রজনীর গাঢ় আঁধার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। মধ্যপ্রহরের নিস্তব্ধতা পেরিয়ে রাত তার শেষ প্রহরে এসে দাঁড়িয়েছে। নীলিমার বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত নক্ষত্র একে একে ম্লান হয়ে আসছে। দূর আকাশের পূর্বদিগন্তে অন্ধকারের বুক চিরে ফুটে উঠেছে এক চিলতে আবছা আভা। পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে আছে ষোড়শী এক রমণী। পরনে তার নীল রঙের মলিন একটা জামা। জামাটির রং বহুদিন আগেই তার আসল উজ্জ্বলতা হারিয়েছে। দুই হাতে মাটির কলসটি আঁকড়ে ধরে পুকুরের স্বচ্ছ জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে সে। ঘোমটার নিচে লুকিয়ে থাকা তার ডাগর আঁখিযুগল নত হয়ে আছে জলের দিকে। সকালের কোমলতা পেরিয়ে রৌদ্রের তেজ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। পুকুরের জলে পড়ে সূর্যের রশ্মি ঝিকমিক করে উঠছে অগণিত রৌপ্যকণার মতো। ষোড়শীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে দীর্ঘ কালো বিনুনি। কোমর ছাড়িয়ে প্রায় হাঁটু অবধি নেমে আসা সেই বিনুনিটি তার প্রতিটি নড়াচড়ায় মৃদু দুলে উঠছে। পুকুরঘাটে আমিরা একা নয়, গ্রামের আরও কয়েকজন নারীও কলস, কলসি আর মাটির হাঁড়ি হাতে এসে জড়ো হয়েছে ঘাটের চারপাশে। আমিরা অবশ্য সবার থেকে খানিকটা আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝ থেকে একজন মহিলা আমিরার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
" তোর নাকি বড়ো বাড়িতে বিয়ে ঠিক হয়েছে আমিরা। এইবার বুঝি তোর কপালে সুখ দেখা দিলো। "
উক্ত কথাটি শুনে আশেপাশে থাকা বাকি মহিলারাও কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমিরার দিকে। আমিরা বেশ বিব্রতবোধ করলো তার কথায়। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই পাশ থেকে অন্য আরেকজন মহিলা কটুক্তির স্বরে বলে উঠলো,
" কে বলেছে জমিদার বাড়িতে বিয়ে হলেই সুখী হওয়া যায়। চার বছর আগে দেখলে না, শাহ বাড়ির মেজো ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার স্ত্রী আত্মহত্যা করলো। আমিরার মতো নিম্নজাতের মেয়েকে বউ করে তোলার পেছনে নিশ্চই কোন কারণ আছে। নাহয় এতিম মেয়েকে কেউ এতো বড়ো বাড়ির বউ করে নিয়ে যায়? তাও আবার কোনপ্রকার দেনা পাওয়া ছাড়া। "
আমিরা কর্ণপাত করলো না তাদের কথায়। মাথার ঘোমটাটা আরেকটু টেনে নিলো সে, অত:পর পানিভর্তি কলসটি কোমড়ে তুলে নিয়ে এক হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ঘোমটার আড়ালে নত হয়ে রইল তার ডাগর আঁখিযুগল। মধ্যপ্রহরের প্রখর রৌদ্র চারদিক তপ্ত অঙ্গারের মতো করে তুলেছে। আকাশের নীলিমায় সূর্য ঠিক মধ্যগগনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, তার তীব্র কিরণ অবিরত ঝরে পড়ছে ধরণীর বুকে। ক্লান্ত শরীরখানা নিয়ে আমিরা ধীর পায়ে এগিয়ে চলল বাড়ির দিকে। সকাল থেকে একের পর এক কাজ করে শরীরটুকু তার অবসন্ন হয়ে পড়েছে। রান্নাঘরের এক কোণে রেখে কলসটি রেখে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলো একটা থালায় রাতের বাসি ভাত রাখা আছে। আমিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাতে পানি ঢেলে কিছুটা লবণ ছিটিয়ে দিলো। হঠাৎ চোখ পড়লো কিছুটা দূরে রাখা ছোট একটি মাটির পাত্রের উপর। আমিরা খানিকটা এগিয়ে গিয়ে পাত্রটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো এক টুকরো মুরগীর কলিজা ও সামান্য ঝোল রাখা সেই পাত্রে। ডাগর ডাগর কাজলরাঙা চোখ দুটি মুহুর্তেই আনন্দে চকচক করে উঠল। এতটুকু খাবার দেখে যে কারও চোখে হয়তো তেমন কোনো আনন্দ ফুটত না। অথচ আমিরার কাছে সেই এক টুকরো কলিজাই যেন এক থালা রাজভোজ। সে পরম তৃপ্তি নিয়ে এক লোকমা মুখে তুলতেই এক চড় এসে পড়লো তার গালে। তৃপ্তি নিয়ে এক লোকমা মুখে তুলতেই এক চড় এসে পড়লো তার গালে। মুহূর্তেই আমিরার কান ঝাঁঝাঁ করে উঠল। সে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে সালেহা বেগমের দিকে তাকাতেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বললেন,
" কার অনুমতি নিয়ে তরকারিতে হাত দিলি তুই? পোড়াকপালি, সারাক্ষণ এতো খাই খাই কেন তোর?"
আমিরা গালে হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না নিবারণের চেষ্টা করলো। সালেহা বেগম আমিরার সামনে থেকে ভাতের থালা তুলে নিয়ে কোনোপ্রকার দ্বিধাবোধ ছাড়াই সেটি ঘরের বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলেন। থালাটি মাটিতে পড়ে শব্দ করে উল্টে গেল। বাসি ভাত ছড়িয়ে পড়ল উঠানের ধুলোয়, সামান্য ঝোল মাটির সঙ্গে মিশে গেল, কলিজা গিয়ে পড়লো উঠানের এক কোণে। আমিরা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার মায়ের পানে। তিনি উঠোন থেকে একটা লাঠি নিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন আমিরার দিকে অত:পর কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়ে বললেন,
" মেয়েটা আমার কলিজা খেতে ভালোবাসে বলে তুলে রেখেছিলাম কিন্তু এই অভাগীর তা সহ্য হলো না।"
আমিরা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
" ভাতের সাথে রাখা ছিলো বলে ভেবেছিলাম আমার জন্য রেখেছেন আম্মা। "
" মা'কে তো খেয়েছিস মুখপুরী, এখন আমার মেয়ের খাবারে নজর দিচ্ছিস। আজ তোর শেষ দেখে ছাড়বো আমি। "
" আমি আর কখনো কলিজা খাবো না আম্মা, আমায় আর মারবেন না। "
অবশেষে থামলেন সালেহা বেগম। চোখে এখনো রাগ ভাসছে তার। আমিরার সারা শরীর তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলো। সালেহা বেগম হাতে থাকা লাঠি ফেলে চলে যেতেই আমিরা নিজের শরীরে চোখ বুলিয়ে নিলো একবার। এসব তার নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিনই কোন না কোন কারণে সালেহা বেগম নিজের মাঝে জমে থাকা রাগ আমিরার উপর ঝাড়েন। আমিরার যখন আট বছরের তখন তার মা কোহিনূর বেগম তাকে ধরণীর বুকে একা রেখে মারা যায়। চিকিৎসার অভাবে বাঁচতে পারেননি তিনি, শরীরে থাকা ক্যান্সার তাকে বাঁচতে দেয়নি। অত:পর আমিরার বাবা মোহাম্মদ আবদুল দ্বিতীয় বিবাহ করে ঘরে তোলেন সালেহা বেগমকে। সালেহা বেগম আমিরাকে সহ্য করতে না পারলেও আমিরার সৎ বোন সুহানা'র সাথে বড্ড ভাব তার। সুহানা'ও নিস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে আমিরাকে। এই বাড়িতে আর কেউ তার সাথে ভালো করে কথা না বললেও সুহানা কখনো তাকে সৎ বোন হিসেবে দেখেনি। আমিরাকে কাঁদতে দেখে সুহানা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
" আম্মা তোমার সাথে এমন করে কেন আপা? "
" মায়েরা কখনো খারাপ হয় না। আমার দোষ ছিলো বলেই তো আম্মা আমায় মারলো। "
" শাক দিয়ে আর মাছ ঢেকো না আপা। শুনেছি তোমার হবু বর খুব ভালো মানুষ। বিয়ে হলে দেখবে তোমার সব কষ্ট চলে যাবে। তোমায় অনেকগুলো মুরগীর কলিজা খাওয়াবে দুলাভাই। "
আমিরা অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকালো সুহানা'র মলিন চেহারার দিকে। অত:পর মনে মনে ভাবলো, সত্যিই কি স্বামীর ভালোবাসা পাবে সে? এই অত্যাচার থেকে কি কখনো মুক্তি মিলবে? নাকি আজীবন সয়ে যেতে হবে। আমার জীবন কোথায় গিয়ে থামবে? সুহানার নাক টানার শব্দে আমিরার ঘোর কাটলো। সে সুহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
" খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস আজকাল। এখনো বিয়ে হয়েছে নাকি, আর এখন থেকেই দুলাভাই ডাকছিস। "
সুহানা নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
" সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেই তো বিয়ে। আগ থেকে শিখে রাখছি দুলাভাই ডাকা নাহয় হঠাৎ করে ডাকলে আমার লজ্জ্বা করবে না বুঝি?"
আমিরা ফিক করে হেসে ফেললো তার কথায়। এইটুকু মেয়ের আবার কিনা দুলাভাই ডাকতে লজ্জ্বা করবে।
বিকেল গড়িয়ে ধীরে ধীরে গোধূলি নামতে শুরু করেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ঢলে পড়েছে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে লালচে-সোনালি রোদ। নিজের ঘরে বসে পা সাজাচ্ছিলেন মেহেরবানু শাহ। তার সামনে রাখা ছোট্ট রুপোর পানদান। ঢাকনা খুলতেই ভেতর থেকে ভেসে আসছিল পানপাতা, সুপারি, চুন আর জর্দার মিশ্র গন্ধ। তিনি পরম যত্নে একেকটি পানপাতা হাতে তুলে নিয়ে তার শিরা ছেঁটে নিচ্ছিলেন। তারপর আঙুলের ডগায় সামান্য চুন, এক চিমটি জর্দা। শাহ বাড়ির বড়ো বউ তিনি। স্বামীর অবর্তমানে তিনিই কর্তী। শেহজাদ শাহ গত হয়েছে প্রায় ছ বছর হতে চললো। একমাত্র ছেলে শহরাঞ্চলে চাকুরী করে। বছরে দুবার বাড়ি এসে ঘুরে যায় মেহরাব শাহ তুরাব। ছেলে চেয়েছিলো তাকে নিয়ে শহরে পাড়ি দিতে কিন্তু এই বাড়ি ও তার আপনজনদের মায়া ছেড়ে যেতে তিনি রাজি হননি। ছেলেকে আটকে রাখতেই মূলত বিয়ের বন্দোবস্ত করেছেন তিনি। হঠাৎ কারো পদশব্দ শুনতে পেতেই তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে দেখতে পান তার বড়ো ননাশ আজমিরা খান । একমাত্র ভাতিজার বিয়ে ঠিক হয়েছে তাও কিনা নিচু জাতের এক মেয়ের সাথে, এই সিদ্ধান্ত তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। নিচু জাতের এক মেয়েকে ঘরের বউ করে আনার এই সিদ্ধান্ত তাঁর অহংকারে যেন তীব্র আঘাত হানল। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তিনি মেহেরবানু শাহের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। অত:পর বললেন,
" একমাত্র ছেলের জীবনটা কিনা নিজ হাতে ধ্বংস করে দিচ্ছো মেহেরবানু। "
মেহেরবানু শাহ কর্ণপাত করলেন না তার কথায়। নির্বিকার চিত্তে নিজের কাজ করে যেতে লাগলেন, যেন সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির উত্তপ্ত বাক্যগুলো তাঁর কানে পৌঁছাচ্ছেই না। আজমিরা খান তার ভাবভঙ্গিমা বুঝতে না পেরে গলার স্বর নরম করে বললেন,
" যেই মেয়ের জাতকূলের ঠিক নেই, বাপ মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। সেই মেয়ের সাথে কিনা অমন চাঁদের টুকরো ছেলের বিয়ে ঠিক করলে মেহেরবানু ! গ্রামে এতো ভালো ভালো মেয়ে থাকতে শেষ পর্যন্তকিনা নেশাখোর লোকের মেয়েকে জমিদার বাড়িতে তুলার পণ করলে। আমার ননদের মেয়েটির কথা যে বলেছিলাম তাকে আনলেও পারতে। উচ্চজাতের মেয়ে,যেমন গুণ তেমন রুপ। "
আজমিরা খানের উক্ত কথা কানে আসতেই হাতের কাজ থামিয়ে তিনি স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে অত:পর বলে উঠলেন,
" উচ্চজাত হলেই সংসার সুখের হয় না, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। "
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে আজমিরা খান তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
" কি এমন গুণ দেখলে তুমি ওই মেয়ের মাঝে? "
" এই বাড়ির বউ হওয়ার জন্য যেসব গুণ থাকা দরকার তার সবকটিই আছে আমিরার মাঝে। "
" এখনো সময় আছে মেহেরবানু। তোমার একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মেহরাবের গোটা জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। জাতের মেয়ে কালো ও ভালো। তুমি চাইলে আমি একবার আমার ননদের মেয়ে চিত্রলেখার ব্যপারে কথা বলে দেখবো?"
" মেহরাবের বিশ্বাস আছে তার মায়ের উপর। আমিরা'র সাথেই মেহরাবের বিয়ে হবে। "
মেহেরবানু শাহের কথায় চোখ মুখ শক্ত হয়ে উঠলো আজমিরা বেগমের। তিনি কোনো বাক্য ব্যয় না করে ক্রোধভারাক্রান্ত পদক্ষেপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আজমিরা শাহ। মেহরাব কাঠের চেয়ারটিতে নিশ্চুপ হয়ে বসে বই পড়ছে। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মুখখানি নত হয়ে আছে বইয়ের পাতার দিকে। মসৃণ কালো চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে নেমে এসেছে। হলুদের ছোঁয়ায় শ্যামবর্ণ চেহারায় আলাদা এক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে তার। আজমিরা খান ঈর্ষান্বিত হয়ে হলুদ মাখায়নি তাকে। যদিও এই নিয়ে মেহরাব খুব একটা মাথা ঘামায়নি। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে আসতেই মেহরাব সেইদিকে তাকিয়ে দেখলো মেহেরবানু শাহ দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে মেহরাব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো অত:পর বললো,
" আমার ঘরে আসতে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই আম্মা। "
মেহেরবানু শাহ স্মিত হাসলেন ছেলের কথায়। তিনি মেহরাবের সামনের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন,
" ভাবলাম তোমার সাথে খানিকটা সময় কাটাই। কতদিন পর সুযোগ পেলাম মা-ছেলে একটু সময় কাটানোর। "
" আপনাকে তো বলেছিলাম আম্মা আমার সাথে যেতে কিন্তু আপনিই তো রাজি হলেন না।"
" তোমার আব্বার অনেক স্মৃতি এখানে মেহরাব। কি করে ছেড়ে চলে যাই সব পিছুটান ফেলে?"
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেললো তার মায়ের কথায়। কিছুসময় চুপ থেকে অত:পর মেহেরবানু শাহ ধীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
" আমার সিদ্ধান্তে কি তোমার আপত্তি আছে মেহরাব?"
" আপত্তি কেন থাকবে আম্মা? আপনার উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। "
মেহেরবানু শাহ নিশ্চিন্ত হলেন ছেলের কথায়। তার অধরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। মেহরাব কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
" মেয়েটার যে বয়স কম আম্মা। বয়সের পার্থক্য আমায় বেশ চিন্তিত করে তুলছে। "
" চিন্তা করো না মেহরাব। কাচা মাটি তুলে দিচ্ছি তোমার হাতে, তুমি যেমন ভাবে চাও তেমনভাবে গড়ে তুলবে। "
মেহরাব চুপ করে রইলো তার মায়ের কথায়। নিশিথের গভীর আঁধারে চারিপাশ নিস্তব্ধতার চাদরে আবৃত। আকাশের নীলিমা পেরিয়ে নক্ষত্রগুলো জ্বলছে মিটিমিটি করে, দূর আকাশের বুকজুড়ে পূর্ণাঙ্গ চাঁদ। আমিরার পরনে শাহ বাড়ি থেকে পাঠানো গাঢ় লাল শাড়ি। শাড়ির আঁচলজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ, আলো পড়তেই যার নকশাগুলো অন্ধকার রজনীর বুকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দীপশিখার মতো জ্বলে উঠেছে । লাল রঙের সেই শাড়ি তার দুধে-আলতা গায়ের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। আমিরার পাশেই সুহানা বসে আছে। আমিরার গায়ে হলুদ ঘটা করে করতে চায়নি সালেহা বেগম। মোহাম্মদ আবদুল আর সালেহা বেগম দূর থেকে তাকিয়ে দেখছেন সমস্ত কর্মকান্ড। আমিরার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ায় মেহেরবানু শাহের কথায় শাহ বাড়িতেই বিয়ের বন্দোবস্ত করা হয়। ঘরের ভেতর নারীদের মাঝে বসে আছে আমিরা। মাথার ওপর লাল আঁচল টানা, চোখ নত করে বসে আছে সে। মেহরাব বসে আছে পরিবারের কয়েকজন পুরুষ সদস্যের সঙ্গে। পরনে তার সোনালী রঙের পাঞ্জাবি। মেহেরবানু শাহ ছেলেকে দেখে মৃদু হাসলেন। কাজী সাহেব মাঝখানে বসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিলেন। অত:পর কাজি সাহেব সাহেব কাগজপত্র দেখে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মেহরাব শাহ তুরাব , হুরাইশা আলম আমিরার সঙ্গে আট লক্ষ হাজার এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া বিবাহে আপনি সম্মত আছেন?”
মেহরাব ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“সম্মত আছি।”
প্রথমে আমিরার সম্মতি নেওয়ার জন্য কাজী সাহেব তার কাছে যেতেই আমিরা তাকে দেখে আরও একটু গুটিয়ে বসল। মাথার ওপর আঁচলটা টেনে মুখখানি আড়াল করল সে। কাজি সাহেব খানিকটা গলা পরিস্কার করে বললেন,
“আমিরা, মোহাম্মদ আবদুলের কন্যা—আপনাকে মেহরাব শাহের সঙ্গে নির্ধারিত দেনমোহরে বিবাহ দেওয়া হচ্ছে। আপনি কি এতে রাজি?"
আমিরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,
"কবুল।”
কাজী সাহেব আবারও প্রশ্ন করলেন,
“আপনি কি কবুল করেছেন?”
“কবুল।”
তৃতীয়বার একই প্রশ্ন করা হলে আমিরা চোখ নামিয়ে রেখে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“কবুল।”
কাজী সাহেব এবার মেহরাবের দিকে ফিরে এলেন।
মেহরাব এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে ঘরের ভেতরের দিকে তাকাল। দূর থেকে লাল আঁচলে আবৃত আমিরাকে দেখা যাচ্ছিল না স্পষ্টভাবে। কাজী সাহেব তার সামনে বসে বললেন,
“মেহরাব, মোহাম্মদ আবদুলের কন্যা হুরাইশা আলম আমিরাকে নির্ধারিত দেনমোহরে আপনার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছেন। আপনি কি রাজি?”
সে স্থির কণ্ঠে বলল,
“ কবুল,কবুল,কবুল। "
মেহরাব কবুল বলতেই সুহানা বেরিয়ে এলো সেই ঘর থেকে। সে মেহরাবের পাশে এসে বসতেই মেহরাব কিছুটা বিব্রতবোধ করল। সুহানা বেশ বেশ গম্ভীর চাহনিতে তাকে পরখ করে বললো,
" আজ থেকে আপনি আমার দুলাভাই। "
মেহরাব বেশ মজা পেলো তার কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গিমায়। সে সুহানার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো,
" আর আপনি আমার শালি সাহেবা।"
" আমার আপার আম খুব পছন্দ। আপনাদের বাড়ির সামনে থাকা গাছের আমগুলো কি আমার আপা খেতে পারবে?"
" নিশ্চয়ই। আপনিও খেতে পারবেন। "
সুহানা বেশ খুশিই হলো মেহরাবের কথায়। ছোট মানুষ অত কিছু বুঝলো না। বিদায়বেলায় আমিরা কাঁদলো না। সালেহা বেগম ও মোহাম্মদ আবদুল দূর থেকেই বিদায় দিয়ে চলে গিয়েছেন। মূলত আমিরা চলে গেলেই তারা মুক্ত
আমিরা তাচ্ছিল্য হাসলো তাদের কর্মকান্ডে। কাদের জন্যই বা কাঁদবে সে? এই বাড়ির মানুষদের সে খুব একটা চেনে না। কেমন হবে তাও জানে না। ম্লান জোছনা ছড়িয়ে পড়ছে উঠোনে। আকাশের গাঢ় নীলিমায় চাঁদ স্থির হয়ে আছে, তার রূপালি জোছনা জানালার ফাঁক গলে মেঝের ওপর এসে পড়েছে। রজনীর গভীরতা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। রজনীগন্ধার সুবাসে ভারী হয়ে আছে ঘরের বাতাস; ফুলের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে আছে শয্যার চারপাশে। সেই ফুলের মাঝখানে শয্যার এক কোণে নিঃশব্দে বসে আছে আমিরা। ঘোমটার আড়ালে মুখখানি আবছা, দু’চোখে লুকিয়ে আছে লাজুকতা ও একরাশ ভয়। আঙুলের ডগায় আঁচলের প্রান্তটি অন্যমনস্কভাবে জড়িয়ে রেখেছে সে। হঠাৎ কারো পদশব্দ শুনতে পেতেই আমিরা জড়োসড়ো হয়ে বসলো। মেহেরবানু শাহ আমিরার কাছে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে বললেন,
" শুনো আমিরা, মেহরাব এলে দুজনে দু'রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিবে। তোমার স্বামী এখানে থাকে না, শহরে থাকে চাকরির সুবাদে। মেহরাবকে আঁচলে বেঁধে রাখবে যেন সে এই বাড়ি ছেড়ে তোমাকে ছেড়ে আবার সেই পুরনো গন্তব্যে পা না বাড়ায়। "
আমিরা মাথা নেড়ে সায় জানাতেই তিনি আমিরাকে আরও কিছু উপদেশ দিয়ে চলে গেলেন। প্রথম দিনেই শাশুড়ির কথা শুনে তাকে বেশ কঠোর মনে হলো আমিরার কাছে। তবে কি তাকে এভাবেই সারাজীবন অত্যাচারীত হতে হবে? তার জীবনে কি সুখ আসবে না? আবারও পদশব্দের আওয়াজ কানে আসতেই আমিরা অধীর আগ্রহে তাকায় দরজার পানে। মেহরাব এক পলক আমিরার দিকে তাকিয়ে অত:পর দরজা বন্ধ করে তার মুখোমুখি হয়ে বসতেই ভয়ে তটস্থ আমিরা আঙুলের ডগায় আঁচলের প্রান্তটি আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মাথা নত হয়ে রইল, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন আচমকাই কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে । মেহরাব কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল তার দিকে, অত:পর ঘোমটা উঠিয়ে আমিরার দিকে তাকাতেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো সে। দুধে আলতা গায়ের রঙে লাল শাড়ি যেন রক্তজবার ন্যায় ফুটে উঠেছে। আমিরার বোকা বোকা চাহনি দেখে মেহরাব মনে মনে হাসলো। আমিরা কতটা ভয় পেয়েছে সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নেত্রপল্লবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আমিরার সেই সন্ত্রস্ত দৃষ্টি মেহরাবের চোখ এড়াল না। সে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অত:পর বললো,
" নাম কি তোমার?"
আমিরা বেশ অবাক হলো তার প্রশ্নে। বিয়ে করেছে অথচ নাম জানে না? আমিরার কাছ থেকে প্রশ্নোত্তর না পেয়ে মেহরাব আবারও জিগ্যেস করলো,
" এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। "
আমিরা ঢোক গিলে আমতাআমতা করে বললো,
" হুরাইশা আলম আমিরা।"
মেহরাব বেশ মনযোগ দিয়ে শুনলো তার কথা, অত:পর হঠাৎ বসা থেকে উঠে পড়লো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ঘরের কোণা হতে একটি লাঠি উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। আমিরার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে মনে মনে ভাবলো, হয়তো দেরি করে উত্তর দেওয়ায় মেহরাব রেগে গিয়েছে। এবার হয়তো সবাইকে ডেকে এনে তারপর শাস্তি দিবে। কিছুসময়ের মাঝেই মেহরাব ফিরে এলো। তার হাতে লাঠি দেখে আমিরা বিছানা থেকে নেমে তার সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো, অত:পর মেহরাবের সামনে তার কাঁপা কাঁপা হাত পেতে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। অপরিচিত কারো হাতে মার খেতে খুব একটা ভালো লাগার কথা নয় অবশ্য। হঠাৎ পেতে রাখা হাতের উপর মারের বদলে অন্যকিছুর অবস্থান টের পেয়ে সে তড়িৎ গতিতে চোখ খুলতেই দেখতে পেলো দুটো আম। আমিরা হতভম্ব হয়ে গেলো মেহরাবের কর্মকান্ডে। মেহরাব স্মিত হেসে হাতের লাঠি আগের জায়গায় রেখে বললো,
"এই নিন বিবিজান। শালি সাহেবার কাছ থেকে শুনেছি আপনি বড্ড আম খেতে পছন্দ করেন, তাই নিয়ে এলাম। আজ থেকে আপনার সব সুখ দুঃখের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব ও কাঁধে তুলে নিলাম।"
আমিরা যেমনটা ভেবেছিলো মানুষটা আদেও তেমন নয়। সে আমতাআমতা করে বললো,
" আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমায় মারবেন, মারলেন না যে? "
মেহরাব বেশ অবাক হলো তার কথায়। অত:পর ধীর কন্ঠে জিগ্যেস করলো,
"এসব ভাবার কারণ ? "
" আমার উপর রাগ হলে আম্মা লাঠি দিয়ে মারতো, তাই ভেবেছিলাম আপনিও হয়তো আমার উপর রাগ করে লাঠি নিয়ে এসেছেন মারার জন্য।"
মেহরাব আমিরার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
"অর্ধাঙ্গিনীর শরীরে হাত তোলা পুরুষ কখনো সুপুরুষ হতে পারে না, তারা পায় কেবল কাপুরুষের খ্যাতি।"
আমিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মেহরাবের দিকে। চোখের কোণে জমে উঠেছে অশ্রুর চিকচিকে বিন্দু। নেত্রপল্লবের কাঁপনে সেই জলটুকু যেন টলমল করে উঠল। হঠাৎ এতো যত্ন পেয়ে নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না, সারাজীবন অবহেলা অনাদরে বড়ো হওয়ায় এইটুকু যত্নও মহা মূল্যবান। আম দুটো সে আঁকড়ে ধরে হুট করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মেহরাব তাকে কাঁদতে দেখে আলতো হাতে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো,
" আম পছন্দ হয়নি বলে কাঁদছো বিবি ?"
মেহরাবের প্রশ্নে ফিক করে হেসে দিলো আমিরা, আম আবার পছন্দ হওয়ার কি আছে? আমিরাকে হাসতে দেখে মেহরাব ও হেসে ফেললো। সে তাকে বিছানায় বসিয়ে নিজেও তার মুখোমুখি হয়ে বসলো। অত:পর বলে উঠলো,
" ঘুম না পেলে দুজনে আজ সারারাত গল্প করবো, আপত্তি আছে?"
মেহরাবের কথায় আমিরার নত করে রাখা দৃষ্টিতে লজ্জার আভা ফুটে উঠল। সে মিনমিন করে বললো,
" আপত্তি নেই। "
" পড়াশোনা করেছো? "
" বেশি পড়তে পারিনি, চতুর্থ শ্রেণী অব্দি পড়তে পেরেছিলাম।"
" চিঠি লিখতে জানো?"
আমিরা মলিন দৃষ্টিতে তাকালো মেহরাবের পানে। সে তো এসব পারে না, নিশ্চয়ই মেহরাব খুব শিক্ষিত। মনে মনে দ্বিধাগ্রস্থ হলো সে, আদেও মেহরাবের পাশে তাকে মানাবে তো। অত:পর ধীরস্বরে বললো,
" না। "
" চিন্তা নেই, আমি শিখিয়ে দিবো। "
আমিরা পলক ফেলে মেহরাবের দিকে তাকালো। খুটিয়ে খুটিয়ে পরখ করতে লাগলো মেহরাবকে। উজ্জ্বল শ্যামলা হলেও লোকটার চেহারায় আলাদা এক প্রকার মায়া ভর করেছে। গালের ডান পাশে ছোট্ট একটা দাগ, দেখে মনে হচ্ছে বহু আগের। এলোমেলো চুলে বেশ লাগছে দেখতে। এই লোকটা তার বর। আজ থেকে তার নতুন পরিবার, যার কাছে সে নির্দ্বিধায় সব আবদার করতে পারবে।