নিহা নিজের ভেতরের প্রকাণ্ড ঝড়টাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে রাখল। তার হাত-পা কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে কাঠ। সে নিজের গায়ের ওড়নাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে কোনোমতে থরথর করে কাঁপা গলায় বলল, "না খালামণি... আমার... আমার হঠাৎ একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ মনে পড়েছে। কলেজের একটা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ সময় আজ। আমি... আমি পরে একদিন সময় করে আসব, সত্যি আসব।"
কথাটা শেষ করারও সুযোগ না দিয়ে সে উল্টো ঘুরে একপ্রকার দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল। বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটা এমনভাবে লাফাচ্ছে যেন পাজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। মেন রোডে এসেই সে চিৎকার করে একটা চলন্ত ট্যাক্সি থামাল। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "নদীর পারের ওই পুরোনো পরিত্যক্ত জুট মিলটায় যাবেন? যত টাকা চান দেব, প্লিজ একটু দ্রুত চালান!"
ড্রাইভার কিছুটা অবাক হয়ে নিহার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু নিহার চোখের চরম আকুতি আর অস্থিরতা দেখে আর কোনো প্রশ্ন না করে গাড়ি ছেড়ে দিল। ট্যাক্সিতে বসে নিহা হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সময় যেন কোনো পিশাচের মতো রক্তচক্ষু উঁচিয়ে তাকে ভেংচি কাটছে। মাত্র ত্রিশ মিনিট! এই ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তাকে যদি অয়নের কাছে না পৌঁছানো যায়, তবে হয়তো এই পৃথিবীতে অয়ন বলে আর কেউ থাকবে না।
ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে নিহার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে দু হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। মনে মনে ভেবে কুল পাচ্ছিল না—কার সাথে এই অদ্ভুত, বিষাক্ত আর আতঙ্কময় খেলায় জড়াল সে? কে এই নির্মম লোক? কে এই উন্মাদ, যে তাকে পাওয়ার জন্য এতগুলো জীবন ছারখার করে দিতে পারে, একটা নির্দোষ ছেলেকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে পারে? নিহার মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কত স্মৃতি অয়নের সাথে তার—স্কুলের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে গল্প করা, টিফিনের খাবার ভাগ করে খাওয়া, বৃষ্টির দিনে একসাথে রিকশায় ঘোরা। সেই সহজ-সরল হাসিভরা অয়ন আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, আর তার কারণ শুধুই নিহা!
একবার মনে হলো ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে সব জানিয়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই ছবির নিচের সেই বীভৎস হুমকির কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠল সে। না, কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। লোকটা নির্ঘাত আশেপাশে নজর রাখছে। পুলিশ কোনোভাবে টের পেলে অয়নকে এক মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেবে। অয়নের জীবনের দাম তার নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বেশি।
শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, ঝলমলে আলোর রোশনাই আর গাড়ির হর্ন ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে লাগল। ট্যাক্সিটা যত ভেতরের দিকে এগোচ্ছিল, রাস্তার দুপাশের লোকালয় তত পাতলা হয়ে আসছিল। আর্দ্র বাতাসে ভেসে আসতে শুরু করেছে জং ধরা লোহা আর বুনো লতাপাতার গন্ধ। সন্ধ্যা নেমে আসতেই চারপাশ যেন এক নিস্তব্ধ, হিমশীতল ও বুকচাপা অন্ধকারে ডুবে গেল। জুট মিলের সামনের পথটা বহু বছর ধরে চলাচলের অযোগ্য। ইট-পাথরের রাস্তা শেষ হয়ে সেখানে শুরু হয়েছে কাঁচা, ভেজা মাটির পথ।
শহরের কোলাহল বহুদূরে ফেলে ট্যাক্সি ড্রাইভার জুট মিলের জরাজীর্ণ গলির মুখে এসে হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিল। চাকার ঘর্ষণে শুষ্ক মাটিতে ধুলোর কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। ড্রাইভার পেছনের সিটের দিকে তীব্র আতঙ্কে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলল, "ম্যাম, সামনে তো পুরো জঙ্গল আর ঘন অন্ধকার! রাস্তা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই, এরপর গাড়ি নিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিত বিপদ। ডাকাত বা অপরাধীদের আখড়া ওসব জায়গা। আমার পক্ষে আর এক পা-ও সামনে যাওয়া সম্ভব না। আপনিও ফিরে চলুন ম্যাম, এই নির্জন জায়গায় একা যাওয়া ঠিক হবে না।"
নিহা কোনো কথা বলল না, ইতস্তত করার মতো এক সেকেন্ড সময়ও তার কাছে ছিল না। মানিব্যাগ থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে ড্রাইভারের সিটে ছুঁড়ে দিয়ে সে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
গভীর নিশিরাতের গা-ছমছমে অন্ধকারের মাঝেই সে একা একা সামনের দিকে হেঁটে যেতে লাগল। চারপাশটা যেন মৃত্যুর মতো ঠান্ডা আর স্তব্ধ। তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুকনো ঝরাপাতা মচমচ করে ভেঙে গিয়ে এক করুণ, আতঙ্কময় শব্দের সৃষ্টি করছে। দূর থেকে হু-হু করে বয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসে ভেসে আসছে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর স্যাঁতসেঁতে শেওলা আর পুরোনো ভেজা পাটের এক উগ্র, ভারী দুর্গন্ধ। সেই পচা দুর্গন্ধ নিহার শ্বাসনালীতে গিয়ে বিধছিল। চারপাশের গহীন নিস্তব্ধতা চিরে কেবল ঝিঁঝিঁ আর নিশাচর পোকাদের একটানা তীক্ষ্ণ ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই—যে নীরবতা মনের ভেতরে এক অজানা আতঙ্কের শিহরণ জাগায়।
সামনেই বিশাল আকৃতির এক কঙ্কালের মতো নির্জীব ও ভয়াল রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত জুট মিলের জরাজীর্ণ ভবনটি। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই লাল ইটের মিলটি বহু বছর ধরে বন্ধ। ছাদ ধসে গেছে, দেওয়াল ধরে ধরে উঠেছে প্রকাণ্ড বট-পাকুড়ের শেকড়।
ভবনের বিষণ্ন ও স্যাঁতসেঁতে ভেতরে পা রাখতেই বাইরের বাতাসটাও যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, চারপাশ নেমে এল এক নিশুতি নিঝুম নীরবতা। চারপাশের আর্দ্রতা আর প্রাচীনত্বের গন্ধ নিহার শ্বাস আটকে আনছিল। নিহা ভয়ের এক হিমস্রোতে ভেতরে ভেতরে জমে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল প্রতিটি দেওয়ালের আড়াল থেকে যেন একাধিক বিষাক্ত চোখ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। নিজের তীব্র বুক ধড়ফড়ানি সামলে কোনোমতে কাঁপা কাঁপা গলায় তোতলে তোতলে ডাকল, "ক-কে... কে আছেন এখানে? আ-আমি... আমি এসে গেছি! দয়া করে অয়নকে ছেড়ে দিন... ওকে আর কোনো কষ্ট দেবেন না! যা চাও আমি করতে রাজি আছি, শুধু অয়নকে মুক্তি দাও!"
তার করুণ আকুতি বিশাল খালি হলঘরটায় প্রতিধ্বনি তৈরি করল—“অয়নকে ছেড়ে দিন... ছেড়ে দিন...”
ঠিক তখনই মিলের দোতলার জং ধরা বারান্দা থেকে ভেসে এলো একটা অত্যন্ত ভারী, গম্ভীর আর হিমশীতল কণ্ঠস্বর—যে স্বরে কোনো স্বাভাবিক মানুষের অনুভূতি ছিল না, ছিল কেবল এক উন্মাদ ভালোবাসার হিংস্রতা।
"আমি জানতাম তুমি ঠিক আসবে, নিহা। আমি জানতাম!"
কথা শেষ করেই অন্ধকারের ভেতর থেকে লোকটা এক বিকৃত ও উন্মত্ত হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই পিশাচসিদ্ধ হাসির প্রতিধ্বনি যেন মিলের প্রতিটি দেয়ালে আছড়ে পড়ে নিহার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের এক শীতল স্রোত বইয়ে দিল। হাসির শব্দটা এতটাই বীভৎস যে নিহা দু হাতে কান চেপে ধরতে বাধ্য হলো।
"তোমার ভেতরে থাকা এই অবুঝ ভালোবাসা, এই মায়াটুকুই তো আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে একটা পাগলে পরিণত করে তোলে," দোতলা থেকে আবার ভেসে এলো কণ্ঠস্বরটা। "জানো নিহা, তোমাকে ভালোবাসার পর থেকে আমার আর কোনো রক্ত-মাংসের অনুভূতির প্রয়োজন হয়নি। তুমি আমার নিঃশ্বাস, তুমি আমার অভিশাপ! তুমি শুধু আমার! অন্য কেউ তোমার দিকে তাকালেও আমার রক্ত টগবগ করে ফোটে। আর যে তোমার আর আমার মাঝে আসার চেষ্টা করবে, তাকে আমি এই পৃথিবী থেকেই মুছে দেব।"
কথাগুলো কানে আসতেই নিহা ভয়ে শিউরে উঠে দোতলার দিকে তাকাল। জরাজীর্ণ ভাঙা ছাদের ফাটল দিয়ে আসা আবছা জোছনা আর অন্ধকারের অদ্ভুত খেলায় সেখানে এক দীর্ঘ ছায়ামূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোলাটে আলো-ছায়ায় লোকটির রক্তলোলুপ চোখের দৃষ্টি আর ঠোঁটের কোনায় ভেসে থাকা সেই বিষাক্ত ক্রূর হাসি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ কাঠের মেঝেতে তার ভারী মিলিটারি বুটের শব্দ তুলে এগোতে লাগল। ঠক... ঠক... ঠক... প্রতিটি বুটের শব্দ যেন নিহার বুকে এসে বিঁধছিল। লোকটির ডানহাতে উঁচিয়ে ধরা ধারালো বিষাক্ত ছুরিটির ফালা আবছা জোছনার আলোতে এক মারণ ঝিলিক দিয়ে উঠল।
ছুরিটার ধারালো দিকে নিজের অন্য হাতের আঙুল স্বাচ্ছন্দ্যে বুলিয়ে সেখান থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত চুষে নিতে নিতে সে বিড়বিড় করে বলল, "অয়নকে ছেড়ে দেব? হা হা হা... ও তো অনেক ভাগ্যবান নিহা! কারণ আজ ও সাক্ষী হচ্ছে আমাদের এই অমর ভালোবাসার। ও দেখবে তুমি কীভাবে চিরতরে আমার হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু তুমি যদি আর একটা পা-ও পেছানোর চেষ্টা করো, তবে তোমার ভালোবাসার অয়নকে আমি তোমার চোখের সামনেই কুচি কুচি করে কেটে ফেলব!"