#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ০৪
#সোনালিকা_বিনতে_আইজা
মৌমিতার শ্বশুর বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকে তুবার মনটা ভার। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজেকে এক প্রকার ঘরবন্দী করে ফেলেছে। রাইমার সাথে কৌশিকের স্বাভাবিক আচরণ তুবা কিছুতেই মানতে পারছে না। কৌশিক জানে, রাইমা ওকে নিয়ে মনে মনে সংসার করার স্বপ্ন দেখে। কৌশিককে পছন্দ করে। জানার পর তো কৌশিকের তাকে এড়িয়ে চলা উচিত। তা না করে আরও ঘেঁষা ঘেঁষি করছে। ব্যপারটা কিছুতেই হজম করতে পারছে না তুবা। ওর ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু বাপ চাচাদের ভয়ে গলা থেকে আওয়াজ বের করতে পারছে না। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁটির মতো বিছানায় বসে আছে। রিয়া, মৌমিতা ডেকে গেছে। কিন্তু তুবা কারোর সাথে নিচে যায়নি। মৌমিতার স্বামী রাতুলও ডেকে গেছে। তুবা তবুও ঘর থেকে বের হয়নি। নিচে বসার ঘরে সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে। হৈচৈ করছে। তুবা দোতলা থেকে সব শুনতে পেলো। কিন্তু মনের রাগে আর আড্ডায় সামিল হতে নিচে নামলো না।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন আটটা। এই সময় বাড়ির সবাই একসাথে ডিনার করে। এ বাড়ির বহু বছরের পুরনো নিয়ম। সকালে এবং রাতে সবাই একসাথে খাবার খায়। দুপুরে যার যার কাজে থাকায় ওই একবেলা আলাদা ভাবে খেয়ে নেয়। সেই রেশ ধরে আটটার পরেই তুবার ঘরের দড়জায় টোকা পড়লো। তাওহীদ ভুঁইয়া ভারি কন্ঠে ডেকে উঠলেন,
"তুবা। আম্মু। তারাতাড়ি বাবার সাথে নিচে এসো। তোমার বড় চাচ্চু ডাকছে।"
বাবার কন্ঠস্বর শুনে ধরে রাখা শক্ত মন নরম হয়ে এলো তুবার। বড়ো চাচ্চুর হুকুম অমান্য করার স্পর্ধা এবাড়ির কারোর নেই। সেই স্পর্ধা তুবা দেখাবে কিভাবে? তাই অগত্যাই তাকে নিচে নামতে হলো। বাবার সাথে গুটিগুটি পায়ে নিচে আসার পর দেখা গেলো ড্রয়িংরুমে পায়চারি করতে থাকা বিচলিত কৌশিককে। কোনো কারণে ছটফট করছে ছেলেটা। তুবাকে নিচে নামতে দেখে লম্বা লম্বা কদম ফেলে এগিয়ে এলো। তুবা চেয়ার টেনে বসতেই ঠিক পাশের চেয়ারটা টান দিয়ে বসে পড়লো কৌশিক। যেনো এতোক্ষণ ধরে তুবার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। কৌশিক পাশাপাশি বসে হাত দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিলো। এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো তুবার দিকে। মেয়েটা এক সেকেন্ডের জন্যও তাকাচ্ছে না। বড়ো কঠিন শাস্তি দিচ্ছে কৌশিককে। সে কি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে?
কৌশিকের ভাবনার ছেদ ঘটলো তুবার মা ময়না বেগমের ডাকে। তিনি আদুরে সুরে প্রশ্ন করলেন,
"রুটি দেবো নাকি পরোটা আব্বু?"
কৌশিকের ধ্যান ভাঙলো। নড়েচড়ে বসে বললো,
"পরোটা দাও চাচি।"
ময়না বেগম তিনটে ঘিয়ে ভাজা পরোটা কৌশিকের প্লেটে তুলে দিলেন। পাশ থেকে তুবা বলে উঠলো,
"আমাকে রুটি দিও তো আম্মু। আমি পরোটা খাবো না।"
মেয়ের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালেন ময়না বেগম। অবাক হয়ে বললেন,
"ওমা! তুই আবার কবে থেকে পরোটা রেখে রুটি খাওয়া শুরু করলি? তুই তো রুটি খাস না।"
"খাই না আজ খাবো। দাও তুমি।"
তুবার হাবভাব সূক্ষ্ম চোখে পড়খ করছে মৌমিতা। তুবার খাদ্য তালিকার ভিন্নতা দেখে প্রশ্ন করেই বসলো,
"এই তোর কি হয়েছে রে?"
"ভুতে ধরেছে আপু। তুবাকে নিশ্চয়ই ভুতে ধরেছে। তাই তো এমন অদ্ভুত ব্যবহার করছে।"
টেবিলের অপর পাশ থেকে নীরব খিলখিল করে হেঁসে বললো। নীরবের মা নাইমা বেগম ছেলের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে চুপ করতে বললেন। জামাল সাহেব ভারি কন্ঠে ধমকে উঠলেন,
"আহ্! থামবে তোমরা? আমার বাড়িতে খাবারের অভাব পড়েছে নাকি? যে অপশন দিচ্ছো? বাচ্চারা যা খেতে চাইবে তাই দিবে। না থাকলে রান্না করে এনে দিবে। ছোটো বউ, তুবা যা চাইছে দাও। আর খাওয়ার সময় কথা কম বলবে সবাই।"
জামাল সাহেবের গম্ভীর কন্ঠ শুনে চুপ হয়ে গেলো সবাই। ময়না বেগম তুবার পাতে একটা রুটি দিয়ে চলে গেলেন। কারণ তিনি জানেন, ঝোঁকের বশে চাইলেও এই মেয়ে অর্ধেক রুটিও খাবে না। সবাই যার যার মতো খাওয়ায় ব্যাস্ত হওয়ার পর তুবা অরুচি নিয়ে রুটি চিবোতে লাগলো। বিষয়টা কেউ খেয়াল না করলেও কৌশিকের নজরে ঠিক পড়েছে। এবং কৌশিক খুব ভালো করেই জানে তুবা ওর ওপর জেদ করেই রুটি নিয়ে বসেছে। মেয়েটার খাওয়া নিয়ে ছেলেমানুষী একদম পছন্দ হলো না কৌশিকের। সে নিজেও আর ঠিক মতো খেতে পারলো না।
-
-
রাত তখন দুইটা ছুঁই ছুঁই। ভুঁইয়া মঞ্জিলের সকল সদস্য ঘুমে বিভোর। প্রতি রাতের এই সময়টাই হলো কৌশিকের একান্ত প্রহর। নিঃশব্দে দড়জা খুলে বাইরে বের হলো কৌশিক। দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে একবার নিচে দেখে নিলো। সবগুলো ঘর অন্ধকার। অথাৎ সবাই পুরোপুরি ঘুম। দোতলা বাড়িটাতে বড়রা সবাই নিচে থাকে। আর বাচ্চারা চারজন থাকে দোতলায়। এতে অবশ্য কৌশিকের একটু সুবিধাই হয়েছে। হুট করেই বড়দের চলে আসার ভয় নেই। কৌশিকের পাশের ঘরটা তুবার।
কৌশিক নিচে একবার নজর বুলিয়ে সোজা চলে গেলো তুবার ঘরের দড়জার সামনে। দুই আঙ্গুলে দড়জায় টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তুবা তখন জেগেই ছিলো। পেটে খুদা নিয়ে সে আবার ঘুমাতে পারে না। তখন একটা রুটির চার ভাগের একভাগ খেয়ে ঘরে চলে এসেছে। এখন খুধায় পেট চেপে ধরে বসে আছে। এমন সময় দড়জায় টোকা পড়ায় নড়েচড়ে বসলো তুবা। সে খুব ভালো করেই জানে এই মুহুর্তে তার ঘরে কে আসতে পারে। তাই জেদ ধরে আর দড়জা খুললো না। সেভাবেই বসে রইলো। খানিক পর কৌশিকের গম্ভীর আওয়াজ এলো,
"তুবা! দড়জা খোল।"
"খুলবো না। আপনি যান তো।"
তৎক্ষনাৎ রেগে জবাব দিলো তুবা। কৌশিক মাথা দুলিয়ে হাসলো। দ্বিতীয়বার আর ডাকলো না। উল্টো ঘুরে গটগট পায়ে দড়জার সামনে থেকে চলে গেলো। মিনিটের মধ্যে কোনো আওয়াজ না শোনায় কান পেতে দিলো তুবা। নাহ্, দড়জা থেকে কোনো শব্দ আসছে না। আচমকা কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। তাড়াহুড়ো করে ছুটলো বেলকনির দিকে। পাশাপাশি ঘর হওয়ায় তুবা এবং কৌশিকের ঘরের বেলকনি কাছেই। তুবা যখন বেলকনিতে পৌঁছেছে ততক্ষণে কৌশিক নিজের বেলকনি থেকে তুবার ঘরের বেলকনিতে লাফ দিয়েছে। কৌশিককে লাফ দিতে দেখে আঁতকে উঠলো তুবা। দুইটা বেলকনির মাঝে প্রায় দুই তিন হাত দুরত্ব। লাফ দিতে গিয়ে কৌশিক যদি পড়ে যায়?
তুবার ভয়কে সত্যি করে কৌশিকের পা পড়লো বেলকনির একদম কোণায়। ভয়ে দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌড়ে কাছে এলো তুবা। কৌশিকের হাতটা ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে নিয়ে গেলো। পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো কৌশিক। কৌশিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতেই তুবা বুকে হাত রেখে হাঁপালো। প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছে মেয়েটা। তুবাকে এমন হাঁপাতে দেখে ওর কাছে এগিয়ে এলো কৌশিক। পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
"রিল্যাক্স জান। শান্ত হ। আমি ঠিক আছি।"
এই পর্যায়ে তুবা তেতে উঠলো। ঘুরেই কৌশিকের বুকে এলোপাথাড়ি কিল ঘুসি মারতে লাগলো। ওর নরম হাতের কিল ঘুসিতে কৌশিকের থোরাই ব্যাথা লাগছে? বরং বুকে সুরসুরি লাগছে। কৌশিক হেসে তুবার দুই হাত ধরে পেছন দিকে মুড়িয়ে ফেললো। তুবার বুক ঠেকলো কৌশিকের প্রসস্ত বুকে। নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কৌশিক বললো,
"এসব কি হ্যা? মনে হচ্ছে বুকে কেউ তুলোর বল দিয়ে বারি মারছে। সুরসুরি লাগছে তো।"
"আপনি খুব খারাপ। কেনো করলেন এমন? পড়ে গেলে কি হতো?"
মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বললো তুবা। বিপরীতে কৌশিক নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
"আসলেই তো। কি হতো পড়ে গেলে? মরে যেতাম? এই রে! তুই তো বিধবা হয়ে যেতিস।"
আচমকা কৌশিকের মুখে মরার কথা শুনে ছটফটানি থেমে গেলো তুবার। ছলছল চোখে তাকালো কৌশিকের দিকে। পরপরই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেললো। তুবাকে কাঁদতে দেখে হকচকিয়ে গেলো কৌশিক। তাড়াহুড়ো করে তুবার গাল দুই হাতে আগলে ধরে বললো,
"এই জান। কাঁদছিস কেনো? আরে, মজা করলাম তো।"
"এমন মজা কেনো করবেন?"
"আচ্ছা বাবা স্যরি। আর করবো না। এবার চুপ হয়ে যা।"
তুবা তবুও কেঁদে চলেছে। কৌশিক ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে বললো,
"স্যরি বললাম তো। তবুও থামবি না? ঠিক আছে। তাহলে আমার কায়দায় কান্না থামাই।"
বলেই তুবার দুই ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো কৌশিক। মুখ থেকে আর একটা শব্দও বের হতে দিলো না তুবার। ছটফটানিও থেমে গেলো মুহুর্তেই। মিনিটের ব্যবধানে কান্নার কথা ভুলেই বসলো তুবা। কৌশিক সময় নিয়ে সরে এলো। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ছেড়ে দিলো। ফিসফিস করে বললো,
"বলেছিলাম না? কাঁদলেই কষে চুমু দেবো। আবার কাঁদ। আবার চুমু দেবো। আমার কিন্তু ভালোই লাগে।"
বিনিময়ে কোনো জবাব দিলো না তুবা। মুখ ফুলিয়ে মাথা নিচু করে রইলো। কৌশিক হাসলো।
"সামান্য কথা বলাতেই এতো রাগ?"
"কথা বলবেন কেনো?"
"ভুল হয়ে গেছে মহারানী। আর কোনোদিন রাইমার সাথে কথা বলবো না। মাফ করুন। এখন আপনার রাগ ভাঙাতে কি করি? কড়া করে আদর করে দেবো?"
"বারন করলে শুনবেন?"
"কখনোই না। আমার বউকে আমি আদর করবো। বারন শুনবো কেনো?"
তুবা জবাব দিলো না। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কৌশিক তুবার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"মুখ ঘুরিয়ে রাখলে কিন্তু এডাল্ট আদর করবো। একেবারে সর্বোচ্চ লেভেলের আদর।"
"আপনি ভিষণ অসভ্য।"
"বউয়ের কাছে অসভ্য হওয়া জায়েজ।"
তুবা প্রসঙ্গ পাল্টালো,
"এতো রাতে কেনো আসলেন?"
"আমার অভিমানী বউ সারা রাত না খেয়ে থাকবে। সেটা কিভাবে মেনে নেই? তোর জন্য চিকেন ফ্রাই নিয়ে এসেছি। উইথ হট টমেটো সস। সঙ্গে এই হট ছেলেটাও আছে। টেস্ট করে দেখতে পারিস।"
বেলকনিতে লাফ দেয়ার সময় কৌশিকের হাতে একটা বাক্স ছিলো। যেটা তুবা তখন খেয়াল করেছে। কৌশিকের এই ছোটো ছোটো কেয়ার গুলো তুবাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। তুবার বিষয়ে তিল পরিমাণ কোনোকিছু কৌশিকের নজর এড়ায় না। এই দিক থেকে তুবা পৃথিবীর সবচাইতে ভাগ্যবতী নারী।
কৌশিক তুবাকে নিয়ে বেলকনির মেঝেতে বসে পড়লো। নিজে পা মেলে বসে তুবাকে নিজের হাঁটুর ওপর মুখোমুখি করে বসালো। মাঝারি বক্সটা খুলে তুবার সামনে এগিয়ে দিলো। পছন্দের খাবার চোখের সামনে দেখে লোভে চোখ চকচক করে উঠলো তুবার। একপ্রকার হামলে পড়লো চিকেন ফ্রাইয়ের ওপর। কৌশিক নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলো তুবার পানে।
পুরো একটা চিকেন ফ্রাই শেষ করে তুবা দ্বিতীয়টাতে হাত দিলো। কৌশিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
"খাবেন?"
কৌশিক ডানে বামে মাথা নেড়ে না বোঝালো। ধীরে সুস্থে টমেটো সসে আঙুল ডুবিয়ে তুবার ঠোঁটের কোণে লাগিয়ে দিলো। বাঁকা হেসে নিজের পুরুষালী ঠোঁট চেপে ধরলো তুবার মুখে লাগানো সসে। তুবা আবেশে দুই চোখ বন্ধ করে নিলো। এক হাতে খামচে ধরলো কৌশিকের পিঠের শার্ট। কৌশিক সময় নিয়ে জিভ দিয়ে তুলে নিলো সসের অংশ টুকু। চোখে মুখে তার তৃপ্তির আভাস। তুবার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"চিকেন নয়। আমি তো তোকে খাবো। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কর জান। আমার আদর করতে অনেক সময় লাগবে।"
চলবে?