#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ১০
#সোনালিকা_বিনতে_আইজা
ঢাকায় ফিরেই নিজেদের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে সবাই। কৌশিক নিজের অফিস জয়েন করেছে। মৌমিতাও রাতুলের সাথে শ্বশুর বাড়ি চলে গেছে। তুবা, রিয়া, নীরব নিজেদের কলেজ, ভার্সিটি লাইফে মশগুল হয়ে গেছে। তবে সময় পানির মতো সরল গতিতে চললেও, মানুষের জীবন সবসময় সরল রেখার বিপরীত। সেখানে আঁকাবাকা উঁচু নিচু সমস্যা দিয়ে ভরপুর। তেমনই একটা সমস্যা সৃষ্টি করতে ভূঁইয়া মঞ্জিলে হাজির হয়েছে কৌশিকের মামা মোবারক সাহেব। নিজের স্ত্রী এবং মেয়ে রাইমা সমেত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন ভদ্রলোক। স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িতে আত্মীয়র আগমন ঘটায় সবাই খাতির যত্নে লেগে পড়েছে। কিন্তু অনর্ত ঘটলো যখন মোবারক সাহেব কৌশিকের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ের কথা তুললেন। শান্ত শিষ্ট পরিবেশ মুহুর্তেই আগুনের উত্তাপের ন্যায়ে গরম হয়ে উঠলো। জামাল সাহেব গর্জে উঠলেন,
"আপনার সাহস কি করে হলো এমন বাজে একটা প্রস্তাব আমার সামনে রাখার?"
আচমকা জামাল সাহেবের গর্জনে কেঁপে উঠলো পুরো ভুঁইয়া মঞ্জিল। তুবা, নীরব আর রিয়া মাত্রই ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরেছে। কাঁধের ব্যাগ এখনও নিচে নামায়নি। এমন সময় বাড়ির গুমোট পরিবেশ দেখে সকলের পা থমকে গেলো। কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো দূরে। এবাড়ির কর্তা জামাল সাহেব। তার কথার বিপরীতে একটা ফুলদানিও নড়েনা এবাড়ির। সকল বিষয়ে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বাড়ির রমনীরা ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছেন সামনে। আজ নিশ্চিত কোনো ঝড় উঠবে। কনকচাঁপা বেগম ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। নিজের বাড়িতে আপন ভাইয়ের অপমান তার জন্য মোটেও সুখকর নয়। তিনি স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ভিতু কন্ঠে বললেন,
"রাগ কেনো করছেন? ভাইয়া তো শুধু কথাই বলতে এসেছে।"
"কিসের কথা হ্যা? কি বিষয়ে কথা? আমার ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। এমন বাজে প্রস্তাব তিনি রাখলেন কিভাবে? আপনের মধ্যে বিয়ে কিভাবে হয় কনক?"
স্বামীর ধমক শুনে চুপ হয়ে গেলেন কনকচাঁপা বেগম। ভাইয়ের অপমানে চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো তার। রাইমার মুখে যেনো বুলি ফুটলো। সে বড়দের মাঝে ফট করে বলে উঠলো,
"নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গড়লে কি সমস্যা আঙ্কেল?"
"সেই কৈফিয়ত কি আমি তোমাকে দেবো মেয়ে?"
"কৈফিয়ত না দিলেও উত্তর দিতে হবে। আপনি আপনের মধ্যে বিয়ে দেওয়ায় রাজি নয়। কিন্তু ঘরের মধ্যে ঘর করতে রাজি?"
জামাল সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। কাঠকাঠ কন্ঠে বললেন,
"মানে?"
"কক্সবাজার গিয়ে তুবা কৌশিক ভাইয়ের কোলে চড়েছিল। গোটা একটা রাত একসাথে এক ঘরে কাটিয়েছে দুজন। আপনার চোখে এটা ঠিক?"
আচমকা তীর নিজের দিকে ছুটে আসায় চমকে উঠলো তুবা। ভয়ে বোধ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। মুহুর্তেই উত্তর দেয়ার মতো কোনো উপযুক্ত জবাব খুঁজে পেলো না। পরপরই পুরো পরিবারের দৃষ্টি একজোটে পড়লো তুবার উপর। ভয়ে, উত্তেজনায় তুবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম। মাথাটা কেমন যেনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এই মুহুর্তে কৌশিককে তুবার খুব করে প্রয়োজন। তুবা যখন বুঝে উঠতে পারছিল না কি উত্তর দেবে তখন রিয়া এগিয়ে এলো বোনকে সাহায্য করতে। তুবাকে নিজের পেছনে আড়াল করে গটগট করে বললো,
"বড় চাচ্চু! আমার কথা শোনো। রাইমা শুধু অর্ধেক সত্য বলেছে। পুরোটা নয়। তুবাকে ভাইয়া কোলে নিয়েছিল কারণ তুবা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বিচে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ঝড় উঠে আসে। আমরা তখন দৌড়ে হোটেলে চলে আসি। কিন্তু কোনো কারণে তুবা আটকে যায়। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ভাইয়া খুঁজতে গিয়ে ওকে জ্ঞানহীন অবস্থায় পায়। তখন কি ওকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব ছিলো বলো? তাই তো কোলে করে হোটেলে নিয়ে আসলো। এটা কি দোষের কিছু? সারা রাত তুবার গায়ে জ্বর থাকায় ভাইয়া ওর মাথায় পানি পটি দিতে রুমে থেকে গিয়েছিল। শুধু ভাইয়া একা নয়, আমি আর নীরবও ছিলাম সেই ঘরে। এই নিরব বল।"
একবুক আতঙ্ক নিয়ে গটগট মিথ্যেগুলো বলে দিলো রিয়া। আগে পিছে কেনোকিছু ভাবলো না। এই মুহুর্তে তার একটাই চাওয়া, বোনকে সবার জেরা থেকে বাঁচানো। রিয়ার সব গুলো কথা নীরবের মাথার ওপর দিয়ে গেলেও তুবাকে বাঁচাতে বোনের সাথে তাল মেলালো। তোতাপাখির মতো মাথা নেড়ে বলল,
"হ্যা হ্যা চাচ্চু! রিয়া ঠিক। রাইমা ভুল।"
জামাল সাহেব নিজের বাচ্চাদের কথা একবাক্যে বিশ্বাস করে নিলেন। পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে রাইমার পানে তাকালেন। একঝুড়ি মিথ্যে শুনে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে রাইমা। ওদের ভাইবোনের যে পেট ভর্তি এতো মিথ্যে সেটা রাইমা আগে জানতো না। সে বুঝতে পারছে না মানুষ এতো কনফিডেন্স নিয়ে এতো এতো মিথ্যে কিভাবে বলতে পারে? তাও আবার এতো সাজিয়ে গুছিয়ে। এদের মিথ্যের বিপরীতে রাইমার মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। রাইমার ভাবনার মাঝেই জামাল সাহেব শক্ত কন্ঠে বললেন,
"শোনো মেয়ে! আমার ছেলে মেয়েরা এবাড়ির নিয়ম কানুন খুব ভালো করেই জানে। ওরা জানে এই বংশে আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে হয় না। এই পরিবারে নিজেদের মধ্যে প্রণয় ঘটানো নিষিদ্ধ। আর আমার ছেলে মেয়েরা কোনো নিষিদ্ধ প্রণয়ে জড়াবে না।"
রাইমা কিছু বলতে যাবে তার আগেই জামাল সাহেব হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন,
"আর কোনো কথা শুনতে চাই না। বড়দের মাঝে কথা বলে এমনিতেই অনেক বেশি স্পর্ধা দেখিয়ে ফেলেছো। আরও বেশি অপমানিত হতে না চাইলো চুপচাপ এখান থেকে চলে যাও।"
গমগমে সুরে কথাগুলো বলেই নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন তিনি। অপমানে লজ্জায় স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে গেলেন মোবারক সাহেব। রিয়া লম্বা করে শ্বাস টানলো। যাক বাবা বাঁচা গেছে। কিন্তু স্বস্তি পেলো না তুবা। বড় চাচ্চুর কাঠকাঠ জবাব তার ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছে। ভয়ে হৃদপিণ্ড কাঁপছে। ওদের পরিবার কৌশিক আর তুবার সম্পর্ক মেনে নেবে না। কখনোই মানবে না।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় তুবার দেহের রক্ত প্রবাহ বাঁধা প্রাপ্ত হচ্ছে যেনো। নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্ষণে ক্ষণে শরীর কাটা দিয়ে উঠছে। মুহুর্তেই মুখটা চুপসে এতটুকুন হয়ে গেলো। রাতে ঠিক মতো খেতেও পারলো না তুবা। গলা দিয়ে কিছুই যেনো নামছে না। এই অস্থিরতা কিভাবে দূর হবে তুবা জানে না। মন শুধু এটুকু জানে, তার কৌশিককে চাই। সবসময় চাই। সারাজীবনের জন্য চাই। অন্যথায়, তুবার দেহে প্রাণ থাকবে না।
-
-
কৌশিক বাড়ি ফিরেছে রাত এগারোটার পর। টানা বেশ কয়েকদিন ছুটি কাটানোর দরুন কাজের চাপ বেশি পড়েছে। ক্লান্ত দেহে বাড়িতে পা রাখতেই দেখা হলো রিয়ার সাথে। যেনো সে কৌশিকের জন্যই অপেক্ষা করছিল। কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির দর্শন পেয়ে দমিয়ে রাখা দমটা যেনো বেরিয়ে গেলো রিয়ার। দৌড়ে কৌশিকের পাশে দাঁড়ালো। সি সি ক্যামেরার ন্যায়ে চোখ দিয়ে যা কিছু দেখেছে, সেই সব কৌশিকের সামনে উগড়ে দিলো। রাইমার কথা শুনে কৌশিকের চেহারায় বেজায় বিরক্তি ফুটে উঠলো। কিন্তু পরক্ষনেই, তুবাকে জেরা করার কথা শুনে সমতল কপালে তিন চারটে চিন্তার ভাজ পড়লো। ক্লান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
"তুবা কোথায়?"
"ওর ঘরেই আছে ভাইয়া। বেচারি খুব ভয় পেয়ে গেছে। ভয়ে রাতে খাবারও ঠিক মতো খায়নি। দড়জার বাইরে থেকে কান্নার আওয়াজও পেলাম।"
কৌশিকের কোঁচকানো ভ্রুদ্বয় এবার দ্বিগুণ কুঁচকে গেলো। ধুপধাপ পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে। রিয়া পেছন থেকে ডেকে বললো,
"বড়মা তোমার খাবার টেবিলে রেখেছে ভাইয়া। আমি কি গরম করে দেবো?"
"লাগবে না। তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পর। আমি নিজেই গরম করে নেবো।"
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দোতলায় চলে গেলো কৌশিক। অফিসের শার্টটা এখনও ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। কৌশিকের ব্যাস্ত কদম জোড়া থামলো তুবার ঘরের দড়জার সামনে। দড়জাটা চাপিয়ে রাখা। কৌশিক সময় অপচয় না করে দড়জা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আস্তে করে ভেতর থেকে দড়জা আটকে দিয়ে পুরো ঘরে চোখ বুলালো। তুবা ঘরে নেই। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। কৌশিক খেয়াল করলো তুবার শরীর থেকে থেকে কাঁপছে।
ব্যাস্ত পায়ে সেদিকে কদম বাড়ালো কৌশিক। বেলকনির কাছাকাছি যেতেই কানে ভেসে আসলো তুবার অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ। কৌশিকের বুকটা দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে গেলো যেনো। এক ছুটে গিয়ে তুবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। দুই হাত বাঁধলো তুবার চিকন উদরে। থুতনিটা রাখলো তুবার ঘাড়ে।
আচমকা ছোঁয়ায় সামান্য কেঁপে উঠলো তুবা। কিন্তু কৌশিকের শ্বাস প্রশ্বাস ঘাড়ে পড়ায় স্বাভাবিক হলো। কৌশিক নিচু কন্ঠে বললো,
"হুশ! এতো কান্না করছিস কেনো? জামাই মরেছে তোর?"
তুবা তৎক্ষনাৎ ঘুরে গেলো। কৌশিকের মুখোমুখি হয়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো। শাসন সুরে বললো,
"খবরদার! আজেবাজে কথা বলবেন না।"
ঘাড় এলিয়ে তুবার ধরে রাখা হাতের তালুতে চুমু খেলো কৌশিক। তুবা সঙ্গে হাতটা সরিয়ে নিলো। মনে মনে বিরক্তও হলো বেশ। লোকটার সব সময় ফাজলামি। তুবা রাগ করে বললো,
"সিরিয়াস মুহুর্তে চুমু দেয়ার মুড আসে কি করে আপনার?"
"তোকে আদর করার মুড আমার সব সময় থাকে। দেখতে চাস? আদর দিয়ে দেখাই?"
তুবা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। দ্বিতীয় কোনো শব্দ ব্যায় করলো না। চোখ থেকে তখনও টপটপ করে পানি ঝরছে মেয়েটার। কৌশিক দুই হাতে তুবার কোমর শক্ত করে চেপে ধরলো। তুবার ঘুরিয়ে রাখা গালে শব্দ করে চুমু খেলো। তুবা যেনো মুহুর্তের মধ্যেই চিন্তার কথা ভুলে বসলো। কান্নাও থেমে গেলো। রাগী কন্ঠে বললো,
"আপনি খুবই অসভ্য।"
"আচ্ছা? তাহলে আর একটু অসভ্যতা করি?"
"একদম না।"
কৌশিক হাসলো। তুবাকে কান্না থামিয়ে স্বাভাবিক হতে দেখে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। দুই হাতে তুবার মুখটা আগলে ধরে বললো,
"এতো ভয় কেনো পাস জান? আমি আছি তো। সব চিন্তা আমি করবো। তুই শুধু আমার পাশে থাকবি। ব্যাস।"
"বড় চাচ্চু আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না কৌশিক ভাই।"
"তো? তোর কি মনে হয়? বাবা না মানলে আমি তোকে ছেড়ে দেবো?"
"আমার জন্য পরিবারের বিরুদ্ধে যাবেন?"
তুবার কন্ঠে ভয়ের আভাস। কৌশিক তুবার কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলো। অভয় দিয়ে বললো,
"আমি সব সামলে নেবো জান। শুধু তুই ভেঙে পড়িস না। মনে রাখবি, তোর হাসিখুশি মুখ আমাকে শক্তি দেয়। তোর কান্না আমাকে দুর্বল করে। তোর ভয় আমাকে ভেঙে ফেলে। তুই পাশে থাকলে আমি কৌশিক পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়তে রাজি। সেখানে পরিবার নিতান্তই তুচ্ছ বিষয়।"
তুবা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। মনের সব ভয়, সব চিন্তা নিমেষেই উবে গেলো। দুই হাতে কৌশিককে জড়িয়ে ধরলো। প্রসস্ত বুকে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। সময় নিয়ে কৌশিক প্রশ্ন করলো,
"রাতে খাসনি কেনো?"
"এমনি।"
"আমাকে খাবি? খেয়ে দেখ।"
"ছিহ্! সরুন তো।"
এক ঝটকায় কৌশিকের থেকে দূরে সরে গেলো তুবা। লজ্জা ঢাকতে তড়িঘড়ি করে পা বাড়ালো ঘরে। কৌশিক পেছন থেকে দুষ্টুমি স্বরে বলে উঠলো,
"জান। চাইলে খেয়ে দেখতে পারিস। ট্রাস্ট মি! আগেরবারের চাইতে বেশি মজা পাবি।"
চলবে?