#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ০৮
#সোনালিকা_বিনতে_আইজা
সুবিশাল আকাশের বুক চিরে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা লুকোচুরি খেলছে। রাতের আধার কেটে গিয়ে পূর্ব গনগনে সূর্য উদয় হয়েছে। ভোরের আবছা আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের চারিদিক আলোকিত করে দিচ্ছে। ভোরের শীতল হাওয়া দমকে দমকে ছুয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত মানব মানবীর চোখ মুখ। কৌশিকের প্রসস্ত বুকে বিড়ালছানার মতো গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে তুবা। ছোটো দেহখানা অসহ্য ব্যথায় জর্জরিত। পুরো রাত কৌশিকের পাগলামি সহ্য করে একটু আগেই চোখ দুটো লেগে এসেছে।
আচমকা একমুঠো শীতল দমকা হাওয়া এসে গায়ের পাতলা সিল্কের চাদর কাঁপিয়ে তুললো। কৌশিকের ঘুম ছুটে গেছে তৎক্ষনাৎ। চোখ পিটপিট করে একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো কৌশিক। মাত্র ভোর পাঁচটা বাজে। চারিদিকে মৃদুমন্দ আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ঘড়ির থেকে নজর ঘুরিয়ে কৌশিক তুবার মুখের দিকে তাকালো। উন্মুক্ত বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে তুবা। চেহারায় হাজারও ব্যথার ছাপ। তবুও বেশ নিশ্চিন্ত। যেনো, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় এই মুহুর্তে আছে সে। সেই ভাবেই কৌশিককে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে।
কৌশিক ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। ডান হাতে তুবার মাথায় আলতো করে হাত রাখলো। কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলো। কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"জান! উঠে পড়। সকাল হয়ে গেছে। গোসল করতে হবে তো।"
তবে ঘুম কাতুরে তুবা সেই ডাকে পাত্তা দিলো না। মারার মতো কৌশিকের বুকেই পড়ে রইলো। কৌশিক আরও একটু ঘনিষ্ঠ হলো। তুবার ফুলিয়ে রাখা গোলাপি ঠোঁটে ছোট্ট করে চুমু খেলো। এই পর্যায়ে তুবা বিরক্ত হলো বেশ। চোখ বন্ধ রেখেই ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
"উফফ! ঘুমাতে দেন না।"
তুবার ঘুম জড়ানো মোহনীয় কন্ঠ শুনে নিজের ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললো কৌশিক। নেশা ধরে গেলো। আরও একবার ঘনিষ্ঠ হওয়ার বাসনা জাগলো। এই মুহুর্তে তুবা দূরে থাকলে হয়তো নিজেকে সামলে নিতো কৌশিক। কিন্তু এমন নেশাক্ত সময়ে প্রিয় মানুষ বুকে অবস্থান করায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালো। অবাধ্য অনুভূতিরা কৌশিকের প্রেমিক হৃদয়কে উস্কে দিলো। আর ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলো না কৌশিক। এক টানে তুবাকে নিচে ফেলে, কৌশিক তুবার উপরে উঠলো। দুই হাতের আঙ্গুল গুঁজে দিলো তুবার আঙ্গুলে। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ডুবিয়ে দিলো তুবার ঘাড়ে।
ঘুমের মধ্যে কি হয়ে গেলো বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো তুবার। কিন্তু ঘাড়ের সাথে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শ পাওয়ায় তুবা পূর্ণাঙ্গ হুঁশে ফিরলো। নিচু স্বরে চেচিয়ে উঠলো,
"কি করছেন?"
"তোকে আবার চাই জান।"
"একটু আগেই তো...."
"শুউউউ....."
তুবাকে কথা শেষ করতে দিলো না কৌশিক। অল্প একটু মাথা তুলে তুবার ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ধরলো। কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"প্লিজ জান। আমি আর পারছি না। নেশা ধরে গেছে। ভেতরে আগুনের মতো জ্বলছে। এখন তুই আমাকে ফিরিয়ে দিলে আমি মরেই যাবো।"
কন্ঠে ছিলো এক আকাশ সমান আকুতি। কৌশিকের আকুতির কাছে হার মেনে নিলো তুবা। দেহের ব্যথাকে এক সাইডে রেখে নতুন করে মনে সাহস জোগালো। আস্তে আস্তে দুই হাত কৌশিকের পিঠে রাখলো। তুবার তরফ থেকে সম্মতি পেয়ে মুচকি হাসলো কৌশিক। পুনরায় ঘাড়ে মুখ ডুবালো। ঠোঁটের ছুঁয়ে বেড়ালো ঘাড়, গলা, বক্ষস্থল। তুবার নরম দেশজুড়ে গভীর ভাবে কৌশিকের হাতের বিচরণ চললো। সর্বাঙ্গে হাত বুলালো। এক একটা ছোঁয়ায় ছিলো হাজারও ব্যাকুলতা। কৌশিকের ছোটো ছোটো চুমুতে অস্থির হয়ে উঠলো তুবা। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বাড়লো। কৌশিকের উন্মুক্ত পিঠ দুই হাতে খামচে ধরলো। কৌশিক তুবার গভীরে প্রবেশ করলো। সর্বোচ্চ গভীরে। তুবার চোখ থেকে দু ফোঁটা খুশির অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। কৌশিক তুবার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললো,
"তোর মাঝে এতো সুখ, তা আগে জানতাম না। এই সুখের নেশা কেনো ধরালি? আই লাভ ইউ জান। আই লাভ ইউ ডেস্পারেটলি। আই লাভ ইউ মোর দ্যান মাইসেল্ফ।"
কৌশিকের আকুতি চরম নেশার সমুদ্রে ডুবিয়ে দিলো তুবাকে। তুবা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো কৌশিকের পিঠ। যেনো পাঁজরে ঢুকে যেতে চাইছে। কৌশিকের পাগলামি বাড়লো। আরও একবার সুখের সাগরে ডুব দিলো দুজন।
-
-
মৌমিতা পুরো ঘর জুড়ে পায়চারি করছে। অস্থির চিত্তে দুই হাতের তালু ঘষে যাচ্ছে। এখন সকাল সাতটা। তুবার ঘরের দড়জা এখনও খোলেনি কৌশিক। হঠাৎ তুবা কোথায় চলে গেছিলো? কৌশিক ওকে কোথায় খুঁজে পেলো? কৌশিকের কোলে চোখ বন্ধ করেই বা কেনো ছিলো মেয়েটা? হাজারটা প্রশ্ন মৌমিতার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সবগুলো প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই।
রাতুল সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল। মৌমিতাকে এমন অস্থির হয়ে পায়চারি করতে দেখে ফোনটা পাশে রেখে দিলো। অধৈর্য্য সুরে বললো,
"তুমি থামবে মৌ? সেই কাল রাত থেকে এমন ছটফট করছো। সারা রাত ঠিক মতো ঘুমাওনি। এমন করলে তুমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়বে।"
"তুবার কি হয়েছে বলো তো রাতুল? ও আমার সবচেয়ে আদরের বোন। আমি ওকে বুঝি। তুবা নিশ্চিত ভালো নেই।"
"ওকে ভালো রাখার জন্য কৌশিক আছে। তোমার চাইতে বেশি ভালো রাখার ক্ষমতা সে রাখে। তুমি চিন্তা করা বাদ দাও তো।"
মৌমিতার মন মানলো না। চোখ মুখে তখনও দুশ্চিন্তার ছাপ। আচমকা বিকটা শব্দে পাশের ঘরের দড়জা খোলার আওয়াজ হলো। দড়জাটা দেয়ালের সাথে এতোই জোরে বারি খেয়েছে যে মৌমিতা চমকে উঠলো। রাতুল ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"রিয়ার ঘরের দড়জার আওয়াজ না? দড়জার সাথে ফুটবল খেলছে নাকি? শালিটা তো আমার জরিমানা লাগাবে।"
"চলো তো।"
চিন্তিত স্বরে বলেই রিয়ার ঘরের দিকে ছুটলো মৌমিতা আর রাতুল।
-
-
বাম গালে হাত দিয়ে থরথর করে কাঁপছে রাইমা। দুই হাঁটুর কম্পন অস্বাভাবিক। রাইমার থেকে ঠিক এক হাত দূরে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক। চোখ থেকে যেনো আগুন ঝরছে। ওদের থেকে প্রায় সাত আট হাত দূরে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া। কৌশিকের রাগ দেখে সামনে এগিয়ে আসার সাহস পেলো না।
এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত হলো মৌমিতা আর রাতুল। প্রথমেই পরিস্থিতি কিছু বুঝতে পারলো না। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হয়েছে? ভাই, কি হয়েছে?"
কৌশিক কোনো জবাব দিলো না। শুধু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মৌমিতাকে দেখে রিয়া সাহস করে এগিয়ে এলো। মৌমিতার পেছনে দাঁড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো,
"ভাইয়া রাইমা আপুকে দাবাং মার্কা থাপ্পড় মেরেছে আপু।"
মৌমিতার কুঁচকানো ভ্রুদ্বয় দ্বিগুণ কুঁচকে গেলো। অবাক সুরে বললো,
"ভাই! তুই রাইকে মেরেছিস?"
"বেশ করেছি মেরেছি। ওর ভাগ্য ভালো যে ওকে জানে মেরে ফেলিনি। ওর সাহস কি করে হলো তুবাকে উল্টো পাল্টা বোঝানোর? মিথ্যের জাহাজ একটা।"
কৌশিকের গর্জনে ভয়ে কেঁপে উঠলো রাইমা। বাম গালে হাত রেখে শব্দ করে কেঁদে ফেললো। এতে যেনো কৌশিক আরও রেগে গেলো। শক্ত হাতে রাইমার বাহু টেনে ধরলো। ঘর থেকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে গর্জন তুলে বললো,
"আউট! জাস্ট গেট আউট। তোমার চেহারা যেনো দ্বিতীয়বার আমি না দেখি। দ্বিতীয়বার সামনে আসলে মেরে পুঁতে রেখে দেবো।"
মৌমিতা আঁতকে উঠে এগিয়ে গেলো। কৌশিকের হাত থেকে রাইমাকে ছাড়িয়ে নিজের পেছনে আড়াল করে ধরলো। অতিষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
"তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে ভাই? ওকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছিস? মেয়েটা একা একা কোথায় যাবে?"
"সেটা ওর দুঃসাহস দেখানোর আগে মনে রাখা উচিত ছিলো। ওর সাহস কি করে হলো তুবাকে মিথ্যে বলার? আমি নাকি ওর সাথে ইন্টিমেট হয়েছি। খুব সখ তাই না? ওয়েট, সখ মিটিয়ে দিচ্ছি।"
বলেই রাইমার বুকের কাছের ওড়না খামচে ধরলো কৌশিক। মৌমিতা তাড়াহুড়ো করে হাতটা সরিয়ে দিলো। কৌশিক রাগের মাথায় খুব বিশ্রী কান্ড ঘটায়। এই অচেনা জায়গায় হাঙ্গামা করলে মৌমিতা সামলাতে পারবে না।
বড়সড় ঝামেলা লাগার আগেই রাতুল কৌশিককে টেনে সরিয়ে নিলো। অতিরিক্ত রাগে ফুঁসছে কৌশিক। ঘনঘন শ্বাস টেনে রাগ কমানোর চেষ্টা করছে। মৌমিতা বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
"শান্ত হ ভাই। এখানে কোনো ঝামেলা করিস না। তোদের আমি দায়িত্ব করে নিয়ে এসেছি। কিন্তু অঘটন ঘটলে বাবার কাছে আমার জবাব দিতে হবে।"
এই পর্যায়ে রাইমা মুখ খুললো। কাঁদতে কাঁদতে বললো,
"তোমরা সবাই আমার দোষ খুঁজছ? অথচ চোখের সামনে আরও একটা অপরাধ হচ্ছে সেটা দেখছো না? দুজন জোয়ান ছেলে মেয়ে সারা রাত এক ঘরে কি করলো? সেই জবাব তো চাইছো না আপু।"
আচমকা রাতুলের হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো কৌশিক। লম্বা লম্বা দুই তিন কদম ফেলে রাইমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেপে ধরলো রাইমার গাল। ব্যথায় ছটফট করে উঠলো রাইমা। মনে হচ্ছে গালটা খুলে পড়ে গেলো। সেই অবস্থাতেই কৌশিক দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
"জবাব চাই তোর তাই না? ব্লাডি বিচ।"
মৌমিতা টেনে হিঁচড়ে ফের ছাড়িয়ে নিলো। কিন্তু স্বাস্থ্যবান কৌশিককে ধরে রাখতে পারছে না। কৌশিক ঘাড় ঘুরিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
"লিসেন! একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো। ঘরে আমার সুন্দরী বউ আছে। তোমার জন্য আমার সংসারে অশান্তি হচ্ছে। কোনোকিছুর বিনিময়ে আমি আমার সংসারে অশান্তি চাই না। সুতরাং, আমার থেকে দূরে থাকবে। ক্লিয়ার?"
চলবে?