#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৮
গত চার বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে সানলকের জীবনে। এসেছিল ল্যাটিন কলেজে পড়ালেখা করতে, তারপর জড়িয়ে গেল রাজনীতির সঙ্গে।
ল্যাটিন কলেজে পড়ার সময় গভর্নর জর্গেন জর্গেনসেনের সুদৃষ্টি পড়ল সানলকের ওপর। একদিন কি এক কাজে বিশপ জনের সঙ্গে আলাপ করতে কলেজে গিয়েছিলেন জর্গেনসেন, সানলককে দেখে তাঁর মনে পড়ে গেল অনেক দিন আগে ভুলে যাওয়া প্রিয় একটি মুখ। সে-মুখ হতভাগী র্যাচেলের। তাঁর একমাত্র সন্তান র্যাচেল, তাঁর আদরের র্যাচেলের সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে ছেলেটার চেহারায়। জর্গেনের আগে এই একই কথা ভেবেছিল স্টিফেন, সানলকের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিল র্যাচেলের।
অযৌক্তিক একটা আবেগ অনুভব করলেন জর্গেনসেন সানলকের প্রতি। সানলককে এতই পছন্দ হলো যে অনুরোধ করে তাকে একেবারে নিজের সরকারি বাসভবনে এনে তুললেন জর্গেনসেন। পরিচয় গাঢ় হতে চমৎকৃত হয়ে গেলেন তিনি সানলকের বুদ্ধি আর বিবেচনার পরিচয় পেয়ে। এবার ধীরে ধীরে নিজের কাজের ভার সানলকের হাতে ছেড়ে দিতে লাগলেন তিনি। প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে সানলকের আগেও পরিচয় ছিল। অ্যাডামের সঙ্গে অনেক কাজেই অংশ নিয়েছে ও। দক্ষতার সঙ্গে কর্তব্য সম্পাদন করতে পারছে দেখে খুশি হলেন জর্গেনসেন। এতদিন পর মনের মতো একটি মানুষ পেয়েছেন তিনি। সানলকের সঙ্গে র্যাচেলের চেহারার মিলটাও বড় ভূমিকা রাখল। সানলককে বিশ্বাস করতে লাগলেন জর্গেনসেন, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কাজগুলোর ভারও দিতে লাগলেন ওর ওপর। তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল গোপনে যে অন্যায়গুলো তিনি করে থাকেন সেব্যাপারে সানলক কখনও মুখ খুলবে না।
জর্গেনসেনের ধারণা ভুল। সানলক মানুষ হয়েছে অ্যাডামের কাছে। অ্যাডামের নীতিবোধ, আদর্শ, বৈশিষ্ট্য সবই অজান্তে চলে এসেছে ওর ভেতরে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া সানলকের ধাতে নেই।
জর্গেন সব সময় টাকাকেই ঈশ্বরের সমতুল্য বলে মনে করে এসেছেন। তিনি চাইলেন সানলকও তাঁর পথ ধরবে। কিন্তু আশাহত হতে হলো তাঁকে। আদর্শ বিসর্জন দিতে সানলক রাজি নয়।
প্রাণপ্রিয় সন্তানকে আদর্শ থেকে টলাতে পারেননি বলে বর্জন করেছিলেন জর্গেন, এখন সানলককে দূরে ঠেলে দিলে অসুবিধে কী!
কিন্তু সানলক তাঁর অভিসন্ধি সবই জেনে গিয়েছে। নানা রকম ভীতি প্রদর্শন করলেন তিনি। লোভ দেখালেন। কিন্তু সানলক আদর্শ বিসর্জন দিতে রাজি নয়। বাধ্য হয়েই সানলককে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন জর্গেন। একটা ছোকরার কাছে এই বুড়ো বয়সে হেরে যাবেন তিনি? এতদিন এর অনুসৃত নীতি থেকে সরে যাবেন? আয় রোজগার কমে যাবে তাঁর? কখনো না!
সানলক ভেবে দেখল হতদরিদ্র এই দেশটাকে জর্গেনসেনের শোষণ আর অত্যাচার থেকে বাঁচানো বিবেকচাক যেকোনো মানুষের দায়িত্ব। স্বৈরাচারী জর্গেনসেনের বিরুদ্ধে একটা বিপ্লব ঘটানো যায় কিনা চিন্তা করতে লাগল সানলক।
অনন্নত দেশ আইসল্যান্ড। শিক্ষার হার খুবই কম। তবু প্রতিটি দেশেই সচেতন শিক্ষিত মানুষ থাকে। আইসল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষিত দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা যখন দেখল জর্গেনের কাছ থেকে সানলক সরে আসছে, গোপনে যোগাযোগ করল তারা। শিক্ষিত, সৎ, যোগ্য এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোক সানলক, এটা বুঝেছিল তারা আগেই, জর্গেনসেনের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংঘটিত করার জন্যে সানলকের নেতৃত্ব তারা মেনে নিল।
জর্গেন কখনো চিন্তাও করেননি বিদেশের এক যুবক আইসল্যান্ডে এসে সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করতে পারে। বিদ্রোহ সফল করে তুলতে চাইলে লোকবল চাই, অনুগত, বিশ্বস্ত অনুচর চাই-সেসব সানলকের নেই। কিন্তু তাঁর ধারণা ভুল। তাঁর কাছের সৎ মানুষেরা গোপনে সানলকের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করল এবং তথ্য পাচার করতে লাগল। সেনাবাহিনীর এক অংশও বিদ্রোহী হয়ে উঠল গোপনে।
একরাতে আক্রমণ এলো জর্গেনের প্রাসাদের ওপর। হামলা করে বসেছে বিপ্লবীরা। অনুগত সৈন্যরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তারা সবাই ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা চায়। ভীষণ ভয় পেলেন জর্গেনসেন। তাঁর সাথে অল্প কিছু সৈন্য ছিল, ইচ্ছে করলে যুদ্ধ করতে পারতেন, কিন্তু সাহসে কুলাল না, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেলেন তিনি প্রাসাদের পেছন-দরজা দিয়ে। আইসল্যান্ড আর তাঁর জন্যে নিরাপদ নয়। সোজা বন্দরে চলে এলেন তিনি, সেখানে কোন জাহাজ না পেয়ে একটা নৌকো নিয়ে সাগরে বেরিয়ে পড়লেন। বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করলেন জর্গেন। কোন না কোন জাহাজ বন্দরে আসবেই। তার আগেই তিনি সেই জাহাজ থামিয়ে উঠে পড়বেন ডেকে, ক্যাপ্টেনকে বুঝিয়ে বলবেন যাতে তাঁকে ডেনমার্কে পৌঁছে দেয়।
তাঁর কপাল ভাল, রাতেই একটা ইংরেজ জাহাজ এলো। ক্যাপ্টেনকে বুঝিয়ে জাহাজ নিয়ে ডেনমার্কে চলে এলেন জর্গেনসেন। আইসল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ। সেখানে তিনি সাহায্য পাবেন। এতদিন তো ডেনমার্কের রাজার পক্ষেই আইসল্যান্ড শাসন করেছেন তিনি।
দরবারে রাজার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তিনি। অভিযোগ করলেন সানলকের বিরুদ্ধে। ইনিয়ে বিনিয়ে জানালেন ম্যান দ্বীপ থেকে আইসল্যান্ডে এসে শান্ত শিষ্ট ভাল মানুষগুলোকে খেপিয়ে তুলেছে এক উদ্ধত যুবক। সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছে আইসল্যান্ডের লোকরা। প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে জর্গেনসেনের সঙ্গে বিদ্রোহীদের। সামান্য সৈন্য নিয়ে জর্গেনসেন প্রাণের মারা ত্যাগ করে লড়েছেন। শেষে যখন বুঝলেন তাঁর মৃত্যু ডেনমার্কের কোন উপকারে আসবে না, তিনি ঠিক করলেন ডেনমার্কে এসে রাজাকে সব কিছু খুলে বলা তাঁর কর্তব্য। আর দেরি করলেন না তিনি, চলে এলেন ডেনমার্কে।
অত্যন্ত বিশ্বাস্য মনে হলো জর্গেনসেনের মিছেগুলো। সৈন্য সমাবেশ করার আদেশ দিলেন ডেনমার্কের রাজা। মূর্খ আইসল্যান্ডবাসীদের তিনি বুঝিয়ে ছাড়বেন ডেনমার্কের অধিপত্য তাদের জন্যে কতখানি জরুরী।
ওদিকে আইসল্যান্ডে নতুন এক জোয়ার লেগেছে। বিপ্লবীরা সানলকের নেতৃত্বে সাধারণ প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে আইসল্যান্ডকে। সাধারণ মানুষ এই প্রথম মুক্তির স্বাদ পেল। মতামত প্রকাশে আর কোন বাধা নেই। প্রশাসনের লোকদের ভয় পেয়ে পালিয়ে থাকার দরকার নেই। তারা এখন মুক্ত স্বাধীন আইসল্যান্ডের নাগরিক। কৃতজ্ঞ হয়ে গেল সাধারণ জনতা। সবার সম্মতিঅক্রমে সানলককেই তাদের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করল বিপ্লবীরা।
সানলক এখন প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতায় এসেই গ্রেবাকে চিঠি লিখেছিল সানলক। সেই চিঠিতে লিখেছিল:
‘গ্রেবা, আমাকে দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি তুমি ভুলে যাওনি তো? যদি মনে থাকে সেই প্রতিশ্রুতি, যদি আজও তুমি ভালবাসে থাকো আমায়, তাহলে দেরি না করে চলে এসো আইসল্যান্ডে। আমি তোমাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। তুমি এখানে এলে বিশপ জন আমাদের বিয়ে পড়িয়ে দেবেন। জানি, আসলে আমারই যাওয়া উচিত ছিল তোমাকে আনতে, কিন্তু নতুন স্বাধীন এই দেশটির প্রশাসনিক কাজে আমি এতই ব্যস্ত যে যাওয়া সম্ভব নয় এই মুহূর্তে। রাগ কোরো না, গ্রেবা। আমার এই অপারগতা ক্ষমা কোরো। চলে এসো, গ্রেবা, আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি অধীর হয়ে।’
দেরি করেনি গ্রেবা, চিঠি পাবার পরদিনই রওনা হয়ে গিয়েছে আইসল্যান্ডগামী জাহাজে চেপে। দেরি করার কোন কারণ নেই, আইসল্যান্ডে সানলক আছে। ওর বাবাও গেছেন আইসল্যান্ডে। ওখানে গেলে দু’জনের সঙ্গেই দেখা হবে ওর। রেইকিয়াভেকোর সরকারী প্রাসাদে সানলকের সঙ্গে সুখে বাস করবে নবপরিণীতা গ্রেবা।
কিন্তু জেসন? তার কি হবে?
সানলকের চিঠি না পেলে হয়তো জেসনের সঙ্গেই বিয়ে হতো গ্রেবার। হয়তো জেসনের আটাকলের পাশের ঘরে সংসার করত। লেণ্ডর খামার বাড়িতে আর দম নিতে পারছিল না গ্রেবা। মা আর ভাইদের ব্যবহার দিন দিন খারাপ হচ্ছিল, শ্বাস আটকে আসছিল গ্রেবার। বেঁচে গেল ও সানলকের চিঠি পেয়ে। এবার গ্রেবার সামনে শুধু সুখের আশ্বাস। কিন্তু জেসন? তার কি হলো?
জেসন তার আটাকলের বাড়ি ভেঙে ফেলেছে। একবার ভেবেছিল পোর্ট লা ভিউলিনের কুটিরটাও ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। তা আর করেনি। কুটিরটা ওর তৈরি নয়। একদিন ও এখানে আশ্রয় পেয়েছিল। তারও আগে স্টিফেন এখানে মাথা গুঁজেছিল। হয়তো আবারও আসবে আশ্রয়হীন কেউ, ঠাঁই পাবে এই কুটিরে। কুটিরটা থাকুক।
ম্যান দ্বীপে মন টিকে না আর। আইসল্যান্ডের উদ্দেশ্যে জাহাজে চাপল জেসন। ঠান্ডা একটা রাগ বুকের ভেতরে পুষে রেখেছে ও। সানলককে খুঁজে বের করতে হবে। আজকাল প্রায়ই মনে পড়ে মায়ের কথা। ‘তোমার ওপর আমার শেষ আদেশ, হত্যা করবে তুমি স্টিফেনকে, ওর ছেলেকে। ওদের রক্ত ছাড়া আর কোন কিছুতেই তৃপ্তি হবে না আমার আত্মার। শুনেছ? হত্যা করবে তুমি ওদের। হত্যা!’
এবার আর ব্যর্থ হবে না জেসন। মায়ের আদেশ পালন করতে হবে এবার যে করে হোক। একবার মায়ের কথার অবাধ্য হয়েছে ও। ভেবেছিল স্টিফেন তো এমনিতেই মারা যাবে, তাকে খুন করার কি দরকার। স্টিফেন মারা গেছে, কিন্তু তৃপ্ত হয়নি মায়ের বিদেহী আত্মা। তিনিই গ্রেবাকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আঘাত দিয়ে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন, প্রতিজ্ঞা পালন করোনি তুমি। সানলক পাবে গ্রেবাকে। সানলকের জন্যে ওকে অবহেলায় ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছে গ্রেবা। অবাধ্য জেসন এখন বুঝতে পারছে মায়ের ইচ্ছে পূরণ করা ওর নিয়তি। স্টিফেন মারা গেছে। সানলককে হত্যা করতে হবে। এটাই মায়ের শেষ ইচ্ছে।
গ্রেবাকে ভালবাসে জেসন, তবু রাগও হয় জেসনের। বিপদের সময় ও ছাড়া আর কোন গতি ছিল না গ্রেবার। তখন ওকে দেখলে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠত মেয়েটার মুখ। আর আজকে সে বিনা দ্বিধায় অবলীলায় অবহেলা করেছে জেসনকে, ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ব্যবহৃত ছেঁড়া ময়লা কাপড়ের মতো। মাঝে মাঝেই হাত মুঠো করে বিড় বিড় করে জেসন, ‘শিক্ষা হবে তোমার, গ্রেবা। শিক্ষা হবে, যখন সানলকের টুঁটি চিপে ধরে দমটা বের করে নেব আমি তোমার সামনে।’
জেসন যেদিন রেইকিয়াভেকে পৌঁছুল, সেদিন আনন্দ উৎসবে মেতেছে রেইকিয়াভেক নগরী। আজকে স্বাধীন আইসল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের বিয়ে। কনে এসেছে সেই সুদূর ম্যান দ্বীপ থেকে। বিয়ে হবে ক্যাথিড্রালে। বিয়ে পড়াবেন বিশপ জন।
খবরটা পেয়ে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল জেসনের। কোটের পকেটে হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করে নিল পিস্তল। এটা জোগাড় করেছে ও। করতে হয়েছে। সানলক এখন প্রেসিডেন্ট। কাছে গিয়ে তার গলা টিপে মারার কোন উপায় নেই। পিস্তলের গুলিতেই কাজ সারতে হবে।
কোথায় যেন হচ্ছে বিয়ে? ক্যাথিড্রালে। ক্যাথিড্রালটা ভাল মতোই চেনে জেসন। জানে কোন করিডর দিয়ে এগোলে কোথায় পৌঁছাবে। ল্যাটিন স্কুল আর কলেজটা সেখানেই। ল্যাটিন স্কুলে বেশ কিছুদিন পড়েছিল জেসন।
অনেক লোক থাকবে নিশ্চয়ই সানলকের চারপাশে? অনেক রক্ষী থাকবে—তার কাছে যাওয়া যাবে না। দূর থেকে গুলি করতে হবে। গুলি যদি না লাগে? না, গুলি বিঁধতে হবে সানলকের বুকে। গুলি ফসকানো চলবে না। পিস্তলের গুলির আঘাতে ছিটকে বেরনো রক্তে আজ নিভে যাবে প্রতিশোধের আগুন, পালিত হবে মায়ের আদেশ। শেষ আদেশ।
যত ভাবছে মাথা গরম হয়ে উঠছে জেসনের। গত কয়েকদিন এক নাগাড়ে চিন্তা করে শরীরটাও ভাল নেই ওর। জ্বর এসেছে। চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। টিপটিপ করে লাফাচ্ছে কপালের শিরা। হাঁটতে গেলে মনে হচ্ছে টলে পড়ে যাবে।
ধীর পায়ে ক্যাথিড্রালের দিকে চলল জেসন। দানবাকৃতি লোক সে। হাঁটছে টলতে টলতে। সামনে থেকে সরে পথ করে দিচ্ছে মানুষ। কেউ ওকে ঘাটাচ্ছে না। জেসনকে একনজর দেখলেই বোঝা যায় একটা ঘোরের মধ্যে আছে সে। হয় লোকটা মারাত্মক অসুস্থ, অথবা বদ্ধ উন্মাদ।
একটাই চিন্তা জেসনের মাথায় ঘুরছে। হত্যা করতে হবে সানলককে। মায়ের আদেশ পালন করতে হবে। প্রতিশোধ নিতে হবে। পিস্তলটা কোটের ভেতর-পকেটে আছে। হাত ঢুকিয়ে এক ঝটকায় বের করে আনতে হবে। গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিতে হবে সানলকের বুক। সানলক মারা গেলে তৃপ্ত হবে মায়ের অতৃপ্ত আত্মা। মা অশুভ বলেই কাছে এসেও দূরে চলে গেল গ্রেবা। এবার মাকে খুশি করবে জেসন। আর দেরি নয়। মনে মনে বলল জেসন, ‘মা, আবার যদি তোমার আদেশ অবহেলা করি, তাহলে যেন জীবিত অবস্থাতেও আমার দোজখবাস হয়।’
ক্যাথিড্রালের ভেতরে অনেক লোক। বাইরেও। আইসল্যান্ডের মান্যগণ্য মানুষদের মেলা বসেছে যেন এখানে। প্রভাবশালী লোকদের ঠেলে ভেতরে ঢোকা যাবে না। বাড়াবাড়ি করতে গেলে রক্ষীরা গ্রেপ্তার করবে। গ্রেপ্তার হওয়া চলবে না জেসনের।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রক্ষীরা। কোথাও কোন গণ্ডগোল দেখলেই হস্তক্ষেপ করবে। রক্ষীরা সবাই সদাসতর্ক। যেকোন মূল্যে শান্তি রক্ষা করবে তারা। তাদের ওপর আদেশ আছে পূর্ণ সতর্ক থাকার। আইসল্যান্ড নতুন দেশ। এখনও দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি পাওয়া হয়নি। চারপাশে ঘুর ঘুর করছে ডেনমার্কের গুপ্তচর। যেকোন অজুহাতে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে তারা। সে-সুযোগ তাদের দেয়া যাবে না।
বিশপ জন ক্যাথিড্রালের ভেতরে বিয়ে পড়াচ্ছেন। বন্ধ জায়গায় দরাজ শোনাচ্ছে তাঁর গলা। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করছেন। আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে চার ধারে। গম্ভীর পবিত্র পরিবেশ ক্যাথিড্রালের ভেতরে।
বাইরে দাঁড়িয়ে বিশপের গলা শুনতে পাচ্ছে জেসন। তিনি কি বলছেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। জ্বালা ধরে যাচ্ছে জেসনের বুকে। মাথায় আগুন জ্বলছে। ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল ওর হাত। অধৈর্য হয়ে উঠছে জেসন। আর কতক্ষণ! সান্ত্বনা দিচ্ছে নিজেকে। আর বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে অনুষ্ঠান, নব দম্পতি বেরিয়ে আসবে ক্যাথিড্রাল থেকে। দু’পাশে সরে পথ করে দেবে উপস্থিত জনতা। নব দম্পতি তাদের মাঝ দিয়ে হেঁটে গিয়ে উঠবে অপেক্ষমাণ ঘোড়ার গাড়িতে।
তা হতে দেবে না জেসন। সানলকের আজ রক্ষা নেই। একটা মাত্র গুলি করবে জেসন। কাছ থেকেই করবে। তপ্ত সীসে দিয়ে স্বাগত জানাবে গ্রেবার প্রেমিককে। মায়ের আদেশ পূরণ করতে আর বেশি দেরি নেই।
সরে যাচ্ছে বাইরে দাঁড়ানো অতিথিরা। দু’পাশে সরে একটা পথ করে দিচ্ছে। আসছে সানলক আর গ্রেবা।
কোটের ভেতর হাত দিয়ে পিস্তলের বাঁট খামচে ধরল জেসন।
ঐ যে দেখা যায় গ্রেবাকে পাশে তার স্বামী। পনেরো ফিট দূরেও নেই আর।
পিস্তল বের করে সানলকের দিকে তাক করল জেসন। হাতটা থরথর করে কাঁপছে ওর। চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসছে। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মাথার মধ্যে কিসের যেন আলোড়ন! ট্রিগারে টিপ দিল জেসন। কিন্তু তার আগেই দু’ভাঁজ হয়ে গেছে ওর পা। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে গেল জেসন। জ্ঞান হারিয়েছে তার আগেই।
গুলিটা ক্যাথিড্রালের ছাদে গিয়ে লাগল। সেখানে বাড়ি খেয়ে উল্টোদিগের দেওয়ালে ঠোক্কর লেগে হারিয়ে গেল কোথায় যেন।
চারদিকে শোরগোল। অতিথিরা হতভম্ব। কিন্তু রক্ষীরা তাদের কর্তব্য ঠিক মতোই পালন করল। ছুটে এসে অচেতন জেসনকে বেঁধে ফেলল তারা আষ্টেপৃষ্ঠে।
★
ধরা পড়েছে গুপ্তঘাতক! এই ক্যাথিড্রাল আর নিরাপদ নয়। আরও কেউ যে লুকিয়ে বসে নেই প্রেসিডেন্টকে শেষ করে দেবার জন্যে তার নিশ্চয়তা কী!
ক্যাথিড্রালের পেছন-দরজা দিয়ে প্রেসিডেন্ট আর তাঁর স্ত্রীকে বের করে আনল রক্ষীরা। সানলক কখনও জেসনকে দেখেনি। আর গ্রেবাও সুযোগ পায়নি মাটিতে পড়ে থাকা জেসনকে দেখার। ওরা জানল না জেসনই ছিল লোকটা।
সারাদেশে একটা গুজব ছড়িয়ে গেল, গুপ্তঘাতক আসলে ডেনমার্কের চর। ডেনমার্কের রাজা তাকে পাঠিয়েছেন সানলককে শেষ করে দিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাজার, তাঁর ইচ্ছেপূরণ হয়নি। লোকটা একেবারে শেষ মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ফিট লাগার রোগ আছে।
তবে এটাও ঠিক, স্রেফ ভাগ্য ভাল বলেই আজকে প্রেসিডেন্ট প্রাণে বেঁচেছেন। সেদিনই সানলকের জন্যে ক্যাথিড্রালে বিশেষ উপাসনার আয়োজন করা হলো। স্বয়ং ঈশ্বর না বাঁচালে কি আর বাঁচতেন প্রেসিডেন্ট সানলক?
পরদিন জেসনের বিচার বসল আইসল্যান্ডের কোর্টে। বিচারক স্বয়ং আইসল্যান্ডের প্রধান বিচারপতি।
প্রথম প্রশ্নই করলেন তিনি, ‘তুমি কি প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, না আর কাউকে?’
‘প্রেসিডেন্টকে,’ এক কথায় উত্তর দিল জেসন।
‘কেন? তাঁর সঙ্গে কিসের শত্রুতা তোমার?’
কোন জবাব দিল না জেসন।
‘তুমি কি ডেনমার্কের গুপ্তচর?’
‘না। আমি ব্যক্তিগত কারণে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম।’
‘এই হত্যা চেষ্টার জন্যে তোমার মনে কি এখন কোন অনুশোচনা জাগছে?’
‘না। তবে আমি অনুতপ্ত। হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারছি না। হয়তো আপনারা আমাকে প্রাণদণ্ড দেবেন। কিন্তু কোন কারণে তা যদি না ঘটে, কোন কারণে আমি যদি মুক্তি পেয়ে যাই, তাহলে আবারও আমি চেষ্টা করব সানলককে হত্যা করার।’
এধরনের বিপজ্জনক অপরাধীকে ক্ষমা করা কোনমতেই সম্ভব নয়। তবে লোকটার বয়স কম। যুবক বয়সে অনেকেরই মাথা গরম থাকে, ভাল-মন্দের তফাৎ তখন বুঝতে পারে না। পরবর্তী জীবনে সেই একই মানুষ হয়তো একেবারেই বদলে যায়। এসব বিবেচনা করে প্রধান বিচারপতি রায় দিলেন জেসনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, গন্ধকের ময়দানে ক্রীতদাসের কাজ করতে হবে ওকে মুক্তির আগ পর্যন্ত।
রেইকিয়াভেকের বারো মাইল দূরে পাহাড়ী অঞ্চলে আছে গন্ধকের ময়দান। অনেকে ওটাকে আগুনের অধিত্যকাও বলে। কয়েক বছর আগে গন্ধক আবিষ্কৃত হয়েছে ওখানে। কিছুদিন হলো গন্ধক উত্তোলনের কাজও আরম্ভ হয়েছে। অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। সর্বক্ষণ আগুন জ্বলছে গন্ধকের প্রান্তরে। কোথাও সে আগুন মাটির তলায়, কোথাও সে আগুন মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছে ওপরে। কখন যে মাটি ফেটে নীল আগুন বেরিয়ে আসবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। হঠাৎ বেরিয়ে আসা আগুনের শিখায় পুড়ে অনেকেই মারা যায়। যারা মরে না অন্ধ হয়ে যায় তারা।
গন্ধকের ময়দানে কাজ করতে পাঠানো আর মৃত্যুদণ্ড প্রায় একই কথা। তফাৎ শুধু এটুকু, গন্ধকের ময়দানে কাজ করতে যাওয়া লোকগুলো ধীরে ধীরে কষ্ট পেয়ে মরে।
রায় হয়ে যাবার পর জেসনকে রেইকিয়াভেকের রাস্তা দিয়ে গন্ধকের ময়দানের দিকে নিয়ে চলল রক্ষীরা। জেসনের সঙ্গে একই সাজা পাওয়া আরও তিনজন অপরাধী রয়েছে। সবার গলায় একটা শেকল পেঁচানো। পায়ে ভারী বেড়ি। হাঁটছে জেসন। কোনদিকে তাকাচ্ছে না। কিছু ভাবছে তাও নয়। পা ফেলছে যন্ত্রচালিতের মতো। সঙ্গে চলেছে তিন অপরাধী। ওরা যখন বাঁক নিচ্ছে, জেসনও যাচ্ছে তাদের সঙ্গে, যেন সুতোয় বাঁধা পুতুল। চার বন্দিকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে গলায় পরানো শেকল। বাকি তিনজন থামলে জেসনও থামছে।
হাঁটতে হাঁটতেই গন্ধকের ময়দানে পৌঁছুল তারা। পাহাড়ের ওপর অপেক্ষাকৃত সমতল এই রুক্ষ এবড়োখেবড়ো জমি। মাইলের পর মাইল পাথর কোথাও, আবার কোথাও আছে খানাখন্দ, ফাটল আর গিরিখাত। গর্তগুলো থেকে ঘন ধোঁয়া আর নীল আগুন বেরিয়ে আসছে।
ফাটল আর গর্তগুলোয় গন্ধক এখন নেই বললেই চলে। আগেই এখানে কাজ করেছে বন্দিরা, তুলে নিয়ে গেছে বেশির ভাগ গন্ধক। এখানে কাজ করতে গিয়ে যারা মরেছে তারা মরে বেঁচেছে। যারা আগুনে পুড়ে এখনও মরেনি তারা আছে হাসপাতালে। দগ্ধ বিকৃত মানুষ তারা, মৃত্যুর প্রহর গুনছে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে। হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। একজন বন্দি মরলে আরেকজন এসে তার শাবল তুলে নেবে। গন্ধক উত্তোলন থেমে থাকবে না। কাঙ্গাল সরকারের কোন প্রয়োজন নেই আহতদের শুশ্রূষা করবে।
প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছে কাজ। গন্ধক উত্তোলন চলছে। আহতরা চলে যাচ্ছে, তাদের বদলে আসছে নতুন বন্দি। এখন আর ফাটল বা গর্তে উত্তোলনেরযোগ গন্ধক নেই। গন্ধক আছে মাইলের পর মাইল পাথর মোড়া প্রান্তরে। ওই পাথর খুঁড়ে তুলে আনতে হবে গন্ধক।
একটি গাঁইতি দিয়ে জেসনকে কাজে লাগিয়ে দেয়া হলো। প্রাণান্তকর পরিশ্রম। বারবার গাঁইতি চালাতে হয় শক্ত পাথরে। এক সময় ফেটে যায় পাথর। তলা থেকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর নীল আগুনের লকলকে জিভ। গন্ধকের ধোঁয়া বিষাক্ত, সেই ধোঁয়ায় শ্বাস টানলে পুড়ে যায় ফুসফুস। গন্ধকের মাঠে যারা কাজ করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত। কেউ মারা যায় দ্রুত, আগুনে পুড়ে। ওরা সৌভাগ্যবান। কষ্ট পায়, কিন্তু সেই কষ্ট ক্ষণস্থায়ী। যারা ওভাবে মরে না তারা রক্ত বমি করে মারা যায় এক দু’মাসের মাথায়। ভুগতে হয় ওদের। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে পোড়া ফুসফুসের রক্তাক্ত টুকরো।
অমানুষিক পরিশ্রম করছে জেসন। দৈত্যাকৃতির মানুষ সে, ভারী গাঁইতি হাতে একটানা কাজ করতে পারছে সারাদিন। ধোঁয়ায় অসুবিধে হচ্ছে, মাঝে মাঝে আগুনে হাত-পায়ের চামড়াও পুড়ে যাচ্ছে। একদিন ফুসফুসটাও যাবে। এসব নিয়ে জেসন ভাবছে না। গন্ধকের ময়দানে কাজ করা অকথ্য অত্যাচারের সামিল। সেদিকেও যেন কোন খেয়াল নেই ওর। সর্বক্ষণ কি যেন ভাবছে ও নিজের মনে। কখনও কখনও অতিরিক্ত পরিশ্রমে এমনও হচ্ছে যে কিছু ভাবছে কিনা সেটাই ভেবে পাচ্ছে না ও।
প্রতিদিন জেসনের সঙ্গে একজন করে বন্দিকে দেয়া হয়। পাশাপাশি কাজ করে দু’জন। দু’জনের পায়ে জড়ানো থাকে শেকল সহ বেড়ি, যাতে পালাতে না পারে কেউ। ওই বেড়ির কারণে গন্ধকের মাঠ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ পালাতে পারেনি। দৌড়ানো যায় না বেড়ি পরে।
দুই মাস হলো গন্ধকের ময়দানে কাজ করছে জেসন। একদিন দেখল অপূর্ব সুন্দর এক যুবক বন্দিকে দেয়া হয়েছে ওর সঙ্গে। যুবকের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। সূর্যের আলোয় তার মাথার সোনালী চুল ঝিলিক মারছে খাঁটি সোনার মতো। একে গন্ধকের ময়দানে আগে কখনও দেখেনি জেসন।
ওর জানার কথা নয় পাশে দাঁড়ানো এই সুদর্শন যুবকই ওর একমাত্র জীবিত আত্মীয়, প্রাণের শত্রু সানলক, যাকে বিয়ের দিন ক্যাথিড্রালে গুলি করে মারতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল ও। আগে কখনও সানলককে দেখেনি জেসন। যেদিন গুলি করতে গেল সেদিনও অত লোকের মাঝে খেয়াল করে উঠতে পারেনি। তাছাড়া ওর শরীর খারাপ ছিল, গ্রেবার পাশের লোকটার দিকে পিস্তল তাক করলেও তার মুখ ভাল করে দেখা হয়ে ওঠেনি। তারপর তো ও অজ্ঞান হয়ে গেল। বিচারের দিনও আদালতে আসেনি সানলক। জেসন জানল না ভাগ্যের খেলায় আজকে তারই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেদিনের সেই ক্ষমতাশালী যুবক প্রেসিডেন্ট সানলক।
সত্যিই এই যুবক সানলক? অবিশ্বাস্য মনে হলেও তাই আসলে সত্যি। আকস্মিক পরিবর্তন এসেছে সানলকের জীবনে। হঠাৎ করেই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল ও, আবার হঠাৎ করেই পতন ঘটেছে।
কিছুদিন আগে রেইকিয়াভেকে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়েছে। বিশেষ দরকারে মন্ত্রী সভার একটি নৈশ অধিবেশন ডেকেছিল সানলক। অধিবেশন চলাকালীন সময়ে ডেনমার্কের একদল সৈন্য ঢুকে পড়ে কক্ষে, বন্দি করে উপস্থিত সবাইকে। ঘটনার আগের রাত থেকেই অধিবেশন দালানের নিচের তলায় লুকিয়ে ছিল সেনারা। এতদিন জায়গাটা ব্যবহৃত হতো সরকারী গুদাম হিসেবে।
জর্গেন জর্গেনসেন ফিরে এসেছেন। আবার তিনি গভর্নর। আইসল্যান্ড তার ক্ষণকালীন স্বাধীনতা হারিয়েছে। ডেনমার্কের রাজা জর্গেনসেনকে আদেশ দিয়েছেন স্বাধীন আইসল্যান্ডের কোন ইতিহাস যেন ভূলেও থেকে না যায়। পারলে মানুষের মন থেকেও স্বাধীনতার স্মৃতি মুছে ফেলুন!
সানলকের বিচার স্বয়ং জর্গেনসেন করলেন। অল্পবয়সী এই যুবককে কলেজের গণ্ডী থেকে তুলে এনে ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি, স্নেহবশত হাত ধরে তাকে শেখাতে চেয়েছিলেন সমস্ত প্রশাসনিক কাজ। অকৃতজ্ঞ ছোকরা তাঁর স্নেহের দাম দেয়নি। শুধু তাই নয়, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাঁর সঙ্গে। আরেকটু হলে মারাও যেতে পারতেন তিনি। না, সানলককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যাতে আর সবাই সতর্ক হয়ে যায়।
আমৃত্যু গন্ধকের ময়দানে ক্রীতদাসের কাজ করতে হবে সানলককে, রায় ঘোষণা করলেন জর্গেনসেন। আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষ চমকে উঠল এই রায় শুনে। খুনী-ডাকাতদের এই শাস্তি দেয়া হয়, কোন রাজনৈতিক বন্দিকে নয়, কারও কিছু বলার নেই। জর্গেনসেন এখন ডেনমার্কের সৈন্য পরিবেষ্টিত হয়ে ক্ষমতার আসনে বসেছেন। কিন্তু সবাই বুঝল আসলে তিনি বিচারের নামে প্রহসন করলেন, নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটিয়ে নিলেন। আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মুখে চড় মেরে বুঝিয়ে দিলেন আসলে কারা শাসক।
গন্ধকের ময়দানে পৌঁছানোর আগে থেকেই সানলক অসুস্থ। শেকল আর বেড়ি পড়ে এতদূর পথ হেঁটে আসার পরিশ্রম শরীরে সয়নি ওর। এমনিতে সানলক সুস্থ শরীরের যুবক। কিন্তু খুব একটা দৈহিক শক্তি কখনোই ছিল না ওর, জীবনে কখনও অত্যন্ত পরিশ্রমের কোন কাজও করতে হয়নি। ফলে অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া আছে মানসিক বিপর্যয়। হতাশায় ভেঙে গেছে ওর অন্তরটা। আইসল্যান্ড তার স্বাধীনতা হারিয়েছে। আইসল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হয়েছে গন্ধকের ময়দানের সামান্য এক ক্রীতদাস! সাধারণ মানুষ যারা ওর ওপর ভরসা করেছিল তাদের নৈরাশ্যের কথা চিন্তা করেই আরও মানসিক অশান্তিতে আছে সানলক। হতাশা ওর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে একেবারে ধূলো করে দিয়েছে।
জেসনের পাশে দাঁড়িয়ে গাঁইতি চালাতে শুরু করল সানলক। ক্লান্ত ওর শরীর, শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে একেকবার গাঁইতি তুলতে গিয়ে। যেকোন সময়ে পড়ে যাবে মাথা ঘুরে।
জেসন কঠোর পুরুষ। তারও মন গলে গেল অসাধারণ রূপবান যুবকটির এই দুর্দশা দেখে। পৃথিবীতে যদি কোন দোজখ থাকে তাহলে সেটা এই গন্ধকের ময়দান। এখানে এত পরিশ্রমের মাঝে বাঁচবে কি করে অভিজাত এই সুদর্শন যুবক?
'তোমার নাম কি, ভাই?' জিজ্ঞেস করল জেসন।
'এ পঁচিশ,' করুণ হাসল সানলক। গন্ধকের ময়দানে বন্দিদের কোন নাম নেই। তাদের নম্বর আছে। বন্দিদের নিষেধ করে দেয়া হয়েছে কেউ যাতে নিজের নাম ব্যবহার না করে। জেসন আবেগের বশবতী হয়ে নাম জিজ্ঞেস করে বসলেও সানলক নিয়ম ভুলেনি।
জেসনের মুখেও করুণ হাসি দেখা দিল। সানলককে বলল, 'থাক, নাম জানার দরকার নেই। এখানে আমরা সবাই সবার ভাই, সহকর্মী। এখন থেকে তুমি আমাকে ভাই বলে ডেকো। আমিও তোমাকে ভাই বলেই ডাকব।'
মাথা দুলিয়ে নিঃশব্দে সম্মতি জানাল সানলক। জেসন আর সানলক কেউ জানল না অপরজনের পরিচয়। দিনের পর দিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাজ করে ওরা। আসলে দু'জনের কাজ জেসন একাই করে। সানলক দিন দিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। গাইতি মাথার ওপর তোলাও এখন ওর জন্যে অত্যন্ত কষ্টকর। পাথর ফাটানোর কোন প্রশ্নই আসে না।
সানলকের প্রতি কেমন যেন একটা মোয়া পড়ে গেছে জেসনের। ওর কাজটাও জেসনই করে যায় বিনা অভিযোগে।
গন্ধকের ময়দানের বন্দি শিবিরের প্রধান নতুন নির্দেশ জারি করলেন একদিন। এখন বন্দিরা যেখানে কাজ করছে সেখানে আর পর্যাপ্ত গন্ধক পাওয়া যাচ্ছে না। এখন থেকে মাঠের আরও ভেতরে কাজ করতে যেতে হবে বন্দিদের। নতুন নতুন কুয়া খুঁড়ে দেখতে হবে কোথায় গন্ধকের ঘনত্ব বেশি।
রক্ষীরা তাদের উর্ধতন কর্মকর্তার আদেশ বন্দিদের জানিয়ে দিল। বন্দিদের নিয়ে চলল মাঠের আরও ভেতরে।
আপত্তি করার অধিকার কারও নেই। তবু জেসন রক্ষীদের নেতাকে বলল, 'যত বিপদই থাকুক পাথর ফাটিয়ে গন্ধকের খোঁজ আমি ঠিকই বের করতে পারব। কিন্তু আমার সঙ্গী অসুস্থ। তার গাইতি চালাবার শক্তি নেই। ওকে পেছনে আগের জায়গায় কাজ করতে দাও।'
আসলে ময়দানের ভেতরের বিপজ্জনক এলাকায় সানলককে নিয়ে যেতে চাইছে না জেসন। এতদিন দু'জনের কাজ একাই করেছে ও, এখনও করবে; কাজ করা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আসল সমস্যা ময়দানের পাথরের নিচে আগুন থাকলে। কোথাও হয়তো ওপরের পাথর ফাটলেই লকলক করে বেরিয়ে আসবে বিশ ফিট উঁচু তিরিশ ফিট বৃত্তের আগুনের শিখা। জেসন হয়তো লাফিয়ে আগুন এড়িয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা করতে পারবে। কিন্তু এই দুর্বল শরীরে সানলক পারবে না কোনমতেই। হাঁটতেই যার কষ্ট হয় সে লাফ দেবে কী! সানলক যদি জেসনের সঙ্গে বেড়িতে বাঁধা থাকে তাহলে আগুন বেরিয়ে এলে দু'জনেই মারা যাবে।
জেসনের কথায় কান দিল না রক্ষীদের নেতা। অল্প কিছু জওয়ান সঙ্গী বলল, 'অফিস থেকে নির্দেশ দেয়া হয় কে কোথায় কাজ করবে। আমাদের সাধ্য নেই বন্দিদের জায়গা বদল করতে সেক। সামনে এগোও। গাইতি চালাও।'
রক্ষীদের রাইফেলকের মাথায় ধারাল বেয়োনেট। সেই বেয়োনেটের খোঁচা মেরে জেসন আর সানলককে সামনে পাঠিয়ে দিল রক্ষীরা। নিজেরা রইল অনেকটা পেছনে রইল। নিচ থেকে নীল আগুনের হলকা উঠবে সে-ভয় রক্ষীদেরও আছে।
'আমাদের তাহলে মেরে ফেলতে চাও তোমরা?' জিজ্ঞেস করল জেসন।
'গাইতি চালাও' জবাবে হুঙ্কার ছাড়ল রক্ষীরা। কয়েকজন সামনে বেড়ে রাইফেলের বাঁট দিয়ে গুঁতো দিল ওর পিঠে। বাধ্য হয়ে সামনে বাড়ল জেসন। তার সঙ্গে সঙ্গে সানলকের কপালেও মার জুটেছে। এই প্রচণ্ড আঘাত সইতে পারবে না বেচারা।
'কোপ দাও!'
'দেরি করছিস কেন, বাটা!'
'গুলি করে দেব, সার?'
'না।'
পাথরের গায়ে গাইতির কোপ দিল জেসন। নরম পাথর কেটে ভেতরে ঢুকে গেল গাইতির সামনেটা। টান দিয়ে গাইতি তুলতেই পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো নীল আগুনের শিখা। হিসহিস আওয়াজ করছে আগুন।
রক্ষীদের দিকে তাকাল জেসন। 'আগুন বেরোবে এখান দিয়ে। আমি হয়তো লাফিয়ে সরে যেতে পারতাম, কিন্তু আমার সঙ্গী খুবই দুর্বল, ওর পক্ষে লাফ দেয়া সম্ভব নয়। আমি যদি বাঁচিও, পুড়ে মরে যাবে বেচারা।'
'কাজ শুরু কর!' জবাবে বেয়োনেট দিয়ে খোঁচা মারা হলো জেসনের গায়ে। কাপড় ফুটো হয়ে রক্ত বেরল এবার।
প্রবল বেগে গাইতি নামিয়ে আনল জেসন ফাটা পাথরের গায়ে। প্রচণ্ড আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেল পাথর। ছোটখাটো একটা গহ্বর দেখা গেল পাথরের জায়গায়। গর্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো তীব্র অগ্নিশিখা। জেসনের বাঁ হাত পুড়ে গেল প্রখর তাপে। আর্তচিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ল সানলক। দুই হাতে দুই চোখ চেপে ধরল। আগুনের হলকা লেগেছে তার চোখে।
'অন্ধ হয়ে গেছি আমি!' চিৎকার করে উঠল সানলক। 'আমি অন্ধ হয়ে গেছি! পুড়ে গেল সব!'
ঝলসানো হাতে জ্বালাপোড়া ভুলে সানলককে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো জেসন, সানলককে জাপটে ধরে বিরাট এক লাফে আগুনের ওপারে গিয়ে পড়ল।
'খোঁড়ো! পাথর কাটো!' রাইফেল বাগিয়ে গর্জন করে উঠল রক্ষীরা। জেসন আর সানলক তাদের বেয়োনেটের নাগালের মধ্যে নেই, কাজেই এখন গুলি করার ভয় দেখাচ্ছে।
গুলি করতে কোন অসুবিধে নেই। বাধ্য বন্দিকে গুলি করে মেরে ফেললে জবাবদিহি করতে হয় না রক্ষীদের। গুলি করত রক্ষীরা, কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। আগুনের প্রকোপ কমতেই এবার গর্ত থেকে বেরতে শুরু করেছে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ছড়িয়ে পড়ছে ধোঁয়া। ধোঁয়ার আড়ালে পড়ে গেছে জেসন আর সানলক।
রক্ষীদের চোখেও লাগছে ধোঁয়া। গন্ধকের ধোঁয়া। অত্যন্ত ঝাঁঝাল। ক্ষতিকর। পিছিয়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রক্ষীরা। সানলকের চোখের দিকে তাকাল জেসন। এখনও চোখ চেপে ধরে আছে সানলক। অস্ফুট স্বরে কাতরোক্তি করছে। ঈশ্বরকে ডাকছে।
'কোপ মারো!' চেঁচাল রক্ষীরা।
সানলকের ওপর থেকে চোখ সরাল জেসন। দেখল ধোঁয়ার স্তর পাতলা হয়ে গেছে। রক্ষীদের দেখা যাচ্ছে, রাইফেল উঁচিয়ে গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
একটানে সানলককে নিজের পেছনে এনে আড়াল করে দাঁড়াল জেসন। পরক্ষণেই সামনে বেড়ে রক্ষীদের সামনে পাথুরে মাটিতে গায়ের জোরে নামিয়ে আনল গাইতি। কোপ দিয়েই দু'হাতে চোখ চেপে ধরে লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলো ও।
ছিটকে বেরল আগুন। রক্ষীদের তর্জনগর্জন আর হুঙ্কার আতঙ্কিত চিৎকারে রূপ নিল। আগুন আর ধোঁয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্যে অনেকখানি পিছিয়ে গেল তারা। প্রত্যেকেই নিজের চোখ সামলাতে ব্যস্ত।
এবার জেসন অবিশ্বাস্য একটা কাজ করে বসল। সানলকের পায়ের কাছে বসল ও, তারপর দু'হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল দু'জনের পায়ে বাঁধা লোহার বেড়ি। পাটকাঠির মতো ভেঙে গেল লোহার শেকল। বেড়ি পায়েই রইল, কিন্তু এখন অনেক সহজে হাঁটতে পারবে ওরা। সানলক না পারলেও জেসন পারবেই। চোখের যন্ত্রণায় পাগলের মতো হয়ে গেছে সানলক। দুর্বল শরীরে তার নড়ার শক্তি নেই।
এক হাতে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা একটা ছেলের মতো সানলককে কাঁধে তুলে নিল জেসন। তারপর পাথুরে মাটিতে হোঁচট খেতে খেতে ছুটতে শুরু করল দ্রুত পায়ে। ক্রমেই রক্ষীদের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
ধোঁয়া সরে যাবার পর রক্ষীরা দেখল রাইফেলের পাল্লার বাইরে চলে গেছে বন্দিরা।
পালাচ্ছে জেসন। পালিয়ে যাবে কোথায়?
চারপাশে দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই গন্ধকের ময়দান, আগুনে পাহাড়। আশপাশের গর্ত আর ফাটলগুলো দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া আর আগুনের কুণ্ডলী উঠছে। মাথার ওপর সোনালী আগুন ঢালছে সূর্য। পায়ের নিচে পাথুরে মেঝে তেতে আছে। যেদিকে তাকানো যায় তাপ প্রবাহের কারণে থরথর করে কাঁপছে সবকিছু।
চারপাশে পাথর আর পাথর। আগুন, ধোঁয়া, গর্ত আর ফাটল। তারই মাঝ দিয়ে পথ করে দৌড়াচ্ছে জেসন। কতক্ষণ ও দৌড়াতে পারবে সানলককে এভাবে কাঁধে নিয়ে? হাঁটার ক্ষমতাও নেই সানলকের। ওকে এখানে ফেলে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। অন্ধ সানলক পুরোপুরি অসহায়। অন্ধ কিনা সেটা নিশ্চিত নয়। কিন্তু এখনও চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। এই অবস্থায় সানলককে ফেলে যাওয়া যায় না। কিন্তু ওর জন্যে গতি কমে যাবে।
রক্ষীদের মাঝে এতক্ষণে নিশ্চয়ই সাড়া পড়ে গেছে। গন্ধকের মাঠ থেকে এই প্রথম কোন বন্দি পালাল। তাও আবার একসাথে দু'জন। রক্ষীদের পুরো দলটাই নিশ্চয়ই ধাওয়া করবে ওদের। তবে ওরা আসবে দেখেশুনে বিপদ এড়িয়ে। ওদের গতি থাকবে কম। ওরা হবে সতর্ক। জেসন তা নয়। প্রাণপণে ছুটছে জেসন। লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে গর্ত আর বিপজ্জনক আগুনের ফাটল।
তবে নিশ্চিত ভাবেই ধরে নেয়া যায় অমোঘ নিয়তির মতোই আসবে রক্ষীরা। তাদের হাতে ধরা পড়লে জেসন আর সানলকের মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না কেউ।
গন্ধকের মাঠ থেকে কারও রক্ষা নেই। জেসন নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় নিজেই সই করেছে। এই ময়দান থেকে বেরুতে পারলেও মরতে হবে, ভেতরে থাকলেও মরতে হবে। ভেতরে থাকলে মরবে ওরা অনাহারে, পিপাসায়, আর বাইরে গিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যু হবে ফাঁসিকাঠে। বেরুতে যদি পারে তবুও ধরা পড়তেই হবে। ওদের পায়ে বেড়ি, গায়ে গন্ধকের ময়দানের সাজাপ্রাপ্তদের পোশাক। সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ওরা।
সবই জানে জেসন। তবুও ছুটে চলেছে ও। যন্ত্রের মতোই ক্লান্তিহীন, নির্বিকার মুখে ছুটছে। লক্ষ্য ওর গন্ধকের ময়দানের শেষ প্রান্তের একটি গিরিখাত। ওটাই এই নরক থেকে বেরিয়ে যাবার একমাত্র পথ। খাড়া পাহাড়ের গায়ে সেই একটি মাত্র গিরিখাত দিয়ে বেরোনো যায় গন্ধকের ময়দান থেকে। সরু সেই গিরিখাত। একসঙ্গে দু'জন লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারবে না। আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু, দুর্গম ওই গিরিখাতটাই ওর শেষ আশা ভরসা। গিরিখাত লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে জেসন। কাঁধের ওপর ঝাঁকি খাচ্ছে সানলক। মাঝে মাঝে প্রলাপ বকছে,
‘পানি! একটু পানি দাও!’ আবার চেতনা ফিরলে বলছে,
‘আমাকে নামিয়ে দাও, ভাই। একা পালাতে চেষ্টা করো। আমাকে নিয়ে পারবে না। আমার জন্যে তুমি কেন নিজের জীবনটা দিচ্ছ ভাই। আমাকে নামিয়ে দাও।'
★
অধিবেশন কক্ষ থেকে জর্গেন জর্গেনসেনের সৈন্যরা সানলককে গ্রেফতার করতেই খবর ছড়িয়ে গেল, আইসল্যান্ড আবারও ডেনমার্কের পরাধীন রাজ্য হয়ে গেছে। সরকারী প্রাসাদে বসে গ্রেবা খবর পেল জর্গেনসেন আসছেন। ভদ্রলোক যে সানলকের স্ত্রীকেও ছাড়বেন না এটা গ্রেবা জানত। তাই দেরি না করে পালাল গ্রেবা।
চলবে.....