#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০২
সাঈদ গাছ গুলো উঠিয়ে নষ্ট অংশ ভেঙে মাটি গুছালো, আবার নতুন করে সুন্দর ভাবে লাগালো। কিছুদিন সময় লাগবে তবে আগের মতোই ঠিক হয়ে যাবে। বরং আগের চেয়ে আরো সুন্দর ভাবেই হবে।
সে কাজগুলো করল খুব দ্রুত। এই আর কি? অপরিণত হাতে এর চেয়ে দশ গুন কাজ একা করেছে। এ সামান্য কাজ তার হাতের ময়লা। সে ঘড়ি দেখলো! সন্ধ্যার মধ্যেই বেরিয়ে যাওয়ার কথা, তবে পারেনি! যখনি গেইটের কাছে গেছে। দারোয়ান অন্য দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে শিস বাঁজিয়েছে যেন তাকে দেখতেই পায়নি।
সাঈদ উঠে দাঁড়ালো! বাগানের সাইডেই পানির কল, সেখানে হাত মুখ পরিষ্কার করল। তার এখন যাওয়া দরকার। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। আজকাল অনেক মানুষই তার পেছনে লেগেছে। একটু দেরি হলেই মা টেনশন করে ।
-- কাজ শেষ?
সাঈদ ঘুরে দাঁড়ালো! আনিস মামা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে হাসি।
-- হুম!
আনিস এগিয়ে এসে সাঈদের পাশে দাঁড়ালো। --- ভিতরে গেলে না কেন?
-- আমি গেলে আপনার মহারাণী খুশি হতো না। তার রাজ্য আমি ধ্বংস করে ফেলেছি। শাস্তি দিয়েছে। মাথা পেতে না নিলে শুধু তো কয়েদি বানিয়েছে এর পরে গর্দান নিয়ে নেবে।
আনিস হো হো করে হেসে উঠল। হেসে বলল,
-- তা বটে! তা বটে! আমার মায়ের কিন্তু সেই ক্ষমতা আছে। তবে নিশ্চিন্ত থাকো। সে এরকম কাজ কখনো করবে না। সে সব কষ্ট নিজের মধ্যে নিয়ে শেষ হয়ে যাবে । তবে অন্য কাউকে ফুলের টোকাও দেবে না।
-- এত ভালো, ভালো না! জানেন তো?
-- জানি! জানি বলেই তো এমন একজন কে চাই যে তার এই রাজত্ব না। এই এত ভালোটাই আগলে রাখবে।
-- সে একজন নিশ্চই আমি না।
আনিস হাসলো! কিছু বলল না।
-- গিফ্ট পছন্দ হয়েছে?
-- হ্যাঁ! এখনো গিফ্টটের সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে আসে।
সাঈদ আর কিছু বলল না। এই মানুষটার কাছে সে ঋণী। সারাজীবনের জন্য ঋণী। না টাকা পয়সার না! ভালোবাসার ঋণী! টাকা পয়সার ঋণ শোধ করা যায়। ভালোবাসারটা যায় না।
সে গেইটের সামনে এগিয়ে গেল। এবার আর কোন সমস্যা হলো না। দারোয়ান গেইট খুলে দিয়েছে। তবে সাইদ বের হলো না। আবার ফিরে আনিসের সামনে এলো। পাশেই চন্দ্রমল্লিকা ফুলের গাছ। হাতে যে কয়টা আসে, সে কয়টা ধরে একটানে উঠিয়ে ফেললো। ফেলে আনিসের দিকে তাঁকিয়ে শান্ত ভাবে বলল, --- আমি আমার রাজত্বের রাজা মামা। আমার হতে হলে আমার রাজত্বে আসতে হবে। সেখানে মিশে যেতে হবে। রোদের তাপে ঝলসে যেতে হবে। সেটা আপনার মমের গুড়িয়ার সহ্য হবে না। মখমলের চাদরে জড়িয়ে কষ্ট সহ্য করা আর পলিথিন জড়িয়ে ইটে মাথা রেখে ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ আছে ।
আনিসও নির্বিকার ভাবে বলল, ---- জানি! জানি বলেই তো চাচ্ছি।
সাঈদ আর দাঁড়ালোও না । এর কাছে কিছু বলা আর গাছের কাছে কিছু বলা একই । লাভ কিছুই হবে না। সে চন্দমল্লিকার গাছ ছুঁড়ে ফেললো! ফেলে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে দারোয়ানের হতম্বভ মুখের দিকে এক বার শুধু তাকালো। যার অর্থ " পারলে এবার আটকে দেখা। "
সাঈদ বাস থেকে নামলো রাত এগারোটার দিকে। এটা এখানকার শেষ বাস ছিল। এরেকটু হলেই মিস হয়ে যেত।
সাঈদকে দেখে তুহিন এগিয়ে এলো। তাঁর বেশ কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে তুহিন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।
--- তোকে অপেক্ষা করতে মানা করেছিলাম।
তুহিন হাসলো! হেসে বাইকের চাবি সাঈদের দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল, --- তুই বললেই শুনবো! এরকম টা ভাবার কারণ কি, বউ লাগি আমি তোর?
সাঈদ ও হাসলো! ক্যাচ করে চাবি ধরলো!
--- সেটাইতো, বউ আমার যে অপেক্ষা করবি?
বলেই বাইকে বসলো! বসে স্টার্ট দিলো। তুহিন পেছনে বসতেই হঠাৎ টান মারলো।
তুহিন শক্ত হয়ে বসে বলল, --- শালা স্পিড কমা। তোর বাইকে বসে আমার দু- বার এক্সিডেন্ড হয়েছে। একবার মাথা ফেঁটেছে আরেক বার সিটকে পরে পা ভেঙেছে। এই বার না জানি কি হয়।
সাঈদ হো হো করে হেসে উঠল ! হেসে বলল ---- এবার বুঝেছিস কথা শুনতে হবে কেন ?
-----
ঐশী মামার পিঠে পিঠ রেখে বসলো। এটা তাঁর ছোট বেলার অভ্যাস। মামা যখন ব্যস্ত থাকে ঐশী টুপ করে এসে বসে থাকে। এমনও দিন গেছে মামা ঘন্টার পর ঘন্টা লিখেছে। ঐশীও ঘন্টা পর ঘন্টা এভাবেই চুপচাপ বসে থেকেছে। মামার প্রতি এত আস্থা, এত ভালোবাসা কিভাবে এলো ঐশী বুঝতে পারে না। ছোট বেলা থেকেই সে সবার ভালোবাসাই পেয়েছে। তবে মামার প্রতি এত টানের উৎস কি?
ছোটবেলায় সে প্রায়ই মামাকে জিজ্ঞেস করত। মামা হেসে বলতো,--- " মায়ের ডাকে একটা মা আর মামা ডাকে দু-টো মা। তো ভালোবাসাও ডাবল হবে তাই না।
" তখন ঐশী অবাক হয়ে বলতো,--- সত্যিই তো মামা! তোমার মধ্যেতো দুইটা মা। "
-- কি হয়েছে ?
ঐশী কিছু বলল না। সে গাল ফুলিয়ে রাখলো।
সে মামার সাথে রাগ করেছে। কেন সে ঐ বেয়াদব লোকটাকে কিছু বলেনি? তাঁর সামনেই ঐ বেয়াদব লোকটা আমার চন্দমল্লিকা ফুলের গাছ দফারফা করে ফেলেছে। সে অবশ্য জানতো না। সকালে বাগানে গিয়ে তাঁর চোখ ছানাবানা। পরে দারোয়ান এসে সব বলল। ফাজিলের ফাজিল! ঘাড়ত্যারার ঘাড়ত্যারা! এই ঐশী তাকে কখনো ক্ষমা করবে না। কখনো না।
আনিস হাসলো! --- গালটা ফোলা ফোলা লাগছে কেন রে? আবার বলিস না তোর দাঁতের মাড়ি আবার ফুলেছে। যে যন্ত্রনা দিস। পুরো বাড়ি মাথায় করে ফেলিস।
ঐশী ঘুরে মামার দিকে তাকালো! বলল,--- তোমার তাই মনে হচ্ছে? দেখ! কোথায় আমার গাল ফোলা? কোথায়?
আনিস আঙুল দিয়ে গালে খোঁচা মেরে বলল,--- এই যে এখানে, এখানে, ঐখানে।
ঐশী হেসে ফেললো!
আনিস ঐশীর হাসি মাখা মুখের দিকে তাঁকিয়ে বলল --- এই যে এখন ঠিক আছে। যাক বাঁচলাম বাবা।
-- ঢং বাদ দিবে মামা! আমি কিন্তু রাগ করে আছি ।
আনিস হাসি থামালো! থামিয়ে ঐশীর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,--- একটা গল্প শুনবি?
ঐশী আগ্রহ নিয়ে বলল,--- তোমার লেখা?
-- না।
-- তবে ।
-- উপরে যে আছেন তাঁর লেখা।
ঐশী কিছু বলল না। বিষন্ন ভাবে তাঁর বড় বড় ভাসা দুটি চোখে তাকিয়ে রইল। এই উপরওয়ালার লেখা গল্পগুলো হয় খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। ভেতর একবার নাড়িয়ে দেয়। তাঁর চেয়ে আর ভালো কে জানে?
আনিস স্মিথ হেসে বলল --- ভয় নেই! নিষ্ঠুরতার গল্প না। একজন হীরার গল্প। কিভাবে সে সাধারণ কয়লা থেকে পুরে পুরে হীরায় পরিণত হয়েছে। সেই গল্প।
ঐশী হালকা হাসলো! --- হঠাৎ হীরার গল্প শোনাতে চাইছো কেন?
-- হীরার গল্প না শুনলে কাচ চিনবে কিভাবে?
-- চেনেটা খুব জুরুরী বুঝি?
--- হ্যাঁ! অবশ্যই।
--- তাহলে বলো আমি মন দিয়ে শুনছি।
আনিস জানালার দিকে তাকালো! বড় এক শ্বাস ফেলে বলল, ---" গল্পটা শুরু হয় একটা ছেলেকে নিয়ে। না! সে কোন রাজকুমার টাজকুমার না। সাধারণ পরিবারের শান্তশিষ্ট, মেধাবী ছেলে। যার স্বপ্ন সে অনেক লেখাপড়া করবে। লেখাপড়া করে বড় হবে। অনেক অনেক বড়। বড় হয়ে সে মানুষের সেবা করবে। সেই স্বপ্ন থেকেই সে নিয়মিত স্কুলে যেত, মন দিয়ে লেখাপড়া করতো আর সব ক্লাসেই খুব ভালে রেজাল্ট করত।
সে যখন ক্লাস টেনে উঠল। হঠাৎ এক ঝড়ে তাঁর জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। সব স্বপ্ন ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেল। "
বলেই আনিস ঐশীর দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল, --- এই ঝড়টার সাথে তুমিও পরিচিত। তবে তোমার দুনিয়া আর তাঁর দুনিয়ায় আকাশ পাতাল পার্থক্য । তোমার কাছে সব আছে। টাকা, আত্মনির্ভরশীল মা, দাদির মত স্নেহের হাত, সব। আর তাঁর পাশে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। আছে শুধু দায়িত্ব! এক অবলা মা, আর পিতৃহারা এক ছোট্ট বোনের দায়িত্ব ।
কি করবে সে? এই কঠোর দুনিয়ার সে কিছুই চেনে না। দিনের পর দিন যায়। তাঁদের ঘর শূণ্য হয়। শূণ্য হয় চালের ড্রাম, তেলের বোতল, নুনের কৌটা। শূণ্য হতে হতে এক বেলা উনূন জ্বলেতো আরেক বেলা জ্বলে না । চেহেরার সাথে সাথে গায়ের কাপড়ও মলিন হয়। শত সেলাই যোগ হয় কাপড়ের ভাজে ভাজে। কি করবে সে? এই কাজ করে, ঐ কাজ করে। যে হাতে কলম নিয়ে স্বপ্ন বুনতো সেই হাতে কোদাল নিয়ে মাঠে নামে, তবুও যে অভাব ঘুচেনা।
তাঁর মা ঠিক করল অন্যের বাসায় কাজ করবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা তো তার নেই। কি বা করবে সে? ছেলেটার ও এত কষ্ট যে সে দেখতে পারে না।
কিন্তু ছেলে তাঁর অনড়! সে তাঁর জীবন থাকতে মাকে অন্যের বাসায় কাজ করতে দেবে না। কোন দিনও না। দিনে কাজ করে হোটলে আর রাতে তাঁর ছিল একটুকরো জমি সেখানে। ফেলে রেখে লাভ কি? যদি কিছু আসে। সেই একটুকরো জমি চাষ করতে করতে সে হয়ে গেল দক্ষ। কিভাবে ধানের বীজ রাখতে হয়, কিভাবে তৈরি করতে হয়, কিভাবে কখন বপন করতে হয় সব, সব কিছুতে।
ঐ যে বলে না। যার হাতই সোনা তাঁর কাছে কলম কি, মাটি কি, ছাই কি, যেখানে হাত দিবে সেখানেই সোনা। নিজের তো ছিল না। আস্তে আস্তে অন্যের জমি বর্গা নিতে শুরু করল। একটা, দুটো, তিনটা আস্তে আস্তে অনেক। আজকাল দিনে সবাই শহর মুখি। লেখাপড়া করে সবাই বড় বড় চাকরি করতে চায়। নিজের জমিজমা গ্রামে পরে থাকে। চাষ বলতে গেলে করেই না। সে খুঁজে খুঁজে অল্প টাকায় অনায়াসেই সে সব নিতে থাকলো।
আল্লাহ বলেন, " মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে পরির্বতন না করা পর্যন্ত আমি করি না। সেও নিজের ভাগ্য নিজ হাতে পরিবর্তন করেছিল। এখন যতদূর চোখ যায় শুধু জমি আর জমি। নিজের জমি! তাঁর আন্ডারেই এখন শতশত মানুষ কাজ করে। তাঁর উৎপাদিত ফসল বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। যেই মা অন্যের বাসায় কাজ করতে চেয়েছিল। সেই মার আশেপাশেই থাকে কাজের মহিলা তিনজন।
তবুও সে সাধারণ! আগের মতোই সাধারণ। এখন তাঁর সব আছে সব। তবুও কি জানি একটা নেই। ভেতর শূণ্য! তাঁর স্বপ্ন নেই। যে স্বপ্ন ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছে সে স্বপ্ন নেই। লেখা পড়া করবে, মানুষের সেবা করবে। সে ঠিক করল। আবার লেখাপড়া শুরু করবে। করলোও তাই। মানুষের ধার সে ধারে না। উন্মুক্ত স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। প্রথম থেকে আবার শুরু করল। কাজের পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে থাকলো। আর রইল মানুষের সেবা। সেটার জন্য তো কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন একটা মনের। আর তাঁর যেই মনটা ছিল সেটা ছিল বিশাল। বিশাল এই মনের কথা তোমাকে আমি বলতে চাই না। কারণ আমার কাছে তার জন্য পর্যাপ্ত শব্দ নেই।শুধু বলবো সে যদি চাইতো এখন তাঁর টিনের চালের ঘরের জায়গায় অট্টালিকা থাকতো। ব্যাংকে থাকতো কোটি কোটি টাকা। সে বাস করতো এসির ঠান্ডা বাতাসে। না, তা সে করে না! সে এখনো রোদে ভিজে মাঠে ধান কাটে। ধানের বস্তা কাঁধে নিয়ে বাড়ি আসে। মায়ের আঁচল নিয়ে নিজের সব ক্লান্তি দূর করে।
#চলবে.....