেদিন সৌভাগ্যবশত খামার বাড়িতে ছিলেন ফেয়ারব্রাদার। আজও স্টিফেনের ভাগ্য ভাল, সানলককে কাঁধে নিয়ে যখন সে খামার বাড়িতে হাজির হলো, বাড়িতেই পেল ফেয়ারব্রাদারকে। ফেয়ারব্রাদার র্যামজেতে নিজের সরকারী বাসভবনে থাকলে স্টিফেনের মতো চোরাকারবারী সেখানে গিয়ে দেখা করার সাহস পেত কিনা সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।
সন্ধ্যা নাগাদ লেণ্ডর খামার বাড়িতে হাজির হলো স্টিফেন। দরজায় টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদার তখন সপরিবারে ডিনার খেয়ে উঠেছেন মাত্র। ছেলে-মেয়েরা চলে গেছে নিজেদের ঘরে। স্ত্রী আর তিনি বসে আছেন ডাইনিং রুমে। তাঁর স্ত্রী ঘরের এককোণে কি যেন করছেন। চাকর এসে খবর দিল এক লোক কাঁধে একটা বাচ্চা নিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
কাউকে ফিরিয়ে দেয়া অ্যাডামের ধাতে নেই। খাবার টেবিলে বসেই তিনি বললেন,
'তাকে আসতে বলো, শুনি কি চায় সে।'
আজকে স্টিফেনকে প্রথম দিনের মতো ভাবভঙ্গিতে মনের ভাব প্রকাশ করতে হলো না। ইংরেজি ভাষার বিকৃত রূপ প্রচলিত আছে ম্যান দ্বীপে। সেই ম্যাঙ্ক্স ভাষা এতদিন মোটামুটি রপ্ত করে নিয়েছে স্টিফেন। প্রাথমিক সম্ভাষণ শেষে ফেয়ারব্রাদার যখন জানতে চাইলেন সে কেন এসেছে, বিনয়ের সঙ্গে স্টিফেন বলল,
'আমি এসেছি আপনাকে একটি উপহার দিতে।'
'উপহার?'
বিস্মিত হলেন ফেয়ারব্রাদার।
'অবাক করলে। এতদিন ধরে আমি গভর্নর, কখনও দেখিনি কেউ আমাকে কিছু উপহার দিচ্ছে। যারা আসে তারা চাইতেই আসে বলে জেনে এসেছি এতদিন। আজকে তোমাকে প্রথম দেখলাম যে উপহার দিতে এসেছ।'
চেয়ার দেখালেন তিনি।
'ওসব কথা পরে হবে। খাওয়া হয়েছে তোমার? তোমার হাত ধরে যে সুন্দর বাচ্চা ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা শুকনো লাগছে ওর, খাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই? বসে পড়ো। ডিনার শেষ, তবে দেখছই তো টেবিল এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। খেতে খেতে বলো কি বলবে।'
'অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।'
মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল স্টিফেন।
'আমরা খেয়েই এসেছি।'
এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল সে গভর্নরের দিকে, তারপর বলল,
'আমাকে চিনতে পারছেন? আজকে না খেলেও আজ থেকে অনেক দিন আগে কিন্তু খেয়েছিলাম আমি আপনার এখানে। খিদেয়, তৃষ্ণায় মৃতপ্রায় ছিলাম তখন, মনে পড়ে? আপনি নিজের হাতে আমার খাবার বেড়ে দিয়েছিলেন, শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আস্তাবলে? সেদিন যদি আপনি আমাকে আশ্রয় না দিতেন তাহলে বন্দি হয়ে আবার আমাকে ফিরে যেতে হতো জাহাজে, ক্রীতদাসের মতো পরিশ্রম করতে করতে হয়তো এতদিন মরেই যেতাম।'
বন্দি! ক্রীতদাস! বুকের ভেতরটা নড়ে গেল ফেয়ারব্রাদারের। তিক্ত স্মৃতি মনে পড়ল। যুবক তখন অ্যাডাম। যুদ্ধে গেলেন আফ্রিকায়। যুদ্ধ হচ্ছে, হঠাৎ একদিন তিনি বন্দি হলেন এক বর্বর উপজাতির হাতে। দেড় বছর অকথ্য নির্যাতন চলল তাঁর ওপর। নারকীয় সে যন্ত্রণা। অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো তাঁকে। ঐকেক সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যেতেন। জ্ঞান ফিরলেই আবার কাজে লাগিয়ে দেয়া হতো তাঁকে। একটু থামলেই কপালে জুটত বর্শার খোঁচা। রক্তাক্ত হয়ে যেত সারা শরীর। সেই সময়ের কথা ভাবলে এখনও বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায় তাঁর। মনে প্রাণে কামনা করেন পৃথিবীতে কেউ যাতে বন্দি হয়ে নির্যাতন ভোগ না করে।
স্টিফেনের দিকে তাকিয়ে বাস্তবে ফিরে এলেন তিনি। নরম সুরে জিজ্ঞেস করলেন,
'কি বলছিলে, কি দিতে চাইছিলে তুমি?'
ঢোক গিলল স্টিফেন। গলার ভেতরটা শুকিয়ে আসছে। ভাঙা গলায় বলল,
'দিতে এসেছি এই ছেলেটাকে। আপনি একে নিয়ে নিন। আমাকে আপনি একদিন ক্রীতদাসের জীবন থেকে উদ্ধার করেছিলেন, আজ একেও বাঁচান দয়া করে। দেখুন একবার ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে, কোন পাপ স্পর্শ করেনি ওকে। আপনি যদি ওকে না নেন, কিছু দিন পর এই ছেলেই হবে নরপিশাচ। মাতাল, লম্পট, লোভী মানুষদের নোংরা সমাজ একেও অমানুষ করে দেবে। আমি আপনার কাছে এসেছি ওকে দিতে। বড় নিরুপায় আমি। আমার সাধ্য নেই ওকে মানুষ করব।'
এতক্ষণ নীরবে ঘরের কোণে একটা চেয়ারে বসে স্টিফেনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন অ্যাডামের স্ত্রী রুথ, আস্তে আস্তে ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছিল, এবার গলা খাঁকারি দিলেন তিনি। অ্যাডামের স্ত্রী আর অ্যাডামের চরিত্রে আকাশ-পাতাল তফাৎ। টাকা ছাড়া আর কিছু চেনেন না। ধনসম্পদ এতই ভালবাসেন যে প্রয়োজনে নিজের ছেলে-মেয়েকেও তুচ্ছ জ্ঞান করতে পারেন। কোথাকার কোন্ উটকো ছোকরা এসে এই বাড়িতে মানুষ হবে, তার পেছনে অর্থ ব্যয় হবে, এটা তাঁর চিন্তার অতীত। খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি, 'সবাই কি মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে! সমাজে দু'একজন ভাল মানুষ থাকলেই চলে। অমানুষের মতো মানুষ হয়েও দেখো গিয়ে কত লোকে নিশ্চিন্তে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে। যাও এখান থেকে, আমি বাঁচি না নিজের জ্বালায়, ছয় ছয়টা ছেলে আমার, তাদের খরচ দিয়েই কুলিয়ে উঠতে পারছি না আর তুমি এসেছ বাড়তি ঝামেলা ঘাড়ে দিতে।'
'রুথ!' আহত স্বরে বলে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার। আস্তে আস্তে কঠোর হয়ে গেল তাঁর কোমল চেহারা। মৃদু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন,
'আমি এই বাচ্চার ভার নেব। সাধ্য থাকলেও যে একটা অসহায় শিশুকে মানুষ করার দায়িত্ব এড়িয়ে যায় তাকে আমি মানুষ বলে মনে করি না।' সানলকের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। 'এসো তো, খোকা, আমার কাছে এসো তো!'
শিশুর সরলতায় তাঁর কোলে গিয়ে উঠল সানলক। রুথ বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা হবে, এখানে তার উপস্থিতি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বাড়িয়ে তুলবে আরও, বেশ তাড়াহুড়ো করেই গভর্নরের কাছ থেকে বিদায় নিল স্টিফেন। শেষবারের মতো সানলকের কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে এলো খামার বাড়ি থেকে। পা সরছে না তার, মনটা কেমন যেন উথালপাতাল করছে, আবার একই সঙ্গে স্বস্তিও বোধ করছে, ছেলে তার মানুষ হবে। মানুষের মতো মানুষ। এবার নিজের কাজে বেরিয়ে যেতে দ্বিধা নেই কোন। অনেক অর্থ উপার্জন করবে সে, সানলককে কলেজে পড়তে পাঠাবে। দ্রুত পায়ে নির্জন জলাভূমির দিকে ফিরে চলল স্টিফেন। না, লিজার সঙ্গে দেখা করতে নয়, ওপথে চলে যাবে সে নিজের কাজে। লিজা তার যা ইচ্ছে করুক, কিন্তু সানলকের কোন খোঁজ যাতে না পায়।
সানলক উপযুক্ত একজন অভিভাবক পেল। বাইরের কেউ জানল না এই শিশুকে কেন্দ্র করে অশান্তির ঝড় বইতে শুরু করেছে গভর্নরের পরিবারে। গোপনে শলাপরামর্শ চলতে লাগল। রুথ তাঁর ছেলেদের উস্কে দিলেন বাবার বিরুদ্ধে। বেয়াদবি শুরু করল ছেলেরা। সবাই মিলে একদিন ফেয়ারব্রাদারকে চেপে ধরল, এই খামার বাড়ি তাদের মায়ের নামে লিখে দিতে হবে। যুক্তি হিসেবে বলল ফেয়ারব্রাদার যেরকম মানুষ তাতে ভবিষ্যতে তিনি ছেলেদের বঞ্চিত করে সানলককে খামারের একটা অংশ দিয়ে দেবেন না তার নিশ্চয়তা কি! জোর সমর্থন পেল তারা মায়ের।
রুথ বললেন, সানলকের মতো পালক ছেলে তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের মতো খাবার খাবে, নরম বিছানায় শোবে এটা হতে দেয়া যায় না।
তিক্ত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো বাড়িতে। নির্বিবাদ শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক ফেয়ারব্রাদার, অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন স্ত্রী আর ছেলেদের চাপাচাপিতে। শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন খামার বাড়ি লিখে দিতে। ছেলেদের শর্তই মেনে নিলেন তিনি, এক হাজার একর জমির এই খামার স্ত্রীর নামে দান করে দেবেন, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর খামারের উত্তরাধিকারী হবে তাঁদের ছয় ছেলে আর এক মেয়ে।
খামার দান করে দিলে অ্যাডামের কি করে চলবে? কেন, তাঁর তো গভর্নরের চাকরি আছে। মোটা বেতন পান তিনি সেই চাকরিতে। তাঁর আর সানলকের সেই টাকাতেই চলে যাবে।
শেষ পর্যন্ত এভাবেই বিরোধ নিষ্পত্তি হলো। বাপ-দাদার সম্পত্তি তিনি বউয়ের নামে লিখে দিলেন, কিন্তু তবু পালক ছেলে সানলকের দায়িত্ব এড়িয়ে গেলেন না।
তিন
দেখতে দেখতে কেটে গেল দশটি বছর।
ম্যান দ্বীপ ছাড়ার দশ বছর পর ফিরে এলো স্টিফেন ওরি। ততদিনে মারা গেছে লিজা। তাতে অবশ্য দুঃখিত হলো না স্টিফেন। মনে হলো তার যা প্রাপ্য ছিল তাই পেয়েছে মেয়েলোকটা।
নির্জন জলাভূমির ভেতর নিভৃত উপত্যকায় লিজা যখন মারা যায় কেউ ছিল না তার পাশে। কেউ জানত না লিজা মারা গেছে। কাছের প্রতিবেশীও বাস করে দুই মাইল দূরে। তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না চরিত্রাহীনা লিজার সঙ্গে। নোংরা বদমাশ ভবঘুরে কিছু লোক ছাড়া আর কেউ তার কাছে আসত না। যারা আসত নিতান্ত জৈবিক চাহিদা মেটাতেই আসত।
লিজার মৃত্যুর খবরটা কিভাবে ছড়াল তা সঠিক জানা যায় না, তবে পোর্ট লা ভিউলিনে খবরটা ছড়াল। হয়তো কোন জেলে গিয়েছিল সেই জলাশয়ে মাছ ধরতে, অথবা বিশেষ উদ্দেশ্যে কেউ উঁকি দিয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা কুঁড়েতে, আবিষ্কার করেছিল বিছানায় পড়ে আছে পচা-গলা একটা মেয়েমানুষের লাশ। তারপর ছুটে গিয়ে সে খবর দিয়েছিল গ্রামে। গ্রাম থেকে দু'চারজন জেলে গিয়ে কোনরকমে জঙ্গলে একটা গর্ত খুঁড়ে লিজাকে কবর দেয়। পাদ্রি পাওয়া যায়নি সে-সময়ে। অবশ্য কয়েকদিন পরে গ্রামের লোকরা পাদ্রি ডেকে এনেছিল। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পাদ্রি ভেবে নিয়েছিলেন কি বলবেন, তারপর পবিত্র বাইবেল থেকে উচ্চারণ করেছিলেন, পাপী আত্মা পরকালে শান্তি লাভ করুক।
লিজার ছেলে যে কাছেই র্যামজে শহরে গভর্নরের বাড়িতে আছে সে-কথা গ্রামের জেলেদের কেউ জানত না। জানার কথাও নয়। স্টিফেন কাউকেই বলেনি সানলককে সে কোথায় রেখে গেছে। ওর ভয় ছিল লোক মুখে সানলক কোথায় আছে একথা লিজার কানে গেলে দজ্জাল মেয়েমানুষটা গভর্নরের বাড়িতে গিয়ে হাঙ্গামা করবে। ছেলের প্রতি টানের কারণে না হলেও স্টিফেনকে জব্দ করার জন্যেই যে গভর্নরের কাছ থেকে ছেলেকে নিজের হেফাজতে নিয়ে আসবে লিজা, এতে কোন সন্দেহ ছিল না স্টিফেনের মনে।
একদম চুপচাপ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল স্টিফেন। লিজা এবং অন্যরা যখন সানলকের কোন খবর পেল না, ধরেই নিল ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে স্টিফেন। সে যে ছেলেকে কতটা ভালবাসে তা চেনা লোকরা ভালমতোই জানত। বন-বাদাড়ে লিজা আর স্টিফেনের বাস। অসামাজিক কাজে দু'জনেই লিপ্ত।
চলবে......