ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ প্রণয়

১৫তম পর্ব

লেখক: সোনালিকা বিনতে আজিম

#নিষিদ্ধ_প্রণয়

#পর্বঃ১৫

#সোনালিকা_বিনতে_আইজা

কৌশিকের লাগামহীন কথা শুনে খেঁকিয়ে উঠলেন জামাল সাহেব,

"অসভ্য ছেলে! আনুষ্ঠানিকতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ঠিক যেমন মির্জা ফখরুল নির্বাচনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ছেলে আমার। তাহলে ফখরুল সাহেবের ঝলক কেনো?"

"কালকেই তো বললাম বাবা। এই বিষয়ে মা ভালো বলতে পারবে।"

সঙ্গে সঙ্গে কনকচাঁপা বেগম কৌশিকের পিঠে থাপ্পড় মারলের। চোখ রাঙিয়ে বললেন,

"বাপ ব্যাটা তর্ক করছিস কর। কিন্তু খবরদার! মাঝখানে আমাকে টানবি না। তোর বাপের যে খ্যাটখ্যাটে স্বভাব। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না।"

কৌশিক ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। জামাল সাহেবের মুখের দিকে নরম চাহনি দিয়ে বললো,

"বেশ! সব দোষ আমার। আমি সবই জানি কিন্তু বলবো না। এখন তোমার আর কি বলার আছে সেটা বলো।"

"আর কিই বা বলার থাকবে? বিয়ের অনুষ্ঠান মুখের কথা নাকি? কত আয়োজন করতে হয়। কেনাকাটা আছে। ডেকোরেশনের জন্য ভালো লোক খুঁজতে হবে। আত্মীয় স্বজনদের নাম লিস্ট করতে হবে। জনে জনে ফোন করে দাওয়াত দিতে হবে। এসবের জন্য কি সময় লাগে না?"

"আত্মীয়দের নামের লিস্ট আর দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব তুমি নাও। বাকি আয়োজন আমি সামলে নেবো।"

জামাল সাহেব চোখ রাঙালেন। বিদ্রুপ করে বললেন,

"বউ ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে অসভ্যটা। বলি, ঘরে না তুলতেই তো বাপ হয়ে গেছো। কোনোকিছু বাদ রেখেছো কি?"

"বাদ কেনো রাখবো? আমার মন অনেক বড়ো বুঝলে। যাকে যা কিছু দেই, সব উজার করে দেই। সেখানে তুবা তো আমার বউ। ওকে কিছু দিতে কিপ্টামি করবো নাকি? এ্যানি ওয়ে। ওই কথাই রইলো। তুমি আত্মীয়দের দাওয়াতে লেগে পড়ো। বাকি সব আমি দেখে নিচ্ছি।"

বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো কৌশিক। অফিসের ব্যাগ হাতে নিয়ে তুবার দিকে স্থির চোখে তাকালো। ঠান্ডা গলায় বললো,

"বাইরে অপেক্ষা করছি। খাওয়া শেষ হলে আয়। তোকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো।"

তুবা আস্তে করে মাথা নাড়লো শুধু। জামাল সাহেব কটমট করে তাকালেন ছেলের দিকে। নিজের দামড়া ছেলের সাথে বাচ্চা মেয়েটাকে কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছেন না। গলা ছেড়ে ছেলেকে ধমকে উঠবেন তার আগেই কৌশিক গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো।

-

-

ক্লাসরুমের একদম শেষের বেঞ্চে বসে বসে গোপন আলাপ আলোচনা করছে তুবা। সঙ্গ দিতে আছে তুবার বেস্টফ্রেন্ড রিমি। দুই বান্ধবী মাথা নিচু করে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করছে। ইতিমধ্যে নিজের প্রেগনেন্সির কথা রিমিকে জানিয়ে দিয়েছে তুবা। গোপন বিয়ের কথা রিমি আগে থেকেই জানতো। তুবা প্রেগনেন্ট কথাটা শুনে প্রথমে রিমি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু পরিবার মেনে নিয়েছে শুনে মনে মনে খুশিও হয়েছে খুব। তুবা আলতো করে পেটে হাত রেখে নিচু কন্ঠে বললো,

"জানিস রিমি? আমার মনে হয়, বাবু আমাদের জন্য খুবই লাকি। ওর আসার খবরে সব ঝড় কত সহজেই থেমে গেলো। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না সবাই এতো সহজে আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছে।"

"সহজে আর কোথায়? নিজে থাপ্পড় খেয়েছিস। কৌশিক ভাইকেও জবাবদিহিতা দিতে হয়েছে। তাহলে সহজে হলো কিভাবে?"

"তবুও। মেনে তো নিয়েছে। একবার ভাব। আমার অন্য কোথাও বিয়ের কথা চলছে। আমি নিশ্চিত, বড় চাচ্চু জোর করে হলেও আমাকে আর কৌশিক ভাইকে আলাদা করে দিতেন। আমার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যেতো। তখন আমি কি করতাম? ভাবতেই তো মরে যেতে ইচ্ছে করছে।"

রিমি বিরক্ত হলো খুব। নিচু স্বরে ধমকে উঠলো,

"তুই একটু বেশি বেশি ভাবিস। আচ্ছা বাদ দে এসব। দ্বিতীয়বার বিয়ে উপলক্ষে কি গিফট চাই বল? তুই যা চাইবি তাই দেবো।"

তুবা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। বেঞ্চের ওপরে ছড়িয়ে রাখা বই খাতা ব্যাগে রাখতে রাখতে বললো,

"তুই স্বশরীরে উপস্থিত হলেই আমি খুশি। আর কিছু লাগবে না।"

"ধুর! তা আবার হয় নাকি? কিছু তো দিতেই হবে। আচ্ছা তোর জন্য শাড়ি কিনবো। আর কৌশিক ভাই? ওনার জন্য কি নিবো? শার্ট নাকি পাঞ্জাবি? কোনটাতে ওনাকে বেশি ভালো লাগে তোর?"

"সবকিছুতেই ভালো লাগে। কিছু না পড়লে আরও ভালো লাগে।"

আনমনে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ফট করে কথাটা বলে ফেললো তুবা। বলার পরে নিজেই হকচকিয়ে গেলো। তাড়াহুড়ো করে রিমির দিকে তাকালো। রিমি হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে আছে। দুই হাতে মুখ চেপে ধরে আছে। চোখ দুটো মার্বেলের আকার ধারণ করেছে যেনো। তুবা খানিকটা লজ্জা পেলো। নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে অগোছালো কিছু যুক্তি দাঁড় করালো,

"ইয়ে! মানে! ওই আর কি। জিম করা বডি না? খালি গায়ে দেখতে ভালো লাগে। আকর্ষনীয় আকর্ষনীয়। বুঝলি।"

তুবাকে আমতা আমতা করতে দেখে মুখ টিপে হাসলো রিমি। তুবার কানের কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"বেশ ভালোই অভিজ্ঞতা হয়েছে দেখছি। দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে বুঝি?"

তুবা হাসফাস করে উঠলো। এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকালো। তখন নজরে পড়লো নীরবের শক্ত চাহনি। মাঝের সাড়ি থেকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে নীরব। ইশারায় কিছু একটা বোঝাচ্ছে। নীরবের শক্ত চোখের ভাষা বুঝে ওঠার আগেই আচমকা তুবা এবং রিমির সামনে এসে দাঁড়ালেন টিচার। নিজের কর্কশ কন্ঠে খ্যাকখ্যাক করে ধমকে উঠলেন,

"এই মেয়েরা। স্ট্যান্ড আপ।"

স্যারের ধমক শুনে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেলো তুবা আর রিমি। স্যার আবারও খেঁকিয়ে উঠলেন,

"ক্লাস টাইমে এতো কিসের কথা হ্যা? অনেক্ষণ ধরে খেয়াল করেছি, তোমরা দুজন কথা বলেই যাচ্ছো। যাও ক্লাস থেকে বের হও। দড়জার সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।"

শেষের বাক্যটা ধমকের সাথে বললেন। আচমকা ধমকে কেঁপে উঠলো তুবা। চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলো। কান ধরে দড়জার সামনে দাঁড়ালো।

ইতিমধ্যে তুবা এবং রিমির বাসায় ফোন করা হয়ে গেছে। তুবার বাসা কলেজ থেকে কাছে হওয়ায় সবার আগে তাওহীদ সাহেব এসে পৌঁছালেন। এতোক্ষণ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও দূর থেকে নিজের বাবাকে আসতে দেখে হকচকিয়ে গেলো তুবা। চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। স্যার ইতিমধ্যে বাসায় নালিশও করে দিয়েছে। তুবা সরু নজরে তাকালো। দূর থেকে তাওহীদ সাহেব আর প্রিন্সিপাল স্যারকে কথা বলতে বলতে এদিকেই আসতে দেখা যাচ্ছে। তুবা মনে মনে ফন্দি আটলো। বকা খাওয়া থেকে বাঁচার জন্য নানান বাহানা খুঁজলো। পাশ থেকে রিমি ফিসফিস করে বললো,

"তুবারে! আজ আমরা শেষ।"

রিমির আহাম্মকের মতো কথা শুনে বিরক্ত নজরে তাকালো তুবা। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

"ইচ্ছে করছে তোকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেই। এই তুই আমার বান্ধবী? শেষ মানে কি? হ্যা? শেষ মানে কি? এই পৃথিবীতে সমস্যা যেমন আছে। ঠিক তেমন সমাধানও আছে। মানুষের হাত দুইটা নয় তিনটা। ডান হাত, বাম হাত আর অজুহাত। এই অজুহাতটা অদৃশ্য থাকে। শুধু সময় এলে কাজে লাগে। শুধু দেখ আমি কিভাবে তিন নাম্বার হাতটা কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি সামলাই।"

ইতিমধ্যে প্রিন্সিপাল স্যার এবং তাওহীদ সাহেব তুবাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। ক্লাস টিচারও ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। তাওহীদ সাহেবকে দেখে ক্লাস টিচার নালিশ সুরে বললে,

"মিস্টার ভুঁইয়া! আপনার মেয়ে ক্লাসে চরম অমনোযোগী। ক্লাস টাইমে দুজন পড়া বাদ দিয়ে গল্প করছিল। ভাবতে পারেন ওদের ভবিষ্যৎ কি?

তাওহীদ সাহেব মেয়ের কাছে এসে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,

"এসব কি তুবা? ক্লাস ফাঁকি দিয়েছো কেনো?"

সঙ্গে সঙ্গে তুবা শুরু হয়ে গেলো। জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগলো। চেহারার ভাব গতি বদলে গেলো। জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতে তুবা ঢলে পড়লো তাওহীদ সাহেবের গায়ে। ভদ্রলোক হকচকিয়ে গেলেন। দুই হাতে জাপ্টে ধরলেন মেয়েকে। কন্ঠে একরাশ দুশ্চিন্তা,

"তুবা! আম্মু কি হয়েছে?"

"আমার ভিষণ শরীর খারাপ লাগছে আব্বু। মাথাটা খুব ঘুরছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। তাই রিমিকে বললাম স্যারকে বলে ছুটি নিয়ে দিতে। কিন্তু স্যার আমাদের কথা না শুনেই ক্লাসের বাইরে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলেন।"

হাঁপাতে হাঁপাতে বললো তুবা। যেনো কন্ঠনালী ভেদ করে কথাও বের হচ্ছে না। ক্লাস টিচার হকচকিয়ে গেলেন। তুবার মরিমরি অবস্থা দেখে প্রিন্সিপাল স্যারও বিশ্বাস করে নিলেন। উল্টো ঘুরে ক্লাস টিচারের উদ্দেশ্যে কড়া কন্ঠে বললেন,

"শুধু মাত্র বই পড়ানোই শিক্ষকের একমাত্র দায়িত্ব নয় রফিক সাহেব। ছাত্র ছাত্রীদের ভালো মন্দ খেয়াল রাখাও শিক্ষারের দায়িত্ব। আপনার ক্লাসে একটা মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর আপনি আগে পিছে না দেখে ওদের কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেন? যদি মেয়েটার সাথে ভালো মন্দ কিছু হয়ে যেতো তাহলে? কি জবাব দিতাম আমি ওর ফ্যামিলিকে?"

প্রিন্সিপালের ধমক শুনে মাথা নিচু করে নিলেন রফিক স্যার। ছোট্ট করে বললেন,

"স্যরি স্যার।"

"এমন ভুল যেনো দ্বিতীয়বার না হয়। নিজের স্টুডেন্টদের খেয়াল রাখবেন। যান ক্লাসে যান।"

রফিক স্যার আর কোনো বাক্য ব্যায় না করে চলে গেলেন। লোকটার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি মনে মনে অনুশোচনায় ভুগছেন। রিমিকে ক্লাসে যেতে বলে তুবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তাওহীদ সাহেব।

-

-

তুবাকে তাওহীদ সাহেব যখন বাসায় নিয়ে আসলেন তখন পুরো দুপুর। কৌশিকের লাঞ্চ আওয়ার চলছে। রিয়া ড্রয়িংরুমের এক কোণে গিয়ে চুপিচুপি তুবার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিলো। কৌশিক তৎক্ষনাৎ ছুটে বাড়ি ফিরে এসেছে। ড্রয়িং রুমে তখন জামাল সাহেব বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ছেলেকে তুফানের গতিতে দোতলায় উঠতে দেখে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। কিন্তু সেই নজরের পরোয়া তার ছেলে থোরাই করলো? সোজা চলে গেলো দোতলায় তুবার ঘরে। তুবা খাটের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে চিপস খাচ্ছিল। এমন সময় হন্তদন্ত ভঙ্গিতে কৌশিককে আসতে দেখে উঠে বসলো তুবা। কৌশিক সোজা তুবার মুখোমুখি হয়ে বসলো। এক টানে তুবাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করছে ছেলেটার। কি করুন সেই ধুকপুকানি। কন্ঠ কাঁপছে,

"জান! কি হয়েছে তোর? রিয়া বলল অসুস্থ হয়ে পড়েছিলি? কি হয়েছে বল আমাকে?"

তুবা চাইলেও আর অভিনয় আগাতে পারলো না। কৌশিকের বুকে বাজতে থাকা দামামা তুবার মনে অনুশোচনা জাগালো। কৌশিক ঠিক কতটা ভয় পেয়ে আছে, সেটা ওর বুকের ধুকপুকানি আর শরীরের কম্পনই জানান দিচ্ছে। তুবা দুই হাতে কৌশিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। বুকের সাথে মুখ গুঁজে মিনমিন করে বললো,

"আমি ঠিক আছি কৌশিক ভাই। কিচ্ছু হয়নি।"

"তাহলে কলেজে কি হয়েছিল?"

"বিশ্বাস করুন কিছুই হয়নি। আমি তো বাবার বকুনি থেকে বাঁচতে এমনি এমনি ওসব বলেছি।"

তুবার কথা শেষ হতেই আচমকা ওকে ছেড়ে দিলো কৌশিক। সামান্য পিছিয়ে গিয়ে বসলো। করুন চাহনিতে তাকালো তুবার মুখের দিকে। পরপরই দুই আঙ্গুলে চোখ চেপে ধরলো কৌশিক। চোখ দুটো শক্ত করে ডলতে ডলতে অসহায় কন্ঠে বললো,

"আমাকে না জ্বালিয়ে তুই শান্তি পাস না তাই না? জানিস, অফিসে কাজের কত চাপ? এমন সময় হুটহাট এমন উড়ো খবর শুনলে কেমন অনুভুতি হয় বুঝিস তুই? টেনশন দিয়ে মেরে ফেলতে চাস আমাকে?"

কৌশিকের কন্ঠে খানিকটা অভিমান ছিলো। তুবার বুকটা মুচড়ে উঠলো। চোখের কোণে পানি জমলো। মাথাটাও কেমন যেনো ঘুরছে। কৌশিকের রাগ তুবা সহ্য করতে পারে। কিন্তু অভিমান সহ্য করতে পারে না।

তুবা কিছুটা এগিয়ে এলো। দুই হাতে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরলো। দৃঢ় মুখটা টেনে মুখোমুখি করলো। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি যুক্ত ডান গালে চুমু খেলো। পরপর বাম গালে চুমু খেলো। কপালেও চুমু খেলো। কিন্তু কৌশিক কোনো রেসপন্স করলো না। পাথর হয়ে বসে আছে যেনো।

এখন যেনো তুবার কান্না পাচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কৌশিক কিছু বলছে না দেখে চোখের পানি বাঁধ ভেঙে উপচে পড়তে চাইছে। তুবা ঠোঁট ফুলিয়ে নাক টানলো। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে মিনমিন করে বললো,

"পুরনো হয়ে গেছি বলে এখন আর ভালো লাগে না তাই না? এজন্য মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন?"

তুবা কথা ভালো মতো শেষও করতে পারলো না। আচমকা কৌশিক হ্যাচকা টানে তুবাকে বুকের ওপর ফেললো। এক হাতে তুবার চিকন কোমর পেচিয়ে ধরলো। অন্য হাতে তুবার চুল মুঠো করে ধরলো। তুবার ফুলিয়ে রাখা ওষ্ঠ নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। মনের সব রাগ সেখানেই ঝারছে কৌশিক। তুবা ইতিমধ্যে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে। কিছুটা ব্যথা লাগছে, কিন্তু তবুও সয়ে নিলো। কৌশিক উন্মাদের মতো আচরণ করছে।

বেশ খানিকটা সময় নিয়ে ছাড়লো তুবাকে। ছাড়া পেয়ে যেনো প্রাণে বাঁচলো তুবা। জোরে জোরে হাঁপাতে লাগলো। কৌশিক তুবার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকালো। জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতে বলল,

"ভালোবাসা কখনো পুরনো হয় না তুবা। যত দিন যায়, ভালোবাসার গাঢ়ত্ব ততই বৃদ্ধি পায়। ভালোবাসা শেষ হওয়ার জিনিস নয়। এ যে অবিনশ্বর একটা সুন্দর অনুভুতি।"

কৌশিক একটু থামলো। একটু দম নিয়ে ফের বলল,

"আজ যা বললি, এই কথা আর কোনোদিন বলবি না জান। তুই যে আমার কাছে ঠিক কি, সেটা মুখের ভাষায় আমি বোঝাতে পারবো না। এটা বোঝাতে হলে আমার প্রাণ ত্যাগ করতে হবে। আমি প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাবে তোর প্রেমে পড়ি। কখনো তোর কাজল বিহীন সরল চোখের। কখনোবা তোর স্নিগ্ধ ঘুমন্ত মুখের। আমি তোর হাসির প্রেমে পড়েছি কয়েকশত কোটি বার। এই প্রেমে পড়ার শেষ নেই জান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই প্রেম শেষ হবে না।"

তুবা চুপ হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে কৌশিকের এক একটা শ্বাস প্রশ্বাস অনুভব করতে লাগলো। ঠিক এমন সময় শোনা গেলো ময়না বেগমের গলা। তিনি বারান্দা থেকে ডাকতে ডাকতে আসছেন,

"তুবা! তুই নিজের ঘরে আছিস নাকি রিয়ার ঘরে?"

বলতে বলতে তিনি তুবার ঘরে আসলেন। এক হাতে দড়জা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলেন। হতভম্ব নজরে তাকালেন সামনে। তুবা গায়ে কাঁথা টেনে শুয়ে আছে আর কৌশিক পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ওদের দুজনকে একসাথে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন ময়না বেগম। জোর পূ্র্বক হেসে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন। তৎক্ষনাৎ কৌশিক বলে উঠলো,

"চাচি। তোমার মেয়ের কাছে একটু বসবে প্লিজ। তুবার নাকি মাথা ব্যথা করছে। আমি ছুটি নিয়ে আসিনি। এক্ষুনি আবার অফিসে ফিরতে হবে।"

একদমে কথাগুলো বলে থামলো কৌশিক। ময়না বেগম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। কৌশিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। এরপর লম্বা লম্বা কদম ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ড্রয়িং রুমে তখনও জামাল সাহেব খবরের কাগজ নিয়ে বসে আছেন। কৌশিককে নিচে নামতে দেখে ভদ্রলোক গলা খাঁকারি দিয়ে প্রশ্ন করলেন,

"তুবার কি অবস্থা? একটু কি আরাম পেয়েছে?"

"আমাকে কাছে পেলে তোমাদের মেয়ে এমনিতেই ভালো থাকে। সব অসুস্থতা খারাপ লাগা নিমিষেই উধাও হয়ে যায়।"

গমগমে সুরে কথাগুলো বলেই বাড়ির বাইরের দিকে পা বাড়ালো কৌশিক। জামাল সাহেব চোখ মুখ কুঁচকে মিনমিন করলেন,

"একটা অসভ্য ছেলে!"

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন