ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিষাদ বৃক্ষ

পর্ব 23

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বিষাদ_বৃক্ষ
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ২৩

জহিরের ব্যাপারটায় নিষেধ হওয়ার পরে ইব্রাহিমের সাথে আবসারের আর দেখা হয়নি। অবশ্য নামাজের ওয়াক্ত ছাড়া আবসার খুব একটা বেরও হয় না। তবুও তাদের বাড়ি সামনে। ইব্রাহিম গ্রামে থাকলে আসতে যেতে একটু হলেও দেখা হয়। তবে আবসারের মনে হয়েছে ইব্রাহিম নিজে থেকেই দেখা করেনি।

সম্পর্কের সুতো তাহলে ঢিলে হচ্ছে। নাকি অনেক আগেই হয়ে গেছে। যা সে বুঝতে পারেনি। কি জানি! তার জমানা আর এই জমানায় আকাশ পাতাল তফাৎ। এই জমানার মানুষ শুধু টাকা চেনে, ক্ষমতা চেনে তবে ভালোবাসা চেনা না, সম্পর্কের সুতোর টান চেনে না। অথচ সুখে থাকার জন্য এর চেয়ে আর বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই।

ইব্রাহিমের বাবা যখন মারা গেল। তখন তাদের অবস্থা বলতে গেছে খুবই শোচনীয়। বাবার মৃত্যু যেমন তেমন আর্থিক অবস্থাও। এলাকার মানুষ যে যেমন পারছে সাহায্য করছে। আবসারও গেলেন। তবে তিনি টাকা দিলেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, -- যখন মনে হবে আর পারছি না,কোন রাস্তা দেখছি না, তখন আমার কাছে এসো। ইন- শা- আল্লাহ খালি হাতে ফেরাবো না।

ইব্রাহিম অনেক কষ্ট করেছে। মুখ থুবড়ে বার বার পড়েছে। তবুও কোন সাহায্যের জন্য তার কাছে আসেনি। কিন্তু একবার হাত পেতে একজন কেই চেয়েছিল। সে দিতে পারিনি। কিভাবে দেবে? টাকা, পয়সা, ধন, দৌলত সব দেওয়া যায়। সম্পূর্ণ একজন মানুষকে তো তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেওয়া যায় না। অন্তত আবসার পারবে না। আর পারেওনি।

ইব্রাহিমের অনেক কথাই তার কানে আসে। এমনকি, আবসার আর ভাবলেন না। কিছু কিছু জিনিস তার ভাবতে ভালো লাগে না। এই ছেলেটাকে সে খুবই স্নেহ করে। করে বলেই বার বার ক্ষমা করেন।

আবসার মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে ধীরে ধীরে এগুলো। সে আর আহমাদ যাচ্ছে ইব্রাহিমের বাসায় । বিয়ের দাওয়াত দেওয়া দরকার। এই পর্যন্ত ছোট থেকে ছোট সব অনুষ্ঠানে এই বাড়ি কি, ঐ বাড়ি কি। কখনো কারো পক্ষ থেকেই কেউ বাদ যায়নি। তো এবার যাবে কেন? তাছাড়া সে বাঁচবেই আর কদিন। যেই কয়দিন বাঁচে না হয় সেই সবাইকে টেনে রাখুক।

আবসার এসেছে শুনেই ইব্রাহিম সাথে সাথেই বের হলো। সব সময়ের মত এগিয়ে জড়িয়ে ধরল। আবসার হাসলো। যাক কিছুটা তো আছে বাঁকি।

ইব্রাহিম ধরেই আবসারকে বসালো। বসিয়ে সেও তার পাশে বসল। বসেই জামিলের দিকে তাকিয়ে বলল, --- আমার ভাইজান এসেছে। নাস্তার ব্যবস্থা কর। বলেই আবসারের দিকে তাকিয়ে বলল, -- আপনার শরীর ভালো তো ভাইজান?

আবসার মাথা দোলাল। দুলিয়ে বলল, --- ভালো! তোমাদের বাড়ির সব ঠিক।

-- ভালো।

আবসার ইব্রাহিমের হাত টেনে নিজের হাতের মধ্যে নিল। নিয়ে কোমল সুরে বলল, -- বিয়ে এটা পুরোপুরি ভাগ্যের উপরে। আমরা ভাবি আমরা দেখে -শুনে চিন্তা ভাবনা করে, তারপর সব ঠিক করি। আসলে সব ঠিক করেন উপরওয়ালা। তিনি ঠিক যেভাবে যেভাবে নির্দেশ দেন, আমরা কলের পতুল ঠিক সেভাবে সেভাবেই এগুতে থাকি। তাই মনে কোন ক্লেশ রেখ না। জহিরের ভাগ্যে বিথী নেই।

ইব্রাহিম হালকা হাসলো! হেসে বলল, --- এরকম কিছু না ভাইজান। ছেলে মেয়ে থাকলে পাঁচ জায়গার পাঁচজন তো সম্বন্ধ নিবেই। তাই বলে কি পাঁচজনকেই ছেলে, মেয়ে দিতে হবে? আপনি কোন দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি মনে কোন কিছুই রাখিনি।

-- যদি না রাখো। তাহলে এই ভাইজানের দাওয়াতটা কবুল করো। সহপরিবারে আমার খুশিতে সামিল হও।

-- আপনি বলেছেন। অবশ্যই কবুল। আমি আমার পুরো পরিবার নিয়ে যথাসময়ে থাকব।

আবসারের মন থেকে বড় একটা পাথর নামলো। নামতেই সে হেসে ইব্রাহিমের কাঁধে হাত রেখে বলল, --- সব সময় এরকমই থেকো ইব্রাহিম।

ইব্রাহিম এবার হাসল না। তার দৃষ্টি নিচের দিকে। সে নিচের দিকে তাকিয়েই বলল, --- আপনার জন্য আমি সব সময়ই এক ভাইজান। তবে আর কারো জন্য না। কারো না।

আনতারা আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। নাকফুলটা সুন্দর। এতদিন ভয়ে হাতই দেয়নি। তবে যখন পরল, তার নিজের কাছেই ভালো লাগছে। চেহেরাও অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে এতদিন যে তার বাবার ছোট্ট মেয়েটা ছিল। সেটা আর নেই। তার শাশুড়িতো দেখেই বলেছে, যাক এতদিনে মনে হলো আমার ছেলের সত্যিই বউ এসেছে। তবে কান নিয়া করবাটা কি? এক নাক নিয়াই যে খেল দেখাইলা, দুই কান নিয়া তো দুনিয়া দেখাইয়া ফেলবা।

আনতারা কিছু বলেনি তবে ভয়ে ঢোক ঠিকিই গিলেছে। আবার কান? সেই কথা চিন্তা করে সে এখনই এক ঢোক গিললো! গিলে খাটের দিকে তাকালো। সব সময়ের মতো রাতে খেয়েই আজাদ পটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে। পড়েছে তো পড়েছে হাত, পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। আনতারা শুলে অবশ্য ঠিক ভাবে শোয়। কোন নড়াচড়া নেই। সটাং হয়ে সোজা শুয়ে থাকে। ঘুমের মধ্যেও এতো সর্তক কিভাবে থাকে আনতারা বুঝতে পারে না। অবশ্য সে নিজেও নড়াচড়া কম করে। তবুও এভাবে সটাং হয়ে সোজা নিশ্চয়ই হয়ে থাকে না।

সে এগিয়ে গেল। চেয়ার টেনে ঠিক আজাদের সামনে বসলো। তার ঘুম আসছে না। আজকাল এত তাড়াতাড়ি ঘুমোতে ইচ্ছে করে না। তার ঘুরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। সে তো আর এই লোকের মত ঠোঁট কাটা না। তবে তার ধারণা সে অতি শীঘ্রই হয়ে যাবে। যে লোকের সাথে থাকছে, না হয়ে উপায় কি? এই যে এখনিতো পটর পটর করে কত কথা বলে। সে কি বদলে যাচ্ছে? কি জানি?

বলেই সে গালে হাত রাখল। রেখে আজাদের মুখের দিকে তাকালো। চুল, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে পুরো মুখ ছেয়ে আছে। বড়ই এলোমেলো এই ছেলে। শুধু কাজে টাজে না। নিজের বেলাও। এই চুল, দাঁড়ি, যখন একেবারে না কাটলেই না তখন গিয়ে কেটে আসে। শুধু কি এসবে তার ক্লিনিকের কাজ ছাড়া সব কিছুতে উদাসীন।

এই যে মেহমান আসবে বলে সেইদিন সবাই মিলে পিঠা তৈরি করল। শবনম ভাবি দুটো পিঠার মধ্যে পুলির সাথে মরিচ ও দিয়ে দিল। দিয়ে সুন্দর মতো ভেজে দিলো আজাদের হাতে। সে ফিরেও তাকায়নি। হাতে নিয়ে পটাপট খেয়ে ফেলেছে। আনতারা হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। গোটা বোম্বে মরিচ ছিল। পরে যখন ঝাল লেগেছে তখন শুধু ভ্রু কুঁচকে বলল, -- পিঠা ভেতরে কিছু দিয়েছিলে ভাবি?

শবনম হেসে কান মলে বলেছে, -- দিয়েছি তোমার মাথা।

আশে পাশের কোন কিছু নিয়ে এর মাথা ব্যথা নেই। এই যে আনতারা নাকফুল নাকে দিল। সবাই কত প্রশংসা করল। এই লোকের কোন বিকার নেই। খেয়ালও করেছে কিনা সন্দেহ। আবার বলে ভয়ংকর সুন্দর। তাকিয়ে দেখে কখন?

আনতারার মন ভার হলো। ভার মন নিয়েই এক আঙুল দিয়ে আজাদের বাহুতে হালকা করে একটা খোঁচা দিল। নিজের যখন ঘুম আসেনা তখন তো ঠিকিই টেনে হিঁচড়ে ঘুরতে নিয়ে যায়। তার বেলা আরামে ঘুমাবে কেন?

সাথে সাথে আজাদ খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, -- বলুন আজাদের তারা বেগম।

আনতারা অবাক হয়ে গেল। আজাদ ঘুমাইনি। তো এতোক্ষণ কি ছিল? তার মানে আজাদ কখন ঘুমায় কখন জেগে থাকে সে জানেই না। সে অবাক হয়েই বলল, -- আপনি ঘুমাননি?

আজাদ ঠোঁট টিপে হাসলো! তবে কিছু বলল না। চোখও খুলল না। তবে নড়ে চড়ে ঠিক হয়ে শুলো।

-- আপনিতো সত্যিই খারাপ লোক।

-- জানি।

-- জানেন তো ভালো হচ্ছেন না কেন?

-- ভালো হওয়ার কারণ নেই তাই।

আনতারা আর কথা পেল না। অবশ্য পেলেই আর লাভ কি? সে যেমন বলবে ঠিক তার মতোই উল্টো একটা জবাব আসবে। সে গাল ফুলিয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পরে আজাদ চোখ বন্ধ করেই বলল, -- ঘুমাও আনতারা।

আনতারা তার মিহি কন্ঠে আস্তে করে বলল, -- ঘুম আসছে না।

-- এদিকে আস আমি ঘুম পারিয়ে দিই।

-- কোথায়?

আজাদ তার হাত ছড়িয়ে দিল।

আনতারার ফোলা গাল আরো ফুললো। আজাদ এবার পুরোই হাসল। হেসে বলল, -- কাল থেকে মেহমান আসা শুরু হবে। একটু সামলে থেকো।

-- কেন?

-- তুমি অনেক কিছুই বোঝ না আনতারা।

-- কি বুঝিনা?

-- মানুষের চোখের ভাষা। একটা মানুষ মনের বিষ মুখের মধু দিয়ে ঢেকে ফেলতে পারে তবে চোখের টা না। তাই সবার আগে চোখের দিকে তাকাবে। তখন তুমি নিজেই বুঝবে সামনের জনের উদ্দেশ্য ভালো না খারাপ।

-- আপনি বুঝেন? আপনি তো আশে পাশের কিছুই চোখে দেখেন না।

-- আমার প্রয়োজন পরে না তাই দেখিনা।

-- আমার বুঝি প্রয়োজন?

-- হ্যাঁ।

-- তাহলে উঠুন আমি আগে আপনার চোখ দেখব।

আজাদ সাথে সাথেই উঠে বসল। আসনে বসার মতো দু- হাত সটান করে হাঁটুতে রেখে আনতারার সামনে বসল। বসে সোজা আনতারার দিকে তাকালো।

আনতারা আজাদের হাবভাব দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। নিস্তব্দ এই রাতে এই হাসি আজাদের কাছে গানের সুরের মত লাগল। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, -- রাত দুপুরে এভাবে হাসতে হয় না মেয়ে?
-- কেন?
-- ঝড় উঠে?
-- কোথায়?
-- আমার চোখ না দেখতে চাইলে। দেখ! তাহলেই বুঝতে পারবে কোথায়?

আনতারা ঠোঁট টিপে হেসেই আজাদের চোখের দিকে তাকালো। তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। ঘুম ক্লান্তিতে আজাদের চোখ লাল হয়ে আছে। পরে পরে শুয়েও ঘুমাইনি কেন এই লোকটা?

তখনি আনতারার ছোট্ট হ্নদয় কোণে কিছু একটা হলো। আনতারা বুঝল না। চোখও ফেরাতে পারল না। সে চোখে চোখ রেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠল। উঠে আজাদের ঠিক সামনে গিয়ে বসল। চোখের জাদুতে আনতারার কি হলো কে জানে। সে হাত বাড়িয়ে আজাদের কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল।

আজাদ চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফেলে বলল, -- আমিতো খারাপই আনতারা। এখন যদি আমি আরেকটু খারাপ হই। তুমি কি তোমার নানা ভাইকে বিচার দেবে?

আনতারা আজাদের কথার অর্থ বুঝল না। অবশ্য বোঝার সময়টুকুও সে পাইনি। আজাদ ততক্ষণে আনতারাকে জাপটে ধরেছে।

আজাদের সব কাজই হঠাৎ ঝড়ের মতো। তাই আনতারা ঝড়ের এই হঠাৎ তান্ডবে ভারসাম্য রাখতে পারেনি। পড়ে খাটের কার্নিশে মাথা লাগতে যাচ্ছিল।

আনতারা মাথা পড়ার আগেই আজাদ হাতের তালু ফেলল। আনতারা ভয়ে শেষ। সে থরথর করে কাঁপছে। অবশ্য সেটা পড়ার জন্য না আজাদের জন্য সে জানে না। আজাদের হাতের উপরে আনতারার মাথা, আর আজাদ আনতারার খুব কাছে।

আনতারার গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। সে ভয়ে হাবুডুবু খেতে খেতে আবার আজাদের চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে আনতারা শুধু একজনকেই দেখল। আর সেটা আনতারা নিজে।

সে আর কিছু বলতে পারল না। কিছু করতে পারল না। এমনি তার মুখ দিয়ে টু শব্দও বের হলো না। শুধু দেখল নেশা ধরানো একটা চোখ। সেই নেশা নিয়েই নাকফুলটার উপরে গভীর ভাবে ঠোঁট ছোঁয়ালো। সেই ছোঁয়া সেখানেই থামলো না। বরং ধীরে ধীরে পুরো আনতারায় ছড়িয়ে গেল। যেতেই আনতারা তার নিজের হুঁশ জ্ঞান সব হারালো।

আর যখন হুঁশ এলো। তখন সে চোখে অন্ধকার দেখল। সেই অন্ধকারে চোখ পুরোপুরি অন্ধকার হওয়ার আগে নিভু নিভু চোখে দেখল একটা মুখ, একটা মানুষ। যে তাকে পরম যত্নে বুকে আগলে নিয়ে, ফিসফিস করে বলছে, -- ভয় নেই। আমি আছি তো। সব ঠিক হয়ে যাবে।

চলবে.......

আমার প্রিয় মানুষেরা। আগামীকাল আর তার পরের দিন আমি গল্প দিতে পারব না। অতি অতি জুরুরি ব্যক্তিগত একটা কাজ পড়েছে। তার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। আশা করি এই কষ্টটুকু আমার জন্য করবেন আর সবাই ভালো থাকবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন