#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১২
আজও নোভার ঘুম ভাঙল দেরিতে। দেরি করে ঘুমাবে, দেরি করে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের জীবনের একই একঘেয়ে ধরা বাঁধা নিয়ম এলোমেলো হচ্ছে। ঘুম আর এমন কী!
তাই উঠেই ঝটপট রেডি হয়ে নিলো। আজকে আর তাদের কোনো স্পেশাল প্ল্যান নেই। অপূর্ব ভাইয়াও বড় চাচার সাথে লেটকে আছে। তো, বাড়িতে বসে বসে ঝিমিয়ে আর লাভ কী! তাছাড়া মেজাজও খুব একটা ভালো নেই। কাল শেষ রাতে ভাইয়া একটা পোস্ট করেছে। সাধারণ পোস্ট, তাদের বাড়ির বারান্দা থেকে রাতের আকাশের ছবি। সাথে ক্যাপশন,
" দ্যা সেম স্কাই ইজ এভরি ওয়্যার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড, বাট ইট ফিলস ডিফারেন্ট ইন এভরি প্লেস।"
সাথে হ্যাশট্যাগসহ লেখা," লাভ ইউ, বাংলাদেশ। "
মিনিটে তার দুনিয়ায় ঝড় উঠেছে গেছে। তিনি বাংলাদেশে আছেন, অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া মনে হয় জানতো না। কালই প্রথম পোস্ট। কয়েক মিনিটেই হাজার খানেক কমেন্ট। তার ভক্ত তো বাংলাদেশেও কম না। সবাই কোথায় কোথায় বলে হেদিয়ে মরছে। বেশির ভাগই মেয়ে। তার মধ্যে আবার ভাইয়া তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে। করতেই নোভা পুরো আইডির পোস্টমর্টেম করে ফেলেছে। আসমানি খালাই ঠিক, এই মাল পুরো ছেড়াবেড়া। এই মেয়ের সাথে ছবি, ওই মেয়ের সাথে ছবি। আর কমেন্ট! আস্তাগফিরুল্লাহ!
অবশ্য এমন লুক, এমন ফেম নিয়ে ধোয়া তুলসিপাতা হয়ে কে'ই বা বসে থাকে ! নিজের জীবন নিজের মতো উপভোগ করছে। কপাল, সবই কপাল।
আর এদিকে তাকে দেখ! এই পর্যন্ত একটা প্রেম পর্যন্ত হলো না। রাত দিন কাটছে তার মায়ের আতঙ্ক নিয়ে। ধুর! বলেই নোভা বেরিয়ে এলো। মনের দুঃখে তার নাস্তা করতে ইচ্ছে করল না। সে হেলে দুলে নিচে নেমে এলো। আসতেই ঝটকা খেলো! তাদের সাত নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তার দলবল নিয়ে হাজির। বাড়ির সামনে বাইক আর বাইক।
নোভা দেখেই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। খালিদ সেই থতমত মুখ দেখে হাসলো। হেসে গলে গিয়ে বলল,
-- ভালো আছো নোভা ?
নোভা ওপর নিচে মাথা নাড়ল। আরে বাবা, কাহিনি কী! তার কাহিনি ভাবার আগেই সবাই গটগটিয়ে উপরে গেলো। তবে খালিদ ভাই তার সাথেই দাঁড়িয়ে রইল। নোভা দেখে বলল, -- সকাল সকাল কাহিনি কী?
-- তেমন কিছু না। আসলে ওই ছেলেদের পরিবারগুলো খুব করে চাচাকে ধরেছে। এখন কাউন্সিলর মানুষ, যদি না এগোয়। সবাই বলবে তার দল করেনি বলে বিপদে এগিয়ে আসেনি।
-- তো, দল না করলে কোন দরকার এগোনোর? তাছাড়া কেসের কারবার তো আপনিই করে দিয়েছেন?
-- তা দিয়েছি। তবে এই চাল ভিন্ন। এই যে সব আমরা করে, আমরাই এগিয়ে এলাম। এর পর থেকে সবাই ভাববে, চাচা জনগণের মানুষ। মনে প্যাচ ট্যাচ রাখে না। তাই কে জানে? তৃতীয়বারও জয়টা তার ঝুলিতে আসে।
-- বাবারে, পুরো ক্রিমিলান মাইন্ড।
-- উঁহুম! দল ভারী করার একেবারে সৎ উপায়। এই রাস্তায় এর চেয়ে সৎ উপায় আর নাই।
-- তা ঠিক! যা যা শুনি আপনার নামে। সেই হিসেবে এটা খুবই ডাল ভাত। তবে আপার সম্মান রইলটা কোথায়?
-- যে ছেঁচা খেয়েছে, বাকি জীবন তোমার আপা তো ভালোই, অন্য কিছুও করবে বলে মনে হয় না। সব সময় শাস্তি দেখিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই।
নোভা বুঝদারের মতো মাথা নাড়লো। নেড়ে বলল,
-- ভালো! নেতা মানুষ। এক ঢিলে সবাই দুই পাখি মারার তালে থাকে, আপনি মেরেছেন তিন চারটা। এদিকেও ঠিক, ওদিকেও ঠিক, আবার শাস্তিও ঠিক। তো বডি উপরে গেছে, ডানহাতা নিচে কেন?
খালিদ ইচ্ছে করেই উপরে যায়নি। যে বদ মহিলা, তাকে দেখে রাজি তো হবেই না, বরং লাভার মতো টগবগিয়ে উঠবে। তাই দূরেই ভালো।
নোভা আর দাঁড়ালো না। যা খুশি করুক। সে হেঁটে গলির মাথায় এগুলো। অফিস টাইম। এই সময়ে রিকশা খুব একটা পাওয়া যায় না। ধুর! আজকে সকালই তার জন্য কুফা। বাবা বাড়িতে, গাড়িও বাড়িতে। ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে বললেই এসে টুপ করে নামিয়ে দিয়ে আসত। এখন এই কাঠফাটা রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুঁটকি হও!
তখনই খালিদ বাইক এক টানে তার পাশে এনে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বলল, -- চলো, নামিয়ে দিয়ে আসি। রিকশা পাবে বলে তো মনে হয় না।
নোভা অবাক হলো না। এই গলা পার্টি যে আসবে, সে ভালো করেই জানে। তাদের বাড়ির যে কোনো সদস্য তার সামনে কষ্ট করবে, এ বুঝি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? তাই নিজের মতোই বলল, -- একটা কথা জিজ্ঞেস করি ?
-- করো।
- এই যে আমাদের বাড়ির যে কোনো সদস্যের জন্য আপনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে সার্ভিস দেন, এই রকম কি সবার জন্য করেন, না শুধু স্পেশাল আমাদের জন্য?
খালিদ হাসলো! হেসে বলল, -- দেরি হয়ে যাবে তোমার। সময় দেখেছো?
কথা সত্য! এমনিতেই দেরিতে উঠেছে, তার মধ্যে আবার নানান কাহিনি। নোভা বাইকে উঠে বসল। নাবিলের বাইকে বসতে বসতে বাইক তার জন্য ডালভাত। তাই বসেই বলল,-- তবে যাই করেন, আমাদের বাড়িতে আপনার ডাল গলছে না। আপার খবর জানি না, মায়ের চোখের বালি আপনি। আর আমাদের বাড়িতে মায়ের কথা, শেষ কথা। তাই অন্য রাস্তা টাস্তা মাপেন।
-- তোমার মায়ের শেষ হোক আর শুরু, কোনোটাই আমার কিছু না।
-- ওরে বাবা! তো, এত গলে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী?
-- ক্ষতি তো হচ্ছে না কোনো?
-- কোথায় ক্ষতি হলো না! আপনার জন্য আমার বোনের জীবন হেল হয়ে যাচ্ছে, বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে,আবার বলে ক্ষতি না!
খালিদ বাইক স্টার্ট দিলো, দিয়ে সব সময়ে মতো টান দিল না। বরং সুন্দর ধীর গতিতে এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে বলল,-- সব কিছুকে এক পাল্লায় মাপতে নেই, নোভা। দুনিয়ায় মানুষ রক্তের সম্পর্ক ছাড়া সব কিছুতেই আঙুল তোলে। এগুলো নতুন কিছু তো না। তবে এই দুনিয়ায় আঙুল তোলার বাইরেও অনেক সুন্দর সুন্দর সম্পর্ক আছে। সেগুলোর কোনো নাম হয় না।
নোভা হা হয়ে গেলো! বলে কী রে! সব তার মাথার ওপর দিয়ে গেলো। এমন কিছু নেই, তো তাদের এত আগলে রাখা কেন? আর সুন্দর সম্পর্ক? আপার সাথে পরিচয় সেই দিন পার্টি অফিসে প্রথম না ? নোভার মাথায় ধোঁয়া উড়ে গেল। আপা তো এলো মাত্র বছর চারেক, খালিদ ভাই তো অনেক দিন। তো?
নোভার হিসেব মেলে না। মেলে নারে, মেলে না। আপা ছিল নানু বাড়িতে। সেখানে খালিদ ভাইয়ের যাওয়ার চান্সই নেই। তো? আল্লাহ গো! মায়ের হাতের দেড় কেজির থাপ্পড় খেয়ে এই হিসেব নিকেশ সব ছেড়েই দিয়েছে। তবে আজ আবার নতুন করে মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো।
সেই ঘুরপাকের হা করা মুখটা মিররে দেখেই খালিদ হেসে ফেললো।
----
নাবিলা দরজা লাগিয়ে ছাদের দিকে এগোল। হাতে তার ভেজা কাপড় ভর্তি বালতি। সেই বালতি শক্ত করে হাতে চেপে এগুনোর মাঝেই বাড়ির ভাড়াটিয়াদের দু’জন মেয়ের সামনাসামনি হলো। তারা ছাদ থেকেই নামছে। দুজনের মুখেই লাজুক মিটিমিটি হাসি। সেই হাসি নিয়েই বলল, -- ভালো আছেন, আপু?
নাবিলা হেসে সাথে সাথে মাথা নাড়ল। নেড়ে তাদের লাজুক মুখের টিপাটিপি হাসির মাঝে যেতে দেখল। তবে এমন হাসির মানে তার বোধগম্য হলো না। সে অবশ্য ওতো মাথাও ঘামালো না। অল্প বয়সী মেয়ে, এই বয়সে কারণে অকারণে হাসবে, এটাই স্বাভাবিক।
তাই হাতের বালতি আগের মতোই চেপে উপরের দিকে এগুলো। খালা ওয়াশিং মেশিনে দিয়েছিল। ছাদে একটু নাড়বে, সে সুযোগ বেচারি আজকে আর পায়নি।
সকালে হাজার খানেক কাজ থাকে। এক হাতে করা চাট্টিখানি কথা না। সেই কাজের মাঝেই তাদের শান্ত বাড়িতে নতুন ঘটনা ঘটল। বড় চাচা তার আদরের ছেলেকে নিয়ে বাজারে গেছেন। এখন যেখানেই যান, বাপছেলে গলায় গলায়। সেই গলায় গলায় গিয়ে বিশাল এক বোয়াল মাছ নিয়ে হাজির। এনেছে সেটা ঘটনা না, ঘটনা হলো মাছ কেটে আনেনি। নিয়ে এসেছে আস্ত। সেই আস্ত মাছ নিয়েই আসমানি খালা হাপুস হপুস করছে। তার নিজের সাইজের বোয়াল। কাটা কি আর মুখের কথা?
তাই তিনি কাটতে কাটতেই ঘোষণা দিয়েছেন, আজকে আর তিনি কোনো কাজে নেই। মাছ কেটে সোজা গোসলে যাবে। গোসল থেকে এসে ঘাম, ঘামানির আর কোন কাজেই নেই।
মা হলেন মহা বিরক্ত। সেই বিরক্তির মাঝেই দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল। তাদের এলকার কাউন্সিলর এসে হাজির। তার দলবল তো ভালোই, যেই ছেলেদের নামে কেস করেছে, তাদের বাবা চাচাও নিয়ে হাজির। হাজির হওয়াটা সমস্যা না। কাউন্সিল ভালো করেই মাকে চেনে। ভয় ডর দেখিয়ে একে গলানো যাবে না। তাই খালিদ ভাইয়ের মতো অতি গলে গিয়ে বলল, -- আপা, বড়ই বড় মুখ করে এসেছি। খালিদের পরিচিত মানুষজন আপনারা। খালিদের পরিচিত মানে আমার আত্মীয়র সমান। তাই কাউন্সিল আমি, সম্মান করে আমাকে ধরেছে। এখন আপনি আমার হাতটা রাখবেন।
খালিদ ভাই ভেতরে আসেনি। নাবিলা তখন বারান্দায়, নোভাকে বাইক নিয়ে যেতে দেখল। সেও ভালো করেই জানে, তাকে দেখলেই মায়ের মেজাজ চড়বে তো চড়বে। তাই এসে ভুল করেনি। তবে তার চাচা সেই একই ভুল করে ফেলেছে। আর ফেলেছে বলেই, মায়ের মেজাজ সপ্তম আকাশে উঠতে সময় লাগল না। সে চড়ে বিরক্ত মুখে বলল, -- খালিদের পরিচিত মানে? কোন জনমের পরিচিত? ও এই এলাকায় আগে এসেছে, না আমি?
কাউন্সিল ধুরন্ধর লোক। সে যে ভুল পথে এগিয়েছে, বুঝতে সময় লাগল না। তাই চট করে কথা ঘুরিয়ে বলল, -- আচ্ছা, বাদ দিন আপা। কাজের কথায় আসি।
-- কাজের কথা মানে, কিসের কাজের কথা? আমার মেয়েকে রাস্তার নোংরা কথা, ছেলেকে পেটানো। এগুলো আপনার চোখে পড়ে না?
-- পড়েছে, আপা। শাস্তি তো পেয়েছেই। আর কত? তাছাড়া এই মানুষগুলোর দিকে দেখেন। তাদের তো আর দোষ নেই। পোলাপান মানুষ, ভুল করে ফেলেছে। তবে আমি কথা দিচ্ছি, ছাড়া পেয়ে নাবিলা মার পা ধরে ঘন্টাখানেক বসে থাকবে। দরকার পড়লে দু-চারটা চর থাপড়ও আপনি নিজের হাতে দেবেন। তবে কেসটা তুলে নেন। সবাই তো আমাদের সন্তানতুল্য, তাই না?
মা এত সহজে গলে যাওয়ার পাত্রী না। তবে বাবা, বড় চাচা সামলে নিলেন। এক এলাকায় বাস করে এতো আড়াআড়ির মানে হয় না। তাই রোকেয়াকে চা নাস্তার কথা বলে সেখান থেকে উঠালেন। এখানে থাকলে ভেজাল কমবে না, বরং বাড়বে।
মা নাস্তার ধারের কাছেও যায়নি। তবে সে গেছে। এতগুলো মানুষ বাড়িতে খালি মুখে বসে থাকবে, নাবিলা বুঝি মানতে পারবে? তাই গিয়ে সুন্দর করে চা নাস্তা সব টি-টেবিলে রেখেছে। কাউন্সিল তাকে দেখে হেসে বলল, -- ভালো আছো, মা?
নাবিলা হেসে মাথা নাড়লো। নেড়ে সবাইকে হাতে হাতে নিজেই চা নাস্তা এগিয়ে দিলো। দেয়ার পর আর রুমের দিকে যায়নি। বালতি ভরা কাপড়গুলো নিয়ে বেরিয়ে এলো।
ছাদে সে এলো বলতে গেলে অনেকটা দিন পরে। নিজেদের ছাদ, যখন তখন আসা গেলেও, তার আসা হয় না। একেবারেই যে আসেনা, তা না। তবে খুবই কম। শেষবার এসেছিল নাবিল, নোভার জন্মদিনে। তাদের বন্ধুবান্ধব মিলে ছাদে বারবিকিউ করেছিল। সব কিছু বলতে গেলে সে'ই। তাই ছাদে থাকা হযেছিল অনেকটা সময়।
আর এলো আজ। তাই এসেই ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে মাথায় কাপড় টানলো। সকালের নরম রোদ এখন নেই। তেজি রূপ নিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে আছে। সেই রূপই নাবিলার চোখে, মুখে কাঁটার মতো বিঁধে গেলো।
সারা রাত দুচোখের পাতা এক করেনি। না, ঘুম আসেনি এমন না, প্রতিদিনের মতো শেষ রাতে ঠিক চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে। তবে তখন হাতে ছিল বই, সেই বইতেই ধ্যান জ্ঞান সব হারিয়ে বসে ছিল।
কিছু বই এমন হয়, শেষ না করে ওঠা যায় না। নাবিলার গত রাতের অবস্থাও ঠিক তেমনই ছিল। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজ। শেষ না করে উঠলে কি তৃপ্তি হয়? পড়তে পড়তে সময় কোথা থেকে কোথায় চলে গেল, টেরই পায়নি। যখন টের পেল, তখন আকাশের রঙ বদলে গেছে, সকালের হইচই, রিকশার টুংটাং, সবজির ওয়ালার হাকডক শুরু হয়ে গেছে।
তাই আর ঘুমাতেই যায়নি। তবে সকাল থেকেই মাথা ঠিক ঝিমঝিম করছে। সেই ঝিমঝিমের মাথা নিয়ে ছাদে আসতেই দেখল অপূর্ব ছাদে দাঁড়িয়ে। ফোনে কথা বলছে।
নাবিলার ধারণাই ছিল না অপূর্ব এখানে। ভেবেছিল, বাজার টাজার করে হয়ত রুমেই। আর তখনি মেয়েদুটোর মিটিমিটি হাসির মানে বুঝল। এমন সুদর্শন পুরুষ দেখে টিনএজের বয়সে মুগ্ধতা কাজ না করলে হয়?
সে মনে মনে হেসেই, এগিয়ে গেলো। নিজের মতো করে জামাগুলো ঝুলিয়ে দিতে লাগলো। ঠিক তখনই সেই কণ্ঠ ভেসে এলো, -- হেই ফেরি টেল গার্ল, গুড মর্নিং।
নাবিলা তাকালো না, তবে হালকা হেসে মাথা নাড়ল। সেই নাড়াও কোনো রকম। অপূর্ব সবই দেখল। রাতের করা কাজ যে এখনো হজম হয়নি, ঠিক বুঝল। তাই ফোন কেটে এগিয়ে এলো। এসে তার মতোই বলল, -- কোনো সাহায্য লাগবে, নাবিলা?
নাবিলা শান্ত গলায় সোজা বলল,-- না।
-- সব সময় না, কেন?
নাবিলা উত্তর দিল না। অপূর্ব পাশের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি এক জায়গায়। ঐ যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস। সেই ভাবেই দেখতে লাগল।
নাবিলার তেমন ভাবান্তর হলো না। তার জায়গায় অন্য কোন মেয়ে হলে অস্বত্বি অনুভব করত। কাজ এলোমেলো হতো। তবে নাবিলা খুব সুন্দর করে, কাপড় নিংড়ে দড়িতে ঝুলিয়ে দিল একটানে। টেনে বালতি নিয়ে ফিরে যাবে তখনই অপূর্ব ডাকল,-- নাবিলা!
নাবিলা ফিরে তাকালো। তবে অপূর্বর দিকে না, পাশের রেলিংয়ের দিকে। সেই রেলিংয়ের নিচু চোখের দিকে অপূর্ব তাকিয়ে বলল, -- আমার কোনো কিছু কি, তোমার সমস্যা কারণ হচ্ছে?
-- না।
অপূর্ব ঠোঁট টিপে হাসলো। যেন জানতো, এই না বাবাজিই আসবে। তাই হেসেই বলল, -- ভালো! তাহলে তো আর সমস্যা'ই নেই। আমি আরো কত কিছু ভাবলাম। কাল রাতের জন্য স্যরি হ্যাঁ।
নাবিলা কি বলবে ভেবে পেলো না। তবে অপূর্ব নিজের মতো বলল,-- সমস্যা যেতেতু নেই, দু-মিনিট তো গল্প করাই যায়। কী বলো?
নাবিলা মাথা নাড়ল। অপূর্ব দেখে বলল, -- শুনেছি এই পৃথিবীতে নাকি সাতজন মানুষ একরকম দেখতে হয়। আর কেউ কেউ তো প্রায় হুবহু মিলে যায়। তুমি হয়ত জানো না, আমি অনেকটা দেখতে আমার মায়ের মতো। বিশ্বাস না হলে এই যে দেখো। বলেই মোবাইল বাড়িয়ে দিল।
নাবিলা হাতের বালতিটা রেখে এগিয়ে গেল। একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে মোবাইলটা হাতে নিল। বড় চাচিকে তারা দেখেনি। তখন সে ছোট। ছবিও নেই। তবে শুনেছিল, অনেক নাকি সুন্দর ছিল।
মোবাইলটা হাতে নিতেই হাতটা একটু কাপল। মোবাইলে মা ছেলের হাস্যজ্বল ছবি। একটা না, অনেক। অপূর্ব কোন একটা ছবি চুজ করে দেয়নি। দিয়েছে পুরো ফোল্ডার। নাবিলা নিজেই কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ছবিতে ক্লিক করল। আর করতেই সর্বপ্রথম চোখ পড়ল অপূর্বর চোখে। মা ছেলের একই চোখ, তবে তাকানোর ভঙিমা আলাদা। আর আলাদা বলেই নাবিলার হাত কাঁপতে লাগলো। সেই কাঁপা কাঁপা হাতেই আস্তে আস্তে একেরপর এক দেখতে লাগলো।
নাবিলা দেখল ছবি। তবে আরেকজন দেখল, এই যে রোদে নেয়ে ঘেমে সাদা ওড়নার আড়ালে রক্তজবার মতো ছোট্ট লাল মুখ। যেই মুখের নাকে ডগা, কপালের চারপাশে মুক্ত দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম। যেই ঘামগুলোকে রোদটাও যেন আলতো পরশে নরম হয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
সেই ছুঁয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আরো আয়েশ করে রেলিং হেলান দিতে দিতে বলল,-- একবার বন্ধুরা মিলে ভুটানের এক পাহাড়ি গ্রামে গিয়েছিলাম। কি অপরূপ সুন্দর, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক কফি শপে গেলাম। গিয়েই থমকে গেলাম।
নাবিলা মোবাইল থেকে প্রথমবার নিজে থেকে অপূর্বের দিকে চোখ তুলে তাকালো। তাকাতেই খেয়াল করল, আজকে আর বুকটা ধক করে উঠছে না। বরং তার চোখে মুখে কৌতূহল।
অপূর্বর মুখ অবশ্য স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই বলল, -- এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? কফির দাম দেখে থমকে গেছি। কফিটো তো না, যেন কফি পাউডারের সাথে গোল্ড পাউডারও মিশিয়ে দিচ্ছে।
নাবিলা শান্ত চোখে তাকালো। অপূর্ব আগের মতোই ঠোঁট টিপে হাসল। সেই হাসি নাবিলা রাতে না দেখলেও এখন ঠিক দেখল। দেখল বলেই বুঝল, -- অসম্ভব ফাজিল এই ছেলে।
তাই সাথে সাথে আঙুল, সব ছবির ডিলেট অপশনে নিল। নিয়ে কিছুক্ষণ থমকে সেভাবেই রইল। তারপর আগের মতোই আস্তে করে আঙুলটা সরিয়ে নিল।
নাবিলা অবশ্য জানে না, তার সব কিছু এই যে সামনে দাঁড়ানো নির্বিকার চিত্তে ফাজিল ছেলেটা, সবই খেয়াল করল।
চলবে…..
আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT