#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৪
অপূর্ব কাজী পাড়ার তিন নাম্বার গলির একেবারে শেষ বাড়িটির তৃতীয় ফ্লোরে পা রাখল খুব সাধারণভাবে। রেখেই চারিদিকে একবার বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে দেখল। সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার বাজে একটা বদ অভ্যাস আছে তার। দেখে দোষত্রুটি বের করে এমন না। ব্যস, দেখতে ভালো লাগে।
তাই আজও দেখল। সুন্দর, গোছানো, পরিপাটি ড্রয়িংরুম। ড্রয়িং রুমের দু’পাশে রুম, একেবারে শেষের দিকে কিচেন, ডাইনিং। ফ্ল্যাটবাড়ির মতো হাবিজাবি না, বরং খোলামেলা, শান্ত, কোমল। কিছু কিছু বাড়ি আছে, দেখলেই আপন আপন লাগে, চোখ জুড়ায়, মনের শান্তি বিরাজ করে। এই বাড়িটাকে অনায়াসে সেই কাতারে ফেলা যায়।
নাবিল ব্যাগগুলো এক পাশে রেখে বলল, -- আপনি বসুন, আমি মাকে ডেকে আনছি। আসলে বাবা, চাচা কেউ বাড়িতে নেই। তার মধ্যে আমার বড় আপু অসুস্থ। তাই সবাই ওই দিকটায় একটু ব্যস্ত।
-- আমাকে ভাইয়া বলতে পারো, নাবিল। তুমিও ডাকতে পারো। আমি মাইন্ড করব না।
নাবিল হাসল। হেসে বলল, -- আপনি বসুন, ভাইয়া।
-- আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। আমি এমন এক মানুষ, সব জায়গায়, সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারি। বাই দ্য ওয়ে, তোমার আপুর দাঁতের ব্যথা কমেছে?
নাবিল অবাক হলো। তার অবাক মুখটা দেখে অপূর্ব বলল, -- ঠিক তোমার মতো দেখতে একটা মেয়ের কাছে শুনেছি। যদি ভুল না হয়, সে তোমার টুইন সিস্টার। অবাক হওয়ার কিছু নেই।
মুখে অবাক হওয়ার কিছু নেই বললেও, আসলে মনে মনে মেয়েটার প্রতি অন্যরকম একটা আগ্রহ কাজ করছে। সে এই এলাকায় এসে পৌঁছেছে সকালে। স্বাভাবিক, অচেনা জায়গা খুঁজতে সময় তো লাগবেই। এখানে ওখানে বলতে গেলে পুরো এলাকাই ঘোরা হয়ে গেছে। কিছু কিছু মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছে। আবার কিছু মানুষ ভেবেছে, মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে দেখতে বা খোঁজ নিতে এসেছে। তাই সুন্দরভাবে কতগুলো তথ্য দিয়েছে। দিয়ে, একটা মেয়ের বিয়ে ভেঙে, তাদের কোন লাভ অপূর্ব বুঝতে পারে না। এটা একটা বিকৃত মস্তিষ্কের কাজ। আর এই কাজগুলোই কি সুন্দর মানুষ নিজ দায়িত্বে মাথায় নিয়ে, হেসে হেসে করে ফেলে।
নাবিল নিজেও একটু হাসল। হেসে মাথা নেড়ে মনে মনে নোভার গোষ্ঠী উদ্ধার করল। রামগাধা! পেটে যদি একটা কথা রাখতে পারে! একজন মানুষ দেখেছে, ওমনি পেটের সব কথা শেষ। এই গাধার সাথে দশ মাস একসাথে ছিল কি করে, আল্লাহই জানে। কপাল গুণে পেয়েছে দুটো বোন। একটায় কথা পেটে রাখতে পারে না, আরেকজন বেরই করতে পারে না।
এমনিই এলাকায় আপুকে নিয়ে হাবিজাবি কথার শেষ নেই। শুধু মা আর খালিদ ভাইয়ের ভয়ে কেউ সেভাবে কিছু বলার সাহস পায় না। তবে পেছনে পেছনে ঠিক ফিসফাস করে।
তাই কোনরকম হেসেই বলল, -- জি, কমেছে।
অপূর্ব আর কিছু বলল না। গিয়ে সোফায় বসল। বসতেই দেয়ালে কয়েকটা ছবির ফ্রেমে চোখ পড়ল। না, মানুষের ছবি নয়। পেন্সিল আর হালকা রঙের ছোঁয়ায় আঁকা কতগুলো স্কেচ। একটাতে শুধু কালো রঙের একটা প্রজাপতি, আরেকটাতে কয়েকটা শিউলি ফুল, আরেকটাতে রঙ বেরঙের কয়েকটা বেলুন।
দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাঁচা হাতের। তবুও দেখতে ভালো লাগছে।
নাবিল আর দাঁড়াল না। মাকে ডাকতে গেল। যাওয়ার আগে একবার আসমানি খালার খোঁজ করল। তিনি এই আশেপাশের কোথাও নেই। রান্না বান্না কী করেছে, কে জানে!
রোকেয়ার শুনেই মেজাজ চড়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল। চান্দিতে ধোঁয়া উড়তে শুরু করল। সেটা তো কমই, মনে হলো গায়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। ভাগ্যিস এই আগুন চোখে দেখা যায় না। তা না হলে তাকে দেখা যেত চিতায় শোয়া, দাউদাউ করে জ্বলে যাওয়া মরা মানুষের মতো। যেই মানুষ নিজে জ্বলে, নিজে শেষ হয়। তবে তার এই আগুনে শুধু সে না, ঘরবাড়িও সব পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যেত।
অবশ্য সব সময় এই আগুন দেখা না গেলেও, তিনি হাবভাবে বুঝিয়ে দেন। এখন না, সেই ছোটবেলা থেকে। কালো মোটা এটায় নিশ্চয়ই তার হাত নেই। তবে ছোটবেলা থেকেই এই দায় যেন তার। নিজের বাড়িতে আদরের মেয়ে হওয়ার সুবাধে কখনো অনাদর হয়নি, তবে মেয়ের জন্য বাবা মায়ের চোখে মুখে দুশ্চিন্তা ঠিক দেখতে পেতো।
স্কুলে কত হাসি তামাশার খোরাক। এমনিতে সব ভালো, তবে উনিশ থেকে বিশ হলেই আর তো কিছু নেই। ব্যস, মোটা গাছের খাম্বা, কালির পাতিল, গাব গাছের মুতা, আযদাহা, আরো কত কী!
সয়ে যাওয়া তার ধাতে নেই। তাই হয়ে গেল মুখরা, ঝড়রাটে, দজ্জাল। না, এই নামগুলোতে তার আফসোস নেই। এই সব হয়েই কেউ আর তার উপরে আঙুল তুলতে পারে নি, কথা শোনাতে পারে নি। তবে বিয়ের পর অবিচার ঠিক হয়েছে।
তার শাশুড়ি তাকে নিজের ইচ্ছায় ছেলের বউ করে নিলেও, কখনও বড় বউয়ের মতো প্রিয় করে নেয়নি। বড় বউ ছিল তার চোখের মণি। ঈদ হোক, ছুটি হোক। দেশে গেলেই তাকে নিয়ে কত আদিখ্যেতা। অথচ সে গেলে, তার শাশুড়ি সত্তা জেগে উঠত। না, কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। তবে জ্ঞান দেওয়ার মতো করে বলত, -- শুনো বাবুর বউ, মেয়েদের মেজাজ ভালো না। মেজাজ হলো ছেলেদের গহনা। শুনো নাই? মেজাজে ছেলেরা বাদশা, মেয়েরা হয় বেইশ্যা। আমার বাবু ভোলা ভালা, তাই কিছু বলবে না। তবে দুনিয়া তো আর আলা ভোলা না। দেখনাই কেস খাইয়া খুটি হইয়া বইসা ছিলা। ওই তো হলো, আমার বাবুর জন্য রক্ষা।
তাই মেজাজ ঠান্ডা রাখবা, মুখে লাগাম রাখবা। মেয়েদের ওতো জবান থাকাও ভালো না। মেয়েদের বড় শত্রু হলো তার জবান। যেই মেয়ের জবান নাই, তার জীবনে অশান্তিও নাই।
ঠিক আছে, আল্লাহর রহমতে তোমার গতি হয়ে গেছে। তবে ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হইবো। আল্লাহ দিয়েছে একটা মাইয়া। সে তো তোমাকে দেখেই শিখবো। তাছাড়া মাইয়া বিয়ে দিতে গেলে বাপ মায়ের কীর্তি উঠে আসে। তাই এখন থেকেই সাবধানে থাকবা, বুঝেছো?
রোকেয়া সাবধান হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। শাশুড়ির মুখের উপরে কখনো বেয়াদবিও করেনি। তবে শাস্তি হিসেবে গ্রামে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। নিজেও যেত না, তার আদরের গেদা বাবুকেও যেতে দিত না। তাই অতি দরকার ছাড়া, তারা কেউ আর গ্রামে পা'ই রাখেনি।
তেমনি বড় জায়ের সাথেও তার কখনো সাক্ষ্যতা হয়নি। সে তার মতো থাকতো, বড় জা থাকতো তার মতো। তবুও অদৃশ্য একটা দণ্ড তাদের মাঝে ছিল। তাই যখন শুনেছে তাদের সংসার ভাঙছে, খুশিই হয়েছে। শাশুড়ি বেঁচে থাকলে ঠিক বলত, -- আমি তো ভালো না, তো আপনার এত ভালো বউয়ের ভালো ছেলের সংসার ভাঙল কেন?
তবে হয়তো তার উপরে আল্লাহর রহমত ছিল। এসব কীর্তি দেখার আগেই আল্লাহ প্রিয় হয়ে গেছেন। তবে সে তো আর আল্লাহর প্রিয় না। তাই তার সাজানো গোছানো জীবনে সেই গুণবতীর ছেলে অমাবস্যার রাত হিসেবে ঠিক হাজির হয়ে গেছে।
আর এই খবর শুনেই রোকেয়ার শরীর জ্বলে গেল। তবে সব সময় হাবভাবে বোঝালেও আজ তেমন কিছুই করল না। মেয়ের চিন্তায় এখন তার শরীর মন কিছুই ভালো যাচ্ছে না। তাছাড়া আগে সব বুঝতে হবে। যদি বাপের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে আসে ভালো, আর যদি গলায় গলায় মিলতে আসে, তো সোজা হিসাব। বাপ পুতে রাস্তা মাপো। এতদিন আদর যত্নে আগলে রেখেছি, এই তো কত?
তাই এগিয়ে ড্রয়িংরুমে গেল। গেলেও ভদ্রতার হাসিটুকুও মুখ দিয়ে বের হলো না। বরং কপাল কুঁচকে নির্বিকার চিত্তে কুশলাদি জিজ্ঞেস করল। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, -- যা, বড় ভাইয়েরে গেস্ট রুমে নিয়ে যা। ফ্রেশ ট্রেশ হোক। রাত তো কম হলো না। দেখি খাবার টাবার কী আছে। ও ভালো কথা! ভাবি ভালো আছে তো?
অপূর্ব হাসল। নানা জায়গায় ঘুরে, নানান মানুষের সঙ্গে মিশে। মানুষ চিনতে তার সময় লাগে না। আজও লাগল না। তাই হেসেই বলল, -- জি, চাচি, আল্লাহর রহমতে ভালো।
ঝরনার ঝিরিঝিরি পানি গায়ে পড়তেই নাবিলার শরীর কেঁপে উঠল। অক্টোবর মাস শেষের দিকে হলেও, এখনো শীতের কোনো আমেজ নেই। ভ্যাবসা গরম। আর এই গরমে বারো ঝামেলায় আজ আর গোসল করা হয়নি। তার মধ্যে অসুস্থ, ঘুম সব মিলিয়ে এখন ক্লান্তি শরীরে জেকে ধরে আছে।
তবে যতই ধরুক, এই ক্লান্তিতে দুটো চোখের পাতা আজ আর এক হবে না। সে জানে, ভালো করেই জানে। দুপুরে দিয়েছে লম্বা এক ঘুম। আজ রাত কেন, কালকে সারা দিনও চোখের কোণে ছিটেফোঁটা আসবে কি না সন্দেহ।
তাই নাবিলা সেই প্রস্তুতি নিয়েই মনে মনে বসে আছে। প্রথমে গোসল করে শরীর, মাথা ঝরঝরে। তারপর কড়া এক কাপ কফি, তার সাথে প্রিয় একটা বই। নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী, এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতেই পারে না। চুপচাপ নিজের মতো করে কখন যে নেশায় ডুবিয়ে ফেলবে, টেরই পাওয়া যাবে না।
তখনই দরজায় ধুম ধুম দুটো পড়ল। নাবিলা জানে এটা কে? তাই কোন শব্দ করল না। বরং ঝরনার নব ঘুড়িয়ে বাড়িয়ে দিল। আজকে সবাই ঘুমাবে কখন ?
নাবিলা বের হলো বেশ কিছুক্ষণ পর। ভ্যাবসা গরম, তবে ট্যাংকির পানি এত শীতল হলো কি করে, কে জানে! তার রীতিমতো কাঁপুনি উঠে গেছে। সেই কাঁপুনি নিয়ে বেরুতেই দেখল, আসমানি খালা ডিভানে আধশোয়া হয়ে আছে। ঘুমের দেবীর চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। নোভা খাটে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এখন আর গায়ে নাইট সুট নেই। বরং সুন্দর একটা টু'পিস, গলায় স্কার্ফ, মাথা গুছিয়ে পনিটেল। মুখে ময়েশ্চারাইজার, লিপবাম সবই ঘষা হয়ে গেছে।
এতরাতে এত আয়োজন কেন, তার মাথায় এলো না। তবে কিছুক্ষণ ঠিক তাকিয়ে রইল। তারপর তোয়ালে মোড়ানো ভেজা চুলগুলো খুলে দিতে দিতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে ঐ যে কাঁধ ছোঁয়া চুলের সিগ্ধ মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, সেই মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল না, তাকাল, ঐ যে শুকনো শরীরে লেগে থাকা ছোট্ট উদর, সেখানে। এক পলকে, এক ধ্যানে।
নোভা দেখল, দেখে বলল, -- তোমার কি পেটে ব্যথা?
নাবিলা উত্তর দিল না। তার উত্তর অবশ্য নোভা আশাও করে নি, বরং নিজের মতো বলল, -- বিরাট কাহিনী, আপু। আমরা নতুন একটা ভাই পেয়েছি। তাও যেন টেন টাইপের ভাই না। নায়ক, নায়ক ভাই। সে যে শুধু দেখতে নায়ক তা না, আসলেই নায়ক। তার ফেসবুক পেইজ, ইউটিউব চ্যানেলে মিলিয়ন ফলোয়ার।
নায়ক, মিলিয়ন, বিলিয়নে নাবিলার আগ্রহ দেখা গেল না। সে আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে কাবাট থেকে চাদর বের করে গায়ে জড়ালো। জড়াতেই নোভা হাল ছেড়ে বলল, -- আবার বলো না, তোমার জ্বর জ্বরও লাগছে। রোগদের সাথে তোমার কেমন বন্ধুত্ব, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। এক রাতে হাজার অসুখ।
নাবিলা এবারও কিছু বলল না। তার কফির দরকার। মাথা ঝরঝরের জন্য গোসল করেছে, এখন আরো ভারী হয়ে আছে। তবে বের হতে ইচ্ছে করছে না। ড্রয়িং রুমে আপাতত সবাই। বের হলেই কথা বলতে হবে। আর এখন সবচেয়ে যেটা বড় সমস্যা, তার কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও মুখ ফুটে বলল, -- খালা, একটু কফি লাগবে।
-- লাগলে গিয়া বানাও। নাইট ডিউটিতে আমি নাই। ঐ তো কাঁচা ঘুম ছুটে গেছে, তাই বসে আছি। পারলে আমার জন্যও এক কাপ নিয়ে আইসো। ঘুম আসুক আর না আসুক, রাত হোক দিন। তোমাদের রাজ কপাল, মন চাইলেই চিৎ হতে পারবা। আমি তো পারব না। তাই বিরক্ত করবা না।
নাবিলা বিরক্ত করল না। সে তোয়ালে হাতে বারান্দার দিকে গেল। যেতেই আসমানি খালা নোভার দিকে তাকিয়ে বলল, -- আমেরিকান পোলা বুঝছ নোভা? হাত ছাড়া করন যাইত না।
নোভা ফট করে উঠে বসল। বসে গোল গোল চোখে আসমানির দিকে তাকাল।
আসমানি দেখে আরো হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে বলল, -- নাবিলা, আম্মারে দেব না। সে ফেরেশতা মানুষ। তার জন্য লাগবে আরেক ফেরেশতা। তবে তোমার কথা ভাবা যেতে পারে।
নোভা রাগ নিয়ে বলল, -- এইটা তুমি কি বললা, খালা?
-- আমি কি বলছি, সেটা তো বড় কথা না। বড় কথা হলো, আমার সামনে এত নাদান সাইজো না, রাত বিয়ানে সাইজা বসে রইছো, অকারণে গড়াগড়ি খাচ্ছো। এই বয়স আমাদেরও গেছে।
নোভা মুখ ভোঁতা করল। আসমানি সেই ভোঁতা মুখ দেখে হেসে বলল, -- চালাই যাও। তয়, আমেরিকান পোলাগো চরিত্র ভালো থাকে না। বিয়ার আগেই হুয়া বহা সব শেষ। আর পোলা তো আগুনের গোলা। চরিত্রের আর কিছু নাই গো। ছিঁড়া ফালাফালা হয়ে গেছে।
-- না ও হতে পারে।
-- তোমাগো আবেগের বয়স, আবেগ দিয়ে ভাবতেই পারো। আমাগো তো আর না। আমরা দেখলেই বুঝি, বুঝছো। কোন পানি কতটুকু গভীর।
-- তো এই পানি দেখে কি বুঝলা?
-- এই পানি দফারফা পানি, ঘোলা পানি, মেনহলের পঁচা পানি।
-- তোমার মাথার পানি।
-- সময় হইলে, মিলাই নিও। আসমানি ফাও কথা কয় না।
-- নোভার ভোঁতা মুখ আরো ভোঁতা হলো। আহারে! কত ভাগ্য করে একটা কাজিন ব্রাদার পেলো। তাও সেকেন্ড হ্যান্ড। এই জীবনে ভালো কিছু আর তার জীবনে জুটবে না।
সেই ভোঁতা মুখ নিয়েই সে বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন আসমানিও হেলে দুলে বেরিয়ে গেল। তারপরই নাবিলা বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো । নিজেদের মন মতো করে করা বারান্দা। নিজের মতো সাজানো, ফুলের গাছ, বসার জায়গা সবই আছে। তাই সেখানেই চুপচাপ বসে এই দুই ছাগলের কথা শুনল। শুনে ইচ্ছে করেই আর রুমে আসেনি। এই দুজনের মাঝে থাকা মানে, ভেজা ফ্রাই হওয়া।
তাই গায়ের চাদরটা ঠিক করে টেনে বেরিয়ে এলো। তার মা ভোঁতা মুখে ওভেনে খাবার গরম করে টেবিলে রাখছে। নাবিলা দেখে মনে মনে হালকা হাসল। হেসে নিজেই এগিয়ে গেল। ভাত, ডাল, মুরগির মাংস। নাবিলা দেখে প্রেসার কুকারে ডাল সেদ্ধ দিল। অন্য চুলায় চারটা ডিম। ওভেনে আলু বেক করতে দিল।
সময় খুব একটা লাগল না। আর এই অল্প সময়েই, নাবিলা পেয়াজ, শুকনা মরিচ ডলে ডাল, ডিম, আলু চটকে ভর্তা করে ফেলল। সাথে টমেটো শসার সালাদ, লেবু। করে সুন্দরভাবে টেবিলে গুছিয়ে দিল। দিয়ে নিজের কফি নিয়ে চলে গেল।
রোকেয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবই দেখল। দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এই দুনিয়ায় যে যত ভালো, তার কপাল তত খারাপ। তার মেয়ে আর বাদ যাবে কেন?
তখনই নাবিল আর অপূর্ব টেবিলে এসে বসল। নাবিল, অপূর্ব দুজনেই সকাল থেকে না খাওয়া। এই ক্ষুধা পেট, আর অনেক দিন পর দেশীয় খাবার, গরম ভাত, গরম গরম ভর্তা নাবিলের কাছে যেমন তেমন, অপূর্বের কাছে অমৃতর মতো লাগল। তাই তৃপ্তি নিয়ে খেতে খেতে বলল, -- এই অসাধারণ খাবারের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, চাচি।
রোকেয়া না চাইতেও একটু হাসল। হেসে কিচেনের দিকে গেল। যেতেই নাবিল বলল, -- ধন্যবাদ আমার আপুর জন্য। এই বাড়িতে এত রাতে এত আয়োজন একজনই করে। আর খুব যত্ন করে।
অপূর্ব নাবিলের দিকে তাকাল। নাবিল হেসে বলল, -- অবাক হওয়ার মতো কিছু না। ভালো কথা, খাবারের পর দরজার সামনে থেকে ধুলোবালি মাখা জুতো তুলে নিবেন। আমার আপুর এলোমেলো, নোংরা জিনিস একদম পছন্দ না।
চলবে…..
আমার গ্রুপের লিংক আর প্রথম ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT