#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ০৯
#সোনালিকা_বিনতে_আইজা
কৌশিকের আকাশ সমান রাগের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়লো মৌমিতা। কৌশিক সচারাচর খুব বেশি রাগে না। কিন্তু একবার রেগে গেলে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে দেয়। ভাঙচুর করে আশেপাশের কিচ্ছু আর আস্ত রাখে না। একসাথে দুই ভাই বোন দুনিয়াতে এসেছে। এজন্য হয়তো দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াটা একটু বেশি।
কৌশিককে শান্ত করার উপায় খুঁজতে গিয়ে মৌমিতার নজর গেলো ওর চুলের দিকে। রাগারাগির কারণে পরিবেশ গরম থাকায় কেউ বিষয়টা খেয়াল করেনি। এজন্য দেরিতে মৌমিতার চোখে পড়েছে।
এই সাত সকালে কৌশিকের ভেজা চুল দেখে থতমত খেয়ে গেলো মৌমিতা। সকাল সকাল গোসল করার রহস্যও উদঘাটন করতে বেশি সময় লাগলো না। ভাইয়ের ধৈর্য্যহীনতা দেখে মনে মনে হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো মৌমিতা। বিষয়টা কতদূর এগিয়ে গেছে কে জানে? এটা নিয়ে আবার ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি না হয়। চিন্তিত ভঙ্গিতে কপাল চুলকে প্রশ্ন করলো,
"তুবা কোথায় রে?"
আচমকা তুবার কথা মনে পড়তেই শান্ত হয়ে গেলো কৌশিক। রাগটা দমে গেলো মুহুর্তেই। কৌশিক লম্বা করে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করলো। রাগী চোখে রাইমার দিকে তাকিয়ে দুই আঙ্গুলের ঘর্ষনে চুটকি বাজিয়ে বললো,
"হেই ইউ! আউট! আমার চোখের সামনে তোমাকে যেনো আর না দেখি।"
দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। মৌমিতাও পেছন পেছন ছুটলো কৌশিকের। কিন্তু ওকে ধরার আগেই কৌশিক তুবার ঘরে ঢুকে আবারও ঠাস করে দড়জা লাগিয়ে দিলো। তুবার চোখটা মাত্রই লেগে এসেছিল। আচমকা দড়জা আটকানোর আওয়াজে ধরফরিয়ে উঠে বসলো। দড়জার সামনে কৌশিককে দেখে বুকে হাত রেখে শ্বাস টানলো।
কৌশিক ততক্ষণে তুবার কাছাকাছি চলে এসেছে। তুবাকে বুকে হাত রেখে শ্বাস টানতে দেখে তড়িঘড়ি করে কাছে বসলো। দুই হাতে তুবার মুখটা আগলে ধরে বললো,
"কি হয়েছে জান? এতো জোরে শ্বাস টানছিস কেনো? কষ্ট হচ্ছে?"
কৌশিকের কন্ঠে ছিলো একরাশ ব্যাকুলতা। তুবা মাথা ডানে বামে নেড়ে না বোঝালো। মাথা উঁচিয়ে খাটের সাথে হেলান দিলো। তুবার শুকনো মুখপানে কৌশিক নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এক রাতেই চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে মেয়েটার। ঘাড়ে, গলায় অসংখ্য কালচে দাগ। রাতে নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে উঠেছিল কৌশিক। দুনিয়াদারির সব চিন্তা ভুলে ডুবে গেছিলো প্রিয় মানুষের দেহে। সেই ভালোবাসা এতোটাই প্রখর ছিলো যে তুবার দেশজুড়ে ছাপ পড়ে গেছে। ইচ্ছাকৃত না হলেও তুবাকে বেশ আঘাত দিয়ে ফেলেছে কৌশিক। সে কথা ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে এলো। ডান হাতটা তুবার বাম গালে রাখলো কৌশিক। অপরাধী কন্ঠে বললো,
"স্যরি জান।"
তুবা অবাক হয়ে বললো,
"স্যরি কেনো?"
"তোকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমার নিজের ওপর আর একটু কন্ট্রোল আনা উচিত ছিলো।"
তুবা হাসলো। একটা স্বচ্ছ বিশুদ্ধ হাসি। কৌশিকের হাতটা নিজের গালের সাথে আলতো করে চেপে ধরে বললো,
"আপনার খুশির জন্য আমি এমন হাজারও ব্যথা সইতে রাজি। শুধু কথা দিন, আপনি আমার হয়েই থাকবেন।"
"সন্দেহ আছে তোর?"
"বলা তো যায় না। যদি কখনো মন বদলে যায়।"
"তার আগেই যেনো আমার মরন হয়।"
আচমকা কৌশিকের মুখে মৃত্যুর কথা শুনে আঁতকে উঠলো তুবা। ঝট করে চেপে ধরলো কৌশিকের মুখ। ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো,
"আমার কসম! এমন কথা আর কোনোদিন বলবেন না।"
"আচ্ছা বলবো না।"
বাধ্য ছেলের মতো মেনে নিলো কৌশিক। তুবা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। কিছুটা এগিয়ে এসে কৌশিকের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো। প্রসস্ত দুই কাঁধে হাত রেখে কৌশিকের কপালে চুমু খেলো। এরপর চোখের পাতায় চুমু খেলো। ঠোঁট নামিয়ে কৌশিকের লম্বা নাকের ডগায় চুমু খেলো।
কৌশিক চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো শুধু। তুবার ভালোবাসা মিশ্রিত ছোঁয়ায় দেহে নতুন করে শিহরণ জাগলো। কৌশিক ঘনঘন শ্বাস টেনে বললো,
"থাম জান। আমি কিন্তু কন্ট্রোল হারাচ্ছি।"
"আপনার কন্ট্রোলের লাগাম এতো ঢিল কেনো?"
"লাগাম আর আছে কই? তুই তো কবেই সেই লাগাম ভেঙে দিয়েছিস।"
তুবা আর কথা বাড়ালো না। এমনিতেই গতকালের ঝড় তার দেহের ওপর তান্ডব চালিয়েছে। সকালেও এক প্রকার সাইক্লোন হয়ে গেছে। নতুন করে আর কোনো টর্নেডো সইতে রাজি নয় তুবা। প্রথম ভার্জিনিটি হারানোর ব্যথা এখনও দেহের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে। নতুন করে আবার ব্যথা কোথায় জায়গা দেবে?
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কৌশিকের থেকে দূরে সরে গেলো তুবা। পুনরায় খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসলো। কৌশিক পকেট থেকে একটা ওষুধের পাতা বের করলো। সেখান থেকে একটা ওষুধ ভেঙে নিয়ে তুবার দিকে এগিয়ে দিলো। পানির গ্লাস মুখের সামনে ধরে আদেশ সুরে বললো,
"হা কর।"
তুবা বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ ওষুধটা খেয়ে নিলো। যদিও তুবা জানে এটা কিসের ওষুধ। তাই আর দ্বিতীয় কোনো বাক্য ব্যায় করলো না।
-
-
বিকেলে সবাই মিলে আবারও ঘুরতে বেরিয়েছে। আগামীকাল সবাই ঢাকায় ফিরে যাবে। যদিও থাকার কথা ছিলো এক সপ্তাহ। কিন্তু কৌশিক তিনদিনের বেশি ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি। এদিকে রাইমা এখানে থাকায় তুবাকে রেখে কৌশিক যাবে না। নিজের সাথে তুবাকেও নিয়ে যাবে। বাড়ির সবচেয়ে ছোটো সদস্য ছাড়া বাকিরা কি আর ঘুরে মজা পাবে? তুবারই তো ঘুরার প্রতি আগ্রহ বেশি। তাই অগত্যাই সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিরে যাওয়ার। পর বেশি করে ছুটি ম্যানেজ করলে আবারও ঘুরতে আসবে।
ইতিমধ্যে সবাই সমুদ্রের তীরে নিজেদের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। রাতুল এখানে এসে পরিচিত কয়েকজনের দেখে পেয়ে তাদের সাথে আড্ডায় মশগুল হয়ে আছে। রিয়া আর তুবা হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে বিভিন্ন পোজ দিয়ে ছবি উঠছে। ওদের ছবি তুলে দিচ্ছে নীরব। রাইমাকে মৌমিতা নিজের কাছেই রেখেছে। কৌশিকের হাতে পড়লে খুব বিশ্রি কান্ড ঘটে যাবে। এমনিতেই একবার থাপ্পড় মেরে দিয়েছে ছেলেটা। আবারও গায়ে হাত তুললে বিষয়টা খারাপ হবে ভিষণ। তাই একপ্রকার নিজের পেছনে লুকিয়েই রেখেছে।
তুবাদের থেকে চার পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে স্ট্র দিয়ে ডাবের পানি খাচ্ছে কৌশিক। ওকে একা দেখে মৌমিতা সেদিকে পা বাড়ালো। যাওয়ার আগে রাইমাকে কড়া ভাষায় বলে গেলো ভদ্র মেয়ের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে। কৌশিকের হাতে পড়লে খবর আছে।
দ্রুত কদমে কৌশিকের পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়ালো মৌমিতা। নিজের পাশে কারোর উপস্থিতি অনুভব করে এক পলক তাকালো কৌশিক। মৌমিতাকে দেখে ফের নজর ঘুরিয়ে তাকালো তুবার দিকে। মৌমিতা নিচু কন্ঠে বললো,
"বাড়ি গিয়ে বাবার সাথে কথা বলবো?"
"কোন বিষয়ে?"
স্ট্র মুখে নিয়ে ডাবের পানি খেতে খেতে জবাব দিলো কৌশিক। মৌমিতা আরও একটু ঘেঁষে দাঁড়ালো কৌশিকের সাথে। কন্ঠে বেজায় সতর্কতা। যেনো আশেপাশের বাতাসও ওদের কথা না শোনে।
"কোন বিষয় মানে? তোর আর তুবার বিষয়ে?"
"আমার খাওয়া কি তুই খেয়ে দিবি? বা তুবার সাথে আমি যা যা করতে পারি সেগুলো তুই করতে পারবি?"
মৌমিতা থতমত খেয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো,
"মানে কি? তুই যা পারিস সেটা আমি কিভাবে পারবো?"
"তাহলে আমার কাজ তুই করতে চাইছিস কেনো?"
"কৌশিক! একটু তো লজ্জা দেখা। বড় বোন আমি তোর।"
"কে মানে তোকে বড় বোন হিসেবে? হুহ?"
কৌশিকের ত্যাড়া জবাব শুনে রাগ হয় মৌমিতার। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
"তুই না মানলেও আমি তোর বড়।"
"মাত্র এক মিনিটের।"
"ওই হলো। এক মিনিট হলেও বড় তো।"
ততক্ষণে কৌশিকের ডাবের পানি খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। পাশ ঘুরে একটা বড় ডাস্টবিনে ডাবটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। এরপর মৌমিতার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,
"লিসেন মৌ! তোর আর আমার জন্ম একসাথে হলেও তোর চাইতে আমি বেশি বড়। যুক্তি দিয়ে বোঝাই। সংসারে ছেলেদের দায়িত্ব বেশি। আর যার দায়িত্ব বেশি, তার কাজ এবং সম্মান দুটোই বেশি। আর সম্মান মানুষ তাকেই দেয় যে বয়সে বড়। তাহলে তোর আর আমার মধ্যে আমিই বড়। সেটা প্রমানিত। আর রইলো তোর পৃথিবীতে এক মিনিট আগে আসার কথা। সেটাও আমার দয়া। এই পৃথিবীতে মেয়েরা আবার সবকিছুতেই অগ্রাধিকার পায়। তোর ক্ষেত্রেও এই পলিটিক্স কাজে এসেছে। মায়ের পেট থেকে বের হওয়ার সময় দেখলাম একটাই দড়জা। ভেতরে ছিলাম তুই আর আমি। ভাবলাম তুই মেয়ে মানুষ। ছিচকাদুনি। তোকে রেখে আমি আমি আগে গেলে আবার ন্যাকা কান্না শুরু করবি। তাই নিজের ইচ্ছেকে দূরে রেখে তোকে আগে বের হতে দিয়েছি। লেডিস ফাস্ট পলিসি মেইনটেইন করেছি আরকি। সবটাই আমার উদারতা আর মহত্ত্ব। তোর তো উচিত সম্মানের খাতিরে আমার পায়ে লুটিয়ে পড়া। তা না করে অসভ্যের মতো নিজেকে বড় দাবি করিস। লোভি একটা।"
একদমে কথাগুলো বলে থামলো কৌশিক। মৌমিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রয়েছে। কয়েক সেকেন্ড সেভাবেই হতভম্ব হয়ে রইলো। এরপরই চোখ মুখ অন্ধকার করে চেঁচিয়ে উঠলো,
"এতো উদ্ভট কথা তুই পাস কোথা থেকে বাঁদর?"
"মায়ের পেট থেকেই শিখে এসেছি। তোকেও শিখিয়েছিলাম। তোর মাথায় ঘিলু কম তাই ভুলে গেছি।"
"তুই আমাকে রাগাচ্ছিস ভাই!"
"রাগছিস কেনো? যা ভাগ!"
নিজ উদ্যোগে তর্ক বির্তক শেষ করে তুবাদের দিকে হাঁটা দিলো কৌশিক। মৌমিতা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু। সেই ছোটোবেলা থেকে দুই ভাইবোন সাপ নেউলের মতো ঝগড়া করে। দু'জনেই নিজেকে বড় প্রমাণ করতে মরিয়া। কারণ একটাই। নিজেকে ছোটো মেনে নিলেই বড়জনের বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। সেটা দুই ভাই বোনের কেউই মানতে পারে না। একজনের ওপর অন্যজন নিজেকে বড় দাবি করতে মরিয়া। তবে ঝগড়ার পাশাপাশি ভাই বোনের মধ্যে মহব্বতও ব্যাপক। জমজ হওয়ায় একে অপরের দুঃখ কষ্ট বাবা মায়ের চাইতে বেশি বোঝে। দুজনের মধ্যে একজন বিপদে পড়লে অন্য জন সবার আগে টের পেয়ে যায়। এটাকি জমজ হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে হয়? নাকি রক্তের টানে? সেটা ওরা জানে না। তবে ওদের মধ্যে ঝগড়া যত বেশি। দিনশেষে মহব্বতও ঠিক ততটাই বেশি।
চলবে?