ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 11

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১১

নোভার গায়ে কালো কারুকাজের জামা। মুখে হালকা মেকআপ। চুলগুলো পিঠময় ছাড়া। রেপেল নেটের ওড়নাটা এক পাশে ছড়িয়ে, উঁচু জুতার গটগট শব্দে তুলে কিছুটা নেচে নেচে নিচে নেমে এলো।

অপূর্ব রেডি হয়ে বেরিয়েছে সবার আগে। জানা কথা, গায়ে কাপড় ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে এই বান্দা নেই। আজও নেই, ক্যাজুয়াল লুক। সাদা টি-শার্ট, উপরে হালকা ধূসর রঙের বুকখোলা শার্ট। মুড়িয়ে মাড়িয়ে কোনরকম গোটানো হাতা। এলোমেলো চুলগুলো কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পায়ে কেডস।

তবুও নোভার চোখে কী চমৎকার যে লাগে। আর সবচেয়ে যেটা ভালো লাগে, মেকি কোনো ঢং নেই। বাহির থেকে যে কেউ এলেই আলাদা এক ভাব থাকে। যা দেখে সবকিছুতেই বিরক্ত,তাচ্ছিল্যে। এমন ভাব স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। এখন দুনিয়া ভরা জার্মস আর জার্মস।

এই তো কিছুদিন আগে, তার এক বন্ধুর ভাই এলো। বিয়ে করবে। ঠিক হতেই, নোভাসহ সব বন্ধুকে ইনভাইট করল। ওমা, কি যে ভাব! উঠতে গেলে ভাব, বসতে গেলে ভাব, খেতে গেলে ভাব, কথার মধ্যে তো আরো হাজার খানেক ভাব।

তবে অপূর্ব ভাইয়ার মাঝে এমন কিছু নেই। সে সবকিছুতে স্বাভাবিক। যেন তাদের মতো এখানেই আছে, এখানেই বেড়ে উঠেছে। এই যে দুপুরে খাবার খেলো, কাটাওয়ালা মাছ যে খেতে পারে না, দেখেই বোঝা গেলো। তবে কোনো ভাব নেই, খাবো না, খেতে পারব না বলে ঢং নেই। বরং দু'হাত মেখে টেকে কি সুন্দর হেসে হেসে খেলো! তার সাথে কত মজার গল্প। এক ঝুড়ি গল্প সবসময় তার ঝুলিতে থাকে। মন্ত্রতন্ত্রের মতো বলতে থাকে। আর সবাই বিভোর হয়ে শোনে। নোভা তো খাওয়ার চেয়ে গল্পই শুনেছে, বেশি। সেই বেশি বেশি শুনতে শুনতে তার ঘোর লাগে।

সেই ঘোর লাগাকে আরো চার চাঁদ লাগিয়ে আজ বেরিয়েছে হাতে ক্যামেরা নিয়ে। সেই ক্যামেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলির দু'পাশের বাড়িগুলো ক্যামেরাবন্দী করার চেষ্টা করছে।

নোভা দেখেই খুশি মনেই এগিয়ে গেল। সেই খুশিতে টগবগ করতে করতেই বলল, -- ইশ, আপনি ক্যামেরা নেবেন? আগে জানলে শাড়ি পরতাম।

-- স্মৃতি কুড়াতে এসেছি, না কুড়ালে হয়?

-- আগে বললেই হতো।

-- কি হতো?

-- আরেকবার যখন বেরোবো, তখন শাড়ি পরব। অনেকগুলো ছবি তুলে দেবেন।

-- অবশ্যই। এই একটা কাজে আমি কখনোই বোর ফিল করি না।

-- হুম! তা আপনার পেইজে উঁকিঝুঁকি মারলেই বোঝা যায়।

-- তুমি আছো তাতে ?

-- আগে ছিলাম না। দুই দিন হলো আছি।

অপূর্ব হাসলো! হেসে ক্যামেরা গুটিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, -- ওয়েলকাম টু মাই অদার ওয়ার্ল্ড

-- থ্যাঙ্ক ইউ প্রিন্স চারমিং?
-- প্রিন্স?
-- হুম।
-- কেন?
-- তেমন কোন কারণ নেই। দেখতে শুনতে ভালো। তাই বললাম। তাছাড়া আপনিও তো বলেন। আমরা কিছু বলেছি?

-- উঁহুম! তবে কারো বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে কিছু বলতে নেই। তার সম্পর্কে বলতে হবে পার্সোনালিটি দেখে।

-- তো, আমাকে কি দেখে বলেন?

অপূর্ব উত্তর দিলো না। সে নোভার মুখ বরাবর ক্যামেরা রাখল। নোভা কিছু বলবে, তার আগেই পরপর কয়েকটা ক্লিক নিলো। নোভা মুখ গোঁজ করল। তার ছবি উঠে বান্দরনীর মতো। আর এগুলো তো কোন প্রস্তুতিই নেই। ধুর!

অপূর্ব নোভার মুখ দেখে হাসলো। হেসে বলল, -- আমরা, মানে আমি আর আমার দু'বন্ধু। একবার পাহাড়ি জঙ্গলে ক্যাম্পিংয়ে গিয়েছিলাম। নতুন নতুন ভিডিও দিতে হয়, তো এখানে সেখানে যাওয়া লেগেই থাকে। জায়গাটা এমন, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, আলো নেই, কেবল বন আর বন।

আমরা ছাড়াও আরো লোক ছিল। সেই লোকের মাঝে দু'তিন ট্রাভেলার দলও ছিল। তাদের মাঝে বেশ কয়েকজন মেয়েও ছিল, তার মধ্যে একজন দারুণ সুন্দরী। প্রথম দেখায় চোখ উপড়ে যাবে এমন। তো সব ছেলেদের সেন্টার অফ অ্যাট্রাকশন সেই মেয়ে হয়ে গেলো।

সবাই সেই মেয়েকেই নিয়ে মেতে আছে। তাকে নিয়ে কত গল্প, আড্ডা, কি লাগবে, না লাগবে হাজার ব্যস্ততা।

সেই ব্যস্তার মাঝেই রাতে ঝড় এল, সবাই যে যেমন পারছে দৌড়াচ্ছে, তাঁবু সামলাচ্ছে, খাবারের জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। তবে সেই সুন্দরী মেয়ে তখন নিজের মেকআপ বক্স বাঁচাতে ব্যস্ত। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ঢংয়ে এদিক ওদিক গলে পড়ছে। এমন অবস্থায়, তার দিকে কেউ আর মুগ্ধ হলো না, বরং হলো বিরক্ত। তবে সুন্দরী বলে কথা, বিরক্ত চাইলেই প্রকাশ করা যায় না।

তবে সেই বিরক্তির মাঝে তখনই সবার নজর পড়ল, এক সাদামাটা এক মেয়ের উপরে। পুরো ভিজে চুপচুপে, তবে নিজের দিকে খেয়াল নেই, অন্যদের টেন্ট ঠিক করতে সাহায্য করছে, খাবারের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে, কারো ব্যাগ, কারো খাবার শুকোচ্ছে, কারো ওষুধ এগিয়ে দিচ্ছে।

কয়েক মিনিটে মেয়েটা সবার মন জয় করে নিলো। ঝড়ের পর সবাই তাকে ঘিরে রইল। কেউ তার গায়ের রং দেখেনি, তার সাদামাটা সৌন্দর্য দেখেনি। দেখেছে মন। আর মনের সৌন্দর্যে জিনিসটা কি জানো? সেটা চোখে আড়াল হলেই মনের আড়াল হয় না। সেই যে প্রথম দেখার বিরাট সুন্দরী, তার কথা কেউ মনে রেখেছে বলে মনে হয় না, তবে সেই মেয়েটার কথা আমাদের প্রায়ই মনে পড়ে। যখনি আমরা কোথাও ঘুরতে যাই, ঝড় বৃষ্টি এসে হামলে পড়ে। তখনি ঐ যে মেয়েটা, মেয়েটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কি সুন্দর নিজের দিকে না তাকিয়ে, সবাইকে সাহায্য করেছিল।

দ্যাট’স কল রিয়াল বিউটি। যা শুধু চোখে না, পুরো হৃদয়ে গেঁথে যাবে। সো প্রিটি গার্ল, ইয়োর হার্ট ইজ বিউটিফুল, দ্যাট’স হোয়াই ইউ আর প্রিটি।

নোভা শুনে খিলখিল করে হাসলো! অপূর্ব সেই হাসিটা টুপ করে ক্যামেরা বন্দী করল। তারপর বলল, -- তবুও থ্যাঙ্কস ফর দ্যা কমপ্লিমেন্ট, প্রিটি গার্ল।

নোভা আবারো হাসলো। তার ভেতরে খুশির লাড্ডু ফুটছে। তার মানে ভাইয়ার কাছে লুকস ডোন্ট ম্যাটার। ইশ! নোভা তো শুধু শুধু নিজের গায়ে রঙ নিয়ে মরছিল। সে মনের ফোটা লাড্ডু নিয়েই, গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল। আজকে যেন রোদের বান ডেকেছে। চারিদিকে একেবারে ঝলমল করছে। আর এই ঝলমলের ভয়েই মেকআপ টেকাআপের ধারে কাছে অতো গেল টেলো না। করলে দেখা যেত, গাড়ি থেকে নামলেই পেত্নী হয়ে গেছে। তাই যেমন আছে, তেমনি ভালো।

অপূর্ব অবশ্য ভেতরে বসল না। বাবা, ছোট চাচা কেউই এখনো আসেনি? তাই গাড়িতে হেলান দিয়ে আবারো ক্যামেরায় চোখ করল। নোভা দেখে বলল, -- আপনার কিছু হারিয়েছে ভাইয়া?

অপূর্ব হাসলো। গলায় যে চেইন নেই, খেয়াল করেছে সকালে। ওযু করতে হাত, মুখে পানি দিতেই গলার কাছটা জ্বলেছে। জ্বালতেই দেখল চেইন নেই, সাথে গলায় কাছটায় হালকা কাটা। একটানে ছিঁড়েছে, এইটুকু না হলে হয়? অবশ্য তখন সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি ঘটল, কিছু খেয়াল করার সুযোগই হয়নি।

কাউকে অবশ্য কিছুই বলেনি। বলতে গেলে বিস্তারিত বলতে হতো। যেই ঘটনা এই মেয়ে ঝট করে ধুয়ে মুছে খেয়ে ফেলেছে, তার তো ধরে ধরে গিট্টু পেঁচিয়ে লাভ নেই ? তাই নিজে একটু উঁকিঝুঁকি দিয়েছিল। কোথায় পড়েছে কে জানে? চোখেও পড়েনি।

এই চেইনটা তার মায়ের দেওয়া। সে যখন আঠারোতে পা দিলো তখন। দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল,
“আমার দেওয়া মতো তো কিছু নেই। তাই ছোট্ট একটা উপহার। যখন থাকবোনা, সেই সময়ের জন্য স্মৃতি হিসেবে রেখো।”

অপূর্ব স্মৃতি হিসেবেই রেখেছে। কখনো নিজের থেকে আলাদা করেনি। তাই হেসেই বলল,-- হুম।

নোভা হাত মুঠো করে গাড়ির জানালার বাইরে রাখল। রেখে বলল,-- পাঁচটা প্রশ্ন করব। সঠিক উত্তর দিতে পারলে আপনার। না হলে এই মুঠো খুলবে না, আর এটা একেবারে আমার।

-- ওকে।
-- আপনার নাম?
-- আরভিন অপূর্ব।
-- আপনার মায়ের নাম?
-- আফসানা হক।
-- আপনার বাবার নাম?
-- আসাদুজ্জামান নাসির।
-- আপনার বোনের নাম?
-- অর্পি।
-- আপনার গার্লফ্রেন্ডের নাম?

অপূর্ব হো হো করে হেসে ফেলল। হেসে বলল, -- নাইস ট্রাই।

-- করতেই পারি, হবু ভাবি বলে কথা! এমনিতে তো আর বলবেন না।

-- তা ঠিক।

-- তাহলে বলুন, তা না হলে আমি মুঠো খুলব না।

-- আপাতত বলার মতো কেউ নেই। তবে এক্স আছে, সেটার নাম চললে, বলতে পারি।

নোভা হাসল। হেসে বলল,
-- কত নাম্বার এক্স?

-- সঠিক মনে নেই। তবে খুব একটা ভালো রেকর্ড নেই।

-- প্লে বয়।

-- ভালো বলে তো এসে, কোনো দাবি করিনি।

নোভা হাসলো! হেসে মুঠো খুলে এগিয়ে দিল। দিতে দিতে বলল, -- এমন ছিঁড়ে পড়ল কী করে?

অপূর্ব এবারো হাসল, তবে উত্তর দিল না। হাত বাড়িয়ে চেইনটা নিতে নিতে বলল, -- থ্যাঙ্কস এগেইন।

নোভা আর কিছু বলল না। বাবা, বড় চাচা এসেছে। নোভা জানালার পাশে বসবে, তাই চাপতেই তারা উঠে বসল। অপূর্ব বসল ড্রাইভারের পাশে। বসে জিজ্ঞেস করল,-- নাবিলা যাবে না?

-- আপা অতি দরকার ছাড়া কোথাও যায় না। তার জন্য তার রুমই পুরো দুনিয়া।

নোভা ভেবেছিল, অপূর্ব এক্ষুনি জিজ্ঞেস করবে, কেন। তবে অপূর্ব আর কিছুই জিজ্ঞেস করল না। বরং মোবাইলটা বের করে সেলফি ক্যামেরা অন করে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-- রেডি গাইস?

আসাদুজ্জামান হেসে ফেললেন। হাসল নাজিমও। নোভা দুই আঙুল তুলে মিষ্টি করে হাসল। হাসতেই চোখ পড়ল খালিদ ভাইয়ের দিকে। তিনি বাইকে। দাড়ি, গোঁফ, উড়িয়ে পুড়িয়ে বাইক টেনে যাচ্ছে। নোভা সাথে সাথেই হাত নাড়িয়ে ডেকে বলল, -- খালিদ ভাই।

খালিদ সাথে সাথেই ব্রেক কষল। নোভাদের গাড়ি আগেই দেখেছে। তাই সেই অবস্থায় ঠোঁট ছাড়িয়ে হেসে, গলে গিয়ে আসাদুজ্জামান, নাজিমকে সালাম দিলো। দিয়ে বলল,
-- কি খবর নোভা, কোথাও যাচ্ছো?

-- হুম, ঘুরতে।
-- কোথায়?
-- এই আশে পাশেই। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
-- একটু কাজে।
-- ওহ! আচ্ছা শুনুন। আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। কিছুদিন আছে এখানে। কোন বিপদ হয় বলা যায়? তাই চিনে রাখুন। বলেই অপূর্ব দিকে তাকিয়ে বলল,
-- ভাইয়া, উনি হচ্ছে খালিদ ভাই। আমাদের গলির সেলিব্রিটি। যে কোন প্রবলেম, ডাইরেক্ট সলভ।

অপূর্ব সাথে সাথে আবার বেরোলো। মানুষ না চিনলেও, এলাকায় পা রেখে এই নাম শুনেছে। শুনেছে আরও অনেক কিছুই। তাই বড় আমুদে স্বরে হাত বাড়িয়ে বলল,
-- হাই। আমি অপূর্ব।

খালিদের কাজ গলে যাওয়া, সে আরও গলে দু'হাত বাড়িয়ে, অপূর্বর হাত ঝাপটে ধরলো। ধরে বলল, -- পরিচয় হয়ে খুবই ভালো লাগলো। নাবিলের সাথে আসবেন আমাদের পার্টি অফিসে।

-- অবশ্যই। বাই দ্য ওয়ে, নাইস বাইক।

খালিদ হাসলো! হেসে বলল,
-- ধন্যবাদ। আজ আসি। আসবেন কখনো।
বলেই একপলক নোভার দিকে তাকালো। তাকিয়ে এক টান দিলো।

অপূর্ব সেই যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আর নোভা হেসে বলল,-- কি কপাল দেখুন তো। এক পাতানো ভাই দাড়ি মুছের গোডাউন, আরেক কাজিন ভাই ফকফকা ধলা মুলা। আর আসলটার কোন দিকই নাই।

অপূর্ব হো হো করে আবারো হাসলো। হেসে গাড়ির ভেতরে এলো। আসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল, তাদের দূর অজানায়। আর এই অজানায় নোভা মুগ্ধতা নিয়ে শুধু দেখেই গেলো। দেখল, কী সাবলীলভাবে নিউমার্কেটের ভিড় ঠেলে এটা ওটা কিনছে, টিএসির গরম চা, ডাল লুচি আরামছে খাচ্ছে। দেখল, দোয়েল চত্বরের শৌখিন দোকানগুলোর প্রতি অপার মুগ্ধতা। দেখল, হাতিরঝিলের সোডিয়াম আলোয় বাবা, চাচাকে নিয়ে কী সুন্দর বন্ধুর মতো হাত নেড়ে চেড়ে গল্পের আড্ডায় হারিয়ে যাওয়া।

......

নাবিলার গোছানো রুম আজ বড় এলোমেলো। পুরো ফ্লোর জুরে রঙ তুলি, ব্লাশ, পেনসিল সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পুরো রুম জুড়ে হালকা রঙের সুভাস। জানালা, বারান্দার দরজা হাট করে খোলা , তাই ক্লান্ত রাতের নরম কোমল মৃদু বাতাস মিশে আছে, সেই রঙের সুভাসে । সেই সুভাসে মাতোয়ারা হয়ে হাঁটু মুড়ে নাবিলা এক এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। চোখের সামনে, সাদা কাগজে একগুচ্ছ রঙ্গন। দেখে মনে হয়, এক্ষুনি যেন মৃদু বাতাসে দুলে উঠবে।

ঠিক তখনই কলিংবেল বাজল। নাবিলা চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকালো। ঘড়ির কাটা একটা ছুঁইছুঁই করছে। তবে ঠিক জানে, কে? তাই হাতের ব্রাশটা রেখে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দুপুরের রান্নার পর আর ঘর থেকে বের হয়নি। খাবারও খেয়েছে,রুমে। বের না হলেও জানে নোভারা ঘুরতে গেছে, আর এখনও ফেরেনি। তাই কলিং বাজতেই বুঝে গেল, কে হতে পারে।

তাই চুপচাপ এগিয়েই দরজা খুললো। খুলতেই ঠিক সামনে অপূর্বর মুখটা দেখল । মুখে সেই হাসি, হাতে এক গাদা শপিং ব্যাগ। তাকে দেখে সকালের মতোই বলে উঠল, -- হেই ফেই-টেইল গার্ল! স্যরি, রুপকথার জগৎ থেকে টেনে বের করার জন্য।

নাবিলা কিছু বলল না। সব সময়ের মতো চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে পেছনে উঁকি দিল। দেখল, নোভা জুতো হাতে ক্লান্ত চোখ মুখ নিয়ে হেলে দুলে আসছে। তার পেছনে বাবা আর বড় চাচা। তাদেরও যে হালুয়া টাইট, দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

নাবিল দেখে হাসল। এমন ঘুরতে গেলে উঁচু হিল পরতে নেই, ঝাকঝমক জামা পরতে নেই। হাঁটতে পরতে আরাম এমন জিনিস পরে যেতে হয়। তাহলে এত আর ক্লান্তি আসে না।

অপূর্ব সেই হাসির দিকে একপলক তাকিয়ে সোজা ভেতরে চলে গেলো। গিয়ে সব ব্যাগ সোফায় ফেলে, সেখানেই গা এলিয়ে দিলো।

নোভা অবশ্য এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। তার পা শেষ। তাছাড়া ঘুরতে ঘুরতে কখন সময় গেলো বুঝতেই পারেনি। এখন পুরো শরীর ঝিমিয়ে আসছে। নাজিম, আসাদুজ্জামান তারাও দাঁড়ালো না। আসাদুজ্জামান নিয়ম মেনে চলা মানুষ। নিয়মের বাইরে গিয়ে তার ঘন্টা বেজে গেছে। নাজিম অবশ্য তাদের মতো এতো ক্লান্ত হয়নি, তবুও শরীর বিছানা টানছে। তাই তারা সোজা চলে গেল নিজেদের রুমে।

নাবিলা তাদের অবস্থা দেখে আবারো হাসল। ড্রয়িংরুমে অপূর্ব বসা। তাকে পুরো অদেখা করে জুতো গুলো গুছালো। হালকা ধুলাবালি ছিল। সেগুলো ঝাড়ু দিল। দিয়ে রুমে যাবে। তখনই অপূর্বর গলা শোনা গেল, -- একটু ঠান্ডা কিছু হবে, নাবিলা?

নাবিলা সাথে সাথে চুপ করে মাথা নাড়ল। বিকেলে নাবিল আইসক্রিম এনেছিল। ফ্রিজ খুলে সুন্দর করে বাটিতে সাজিয়ে এনে রাখল অপূর্বের সামনে। রেখে ফিরতে যাবে, এমন সময় আবার অপূর্ব ডাকল। -- আসলে, কিছু মনে করো না নাবিলা। এখন আইসক্রিম খেলে ঠিক গরম ঠান্ডা লেগে যাবে। অন্য কিছু কি আছে? হালকা ঠান্ডা, জুস এমন টাইপ কিছু?

ঘরে জুস নেই। তবুও নাবিলা আবার কিচেন রুমে গেল। তারপর বড় চাচার জন্য যেমন ঠান্ডা শরবত বানায়, তেমনি লেবু চিপে হালকা ঠান্ডার মতো করে বানালো । বানিয়ে আবার সামনে রাখল।

রাখতেই অপূর্ব বলল, -- কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগছে। সারাদিন রোদে হাঁটা হাঁটি। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তোমার কাছে কোনো ঔষধ আছে?

নাবিলা দৃষ্টি শরবতের গ্লাসের দিকে। সেখানে রেখেই দু'পাশে মাথা নাড়ল। অপূর্ব সেই নিচু দৃষ্টির দিকে এক পলকে তাকিয়ে বলল, -- ওহ, কি যে করি! রাতে ঠিক ঘুম হবে না। তুমি যদি কিছু মনে না করো, এক কাপ কফি করে দিতে পারবে? প্লিজ!

নাবিলা কিছুক্ষণ চুপচাপ সেভাবেই রইল। তার মুখ শান্ত শীতল। চোখ তুলে একবার তাকালেই অপূর্বর ঠোঁট টেপা হাসিটা ঠিক দেখত। তবে চোখ তুলে তাকালো না, বরং আগের মতোই কিচেনে গেলো। কফি নিয়ে আসতেই দেখল, পুরো ড্রয়িংরুম ফাঁকা। অপূর্বের রুমের দরজা লক। তবে শরবতের গ্লাসের নিচে একটা কাগজ চেপে রাখা। নাবিলা তুলে হাতে নিলো। যেখানে লেখা, -- কাঠ পুড়ে কয়লা হয়, তবে কয়লা পুড়ে ছাই হয় না। কয়লা সব সময় কয়লাই থাকে। তাই মিস কয়লা, ইচ্ছে যখন হয়েছিল, গ্লাসটা মুখের উপরে ছুড়ে মারলেই হতো। এতো ভালো সেজে হবেটা কি?

চলবে.....

আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুকের লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন