ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

৩০তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#শেষ_পর্ব (প্রথম অংশ)

“নারী নাকি যত্নে আটকায়! অথচ, আমি তার অবহেলায় আটকে ছিলাম।”

বলেই মিসেস আহানা চোখের চশমা ঠিক করলেন । মুখে তখন মুচকি হাসির রেখা।

“এখনো আটকে আছো ?”

“নাহ!!! এখনো আটকে থাকলে আমি এখানে থাকতাম বুঝি?”

মিসেস আহানার কথায় অষ্টাদশী মেয়েটি ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো। তারপর সে মিসেস আহানা'কে আবার উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো——

“তোমাদের তাহলে ডিভোর্স হয়ে গেছে?”

“নাহ!!কাগজে-কলমের থেকে মনের বিচ্ছেদ যে বড়ো।”

“ধুর বাবাহ!!! তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। তোমার কথাগুলো বড্ড কঠিন!”— অষ্টাদশী মেয়েটি ঠোঁট উল্টে বললো। যা দেখে মিসেস আহানা আবারও ঠোঁট এলিয়ে হাসলেন। তারপর মেয়েটির গাল টেনে দিয়ে বলে উঠলেন —— “এই কঠিন ভাষা বোঝার এখনও তোমার বয়স হয়নি সোনামা!”

“তাহলে তুমি একটু সহজ ভাষায় বললেই পারো তো।”

“আচ্ছা অন্যদিন বলবো! কেমন?? এখন একটু তোমার দিদুনকে ডাকো দেখি!”

মিসেস আহানার বলার সাথে সাথেই মেয়েটি ধুপধাপ পা ফেলে ছুটলো তার দিদুন'কে ডাকতে। যা দেখে মিসেস আহানা আবারও হাসলেন। মেয়েটি ভারী দুরন্ত। আর কথা বলে একেবারে তোতা পাখির মতো। শুনলেই মনটা যেন ভালো হয়ে যায়।

মিষ্টি মেয়েটির নাম হিয়া। মিসেস আহানার স্কুল জীবনের বন্ধুর নাতনি। হিয়া গল্পপ্রেমী। সে গল্প শুনতে বেশ ভালোবাসে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই। মিসেস আহানা যখন হিয়াকে প্রথম দেখেছিলেন তখন তার বয়স তেরোবছর। সেই সময় ওইটুকু মেয়ের ভূতের গল্পের প্রতি কি ঝোঁক। একগাদা ভূতের গল্পের বইয়ের সাথে দাদু-দিদুনের মুখে গল্প শুনতে মেয়েটা বেশ ভালোবাসতো। বরং এখনো যাকে পায় ধরে 'গল্প শুনবো' বলে বায়না করে। আগে অবশ্য ভূত-পেত্নী-ডাইনীর গল্প শুনতো। এখন মেয়েটা অন্যধরনের গল্প পছন্দ করে। এই যেমন, এখন তার প্রশ্ন গুলো এমন হয় —— “তোমাদের কী লাভ ম্যারেজ?? আচ্ছা, দাদু কী অফিস থেকে ফেরার পথে তোমার জন্য চুরি-টিপ আনতো?? তুমি দাদুকে লজ্জা পেতে? আরো কত কী”...

মিসেস আহানার উওর সবসময় না’ই হয়। ঠিক তখন হিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে——“ধুর বাবাহ!! এমন কন?? আমার গল্পের নায়ক গুলো তো খুউব ভালো”...

তখন মিসেস আহানা মেয়েটার নাক টেনে দিয়ে বলেন — “বোকা মেয়ে, গল্প আর বাস্তব কখনো এক হয়??”

-----

মিসেস আহানা চোখের চশমা খুলে মলিন হাসলেন। ইতিমধ্যে পাঁচটা বছর কেটে গেছে দেখতে দেখতে। এই পাঁচ বছরে অনেক কিছু বদলেছে।

সাংসারিক জীবন থেকে তিনি অবসর নিয়েছেন সেই কবে। আসলে যেখানে সম্মান নেই সেখানে তো আর থাকা যায় না। মিসেস আহানাও থাকেননি।

আগে নয়ন্তীকার মুখ দেখে সব মেনে নিলেও। নয়ন্তীকার বিয়ের পর আর তিনি নৈতিক মুখার্জির উপর নির্ভর হয়ে থাকেননি। মিসেস আহানার স্কুল জীবনের বন্ধুর সহায়তায় তিনি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মহিলাদের নিয়ে সেলাই থেকে শুরু করে আচার পাঁপড়ের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।

উপরওয়ালার দয়ায় এখনও সব ভালোই চলছে। বর্তমান, মিসেস আহানা নিজের টাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন। তিনি নিজের জীবন একাই আপাতত কাটাচ্ছেন। তাও আবার নিজের টাকায়। আর এটাই নৈতিক মুখার্জির যোগ্য জবাব।

নৈতিক মুখার্জি ভেবেছিলেন —— শত অপমান,অসম্মান, দুর্ব্যবহারের পরও মিসেস আহানা তার পায়ে পড়ে থাকবেন। তার কথায় তিনি উঠবেন আর বসবেন। কেননা তিনি মিসেস আহানার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে কথা। কিন্ত তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নৈতিক মুখার্জির গালে একটা অদৃশ্য চড় দিয়েছেন।

কথায় আছে না—— “নারী যেমন গড়তে পারে, তেমন ধ্বংসও করতে পারে।”

মিসেস আহানা মুখার্জি বাড়িটাকে অনেক যত্ন নিজ হাতে গড়ে ছিলেন। সে টাকা নৈতিক দিলেও, মায়া মমতা তো মিসেস আহানারও ছিল। কিন্ত ওই যে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। নৈতিক মুখার্জির অতিরিক্ত পাপের জন্য তাদের সাজানো গোছানো বাড়িটা আজ মরুভূমি। আর সে তার পাপের ফল ভালোই পাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। লোককে ঠকিয়ে গড়ে তোলা তার ব্যবসার চিহ্ন আজ কোথাও পাওয়া যায় না। মিসেস আহানা শুনেছেন কোনো ভাবে চলছে তার। হয়তো একবেলা ভাত খেয়ে আর একবেলা জল খেয়ে।

তবু তার মিথ্যে অহং, দম্ভ যায়নি। নয়ন্তীকা এই পাঁচ বছরে কম চেষ্টা করেনি তার বাবার সাথে কথা বলার জন্য। সবকিছু আগের মতো ঠিক করে নেওয়ার জন্য। কিন্ত লোভী লোকটা মেয়েটার মুখের দিকে ফিরেও তাকায়না একবার। নয়ন্তীকা কথা বলতে গেলেই সে দুর্ব্যবহার করে তার সাথে।

বর্তমানে অহংকার আর লোভ ব্যতীত নৈতিক মুখার্জি সব হারিয়েছে। মিসেস আহানা সেই ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময়ও তিনি আটকানোর চেষ্টা করেননি তাকে। মানুষটার কাছে নিজের কুড়ি বছরের সংসার-বউ আর বাচ্চার থেকে বড়ো তার লোভ আর অহংকার। হায় রে, লোভী মানুষ!!!!

আসলে, নৈতিক মুখার্জিরা এইরকমই হয়। মিথ্যে অহংকারের জন্য তারা নিজের ঘর ভাঙতে দুবার ভাবেও না। তাদের কাছে ফ্যামিলির আগে টাকা বড়ো। তাদের লোভ বড়ো। এমনকি লোভে পড়ে তারা পাপ করতেও দুবার ভাবে না। তাই তো দিনশেষে তারা শাস্তিটা পায়। তাদের কু-কর্মের শাস্তি। ওই যে—— “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু!!”

---------------

“তুমি নয়নকে কী বলেছ হতছাড়া?? মেয়েটা কাঁদছে সাথে বাচ্চাটাও কাঁদছে। দুজনকেই সামলানো যাচ্ছে না। তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবে। নাহলে তোমার একদিন কী আমার একদিন!”

বলেই অনিমেষ দাশগুপ্ত টুক করে ফোন কাটলেন। ঘটনা এতই দ্রুত ঘটে গেল কি রক্তিম কোনো কথা বলার সুযোগই পেল না। সে হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ফোনের দিকে।

“স্যার, ফাইলটা”...

ম্যানেজারের ডাকে রক্তিম তাকালো। তারপর মনে পড়লো বাবার বলা শেষ কথাটা। সে আজকে বাড়ি না যেতে পারলে বাড়িতে আর ঢুকতে দেওয়া হবে না তাকে। কেননা তার আদরের বউমা কম মেয়ে কান্নাকাটি করছে। তাও আবার রক্তিমের জন্য। অথচ সে জানে না। হাস্যকর ব্যাপার-স্যাপার।

রক্তিম নিজের কোট আর ফোন নিতে নিতে তার ম্যানেজারের উদ্দেশ্যে বললো —— “আজকে অফিসটা তোমার দায়িত্ব ছেড়ে গেলাম। যদি তোমার কোনো ভুল আমার কানে আসে, তারপর তোমার একদিন কী আমার একদিন।”

বলেই রক্তিম নয়ন্তীকার নাম্বারে ফোন করতে করতে বেরিয়ে গেল। তার বউ-বাচ্চা কাঁদছে বাড়িতে। নাহ, দুটো বাচ্চা। তাদের বিয়ের ইতিমধ্যে পাঁচবছর কেটে গেছে, অথচ মেয়েটা সেই আগের মতোই রয়েছে ছিঁচ কাঁদুনি। একটা গুবলু-গাবলু বাচ্চা।

--------------------

নয়ন্তীকার জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুশমন হচ্ছে কুকুর। আর তার চেয়ে বড়ো দুশমন ওই খচ্চর বান্টি। এই বাড়ির সবাই জানে নয়ন্তীকা কুকুরকে ভয় পায়। সেটা টুইটার বলে নয়। পৃথিবীর সব কুকুরের থেকেই নয়ন্তীকার মারাত্মক ভয়।

তাই এই বাড়িতে আসার পর থেকেই টুইটারকে অন্য একটা ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়। কিন্ত যখন রক্তিম বাড়ি থাকে কিংবা নয়ন্তীকার নীচে অতো কাজ না থাকলে তখন টুইটার কে ছাড়া হয়। সে তাদের রুম ব্যতীত সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।

এই নিয়ম গত পাঁচ বছর ধরে চলে আসছে। আর এই বিষয়ে রক্তিম সহ তার শ্বশুর বাবা ভালোই নজর দেন।

কিন্ত আজকে তাদের অগোচরে একটা ভিন্ন ঘটনা ঘটে গেছে। মিসেস রেবা তখন কিচেনে। রক্তিম অফিসে আর অনিমেষ দাশগুপ্ত বাজারে। ঠিক তখনই রূপক তাদের ঘরে এল নয়নীকে নিতে। নয়ন্তীকা তখন বিছানায় শুয়ে ল্যাদ খাচ্ছে।

রূপক নয়নীকে নিজের সাথে নিয়ে গিয়ে টুইটারকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। নয়ন্তীকা দরজা বন্ধের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো মাত্রই টুইটার দ্রুত গতিতে ছুটে এল তার কাছে। নয়ন্তীকা হতভম্ব হয়ে গেল মূহুর্তে। ততক্ষণে টুইটার তার উপর উঠে এসে হাঁপাচ্ছে আর জোরে জোরে ডাকছে। নয়ন্তীকার তখন হাট অ্যাটাক আসবে আসবে অবস্থা। তারপর নয়ন্তীকা ভয়ের চোটে ঘরের এই কোণা থেকে ওই কোণায় ছোটা শুরু করলো। এরপর টুইটারও তার কাছে এসেই তার গায়ে একেবারে উঠে পড়ছে। নয়ন্তীকা ভয়ে কেঁদে ফেললো হু হু করে। অতিরিক্ত ভয়ের জন্য সে চেঁচাতে পারলো না মোটেই। এরপর ঠিক দুমিনিটের মাথাতেই রূপক বাইরে থেকে দরজা খুলে এসে নয়নীকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে টুইটারকে নিয়ে চলে গেল।

ঠিক তার পরেই মিসেস রেবা সহ অনিমেষ দাশগুপ্ত এলেন তার কাছে। নয়ন্তীকা তখনো কেঁদে চলেছে। কান্নার ফলে তার ছোট্ট শরীর খানা কেঁপে উঠছে। এইদিকে মায়ের কান্না দেখে ছোটো নয়নীও ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। যা দেখে অনিমেষ দাশগুপ্ত নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন। অপরদিকে মিসেস রেবা নয়ন্তীকাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে চুপ করাতে লাগলেন। তিনি অনিমেষ দাশগুপ্তের উদ্দেশ্যে বললেন —— “বাঁদরটা'কা এখুনি আসতে বলো। কী বলেছে মেয়েটাকে ও? মগের মুল্লুক পেয়েছে?? বাচ্চা মেয়েটাকে কাঁদানোর অধিকার কে দিয়েছে ওকে?? রূপক না বললে জানতে পারতাম না। ওকে শীঘ্রই আসতে বলো।”

------------

নয়ন্তীকার ইতিমধ্যে কান্না থেমে গেছে।সে চুপচাপ বিছানায় বসে রয়েছে চোখমুখ লাল করে।মা-বাবা তাকে চুপ করিয়ে নীচে নেমে গেছে অনেকক্ষণ হল। তার পাশেই তাদের মেয়ে নয়নীকা খেলছে হাতপা ছড়িয়ে। নয়নীকার পাশেই কাজুও বসে রয়েছে। সে ড্যাব ড্যাব করে একবার নয়নীকা'কে দেখছে আর একবার নয়ন্তীকাকে দেখছে।

ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ হল। নয়ন্তীকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো, রূপক এসেছে। নয়ন্তীকা নাক মুছে মুখ ঘুরিয়ে নিল। রূপক এসে নয়নীকা কোলে নিয়ে সোফায় বসলো, ঠিক তার সামনে।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ গড়ালো, কেউ কোনো কথা বললো না। নয়নীকার আওয়াজ ব্যতীত আর কোনো শব্দ কানে এল না। এমনকি কাজুও টু শব্দ করছে না। সে গোলগোল চোখে চেয়ে দেখছে সবকিছু।

অপরদিকে নয়ন্তীকার নিরবতা সহ্য হচ্ছে না রূপকের। সে ভ্রু কুঁচকে দেখছে মঞ্জুলিকাকে। নাহ্! এই মেয়ে তো চুপচাপ থাকার নয়। তাও আবার এতকিছুর পর। তাই রূপক নয়ন্তীকাকে রাগিয়ে দিতে বলে উঠলো —— “এই কেমন দিলাম মঞ্জুলিকা? ভালো তো?”

বলেই রূপক হাসলো। যা দেখে রাগে ছ্যাৎ করে উঠলো নয়ন্তীকা। তার রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছে। কিন্ত এই অসভ্যটার সামনে সে কাঁদবে না।

নয়ন্তীকা ডান হাত উঁচিয়ে আবার নাক ঘষলো। তারপর সোফায় আরামসে বসে থাকা রূপকের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো—— “ কোয়েল ঘোষকে আমি চিনি না তো। শুধু আমার উনি আসুক একবার। তারপর বলবো কোয়েল ঘোষের খোঁজ করতে”....

“এই অসভ্য মহিলা, তুই ওর খোঁজ কোথায় পেয়েছিস?? তুই আমার ফোন ধরেছিলিস??”

বলতে বলতেই রূপক নয়ন্তীকার কাছে লাফিয়ে চলে এল, তার চোখেমুখে ভয়। নয়ন্তীকা রূপকের মুখ পানে চেয়ে শয়তানি হাসি হাসলো। তারপর সে দুষ্টু কন্ঠে বলে উঠলো —— “ওহ! ওটা তোর ফোন ছিল বুঝি?? হলরুমে ফোন খুলে ঘুমালে আমি কী করতে পারি বল??? ”

নয়ন্তীকার ইহ কথায় রূপক ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। কিছুক্ষণ আগের ভিতু মুখটা আর নেই। সে হাস্যরত অথচ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো —— “যা বলে দিস। আমারও তো বিয়ের বয়স হয়েছে। এবার বাড়ির লোকের কাছে নিজের বিয়ের কথা বলতে আমার লজ্জা করবে না বল?? তুই আমার কাজটা করে দিলে সুবিধাই হয়। সাথে তুইও বিয়ে বাড়ি খেতে পারবি।”

“আচ্ছা তাই নাকি??? যা আমি মায়ের কাছে বলবো। তবে কোনটার কথা বলবো বলে তো??তোর কয়েল সোনা, নাকি দিয়া, রিয়া, পিয়া, জিয়া? নাকি ইনা, মিনা, টিনা কার কথা বলবো???

নয়নীকার কথা শুনে রূপকের মুখের রঙ পাল্টে গেল মূহুর্তে। সে নয়নীকাকে বিছানায় বসিয়ে নিজেও ধপ করে বসে পড়লো নয়ন্তীকার পাশে। তার মাথায় হাত। বাড়ির লোক যদি ইনা-মিনা-টিনার কথা জানে তাহলে একটাও মাইর মাটিতে পড়বে না। রূপক আগেভাগেই কী হতে পারে ভেবে একটা ঢোক গিললো। এখন কোনো ভাবে এই নয়নের বাচ্চার মুখ বন্ধ করতে হবে।

সে ঘার ঘুরিয়ে নয়ন্তীকার পানে চাইলো। মেয়েটা পায়ের উপর পা তুলে বসে রয়েছে। মুখে শয়তানি হাসির ছড়াছড়ি। একটু আগেও যে কাঁদছিল, তার ছিটেফোঁটাও নেই মুখে। রূপক নয়নীকাকে মনে মনে খুব বকলো। সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো — গিরগিটি একটা।

এরপর রূপকও নিজের রঙ পাল্টে কাঁদো কাঁদো মুখ করে নয়ন্তীকার হাত ধরে বলতে লাগলো —— “তুই না আমার বউদি হোস? আমি না তোর ভাইয়ের মতো দেওর?? তুই এইরকম করতে পারবি আমার সাথে??”

“আমি সব করতে পারি। আসলে যে যেমন আমি তার সাথে তেমনি। তুই যদি আমাকে টুইটারের সাথে বন্ধ করতে পারিস। তাহলে আমিও সব পারবো।”

নয়ন্তীকার এই কথায় রূপক মুখটা ভোঁতা করে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো —— “ প্রথমে তুই আমার চায়ের সাথে গুঁড়ো লঙ্কা মিশিয়ে খাইয়ে ছিলিস!”

নয়ন্তীকা রূপকের পানে অগ্নি চোখে চাইলো। তারপর রাগি গলায় বলে উঠলো —— “তার আগে তুই আমার পছন্দের ফুলের টবটা ভেঙে দিয়েছিলিস।”

“মনে করে দেখ নয়ন, তার আগে তুই আমার পছন্দের নতুন জুতোটা পুকুরে ফেলে দিয়েছিলিস।”

“হ্যাঁ! তুই ধোয়া তুলসী পাতা তো। মনে আছে ওই পুকুরেই আমার একটা কুর্তি ডুবিয়েছিস তুই?”

এই রে, কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটে সাপ বেরোচ্ছে!! রূপক মাথা চুলকালো। তারা একে অপরের উপর শোধ তুলতে এত কুকর্ম করেছে সে আজ জানলো। এখন আর একটা কথা বললে আরও দশটা শুনতে হবে। যা আজ সারাদিন-রাতেও শেষ হবে না।

তার চেয়ে ভালো একটা চুক্তি করলেই হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। রূপক নয়ন্তীকার উদ্দেশ্যে দুঃখী কন্ঠে বলে উঠলো — আমি খুব দুঃখিত নয়ন। এতবছর ধরে আমি তোর সাথে খুব বাজে ব্যবহার করেছি। আজ থেকে তুই যা বলবি আমি তাই করবো। তুই পা ধরতে বললে আমি তাও করতে রাজি আছি। কিন্ত তুই আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি আর তোর পিছনে লাগবো না।

নয়ন্তীকা নয়নী'কে কোলে নিয়ে গালে চুমু খেল। একবছরের ছোটো নয়নী দুই হাতে নয়ন্তীকার মুখ আগলে লালা লাগিয়ে দিল। নয়ন্তীকা একপলক রূপকের দিকে তাকিয়ে বললো—— “পা ধরে ক্ষমা চাইলে ভাবতে পারি।”

এই কথা শোনা মাএই রূপক মুখ কুঁচকালো। মনে মনে নয়নকে সে বকতে লাগলো— অভদ্র, পাষানী মহিলা বলে। এরপর সে ধীরে ধীরে নয়ন্তীকার পায়ের কাছে বসলো। যদি খচ্চর মেয়েটার একটু মায়া দয়া হয়। যদি বলে — “না থাক রূপক। তুই তো ছোটো মানুষ, আমি কিছু মনে করিনি।”

কিন্ত সে গুড়ে বালি। রূপকের ভাবনা মতো কিছু হলো না। রূপক নয়ন্তীকার পা ধরা মাত্রই সে রূপকের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো —— “বল, আমি তোর পা ধরে বলছি আমি তোকে আর বিরক্ত করবো না।”

নয়ন্তীকার এই কথায় রূপক করুন চোখে তাকালো। যা দেখে নয়ন্তীকা তাড়া দেখি বলে উঠলো —— “তাড়াতাড়ি বল!! বেশি সময় নেই আমার কাছে।”

হুঁ রে! রানি ভিক্টোরিয়া আমার। বাসন ধুতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভেবেই রূপক মুখ কুঁচকালো। তারপর নয়ন্তীকার কথা মতো রূপক বলা মাএই, ছোটো নয়নী কী বুঝলো কে জানে সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। যা দেখে রূপক অসহায় চোখে চাইলো নয়নীর পানে। দুই দিন আগে ডাউনলোড হওয়া নয়নের জেরক্স কপি এখন তার উপর হাসছে। ভাবা যায়?? পুরোই মায়ের মতো হয়েছে। কাঁধে-কোলে-পিঠে মানুষ করলো সে। এতদিন যত হাগা-মোতা তার গায়ে করলো। এখন তার উপর হাসছে।

ভেবেই রূপক বেশ দুঃখ পেল। যা নয়ন্তীকা বেশ বুঝলো। সে রূপকের উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠলো ——“ আর আমার সাথে লাগতে আসবি?”

“মাথাখারাপ নাকি? পাগল কুওায় কামড়ালেও আর তোর পিছনে লাগবো না। সত্যি!!”

রূপকের কথা বলার ভঙ্গি দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো নয়ন্তীকা। সে হাস্যরত মুখে বলে উঠলো —— ঠিকাছে, যা ক্ষমা করলাম! এখন চোখের সামনে থেকে ফোট।

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#শেষ_পর্ব ( দ্বিতীয় অংশ)

ঘড়িতে তখন সাড়ে বারো'টা, রক্তিম তাড়াহুড়ো করে দাশগুপ্ত বাড়িতে ঢুকলো। তখন লিভিং রুমে অনিমেষ দাশগুপ্ত খবরের কাগজ এবং মিসেস রেবা দুপুরের মেনু নিয়ে ব্যস্ত। রক্তিম এসেই বাবার পাশে ধপ করে বসে পড়লো। শব্দ শুনে অনিমেষ বাবু মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজ সরিয়ে ঘাড় কাত করে চাইলেন। এইদিকে, মিসেস রেবাও সবজি কাটা বাদ ছেলের দিকে মনোযোগ দিলেন।

রক্তিম কোনো দিকে না তাকিয়ে হাতে থাকা ফুলের তোড়া, চকলেট-চিপসের প্যাকেট গুলো সামনের টেবিলে রেখে মাথাটা সোফার পিছনে এলিয়ে দিল।

“তুমি দেড় ঘণ্টা লেইট করেছো হতছাড়া!”

রক্তিম সামনের কয়েকটা বোতাম খুলতে খুলতে জবাব দিল— “ট্রাফিকে আটকে ছিলাম বাবা। জানোই তো কলকাতার রাস্তাঘাটের অবস্থা!”

“না জানি না। আমি অতো কিছু এই মুহূর্তে আপাতত জানতে চাইছি না!! তুমি শুধু বলো— মেয়েটাকে কাঁদিয়েছো কেন?”

রূপক সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। বাবার কথা শোনা মাএই দাঁড়িয়ে পড়লো চুপচাপ। এই তিন নয়ন ভক্ত সত্যিটা জানতে পারলে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে নিশ্চয়ই। এখন এদের চোখের সামনে না পড়লেই হয়। তাই রূপক চুপচাপ কেটে পড়লো সেখান থেকে।

এইদিকে, অনিমেষ দাশগুপ্তের কথায় রক্তিম কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। নয়ন তার কারণে কাঁদতেই পারে না। সে মেয়েটার ঠোঁটের হাসির কারণ হতে পারে, ওর চোখের জলের নয়। এই কথাটা যদি তার মা-বাবা বিশ্বাস করতো। কিন্তু আফসোস!!

রক্তিম উঠে দাঁড়ালো চুপচাপ । অযথা তর্ক করে লাভ নেই। তাই সে কোনো দিকে মনোযোগ না দিয়ে, চুপচাপ চিপস, চকলেট গুলো নিয়ে কেটে পড়লো। দেখাযাক তার বাচ্চা বউয়ের কান্নাকাটির কারণ কি!

--------

নয়ন্তীকা তখন রাগে গজগজ করতে করতে ঘর গোছাতে ব্যস্ত। মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছে রূপককে জব্দ করার কৌশল। ওই বদমাইশ বান্টিকে আচ্ছা মতো নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারলে তার বেশ শান্তি লাগতো। তবে কোনো ব্যাপার না। এবারে এমন ফাঁদে ফেলবে ওই দুষ্টু বান্টিকে। সে নয়ন্তীকা'র নাম শুনেই পালাবে। হু!! তার পিছনে লাগতে আসা বেরিয়ে যাবে একেবারে।

নয়ন্তীকা জামা ভাঁজ করতে করতে একপলক মেয়ের দিকে তাকালো, ছোট্ট নয়নীকা বিছানায় শুয়ে হাত পা নাড়িয়ে খেলা করছে তখন। নয়ন্তীকা মেয়েকে দেখে রাখার ফাঁকে কাজ সেরে নিচ্ছে। মেয়ের মন ভালো আছে বিধায় নয়ন্তীকা একটু নড়াচড়া করতে পারছে। তা নাহলে অন্যসময় নয়ন্তীকা মেয়েকে ছেড়ে ওয়াশরুম পর্যন্ত যেতে পারে না। নয়ন্তীকা তাকে কোলছাড়া করলেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে নেয় এই মেয়ে। তবে, মায়ের থেকে বেশি বাপ ভক্ত হয়েছে নয়নীকা। নয়ন্তীকা'র মেয়েকে সামলাতে বেশ বেগ পোহাতে হলেও, রক্তিমের কাছে যেন দুধভাত। নয়নীকা তার বাবার কাছে থাকলে তার আর কাউকে লাগে না। খাওয়া দাওয়া সব ভুলে যায়। এমনকি তার মা'কেও।

নয়ন্তীকা'র ভাবনা চিন্তার মাঝেই রক্তিম এসে ঢুকলো ঘরে। হাতের জিনিসপত্রগুলো টেবিলে রেখে একপলক তাকালো তার বাচ্চা বউয়ের পানে। মেয়েটা একমনে কাজ করেই চলেছে, ভুলেও রক্তিমের পানে তাকাচ্ছে না। যা দেখে রক্তিম হাসলো ঠোঁট এলিয়ে। সে বুঝলো তার বাচ্চা বউ প্রচুর রেগে আছে এইমুহুর্তে। তবে সে মূহুর্তের মধ্যে নয়নের রাগ ভাঙিয়ে দেবে। কেননা তার নয়ন তার উপর বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারে না। তা এত বছরে বেশ বুঝেছে রক্তিম। ভেবেই সে আবারও মুচকি হাসলো।

রক্তিম পরপরই টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল। বাইরে থেকে এসে সে মা-মেয়ের কাছে একেবারেই ঘেঁষে না। অপরদিকে, নয়ন্তীকা আড়চোখে রক্তিমের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলো চুপচাপ। সে রেগে আছে। হ্যাঁ রক্তিমের জন্য তার মাথা গরম হয়নি। তবুও সে লোকটার সাথে কথা বলছে না। এটা তার এক বদ অভ্যাস, তাকে যে যা বলুক। নয়ন্তীকা রক্তিমের উপর অভিমান করে। যদিও লজিক'টা আজব। নয়ন্তীকা নিজের ব্যাপার-স্যাপার নিজেই বোঝে না। হয়তো বা বুঝেও বুঝতে চায় না। আসলে লোকটা তার জন্য বিচলিত হলে নয়ন্তীকা'র বেশ ভালোই লাগে। এই কয়েক বছরে নয়ন্তীকা কম তো জ্বালালো না লোকটাকে, তবু সে কখনো বিরক্ত হয় না নয়ন্তীকা'র থেকে।

রক্তিম দশমিনিটের মাথায় ওয়াশরুম থেকে বেরোলো ফ্রেশ হয়ে। টাওয়াল'টা বেলকনিতে মেলে দিয়ে বসলো বিছানায় নয়ন্তীকার পাশে। পরপরই হাত বাড়িয়ে মেয়েকে চট করে কোলে তুলে নিল রক্তিম। ঘাড় বাঁকিয়ে একপলক কাপড় চোপড় গোছানো নয়ন্তীকার পানে চাইলো সে, মেয়েটা একমনে চুপচাপ কাজ করে চলেছে। রক্তিম সামান্য এগিয়ে নয়ন্তীকার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। পরপরই মেয়েকে আদর করতে করতে সুধালো— “আমার নয়নের কী হয়েছে? মন খারাপ কেন?”

নয়ন্তীকা'র হাতজোড়া থেমে গেল আপনাআপনি। সে ঘাড় ঘুরিয়ে একপলক তাকালো রক্তিমের পানে। লোকটা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে রয়েছে। নয়ন্তীকা তাকানো মাএ ভ্র উঁচিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো — “কী হয়েছে?”

নয়ন্তীকা আবারও কাপড় গোছানোতে মন দিল। এবং ঘাড় নাড়িয়ে ধীর স্বরে বলে উঠলো —“ কিছু হয়নি তো।”

রক্তিম মেয়েকে দুহাতে দোল দিতে দিতে বলে উঠলো —“ মাম্মাম, দেখেছো তোমার মাম্মিকে আদর করে দিইনি বলে রাগ করেছে। তাই না নয়ন?”

নয়ন্তীকা ভ্র কুঁচকে তাকালো। যা দেখে রক্তিম দুষ্টু হেসে বলে উঠলো — “আসো নয়ন তোমাকে একটু আদর দিই। আমার আদরের অভাবে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছো।”

রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা নিজের পানে তাকালো। আগের থেকে তার শরীর বেশ ভারী হয়েছে । ফুলকো গাল দুটো আরও লুচির মতো ফুলে গেছে। সেখানে লোকটা বলে কিনা সে শুকিয়ে গেছে। অদ্ভুত!!! নয়ন্তীকা তৎক্ষণাৎ মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো — “এহ! ঢং যতসব। অফিস ছাড়া আর কিছু বোঝো? আমাদের মা -মেয়ের জন্য তোমার কাছে সময় আছে নাকি?”

"এর জন্যই তুমি কান্নাকাটি করছিলে নয়ন? ”

রক্তিমের কন্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট। যার দরুন চটে গেল নয়ন্তীকা। রাগে তার নাক ফুলে ফেঁপে উঠলো মূহুর্তে। সে কাপড় চোপড় ফেলে রক্তিমের দিকে একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলো — “আমাকে ছোট্ট বাচ্চা মনে হয় ? এর জন্য রাগ করবো কেন? তুমি আমাদের জন্য দিনরাত মেহেনত করছো আমি বুঝি না ভেবেছো?”

তার বাচ্চা বউয়ের রাগ দেখে হকচকিয়ে গেল রক্তিম। সে মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নয়ন্তীকা'কে টেনে নিজের কোলে বসালো। মেয়েটাকে দুহাতে পেঁচিয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজলো সে। পরপরই ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো — “একেবারেই না। তুমি বাচ্চা নয়, আমার বাচ্চার মা। তুমি ভীষন বুঝদার নয়ন। তা নাহলে আমরা এতদূর আসতে পারতাম বলো?”

রক্তিমের মাখনের মতো কন্ঠ শুনে মুখ টিপে হাসলো নয়ন। তাদের সাত বছরের সংসারে একবারও তাদের ঝগড়াঝাঁটি হয়নি। নয়ন্তীকা'কে কখনো বলতে হয়নি, ‘যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবো’। তাকে সেই সুযোগ কখনো দেইনি লোকটা। বরং, নয়ন্তীকার সমস্ত অভিমান, অভিযোগ, মিছে রাগ লোকটা মাথা পেতে নিয়েছে। অতি আবেগী নয়নের ঢাল হয়ে পাশে থেকেছে লোকটা।

এইদিকে বেশ কিছুক্ষণের পরও নয়ন্তীকা'কে কিছু না বলতে দেখে রক্তিম নয়ন্তীকা'র গালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। তৎক্ষণাৎ আবেশে চোখ বন্ধ করে নিল নয়ন্তীকা। রক্তিম নয়ন্তীকার গালে নাক ঘষতে ঘষতে বলে উঠলো — “তুমি কেঁদেছো কেন নয়ন? আমি কষ্ট দিয়েছি তোমাকে? আমার কোনো কাজে দুঃখ পেয়েছো তুমি?”

নয়ন্তীকা শাড়ির আঁচল আঙ্গুলে পেঁচাতে পেঁচাতে ধীর গতিতে না সূচক ঘাড় নাড়লো। পরপরই রক্তিম নিজের মাথা নয়ন্তীকার কাঁধে এলিয়ে দিল। সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো — “তবে? কেন কেঁদেছো মেয়ে? তোমার চোখের জল যে আমায় বড্ড কষ্ট দেয় নয়ন। তা জানো না? তখন আমার নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। আমার মনে হয়, আমি বুঝি তোমাকে ভালো রাখতে পার”.....

নয়ন্তীকা রক্তিমের মুখ চেপে ধরলো ডান হাতে। রক্তিমের ইহ কথায় যেন নয়ন্তীকার বুক ভার হয়ে এল দুঃখে। লোকটা কীভাবে ভাবতে পারে যে, নয়ন তার কাছে ভালো নেই। বরং নয়ন তার কাছে আছে বলেই ভালো আছে। সে ভীষন সুখে আছে। এত সুখে তো তার বাবাও রাখেনি তাকে। ভেবেই নয়ন্তীকা'র বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পরপরই সে ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়লো রক্তিমের বুকে। যার ফলে রক্তিম সামান্য পিছনের দিকে হেলে পড়লো। পরপরই সে নিজেকে সামলে আঁকড়ে ধরলো নয়ন্তীকার কোমর। নয়ন্তীকা তখন তড়িঘড়ি করে মলিন কন্ঠে বলে উঠলো —“ রূপকে সাথে ঝগড়া করেছি। তেমন কিছু না। ও শুধু ট্যুইটারের সাথে আমাকে বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই কাঁদছিলাম।”

“দাঁড়াও, আমি রূপক’কে দেখছি। ও মার না খেলে সুধরাবে না।”

রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা তড়িৎ বেগে চাইলো রক্তিমের পানে। হ্যাঁ, সে রূপককে দুচোখে সহ্য করতে পারে না ঠিকই। কিন্তু ছেলেটা তার জন্য মার খাবে , এটা একেবারে চায় না নয়ন্তীকা। তারা দুজনে উপরে উপরে যতই ঝগড়া করুক, একে অপরকে ফাঁসানোর চেষ্টায় থাকুক। কিন্তু দিনশেষে দুজনেই দুজনের ভালো চায়। তা এই বাড়ির সবাই জানে। কিন্তু ওই যে অভ্যাস। তারা দুটোতে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া না করলে তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। তাই কি আর করার।

ভেবেই নয়ন্তীকা মিনমিন করে বলে উঠলো — “আসলে ঝগড়া তো আমরা দুজনেই করি। দুজনেরই দোষ। পরের বার থেকে সত্যি এমন আর হবে না ।”

নয়ন্তীকা''র কথায় রক্তিম ভ্র কুঁচকে তাকালো নয়ন্তীকার পানে। যখনই দুজনে দুষ্টমি করতে গিয়ে ধরা পরে তখনই দুজনেরই মুখে একই গান থাকে। — “পরের বার থেকে আর হবে না।”

কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই দুজনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। আসলে দুটোর মধ্যে টক -ঝাল - মিষ্টি সম্পর্ক। এই ভালো তো, এই খারাপ। দুটোতে ঝগড়া না করে থাকতে পারে না। আবার একসঙ্গে ভালো ভাবেও দুজনের থাকা যায় না। ভেবেই মনে মনে হাসলো রক্তিম।

ঠিক তখনই হাত পা ছড়িয়ে কেঁদে উঠলো নয়নীকা। রক্তিম দক্ষ হাতে মেয়েকে কোলে তুলে, পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। এইদিকে, নয়ন্তীকা তখন হা করে চেয়ে রয়েছে রক্তিমের পরবর্তী কথা শোনার অপেক্ষায়। যা রক্তিম লক্ষ্য করলো। সে মেয়েকে দোল দিতে দিতে বলে উঠলো — “বেশ! দুজনকেই বকবো না। তবে, পরের বার দিয়ে যেন দুজনের ঝগড়া না হয়। মেয়ে বড়ো হচ্ছে, সে কি শিখবে। তাই না?”

নয়ন্তীকা হ্যাঁ সূচক ঘাড় নাড়লো। পরপরই দ্রুত বেগে রক্তিমের গালে ঠোঁট বসিয়ে এক ছুটে পালালো নয়ন্তীকা। কেননা এই লোকের কাছে একবার ধরলে ছাড়া পাওয়া মুশকিল ‌। এইদিকে রক্তিম চোখ ছোট্ট করে চেয়ে রইলো নয়ন্তীকা'র মুখপানে। চোখ দিয়ে নীরবে লোকটা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে— "পালিয়ে আর কোথায় যাবে নয়ন? সেই তো আবার ফিরতেই হবে রক্তিম দাশগুপ্তের কাছে।”

নয়ন্তীকা একটা ভেংচি কাটলো। যা দেখে রক্তিম স্বশব্দে হেসে উঠলো। নয়ন্তীকা মুচকি হাসলো। পরপরই কাজে লেগে পড়লো। বড়মা অর্থাৎ তার শ্বাশুড়ি মা একা রান্নাঘরে। তাকেও তো সাহায্য করতে হবে ভেবেই দ্রুত হাত চালোলো নয়ন্তীকা। এইদিকে, দুষ্টু নয়নীর চোখে ঘুম নেই। সে বাবাকে পেয়ে আহ্লাদী হয়ে উঠেছে যেন। ন্যাকা কান্না কাঁদা শুরু করেছে ইতিমধ্যে। যার জন্য নয়নী'কে কোলে তুলে ঘর জুড়ে পায়চারি করছে রক্তিম, বেশ আদরে মেয়ের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে আলতো হাতে।

নয়ন্তীকা মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলো বাপ -মেয়ের পানে। ইশ তার কপালে এত সুখ ছিল। তার কপালে আস্ত একটা রক্তিম দাশগুপ্ত ছিল। নয়ন্তীকা কখনো কি আদেও ভেবেছিল তারও একটা টোনাটুনির সংসার হবে। নয়ন্তীকা তার মা-বাবা'কে দেখে বিয়ের প্রতি যে বিতৃষ্ণা জন্মেছিল মনে , রক্তিমকে পাওয়ার পরপরই তা ঘুচে গেছে। তার জীবনে, লোকটা আসার পর বুঝলো নয়ন্তীকা ভালোবাসা কেমন হয়। সংসার কেমন হয়, পরিবার কেমন হয়, বাবার ভালোবাসা কেমন হয়।

নয়ন্তীকা'র চোখে রক্তিম একেবারে সুপুরুষ। ছেলে, দাদা,প্রেমিক,বরং, বাবা এই সব চরিত্র হিসেবেই রক্তিম দূর্দান্ত। কারা যেন বলে — মানুষ সকল চরিত্র হিসেবে কখনোই ভালো হতে পারে না। কথাটা আসলে একেবারেই ভুল। তা নয়ন্তীকা রক্তিমকে না দেখলে বোধহয় বুঝতোই না। ভেবেই মুচকি হাসলো নয়ন্তীকা। দৃষ্টি সেই আগের মতোই রক্তিম আর নয়নীর পানে স্থির রেখে সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো — “জীবনে সঠিক মানুষের আগমন হলে, মন জমিনে সারাজীবনই রঙধনু থাকে। জীবন সবসময়ই রঙিন লাগে।”

~ সমাপ্ত 🌸

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন