#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০১
ঐশী কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামলো। তার পায়ে উঁচু হিল। শুধু হিল না। সে আজ শাড়িও পরেছে। তাঁর মায়ের শাড়ি।
সে তার প্রতি জন্মদিনে মায়ের একটা করে শাড়ি পরে। তাই আজও পরেছে। শাড়ি প্লাস উঁচু হিল নিয়ে এই ঢালু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে তার বেগ পেতেই হলো। উঠতে অবশ্য কষ্ট হয়নি। টিং টিং করে উঠে গেছে। আর উঠবেই না কেন? তখন তার খুব মন খারাপ ছিল। খুব খারাপ! এখনো অবশ্য আছে, তবে কম।
এই ট্রি হাউজে আসলেই তার মন ভালো হয়ে যায়। কি সুন্দন, নির্মল, শান্ত পরিবেশ। আর কেমন জানি মিষ্টি একটা সুবাস। মামা বলেন,-- প্রকৃতির নিজস্ব একটা ঘ্রাণ আছে। সেটা পেতে হলে প্রকৃতির মাঝে মিশে যেতে হয়। অবশ্য প্রকৃতির আসল রুপ এই ইট পাথরের শহরে দেখা দুষ্কর । তবুও যতটুকু আছে এই কম কি। এর মধ্যেই মিশে যাও।
ঐশীও তাই করে। যখনি এখানে আসে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এই মিশে যাওয়ার বাগান টা তার ভীষণ পছন্দের। এই বাগানের এক কোণে ঝোপের মধ্যে বিশাল একটা আম গাছ । এই আঁকা বাঁকা আম গাছটার মধ্যেই ট্রি হাউজ টি। গাছটা অনেক পুরোনো। সেই আমার দাদার আমলের। তখন অবশ্য এরকম ছিল না। আরো অনেক গাছগাছালি ছিল। সেই গাছ গাছালি কেটেই তৈরি হয়েছে এক বিশাল অট্টালিকা। ঐ অট্টালিকায় যখন সে হাঁপিয়ে যায় তখনি দৌড়ে আসে এই ট্রি হাউজে। ট্রি হাউজটা তৈরি করেছে তার মামা। তার অতি, অতি, অতি পছন্দের প্রিয় মামা।
আমার মামার নাম আনিস । ভালো নাম আনিসুর হক। সে একজন লেখক। টাট্টি, বাট্টি লেখক না। বেশ নামকরা লেখক। তাঁর লেখা নিয়ে বেশ কয়েকটা ফিল্মও হয়েছে। আমি ইট, পাথরের দেওয়ালে হাঁপিয়ে গেলে যেমন এখানে আসি, তেমনি মামা আসেন মাথায় গিট্টু লেগে গেলে। এটা অবশ্য আমার কথা না। মামার'ই কথা। প্রায় সময়ই নাকি লিখতে লিখতে তাঁর মাথায় গিট্টু লেগে যায়। সেই গিট্টু খুলতেই মামা এখানে ওখানে চলে যায়। আর যখন কোথাও যেতে না পারেন। তখন চলে আসেন এই ট্রি হাউজে।
মামা আমাদের সাথেই থাকেন। এর অবশ্য কারণও আছে। আমার যখন নয় বছর বাবা মারা গেলেন। হঠাৎ করেই গেলেন। কোন অসুখ টসুখ নেই। রাতে খাবার খেয়ে হাসি খুশি ভাবেই ঘুমোতে গেলেন। মাঝ রাতে মাকে ডেকে তুললেন। বুকে হাত রেখে শুধু বললেন, "তাঁর কষ্ট হচ্ছে! খুব কষ্ট!
কি কষ্ট, কি হয়েছে, কি হচ্ছে, মা বোঝার আগেই বাবা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। বাবা ছিলেন এই বংশের শেষ পুত্র সন্তান। কেন জানি এই বংশে সবার ঘরেই দু-তিনটা করে মেয়ে হলেও ছেলে সন্তান হতো একটাই। তেমনি দাদা ছিল এক পুত্র। তাঁর ঘরে বাবাও ছিল এক পুত্র। অবশ্য এদের দু-জনেরই দু- তিনটা করে বোন আছে। শুধু তাঁর নিজের'ই নেই। সেই হিসেবে বলতে গেলে এই বংশের বাতি সেখানেই শেষ ।
আমি অবশ্য আছি! তবে আমি এই বংশের কি এখনো বুঝতে পারছি না। বাতিতো অবশ্যই না তবে মোববাতি টাতি টাইপ হতে পারি।
যাইহোক, বাবা মারা যাওয়ার পরে এই বিশাল অট্টালিকায় শুধু রয়ে গেলাম মা, আমি আর ফ্যাশন কুইন মানে আমার দাদি।
মা পেশায় একজন উকিল। আত্মনির্ভশীল মেয়ে। সে আগে থেকেই ছিল কঠিন টাইপ মহিলা। বাবার মৃত্যুর পর হয়ে গেল আরো কঠিন। ইস্পাতের মতো কঠিন। তবুও এই বাসায় একজনের প্রয়োজন ছিল। সেটা মুখে কেউ না বললেও, তিনজনেই হারে হারে টের পাচ্ছিলাম।
সেখানে আশার আলো হয়ে এলেন মামা। মামা ছিলেন ছন্নছাড়া। বিয়ে করেছিলেন, সেটা কোন একটা কারণে শেষ করতে হয়েছে। ঐশী অবশ্য সঠিক জানে না। সেই শেষ হয়ে যাওয়া বিয়ে থেকেই মামা ছন্নছাড়া। বছরে একবার কি দু-বার বোনকে দেখতে আসতেন। সেই বার এসে ফেঁসে গেলেন। আমার ড্রামা কুইন দাদু সব সময়ের মতো তাঁর ঝাঁঝের সাথে বললেন," বোন, বোনের মেয়ে ভেসে যাচ্ছে। আর তুমি পাখনা মেলে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছো। কেমন ভাই তুমি?
মামা আমতা আমতা করতে লাগলেন। তার বোন কোথায় ভেসে যাচ্ছে সে বুঝতে পারল না। সে যতদূর জানে তার বোনই একবারে কয়েকজনকে ভাসিয়ে দিতে পারে। সে কি করবে বুঝতে পারল না। আর যখন সে কিছু বুঝতে পারে না, তখন সে ফোন করে তার একমাত্র প্রাক্তন কে। বিয়ে শেষ হলেও কোন কিছু একটা এখনো আছে। ঐশী ঠিক বুঝতে পারে না।
যাইহোক মামা ফোন করে করুণ সুরে বলবে, --- খুব বিপদে পড়েছি রাবেয়া। কি করি বলোতো?"
সে বারো ফোন করলেন। করুন সুরে বললেন,--- রাবেয়া বিরাট বিপদে পড়েছি। কি করি বলোতো?
তার প্রাক্তন মানে রাবেয়া সামাজিকতা ধারও ধারে না। ফোন ধরেই মারবে এক ঝাড়ি। ঝাড়ি মেরে কতক্ষণ ফোন দেওয়ার জন্য ধমকা ধমকি করবেন। পরে অবশ্য শান্ত ভাবে তার সব সমস্যা কথা মন দিয়ে শুনেন আর আশ্চর্য ভাবে সমাধানও করে ফেলেন।
সেই বারেরটাও শুনলেন, তারপর শান্তভাবে বললেন,--" আনিস মেয়েরা হাজার আত্মনির্ভরশীল, হাজার সাহসী, অনেক শক্ত মনের হলেও তাদের একটা ছায়ার প্রয়োজন হয়। হোক সেটা বাবার, ভাইয়ের কিংবা স্বামীর। প্রয়োজনতো হয়। তাহলেই তাঁরা হাজার সমস্যার সমাধান করে নিশ্চিন্তে ঘুমতে পারে। তোমার এখন এই ছায়া হতে হবে। স্বস্তির ছায়া। "
ব্যস হয়ে গেলেন আমাদের স্বস্তির ছায়া। আর আমার হয়ে গেল পুরো দুনিয়া।
ঐশী বড় একটা নিশ্বাস ফেলে শাড়ির কুঁচি ধরলো।তার এই এক দোষ। একবার কথা বলতে গেলে সে বলতেই থাকে বলতেই থাকে। ইমরান খুব বিরক্ত হয়। অবশ্য তাকে কিছু বলবে না। তবে ঐশী বুঝে। সে অনেক কিছুই বুঝে। তবে কেন জানি মানতে পারে না।
এই যে আজ তার জন্মদিন। শাড়ি পরে, চোখে কাজল দিয়ে মিষ্টি করে সেজে সে সবার আগে ইমরানকে কল দিলো। ইমরানের চোখে মুগ্ধতা দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু কেন জানি সেটা কখনো দেখতে পারে না। ইমরান অবশ্য একগাদা প্রশংসা করেছে। তবুও তার কাছে কেন জানি ফেইক মনে হয়। মনে হয় বলার জন্যই বলছে। শুধু তাকে খুশি রাখার জন্য।
ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে ঠিক করল। তা না হলে ভিতরে গেলেই মামা বুঝে যাবে। আর তার মন খারাপ মানে মামারও খারাপ। জন্মদিনের সব আনন্দ শেষ। সে বড় বড় কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করল। বাসার ভিতরে এখন অনেক গরম। তার জন্মদিন উপলক্ষে তিনো ফুপি এসেছে। তারা আসলে ঐশীর খুবই ভালো লাগে। বাড়িটাকে কেমন মাতিয়ে রাখে।
সে এগুতে লাগলো। তার হাঁটতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কেননা শাড়ি পরতে শিখলেও এখনো ভালো ভাবে হাঁটতে শিখেনি। সে খুব সাবধানে এগুতে লাগলো। কিছুদূর এগুতেই অবাক হয়ে তাঁকালো।
একটা লোক ফোনে কথা বলছে। বলতে'ই পারে ! এই বাড়িতে মামার অবদানে অনেক আজব আজব প্রাণীরা আসে। মামার সাথে মিলে নানা রকম কান্ড কারখানা করে। করুক! এসব নিয়ে ঐশীর কোন কালেই কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো লোকটা তার শখের বাগানের পুর্তুলিকা ফুলের গাছ পাড়িয়ে চিরে চ্যাপটা বানিয়ে ফেলছে। আজব এক মানুষতো ! আশে পাশে এত জায়গা তা না। গাছের উপরে এভাবে নেচে নেচে কথা বলার মানে কি? একবার এদিকে যাচ্ছে তো আরেকবার ঐদিকে। সে তাড়াতাড়ি এগুলো। তার এতো শখের গাছ। এই লোক অন্ধ নাকি?
----
সাঈদ ফোনে কথা বলতে বলতেই ঐশীর দিকে তাকালো। শাড়ির কুঁচি ধরে একপ্রকার দৌড়ে তার দিকে আসছে। হাই হিলের জন্য অবশ্য পারছে না। টিপে টিপে দৌড়াতে হচ্ছে।
সাঈদের হাসি পেল। মেয়েরা পারেও বটে। তবে মেয়েটাকে দেখতে ভালো লাগছে। এক রাশ ফুলের মাঝে গোলাপী শাড়িতে মেয়েটাকে অন্য রকম লাগছে। মনে হচ্ছে ভিন্ন জগৎতের বাসিন্দা। শুধু দু-টো পাখার অভাব। এই পাখা বিহীন মানবীকে দেখতে দেখতে সে একটা অকাজ করে ফেলেছে। কিছু ফুলের গাছকে ভর্তা বানিয়ে ফেলেছে। সে সরে যেতে চেয়েছিল। তখনি আড়চোখে দেখলো মেয়েটা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তখন ভাবলো যা হবার হয়ে গেছে এখন সরে লাভ কি? মেয়েটাকে আরেকটু অবাক করা যাক। তাই সে গাছের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগলো।
ঐশী এগিয়ে এসেছে! সাঈদ কথা শেষ করে ফোন পকেটে রাখল।
--- আপনি কি অন্ধ? এভাবে গাছ নষ্ট করছেন কেন?
সাঈদ নিচের দিকে তাকালো। তার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। সে আরেকটু আরামের সহিত দাঁড়ালো।
ঐশী আর্তনাদ করে উঠল, --- কি করছেন আপনি?
--- ভর্তা বানাচ্ছি! খাবেন?
ঐশী তাকিয়ে রইল! এই এলোমেলো চুলের সাধারণ জামা কাপড় পরা ছেলেটাকে চিনতে চেষ্টা করল। তবে সফল হলো না। কে এই ছেলে? তার বাড়িতে এসে তাকেই তেড়া কথা বলছে। আশ্চর্য!
--- আপনি জানেন আমি কে? কোন সাহসে এভাবে কথা বলছেন?
সাঈদ কোন উত্তর দিলো না। ঐশী হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। সে শাড়ি পরলেও হাত খালি। খালি না থেকে একগুচ্ছ রেশমী চুড়ি থাকলে ভালো হতো। রিনঝিন শব্দ হতো।
সাঈল তার হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। তাকিয়ে সোজা চলে যেতে লাগলো। সন্ধ্যার পর পর তাকে রওনা দিতে হবে। তা না হলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।
ঐশী তার পিছু পিছু দৌড়ে যেতে যেতে বলল,--- আপনি তো খুব বেয়াদব। কথার উত্তরও দিচ্ছেন না। আপনি কি ইচ্ছে করে এগুলো নষ্ট করেছেন?
-- হ্যাঁ।
-- কেন?
-- এমনিই।
ঐশী থমকে দাঁড়ালো। তার উচিত এই ছেলেকে কষে কয়েকটা থাপ্পড় মারা। যদিও বয়সে বড় তবুও অপরাধের ক্ষেত্রে আবার বড় ছোট কি? অপরাধ! অপরাধই! তবে সে নিরুপায়! এই ছেলেকে কেন তার চেয়ে ছোট বাচ্চাকেও থাপ্পড় মারার সাহস তার হবে না। তার দ্বারা এসব হয়না। মারাতো দূরের সে কারো সাথে উঁচু গলায় কথাও বলতে পারে না। তাই সে তার মতোই বলল --- যদি ভুল করে করতেন তাহলে আমি অবশ্যই ক্ষমা করতাম। তবে এখন করবো না। কোন দিনও না।
সাঈদ দাঁড়ালো! তবে কিছু বলল না। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।
--- আমার কথা বিশ্বাস হবে না জানি । মানুষ শান্ত ধীর কথায় ভয় পায় না। তারা চিৎকারে অভ্যস্ত। তবে হয়তো আপনি জানেন না। আমার এই শান্ত কথার কতো ক্ষমতা। এই গাছ গুলো আপনি ঠিক করবেন। অবশ্যই আপনি করবেন। ঠিক করা না পর্যন্ত এই বাসা থেকে আপনি বের হতে পারবেন না। আর এটাই আমার শেষ কথা। বলেই ঐশী গটগট করে চলে গেল। উঁচু হিলের জন্য অবশ্য একটু সমস্যা হলো! গটগট করে হাঁটতে গিয়ে এঁকেবেঁকে গেল।
সাঈদ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার ফোন বাজচ্ছে। সে ফোন রিসিভ করে কানে রাখলো। তবে তার দৃষ্টি পাখা বিহীন মানবীর দিকে । সেই মানবী দৃষ্টির বাহিরে না যাওয়া পর্যন্ত সে তাকিয়েই রইল।
#চলবে.....