#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ১৯
#সোনালিকা_আইজা
নীলাম্বরী আকাশটা আজ কালো মেঘে ঢেকে আছে। রাশি রাশি কৃষ্ণ কালো মেঘপুঞ্জ দলবেঁধে ভেসে বেড়াচ্ছে। থেকে থেকে ধরনীর বুক কাঁপিয়ে গর্জে উঠছে মেঘের রাজা। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ঝিরিঝিরি ঠান্ডা বাতাসের শীতল আবরণ।
এই সাত সকালে মেঘের তর্জন গর্জন তোয়াক্কা না করে ছাঁদে এসেছে রিমি। তুবার বিয়ে উপলক্ষে দুই দিন ধরে এই বাড়িতেই আছে সে। রিমির একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড তুবা। ছোটো থেকেই দুজনের একে অপরের বাড়িতে অবাধ আনাগোনা। দুই পরিবারের মধ্যে পরিচয় পরিচিতি ভালো বিধায় রিমিকে এখানে থাকার অনুমতি দিয়েছে ওর বাবা মা। হলুদ, এবং বিয়ে শেষ করে আজ তার এই বাড়িতে তৃতীয় দিন। কথা ছিলো আজকেও সে এই বাড়িতেই থাকবে। আগামীকাল তলপিতলপা গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ভাবনা মোতাবেক কোনোকিছু হলো কই? এখানে এসে যে এতটা নোংরা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে সেটা ভাবতে পারেনি রিমি।
এই ঘটনার পর এখানে আর এক মুহুর্তও থাকা সম্ভব নয়। ভাবতে ভাবতে রিমি উদাস চোখে আকাশ পানে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়লো। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রিমি আগে কখনও পড়েনি। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে এলো। রিমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছলো। উদাস চোখে তাকিয়ে চলন্ত মেঘের কাছে অভিযোগ জমা দিলো। এমন সময় হঠাৎ ছাঁদের দড়জায় কারোর উপস্থিতির আভাস পাওয়া গেলো। রিমি আন্দাজ করে নিলো কে হতে পারে। ছাঁদে আসার সময় রিয়াকে বলে এসেছে তুবা ঘুম থেকে উঠলে যেনো ছাঁদে পাঠিয়ে দেয়। তার তলবে হয়তো তুবাই এসেছে। বুঝতে পেরেও রিমি পেছন ফিরলো না। শক্ত করে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। উদাসীন চোখ দুটো তখনও ঘন কালো মেঘে স্থীর। পেছনে না তাকিয়েই রিমি ধরা গলায় বলল,
"আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই তুবা। আজ এবং এক্ষুনি। ভাইয়াকে একটু বলবি আমাকে পৌঁছে দিতে?"
"কেনো?"
তুবার উত্তরের জায়গায় পুরুষালী কন্ঠে জবাব শুনে চমকে গেলো রিমি। হুট করেই পেছন ফিরে তাকালো। নিজের থেকে দুই তিন হাত দূরে নীরবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেজাজটা বিগড়ে গেলো। ধপ করে মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। মনে পড়ে গেলো গতকালকের ঘটনা। সেই জঘন্য আবারও রিমির বুকে বিষাক্ত তীর ছুড়লো। রিমি মেজাজ হারালো। ভয়ঙ্কর রুপে গর্জে উঠলো,
"তুই? তুই এখানে কেনো এসেছিস নীরব? কোন সাহসে আমার সামনে এসেছিস? আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা। তোর চেহারাও আমি দেখতে চাই না।"
"যাতে তোর রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে যায়। তাই তো?"
রিমির রাগ বাড়লো। চোখের সামনে যা কিছু পড়ছে সবকিছু ভেঙেচুড়ে গুঁড়িয়ে দিতে মন চাইছে। সে প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে তাকালো নীরবের দিকে। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে হাত টেনে ধরলো নীরব।
নীরবের ছোঁয়ার পুরো শরীরের মধ্যে রিরি করে উঠলো রিমির। অত্যাধিক রাগে পেছন ফিরেই শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কষে চড় মারলো নীরবের গালে। থাপ্পড় খেয়ে মুখটা ডানদিকে ঘুরে গেলো নীরবের। দমিয়ে রাখা মনটা এবার ভিষণ উগ্র হয়ে উঠলো। হাচকা টানে রিমিকে নিজের বুকের ওপর ফেললো। হাত দুটো মুচড়ে পেছন চেপে ধরলো। নীরবের চোখে ভয়ানক আগুন।
"থাপ্পড় মেরেছিস। আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু তুই যেতে পারবি না রিমি।"
রিমি ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে। কিন্তু পুরুষের শক্তির কাছে একটা মেয়ের শক্তি নগন্য। বেশ কিছুক্ষণ মোচড়ামুচড়ি করে যখন রিমি ছাড়া পেলো না। তখন শব্দ করে কেঁদে উঠলো। ফুঁপিয়ে উঠে ঘৃনা ভরা কন্ঠে বললো,
"তুই একটা জানোয়ার নীরব। আই হেইট ইউ।"
"বাট আই লাভ ইউ।"
আচমকা নীরবের জবাব শুনে চমকে উঠলো রিমি। চমকিত নয়নে মাথা তুলে তাকালো। মাথাটা ঘুরে উঠলো। কানের ভেতরেও শো শো করে শব্দ হচ্ছে। রিমি বুঝতে পারলো না সে ঠিক শুনেছে নাকি ভুল। শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। ইতিমধ্যে আকাশ কাঁপিয়ে তীব্র বর্ষন শুরু হয়ে গেছে। বিরতিহীন বারিধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে সবকিছু।
রিমির নড়াচড়া থামতেই নরম হয়ে এলো নীরব। তীব্র বর্ষনের মাঝে আদুরে চোখে তাকালো। জ্বলতে থাকা চোখ দুটো নিভে গেলো মুহুর্তেই। নীরব অনুতপ্তের ন্যায়ে মাথা নোয়াল। ধিমি কন্ঠে বললো,
"সব সময় তুই আমাকে উপেক্ষা করেছিস রিমি। দেখেও অদেখা করেছিস। আমি বহুবার তোর দরবারে একবুক ভালোবাসা নিয়ে হাজির হয়েছি। কিন্তু তুই আমার বুকে ছুরি চালিয়ে উল্টো মুখে হেঁটে চলে গেছিস। আমার কষ্ট হতো। তবুও মেনে নিতাম। আশায় ছিলাম তুই একদিন আমাকে বুঝবি। কোনো না কোনোদিন আমার ভালোবাসাকে মর্যাদা দিবি। কিন্তু তুই এমন কোনোদিন করিসনি। সবসময় আমাকে অপমান করেছিস। দুটো বছর তোকে পাগলের মতো ভালোবেসে এসেছি। কিন্তু তুই? হাহ্!"
শেষে বাক্যটা বিদ্রুপ সুরে বললো নীরব। গলাটা কাঁপছে ছেলেটার। রিমি তখন অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। কন্ঠে বিস্ময়,
"তুই আমাকে ভালোবাসিস? কই? কোনোদিন তো বলিসনি?"
"সব কথা মুখে কেনো বলতে হবে? চোখেরও তো অনেক কথা থাকে। তাছাড়া প্রেমের বিষয়ে মেয়েদের সিক্স সেন্স অতুলনীয়। দুই মাইল দূর থেকে কোনো ছেলে তাকালেও মেয়েরা বুঝে যায়। এবং ছেলেটা কোন প্রেক্ষিতে তাকিয়েছে সেটাও বুঝে যায়। আর দুটো বছর ধরে তোর দিকে হাপিত্যেশ নয়নে তাকিয়ে থাকি আমি। তুই বুঝিসনা সেই চোখের ভাষা? আমাকে এটা বিশ্বাস করতে বলছিস?"
রিমি নত হলো। মাথা নিচু করে নিলো। চোরের মতো এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকালো। পেছনের ধরে রাখা হাতটা মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,
"ছার নীরব। আমার হাতে ব্যথা লাগছে।"
"ব্যথা তো আমারও লাগে রিমি। যখন দেখি তুই আমাকে পাত্তা না দিয়ে অন্য ছেলেদের সাথে ম্যাসেন্জারে প্রেমালাপ করিস। বিশ্বাস কর। আমারও খুব ব্যথা লাগে। শ্বাস আটকে আসে। বুকটা জ্বলে যায়।"
এই পর্যায়ে রিমি আরও এক দফা চমকে উঠলো। গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে বললো,
"তুই কিভাবে জানলি আমি ম্যাসেন্জারে কার সাথে কি কথা বলি?"
"সবই জানি। কি যেনে নাম ছেলেটার? অনিক রাইট?"
" তুই আমার আইডি হ্যাক করেছিস?"
"আমার জন্য এসব বা হাতের খেলা।"
রিমির প্রচন্ড রাগ হলো। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো। আক্রমনাত্বক সুরে বললো,
"তুই একটা জঘন্য ছেলে নীরব। তোকে আমি কোনোদিন ভালোবসবো না। আই হেইট ইউ।'
"আমাকে রাগাস না রিমি। দুটো বছর ধরে তোর পেছনে পাগলা কুত্তার মতো পড়ে আছি। স্কুল কলেজে অন্য কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াইনি। তোর আশায় এখনও বুকটা খালি রেখেছি। তুই সেই বুকে ছুরি মেরে চলে যাবি। আর আমি তোকে ছেড়ে দেবো?"
"কি করবি তুই?"
নীরব একটানে রিমিকে আরও কাছে টেনে নিলো। দুজনের দেহ একে অপরকে সঙ্গে মিশে রইলো। রিমির ঘাড়ের কাছের একগোছা চুল খামচে ধরে মুখটা এগিয়ে আনলো নীরব। সামান্য ঝুঁকে রিমির মুখোমুখি হলো। বাঁকা হেসে বলল,
"আমাকে রাগালে এমন কিছু করবো যে, তুই বাধ্য হবি আমাকে মেনে নিতে। নিজের ইচ্ছায় আমাকে বিয়ে করবি তুই। আর এমন কিছু করার ক্ষমতা আমার অবশ্যই আছে। সামান্য নমুনাও দেখিয়েছি। সুতরাং ভালো মেয়ের মতো সবগুলো ছেলেকে ব্লক করে দিবি। নাহলে, পরবর্তী পদক্ষেপ আমি খুব দ্রুত নেবো।"
নিজের কথা শেষ করে ছেড়ে দিলো রিমিকে। ইতিমধ্যে দু'জনেই ভিজে একাকার। আর সেখানে দাঁড়ালো না নীরব। হনহন করে নিচে নেমে গেলো।
-
-
ঘড়িতে সকাল নয়টা বাজে। এখনও বাইরে তীব্র বর্ষন চলছে। সবাই একে একে খাবার টেবিলে উপস্থিত। রিমিও এসে সবার সাথে যোগ দিয়েছে। তখন চলে যেতে চাইলেও নীরবের হুমকি ধমকিতে দমে গেছে মেয়েটা। গতকালকের ঘটনার পর ওকে আর রাগানোর সাহস হলো না রিমির। একটা দিনেরই তো ব্যাপার। চুপচাপ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত হওয়ার পর সবশেষে আসলো কৌশিক আর তুবা। কৌশিক অফিসে যাওয়ার জন্য একেবারে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছে। এক হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ। অন্য হাতে তুবার হাত। সে খুবই যত্ন নিয়ে গুনে গুনে সিঁড়িতে পা ফেলছে। ঠিক এতোটাই সাবধানে যেনো ভুলক্রমেও তুবার সামান্যতম কষ্ট না হয়। ডাইনিং টেবিলে বসে এক পলক নিজের ছেলের কান্ড দেখে নিলেন জামাল সাহেব। তুবার প্রতি কৌশিকের এতো যত্ন দেখে তিনি মনে মনে খুশি হলেন বেশ। বুক জুড়ে প্রশান্তি ছেয়ে গেলো। কিন্তু মুখে বিড়বিড় করলেন,
"একটা অসভ্য!"
এক মিনিটের জায়গায় চার মিনিট লাগালো কৌশিক। এরপর তুবাকে আলতো করে বসিয়ে দিলো একটা চেয়ারে। পাশের চেয়ার টেনে নিজে বসলো। নিজ উদ্যোগে তুবার পাতে গরম গরম খিচুড়ি তুলে দিলো। টেবিলে সাজিয়ে রাখা নানান পদের ভর্তার মধ্যে বেছে বেছে তুবার পছন্দের ইলিশমাছ ভর্তা, টমেটো ভর্তা, কাঁকরোল ভর্তা এবং চিংড়ি ভর্তা দিলো। এরপর জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসটা সামনে এগিয়ে দিলো। তুবার মাথার পেছনে আলতো করে হাত রেখে বলল,
"আস্তে আস্তে খা।"
তুবা খাবে কি? বাড়ির বড়দের সামনে কৌশিকের এমন কেয়ারিং আচরণ তুবাকে প্রচন্ড লজ্জায় ফেলেছে। বড়দের সামনে মানুষ এমন কিছু করে? তুবা আঁড়চোখে একবার সবার দিকে চাইলো। এক জামাল সাহেব ব্যাতিত বাকি সবাই মুখ টিপে মিটিমিটি হাসছে। তাওহীদ সাহেব মুগ্ধ চোখে তুবা আর কৌশিকের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মুখেও চমৎকার হাসি। সবার হাসি দেখে তুবা মাথা নিচু করে নিলো। ঠিক সেই মুহুর্তে শোনা গেলো কৌশিকের গলা,
"খাচ্ছিস না কেনো? আমি খাইয়ে দেবো?"
তুবা তড়িৎ ডানে বামে মাথা নাড়লো। খপ করে খিচুড়িতে হাত ডোবালো। জামাল সাহেব পাশ থেকে তিরস্কার করে বলে উঠলেন,
"অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। তোমার মাঝে চোরের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কেনো?"
"চশমা বদলাও বাবা। এখানে আমি কিছুই চুরি করিনি। তোমাদের মেয়ে আগেও আমার বউ ছিলো। এখনও আমার বউ আছে। তবে গোপনীয়তার খাতিরে আগে প্রকাশ্যে ওর যত্ন নিতে পারতাম না। এখন লাইসেন্স পেয়ে গেছি। এবার আমার বউয়ের যত্নে কিপ্টামি করবো নাকি?"
খেয়ে খেতেই ভাবলেশহীন জবাব দিলো কৌশিক। বক্তব্য শেষ করে নিজের প্লেটের কোণে বেছে রাখা ভাজা মাছটুকু তুবার প্লেটে তুলে দিলো। জামাল সাহেব চোখ পাকিয়ে তাকালেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
"এই! এইসব আতি আদর দেখিয়ে আমার বাচ্চা মেয়েটাকে বাগে এনেছো তুমি তাই না? আমি বেশ বুঝতে পারছি। এভাবেই ওর মাথা খারাপ করেছো। আমার অবুঝ মেয়েটা তোমার কুটিল ষড়যন্ত্র ধরতে পারেনি। তোমার বশে চলে গেছে।"
"যদি বলি তোমার এই অবুঝ বাচ্চা মেয়েটাই ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে বাগে এনেছে, তাহলে মানতে পারবে তো বাবা? থাক মানা লাগবে না। তুমি বরং খাবার খাও।"
গোপন কথা ফাঁস হতে দেখে হকচকিয়ে গেলো তুবা। আচমকা খাবার গলায় আটকে গেলো। জোরে জোরে কাশতে শুরু করলো। কৌশিক ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পানির গ্লাসটা তুবার মুখের সামনে ধরলো। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো। সমতল কপালে দুই তিনটা চিন্তার ভাজ ফেলে বলল,
"আস্তে! আস্তে! এতো তাড়া কিসের? এখন আরাম লাগছে?"
তুবা উপর নিচ মাথা ঝাকালো। পানি খেয়ে কাশি কিছুটা কমে গেছে। কিন্তু পুরোপুরি নয়। এখনও মেয়েটা খুকখুক করে কাশছে। তুবার অবস্থা দেখে জামাল সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। নিজের অসভ্য ছেলের জন্য বাচ্চা মেয়েটাকে লজ্জায় ফেলার মানেই হয় না।
খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই যার যার মতো উঠে চলে গেলো। টেবিলে এখন শুধু রয়েছে তুবা আর কৌশিক। তুবা খুব সময় নিয়ে আস্তে আস্তে খাচ্ছে। কৌশিক পাশে বসে তুবার খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে। প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে পুরোটা খাবার শেষ করলো তুবা। ভাগ্য ভালো তার খাওয়াতে খুব একটা অরুচি এখনও আসেনি। বরং মুখের রুচি একটু বেশিই বেড়ে গেছে।
খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার পর কৌশিক ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তুবার কপালে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে বলল,
"অফিস যাচ্ছি জান। নিজের এবং আমাদের পুচকুর খেয়াল রাখিস। আমি পরে ফোন করবো তোকে।"
তুবা হেঁসে মাথা নাড়লো। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে লম্বা লম্বা কদম ফেলে বেরিয়ে গেলো কৌশিক। তুবা তখনও ডাইনিং চেয়ারেই বসে ছিলো। যেই না উঠতে যাবে আচমকা সেখানে ময়না বেগম উপস্থিত হলেন। নিজের মাকে দেখে তুবা আর উঠে দাঁড়ালো না। বরং স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
"তুমি ঘরে যাওনি আম্মু?"
ময়না বেগম চেয়ার টেনে মেয়ের মুখোমুখি হয়ে বসলেন। একহাত তুবার গালে রেখে আদুরে সুরে বললেন,
"কৌশিক তোকে খুব ভালোবাসে তাই না তুবা?"
তুবা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নিচু করলো। ময়না বেগম ফের প্রশ্ন করলেন,
"তুই খুশি তো মা?"
তুবা উপর নিচ মাথা নাড়লো। ময়না বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তার বড়ই চিন্তা ছিলো। মেয়েটার কোথায় বিয়ে হবে? কেমন পরিবার পাবে? সুখী হবে কি না? এইসব চিন্তা ময়না বেগমকে সব সময় তাড়া করে বেড়াতো। কিন্তু এখন তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। শুরুতে ওদের সম্পর্কটা দৃষ্টিকটু লাগলেও এখন ময়না বেগমের মনে হচ্ছে এটাই সবচেয়ে ভালো হয়েছে। কৌশিকের চেয়ে ভালো ছেলে তিনি আর কোথায় পেতেন? আজ কৌশিকের যত্ন দেখে মনের কোণে সামান্য যে খুঁতখুঁতানি ছিলো, সেটাও চলে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা মায়ের মেয়ে মায়ের কোলেই আছে। এমনকি সারাজীবন মায়ের কোলেই থাকবে। মেয়ের অসুখ, বিসুখ, বিপদ, আপদ ময়না বেগম নিজের হাতে পার করবেন। এর চাইতে ভালো আর কি হতে পারে? যেখানে নিয়তি নিজ হাতে ওদের দুজনের সম্পর্ক বেঁধে দিয়েছে। সেখানে ভালো না হয়ে যাবে কোথায়?
চলবে?