#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#বোনাস_পর্ব
সময়টা মধ্যদুপুর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো শীত চারদিক জড়িয়ে রাখলেও, দিনের এই মধ্যভাগে রোদের স্পর্শে শীতটা যেন একটু নরম হয়ে আসে। আর এই নরম, কোমল আলোতে রোকেয়া চাদরটা জড়িয়ে বারান্দায় বসেছিল একটু গা ভাসাতে।
তবে তার আর সেই ভাগ্য কই? দুনিয়ার প্যাড়া নিয়েই কূল পায় না, আবার রোদে গা ভাসানো? তাই আজও চোখের সামনে শীতের মধ্যদুপুরের প্রকৃতির মন মাতানো রূপ তার চোখেও পড়ল না। বরং চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে কিছুটা স্তব্ধ হয়ে বারান্দায় বসে আছে। হাতে মোবাইল। সেখানে ভেসে আছে ছোট একটা মেসেজ, যেখানে লেখা --
"নাবিল, আমার বিয়ে। জোর করে বিয়ে। কাজিন, লেখাপড়ার জন্য বাইরে যাবে। এখন কাবিনটা করে রাখবে, বাকি সব পরে। আমি অন্য কারো সঙ্গে এই কাবিন টাবিন করতে পারব না। ঠিকানা দিচ্ছি। আমাকে এসে নিয়ে যাও। আজই আসবে। তা না হলে আমি ফ্যানের মধ্যে ঝুলে যাবো।”
জানা কথা, মোবাইলটা নাবিলের। চার্জে ছিল। কালকের এত এত কাজের পর আজ বলতে গেলে কেউ'ই এখনো রুম ছাড়েনি। রোকেয়াও বেরোল এই তো কিছুক্ষণ আগে। বেরিয়ে বসে চায়ের কাপ হাতে নেওয়ার আগেই আসমানি এসে হাজির। হাতে মোবাইল গুঁজে দিয়ে বলল, “ আপনের পোলার হুঁশ নাই। কোথাকার কোন বুড়ি! কল দিতাছে তো দিতাছে।”
রোকেয়া মাথা ঘামাল না। সন্দেহজনক কোনো নাম হলে ভাবা যেত। আজকাল ছেলে মেয়েরা বন্ধুবান্ধবের নামই এমন আজব গজব ভাবে সেভ করে রাখে। নোভার মোবাইলে একদিন দেখলো ববকাট ডাইনী নামের কেউ অনবরত কল দিচ্ছে।
তাছাড়া আগে ফুসুর-ফাসুর করলেও এখন আর তেমন কিছু চোখে পড়ে না। কাজ-টাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর তার তিন ছেলে-মেয়েই বিটলা শয়তান। কানের কাছে মোবাইল বাজবে, তা তারা শুনবে না। এমন আবার হয়? দরকার নেই, তাই মাথাব্যথাও নেই।
রোকেয়া এসেছে আবার গ্রামের বাড়ি। এই সময় প্রতি বছরই বড় ভাই দোয়ার আয়োজন করা শুরু করেছেন।করুক, রোকেয়া আজকাল কোন কিছু নিয়েই তেমন ভাবে মাথা ঘামায় না। ইচ্ছে হলে আসেন, না হলে নেই।
তবে এবার সবাই এলো, সে আর বাকি থাকবে কেন? তাই আয়োজনে কাজ তো কম ছিল না। অবশ্য যেখানে খালিদ আছে, সেখানে কাজ নিয়ে তাদের চিন্তা করতে হয় না। এখানেও হয়নি। দশ দিক এই ছেলে একাই সামাল দিতে পারে। আর যেখানে খালিদ, সেখানে তার ছেলে থাকবে না, তা হয় নাকি?
আগেই ছিল গলায় গলায় ভাব। আর এখন তো বোনের জামাই। তবে শালা দুলাভাইয়ের কোনো হাবভাব এদের মাঝে নেই। সব আগের মতোই। গলায় গলায় ভাই ভাই। সানাউল্লার ডান হাত যদি খালিদ হয়, তবে খালিদের ডান হাত নাবিল। দিনরাত একসঙ্গে কাঠালের আঠার মতো লেগে কানাকানি করতেই থাকে।
সেই কাজী অফিসে বিয়ের পর রোকেয়া নোভাকে আর দেয়নি। তার এক কথা ছিল, তার মেয়ে স্বামীর বাড়ি যাবে সম্মানের সঙ্গে। এমন লুকোচুরির বিয়ে আবার কি?
খালিদ আগেই ছিল ঢঙের জাহাজ, আর এখন তো শাশুড়ি। শাশুড়ির ওপর আর কথা চলে নাকি? তাই কোনো টালবাহানা না করে সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতি দিয়েছে। এলাকায় ফিরেই চাচাকে পাঠিয়েছে। দিন তারিখ ঠিক করে সব আয়োজনে লেগে গেছে। যেন তেন আয়োজন না। পুরো এলাকা হেলিয়ে-দুলিয়ে দেওয়ার মতো আয়োজন।
আগের দিনে বিয়ে হতো মোটমাট তিন দিন। একদিন গায়ে হলুদ, একদিন বিয়ে, আরেকদিন ফিরনি। আর এই বিয়েতে একদিন রঙখেলা, একদিন মেহেদি, একদিন হলুদ, তার ওপর আরও কত কী! রোকেয়া এসবের নামই জীবনে শোনেনি। পুরো সপ্তাহ ধরে এই বিয়ের আমেজ চলেছে, তো চলছে। খালিদের ছেলে পেলেরাও বিয়েতে কমতি হতে দেবে ভালো কথা, পুরো চার চাঁদ লাগিয়ে দিয়েছে।
এলাকায় তাদের নামডাক থাকলেও, বলতে গেলে ভালো সম্পর্ক খুব কম মানুষের সাথেই আছে। রোকেয়া এমনিতেই খুব একটা কারও সঙ্গে মেশে টেশে না। তার স্বভাব কেমন, সেটা সবারই জানা।
তবে খালিদের বদৌলতে সবাই নিজ ইচ্ছেতেই সামিল হয়েছে। আর এই সামিল হওয়াতেই রোকেয়া একটা জিনিস খেয়াল করেছে। এতদিন ভেবেছিল, খালিদের চাচা আর খালিদের ছেলে পেলের ভয়ে সবাই খালিদকে সমীহ করে। আসলে ব্যাপারটা ভিন্ন। দুনিয়ায় সবাই তো এক রকম না, তবে যারা এই বিয়েটাতে সামিল হয়েছে, তারা মন থেকেই এই ছেলেটাকে পছন্দ করে। বলতে গেলে খুব পছন্দ করে।
খালিদকে করলেও, তাকে তো আর করে না। তাই একেকজন হাসিমুখেই টিপুনি কেটে বলছে, “সোনার টুকরো জামাই পাইছো, রোকেয়া। আঁচল দিয়ে বাইন্ধা রাইখো।”
মেয়ের বিয়ে না হলে, উচিত জবাব তিনি দিতেন। সাথে সাথেই দিতেন। হজম জিনিস রোকেয়ার মধ্যে নেই। তবে টিপুনি হলেও কথা সত্য। সোনার টুকরো যে, সেটা তিনি কিছুদিনের মধ্যেই টের পেয়েছেন।
তার মেয়ে তো মেয়ে না, অর্কমা। মুখ যে স্পিডে চলে, শরীর তার এক আনাও চলে না। তার মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কাজকারবার করে। তিনি নিজেই মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না, গাল-টাল ফাটিয়ে দেন। সেখানে পরের ছেলে এত সহ্য করবে? দূর থেকে পছন্দ আর এক ছাদের নিচে বসবাসের অনেক তফাত আছে।
আসমানি তো টেনশনে শেষ। আগে পিছে কেউ নেই। একা একা এই মেয়ে সংসার সামাল দেবে কেমনে?
তবে তার মেয়েকে কোন সংসার সামাল দিতে হয়নি। বরং এই মেয়েটাকে সুন্দরভাবে এই ছেলেটা সামলে নিয়েছে। কোনো অভিযোগ নেই, রাগ নেই, দোষ নেই। বরং তার পাগল ছোট মেয়ে আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনি আছে। উঠতে-বসতে এই ছেলেকে জ্বালিয়ে ভাজা ভাজা করছে।
বাড়ি তো দূরে না, আসমানি সকাল বিকাল হেঁটে হেঁটেই চলে যায়। এটা সেটা গুছিয়ে শিখিয়ে দিয়ে আসে। এসে কপাল চাপড়ে বলে, “খালি এই পোলা বইলা, অন্য জায়গায় মেয়ে দিলে নাক আর নাক থাকত না।”
কথা সত্য। তিনি তো অন্ধ না। তার মেয়ের সামান্য কষ্টেও এই ছেলের মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। এদিকে মেয়ে কাজ কামের ধারের কাছেও নেই। একদিন রান্না করলে তিন দিন সে আরাম করে, সপ্তাহ ভরে পার্লারে দৌড়াতে থাকে। তাই মেয়েকে দিলেন একদিন এক ধমক।
জামাইয়ের আহ্লাদী সে, রোকেয়ার ধমকে আজকাল আর কি হয়। তবে গাল ফুলিয়ে ঠিক ঘোষণা দিল, বাপের বাড়ি সে, জীবনেও আর পা মাড়াবে না। বিয়ে দিয়ে সব পর করে দিয়েছে। তার জামা'ই ভালো।
রোকেয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। স্বভাবে বাপের ডুপ্লিকেট এই মেয়ে। তার বাপ ফাঁকিবাজ, মেয়ে হইছে ডাবল ফাঁকিবাজ। তবে এই ফাঁকিবাজ মেয়েটার ফাঁকিবাজই যেন, এই ছেলেটার পছন্দ। তার মেয়ের সব পাগলামিতে সবাই বিরক্ত হলেও, এই ছেলেটার কাছে সব সময় প্রশ্রয়, মুখে থাকে হাসি। আর এই হাসিটাই বলে দেয়, সে কতটা সুখী।
তাইতো যে ছেলে আগে চোখের বিষ ছিল, এখন বলতে গেলে রোকেয়ার ভরসার জায়গা। তাই বড় ভাই যখন তার ছেলের জন্য নাবিলার হাত চাইল, রোকেয়া কিছুক্ষণ কিছু বলতেই পারেনি। কেমন করে পারবে? এও কি সম্ভব? তাছাড়া অপূর্ব শুধু বড় ভাইয়ের ছেলে না, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আফসানা ভাবি।
সেই সঙ্কা দূর করল খালিদ। সব কিছু সুন্দর করে বুঝিয়ে বলল। একসময় হয়তো কোনো সম্পর্ক ছিল। তবে সেই রকম মধুর জায়ে জায়ে সম্পর্ক কখনও হয়নি। তবুও অনেক দিন পর খালিদ নিজে ফোন করে হাতে ধরিয়ে দিলো।
বহু দিন পর সেই মানুষটার সাথে কথা হলো। আছেন আগের মতোই। রোকেয়া বয়সে ছোট, তবুও রোকেয়ার কাছে আফসানা ভাবিকেই যেন বয়সে ছোট মনে হলো।
তবুও রোকেয়ার সঙ্কা কাটে না। খালিদ ভরসা মাখা কণ্ঠে বলল,
-- নাবিলার এগোনো উচিত, চাচি। অপূর্বর চেয়ে নাবিলার জন্য আর কেউ ভালো হবে না। সে তো নাবিলাকে চায়নি, চেয়েছে নাবিলার দুঃখগুলোকে। আর যে মানুষ বিনা দ্বিধায় কারো দুঃখকে নিজের মনে জায়গা দিতে পারে, তার চেয়ে ভালো আর কে হবে?
রোকেয়া উত্তর দিতে পারেনি। অপূর্ব ভালো, নিঃসন্দেহে ভালো। তবে দুজনের দুনিয়া ভিন্ন। কখনও যদি সামনে গিয়ে বদলে যায়। অপূর্বের তো কিছুই অভাব নেই, ভবিষ্যতেও হবে না। তবে তার মেয়ের আছে কি? কত কত কষ্টের পর একটু স্বাভাবিক হয়েছে।
খালিদ তখন আফসানা ভাবির লেখা নাবিলার চিঠিটা তার হাতে গুঁজে বলল,
-- যদি অপূর্ব না হয়। বিশ্বাস করুন চাচি, নাবিলার জীবনে আর কেউ কখনও হবে না। কোন দিনও না। হয় অপূর্ব, তো কেউ না।
-- নাবিলাও অপূর্বকে পছন্দ করে?
-- আমি জানি না, চাচি। কিছু কিছু সম্পর্ক পছন্দ, প্রেম, ভালোবাসা এই সবের মধ্যে হয় না। তবে এটুকু জানি। আপনার অনুমতি ছাড়া ছোট বোনের পাশে দাঁড়ালেও, নিজের বেলা এবার কিন্তু কিছুই করবে না। আপনি কি অপূর্ব নামের অপূর্ব ছেলেটির জন্য একটু কিছু করবেন? প্লিজ চাচি।
রোকেয়া লোভী, সব সময়ই লোভী। সন্তানের সুখের জন্য সে আরও লোভী। তার লোভী মন আবার চাইল, এই দুখী মেয়েটার সত্যি একটা সুখের সংসার হোক, সুখ দুঃখের একজন চিরসঙ্গী হোক। তাই মেয়ের কাছে গেলেন। না, কোন রাগ না, জেদ না। শান্তভাবে শুধু বললেন,
“দুনিয়াতে খুব কম মানুষ আছে, সব হারিয়ে আবার দ্বিতীয়বার সুযোগ পায়। আর সেই সুযোগ এলে, এতো ভাবতে হয় না মা।”
নাবিলা কি ভেবেছে, রোকেয়া জানে না। তবে একদিন নোভা নাচতে নাচতে এসে বলল,
“তোমার বড় মেয়ে উড়াল দিয়েছে। বিয়ের প্রস্তুতি নাও।”
যেই মেয়ের বিয়ের চিন্তায় তার কলিজা চেপে থাকত, সেই মেয়ের বিয়ে হলো, রাজপুত্রের মতো ছেলের সঙ্গে। বিয়ে হয়েছে দেশের বাইরে। তার ভাবিরা ছবি দেখে একেক পর এক ফোন দিয়ে বললেন,
“রোকেয়া, তোর জামাই ভাগ্য ভালো রে। একটা পেয়েছিস সোনার টুকরা। আরেটা হিরের টুকরা। ঐ যে দেখ। যেই মেয়ের জন্য তোর চিন্তার শেষ নেই, সেই মেয়ের দিকে কিভাবে এক পলকে তাকিয়ে আছে। যেন পলক ফেললেই তোর মেয়ে গায়েব।”
রোকেয়া তখন সুখের হাসি হেসেছে। হেসে সাথে সাথে বলেছে, “মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ।” তার এই মেয়ের সুখে আর কারো নজর না লাগুক।
মেয়ের সুখে না লাগলেও, তার নিজের সুখে মনে হয় লেগে গেছে। তাই সাথে সাথে সবাইকে দু'মিনিটের মাথায় হাজির হতে বললেন।
দু'মিনিটের মাঝে সবাই হাজির হলেও, তার দুই মেয়ে নেই। রোকেয়া মাথা ঘামালেন না। এরা থাকলেও যা, না থাকলেও তা। তবে খালিদের দিকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলেন। শুধু রোকেয়া না, নাজিম আসাদুজ্জামানও। তবে আসমানি, নাবিল স্বাভাবিক। আসমানি এত সহজে খাবি খায় না, আর নাবিল তার চোখে মুখে কাঁচা ঘুমের রেশ।
খালিদের চোখে মুখেও ঘুমের রেশ। দেখে মনে হচ্ছে, ঘুম থেকে কেউ টেনে তুলে এনেছে। হতেই পারে, দোয়ার কারণে বেচারার উপর দিয়ে ঝড় গেছে। বলতে গেলে গত দু'রাত পুরোই নির্ঘুম। তবে এমন মোটা, ভারী কম্বল পেঁচিয়ে উঠে আসার কারণ রোকেয়ার মাথায় এলো না।
খালিদ এমন না। তো? এই বাড়িতেই কোন সমস্যা আছে কি না, কে জানে? এমন ঘুরে বেড়ায় অপূর্ব। তার একটা পাতলা কম্বল ছিল, সেটা অপূর্বর দখলে। কিভাবে গেছে, তিনি জানেন না। তবে যক্ষের ধনের মতো এই কম্বল সে আগলে রাখে। সেটা গায়ে দিয়ে এভাবে পুরো বাড়ি ঘুরে।
তাই নিজেকে সামলে, নাবিলকে মেসেজ দেখিয়ে বলল, -- এইসব কি?
নাবিল উত্তর দিল না। মুখ ভোঁতা করে বসে রইল। কিন্তু ঘুমের রেশ যে ফুরুৎ করে উড়েছে, রোকেয়া ঠিক বুঝল। আর বুঝল বলেই তার মেজাজের পারদ বাড়তে শুরু করল।
খালিদ শাশুড়ির অগ্নি রুপ ফিরে আসার আগেই হাই তুলে বলল,
-- নাবিলের এক মেয়ের সাথে ফোনে কিছুদিনের আলাপ ছিল। কেমন আলাপ, সেটাতো বুঝতেই পারছেন, চাচি।
-- তো?
-- মেয়েটা নিজেই সব কাট করে দিয়েছিল।
-- কেন?
-- মেয়েটা মিথ্যা বলেছিল। সে বিবাহিত। একটা বাচ্চাও আছে। বয়সেও নাকি বড়। ফাজলামি হিসেবে কথা বলেছে।
রোকেয়া হা হয়ে গেল। বলে কি? সেই হা হয়েই বলল,
-- তাহলে আবার এই সব কি?
-- সেটাই বুঝতে পারছি না চাচি। আপনি টেনশন করবেন না। আমি ব্যাপারটা দেখছি।
রোকেয়া আর কথা বাড়ালো না। নিজের রুমে চলে গেল। আজকাল ফট করেই মেজাজ খারাপ হয় না। তা না হলে চেনা নেই, জানা নেই। প্রেম করার সাধ এই ছেলের মিটিয়ে ফেলতো। আর আজকালকের মেয়েরা! এমনি প্রেম করে করে। তাই বলে ফাজলামির জন্য স্বামী বাচ্চা রেখেও করবে। ছিঃ!
আসাদুজ্জামান নিজেও নিজের কাজে গেলেন। খালিদ যেহেতু বলেছে, তাহলে আর টেনশন নেই। নাজিম গেল বউয়ের পিছু পিছু। নাবিল বসে রইল আগের মতোই, হাতে মোবাইল। তার মাথায় তো কিছুই কুলচ্ছে না। তাই সাথে সাথেই কল দিল। কিন্তু এখন মনে হয় নম্বর সুইচড অফ।
খালিদও আর বসল না। রুমে চলে এলো। আর আসতেই পুরো এক জগ পানি তার উপরে পড়ল। পড়তেই খালিদ হাসল। আসমানি খালা ডাকতেই উঠে গেছে। তবে এই মেয়ে উঠলে তো… তাই ওঠার সাথে সাথে কম্বল সাথে নিয়ে গেছে। এই শীতে আর যাই হোক, কম্বল ছাড়া আরামের ঘুম দেওয়া সম্ভব না।
নোভা দরজার পাশটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। গায়ে রাতের রেড নাইটসুট। সামনের কাটা চুলগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বলল,
-- ঢিলের জবাব সব সময় পাটকেল হয়, জানেন তো।
খালিদ উত্তর দিল না। কম্বল ফেলে দিল। ভেজা লম্বা চুলগুলো হাতে পেছনের দিকে নিতে নিতে বলল,
-- আর পাটকেলের জবাব?
নোভা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। যখন বুঝল এক লাফে বেরুতে চাইল। খালিদ দিলে তো। মেয়ে হিসেবে যতোই লম্বা গুলুমুলু হোক, খালিদের কাছে চুনোপুঁটি। তাই পেটের কাছে হাত গলিয়ে পুরো শূন্য তুলে ফেলল। বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বলল, -- গোসল যেহেতু হচ্ছেই, এক কাজে দু'কাজ হোক।
-- কিসের দুকাজ?
-- এক্স, ওয়াই, জেড।
-- আপনি বলেছিলেন এখানে এসে বিরক্ত করবেন না।
-- সেটা তো তুমি শীতে কুক্যা কুক্যা করো, সাত সকালে ঝামেলা থেকে বাঁচাতে তাই।
-- তো?
-- এখন ঝামেলা যেহেতু হচ্ছে, বিরক্তি আর বাদ থাকবে কেন?
-- জবান বলেও তো কিছু আছে।
-- খালিদের নেই।
-- তা ঠিক। আছে শুধু এক হাতা মুখ আর দশ বিঘা দাড়ি মুছ।
-- একদম ঠিক।
-- কিসের ঠিক, কাঁটেন না কেন?
-- বউয়ের প্রেমে পড়ার অপেক্ষায় আছি।
-- নোভা, তাও আবার এই দাঁড়ি মুছের প্রেম। দুনিয়া উল্টে গেলেও না।
-- যদি বলি দুনিয়া উল্টেই গেছে।
-- ছাই গেছে, ছাড়েন।
-- পাটকেলের জবাব না নিয়েই!
-- আপনি দিতে পারবেন?
-- খালিদ সবাই পারে। ভালো না সেটা তো জানা কথাই।
নোভা আর কিছু বলল না। খালিদের হাতেই বাকা হয়ে ঝুলে গাল ফুলালো।
খালিদ সেই মুখ দেখে হাসল। তারপর সেভাবেই টেনে বুকে আনল। বাথরুমে না নিলেও, ভেজা দাড়ি গোঁফ নিয়ে সেই ফোলা গালে ঠোঁট দুটো ছুঁয়ালো। গভীরভাবে, একেবারে নিজের মতো।
আর ছোঁয়াতে নোভার পুরো শরীর শিরশিরিয়ে উঠল। অবশ্য সেটা শীতে, না তার সবচেয়ে অপছন্দের দাড়ি গোঁফে স্পর্শে সেটা বোকা নোভার বুঝে আসে না। তবে ঠিক চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।
....
নাবিলা হাতের বইটা বন্ধ করে জানালার দিকে তাকালো। বইয়ে মন বসছে না। বারবার ধ্যান চলে যাচ্ছে, ঐ যে জানালা গলিয়ে ঝরঝরে ঝিকিমিকি রোদ, সেই রোদের দিকে।
পূর্ণিমার চাঁদ যেমন মেঘের আড়াল থেকে চুপিচুপি উঁকি ঝুঁকি মারে, তেমনি সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে এই শেষ বিকেলের কোমল রোদটুকুও দুষ্টু হয়ে খেলা করে। একবার ধরা দেয়, আবার হঠাৎই লুকিয়ে পড়ে ছায়ার ভাঁজে ভাঁজে।
দেখলে মনে হয়, যেন একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সবুজ মাঠজুড়ে কানামাছি খেলছে। কখনও হাসি, কখনও ছুটোছুটি, কখনও বা হঠাৎ চুপ। আলো আর ছায়ার সেই লুকোচুরিতে দুপুরটা হয়ে ওঠে নরম, শান্ত আর মুগ্ধতায় মাখামাখি।
সেই মুগ্ধতাটুকু কাগজের খাঁচায় একটু বন্দি করে ধরে রাখার প্রয়াসেই, নাবিলা বই রেখে ঝট করে উঠে পড়ল। উঠেই অনেকদিন পর রংতুলি সব হাতে তুলে নিলো। নানান কাজের ব্যস্ততায়, আজকাল ঠিকঠাক সময় হয় না। তবে বড় চাচার এই বাড়িতে পা রাখলেই নাবিলা পুরো দুনিয়া ভুলে যায়। ভুলে যায় শত ব্যস্ততা।
পুরো গ্রামে নাবিলার বড় চাচার বাড়িটা সব সময় একটু মুখে মুখেই থাকে। একদিকে সবার পছন্দের মিষ্টি মেয়ে নাবিলার গ্রামের বাড়ি, অন্যদিকে মন মাতানো দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য। আশপাশের তিন চার গ্রামে এমন বাড়ি আর নেই বললেই চলে।
আজকাল গ্রামে অহরহ বিল্ডিং উঠছে, তবে বেশিরভাগই শহুরে রঙে রঙিন। এমন চোখজুড়ানো, মমতায় মোড়ানো সৌন্দর্যের বাড়ি আজকাল খুব কম মানুষই তৈরি করে। চারপাশে গাছগাছালি, নানান রঙের ফুল-ফল, এক টুকরো উঠান, শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের পাড় ঘেঁষে শান্ত ও মনোরম পরিবেশ।
এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করতে কতশত মানুষ ঘুরতে চলে আসে। এমনকি নাবিলার দুটো নাটকের শুটিংও হয়েছে এখানে। তার দেখাদেখি আজকাল অনেকেই আসার রিকোয়েস্ট করে। তবে বড় চাচা, তার এই মেয়েকে ছাড়া তো আর কাউকে অনুমতি দেবেন না। গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্য অবশ্য সব কিছুই একটু ভিন্ন।
আজকাল বড় চাচা বেশির ভাগ সময় গ্রামেই থাকেন। এতদিন বাড়ির ভূত চেপে ছিল। এখন চেপেছে খামারের। দুটো দুটো করে সব গবাদি পশু নাকি পালবেন।
তারই তোড়জোড় হচ্ছে আজকাল জোরেশোরে। তাছাড়া এলাকার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো। দেখাশোনার জন্য লোক আছে, তাই কাউকে খুব একটা নিষেধ করা হয় না। তারা যখন তখন আসেন। বড় চাচা সাথে আড্ডা, হাসি-খুশি ভাবে মেতে থাকেন।
নাবিলা বেশির ভাগই আসে চুপিচুপি। কখন আসে, যায়, খুব একটা কেউ ধরতে পারে না। তবে বছরের একটা সময় একেবারেই ভিন্ন হয়।
এই যে শীতের মাঝামাঝি, এই সময়টা। এই সময়টা এলেই প্রতি বছর বড় চাচা সবার জন্য দোয়ার আয়োজন করেন। আগে করতেন ছোটখাটো। এখন বলতে গেলে বেশ বড়সড় করেই করেন। এই বড়সড় দোয়ার আয়োজনের মধ্যে তাদের মৃত আত্মীয় স্বজনও মাঝে আজকাল আরেকটা নামও যোগ হয়, শাহরিয়ার।
সেই দোয়ায় আর কেউ থাক না থাক, নাবিলা সব কাজ ফেলে ছুটে চলে আসে। লুকিয়ে আসে না, সবাইকে দেখিয়েই আসে। আর এলেই সারা বছরের গা ছাড়া বড় চাচা একটু কড়াকড়ি হন। গেটে দুজন পাহারা বসান। নাবিলা যেই কয়দিন থাকবে, অনুমতি ছাড়া কোন মানুষই যেন, এই লোহার গেট মাড়িয়ে একদম ভেতরে আসতে না পারে।
গ্রামের মানুষ এ সবে অভ্যস্ত। তবে সমস্যা শুরু হয়েছে এই বছর এক ধরে। যখন সিম্পল ঘিয়ে রঙের শাড়ি, ঘিয়ে রঙের পাতলা দোপাট্টা, তার সঙ্গে ম্যাচিং ঘিয়ে রঙের শেরওয়ানি গায়ে, এক নতুন বর-বউয়ের মিষ্টি কয়েকটা ছবি পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় পুরো হইচই তৈরি করে ফেলে।
হইচইয়ের কারণ, বর্তমান মিষ্টি মেয়ে খ্যাত তরুণ প্রজন্মের ক্রাশ নাবিলা পারিবারিকভাবে তার কাজিন এবং ফেমাস ট্রাভেল ভ্লগার আরভিন অপূর্বের সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। বিয়েটা হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিন অপূর্বের নিজ বাস ভবনে। ঘনিষ্ঠ কিছু আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের মানুষজন উপস্থিত ছিলেন। ছবিগুলো নাবিলার ছোট বোন সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন এবং দোয়া চেয়েছেন।
এই বিয়ে নিয়ে কারও আগাম ধারণা ছিল না। আরভিন অপূর্ব তাদের কাজিন, এতদিনে সবাই জেনে গেছে। কিন্তু বিয়ে! ছবি শেয়ার করতেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো হইচই পড়ে গেছে।
সেই হইচই থেকেই শুরু হয়েছে ডবল জ্বালানি। আগে নাবিলার জন্য কৌতূহল ছিল, আর এখন এই যে দেবদূতের মতো ছেলে আর মিষ্টি মেয়ে কী করছেন, কোথায় আছেন, আর সবচেয়ে বড় কথা। আরভিন অপূর্বের মতো ভবঘুরে মানুষের সঙ্গে এমন শান্তশিষ্ট নাবিলার জুটি কিভাবে বেঁধে গেল, সেটাই জানার যতো কৌতুহল।
আর সেই কৌতুহল থেকেই, যতই গেট বন্ধ থাকুক। টুকটাক ভিড় লেগেই থাকে। তাই এবার আর বড় চাচা ভুল করলেন না। দোয়ার সব আয়োজন বাড়ির ছোট মেয়ের জামাইয়ের ঘাড়ে দিয়ে, তিনি আরাম করে আড্ডায় বসে আছেন। আজকাল তার আর্মি জীবনের গল্প শোনার মানুষের অভাব নেই, বরং আগ্রহ ও মনোযোগ নিয়ে অনেকে শুনতে আসেন। তাই দাদির স্বামীর ভিটা আজকাল কখনও আন্ধকার হয় না। তাদের আসা-যাওয়া, হাসি-খুশির আড্ডায় সব সময় মুখরিত হয়েই থাকে।
এই মুখরিত সুখের মুহূর্তগুলোই নাবিলার ভালো লাগে। সেই ভালো লাগার রেশ নিয়েই, রং-তুলি ও কাগজ নিয়ে অনেক দিন পর নিজের মতো বসে পড়ে।
এই যে জানালার কাছে, নিচে পা মুড়িয়ে। বাইরের নরম ঝিলমিল রোদ পড়ছে তার গালে, চোখে-মুখে, আর এই যে সাদা শুভ্র কাগজ এই কাগজের ওপরে। গায়ে ঘরোয়া নরম সাদা থ্রি-পিস। মেরুন রঙের ওড়নাটা গা থেকে সরে বেশিরভাগটাই ফ্লোরে ছড়িয়ে গেছে। কোমর ছোঁয়া লম্বা চুলগুলোও ঠিক তেমনি ছড়িয়ে আছে পিঠ বেয়ে। অগোছালো, তবে অদ্ভুত সৌন্দর্য নিয়ে।
সেই সৌন্দর্যের ঝিলমিল রোদে গা ভাসিয়ে, রং তুলিটা হাতে নিতেই দরজার সামনে উইন্ড-চাইমটা টুংটাং করে বেজে উঠে।
নাবিলা ঠোঁট টিপে হাসে। হেসে অবশ্য তেমন ভাবান্তর হলো না। সে যেমন আগেও দরজা লাগাতো না, এখনও লাগায় না। তবে হাট করে খোলাও থাকে না, চাপানো থাকে। আর এই চাপানো দরজায় কেউ একটু এদিক-ওদিক হলেই উইন্ড চাইমটা টুংটাং করে বাজতে থাকে।
তার উইন্ড চাইম পছন্দ। ছোট বেলা থেকেই পছন্দ। বাতাসে টুংটাং করে মৃদু স্বরে যখন সুর তোলে, তার এতো ভালো লাগে। তবে সেটা বারান্দায়, হুটহাট বাতাসে। এমন দরজার সামনে অবশ্যই না। তবে এই ‘অবশ্যই না’, অবশ্য হয়ে গেছে অন্য কারো বদলৌতে। আর সেই অন্য কারোর সব কিছুই অন্যরকম। আর অন্যরকম বলেই হয়তো আজ নাবিলা এখানে।
আসমানি শব্দ টব্দের ধারের কাছে গেল না। কখনও যায়ও না। এমন ছাতার মাথা দরজার সামনে লাগায় কে। আসতে গেলে চ্যা, যাইতে গেলে চ্যা। তবে আম্মাদের রুম তো এখন আর শুধু আম্মাদের না। আম্মার খাম্বাদেরও। দু’দুইডা মেয়ের জামায়। দুটোই হয়েছে, কারেন্টের খাম্বা। একটা হাইব্রিড খাম্বা, আরেকটা দেশি খাম্বা। তবে দুটোই ভালো।
একটা পুরো দুনিয়ার কাছে শের, তবে বউয়ের চোখের এক ইশারায় সোজা দাঁড়িয়ে যায়। উঠতে বললে উঠে, বসতে বললে বসে। আরেকটা নায়ক মহানায়ক। তবে বউয়ের সামনে সাদা মাটা ডালভাত। যেই ডালভাতের দিকে পুরো দুনিয়া হা করে তাকিয়ে থাকে, আর সে তাকিয়ে থাকে বউয়ের দিকে। বউ কি করে, না করে, কত কদম হাঁটে, কত বার উঠে, বসে, শ্বাস ফেলে যতক্ষণ নাবিলা আম্মার আশ পাশে থাকে, তাকিয়ে তাকিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কি যে এতো দেখে, আসমানির সেটাও মাথায় আসে না।
পরের বউ হলে এক কথা, নিজের বউ। অথচ তার ধারণা ছিল। বিয়ের এক দেড় বছর পর, জামাইয়ের চোক্ষের সামনে বিনা সুতায় নাচতে নাচতে গেলেও ফিরে তাকিয়ে দেখার কথা না।
তার জীবনের অভিজ্ঞতা সব এই দুই বিটলায় বিফলে ফেলে দিচ্ছে। এই যে মেয়েটা নিজের মতো বসে আছে। সে একশো পার্সেন্ট গ্যারান্টি। আজও এখানে থাকলে চুপচাপ ক্যামেরা হাতে হা করে বসে থাকত। তাও যেন তেন ক্যামেরা না, যৌতুকের ক্যামেরা। বেটায় আমার ফেরশতার মতো, আম্মারে নিছে নিছে। আবার আম্মার কেনা ক্যামারাও নিয়েছে। ভাবা যায়! তাই বিরক্ত মুখে এসে বলল,
-- ডাইকা যে গেলাম, গেলা না কেন? বিরাট কারবার মিছ করে গেছো।
নাবিলা কাগজ থেকে চোখ ফেরালো না। আগের মতো হলে কথার উত্তরও দিতো না। তবে ঐ যে আলাদিনের জিনি, যে চুটকি বাজিয়ে তার কষ্টগুলো হাওয়ায় মিশিয়ে দিয়েছে, নাবিলার মনের যে অবরুদ্ধ দার ছিল। ভালোবাসার আলতো পরশে, পরশে সেই দারের খিলগুলো খুব যত্ন নিয়ে খুলেছে। কোন তাড়া নেই, ধৈর্য হারানো নেই, পাওয়ার তৃষ্ণা নেই। শুধু ছিল অপেক্ষা।
আর এই অপেক্ষার এক জায়গায় এসেই মানুষটা পুরো এলোমেলো হয়ে যায়। যখন নাবিলা সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঐ যে, প্রথম দিন নাবিলা এক পা এগুলো। আর সে পুরো এলোমেলো হয়ে গেল। খোলা জায়গা, এতগুলো মানুষ। লজ্জা, নিজের সংকোচ, অস্বতিতে, নাবিলা মানুষটার শক্ত বাঁধনে পুরো নুইয়ে গেল।
নাবিলা এক পা তো এগিয়েছে, তবে নাবিলা নিজের দোষ ভুলতে পারে না, কলঙ্ক কালি কাজল বানিয়ে চোখে লাগাতে পারে না। ঐ যে চোখ, সেই চোখের দিকে তাকাতে পারে না।
দুনিয়ায় আজব এক কারিশ্মা আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন সেই চোখে। তা না হলে, চেনা নেই জানা নেই, মায়ের পুরো রূপ নিয়ে হলেও, এই একটা দিক কিভাবে অন্য কারো সাথে মিলে যায়? নাবিলার ভেতরের অবরুদ্ধ দারটা ভেঙে চৌচির হবে, এজন্যই বুঝি।
-- কি হলো, ঝিম মেরে আছো কেন? শরীর ভালা না? চান্দিতে তেল দিবা?
নাবিলা হাসল! সবুজ রঙটায় সাদা ফ্যাকাশে তুলিটা ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলল, -- কাহিনী কি?
-- সেটা আর বলছি না। কথা চালাচালি সব বাদ দিয়া দিছি। ঠিক করেছি, হজ্জে যাব। যাওয়ার আগে সব বাদ। ফিরা আইয়া দুনিয়ায়ই বাদ। কিবলা মুখী ছাড়া ডানে বামে আর তাকাব না।
নাবিলা কিছু বলল না। তার বিয়ের সময় প্লেনে উঠে দাঁত দুপাটি লেগে যায় যায় অবস্থা। তার মধ্যে অপূর্বর এক ফরেন বন্ধু ডাকল “কালা।” খ উচ্চারণটা সে ঠিকমতো করতে পারে না। এটা খালাকে কে বুঝাবে? রাগে দুখে সে ঘোষণা দিল, জীবনে আর অন্য কোন দেশে পা'ই দেবে না। আসমানিরে কয়, “কালা।”
আসমানি আর দাঁড়াল না। যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল। তার তো আর জ্বালা যন্ত্রণার শেষ নাই। সে যেতেই নাবিলা আবার মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। তবে তখনই আবার ইউন্ড চাইমটা বেজে উঠল।
নাবিলা এবারও ঠোঁট টিপে হাসল। হাসতেই নাজিম উঁকি দিয়ে সব সময়ের মতো বলল, -- গাধাটায় করেছে কিরে, নাবিলা। কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এক মেয়ে নাকি গলায় দড়ি দেবে। মেসেজে কি সব লিখেছে? ভাগ্যিস আসমানির নজরে পড়েছে। মরলে তো সোজা জেল। তোর মায় এবার গাল না, এই বদমায়েশের মাথা ফাটিয়ে ফেলবে দেখিস।
নাবিলা এবার ফিরে তাকালো। তবে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। তার না পারার মাঝেই নাজিম নিজের মতো চলে গেল। তখনই মোবাইলটা টুং করে বেজে উঠল।
নাবিলা এবার সাথে সাথে উঠল। কার মেসেজ সে জানে। কোন ট্যুরে গেলে, এই ছেলের সব বাদ। মোবাইল থেকে শুরু করে সব যোগাযোগ বন্ধ। তবে মাঝে মাঝে একেকটা ছবি তাকে পাঠানো হয়। ছবিতে একেকটা লুকানো মেসেজ থাকে। নাবিলা প্রথম দিকে বুঝত না, এখন বুঝে। এই যে, এখনো ঠিক বুঝে গেল।
রাস্তার পাশে দুটো বনফুন, পাশাপাশি ফুটে আছে। দেখলে মনে হয়, একজন আরেকজন কে জড়িয়ে ধরে আছে।
নাবিলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। অপূর্ব আসছে। হয়ত এসেও পড়েছে। ছবিটা বাংলাদেশের।
নাবিলার নিঃশেষ হওয়া জীবনের শেষটা হয়েছিল, ঐ যে অপূর্বর ট্যুর কোম্পানির টুরে যাওয়া। সেই ট্যুর থেকে। সেখানেই এই মানুষটাকে নাবিলা নতুন করে চিনেছে। নাবিলার প্রথম হাইকিং৷ কোন অভ্যাস নেই, প্যাকটিস নেই। তবে এই মানুষ তাকে সাথে নিয়ে তার নিজের মতো করে প্রকৃতির ভেলায় ভেসেছে। বড় যত্ন করে, আগলে, চোখে মুখে খুশির ঝিলিক নিয়ে।
নাবিলা হাজার এগিয়ে যাক, হাজার ঝলমলে দুনিয়ায় মিষ্টি মেয়ে নাবিলা হোক। ভেতরে সে, সেই সর্বহারা নাবিলা। যেই নাবিলা এই অস্বস্তি, জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারে না। অপূর্ব নামের অপূর্ব ছেলেটার সামনে আরো পারে না।
তবে এই মানুষটা হাল ছাড়ে না। তার রঙিন দুনিয়ায় সাদা মাটা নাবিলাকে জড়িয়ে নিয়েছে ধীরে ধীরে। সেই ধীরে ধীরেই এই হাতটুকু ধরেই নাবিলা আবার বেঁধে গেছে আদৃশ্য তবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাঁধনে। সেই বাঁধনের পরশে প্রথমবার নাবিলা অপূর্বের রুমে পা রাখল। অগোছালো অপূর্ব তার মুগ্ধতার জন্য পুরো রুমটা সাজিয়েছে বড় যত্ন করে। ফুল, মোমবাতি আর ঐ যে বারান্দায় তার পছন্দের উইন্ড চাইমটা কি সুন্দর টুংটাং করে বাজছে।
এই মানুষটা নাবিলার সব বোঝে। নাবিলা না বলা প্রতিটা শব্দ বোঝে। নাবিলার ভেতরের কাঁপন বোঝে, নাবিলার বিষণ্ন মন বোঝে। তাই তো হাত ধরে ফুলে বিছানো বিছানায় নেয় না, নেয় বারান্দার চেয়ারে। বিয়ের ওড়না শাড়িটা যত্ন করে গুছিয়ে বসিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলে,
-- কফি খাবে, নাবিলা?
নাবিলা উত্তর দেয় না। অপূর্ব উত্তরের অপেক্ষায় বসেও থাকে না। গুছিয়ে ফুল বাবু হয়ে এতোক্ষণ ছিল, এই তো কত! তাই শেরওয়ানি খুলে খাটে ছুড়ে, এলোমেলো চুলগুলো আরেক ধাপ এলোমেলো করতে করতে নিজেই বানিয়ে আনে। সব সময়ের মতো এক কাপ।
নাবিলা চোখ তুলে তাকায় না, ওই যে সব সময়ের মতো এলোমেলো চুলের সুন্দর মুখটা, সেদিকেও না। তবে কফির মগটা নিতে নিতে বলে,-- আমি এখন আর বোকা না, তাই ভাগ পাচ্ছেন না।
অপূর্ব সব সময়ের মতো হাসে। হেসে বলে,-- গান শুনবে?
নাবিলা কফিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
-- না।
-- কেন?
-- ইংরেজি গান আমার ভালো লাগে না।
-- তোমার কেন মনে হলো, আমি ইংরেজি গানই গাইব?
-- আপনি তাই তো গান। নোভার রিসেপশনেও তো সবাই কত রিকোয়েস্ট করল। গাইলেন তো না।
-- তুমি তো করোনি।
-- আমি করলে গাইবেন?
-- করে দেখো।
-- করলাম।
-- কোথায় করলে?
-- একটা গান শোনান, অপূর্ব।
-- উঁহু, হয়নি।
নাবিলা একটু নিশ্চুপ বসল। তারপর আস্তে করে বলল, -- একটা গান শোনাও, অপূর্ব।
অপূর্ব সাথে সাথে রুম থেকে গিটার এনে নাবিলার ঠিক সামনে, বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এই যে তার মুগ্ধতার দিকে। সেই মুগ্ধতার দিকে তাকিয়ে একটা চুটকি বাজাল।
নাবিলা সাথে সাথে চোখ তুলে তাকাল। তাকাতেই অপূর্ব হাসল। হেসে ঐ যে চিকন করে টানা কাজল ঘেরা চোখ, সেই চোখে চোখ রেখে গাইল - -
চোখে চোখে চোখ পড়েছে
কী বলব মুখে?
কে তোমায় সাজিয়েছে
এতো অপরূপে?
আমার কল্পনায় হাজার ভাষা
নীরব দুঃখে দুঃখে.....
তখনই আবার টুংটাং করে নাবিলার রুমের দরজার সামনে উইন্ড চাইম বেজে উঠল। নাবিলার ধ্যান ভাঙল। আজকাল তার পুরো ধ্যানজুড়ে একজনেরই বসবাস। যে ঘুরে ফিরে পুরো নাবিলায় রাজত্ব করে।
তাই ফিরে তাকানোর জন্য ঘুরতেই, কেউ এক ছুটে এসে তাকে জাপটে ধরল। ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
-- কথা বন্ধু, কথা বন্ধু! ইশ, কত দিন পর দেখা!
নাবিলা অবাক হলো না। ঐ যে বলেছিল, ছবির মেসেজগুলো এখন সে বোঝে। অপূর্ব যে তার বনফুলের বনফুলকে কিছু সময়ের জন্য চুটকি বাজিয়ে নিয়ে আসবে, সে জানে। নাবিলার সুখের সওদাগর যে সে, সব সুখ কুড়িয়ে মালা গেঁথে গলায় তুলে দেবে।
আর এই সুখকেই নাবিলা কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখে পানি। সেই পানি নিয়েই দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাল। হাতে ক্যামেরা, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসি, আর কপালজুড়ে সব সময়ের মতো এলোমেলো চুল।
এই এলোমেলো চুলগুলোতেই নাবিলা তার সব জড়তা, অস্বস্তি কাটিয়ে প্রথমবার হাত বাড়িয়ে আলতো করে গুছিয়ে দিয়েছিল। ঐ যে তাদের কাজীপাড়া, যেখান থেকে সব শুরু। সেই কাজীপাড়ার গলির একেবারে শেষের বাড়িটার তৃতীয় ফ্লোর। সাদা পর্দার আড়ালে, টিপটপ সিম্পল গোছানো, ভীষণ সুন্দর নাবিলার রুম, সেই রুমে।
জানা কথা, নাবিলা এক কদম এগুবে, আর এই মানুষটা এগুবে দশকদম। পুরো এলোমেলো দিশেহারা হয়ে। এই দিশেহারা ঝড়ের উত্তাপে নাবিলা মানুষটার অপেক্ষার গভীরতা বুঝে। বুঝে মানুষটার ব্যকুলতা। সাথে এও বুঝে, এই মানুষটা নাবিলাকে চায়নি, বরং নিজেই পুরো নাবিলার হয়ে গেছে।
.....
ঘড়ির কাটা তখন নয়টার উপরে। নাবিলদের গাড়ি এসে থামল এক গলির মোড়ে। থামতেই নাবিল নামল। তার সাথে নামল তার দুই বোনের জামাই।
গলির সামনে বিয়ের বিশাল গেট। সেই গেট থেকেই মরিচ বাতি সোজা ভেতরে চলে গেছে। সম্পর্কটা নিয়ে প্রথমে সে সিরিয়াস ছিল না। তবে কথা বলতে বলতে মায়ায় পড়ে গেছে। আর পড়তেই এই মেয়ে পল্টি মেরেছে। তাও যেন তেন পল্টি না। এমন পল্টি নাবিল শুনে ভালো মন্দ কিছু বলবে, সেই অবস্থায়ই ছিল না। পরে খালিদ ভাই সব ভুলে যেতে বলল। যা হয়েছে হোক, মেয়েটা ভুল বুঝতে পেরেছে। অযথা আর ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কী?
সে আর মাথা ঘামায়নি। তবে এত এত কথা হয়েছে। একটা শূন্যতা ঠিক জেকে ধরেছিল। তবে স্বামী সংসার নিয়ে থাকা মেয়ের দিকে এগোবে, এমনও না। তাই নিজেকে সামলে বাবার ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তো, এখন আবার এইসব কি?
ফোন বন্ধ। তাই তারা ডিসাইড করল, সোজা গিয়ে কোন মুরব্বিদের গোছের লোকের সাথেই কথা বলবে। মেসেজ দেখাবে। পরে উনিশ থেকে বিশ হলে। তাদের যেন কোনো দোষারোপ করতে না পারে।
সেই হিসেবে এগুবে, তখনি সেই গলির ঠিক পাশের এক অন্ধকার গলি থেকে ছোটখাটো, অল্প বয়সের পুতুলের মতো এক মেয়ে ফুরৎ করে তাদের সামনে দিয়ে দৌড়ে গেল। যেতে যেতে অবশ্য একবার তাদের দিকে তাকালো। তাকিয়ে তারা যেই পথ দিয়ে এসেছে, সেই পথেই অন্ধকারে মিশে গেল।
মেয়েটার পায়ে কেডস, জিন্স। সাদা টিশার্টের ওপরে তার সাইজের ডাবল একটা শার্ট। বুক খোলা, লম্বা চওড়া হাওয়াই হাতাটা কিছুটা গুটিয়ে রাখা। মাথায় ক্যাপ, কাঁধে একটা মানকি ব্যাগ।
তারা তিনজনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সেই যাওয়া তাকিয়ে দেখল। নাবিল ভ্রুঁ কুঁচকে আছে, খালিদ স্বাভাবিক, তবে অপূর্ব একটু ভেবে নাবিলের উদ্দেশ্যে বলল,
-- তুমি মেয়েটার কোনো ছবি দেখোনি?
নাবিল দুপাশে মাথা নাড়ল।
-- আসল নাম জানো?
নাবিল আবারও মাথা নাড়ল।
-- বুড়ি বলতে কেন?
-- পাকনা পাকনা কথা বলত তাই।
খালিদ ঠোঁট টিপে হাসল। নাবিল কটমটিয়ে তাকালো।
অপূর্ব অবশ্য আছে অন্য চিন্তায়। তাই আগের মতোই বলল,
-- তোমাদের মাঝে কি কোনো লেনদেন টাইপ কিছু হয়েছে?
নাবিল অবাক হয়ে বলল,
-- মানে?
-- আমি প্রথমবার এসে তোমাদের কিছু গিফট করেছিলাম। সেখানে তোমার জন্য একটা শার্ট ছিল। ব্র্যান্ডেড, এন্ড ওয়ান পিস। আমি যদি ভুল না হই, সেই সেইম শার্টটা আমাদের সামনে দিয়ে যাওয়া মেয়েটার গায়ে ছিল।
নাবিল চমকালো। মেয়েটা এত পাগল ছিল। সে তার ব্যবহার করা একটা শার্ট চায়। গায়ে দেবে, নাবিলের সুবাসে মাখবে। তখন নাবিল এতকিছু ভাবেই নি। সামনে যেটা ছিল, সেটাই পার্সেল করেছিল।
খালিদ তার দাড়ি মাখা গাল আলতো চুলকে বলল, -- মেয়েতো নিজেই বাচ্চা, আবার বাচ্চা মা হবে কিভাবে?
অপূর্ব এবার হাসল, হেসে বলল, -- মেয়ে পুরো ঘোল খাইয়েছে। দুষ্টুমি করে কথা বলে, মিথ্যা বলে কাটিয়ে দিয়েছে। বয়স অল্প, ভালোবাসা মোহের মাঝে হাবুডুবু খেয়েছে। কিন্তু বিয়ে ঠিক হতেই মোহ আর ভালোবাসার সীমানাটা ঠিক চিনে গেছে।
খালিদ বিশেষ বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। নেড়ে নিজের মতো বলল, -- কাহিনী যাই থাক, কেস খাওয়ার জন্য তৈরি হও, শালাবাবু। মেয়ে প্রেমিকের বাড়ির উদ্দেশ্যে বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, দু’গাল সামলাও। শাশুড়িমা অনেকদিন কারো গালে তবলা বাজায় না।
অপূর্ব সহমত হলো। তবে নাবিল এত কিছু ভাবলোই না। সে নিজেই গাড়িতে উঠে দুই বোনের জামাইদের রেখেই এক টান দিল। অন্ধকারে মেয়েটা কোন দিকে গেল। বেশিদূর অবশ্য যেতে হলো না। বাস স্টেশনেই দেখা পাওয়া গেল। নাবিল গাড়ি থেকে মাথা বের করে ডাকল, “বুড়ি?”
অনন্যা সাথে সাথে ফিরে তাকাল। তার চোখে মুখে বিস্ময়।
#সমাপ্ত