#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৯
অধিবেশন কক্ষ থেকে জর্গেন জর্গেনসেনের সৈন্যরা সামলককে গ্রেফতার করতেই খবর ছড়িয়ে গেল, আইসল্যান্ড আবারও ডেনমার্কের পরাধীন রাজ্য হয়ে গেছে। সরকারী প্রাসাদে বসে গ্রেবা খবর পেল জর্গেনসেন আসছেন। ভদ্রলোক যে সামলকের স্ত্রীকেও ছাড়বেন না এটা গ্রেবা জানত। তাই দেরি না করে পালাল গ্রেবা।
কিন্তু কোথায় মিলবে আশ্রয়? বিশপ জন হয়তো মাথা গোঁজার ঠাঁই দেবেন, কিন্তু গ্রেবার তাতে চলবে না, স্বামীর সান্নিধ্য লাভের জন্যে উন্মুখ হয়ে উঠেছে ও। সামলকের কাছে যেতে হবে। কিন্তু আর কেউ জানলে চলবে না সে সামলকের কাছে গেছে, তাহলে ধরা পড়ে যেতে হবে সরকারী সৈন্যদের হাতে। আর ধরা পড়লেই বিদ্রোহী নেতার স্ত্রী হিসেবে তাকেও বন্দি করবেন জর্গেনসেন।
আত্মপরিচয় গোপন করে সানলকের কাছাকাছি পৌঁছতে হবে।
সানলককে নিয়ে গেছে গন্ধকের ময়দানের মজুর করে। গ্রেবা ঠিক করল সেখানেই যাবে ও। ওই নরকে গিয়ে হলেও সানলকের কাছাকাছি থাকবে। স্বামীর কাছে থাকার সুযোগ পেলে পৃথিবীর যেকোন জায়গায় নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে ও।
গন্ধকের ময়দানের কাছেই বন্দিদের জন্যে একটা হাসপাতাল আছে। সেখানে চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। ডাক্তার নার্সের বালাই প্রায় নেই বললেই চলে। ওখানে গিয়ে হাজির হলো গ্রেবা। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইল হাসপাতালে নার্স নেয়া হবে কিনা।
কর্মকর্তা বিস্মিত হয়ে দেখলেন রূপবতী গ্রেবাকে।
তারপর বললেন,
'আসলেই নার্স দরকার। অনেকেই এসেছে নার্স হয়ে। তারা সবাই পুরুষ ছিল। চলে গেছে দু'দিন কাজ করে। এখানে কেউ থাকতে চায় না। একে এদিকের বাতাস বিষাক্ত, তারওপর শরীর পোড়া রোগীদের দেখলে বমি আসে। তুমি মেয়েমানুষ, আমার মনে হয় না তুমি একদিনও টিকতে পারবে।'
টিকতেই হবে! চাকরিটা নিল গ্রেবা। মনে ওর আশা, কখনও না কখনও সানলকের দেখা পাবে। আবার একই সঙ্গে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও করছে, সানলকের যাতে কোন রোগ না হয়। কিন্তু রোগ যদি হয়? তখন তো এই হাসপাতালেই সানলককে পাঠানো হবে। তখন গ্রেবার সঙ্গে দেখা হবে ওর। সানলকের সেবা করতে পারবে গ্রেবা, শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুলতে পারবে। আর দেখা যদি নাও হয় তবু গ্রেবা সানলকের খুব দূরে নেই এটা একটা বড় সান্ত্বনা।
কিন্তু গ্রেবার কপালে সুখ নেই। সানলকের নৈকট্যে আছে এই সান্ত্বনাটুকুও যেন ওর প্রাপ্য নয়। হাসপাতালের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারী, সবাই ওকে নানা ভাবে উত্ত্যক্ত করতে লাগল। বাড় বাড়তে লাগল। শেষে লালসার হাত বাড়াল। শারীরিকভাবে অত্যাচারিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় বাধ্য হয়ে হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিল গ্রেবা। একরকম পালিয়েই সে আশ্রয় নিল কাছের গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়িতে।
সেই বাড়িতে একদিন ফিরে এলো গৃহস্থের যুবক ছেলে। সে যখন সবার সঙ্গে তার অভিযানের ব্যাপারে গল্প করছে, গ্রেবা জানতে পারল জাহাজে চাকরি নিয়ে আইরিশ সাগরে গিয়েছিল যুবক। আইসল্যান্ডে ফেরার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ। রেইকিয়াভেকে আর ফেরা হলো না। প্রচণ্ড ঝড় আইসল্যান্ডের উত্তর প্রান্তে জাহাজটাকে ঠেলে নিয়ে গেল। সেখানে একটা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ডুবে গেছে জাহাজ।
তবে যাত্রীরা কোনরকমে তীরে উঠতে পারল। স্থির হলো সেখান থেকে পায়ে হেঁটে রেইকিয়াভেকের দিকে রওনা হবে সবাই। পথে একটা দুর্ঘটনায় জাহাজের ক্যাপ্টেন আর মেট, দু'জনই মারা গেলেন। নেতৃত্বের সংকট দেখা দিল দলে। তখন সবাই মিলে একজনকে নেতা নির্বাচন করল ওরা। ভদ্রলোক বয়স্ক, স্থিতধী, বিবেচক এবং সহৃদয়। কিছুদিন যেতে না যেতে দলের তিরিশ জন নাবিক আর যাত্রীর হৃদয় তিনি জয় করে নিলেন। বাড়ি তাঁর ম্যান দ্বীপে, আইসল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন এক আত্মীয়ের খোঁজে। যুবকের কথা শেষ হতে গ্রেবা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল,
‘ভদ্রলোকের নাম কি অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদার?’
‘হ্যাঁ।’ বিস্মিত হলো যুবক। ‘তুমি জানলে কি করে?’
গ্রেবা যখন আইসল্যান্ডে আসে তখন ওর মুখে সানলক জানতে পারে যে অ্যাডামও আসছেন। তারপর খবর পাওয়া যায় অ্যাডামের জাহাজ ডুবে গেছে। তিনি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন সে-খবর নেয়ার জন্যে আইসল্যান্ডের উত্তরে লোক পাঠায় সানলক। কিন্তু তার লোক সেখানে পৌঁছবার আগেই ভাগ্য বিপর্যয় হলো সানলকের। প্রেসিডেন্ট থেকে হয়ে গেল সে গন্ধকের ময়দানের বন্দি। সানলকের লোক অ্যাডামের খোঁজ নেয়া স্থগিত করে দিল। জানা হলো না অ্যাডাম বেঁচে আছেন কিনা। আর সব যাত্রীদেরই বা কি অবস্থা।
এতদিনে বাবার খোঁজ পেল গ্রেবা। ভদ্রলোক বয়স্ক। বাড়ি ম্যান দ্বীপে। বিচক্ষণ লোক তিনি। প্রাজ্ঞ। হিতৈষী। অনায়াসে নাবিক আর যাত্রীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন তিনি নিজের মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে। এই ভদ্রলোক অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদার, অর্থাৎ ওর বাবা ছাড়া আর কে হবেন!
নাবিক আর যাত্রীদের সেই দলটা এখন কোথায়, যুবকের কাছে জানতে চাইল গ্রেবা।
যুবক বলল,
‘ওরা রেকয়াভেকের দশ মাইলের মধ্যে এসে পড়েছে। আমার বাড়ি পথে পড়ে বলে চলে এসেছি আমি। ওরা এখনও পথ চলছে।’
‘ওদের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে হবে,’ বলল গ্রেবা।
‘ওই বয়স্ক ভদ্রলোক আমার বাবা।’
গ্রেবার অনুরোধে দেরি না করে পথ দেখাল যুবক। রেইকিয়াভেকের বেশ আগেই যাত্রী দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের।
গ্রেবাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন অ্যাডাম। জড়িয়ে ধরলেন বুকে। চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু বিন্দু পড়তে লাগল। গ্রেবাও কেঁদে ভাসাল। দু’জনের কেউই ভাবেনি এভাবে নতুন দেশের অপরিচিত পরিবেশ আকস্মিকতে পরস্পরের দেখা হবে।
গ্রেবার মুখে অ্যাডাম জানলেন সানলক এখন তাঁর মেয়ে-জামাই।
যেখানে ওদের দেখা হলো সে জায়গাটা রেইকিয়াভেক শহর থেকে আট-দশ মাইল দূরে। গন্ধকের ময়দান, সেই আগুনে পাহাড় মাত্র দু’মাইল এখান থেকে।
সমুদ্রের তীরবর্তী খাড়া পাহাড়শ্রেণীর ওপর দিয়ে সবাইকে নিয়ে এতটা পথ এসেছেন অ্যাডাম। এই পাহাড়শ্রেণী থেকে নেমে দুই মাইল পুবে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গন্ধকের ময়দানে।
অ্যাডাম যখন শুনলেন সানলককে ভয়ঙ্কর গন্ধকের ময়দানে বন্দি করে মজুরের কাজ করানো হচ্ছে, অত্যন্ত আঘাত পেলেন মনে। তিনি চিন্তা করে দেখলেন সানলককে ফেলে তাঁর পক্ষে রেইকিয়াভেকে যাওয়া কোনমতেই সম্ভব নয়। অন্তত সানলকের সঙ্গে দেখা না করে...
গন্ধকের ময়দানে যাবেন তিনি, চেষ্টা করে দেখবেন সানলকের সঙ্গে দেখা করা যায় কিনা। দেখা করা না গেলেও খোঁজ তো অন্তত পাওয়া যাবে। সঙ্গীদের ডেকে থামালেন অ্যাডাম। ধীর শান্ত গলায় বলে গেলেন তাঁর মেয়ে-জামাইয়ের ভাগ্যে কি ঘটেছে। শেষে তিনি বললেন,
'আমাকে যেতে হচ্ছে। চেষ্টা করে দেখব সানলকের কোন খোঁজ বের করতে পারি কিনা। এখান থেকেই আমি বিদায় নেব। তোমরা অনেক পথ আমার সঙ্গী হয়েছ, সেজন্যে ধন্যবাদ। আমার যদি কোন দোষ-ত্রুটি হয়ে থাকে তাহলে তোমরা ক্ষমা করে দিয়ো।'
এক সঙ্গে বিপদের মাঝ দিয়ে পথ চললে পরস্পরের প্রতি একটা দায়িত্ব তৈরি হয়ে যায়। নিতান্ত অমানুষ না হলে সেই দায়িত্ব কেউ এড়িয়ে যায়, না। অ্যাডামের কথা শুনে যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল। সবাই ওরা স্বাধীনতাকামী। আইসল্যান্ডের আপামর জনসাধারণের মতোই ডেনমার্কের অধীনে থাকতে নারাজ। দেশের কোন কাজে যদি লাগতে পারে তো নিজের জীবন দিতেও আপত্তি করবে না কেউ।
যাত্রীদের একজন অ্যাডামকে বলল,
'অনেকদিন একসঙ্গে পথ চলেছি আমরা। এখন যদি আপনার বিপদের সময় আপনাকে ছেড়ে চলে যাই, নিজেদের মানুষ বলে মনে হবে না আমাদের। আমরা কেউ যাচ্ছি না। আপনি যতদিন আপনার জামাইকে মুক্ত করতে না পারেন আমরা আপনার সঙ্গেই আছি।'
আপ্লুত হয়ে গেলেন অ্যাডাম লোকটার কথা শুনে। অশিক্ষিত আইসল্যান্ডবাসীদের আন্তরিকতা আর সহমর্মিতাবোধ অন্তর ভিজিয়ে দিল তাঁর। এত নিঃস্বার্থ ভাবে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতে আর কাউকে কখনও দেখেননি তিনি।
আলোচনা হলো কি করে সানলককে মুক্ত করা যায়। শেষে ঠিক হলো জ্যাক নামের করিৎকর্মা এক যুবককে তিনি গন্ধকের ময়দানের বন্দিশালায় পাঠাবেন, কৌশলে সে সানলকের খবর জেনে আসবে।
'সানলকের নাম ওখানে কেউ জানবে বলে মনে হয় না,
' তাকে বললেন অ্যাডাম। 'বন্দির পরিচয় তার নম্বরে। সানলকের নম্বর কত তা আমি জানি না। তবে তুমি একটা কাজ করতে পারো। সানলক ছিল স্বাধীন আইসল্যান্ডের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তার এই পরিচয়ে হয়তো ওখানে কেউ চিনতে পারে তাকে।'
চলে গেল জ্যাক। ফিরে এলো এক ঘণ্টা পর। চাঞ্চল্যকর খবর নিয়ে এসেছে। আজই সকালে গন্ধকের প্রান্তর থেকে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সানলক। তিনি সম্ভবত গন্ধকের ময়দানের শেষ প্রান্তের গিরিখাত দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
একদল সৈন্য পুরোপুরি সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে গেছে তাঁকে ধরে নিয়ে আসার জন্যে। সবার অবশ্য ধারণা তাঁকে জীবন্ত ধরে আনা সম্ভব হবে না। এতক্ষণ তাঁর বাঁচার কথা নয় ওই পাথুরে মাঠে। মাথার ওপর আগুন ঢালছে সূর্য, মাটি ফেটেও উঠছে আগুন। সঙ্গে আছে বিষাক্ত ঘন ধোঁয়া। শ্বাস নেয়া যায় না ওই ধোঁয়ায়, ফুসফুস জ্বলে যায়। তবে লাশ পেলেও নিয়ে আসবে সৈন্যরা। প্রেসিডেন্ট সানলকের লাশ দেখতে চেয়েছেন গভর্নর জর্গেনসেন। লাশ না দেখলে নিশ্চিত হতে পারবেন না তিনি। সানলক যদি ভুলেও বেঁচে যায় আবার বিপ্লব সংঘটিত হতে পারে। সেই ঝুঁকি তিনি নিতে পারেন না। গিরিখাত! ওই পথে সানলক বেরিয়ে আসতে চাইছে!
জ্যাকের কথাটা অ্যাডামের মাথার ভেতরে অনবরত ঘুরছে। গিরিখাত! ওই গিরিখাত দিয়ে আসবে সানলক। জিজ্ঞেস করলেন তিনি,
'গিরিখাতটা চেনো কেউ?'
অনেকেই চেনে। গন্ধকের মাঠের ওপর দিয়ে গেলে শেষ মাথায় আছে সেই গিরিখাত।
মাথা নাড়লেন অ্যাডাম।
'গন্ধকের মাঠের ভেতর দিয়ে যেতে পারব না আমরা। সৈন্যরা বাধা দেবে। অন্য কোন পথ নেই? পাহাড়ের ওপর দিয়ে সেই গিরিখাতে পৌঁছুনো যায় না?'
'যায়।'
'আরও পথ আছে।'
'পাহাড়ের ওপর দিয়ে গেলে আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছুনো যাবে।'
'তবে আমরা পৌঁছব গিরিখাতের বাইরের অংশে। সেখান থেকে ভেতরে ঢুকতে হবে।'
'একবারে একজনের বেশি হাঁটতে পারবে না। লাইন ধরে সবাইকে যেতে হবে।'
'আর দেরি করা ঠিক হবে না। চলো তোমরা।'
পা বাড়ালেন অ্যাডাম। দ্রুত পায়ে হাঁটছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে যাত্রী আর নাবিকের দলটা।
সৈন্যরা পিছু ধাওয়া করে আসছে। সঙ্গে তাদের কুকুর আছে। পাথর শুঁকে বন্দিদের গন্ধ অনুসরণ করে ছুটছে তারা। কুকুর না থাকলে সৈন্যদের সাধ্য ছিল না জেসন আর সানলককে এই পাথুরে ময়দানে অনুসরণ করে। চারপাশে শুধু পাথর আর পাথর। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। এবড়োখেবড়ো। খানাখন্দে ভরা। পায়ের চিহ্ন ফেলে যায়নি জেসন।
'পানি! একটু পানি! গলা জ্বলে যাচ্ছে!' মাঝে মাঝে অচেতনপ্রায় সানলকের কণ্ঠ চিরে কাতরোক্তি বেরিয়ে আসছে। জেসনের কাঁধেই এখনও পড়ে আছে ও। একটানা ছুটছে জেসন।
ও কি মানুষ? সকালে দৌড় শুরু করেছিল ও, এখন প্রায় বিকেল। কাঁধে সানলককে নিয়ে সাত-আট ঘণ্টা একনাগাড়ে দৌড়ে চলেছে ও। কোন বিশ্রাম নেই। ফোঁসফোঁস করে শ্বাস নিচ্ছে। ফুলে ফুলে উঠছে বুক। পানির অভাবে অনেকক্ষণ হলো গা থেকে ঘাম বেরচ্ছে না। প্রতিবার পা ফেলতেই পাথরে ঘষা খেয়ে ধাতব আওয়াজ করছে পায়ের বেড়ি। থামছে না জেসন, ভাবছে না কিছু, ওর যেন একটাই কাজ, দৌড়ে এগিয়ে চলা। জানে, পেছনে ধাওয়া করে আসছে মৃত্যুদূত।
সৈন্যরা এগোচ্ছে কুকুর নিয়ে। শিকারের নেশা চেপেছে তাদের। আসামী দু'জনকে ধরতেই হবে। জীবিত ধরতে পারলে ভাল, তা নাহলে লাশ নিয়ে ফিরতে হবে। জর্গেনসেন ঘোড়সওয়ার পাঠিয়েছেন। নির্দেশ দিয়েছেন যে করে হোক সানলককে পাকড়াও করতে হবে। সানলক যদি পালায় তাহলে আবারও ডেনমার্কের কবজা থেকে ছুটে যাবে আইসল্যান্ড। ঘোড়সওয়ারের মুখে জানা গেল জর্গেনসেন নিজেই আসছেন তদারকি করতে। গন্ধকের ময়দান এড়িয়ে পূবের পাহাড় দিয়ে আসবেন তিনি।
কাঁধে সানলককে নিয়ে গন্ধকের ময়দানের মাঝ দিয়ে ছুটে আসছে জেসন। তাদের পেছনে ধেয়ে আসছে সশস্ত্র সৈন্যদের দল। পশ্চিমের পাহাড়ের ওপর দিয়ে আসছেন অ্যাডাম তাঁর নাবিক আর যাত্রীদের দল নিয়ে। পূবের পাহাড়ের ঢাল ধরে আসছেন জর্গেনসেন। তাঁর সঙ্গে অশ্বারোহী সৈন্যদের আরেকটা দল। এরা একই সঙ্গে গভর্নরকে পাহারা দেবে এবং বন্দিদের খুঁজতে সাহায্য করবে।
গিরিখাতের বাইরের মুখে সবার-আগে পৌঁছে গেলেন অ্যাডাম। দু’জনকে সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মাথায় উঠতে বললেন তিনি। ওরা গন্ধকের ময়দানের ভেতরের অবস্থাটা দেখে তাঁকে খবর জানাবে।
দম নেবার ফাঁকে সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন অ্যাডাম,
‘কাছের টেলিগ্রাফ অফিসটা কোথায় কেউ কি বলতে পারো?’
‘সমুদ্রের তীরে। এখান থেকে ছয় মাইল দূরে কিলনাথোর বন্দরে।’
পকেট থেকে কাগজ আর পেন্সিল বের করে একটা চিঠি লিখলেন অ্যাডাম। বেশ দীর্ঘ চিঠি। লেখা শেষ হতে জ্যাকের হাতে কাগজটা দিলেন তিনি। ‘এটা কিলনাথোরে পৌঁছে দিতে পারবে?’ কেন পারব না গোছের চাহনি দিল করিৎকর্মা জ্যাক। অ্যাডাম বললেন, ‘ফিরে আসার আগে নিশ্চিত হয়ে নিয়ো টেলিগ্রাফার সংবাদ পাঠিয়েছে।’
জ্যাকের হাতে টেলিগ্রাফ পাঠানো খরচটা দিয়েই ছুটে চলে গেল যুবক। গ্রেবার দিকে ফিরলেন অ্যাডাম। ‘ডিউক অ্যাথলকে খবর পাঠালাম। বিস্তারিত জানিয়েছি। সানলক গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক। ওকে শাস্তি দেবার অধিকার আইসল্যান্ডের গভর্নরের নেই। লন্ডন আর কোপেনহেগেনের কূটনীতিকরা আলাপ করে ঠিক করুক কি করবে।’
পাহাড়ের ওপর থেকে অ্যাডামের পাঠানো লোক দু’জন চেঁচিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ‘বিশালকায় এক লোক টলতে টলতে ছুটে আসছে এদিকেই। কাঁধে আরেকজনকে নিয়ে আসছে। তাদের পেছনে আসছে বিশজন সৈন্য। সৈন্যদের সঙ্গে কুকুরও আছে।’
বিশালকায় লোক? সানলককে কাঁধে নিয়ে আসছে? কে হতে পারে লোকটা? ম্যান দ্বীপে দৈত্যাকৃতি একজনকে চিনতেন তিনি। অনেক সাহায্য পেয়েছেন ওর কাছ থেকে। কিন্তু যতদূর জানেন, সেই জেসন তো এখনও ম্যান দ্বীপেই আছে।
‘ঢুকে পড়ো সবাই গিরিপথ দিয়ে,’ মাথা থেকে চিন্তা ঝেড়ে আদেশ দিলেন অ্যাডাম। ‘সৈন্যদের যদি ওপাশেই ঠেকাতে না পারি তাহলে গিরিখাতের ভেতরে সানলকদের ধরে ফেলবে ওরা।’
অ্যাডামের নির্দেশ পাহাড়ী ফাঁক দিয়ে ঢুকতে লাগল নাবিক আর যাত্রীরা। একজন একজন করে যাচ্ছে। খুবই সরু গিরিখাত। কয়েকবার বাঁক নিতে হলো। মাঝখানে এসে কিছুটা চওড়া হয়েছে পাহাড়ী পথ। সামনে আর কোন বাঁকও নেই। অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল অ্যাডামের সঙ্গীরা। প্রত্যেকের চোখ সামনের দিকে। অভূতপূর্ব একটা দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছে ওরা।
সানলককে কাঁধ থেকে নামিয়ে তাকে আড়াল করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দানবাকৃতির লোকটা। ভাব দেখে মনে হলো রুখে দাঁড়িয়েছে। পিছু হটবে না আর। তারপর বড় বড় পাথরের টুকরো মাথার ওপর অবলীলায় তুলে নিয়ে সৈন্যদের দিকে ছুঁড়ে দিতে লাগল সে। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আছে দৈত্য। তার ছোঁড়া পাথরের আঘাতে কয়েকজন সৈন্য ধরাশায়ী হলো।
এতক্ষণ ইচ্ছে থাকলেও রাইফেলের গুলিতে দূর থেকে লোকটাকে গেঁথে ফেলতে পারেনি রক্ষীদের নেতা। মনের ইচ্ছে মনেই চেপে রাখতে হয়েছে। গুলি করলে সানলকের গায়ে লাগার সম্ভাবনা ছিল। জর্গেনসেন আদেশ দিয়েছেন সম্ভব হলে সানলককে যাতে জীবিত ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সানলক আইসল্যান্ডের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। তাকে এভাবে কুকুরের মতো গুলি করে মারলে আন্তর্জাতিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। হয়তো ডেনমার্কের রাজ দরবারেও জর্গেনসেনকে জবাবদিহি করতে হবে। কোন ঝুঁকি নিতে রাজি নন জর্গেনসেন।
রক্ষীদের নেতা দেখল এবার গুলি করার সুযোগ রয়েছে। সানলক এখন দেন্তাকৃতি লোকটার কাঁধে নেই। সে শুয়ে আছে একটু দূরে মাটিতে। পাথর ছুঁড়ছে যে দানবটা তাকে অনায়াসে গুলি করা যায় এখন। সানলকের গায়ে গুলি লাগার কোন সম্ভাবনা নেই।
‘পাথর ছুঁড়ছে যে তাকে গুলি করো!’ চিৎকার করে আদেশ দিল রক্ষীদের নেতা।
রক্ষীরা গুলি করার আগেই অ্যাডামের চড়া গলা শোনা গেল। ‘খবরদার! কেউ গুলি করবে না। আমাদের কাছেও রাইফেল আছে। তোমরা গুলি করলে আমরাও থেমে থাকব না।’
রক্ষীরা থমকে গেছে দেখে এবার অ্যাডাম বললেন,
‘গোলাগুলি হলে অনেক লোক মরবে। তারচেয়ে বন্দিদের সঙ্গে আপনারাও আমাদের এখানে আসুন। এখানে আমরা আলাপ আলোচনা করতে পারি। আসুন। আমি বুঝিয়ে আপনাদের বলতে পারব যে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সানলকের কোন ক্ষতি করার অধিকার রাজনৈতিক ভাবেই আপনাদের গভর্নরের নেই।’
রক্ষীদের দলপতি বুদ্ধিমান লোক। এখানে গোলাগুলি হলে দু'পক্ষেই অনেকে আহত নিহত হবে এটা স্পষ্ট বুঝতে পারল। তাছাড়া রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচে পড়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। সুবিধাজনক অবস্থানে আছে সে। ইংরেজ লোকটাকে তার দলবল সহ দেরি করিয়ে দিতে পারলে এখানে পৌঁছে যাবেন জর্গেনসেন। তিনি দায়িত্ব নেবার পর যে নির্দেশই দিন বিনা দ্বিধায় পালন করবে সে। গভর্নরের নির্দেশ পালন করলে তার বা সৈন্যদের কোন দায়দায়িত্ব থাকবে না।
‘ঠিক আছে ওই লোকটাকে এগোতে বলুন,’ বলল রক্ষীদের নেতা। ‘আমরা ওদের পেছনে আসছি।’
সানলককে আবার কাঁধে তুলে নিল দানবাকৃতি লোকটা। গিরিখাতের দিকে এগোতেই একটু পর চিনতে পারলেন অ্যাডাম। তাঁর গলা চিরে আনন্দ আর বিস্ময় ধ্বনি বেরিয়ে এলো। চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি,
‘জেসন!’
‘জেসন!’ গ্রেবাও চিনতে পেরেছে ধূলিধূসরিত পরিশ্রান্ত ফুরিয়ে যাওয়া মানুষটাকে।
জেসন যেন কোন কথা শুনছে না। কোনদিকে তাকালও না। অ্যাডামকে পাশ কাটাল, অথচ দেখল না তাঁকে। চিনতেও পারল না কাউকে। সানলককে নামিয়ে দিল কাঁধ থেকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলতে লাগল।
সানলকের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল গ্রেবা। একটু একটু করে পানি খাওয়াবার চেষ্টা করতে লাগল। বেশির ভাগটাই পড়ে কথা বেয়ে। বিড়বিড় করে কাতরোক্তি করছে সানলক,
‘অন্ধকার। বড় অন্ধকার। কিছুই দেখি না চোখে। কিছুই দেখি না।’
সসৈন্যে পৌঁছে গেলেন জর্গেনসেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার ফাঁকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিলেন। অ্যাডামের ওপর দৃষ্টি স্থির হলো তাঁর। অ্যাডামকেই শুধু কথা বলার উপযুক্ত বলে মনে হলো।
‘আপনি কে? এখানে কি করছেন?’ জানতে চাইলেন জর্গেনসেন।
‘আমি অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদার,’ নিজের পরিচয় দিলেন অ্যাডাম। ‘আমি একজন ব্রিটিশ নাগরিক।’ সানলককেও দেখালেন তিনি। ‘সানলকও একজন ব্রিটিশ নাগরিক।’ তীক্ষ্ণ চোখের কড়া দৃষ্টিতে জর্গেনসেনের দিকে তাকালেন অ্যাডাম। ‘আপনার বোধহয় জানা আছে সানলক আইসল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ছিল। তার যদি বিচার করতেই হয় তাহলে সেই বিচার করতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। আপনাকে এই কথাটা বলার জন্যেই আমি এখানে অপেক্ষা করছি। আরেকটা কথা, আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রার্থনা করে লন্ডনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমি টেলিগ্রাফ পাঠিয়েছি। কূটনৈতিক পর্যায়ে এতক্ষণে বোধহয় তৎপরতা শুরুও হয়ে গেছে। সানলকের বিচারের ব্যাপারটা এখন লন্ডন আর কোপেনহেগেনের মধ্যে স্থির হবে।’
মুখটা কালো হয়ে গেল জর্গেনসেনের। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। এই জটিলতায় পড়তে হতে পারে সেই আশঙ্কাই জাগছিল তাঁর মনে। সানলক ব্রিটিশ নাগরিক। তার বিচারও যথার্থ বিচারকের রায়ে হয়নি। ব্যক্তিগত আক্রোশবশে সানলককে তিনি গন্ধকের ময়দানে অমানুষিক অত্যাচারের কাজ করতে পাঠিয়েছিলেন। তখন ভাবেননি পরিস্থিতি এরকম ঘোলা হয়ে যাবে। বাইরে সানলকের কোন খবর যাবে সেটা চিন্তাও করেননি। সারা ইউরোপ এই ঘটনা জানলে তাঁকে ধিক্কার দেবে। ডেনমার্কের রাজা নিজের ভাবমূর্তি বাঁচাতে তাঁকে অপদস্থ করবেন। তাঁর আর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকল না।
কড়া চোখে সবাই দেখলেন তিনি। চোখ আটকে গেল জেসনের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত গরম হয়ে উঠল। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল জেসনের ওপর। ও তো জেসন নয়, ও তো স্টিফেন ওরি। সেই একই চেহারা। একই আকৃতি। অবিকল স্টিফেন ওরি। না, আসলে ও-ই স্টিফেন ওরি।
জেসন মাথা নিচু করে রেখেছে। চিন্তার ভারে মাথা যেন ছিঁড়ে পড়বে।
মনে মনে একটা কথাই ভাবছে, এই যুবকই তাহলে সানলক? একেই খুন করার আদেশ দিয়েছিলেন মা? মায়ের শেষ আদেশ ছিল একেই শেষ করা? ভাগ্যের অবাক খেলায় যাকে খুন করার কথা তাকেই বাঁচিয়ে এনেছে ও দুর্গম মৃত্যূপুরীর দ্বার থেকে। এখন জেসন বুঝতে পারছে ঈশ্বরের ইচ্ছে নয় ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের মৃত্যু হোক।
‘কে তুমি!’ জর্গেনসেনের কর্কশ গলার আওয়াজে চিন্তার জাল ছিন্ন হলো জেসনের। তাকাল ও। দেখল ওর দিকেই চেয়ে আছেন জর্গেনসেন।
ধীরে ধীরে তিক্ত এক টুকরো হাসি দেখা দিল জেসনের ঠোঁটে। ঠাট্টার সুরে বলল,
‘চিনতে পারছ না? নানা, আমি তোমার নাতি, র্যাচেলের ছেলে জেসন।’
আড়ষ্ট ভঙ্গিতে অ্যাডামের দিকে ফিরলেন জর্গেনসেন। চরম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। অ্যাডামকে বললেন,
‘সানলককে নিয়ে আপনি আপাতত যেতে পারেন। আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারে দেখা যাবে কি হবে।’
এবার তিনি জেসনের দিকে ফিরলেন। অ্যাডামকে উদ্দেশ্য করেই বললেন,
‘কিন্তু ওই লোক জেসন ওরি। ও গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক নয়। জেসন ওরি আইসল্যান্ডের মানুষ। আমি আইসল্যান্ডের গভর্নর। আমি আদেশ দিচ্ছি এই মুহূর্তে জেসন ওরির প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হোক।’ হাতের ইশারায় সৈনিকদের আদেশ পালন করতে নির্দেশ দিলেন জর্গেনসেন। মুখে বললেন, ‘গুলি করো ওকে।’
একসঙ্গে চারজন সৈন্য গুলি করল। প্রত্যেকটা গুলি বুকে বিঁধল জেসনের। দড়াম করে মাটিতে পড়ে গেল জেসন। মারা যাওয়ার আগে মৃদু অস্ফুট স্বরে বলল,
‘মা, তোমার আদেশ পালন করিনি আমি। শাস্তি পেয়েছি। মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি পারলাম না। আমি চেষ্টা...পারলাম না। ঈশ্বরের সম্মতি ছিল না তোমার আদেশে।’
সমাপ্তি