#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৩
কাজী পাড়ার একেবারে সম্মুখে এসে নোভা জ্যামে পড়ল। যেন তেন জ্যাম না। গোলক ধাঁধার মতো জ্যাম। তিন রাস্তার মোড়, তিন সাইড থেকে একেবারে আটকে বেড়াছেড়া লেগে গেলো।
ভর দুপুরে এমন জায়গায়, এমন জটিল জ্যাম পড়ার কথা না। জটিল কেন, কোন জ্যামই পড়ার কথা না। তবে একেবারে গলির মাথায় আড়াআড়ি করে এক বিশাল ট্রাক আটকে গেছে। এখন না সামনে এগোতে পারছে, না পেছনে যেতে পারছে। তার আগে পিছে আটকে আছে রিকশা, অটো, সিএনজি। সেই আটকে পড়া রিকশা, অটোর মতো নোভাও ঝুলে গেছে।
এমন অলি গলিতে এমন বড় মাপের ট্রাক চলাচল করে না। হয়ত কোন বাড়ির কাজ চলছে। আর বিল্ডিংয়ের কাজের জন্যই ইট, রড, টাইলস সব বিভিন্ন জিনিস এমন ট্রাকেই আসে। আর যখন আসে, এমন কোন না কোন গিট্টু ঠিক লাগে।
আর এমন কাঠ ফাটা রোদে, এমন গিট্টুতে পড়ার কি যে যন্ত্রণার, যে পড়ে সেইই বুঝে। নোভাও হারে হারে বুঝতে পারছে। গরমে নেমে ঘেমে একাকার সে। ঘাম টপটপিয়ে পড়ছে। তার সাথে পড়ছে বিরক্তির আগুন। ভাগ্যিস এই আগুন দেখা যায় না। তা না হলে, যে জ্যামের শহর ঢাকা, মানুষের বিরক্তের আগুনে শহর ঠিক জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যেত।
নোভা ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে আলতো করে মুখটা মুছল। ঘষে ঘষে মোছা যাবে না। এমনিতেই যে ঢঙের মুখ, ঘুরতে টুরছে যাচ্ছে, এখন মুখ নষ্ট মানে জীবন নষ্ট। তাই খুব যত্ন নিয়ে আলতো পরশে মুছল। মুছে টিস্যু ফেলার জন্য পাশে তাকাতেই চমকাল।
এক চায়ের দোকানে, অপূর্ব ভাইয়া বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ, চমুক দিচ্ছে আর হেসে হেসে গল্প করছে। একটা মানুষ যে কত সুন্দর করে গল্প বলতে পারে, এই মানুষটাকে না দেখলে বুঝতেই পারত না। অবশ্য আসমানি খালা বলে, সবই বয়সের দোষ। এই বয়সে পিরিতের কাককেও নাকি কোকিল মনে হয়। আর একবার কোকিল মনে হলে, তার উঠা বসা, খাওয়া - দাওয়া, হাগা মুতা সবই সুন্দর।
নোভার অবশ্য এমন মনে হয় না। যেই মানুষ সুন্দর তাকে তো সুন্দর লাগবেই। এখানে বয়সের কি কাজ? তাই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। ফর্সা মুখ গরমে নেয়ে ঘেমে একেবারে লাল হয়ে আছে। ইশ, নোভার তো দেখেই আলতো করে মুছতে দিতে ইচ্ছে করল।
তবে ইচ্ছে হলেই সব করা যায়? এই যে দিন রাত তার ভাইয়া আশে পাশে থাকতে ইচ্ছে করে। এখন চাইলেই পারা যাবে? যাবে না। তবে ভাগ্য যখন ফ্রিতে ফ্রিতে সুযোগ করে দিয়েছে, হাত ছাড়া করবে কেন? তাই ভাড়া মিটিয়ে ঝটপট নেমে এগিয়ে গেল।
অপূর্ব নোভাকে দেখেই হাসল। ছাদ থেকে নেমে আর ভেতরে যায়নি। বাবার সাথে আশপাশ ঘুরেছে, সেই হিসেবে কিছুটা পরিচিত হয়ে গেছে। তাই হেঁটে আশপাশ নিজের মতো ঘুরে এই দোকানে এসে বসল। বাবার পরিচিত, সেই হিসেবে এখন সে ও পরিচিত। তাই হেসেই বলল, -- ছুটি?
-- হুম।
-- বসো।
নোভা এমন চায়ের দোকানে জীবনেও বসবে না। তাছাড়া মা যদি জানে, বাকি জীবন এই দোকানেই খাম্বা দিয়ে দেবে।
অপূর্ব হয়ত নোভার হাবভাব বুঝল। বুঝে আগের মতোই হাসল। হেসে বাকি চা টুকু এক চুমুক শেষ করে টাকা এগিয়ে দিল। তারপর লম্বা এক সালাম দিয়ে বিদায় জানাল।
নোভা দেখে বলল,-- বাবারে, পুরো নম্র ভদ্র ছেলে?
-- সন্দেহ আছে ?
-- হুম, দেখেছি আমি।
-- কি?
-- থ্যাঙ্ক ইউ বেবি, থ্যাঙ্ক ইউ সুইটহার্ট।
অপূর্ব হো হো করে হেসে উঠল। হেসে বলল, -- বড় ভাইদের দুনিয়ায় উঁকিঝুঁকি মারা ইটস ব্যাড ম্যানার্স।
-- বড় ভাইয়ের একটু সভ্য টভ্য হওয়াও উচিত। ছোটরা দেখে শিখবে কি?
-- ট্রু! যাও। ভালো হয়ে গেলাম। এর পর আর কোন লেফট রাইট নেই। সোজা বেবি সুইটহার্ট তোমাদের সিস্টার ইন ল কেই বলব।
নোভা খিলখিল করে হাসলো। হেসে বলল, -- বিয়ের প্ল্যানও বুঝি হয়ে গেছে?
-- ইয়েস! এবার ফিরলেই মা একেবারে বউয়ের আঁচলে বেঁধে দেবে। বয়স তো কম না। এই যে দেখো দুই একটা চুলও পেকেছে আমার।
নোভা দেখল না। জোর করে একটু হাসলো। হেসে এগিয়ে গেলো।
অপূর্ব সেই হাসি দেখল। দেখে দু'হাত পকেটে পুরে, সেও ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে বলল, -- ক্যানারি পাখি চেনো?
নোভা দুপাশে মাথা নাড়ল। অপূর্ব দেখে বলল,
-- কিছুটা লাভ-বার্ডের মতো। দেখতে ব্রাইট ইয়েলো। চোখদুটো ভীষন উজ্জ্বল। একবার দেখলেই ভালো লেগে যায় এমন। আমারো দেখেই ভালো লেগে গেলো। সেই ভালোলাগা থেকেই, বেশকয়েকটা কিনে একেবারে বাড়ি নিয়ে এলাম।
তবে ভালোলাগা আর ভালোবাসার মধ্যে বিশাল এক তফাৎ আছে জানো? এতটাই বিশাল আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে বোঝা এত সহজ হয় না।
আমি ভালোবাসি ঘুরতে, এই ঘোরার মাঝে অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তবে সেই কষ্ট আমার কষ্ট মনে হয় না। এটা আমি ইনজয় করি। তবে ঐ যে ভালোলাগা। এই পাখি ছিল আমার সাময়িক ভালোলাগা, মুগ্ধতা। তাই সামান্য যত্ন করে নিয়ম মতো খাওয়াবো, পানি দেবো, একটুখানি যত্ন নেবো। সামান্য এই কাজগুলোতেই আমি দু'দিনেই ফুল টায়ার্ড। পুরোপুরি হাল ছাড়লাম। ছেড়ে তাড়াতাড়ি যেখান থেকে এনেছি, সেখানেই দিয়ে দিলাম।
মানুষ ভাললাগা আর ভালোবাসা এই শব্দ দুটির মধ্যে ডিফারেন্স টা ধরতে পারে না। আর পারে না বলেই বড় বড় ভুল করে বসে। করে বলেই ব্রেকআপ, ডিভোর্সের মতো বিষয়গুলো আজকাল খুব বেশি। সব ক্ষেত্রে কিন্তু এমন সুযোগ থাকে না। সব ক্ষেত্রে চাইলেই ঝট করে ফিরে আসা বা, ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই আগে নিজেকে চেনো, দুনিয়া চেনো, মানুষ চেনো। তারপর বাকি সব কিছু।
নোভা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। অপূর্ব কেন এই গল্প বলল, তার বোধগম্য হলো না। হওয়ার কথাও নয়। মুগ্ধতা একবার কাজ করা শুরু করলে, তখন চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে বধির, মুখ থাকলেও বোবা। তাই মুখ গোঁজ করেই বলল, -- মোরাল কি?
-- সেটা তুমি বের করো?
-- কেন?
-- মনে করো এটা তোমার জীবনের ট্রেজার।
-- যদি না পারি?
-- সমস্যা নেই, আমি খুঁজে দেব। বিগ ব্রাদার বলে কথা।
নোভার গোঁজা মুখ এবার ভোঁতা হলো। ভোঁতা মুখেই এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে গল্পটা আবার মনে করার চেষ্টা করল। সে না বুঝলেও, তার আপা ঠিক বুঝবে। ব্যস, ভাইয়ার মতো গুছিয়ে বলতে পারলেই হলো। কি যেন ছিল?
......
নাবিলা ঘুমঘুম চোখে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকালো। গতরাতে তো ছিটেফোঁটাও ঘুমায়নি। তাই মাথায় ছিল ঝিমঝিম, তারমধ্যে সকাল থেকে এটা ওটা দৌড়ের উপর। অথচ তাদের জীবন ছিল ধরা বাঁধা ছকের উপর। সব এমন এলোমেলো হচ্ছে কেন? এই যে, যে মানুষ দিনে অতি দরকার ছাড়া রুম থেকে বেরই হয় না, সেই মানুষ সারাদিনে রুমে আর ঢুকতেই পারছে না।
তাই দুপুরের রান্নার পরে ঢুকেছে যে ঢুকেছে । আর বেরই হয়নি। ঠিক করেছে আজ আর বেরই হবে না। সেই নিয়তে খাবারও খেয়েছে ঘরে। খেয়ে টেঁয়ে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছে। সেই দেয়ায় কখন চোখ লেগেছে, বুঝতেই পারেনি। সেই ঘুম ছুটল এখন, তাও দরজার টুকটাক শব্দে।
তার রুমের দরজা সবসময়ই খোলা থাকে। সেটা দিন হোক বা রাত। যখন যার মন চায় আসে যায়। একমাত্র নাবিলই দরজার টোকা দিয়ে আসে। শুধু টোকা না, মাঝে মাঝে সেখান থেকেই শুধু উঁকি দেবে।
এই উঁকি দেওয়ার অভ্যাস শুধু এখনের না, সেই ছোটবেলা থেকে। নানুবাড়িতে যখন ছিল, প্রথমে তো থাকত নানুর সাথে, পরে খুব অল্প বয়সে নিজের আলাদা একটা দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছিল। কোনো দুঃখে না, বরং জেদে। সেই জেদের দুনিয়ায় ছিল, তার মনের রঙে রঙানো। এই যে এই রুম, এই রুমের চেয়েও ছিল অনেক অনেক সুন্দর, গোছানো। প্রতিটি দেয়ালের কোণায় ছিল তার হাতের আলপনার ছোঁয়া। মন মাতানো শৌখিন জিনিসে ভরপুর।
সেই দুনিয়ায় এই বাড়ির কারো যাওয়ার অনুমতি ছিল না। বাবা মায়ের তো আরো না। যাওয়া তো ভালো, তাদের সাথে কথাই বলত না। না, ঐ বাড়িতে তারা গেলে কখনও এগিয়ে সামনে পড়ত। পড়ার আগেই দরজাটা খিল এটে বসে থাকত।
সেই বসার সময়েই নাবিল জানালার পর্দা সরিয়ে এভাবে উঁকি দিত। চোখে মুখে ভয়, সেই ভয় মাখা মুখেই উঁকি দিয়ে দেখত তাদের রাগী, জেদি, ঘাড়ত্যাড়া বড় আপুকে। যে আপা কোনোদিন আদর তো ভালো, ডেকে কথাই বলেনি।
নোভা অবশ্য ভিন্ন। সে সোজা গিয়ে পটাপট দরজায় কয়েকটা লাথি ঘুষি মেরে দিতো, তারপর চেঁচিয়ে বলত,
-- দরকার নেই আমাদের কোনো বড় আপাকে। তুমি দরজা দিয়েই বসে থাক।
নাবিলা মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেলল। দুনিয়াতে সবচেয়ে আজব জিনিস হলো রক্ত। এই রক্ত হাজার ঘৃণা থাক, হাজার রাগ থাক, হাজার মনোমালিন্য থাক, অদৃশ্য এক মায়াজাল ঠিক বুনে রাখে। তাই তো কষ্টে যখন কেউ পড়বে, আরেকজনের ভেতর ঠিক টাটিয়ে জানিয়ে দেবে, একই সুতোয় বাঁধা তোমরা।
তাইতো এদের ভেতরেও ঠিক জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আপা আদর না করুক, কথা না বলুক, পাগল টাগল যেমনি থাকুক, শুধু ভালো থাকুক।
নাবিলা নিজের তেলে ভেজানো খোলা চুলগুলো মুঠোয় পুরে পেঁচিয়ে হাত খোঁপা করতে করতে বলল, -- নাবিল, ভেতরে আয়।
নাবিল হেসেই ভেতরে এলো। মুখের দাগ কমেছে, কাটা জায়গা শুকিয়েছে। সেই শুকনো কাটা মুখের হাসি নিয়ে বলল, -- যদি আয়োজন করতে চাও, এক্ষুনি করতে হবে, আপা। অলরেডি সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। কী কী লাগে, অন্তত লিস্টটা তো লাগবে, নাকি?
নাবিলা কথার মানে বুঝল না। বাবা, মা, বড় চাচা বিকেলে থানায় গেছেন। কেস তুলে ফেলবেন। এখনো ফেরেননি। তো এরা আবার কী করবে? তাই না বোঝার মুখ করেই বলল, -- কিসের আয়োজন? তোরা কোথাও যাবি?
নাবিল আকাশ থেকে পড়ার মুখ করে বলল, -- আমরা যাবো মানে! আমরা কোথায় যাবো? তুমিই তো ভাইয়াকে বারবিকিউয়ের কথা বলেছো।
-- কিসের?
-- ছাদে, বারবিকিউ।
-- কখন?
-- কখন মানে! দুপুরে ছাদে নাকি কথা হয়েছে তোমাদের।
নাবিলা কী বলবে ভেবে পেল না। এমন কোনো কথা তার সাথে হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। বিকেলে কথা ঐ পর্যন্তই। তারপর যার মোবাইল, তাকে আস্তে করে হস্তান্তর করে চলে এসেছে। তো এই বারবিকিউ কোথা থেকে এলো? তাই বিস্ময় নিয়ে আবার বলল, -- আমি?
নাবিল নাবিলার রিয়্যাকশন দেখে অবাক হলো। আসলে প্রথমে শুনে তার নিজের প্রতিক্রিয়াও এমনই ছিল। কিছুক্ষণ আগে সে ভাইয়ার রুমে গিয়েছিল, তাদের নেক্সট প্ল্যান কী সেটা জানতে। তখন ভাইয়া জানালো, আপা নাকি রাতে বারবিকিউর কথা বলেছে। সবাই যদি রাজি থাকে, তাহলে আয়োজন করবে।
নাবিল শুনে টাসকি খেয়েছে। তার আপা সেধে এমন কিছু বলবে, তাও ভাইয়াকে? বিশ্বাস হয়নি! তবে তখন ভাইয়াই আবার বলল, -- তুমি সেই দিন রাতে তোমাদের জন্মদিনের কথা শেয়ার করেছিলে। নাবিলার সাথে সেই কথাই হলো। তখন বলল, '‘ইচ্ছে হলে আবার আয়োজন করা যায়।’' এখন তোমাদের যা ইচ্ছা।
আপা মাদার তেরেসা টাইপ মেয়ে। নিজের বেলা কিছু নেই, কিন্তু অন্যের বেলা সবকিছুতেই আগে। তাই ভাইয়া হয়তো এমনিই বলেছে। আপা গলে গেছে।
আর তাদের এমন বিষয়ে অনিচ্ছা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাদের বাড়ি হচ্ছে বারো মাসের মরা বাড়ি। অতি দরকার ছাড়া কখনও কোনো আয়োজন নেই। জন্মদিনের অনুষ্ঠানও আপাকে ধরে করেছিল। তা না হলে তার মা তো তার কোনো বন্ধু-বান্ধবকে দেখা তো দূরের, বাড়ির ত্রিসীমানায়ও ঘেষতে দেয় না। তাই একমাত্র আপাই যদি আয়োজন করে, মা টু-শব্দও করবে না।
তাই তখনই নেচে আপার কাছে আসছিল, আসমানি খালা আটকে নির্বিকারভাবে বলল, -- নাবিলা, আম্মা ঘুমাইছে। খবরদার, এখন কেউ বিরক্ত করবা না। ঘুম পুরা হতে দাও। নিজেরা তো হাত পা ছড়িয়ে রাতভর পড়ে পড়েই ঘুমাইবা, এই মাইয়াডা কি আর দু’চোখ এক করবো?
আসমানি খালার কথা সত্য। তাই তখন আর আসেনি। তবে এখন না এলেই না। ফারায়, স্টেইনলেস গ্রিল কোনো সমস্যা নেই, তার বন্ধুর সব আছে। শুধু এনে ছাদে গুছিয়ে ফেলবে। তবে সমস্যা হলো, মাংস আনতে হবে, কাটা বাছা, তারপর এক-দেড় ঘণ্টা মেরিনেট না করলে ঠিক জমে না। তাছাড়া মাছের বাজারও একবার টুপ করে ঘুরে নিতে হবে। যদি কোরাল, রুপচাঁদা কিছু পায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
তাই বাধ্য হয়ে দরজায় টুকটাক করল। আর এখন আপার এই রিয়্যাকশন! সব আশায় না, পানি পড়ে যায়।
নাবিলা ভাইয়ের মুখটা দেখল। দেখে মনে মনে একটু হাসল। সব পাগলের কারখানা তাদের বাড়িতে। আবার এসে জুটেছে নতুন একজন।
তাই হেসেই ওড়নার কোণা নিয়ে কপালের এপাশ ওপাশ মুছল। তার মাথায় ঝপঝপে তেল, কপালের এপাশ ওপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। না, এমন এক হাতা তেল সে কোনদিনও দেয়নি, এটা আসমানি খালার কাজ। দিনে সে ঘুমায় না, খারাপ লাগলে বা অসুস্থ থাকলেই শোয়। তাই শুলেই ঘুমের মাঝখানে এক হাতা তেল চান্দিতে ঘষে দিয়ে যাবে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
নাবিলা সেই বেড়ে ছেয়ে পড়া কপালের তেল ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, -- ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম তো, ভুলে গেছি। যা, কাগজ কলম নিয়ে আয়। আমি লিস্ট করে দিচ্ছি।
নাবিল হাঁফ ছাড়লো। ছেড়ে এগিয়ে নাবিলার পাশে বসে বলল, -- আমার কিছু বন্ধুদের বলি, আপা? মার ভয়ে তো কখনও বলা হয় না। তারা ভাইয়ার সাথে পরিচয় হতে চাইছে।
নাবিলা হাসল। হেসে ভাইয়ের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে বলল, -- বল, আমি মাকে সামলে নেবো।
নাবিল খুশি হয়ে গেল। সেই খুশির আমেজ নিয়েই বলল,
-- আরে বাহ, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!
নাবিলার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে আর কথাও বাড়ালো না। আয়োজন করতে চাইলে করুক, ভালো কথা। এমনি বললেই হয়ে যেত। তবে তাকে এমন টেনে হিঁচড়ে জড়ানো কেন, সেটাই তার মাথায় এলো না।
রোকেয়া বাড়ি ফিরেই আয়োজন দেখল। নাবিলের বন্ধু-বান্ধবদেরও দেখল। তারা অতি উৎসাহে ছাদে সব কিছুর আয়োজন করছে। নাবিলের বন্ধু দেখে নোভাও তার দুই বান্ধবীকে ডেকে ফেলেছে। তারা অতি উৎসাহে পুরো বাড়ি ঘুরছে, দেখছে। তিন বান্ধবী মিলে কারণে অকারণে হা-হা-হি-হি করছে।
আসমানিকেও দেখল, সে অবশ্য কোনো কিছুতেই নেই। তার মুখের একজবান। আজ সে কোনো কিছুতেই নেই। যা হবার হোক, আগুনে ঝলসে মাংস হোক আর কয়লা হোক। সে টিভি রেখে উঠছে না। অবশ্য এই বাড়িতে টিভি বেঁচেই আছে তার বদৌলতে, তা না হলে এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে টিভি দেখে কে?
নাজিম ফিরেনি, দোকানে গেছে। আসাদুজ্জামান এখন ছেলের সব কিছুতেই হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাই দেখে বরং খুশিই হলো। তাছাড়া ছেলে ফিরেছে পর থেকে, মায়ের অত্যাচার নেই। ঘুম ভালো হচ্ছে, “ও হাবু, ও হাবু” বলে মাথার পেকা নাড়ছে না। তাই তিনিও নিজের মতো ছেলের সাথে মিশে গেলেন।
আর তাদের সব কিছুর মাঝখানে নাবিলা তার তেলচিটে মাথা নিয়ে এক হাতে সব কিছু আয়োজন করছে। রোকেয়া সবই দেখল। অন্য সময় হলে এতক্ষণে এক দুুইটা ধমক ঠিক পড়ে যেত। তবে আজ তেমন ভাবান্তর হলো না, কিছু বললও না।
বরং সবার চোখের আড়ালে নাবিলার রুমে গেল। বেড টেবিলের উপরে মোবাইল রাখা। সেটা আস্তে করে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। গিয়ে অফ করে আলমারিতে তুলে রাখল।
কালকে তার বড় ভাবি সেই ছেলের বাড়ির মানুষদের নিয়ে আসবে। এখন সে কাউকে কিছুই বলবে না। এমনকি নাবিলার বাবাকেও না। এমন ভাব হঠাৎ এসেছে। আর এই হঠাৎকে সে স্থায়ী করবে।
কেন জানি তার মনে হচ্ছে, ফাঁক তার ঘরের ভেতরে। তবে কে, সেটা বুঝতে পারছে না। ঘুরেফিরে সন্দেহ একজনের ওপরেই আসছে। তাই দেখা যাক।
নাবিলার রুমে মোবাইল নেই, নাবিলা বুঝল কিছুক্ষণ পরেই। রুমে আসতেই দেখল। এদিক ওদিক খুঁজল, তারপর হাল ছেড়ে দিল। হাতে দুনিয়া কাজ। পরে দেখা যাবে।
তাই চুপচাপ আবার কিচেনে চলে এলো। বাড়িতে মেহমান, এই অবস্থায় মোবাইল কেন? দুনিয়া হারিয়ে গেলেও নাবিলা টু-শব্দ করবে না। ভাইবোনের বন্ধুরা এসেছে, টু-শব্দ মানেই তাদের অপমান।
তখনি অপূর্ব উঁকি দিল। দিয়ে বলল,
-- হেল্প লাগবে, নাবিলা?
সব সময়ের মতো নাবিলার সোজা উত্তর, - না।
-- কেন?
-- এমনিই।
-- তাহলে আমাকে হেল্প করো।
-- কি?
-- এক কাপ কফি, সাথে হালকা নাস্তা। আসলে যে লিস্ট দিয়েছো। করতে করতে খুদা লেগে গেছে। তাছাড়া আজ এমন আয়োজন না করলেও হতো।
নাবিলা আর উত্তর দিল না। তার ইচ্ছে করছে, এই যে তার হাতে মেরিনেট করা মাংস। এই মাংস এই ফাজিল ছেলের মুখ বারাবর মারতে। তবে সেই রকম কিছুই করল না। বরং বড় একটা শ্বাস ফেলল। তাকে এমন জ্বলানোর কারণ সে বুঝতে পারছে না। অথচ, বাকি সবার সাথে সব ঠিক।
চলবে.....
আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুকের লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT