ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 40

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪০ ( শেষ পর্ব)

নাবিলা যখন তার নানু বাড়ির উঠানে পা রাখল, তখন বেশ রাত। সব ঝামেলা মিটিয়ে বেরোতে বেরোতেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তার ওপর পড়েছিল ভয়ানক জ্যাম। যে রাস্তা তিন ঘণ্টার, সেখানে লেগে গেছে প্রায় চার পাঁচ ঘণ্টা। নাবিল অবশ্য সন্ধ্যা দেখেই বলেছিল, -- আজ থাক আপা। এমনিতে খুব দৌড়াদৌড়ি হয়েছে। কাল ধীরে সুস্থে যেও।

কিন্তু নাবিলা জানে, তার মাকে যদি কেউ শান্ত করতে পারে, সে একমাত্র নাবিলাই। তো কি করে চুপচাপ সেখানে বসে থাকবে?

তাই মামা দরজা খুলতেই নাবিলা সোজা মায়ের কাছে চলে গেল। অন্ধকার রুমে কপালে হাত ফেলে চুপচাপ শুয়ে আছে। বাবা, বড় চাচা আর আসমানি খালাকে সোজা বলে দিয়েছেন এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। কারো মুখ আর তিনি দেখতে চান না। কাজীপাড়ায়ও আর ফিরবেন না। তার চোখের সামনে ওই ফাজিল তার মেয়ে নিয়ে রংঢং করবে, এটা তিনি কিছুতেই মানতে পারবেন না।

উঠতে বসতে আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলবেন। তার চেয়ে ভালো বাকি জীবন বাপের বাড়িতেই কাটাবেন। তাকে রাখার মতো ভাই এখনও জীবিত আছে।

নাবিলা রুমে পা রেখেই বাতি জ্বালাল। আর জ্বালাতেই বড় একটা শ্বাস আপনা আপনি ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। এই রুমটা তার, শৈশব, কৈশোর থেকে শুরু করে তার সব স্মৃতি, সুখ, আনন্দ, বেদনা সব কিছুর নীরব সাক্ষী। এই এলাকা, এই বাড়ি, এই রুমের প্রতিটা কোণা।

না, নাবিলার এখানে আর কোনো জিনিসপত্র নেই। কিন্তু জিনিসপত্রের মতো স্মৃতিগুলোকে তো আর সরিয়ে ফেলা যায় না। ইট পাথরের দেয়ালের মতোই তারা গেঁথে থাকে, আজীবনের জন্য।

নাবিলা নিজেকে সামলে এগিয়ে মায়ের কাছে গেল না। বরং জানালাটা খুলে দিল। সকালে ঝুম বৃষ্টি হলেও রাতের আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। থালার মতো এক চাঁদ ভেসে আছে আকাশে। সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে বলল,

-- আমি জানি তুমি ঘুমাওনি, মা। মেয়েদের দূরে সরিয়ে তুমি কখনও ঘুমাতে পারবে না। অতিরিক্ত কঠোর মানুষের হৃদয়টা হয় তুলোর মতো নরম। সেই নরম মনে যারা বাস করে, তাদের হাজার দোষ ত্রুটি থাকলেও, তাদের দিক থেকে কখনও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। তুমিও পারবে না, মা। আমি জানি, তুমি কখনও পারবে না।

রোকেয়া মৃদু হেসে বলল, -- এটারই বুঝি সুযোগ নিস তোরা। যা ইচ্ছে হয়, টুপ করে, করে ফেলিস।

-- খালিদ ভাই সব সম্ভব করেছে মা। নিজে প্রস্তাব রেখেছে, তার বর্তমান অভিভাবক দিয়ে সবার সামনে সম্মানে প্রস্তাব রেখেছে। তুমি আমার মা, জানার পর কখনও তোমার পেছনে লাগেনি। বরং তুমি হাজার বার তাকে ছোট করেছো, কথা শুনিয়েছো, যখন যা মনে আসে বলেছো। তাহলে যা ইচ্ছে তাই কি করে করলাম বলো তো?

-- নোভার মাথা নষ্ট করিস নি?

-- না মা, নোভার ডিসিশন নোভা নিয়েছে। আমি শুধু বড় বোন হিসেবে পাশে থেকেছি।

-- ভালো, থাক। এখানে কি? রোকেয়ার আর কাউকে দরকার নেই।

নাবিলা ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- শাহরিয়ারের ভাগ্য খারাপ ছিল, কিন্তু শাহরিয়ার খারাপ না, খালিদ ভাইও না। তার জন্মপরিচয়ের দোষ ছাড়া, একটা দোষ বলো, মা। যেটায় আমার মনে হবে, আমি তোমার ওপর গিয়ে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আর যদি বলতে পারো, তোমার মেয়ে আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব। আর তুমি জানো? আমি আমার এই ভাইয়ের কাছে গিয়ে যদি তার কলিজাটাও চাই, সে হেসে হেসে আমার হাতে তুলে দেবে।

রোকেয়া কোনো উত্তর দিল না। নাবিলা এগিয়ে মায়ের পাশে বসল। বসে কপাল থেকে হাতটা নিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

-- তুমি কি আমার মেয়েকে ঘৃণা করো, মা?

রোকেয়া সাথে সাথে নাবিলার দিকে কঠিন চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টি দেখে নাবিলা হেসে ফেলল। হেসে বলল,

-- শাহরিয়াররও তো জন্মপরিচয় নেই। তার শরীরে যে রক্ত, সেই একই রক্ত তোমার মেয়ে সন্তানের শরীরেও। তাকে ঘৃণা করার কথা শুনেই তোমার মেজাজ চড়ে গেল। অথচ খালিদ ভাইকে তুমি ঠিকই ঘৃণা করছ। কেন? আমাদের সমাজের এটাই রীতি মা। যারা ফেলে গেছে, তাদের আমরা ঘৃণা করি না। করি ঐ নিষ্পাপ জানকে। আমরা ঐ যে অন্ধকার জেলের পিচাশ বাশারের মতো মানুষকে ঘৃণা করি না, করি নাবিলার মতো মেয়েকে। অথচ এদের কোন অপরাধই নেই। তাহলে ধরে নেবো, তুমি আমাকেও ঘৃণা করো মা।

নাবিলার কথা শেষ হতে দেরি, রোকেয়া যা কখনও করেনি তা আজ করল। উঠেই ঠাস করে এক চড় নাবিলার গালে ফেলল। না রাগে না, বরং অভিমানে। তার মেয়েকে সে ঘৃণা করবে?

চড় খেয়ে নাবিলা আবারও হেসে ফেলল। তবে তার চোখে পানি। মায়ের মতো মেয়ের, মেয়ে হয়েও কথায় কথায় চোখের পানি কোথায় থেকে আসে কে জানে? সে তো ভালোই, নোভা তার চেয়েও দু'ডিগ্রি উপরে। তাই চোখের পানিটুকু মুছে বলল,

-- কিন্তু জানো মা, যাকে তুমি ঘৃণা করছ। সে কিন্তু বিয়ে করেই বউ নিয়ে নিজের মতো চলে যায়নি। বরং ঐ যে তোমার বাপের বাড়ির গেট সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার একটাই কথা, চাচির দোয়া না নিয়ে তার আদরের ছোট মেয়েকে ঘরে নিয়ে যাবে না। তার তো কেউ নেই। এখন যদি সবার দোয়াটাও না থাকে, তার শান্তি হবে কী করে।

রোকেয়া কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকাল। নাবিলা সেই বিস্ময় ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

-- মা, তুমি দেখো নিও। তোমার এক মেয়ে দুঃখের সাগর পাড়ি দিলেও, আরেক মেয়ে কখনও দেবে না। বরং এই মেয়ের সুখ দেখে তুমি নিজেই আঁতকে যাবে। নিজের নজর না লাগে সেই ভয়ে।

রোকেয়া অসহায় চোখে নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলা মায়ের গালে হাত রেখে বলল,

-- তোমার ছোট মেয়ে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে । মুখ ফিরিয়ে থেকো না মা। তুমি আমাদের কাছে কি, তুমি নিজেও জানো না। যাও মা। ছোট মেয়ে, আর ছোট মেয়ের জামাইকে বরণ করে নাও।

রোকেয়া সাথে সাথেই উঠল। উঠতেই পুরো বাড়ি এই মাঝ রাতেও পুরো গরম হয়ে গেল। এমনিতেই জয়েন ফ্যামিলি তার মধ্যে বিয়ের জন্য আত্মীয়- স্বজনে আগেই ভরে আছে। আর সেই সবা'ই হই- হুল্লোড় করে নতুন বউ আর জামাই বরণ করল। বরণ করল ঘুম ঘুম চোখে আসমানিও। আটটা বাজলে সে ঘুমে চোখে দেখে না। তবে নাবিলা প্রথম বার নোভার মতো তাকে টেনে আনল। আর নাবিলা আম্মার ক্ষেত্রে তার সাত খুন মাফ। তাই বরণ করেই আবার সোজা শুতে চলে গেল। জাগো বিয়া সে থাকব রাত ভর জেগে, তার থেকে কোন লাভ?

সবার শেষে বরণ করল রোকেয়া। নোভা ভয়ে শেষ, সে দু'কদম দূরেই রইল। এত মানুষের সামনে চড় টড় পড়লে মান সম্মান সব শেষ। তবে খালিদ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আর করতেই রোকেয়া প্রথম বার খালিদের সামনে মৃদু হাসল। হেসে মাথায় হাত রেখে বলল, -- বেঁচো থাকো বাবা।

খালিদ এই জীবনে কেঁদেছে বলে মনে পড়ে না। তবে আজ চোখে পানি এসে গেল। তবে সেই পানি অতি কৌশলে ফিরিয়ে নাবিলার দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, -- এই অপূর্ণতার জীবনে, তার সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো শাহরিয়ার। তাকে পেয়েছে বলেই, এই যে এই মিষ্টি মেয়েটা তার বোন, নাবিলের মতো একজন ভাই আর এই যে দু'কদম পিছিয়ে ভয়ে আধমরা হয়ে আছে তার সবচেয়ে আপনজন। তাকে যদি না পেত, এদের কাউকেই তার আর পাওয়া হতো না। কখনও না।

পুরো বাড়িতে হই হুল্লোড় চলতেই রইল। এতরাতে খাবারের টাবারের আয়োজন করতে খালিদ পুরো নিষেধ করল। তবে তার নিষেধ শুনে কে? ভারি না করলেও হালকা আয়োজনেই সবাই লেগে গেল। তার সাথে মামাতো শালা শালীরাও লেগে গেল, বাসর সাজাতে। উঠানে যে কয়টা ফুলের গাছ আছে, সব গাছকে ন্যাড়া করে ফুলতো ভালোই পাতাসহ নিয়ে এলো। সেগুলো দিয়েই যা পারল তাই সাজিয়ে দুলাভাইয়ের সামনে দাঁড়াল।

খালিদ তো খালিদ, যা আছে সবই তাদের হাতে তুলে দিল। দিতে দিতে বলল, -- আজ এইটুকুই, তবে কথা দিচ্ছি। পরে ঠিক মনমতো পুষিয়ে দেব।

শালি শালীরা এই দুলাভাই পেয়ে দুনিয়ায় খুশি। সেই খুশি টুশি ভাগ করে খালিদ যখন বাসর ঘরে এলো তখন ফজরের আজান দেবে দেবে করছে। ঘরে মৃদু আলো, সেই
আলোতে দেখল, তার বউ কাঁথা টাঁথা টেনে আরামছে ঘুমিয়ে আছে।

এই ঘুম বুঝি খালিদের সহ্য হবে? তাই একটান দিয়ে নোভাকে বসিয়ে ফেলল।

নোভা হতভম্ব! ঘুমের মধ্যে বিয়ের কথা সে ভুলেই গেছে। তাই চোখের সামনে খালিদের দাড়ি গোঁফের বিশাল মুখ দেখেই চিৎকার দিতে গেল। খালিদ সাথে মুখ চেপে ধরল। ধরে বলল,
-- মান সম্মান সব শেষ করে ফেলবে নোভা।

নোভার তখনই সব মনে পড়ে গেল, আর পড়তেই সাথে সাথে মুখ থেকে হাত সরাতে চাইল। তবে খালিদ নিজে থেকে না সরালে, তার পক্ষে কি কখনও সম্ভব? তাই খালিদ ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
-- উঁহুম, তোমার পক্ষে কোনদিনও সম্ভব না।

নোভা কঠিন চোখে তাকাল। খালিদ এই কঠিন চোখ দেখে হাসল। হেসে হাত সারাতে সরাতে বলল,-- দুনিয়ায় সব শক্তি এক জায়গায় এসেই ফুঁস, বউয়ের আগুন গরম চোখ।

নোভা এতো কিছু শুনল না। বরং বিরক্ত মুখে বলল,
-- পিছে, পিছে। একদম পিছে।

-- কেন?

-- কেন আবার কি? এই দাড়ি মুছের জঙ্গল নিয়ে আমার সামনে আসবেন না। এই দাড়ি মুছের জঙ্গল দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়। তাই দশ হাত দূরে। গুণে গুণে দশ হাত।

খালিদ দশ হাত দূরে যাবে, দূরের কথা, সে এগিয়ে নোভার কাথার ভেতরেই ঢুকে গেল। নোভা এক লাফে দূরে সরতে চাইল। তবে খালিদ পুরো আঁকড়ে নোভা গলার মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে বলল,

-- ব্যস, ঘুমাবো নোভা। এই দাড়ি গোঁফের প্রেমে না পড়া পর্যন্ত খালিদ তোমাকে বিরক্ত করছে না। তাই নিশ্চিতে ঘুমাও।

নিশ্চিন্তে ঘুমাবে মানে? গলার কাছে নোভার দুনিয়ায় সুরসুরি। তাই আবারো এক চিৎকার দিতে গেল। খালিদ খুব স্বাভাবিক ভাবে আবারো মুখ চেপে ধরে বলল,

-- ওহ, মনে হয় ভুল বলে ফেলেছি, নোভা। তোমার প্রেমে পড়া পর্যন্ত মনে হয় থাকতে পারব না। এই যে নিয়ত এক্ষুণি খারাপ হয়ে গেছে।

নোভা ফট করে খালিদের দিকে তাকাল। তার চোখ কপালে উঠে গেছে। খালিদ সেই চোখে চোখ রেখে বলল, -- জানোই তো আমি ভালো মানুষ না। তাই একটু তো জ্বালাবোই।

তোর জ্বালানোর খেতা কম্বল পুড়ি আমি। শালার জঙ্গল। বলেই নোভা খালিদের হাতে কয়েকটা দিতে গেল। তবে খালিদ খুব সুন্দর করে বউয়ের হাতদুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। তার মুখজুড়ে হাসি। প্রাণখোলা সুখের হাসি।

........

নাবিলার সকাল হলো, বারান্দার চেয়ারে বসে। আজকাল শহরের দিকের বাড়িতে উঠান থাকে না, বারান্দা থাকে না। তবে সেই নানুর আমলের বাড়ি। তাই এখনও কিছুটা উঠান আর বারান্দাটা রয়ে গেছে। আর এই বারান্দায় বসে কাঁচা হাতে কত আঁকাবুঁকি করেছে। পেতেছে কত স্বপ্নের খেলাঘর।

আর সেই খেলাঘরের বারান্দায় বসে বসে রাতের অন্ধকার হারিয়ে যেতে দেখল, আর এখন দেখছে ঐ যে সূর্য ওঠার আগাম প্রস্তুত্তি।

নাবিলার ইনসমনিয়া এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। মাঝে মাঝে ঘুমায়, মাঝে মাঝে এভাবেই কেটে যায়। সেই কেটে যাওয়ার মাঝে আসাদুজ্জামান নামাজের উদ্দেশ্যে বের হলেন। নাবিলাকে বারান্দায় দেখে অবাক হলেন না। বরং আবার নিজের রুমে গেলেন। গিয়ে আবার ফিরে এলেন কিছুসময়ের মাঝেই। হাতে একটা চিঠি, রেজিস্ট্রি করা চিঠি। ফোনের যুগে আজকাল কেউ চিঠি লিখে না। তাই যখন এলো, সে অবাক হয়ে গেল। সেই অবাক বিস্ময়ে রূপান্তর হলো চিঠির নাম দেখে, আফসানা।

অপূর্ব ফিরে গেলেও তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে। ধরা বাঁধা কাজ এই ছেলেকে দিয়ে হবে না, ভালো করেই জানে। তাই নিজের যা পছন্দ তাতেই লেগে গেছে। একটা ট্যুর কোম্পানিতে ঢুকে গেছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষ নিয়ে ঘুরছে ফিরছে, ট্রেকিংয়ে যাচ্ছে। আর ভিডিও তো আছেই। এমন কোন কোণা নেই, যেখান থেকে এখন এই ছেলেকে চেনে না। তার মধ্যে আছে দুনিয়ায় মেয়ে। সে নিজেও আজকাল কিছুটা পালিয়ে পালিয়ে চলে। দেখলেই একেকজন জেঁকে ধরে।

তবে আফসানা তাকে চিঠি লিখবে, এমন কোনো ধারণা তার কল্পনাতেও ছিল না। অবশ্য চিঠিটা এসেছে আরও সপ্তাহ খানেক আগে। তবে খোলার মতো সাহস তার হয়নি। যদি বলে বসে, আমার ছেলের সাথে যোগাযোগ এবার বন্ধ করো।

তবে কাল রাতে খুলেছে। সাহস কোথা থেকে হলো, কে জানে? তবে মন বলল, "অবশ্যই খোলা দরকার " তাই সাথেই সাথেই খুলেছে।

কিন্তু সেই রকম কিছুই লিখেনি। চিঠির ইনগেলাপের ভিতরে আরেকটা চিঠি। সেটা সরিয়ে রেখে, তার নামেরটা খুলল। সেখানে লেখা,

সামনাসামনি বা ফোনে কথা বলার মতো অবস্থায় হয়তো আমাদের নেই। তাই চিঠি লেখা। অবশ্য কথা বলার জন্য,
চিঠির চেয়ে বড় উত্তম এই দুনিয়ায় আর কিছু হতেই পারে না। সময়, দেশ, পৃথিবী, যতই এগিয়ে যাক না কেন, একে বিট করার মতো কিছু এখনও তৈরি হয়নি। কেন জানো?
কারণ চিঠিতে মানুষ নিজের কথাগুলো নিজের মতো করে বলতে পারে। কারো চোখের রাগ, অভিমানের ভয় থাকে না। থাকে না কথার মাঝখানে কেউ বিরক্ত করে দেওয়ার আশঙ্কা। নিজের মতো করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যায়, নির্বিঘ্নে।

যাই হোক, এ ধরনের কথা তোমার কাছে সব সময়ই অমূল্য, সময় নষ্ট মনে হতো। এখনও হয় কি না জানি না। তাই আর তোমাকে বেশি বিরক্ত করব না।

শুধু একটা রিকোয়েস্ট। দ্বিতীয় চিঠিটা আমার ছেলে মুগ্ধতাকে দিয়ে দিও। আমি সব সময় চেয়েছি, আমার ছেলের জীবনে কোনো অপূর্ণতা না থাকুক। অথচ সে ফিরে এসেছে এক বিশাল অপূর্ণতা বুকে নিয়ে।
এসে সব সময়ের মতো হেসে, খুব স্বাভাবিক গলায় তার মাকে বলেছে, -- সরি মা, আমি তোমার মনের মতো ছেলের বউ দিতে পারছি না। তাই, সরি ফর এভরি থিং। তোমার ছেলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য একজনের অপেক্ষা যাত্রা শুরু করছে। তোমার কি খুব বেশি কষ্ট হবে? হলেও এই টুকু আমার জন্য করো মা। প্লিজ...

আমার কষ্ট আমি কখনও আমার ছেলের ওপর চাপিয়ে দিইনি। তাই সেদিনও দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না।
তবে তার এই অনির্দিষ্ট যাত্রায় আমি যদি একটুও সঙ্গী না হতে পারি, তা হলে কেমন বন্ধু হলাম তার।

তাই এটুকুই রিকোয়েস্ট। চিঠিটা ওকে দিও। আমাদের ছেলে ভালো নেই আসাদ। তার ভালোর জন্য এইটুকু করো। প্লিজ।

আসাদুজ্জামান রাতেই দিতেন। তবে এত এত ঝামেলায় আর সুযোগ হয়নি। তাই এগিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। নাবিলা দেখে মিষ্টি করে হাসল। হাসতেই তার হাতে চিঠিটা গুঁজে বলল,
-- পৃথিবীতে ভালোবাসার নাম ভিন্ন হতে পারে। তবে ভালোবাসার রঙ কিন্তু এক। আর এই রঙ যার যার গায়ে লাগে, সেই রঙ কখনও ফিকে হয় না। তাই তো হাজার দোষ করলেও বাবা-মা সন্তানের উপর থেকে মুখ ফেরাতে পারে না। বোনে পাগল হোক, ভালো হোক, ভাইয়ের মতো ভাই হলে, কখনও ফেলে দেবে না। তেমনি একবার কেউ যদি ভালোবাসে, তার গায়ে কলঙ্কের কালিতে ঝলসে গেলেও, তার কিছু আসে যায় না। তার কাছে সে সব সময়ই রঙিন।

নাবিলা শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। আসাদুজ্জামান আর দাঁড়ালেন না। নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। তাই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন। নাবিলা সেই যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হাতের চিঠিটা খুলল। কোন শুরু নেই, শেষও নেই। ব্যস, লেখা...

নাবিলা, কেমন আছো সেটা আমি জিজ্ঞেস করব না। আমার ছেলে যে দুঃখ ছুঁয়ে যাবে, আর সেই দুঃখ সুখ হবে না, এটা হতেই পারে না।

এই দুনিয়ায় এসে আমার সব দুঃখকে সে সুখে পরিণত করেছে। ভেঙে যাওয়া আমিকে ছোট্ট হাতে আঁকড়ে ধরতে না পারলেও, লাঠি হয়ে ঠিকই সাহারা দিয়েছে। আর বড় হতে হতে সে হয়ে উঠেছে আমার বন্ধু।

ঠিক ভুলের হিসেব আমি করি না, নাবিলা। তবে এই ছেলেটা কোনও দিন মায়ের কোনও সিদ্ধান্তে আঙুল তোলেনি। তার কাছে একটাই সত্য, ভালো থাকা। তুমি ভালো আছো মানে তুমি ঠিক। তোমার সব সিদ্ধান্তই ঠিক।

কিন্তু এই ছেলেটাই এখন ভালো নেই, নাবিলা। উঁহুম… তার কিছুই সে কাউকে বুঝতে দেয় না। তার সব কিছু ঠিক। আগের মতোই ঘুরছে, ফিরছে, কাজ করছে।

আমার ছেলে এসবেতে কখনও ক্লান্ত হতো না, নাবিলা। মাসের পর মাস সে নিজের মতো থেকেছে। ঘুরেছে, কিন্তু ফিরে এসে কখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ বসে থাকেনি। বরং ফিরেই নতুন উদ্যমে আবার ঘোরার প্ল্যান করেছে। হেসে হেসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প বলেছে।
কিন্তু আজকাল আমার ছেলে ক্লান্ত হয়,উদাস হয়, মায়ের কোলে মাথা রেখে কথা খুঁজে পায় না।

আমি আমার ছেলেটাকে হারিয়ে ফেলছি, নাবিলা। অথচ এই ছেলেটা আমার গর্ব। হারিয়ে গেলে আমি বাঁচতে পারব না। তুমি কি আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে খুঁজে এনে দিতে পারবে, নাবিলা?

নাবিলার কোনো ভাবান্তর হলো না। অনেক অনেক দিন আগে, এমন একটা চিঠিই তার পুরো দুনিয়াটা ধ্বংস করে দিয়েছিল। আজ আবার এক চিঠি। গল্পগুলো সত্যিই ঘুরে ফিরে আসে, শুধু সময়টা বদলায়। সেদিন চিঠি পড়ে নাবিলা যেমন মূর্তির মতো বসে ছিল, আজও ঠিক তেমনই রইল। তবে সেদিন তার হুঁশ ছিল না, আজ আছে। তাই তো, এই যে নতুন করে উঁকি দিচ্ছে সূর্যটা, সেই উঁকি দেওয়ার দিকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

.......

সোশ্যাল মিডিয়ায় আজকাল নাবিলার একটা ভিডিও খুব ভাইরাল হিসেবে ঘুরছে। তার নতুন ছবির প্রমোশন হিসেবে এক পডকাস্টে অতিথি হিসেবে ছিল। যেখান তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, -- অভিনয় জগতে আসা শখ না স্বপ্ন?

সেখানে মিষ্টি মেয়ে নাবিলা মিষ্টি করে হেসে বলছে, -- শখ, স্বপ্ন কোনটাই না। আলাদিনের জিনির গল্পটা শুনেছিলেন। চেরাগের এক জিনি, আলাদিন নামের সামান্য এক চোরের জীবন কেমন পুরো বদলে দিয়েছিল। ঠিক তেমনি আমার জীবনে হঠাৎ করে এক জিনির আগমন হয়েছিল। যে আমার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে। আর তার জাদুর চুটকিতে আজ আমি নাবিলা। আপনাদে মিষ্টি মেয়ে নাবিলা।

হোস্ট খুব ইনসিস্ট করল, সেই আলাদিনের ব্যাপারে আরো কিছু বলতে। তবে নাবিলা তার বিপরীতে শুধুই মিষ্টি করে হাসল।

আর সেই হাসিই অনেক অনেক দূর থেকে অপূর্ব সব সময়ের মতো মুগ্ধ চোখে দেখল। তার ঠোঁটের কোণে নাবিলা মতোই হাসি। সেই হাসির মাঝেই দরজার টোকা পড়ল।

অপূর্ব মোবাইল রেখে তাকাতেই তাদের টিমের একজন বলল, -- সব রেডি অপূর্ব, আমাদের বেরুতে হবে। আর হ্যাঁ! এবারে হাইকিংয়ে একজন বাঙালিও আছে। স্পেশাল রিকোয়েস্টে এসেছে। আর তার ফার্স্ট হাইকিং। আই থিংক সি ইজ স্কেয়ার্ড। তুমি কি একটু দেখবে।

-- সি?
-- ইয়েস।
-- এলোন?
-- ইয়াপ।

অপূর্ব অবাক হলো। না বাঙালি দেখে না। তার ফ্যান হিসেবে অনেকেই আসে। তবে বন্ধুদের নিয়ে। এমন একা প্রথম কেউ এলো। তবে তার বিস্ময় প্রকাশ করল না। সবাই গোছগাছ করে জিনিসপত্র গাড়িতে রাখছে। কিন্তু সে এগিয়ে গেল ওয়েটিং লাউঞ্জে।

এগোতে এগোতে দেখল লং স্লিভের ফিটেড কালো টি-শার্ট, জ্যাকেট, হাইকিং প্যান্ট বুট গায়ে ছোট খাটো একটা মেয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা ওপাশে ফেরানো, তবে ক্যাপের স্ন্যাপব্যাক দিয়ে মাথার লম্বা পনিটেলের চুলগুরু বেরিয়ে আছে।

অপূর্ব নিজের স্বভাব মতো হেসে স্বাভাবিকভাবে বলল, -- হাই সুইট লিটল গার্ল। ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই। এটা খুবই সেইভ হাইকিং। আমরা সব সময় আমাদের বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করি।

নাবিলা হেসে ফেলল। লিটল গার্ল, তাও এই বয়সে এসে। তবে ফিরে তাকাল না। তাকাতে তার ইচ্ছেই হলো না। তবে না তাকালেও অপূর্ব থমকে গেল। এই হাসি অপূর্ব চিনবে না, এমনও বুঝি হয়?

তখনই দরজার আবার টোকা পড়ল। পড়তে পড়তে একজন বলল, -- অপূর্ব হারি আপ।

অপূর্ব এবার নিজেই হেসে ফেলল। হেসে নাবিলার ব্যাগটা হাতে তুলে নিতে নিতে বলল, -- যেখানে অপূর্ব আছে, সেখানে তোমার ভয়ও করে।

নাবিলা তখনই ফিরে তাকাল। অপূর্ব আজ নাবিলার মুগ্ধ করা মুখের দিকে তাকাল না, বরং তাকাল কালো টিশার্টের উপরে জ্বলজ্বল করা তার সেই চেইনটার উপরে। যেটা সে চলে আসার সময় ছোট্ট গিফট বক্সে দিয়ে এসেছিল। প্রিয় জিনিস প্রিয় মানুষের নামে। সাথে ছিল ছোট্ট চিরকুট। সেখানে লেখা ছিল, " কখনও যদি মনে হয় একটু এগুনো যায়, তবে পা টা আমার দিকে ফেলো নাবিলা। বাকিটুকু সব আমার। "

অপূর্ব হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল। দুজনের মাঝে আজও কিছুটা দূরত্ব। অপূর্ব সেই দূরত্বের দিকে তাকিয়ে রইল। আর তার দৃষ্টির সামনে দুটো পা থেকে একটা পা অনেক কষ্টে একটু বাড়ালো।

ব্যস, ওইটুকুই। অপূর্বের জন্য ওইটুকুই অনেক। তাই সেইদিন নাবিলার রুমের মতো বাকিটা অপূর্বই এগিয়ে এলো। তবে সেইদিন আলতো করে হাতটা আঁঁকড়ে ধরলেও, আজ কেউ এগিয়ে এসেছে ঝড়ের দাপটের মতো। যেই এক দাপটে নাবিলাকে পুরো ভাসিয়ে নিলো।

ওয়েটিং লাউঞ্জের দরজাটা পুরো হাট করে খোলা। দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভেতর থেকে সবাই মিটি মিটি হেসে সেই ঝড়ের দাপট দেখল। তার সাথেই দেখল, মুগ্ধতায় মাতাল, ভীষণ সুদর্শন এক এলোমেলো ছেলেকে। আর তার পাশে নুইয়ে পড়া, লাজুক মিষ্টি একটা মেয়েকে।

#সমাপ্ত

আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 40 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন