#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৩
নাবিলার জ্ঞান ফিরল কিছু সময়ের মাঝেই। ফিরতেই ঝট করে চোখ খুলে তাকাল। তাকাতেই দেখল, তার মা, আসমানি খালা, নোভা, নাবিল সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে। থাকারই কথা, সুস্থ সবল মানুষ হঠাৎ করে দাঁত দু'পাটি লাগিয়ে চিৎ পটাং হওয়া স্বাভাবিক কথা না। অবশ্য তার জীবনে কিছুই স্বাভাবিক না। তবুও, বাড়ির মেয়ে চিন্তা না করে উপায় কি?
নাবিলা আস্তে করে উঠে বসল। এক ব্যথা কমে, আরেক ব্যথা শুরু হয়। কিভাবে পড়েছে কে জানে! মাথার এক পাশ চিনচিন করছে, জিহ্বা ভার হয়ে আছে। নাড়াতে গেলেই ব্যথা লাগছে।
সে সব কিছু হজম করে, একটু হেসে বলল,-- আমি ঠিক আছি।
রোকেয়ার, 'এই ঠিক আছি' বিশ্বাস হলো না। অনেক কিছুই এই মেয়ে চুপচাপ হজম করতে পারে। আর যদি হয় নিজের কিছু, তাহলে তো আর কথাই নেই। নিজেকে শাস্তি দিতে সে বড়ই ওস্তাদ। তাই ভ্রু কুঁচকে বলল,-- পড়লি কি করে?
-- হয়তো প্রেশার ফল করেছে।
-- দেখি হা কর।
নাবিলা হা করল না, আগের মতোই এক বাক্যে বলল, -- আমি ঠিক আছি।
রোকেয়া হাল ছাড়ল। বড় মেয়ে তার। তেমনভাবে তো কখনো কাছে পায়নি। কিছু শুনলেই পাগলের মতো লাগে। অথচ, পাগল মেয়েই তার।
মা, বড় বোনের কথা শুনে, নাবিল উঠে দাঁড়ালো। নোভার এক চিৎকারে দৌড়ে বেরিয়েছে। শুধু সে না, বাড়ির সবাই। যে আসমানি খালাকে হাতি দিয়েও টেনে তোলা যায় না, সেও লাফিয়ে বেরিয়ে এসেছে আর এসেই পুরো বাড়ি মাথায়। একদিকে মা, - "কি হলো, কি করবে, আল্লাহ রক্ত কেন? কি হয়েছে আমার মেয়ের! আরেক দিকে খালা, " আগেই কইছি, এই মেয়ের উপরে জ্বিনের আছর আছে। কে শোনে কার কথা! জবান বন্ধ, বিয়ে বন্ধ, এখন জানও বন্ধ।
নোভার জমজ হলেও, নোভার উল্টো সে । যেমন বুদ্ধিতে, তেমন স্বভাবে। তাই কারো কথা কানে না নিয়ে, সোজা পাঁজাকোলে তুলে নিয়েছে। নিয়ে, রুমে গিয়ে আস্তে করে শুইয়ে দিয়েছে।
বয়সে আপার ছোট হলেও সে, নোভা মায়ের মতো। লম্বাও মায়ের মত, শরীরের গড়নও মায়ের মত। তবে আপা হয়নি। সে হয়েছে দাদির মত। ছোট খাটো গড়নের চিকন মিষ্টি মুখের মেয়ে। তাদের চেয়ে আপাকেই লাগে বেশি ছোট। তাই রুম পর্যন্ত আনতে সমস্যা হলো না তার। আর এনেই নোভার দিকে তাকিয়ে বলল, -- তাড়াতাড়ি মাথায় পানি ঢাল। খালা একটা চামচ আনো তো। ইশ, দাঁত লেগে জিহ্বা শেষ।
তবে মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছুই বলল না। এই বয়সে এসেও মায়ের হাতে মার খাওয়া, সহজ কথা না। তার জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের কাজ। আর এই কাজটাই মা হুটহাট করেন। যেটা তার একদম ভালো লাগে না। কিছু বলবে, সেই জোগাড়ও নেই। টাকা পয়সা সব বন্ধ করে বসে থাকে। সেটা ভালো না লাগার চেয়ে ও হজম করা কঠিন ব্যাপার স্যাপার।
নোভা নাবিলের কথা শুনেই বাথরুমে দৌড়ে গেছে। কী থেকে কি হয়েছে, তার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ করে জ্ঞান হারাবে কেন? ঐ ভ্যানওয়ালা কোন ঔষধ দিয়েছে, কে জানে! তবে এসে তো দেখেছে দিব্যি আরামসে ঘুমাচ্ছে। তো, পরে হলোটা কী?
তাই নাবিলার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত সে মুখই খোলে নি।এখনো খুলল না। যদি শোনে অচেনা মানুষের কাছ থেকে ঔষধ এনে খাইয়ে দিয়েছে, তাকে মা কিমা বানিয়ে ফেলবে। তাই চুপচাপ ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রইল।
তবে নাবিল দাঁড়িয়ে বলল, -- তবুও চলো, একবার ডাক্তার দেখিয়ে আনি। শহরে এই রাত আর এমন কি? আমার বাইক তো আছেই। হাসপাতালে গেলে ডাক্তারের অভাব হবে না।
রোকেয়াও সাথে সহমত হলেন। তবে নাবিলা আগের মতোই আস্তে করে বলল,-- এসবের প্রয়োজন নেই। দুপুর থেকে দাঁতে ব্যথা ছিল। খাবার খাওয়া তো আর হয়নি। তাই প্রেশার ফল করে মাথা ঘুরে গেছে। আর কিছু না। আরাম করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
নাবিল বিরক্ত হলো, বিরক্ত কণ্ঠে বলল,-- তুমিও না! বাবা এক পাগল, তুমি আরেক পাগল। ডাক্তার দেখাচ্ছো না কেন? এখনও এই দাঁত নিয়ে বসে আছো।
নাবিলা আবারও হালকা হাসলো! হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,-- চাচার কাছে এক লোক এসেছে মা। দুপুর থেকে এই ধুলা বালির মধ্যে গ্যারেজে বসে আছে। দেখতো কে?
আসমানি কাঁচা ঘুম ভাঙায় বড়ই বিরক্ত, সেই বিরক্ত নিয়েই বলল, -- বড় ভাইয়ের কাছে কোথায় আইল! আইছে তো আসাদুজ্জামানের কাছে।
রোকেয়া বিস্ময় নিয়ে বলল, -- কার কাছে?
-- আসাদুজ্জামান! ভাঙা ক্যাসেটের মতো বাজাইতেছে, আমি আসাদুজ্জামানের কাছে আইছি, আমি আসাদুজ্জামানের কাছে আইছি।
রোকেয়া বিরক্ত হলো, বিরক্ত মাখা কণ্ঠে ধমকে বলল,-- এসেছে ভালো কথা, গ্যারেজে ঢুকিয়েছে কে?
নোভা সাথে সাথেই হাত ধুয়ে ফেলল। ফেলে বলল, -- আমি না। আমিতো ভাই সোজাই বলেছি, এটা আসাদুজ্জামানের বাড়ি না।
-- থাপড়ে তোদের দাঁত ফেলে দেব।
-- এখন তো এইসব বলে লাভ নেই, মা। সবাই দরজায় খিল দিয়ে বসে ছিলে। আমি কি করব। তাছাড়া, আমি তো আর জানি না, বড় চাচা নাম আসাদুজ্জামান। এক মানুষের যে কত নাম রাখতে হয়, বুঝে আসে না। হাবু, নাসির আবার নাকি আসাদুজ্জামান। এদিকে আমার দুই অক্ষরে কাজ কাম সব খালাস করে ফেলেছো।
আসমানিও সহমত হলো। সহমত হয়ে বলল, -- এই মাইয়ার সাথে বড়ই অন্যায় হয়েছে। নোভা! এইডা কোন নাম হইল। আগেও নাই, পিছেও নাই। ডাকতে গেলে কানে বাজে শুধু ভা ভা।
রোকেয়া চেঁচিয়ে বলল,-- আসমানি তুই তোর কাজে যা।
-- কাঁচা ঘুম থেকে তুলে, এখন আবার কাজে যা! আমি আগেই কইলাম, কাল সকালে আটটার আগে আমি ঘুম থেকে উঠব না।
-- তোর উঠতে হবে না, যা।
আসমানি মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল। নাবিল ঠিক করেছিল মায়ের সাথে আর কথা বলবে না, তবুও বলল, -- আমি দেখছি। তুমি আপার জন্য একটু খাবারের ব্যবস্থা করো। তারপর নাবিলার দিকে তাকিয়ে বলল,-- কালকে তুমি অবশ্যই আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাবে।
নাবিলা কিছুই বলল না। সে আগের মতো শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করতেই কেউ কানের পাশে ফিসফিস করে বলল, -- নাবিলা, ভালবাসো ?
নাবিলা সাথে সাথেই চাদর খামচে ধরল। রোকেয়া দেখল, দেখে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নাবিলদের এই বাড়িটা পুরোনো ধাঁচের। সেই বাবা মায়ের বিয়ের সময় দু'তলা করা হয়েছিল। সেই হিসেবেই শুধু উপরে বাড়ানো হয়েছে। লিফটের ব্যবস্থা নেই, আগে গ্যারেজ ট্যারেজ কিছুই ছিল না। নিচের এক পাশের ফ্ল্যাট ভেঙে করা হয়েছে।
সেই গ্যারেজের ভেতরেই এসে নাবিল দাঁড়ালো। দেয়ালে হেলান দিয়ে একজন বসে আছে। তার সব মনোযোগ হাতের একটা বইয়ে। ইংরেজি বই। বইয়ের নাম, দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি। মুখের সামনে তুলে ধরে আছে। তাই নাবিলের পড়তে সমস্যা হলো না।
সে এগিয়ে গেল। যেতেই বইয়ের পাশ দিয়ে মুখটা দেখা গেল আর যেতেই নাবিল থমকালো। তার কাছে এই মুখটা চেনা চেনা লাগল। কোথায় যেন দেখেছে?
নাবিল মনে করতে পারল না। আর ঠিক তখনই লোকটা বইটা নিচু করল। করে চোখ তুলে তাকালো। তাকাতেই নাবিল বিস্ময় মাখা সুরে বলল, -- আপনি? ও মাই গড!
অপূর্ব হাসল! মানুষের মুখে বিস্ময় তার জন্য নতুন না। তবে এখানের কেউ ও তাকে এক দেখায় চিনবে ভাবতে পারেনি। অবশ্য তার অনেক ফ্যান ফলোয়ার'ই বাংলাদেশের। তবুও, ফোনের স্ক্রিনে দেখা, আর বাস্তবে দেখা এক কথা না।
তাই হেসে হাতের বইটা রেখে উঠে দাঁড়ালো। প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে হাত বাড়িয়ে বলল, -- হাই, আমি অপূর্ব।আসাদুজ্জামান জামানকে খুঁজছি। সম্পর্কে আমি তার ছেলে হই।
নাবিলের বিস্ময়ে খাবি খাওয়ার অবস্থা। বড় চাচার ছেলের নাম অপূর্ব জানে, তবে এই অপূর্বই সেই অপূর্ব তার তো ধারণারও বাইরে ছিল।
তাই হাত মেলাবে কি, বরং খাবি খেয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের বংশ হচ্ছে খাল-বিলে ভেসে থাকা কচুরিপানার মতো। এখানে এক থোকা, আরেক জায়গায় আরেক থোকা। তারা নিজেদের মতো ভেসে চলছে তো চলছে। অতি দরকার বা কাজ ছাড়া কেউ কারো আগে পিছে নেই।
তাদের দাদা মারা গেছে অনেক আগে, তবে দাদি কিছুদিন ছিল। অবশ্য নাবিল, নোভার কপালে তাদের একজনকেউ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আপার যখন দুই তিন বছর, তখনই মারা যান। তিনি মারা যাওয়ায় দুই ছেলে, এক মেয়ে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেই বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে নাবিল তার ফুপুকে দেখেছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার।
তিনি ফ্যামিলি নিয়ে দেশের বাইরে থাকেন। আসেন দু'তিন বছরে একবার। সেই আসায় ভাইয়ের বাড়িতে এসে ঘণ্টাখানেক বসেন, বিদেশি জীবনযাত্রার গল্প করেন, তারপর নিজের মতো রাস্তা মাপেন।
সেখানে বড় চাচার পুরো নাম না জানা, বা তার ছেলেকে না চেনা অস্বাভাবিক কিছু না। তাছাড়া বড় চাচাকে কাছে পেলই বা কয়দিন?
বড় চাচা আর্মিতে ছিলেন। নাম ডাকওয়ালা আর্মি না, সাধারণ সৈনিক। অনেক টেনে হিচড়ে কর্পোরাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। এই যাওয়া পর্যন্ত তার গর্ব আর গল্পের শেষ নেই। নোভা আর সে পালিয়ে বাঁচে। আপু কথা টথা বলে কম, তবে আসমানি খালা আবার সেই গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
বাবা যেমন, তার পুরো বিপরীত হলো তার বড় চাচা। বাবার যেমন কোন কাজে মনই বসেনি, তবে চাচা যে কোনো কাজই মন দিয়ে করেন। তার কাজে তিনি নিষ্ঠ, দায়িত্ববান। হেলা ফেলা তার মধ্যে নেই।
দাদি ছিলেন এই ছেলের পুরো ভক্ত। তাই ভালো ঘর, ভালো বাড়ি, দুনিয়ার যাচাই বাছাই করে মনের মতো বউ আনলেন। সেই বউ যেমন দেখতে সুন্দরী, তেমনি গুণবতী। তবে তার ছেলেদের বউয়ের কপালই খারাপ। একজন দজ্জাল, আরেকজনের স্বামীর সাথে বনিবনাই হয় নাই।
বাবার মুখে শুনেছে, চাচি অন্যরকম ছিলেন। হাসিখুশি, গল্প, স্বপ্ন বিলাসী টাইপ মেয়ে। তিনি ঘুরবেন, ফিরবেন, দুজনে সময় কাটাবেন, বৃষ্টি বিলাস করবেন, রাতে চায়ের কাপে সাথে বসে বসে জ্যোস্নায় মাখবেন আর চাচা ছিলেন নিরামিষ টাইপের। তার কাছে নিয়ম ধরে কাজ, খাওয়া, ঘুমই সব। বাকি সব কিছু সময় নষ্ট।
তাই সেই না বনিবনার সংসার,, দুজনেই টেনে হিচড়ে বছর দশ এক নিয়েছেন। তার পর শান্তিচুক্তির মতো দুজনেই চুপচাপ সরে গেছেন।
সরে যাওয়ার সময় তাদের একমাত্র ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। না নিয়ে অবশ্য উপায়ও ছিল না। দাদি বয়স্ক মানুষ, চাচা দুনিয়ার ব্যস্ত। তাছাড়া মায়ের মতো সন্তানকে আগলে রাখবেই বা কে?
তারপর অনেকটা দিন গেছে। রিটায়ার্ডের পর বড় চাচা সোজা ছোট ভাইয়ের বাড়িতে উঠলেন। উঠে গম্ভীর মুখে ছোট ভাইয়ের বউকে বললেন, -- রোকেয়া, শোনো। আমি তোমাদের ঘাড়ে কোনো বোঝা হতে আসিনি। পেনশন প্লাস আমার চাকরি জীবনে দু’বার শান্তি মিশনে গিয়েছি। টাকা-পয়সা নিয়ে আল্লাহর রহমতে সমস্যা নেই। খাবার খরচের তো লোক ছিল না। আম্মা অল্পতেই চলে গেলেন। তুমি হয়তো জানো না, আফসানা নিজের সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। নেওয়ার পর আমার কাছ থেকে টাকা তো দূরের , কোনো যোগাযোগই রাখেনি। আমি আমার সন্তানের খোঁজ করার চেষ্টা করেছি। তবে শুনেছি, তারা দেশেও নেই। কোথায়, কোন দেশে গেছে আমার জানা নেই। আফসানার বাপের বাড়ির মানুষও বলতে নারাজ। তারা তাদের মেয়ের সন্তানের ভাগ আমাকে দেবে না।
যাইহোক, এখন আমার যা, তাই তোমাদের। অর্ধেক জীবন তো একা একাই গেল। বাকিটুকু আমি শুধু একটা পরিবারের মাঝে থাকতে চাই। তাই তুমি ভাবো। ভেবে স্পষ্ট জানাও, আমি তোমাদের সাথে থাকলে কোনো সমস্যা হবে কি না। মন রাখার জন্য বলবে না। দেখা গেল, মন রাখার জন্য বললে, তবে মনে মনে আমার গোষ্ঠী উদ্ধার করবে, দরজা লাগিয়ে আমার ভাইয়ের সাথে ‘আকডুম-বাকডুম’ করবে। এমন কিছুর দরকার নেই। তাই যা বলবে, মন থেকে সোজা বলবে।
তাদের মা সব সময়ই পাক্কা হিসাবি। দাদি পৈত্রিক বাড়ি থেকে বাবাকে অংশ দেননি। তার চিন্তা ছিল, ছেলে তো ছন্নছাড়া, বউ বাসিন্দা হয়ে গেছে শহরের। দরকার পড়তেই টুপ করে স্বামীর ভিটে যে বেচে ফেলবে, তাতে ভুল নেই। তাই বাড়িটা দিয়েছিল বড় ছেলেকে, বাকি সব ছোট ছেলেকে।
তার ধারণা ভুলও ছিল না। দেশে জমিজমা ফেলে রেখে লাভ কী? তাই দাদি একদিকে মারা গেছেন, আরেকদিকে মা সব বিক্রি করেছেন। তাদের দ্বিতীয় বাড়ির অর্ধেক টাকা তো এই দেশের জমির টাকাই। তবে বড় চাচা এমন কিছুই করেনি। বরং পৈত্রিক ভিটে তো ভালোই, বাবার সব জমিজমাও নিজে কিনেছেন। এগুলো তো ভালোই, টুকটাক আরও কিছু যোগ করেছেন।
তাই এবারও হিসেব কষতে তার মার ভুল হয়নি। বরং খুশি মনেই ভাসুরকে নিজের পরিবারের মানুষ করে নিয়েছেন। তবে আপাতত চাচা বাসায় নেই। তিনি আছেন তাদের গ্রামের বাড়িতে।
গ্রামের বাড়ি, জমিজমা নিয়ে চাচার আর তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তিনি রিটায়ার্ড হলেও এখনো আর্মিওয়ালা জীবনযাপন করছেন। কাটায় কাটায় দশটায় ঘুমোতে যান, কাটায় কাটায় পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠেন। নামাজ পড়েন, জগিং করেন, ঠিক আটটায় এসে সকালের নাস্তা করেন।
তবে মৃত্যুর আগে দাদির খুব মাথাব্যথা ছিল। চাচার ডিভোর্স, ছোট ছেলে শহরে, তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তার স্বামীর ভিটেতে কেউ আর আলো জ্বালাতে আসবে না। তার কাছে, বসতবাড়ি হচ্ছে ভাগ্যের লক্ষী। সেই লক্ষীতে আলো থাকতে হয়। না হলে বসতবাড়ির মতো বংশও ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়। বড় ছেলেরটা তো অন্ধকার হয়েই গেছে, ছোট ছেলেরটাও না হয়! তাই শেষ সময়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। চাচা, বাবা ফোন দিলেই বলতেন, -- তোদের বাপদাদার ভিটে তো আনদার হয়ে গেল রে। আমি মরলে আলো দেবে কে? এক্ষুনি আসিস না, চোখ বন্ধ করলে তো ফিরেও তাকাবি না। বরং আমাকে আমার স্বামীর ভিটেতেই মাটি দিস। অন্তত আমার কবর দেখার তাগিদে বছরে একবার ভিটায় পা রাখবি।
দাদির স্বামীর ভিটেতে কবর হয়নি। তিনি যখন মারা যান, তখন পুরো বর্ষার সিজন। গ্রামের চারিদিকে পানি থইথই। আর তাদের বাড়ি তো এমনিই খালের পারে। মাটির ছিটেফোঁটাও তখন পুরো গ্রামে নেই। শুধু পানি আর পানি। তাই তার কবর হয় শহরের গোরস্থানে। বাবা ব্যবস্থা করেন, ট্রলার ভাড়া করে শহরে আনেন।
মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা চাচার জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। আসার কারণও নেই। তার বাবা আগেই ছন্নছাড়া, আর তার বড় চাচা বাস্তববাদী মানুষ। তার কাছে মৃত্যু অনিবার্য সত্য। সবাইকেই একদিন যেতে হবে। এটা তেমন কোনো বড় ব্যাপার না।
বড় ব্যাপার না হলেও, আজকাল তিনি ঘুমাতে পারেন না। পারেন না বলেই আর্মির নিয়ম মাফিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটছে। সেই ব্যাঘাত ঠিক করার জন্য তিনি জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। আর করতেই ধড়ফড়িয়ে উঠেন। কেননা, চোখে ঘুম কোনো রকম লাগলেই তিনি শুনতে পান, তার মা বলছেন,-- ও হাবু, ভিটায় এতো আনদার ক্যা?
দাদি তার দুই ছেলেকে ডাকতেন দু'নামে -- বড় ছেলে হাবু, ছোট ছেলে বাবু। বাবু সারা জীবন বাবুই রইলেন, তবে হাবুর পাগল হওয়ার অবস্থা। তাই তিনি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে দৌড়ে গেলেন। সাইকিয়াট্রিস্ট সুন্দর করে বোঝালেন, -- বর্তমানে কাজটাজ করছেন না, অফুরন্ত সময়। এই রকম সময়ে মস্তিষ্ক নানা রকম চিন্তাভাবনা করে। যেহেতু আপনার মা মৃত্যুর আগে এই কথাটা অনেকবার বলেছেন, সেটাই অবচেতন মনে গেঁথে আছে। সেটাই এখন ঘুমালে মস্তিষ্ক স্বপ্নের মতো দেখাচ্ছে। আপনি বরং একটু ঘুরে ফিরে বেড়ান, ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন। ব্যস্ত থাকলেই এসব মাথা থেকে বের হয়ে যাবে। শরীর ক্লান্ত হবে, রাতে ভালো ঘুম হবে।
চাচা নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেন। বাবা দোকানে বসা ছাড়া সংসারে এমনিতেও নেই। বাজার সদাই থেকে শুরু করে সবকিছুই নিজের ঘাড়ে নিলেন। দূরে যেতে তার ইচ্ছে করে না, তবে আশেপাশে টুকটাক ঘোরাফেরা করেন। তবু তার মায়ের উঁকিঝুঁকি কমে না। স্বপ্নে এসে, -- ও হাবু, হাবু” বলে গান গাইতে লাগলেন।
বড় চাচা দিশেহারা। সেই দিশেহারার মাঝেই আপা তার স্বভাব মতো শান্ত ভাবে, বড় চাচার মাথা ঘুঁটা দিয়ে দিল। বলল,-- তুমি তো বসেই থাকো। গ্রামের জমিজমায় কিছু করলেই হয়। তোমারও সময় কাটবে, দাদির ভিটেতে আলোও জ্বলবে।
ব্যস, চাচার দিমাগের ঘণ্টি বেজে গেল। তিনি বাড়ির সবাইকে ডেকে বললেন, -- তিনি একটা খামারবাড়ি করবেন, যেখানে পুকুর থাকবে, সবজি ফলের গাছ থাকবে, গবাদি পশু থাকবে।
বাবা খুব আগ্রহ দেখালেন । এক ব্যবসা করতে করতে এমনিতেই তিনি থেতাবোতা। তাই দুই ভাই লেগে গেল কাজে। মার ভয়ে অবশ্য বাবা খুব একটা যেতে পারে না, তবে চাচা লেগে আছে ধুমছে।
এই ধুম ধুমছে দেখে মার তেমন ভাবান্তর হয়নি। তার এমন ভাব, যা খুশি করুক, তার কী! জমিজমা বিক্রি না করলেই হলো। তবে মায়ের সেই জমিজমার ভাগিদার এসে হাজির। ভাবা যায়!
নাবিল তার হতভম্ব থেকে বের হয়ে সুন্দর করে হাত মেলালো। মেলাতে মেলাতে বলল, -- আমার যদি ভুল না হয়, আপনি ফেমাস ট্রাভেল ভ্লগার আরভিন অপূর্ব?
অপূর্ব হাসল, তার সেই সুন্দর হাসি। হেসে বলল, -- সেটা অন্য দুনিয়ায়। এই দুনিয়ায় অপূর্ব নামের ছেলেটা এসেছে, তার বাবার সাথে দেখা করতে। আমার যদি ভুল না হয়, এটাই কি আসাদুজ্জামানের বাড়ি?
নাবিল নিজেও হাসল। হেসে হাত ছাড়িয়ে ব্যাগ দুটোর দিকে যেতে যেতে বলল, -- হ্যাঁ! এটাই আসাদুজ্জামানের বাড়ি। আর আমি আসাদুজ্জামান দেওয়ানের একমাত্র ভাইয়ের একমাত্র ছেলে নাবিল দেওয়ান।
চলবে.....
আমার গ্রুপের লিংক আর প্রথম ইবুকের লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT