ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ প্রণয়

১৩তম পর্ব

লেখক: সোনালিকা বিনতে আজিম

#নিষিদ্ধ_প্রণয়

#পর্বঃ১৩

#সোনালিকা_বিনতে_আইজা

বজ্রপাতের ন্যায়ে কাঁপছে চারিধার। ভুঁইয়া পরিবারের প্রতিটা সদস্য স্তব্ধ, হতভম্ব। যে কেউ দেখলে মনে করবে এরা সবাই পাথরের কোনো মুর্তি। হসপিটালের একদম শেষ কোণার ভিআইপি রুমে রাখা হয়েছে তুবাকে। আপাতত বারান্দার শেষ প্রান্ত তুবার পরিবারের সদস্য দিয়ে পরিপূর্ণ। খোলা জানালা দিয়ে পাখির কিচিরমিচির ডাক ব্যাতিত অন্য কোনো শব্দ নেই। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করলো কিছুক্ষণ। পাথরের মুর্তি থেকে এবার জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠলেন ময়না বেগম। তিনিই প্রথম নীরবতা ছিন্ন করলেন। ধুপধাপ পা ফেলে দড়জা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।

হসপিটালের শুভ্র রঙা বিছানায় চিন্তিত মুখে শুয়ে ছিলো তুবা। মনের ভেতর চলছিল এলোমেলো তুফান। কি জবাব দেবে পরিবারকে? তুবার আকাশ সমান চিন্তার মাঝেই হুট করে সেখানে উপস্থিত হলেন ময়না বেগম। তুবা এক নজর নিজের মাকে দেখার সুযোগ পেয়েছে শুধু। এর পরপরই ময়না বেগম একটানে তুবাকে শোয়া থেকে উঠিয়ে বসালেন। সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুই দুই চারটে থাপ্পড় পড়লো তুবার গালে। শক্ত থাপ্পড়ের দাপটে তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে ডানে হেলে পড়লো তুবা। হাতের স্যালাইন চলতে থাকা ক্যানুলায় টান লেগে উপর দিকে রক্ত উঠে গেলো। অতর্কিত আক্রমনে হতভম্ব তুবা। অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো।

অবস্থা বেগতিক দেখে পরিবারের বাকি সদস্যরা হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো। কনকচাঁপা বেগম পেছন থেকে জাপ্টে ধরলেন ময়না বেগমকে। কিন্তু তাকে ধরে রাখা দায়। হাত ছাড়িয়ে ছুটে যেতে চাইছেন যেনো। চেহারার ভয়াবহতা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে আজ মেয়েকে মেরে বস্তুায় ভরে যমুনা নদীতে ভাসিয়ে দেবেন। তুবাকে সামলাতে গেলো রিয়া। রিয়ার পেটে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো তুবা। থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। অত্যাধিক ভয় দিশেহারা। ময়না বেগম নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে চেঁচিয়ে উঠলেন,

"ভাবি ছাড়ুন আমাকে। আজ আমি ওকে মেরেই ফেলবো। অসভ্য মেয়ে। শেষে কি না অবিবাহিত অবস্থায় কোনো ছেলের সঙ্গে... ছি ছি ছি। এই মেয়ে আমি রাখবো না। ওকে মেরেই ফেলবো।"

কনকচাঁপা বেগম শক্ত করে চেপে ধরে আছেন ময়না বেগমকে। স্ত্রীকে বেশি গর্জন করতে দেখে ধমকে উঠলেন তাওহীদ সাহেব,

"হসপিটালে রঙ তামাশা শুরু করেছো কেনো? এখানে কোনো হাঙ্গামা নয়। যা কথা হওয়ার বাড়িতে গিয়ে হবে।"

"কি কথা বলবে বাড়ি গিয়ে? কথা বলে কোনো মিমাংসা হবে? তোমার মেয়ে চুনকালি মাখিয়ে দিলো বংশের মুখে। এই গতকালই ওর বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। কত ভালো একটা ছেলে ওকে বিয়ে করতে চাইছে। আর আজই তোমার মেয়ে কিনা..... ছিহ্!"

ঘৃনায় মুখ কুঁচকে নিলেন ময়না বেগম। সেকেন্ডের ব্যবধানে ফের বলে উঠলেন,

"ডাক্তারকে ডাকো। এই বাচ্চা রাখা যাবে। এই বাচ্চা থাকলে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে। ওকে দুনিয়া থেকে সরাতে বলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বিয়ে দিয়ে দেবো।"

বলতে বলতে স্ব শব্দে চড় পড়লো ময়না বেগমের গালে। উপস্থিত সবাই হতভম্ব। তাওহীদ সাহেব গর্জে উঠলেন,

"কোন পরিস্থিতিতে কি কথা বলতে হয় জানো না তুমি? না জেনে থাকলে শিখে নাও। যাও বেরোও এখান থেকে।"

পরিস্থিতি আরও ঘেঁটে যাওয়ায় ময়না বেগমকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন কনকচাঁপা বেগম। একে একে সবাই বেরিয়ে গেলো। তুবা অত্যন্ত ভয় পেয়ে আছে। কিছুটা শান্ত হলে আলোচনা করে সমাধান করা যাবে।

-

-

অফিস থেকে হসপিটাল পৌঁছাতে কৌশিকের মিনিট বিশেক সময় লেগেছে। এতটুকু সময়ের ব্যবধানে এতো ঝড় বয়ে গেলো। রিসিপশন থেকে তুবার রুম নাম্বার জেনে সেদিকে ছুটে আসলো কৌশিক। অত্যাধিক চিন্তায় চেহারার নাজেহাল অবস্থা। বারান্দার শেষ প্রান্তে আসতেই দেখতে পেলো তার পরিবারের সদস্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে পুরো বারান্দা জুড়ে গুমোট ভাব। কৌশিক পায়ের গতি বাড়লো। ময়না বেগমকে কাঁদতে দেখে ওর অস্থির চিত্ত আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠলো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে পাগলের মতো প্রশ্ন করলো,

"তুবা! তুবা কোথায়? মা তুবা কোথায়? নীরব তুবা কোথায়?"

কন্ঠে ছিলো একরাশ ব্যাকুলতা। একবুক ভয়। এক আকাশ পরিমাণ আশঙ্কা। ময়না বেগম যেনো কথা বলার সুযোগ খুঁজে পেলেন। কৌশিকের সামনে অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসলেন,

"কোথায় আর যাবে? মরে কি আর শান্তি দেবে আমাদের? ভেতরেই আছে অসভ্যটা।"

কৌশিক সেই মুহুর্তে ময়না বেগমের রাগের কারণ বুঝতে পারলো না। ভ্রু কুঁচকে তাকালো শুধু। ময়না বেগম ফের অভিযোগ তুললেন,

"জানো কৌশিক? তোমার ওই অসভ্য বোন কি করেছে? পরিবারের মুখে চুনকালি মাখিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। আমার অবিবাহিত মেয়ে মা হতে যাচ্ছে। ভাবতে পারছো?"

কৌশিকের কানে কঠিন বজ্রপাতের শব্দ ভেসে এলো। মুহুর্তের মধ্যেই থমকে গেলো হৃৎস্পন্দন। তুবা মা হতে যাচ্ছে শব্দটা সজোরে বারি মারলো মস্তিষ্কে। দেহের শিরা উপশিরা জেগে উঠলো কৌশিকের। গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। নিজের অস্তিত্বের সংবাদ মনের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি করলো। এই অনুভুতির সাথে কৌশিক পূর্ব পরিচিত নয়। শক্তিহীনের মতো দুকদম পিছিয়ে গেলো কৌশিক। দেয়ালের সাথে সারি সারি বিছিয়ে রাখা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লো। মাথাটা আপনাআপনি নিচু হয়ে গেলো। এই মুহুর্তে এই পরিস্থিতির জন্য কৌশিক মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। কোনো উত্তর তার ভেতরে সাজানো নেই। অবোধের মতো মাথা নিচু করে বসে রইলো শুধু।

এই পর্যায়ে জামাল সাহেব মুখ খুললেন। তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন,

"পিতৃহীন সন্তান পৃথিবীতে না আনাই ভালো। এতে আমাদের মেয়ের নামে বদনাম রটে যাবে। তারচেয়ে বরং হসপিটালে থাকতে থাকতেই কোনো একটা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।"

বাবার কথা শেষ হতে না হতেই রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকালো কৌশিক। বাঘের মতো গর্জে উঠলো,

"খবরদার বলছি বাবা! এমন চিন্তা কেউ মাথাতেও আনবে না। তুবার গর্ভের সন্তানের বাবা আমি। ও আমার সন্তান। আর আমি বেঁচে থাকতে আমার স্ত্রী সন্তানের গায়ে ফুলের টোকাও লাগতে দেবো না।"

এই মুহুর্তে কৌশিকের কথাগুলো দ্বিতীয়বার বজ্রপাত ঘটালো সবার মাথায়। হতভম্ব পরিবার এবার দ্বিগুণ হতভম্ব হয়ে গেলো। তাদের মনে হচ্ছে আজ বজ্রপাত ঘটারই দিন। মিনিটে মিনিটে সেকেন্ডে সেকেন্ডে অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটছে। তবে কৌশিকের কথা শুনে একটা বাজ যেনো সোজা জামাল সাহেবের মাথার ওপর পড়লো। কৌশিক আর কারোর দিকে তাকালো না। সোজা পা বাড়ালো তুবার কেবিনের দিকে। যেতে যেতে বলে গেলো,

"বাড়ি ফিরে যাও সবাই। বিচার সালিশ যা আছে সব ভুঁইয়া মঞ্জিলে হবে। আমি আমার বউ বাচ্চাকে নিয়ে আসছি।"

জামাল সাহেব বুকে হাত চেপে ধরলেন। হুট করেই শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেলো যেনো। হার্ট অ্যাটাক হবে হবে ভাব।

-

-

শক্ত চেহারা নিয়ে কেবিনে ঢুকলেও, বেডে শুয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকা তুবাকে দেখে নমনীয় হয়ে এলো কৌশিক। চোখ দুটো লালচে রঙ ধারণ করলো। সেকেন্ডের ব্যবধানে দৌড়ে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো তুবার ওপর। তুবার পিঠের নিচে দুই হাত ঢুকিয়ে পেচিয়ে ধরলো নিজের সাথে। ক্রন্দনরত তুবার পুরো মুখ জুড়ে অজস্র চুমু খেলো। মুখের এক চিমটি জায়গাও বাদ রাখলো না ঠোঁট ছোঁয়াতে। তুবার পুরো মুখ জুড়ে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজল কৌশিক। পাগলের মতো বিলাপ করতে করতে বললো,

"স্যরি স্যরি স্যরি জান। রিয়েলি ভেরি স্যরি। আমার আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার উচিত ছিলো তোর কাছেই থাকা।"

তুবা জবাব দিলো না। কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে দিলো। তুবার শরীরের কম্পন স্পষ্ট টের পেলো কৌশিক। কেমন থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। হৃদপিণ্ড লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কৌশিক তুবার চুলে হাত ডোবালো। সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করলো তুবাকে শান্ত করার। এই সময় প্যানিক এ্যাটাক করা বাচ্চার জন্য বিপদজনক। দেহের কাঁপুনি থামছে না দেখে নিরুপায় হয়ে কৌশিক তুবার ওষ্ঠে ওষ্ঠ চেপে ধরলো। একদম শক্ত করে। এরপর ধীরে ধীরে নমনীয় হলো। ঠোঁটে নরম কোমল ছোঁয়ায় তুবার কান্নার বেগ কমলো। তুবার ওপর ঝুঁকে থাকা কৌশিকের চোখ থেকে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তুবার মুখে। তুবার কান্না এইবার পুরোপুরি থেমে গেলো। অবাক হয়ে কৌশিকের পিঠ থেকে দুই হাত সরালো। ক্যানুলা লাগানো রোগাক্রান্ত হাতটা কৌশিকের গালে রাখলো।

"আপনি কাঁদছেন কৌশিক ভাই?"

কৌশিক ঘাড় ঘুরিয়ে পড়নের শার্টের হাতায় চোখ মুছলো। লাল লাল চোখ নিয়ে জোর করে হাসলো। তুবার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে বললো,

"আমার অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে জান। জানি না কেমন লাগছে। আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। এই অনুভুতির নাম কি তুবা?"

তুবা কোনো জবাব দিলো না। শুধু নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলো কৌশিকের মুখপানে। খানিকটা সময় কেটে গেলো সেভাবেই। মিনিটের নিরবতা ছিন্ন করে কৌশিক বললো,

"এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো জান?"

"এখন কি হবে কৌশিক ভাই? বাসায় সবাই সব জেনে গেছে। এখন কি জবাব দেবো সবাইকে? মা আমাকে মেরেই ফেলবে।"

হুঁশ! তর্জনি আঙ্গুল দিয়ে তুবার ঠোঁট চেপে ধরলো কৌশিক। নিচু কন্ঠে বললো,

"বলেছি না, কোনো চিন্তা করবি না। সব চিন্তা আমার। সবার প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো। সব আঘাত আমি সয়ে নেবো। কিন্তু তোকে আড়ালে রাখবো। প্রমিস!"

তুবা ফের কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরলো। নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। চোখ থেকে তরল অশ্রুধারা তখনও বইছে। খট করে দড়জা খোলার শব্দে সোজা হয়ে দাঁড়ালো কৌশিক। লালচে চোখদুটো নার্সের থেকে আড়াল করলো। নার্স এগিয়ে এসে সরাসরি প্রশ্ন করলো,

"আপনি কে?"

"আমি পেসেন্টের হাসবেন্ড।"

তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো কৌশিক। নার্স প্রতিউত্তরে বলল,

"ডিসচার্জের সব ফর্মালিটি শেষ। আপনি আপনার ওয়াইফকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। আপনার ফ্যামিলির সবাই চলে গেছে।"

এতটুকু বলেই নার্স চলে গেলো। দড়জার দিকে এক পলক তাকিয়ে তুবার পাশে বসলো কৌশিক। তুবার ক্যানুলা লাগানো হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো। আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল সেখানে। তাকিয়ে দেখলো তুবার দুই গালে চার আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কৌশিক আলতো করে হাত ছোঁয়াল গালে। অসহায় কন্ঠে বললো,

"ব্যথা করছে জান?

তুবা মাথা ডানে বামে নেড়ে না বোঝালো। কৌশিক আর কথা বাড়ালো না। ছোট্ট করে বললো,

"বাড়ি চল।"

-

-

বাড়ি ফিরেই সবার আগে তুবাকে দোতলায় পাঠিয়ে দিয়েছে কৌশিক। পারিবারিক কলহ থেকে যথা সম্ভব দূরে রাখতে চাইছে তুবাকে। সবার প্রশ্নের জাতাঁকলে পড়লে তুবার স্ট্রেস বাড়বে তাই।

ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়েছে পরিবারের সবাই। খবর পেয়ে মৌমিতাও ছুটে চলে এসেছে। ড্রয়িংরুমের সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে কৌশিক। পুরো পরিবার ওকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে আছে। তাদের চোখে মুখে হাজারও প্রশ্নের ছড়াছড়ি। সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে কৌশিক ছোট্ট করে বললো,

"আমি তুবাকে ভালোবাসি বাবা।"

সঙ্গে সঙ্গে স্ব শব্দে চড় পড়লো কৌশিকের গালে। দাঁতে দাঁত চেপে চড়টা হজম করে নিলো কৌশিক। জামাল সাহেব গর্জে উঠলেন,

"লজ্জা করছে না এই কথা বলতে? আমার বাড়িতে থেকে আমারই পিঠ পিছে একটা অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছো তুমি। আবার বুক ফুলিয়ে বলেও বেড়াচ্ছো "এই বাচ্চা আমার"। লজ্জা করছে না?"

"লজ্জা তো করছেই। কিন্তু না বলেও তো উপায় রাখোনি তোমরা। তাছাড়া কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়াইনি। তিন কবুল বলে হালাল ভাবে নিজের বউ বানিয়েছি তুবাকে।"

জামাল সাহেবের বুক ধরফর করে উঠলো। তিনি এক হাতে বুক চেপে ধরে সোফায় বসে পড়লেন। এ যেনো বিনা মেঘে আরও একটা বজ্রপাত। আর কত বজ্রপাত ঘটবে কে জানে? আজ তার হার্টঅ্যাটাক নিশ্চিত। তিনি কোনো মতে আঙ্গুল তুলে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললেন,

"অসভ্য বেয়াদব। এটা আমার ছেলে? এই তুমি আমার ছেলে?"

"মনে হয় তোমারই। শিওর জানি না। মা ভালো বলতে পারবে।"

সিরিয়াস মুহুর্তে কৌশিকের এমন ত্যাড়া জবাবে হতভম্ব হয়ে গেলেন জামাল সাহেব। বুকের ব্যথা বাড়লো। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে মন চাইছে। তিনি ফ্লোরের দিকে নজর রেখে কাঠকাঠ কন্ঠে বললেন,

"আমার এতো বছর ধরে অর্জিত মান সম্মান সব নদীতে ভেসে গেলো। নিজের ছোটো ভাইয়ের দিকেও চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। আমার মাথা এতোটাই নিচু করে দিয়েছো তুমি। তোমার মতো অসভ্য ছেলের হাতে আমি আমার মেয়েকে তুলে দেবো না। তুবাকে ওর নানাবাড়ি পাঠিয়ে দেবো। ওর অন্য কোথাও বিয়ে দেবো। তবুও তোমার নাগালের মধ্যে রাখবো না।"

তুবাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা শুনে চমকে উঠলো কৌশিক। সকল ধৈর্য্য সহ্য হারিয়ে ফেললো মুহুর্তেই। বাঘের মতো গর্জন দিয়ে বললো,

"আগুন লাগিয়ে দেবো বাবা। সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবো। তুবাকে না পেলে আমি জাস্ট মরে যাবো। কিন্তু মরার আগে সবাইকে মেরে দেবো।"

জামাল সাহেব ধমকে উঠলেন,

"বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে কৌশিক।"

"কোনো সীমা নেই। পৃথিবীর সবকিছুতে সীমারেখা টানা থাকলেও আমার ভালোবাসার কোনো সীমা নেই। আমি তুবাকে আকাশ সমান ভালোবাসি। অথৈ সমুদ্রের সমান আমার ভালোবাসার গভীরতা। স্বচ্ছ পানির ন্যায়ে আমার ভালোবাসার সত্যতা।

জানো বাবা, আমি তুবাকে ঠিক কতটা চাই? মানুষ জীবনের শেষ মুহুর্তে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ঠিক যতটা বাঁচতে চায়। তুবাকে আমি ঠিক ততটাই চাই। আমার নিঃশ্বাস চলে তুবার হাসিমুখ দেখে। ওকে এক পলক না দেখলেই হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস কষ্ট শুরু হয় আমার। আমি শ্বাস নিতে পারি না। তুমি আমার শ্বাস কেড়ে নিতে চাইছো বাবা? তাহলে নিজের হাতে কবরটাও খুঁড়ে রাখো। কারণ ছেলের খাটিয়া তোমাকেই কাঁধে তুলতে হবে।"

আবারও পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেলো পুরো ঘর জুড়ে। পরিবারের সকলে মুখের খেই হারিয়ে ফেললো যেনো। কনকচাঁপা বেগম এই পর্যায়ে সাহস করে এগিয়ে এলেন। অভিমান নিয়ে বললেন,

"আপনি সারাজীবন পরিবারকে কড়া শাসনেই রেখেছেন। কিন্তু ছেলে মেয়ের মন বোঝার চেষ্টা করেননি। আপনার কঠোরতায় বাচ্চাগুলো কথা গোপন করতে শিখে গেছে। আপনি যদি ওদের সাথে একটু সহজ হতেন তাহলে আজ এই দিন আসতো না। মনের ওপর মানুষ কখনো লাগাম টানতে পারে না কৌশিকের বাবা। কখন কার ওপর মন বসে যায় কেউ বুঝতে পারে? আপনি যদি ওদের ওপর প্রতি পদে পদে নিষেধাজ্ঞার বোঝা চাপিয়ে না দিতেন, তাহলে বহু আগেই আপনার ছেলে আপনার কাছে এসে বলতো বাবা, আমি তুবাকে ভালোবাসি। আপনি কি উপায় রেখেছেন বলার? আমার ছেলে মেয়ের কোনো দোষ নেই। সব দোষ আপনার আর আপনার তৈরি করা অদ্ভুত নিয়মের। এই নিয়ম আমি আর মানবো না। ছেলেও আমার, মেয়েও আমার। আমি ওদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছি। সারাজীবন আমার ছেলে মেয়ে আমার কোলেই থাকে। আমার মনে হয় না ছোটো ভাই বা ময়না এতে অখুশি হবে।"

বলেই তিনি তাওহীদ সাহেব এবং ময়না বেগমের দিকে তাকালেন। ময়না বেগম আঁচলে মুখ চেপে কাঁদছেন। বড় জায়ের নজর পড়তেই তিনি উপর নিচ মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন। তাওহীদ সাহেবও মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছেন।

মায়ের প্রতিবাদ দেখে মৌমিতাও সুযোগ পেলো। জামাল সাহেবের কাছে বসে আলতো করে কাঁধে হাত রাখলো। অপরাধীর ন্যায়ে বললো,

"সবচেয়ে বড় অপরাধী আমি বাবা। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের দুজনের বিয়ে দিয়েছি। কি করতাম বলো? তোমার ভয়ে ওরা সামনে এগোতে পারছিল না। কিন্তু একে অপরের জন্য পাগল ছিলো। তাই এতবড় পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। বাবা, যা হয়েছে ভুলে যাও না। একবার ভাবো! এ বাড়িতে কত বছর হলো বাচ্চার পা পড়েনি। আমরা ভাইবোন বড় হওয়ায় পর এবাড়িতেও কোনো বাচ্চার আগমন ঘটেনি। কিন্তু এখন আসতে যাচ্ছে। কেউ একজন ছোটো-ছোটো পায়ে পুরো বাড়ি জুড়ে দৌড়ে বেড়াবে। আধো আধো স্বরে তোমায় দাদু বলে ডাকবে। চকলেট খাওয়ার বায়না ধরবে। তোমার কোলে চড়বে। এতোটা সুখ এই বাড়িতে লাস্ট কবে এসেছিল বলো তো? সেই বহুবছর আগে, যখন আমরা ছোটো ছিলাম। সেই সময় আবারও ফিরে আসতে চাইছে বাবা। এরপরেও তুমি রাগ নিয়ে থাকবে? ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটার কথা ভেবে কি ওদের ক্ষমা করে দেওয়া যায় না?"

মৌমিতার মুখে বাচ্চার বর্ণনা শুনে বুকের ভেতর নড়ে উঠলো জামাল সাহেবের। তার নাতি অথবা নাতনি আসবে। ছোটো ছোটো পায়ে এদিক সেদিক দৌড়াবে। এক গোছা তুলোর মতো নরম শরীর নিয়ে সবার কোলে চড়ে বেড়াবে। আধো আধো বুলিতে যখন দাদু বলে ডাকবে, তখন শুনতে কেমন লাগবে? খুব ভালো লাগবে কি? ভাবতেই বুকে শীতল হাওয়া বয়ে গেলো জামাল সাহেবের। রাগটা একটু কমে গেলো কি? হ্যা তাই। কল্পনায় নাতি নাতনিকে অনুভব করতে গিয়ে জামাল সাহেবের রাগ একটু একটু করে কমছে।

বাড়ির কর্তাকে চুপ হয়ে যেতে ধরে রাখা দমটা ছাড়লো বাকিরা। জামাল সাহেবের চেহারার পরিবর্তনই বলে দিচ্ছে তার মন বদলে গেছে। পেছন থেকে রিয়া মিনমিন করে বলে উঠলো,

"বড় চাচ্চু! তুবার জিনিসপত্র সব কৌশিক ভাইয়ের ঘরে ট্রান্সফার করে দেবো?"

জামাল সাহেবের ঘোর কাটলো। ছোট্ট প্রাণটার কথা চিন্তা করতে গিয়ে ঠোঁটের কোণে যে সুক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠেছিল, সেটাও নিভে গেলো। তিনি চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

"এতদম না। আগে ছোটোখাটো পরিসরে আয়োজন করে আত্মীয় স্বজন জানাতে হবে। ছেলে তো আমার গর্বের কাজ করেনি। মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিয়েছে। যতই বিয়ে করুক সেটা চুরি করে করেছে। আত্মীয় স্বজন তো আর জানে না। না জানি কয় মাস চলে। হিসাবে না মিললে পাড়ায় বদনাম রটে যাবে।"

"দু সপ্তাহের মতো হচ্ছে বাবা।"

আকস্মিক কৌশিকের উত্তর শুনে থ মেরে গেলেন জামাল সাহেব। বাড়ির রমনীরা মুখ লুকাতে ব্যাস্ত। মৌমিতা জিভ কামড়ে মাথা নিচু করে নিয়েছে। জামাল সাহেব ফের চেচিয়ে উঠলেন,

"নির্লজ্জ ছেলে কোথাকার। এই তুমি সরো তো আমার চোখের সামনে থেকে। তোমার মুখও আমি দেখতে চাই না।"

কৌশিক মাথা দোলালো। বাধ্য ছেলের মতো উঠে দোতলার সিঁড়ি ধরলো। যেনো সে প্রচন্ড বাবা ভক্ত ছেলে। বাবার আদেশের বাইরে সে একটা কদমও রাখে না।

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন