#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ২১
#সোনালিকা_আইজা
পরিক্ষা শেষ হতে হতে দুপুর পেরিয়ে গেছে। পরিক্ষা চলাকালীন পুরোটা সময় কৌশিক তুবার পাশে ছায়ার মতো লেগে ছিলো। নিশ্চিত হতে একটু পরপরই জিজ্ঞেস করেছে "জান খারাপ লাগছে?" তুবা শুধু মুচকি হেসে মাথা নেড়েছে। হলে ডিউটিরত শিক্ষকেরা শুরুতে বিরক্ত বোধ করলেও, কৌশিকের যত্ন দেখে একসময় মুগ্ধ হয়েছে তারা। একটা পুরুষের ভালোবাসা ঠিক কতটা তীব্র হতে পারে, সেটা কৌশিককে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তুবা নিঃসন্দেহে একজন ভাগ্যবতী নারী। না হলে কি আর এতো যত্নশীল স্বামী পায়?
পরিক্ষা শেষে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো কৌশিক। রিমিকে নিতে পরিক্ষা কেন্দ্রের বাইরে ওর বাবা দাঁড়িয়ে ছিলো। কৌশিক রিমিকে ওর বাবার হাতে তুলে দিয়ে নীরব আর তুবাকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো। ড্রাইভিং সিটে কৌশিক বসে তুবাকে নিজের পাশে বসিয়েছে। নীরব পেছনে বসেছে। তুবা সিটের সাথে মাথা হেলিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য চলতে দেখা যাচ্ছে। তুবা মনোযোগ দিয়ে দোকানগুলোর দিকে চাইলো। রাস্তার বিপরীতের একটা দোকানে কিছু পুতুল ঝোলানো রয়েছে। তুবা আগ্রহ নিয়ে তাকালো। ঠিক সেই মুহুর্তে গাড়িটা সাবধানে ব্রেক কষলো কৌশিক। আচমকা গাড়ি থেমে যাওয়ায় তুবা বাইরে থেকে নজর সরিয়ে কৌশিকের দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলো কৌশিক,
"এক থাপ্পড়ে সবগুলো দাঁত ফেলে দেবো। কিছু পছন্দ হলে আমাকে বলিস না কেনো বেয়াদব?"
তুবা বাচ্চাদের মতো করে ঠোঁট ফুলালো। মিনমিন করে বললো,
"আমার ওই সাদা রঙের টেডিবিয়ারটা চাই। বিড়াল বিড়াল।"
বলতে বলতে হাতের ইশারায় দোকানটা দেখিয়ে দিলো। কৌশিক এক নজর দেখলো শুধু। পরপরই গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো। লম্বা লম্বা কদম ফেলে দৌড়ে চলে গেলো দোকানের ভেতরে। মিনিট দুইয়েক পরেই ধবধবে সাদা রঙের টেডিবিয়ার নিয়ে ফিরে এলো কৌশিক। এটা একটা বিড়ালের পুতুল। দেখতে একদম জীবিত সাদা বিড়ালের মতো। কৌশিক গাড়িতে বসতে বসতে পুতুলটা তুবার দিকে এগিয়ে দিলো। তুবা খপ করে নিয়ে বাচ্চার মতো আগলে ধরলো। সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে অভিমান স্বরে বললো,
"আপনি আমাকে ধমক দিলেন তো? থাপ্পড়ও মারতে চাইলেন। একবার আমার বাবুকে আসতে দিন। আমি ওকে আপনার কোলে একটুও দেবো না। হুহ!"
"আচ্ছা তাই?"
"হ্যা হ্যা তাই!"
তুবার বাচ্চামো দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো কৌশিক। একটানে গাড়ির দড়জা আটকে নীরবকে বলল,
"চোখ বন্ধ কর তো নীরব।"
নীরব বাধ্য ছেলের মতো দুই হাতে চোখ আবদ্ধ করলো। কৌশিক বাঁকা হেসে এগিয়ে এলো। তুবার অভিমানে ফুলিয়ে রাখা ফুলো ফুলো গালটা চেপে ধরে শক্ত করে ঠোঁটে চুমু খেলো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
"বাচ্চার মা সহ কোলে তুলে নেবো। যদি পারিস তো আটকে নিস।"
তুবা চোখ পাকিয়ে তাকালো। সেটা দেখে কৌশিক শব্দ করে হেঁসে ফেললো। হাসতে হাসতে গাড়ি স্টার্ট দিলো। দুষ্টুমির ছলে বলল,
"অনেকদিন ধরে ছাড় পেয়েছিস জান। এজন্য মাথার স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে। কোনো ব্যপার না। আমার বেবিটাকে একবার আসতে দে। তোর ঢিলে হওয়া সব স্ক্রু একে একে টাইট করে দেবো।"
-
-
তুবার পরিক্ষার মাঝে দুই, তিন এমনকি চারদিন পর্যন্তও গ্যাপ আছে। আগামী পরিক্ষা দুই দিন পর হবে। তুবা সন্ধ্যায় হালকা নাস্তা করে পড়ায় মনোযোগ দিয়েছে। কৌশিক আজ অফিসে গেছে। ছলে বলে কৌশলে ঘনঘন ফাঁকি দিলেও আজ অফিসে যেতেই হয়েছে। বাসায় থেকে সব কাজ ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন সবে সন্ধ্যা। নিয়ম মোতাবেক রাত আটটায় কৌশিক বাড়ি ফিরবে।
কৌশিকের ফেরার অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে পড়ায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলো তুবা। কিন্তু কেনো যেনো ভালো লাগছে। শরীরটা দরদর করে ঘামছে। ভিষণ একা একা লাগছে। অকারণেই কান্না পাচ্ছে। প্রেগনেন্সির শুরু থেকেই তুবার মধ্যে এমন অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। মাঝে মাঝে কিছুই খেতে মন চায় না। আবার কখনো কখনো প্রচুর খেতে ইচ্ছে করে। কারণ ছাড়াই হাসতে মন চায়। আবার অকারণেই কান্না পায়। এমন অনেক হয়েছে, রাতে তুবার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে। সেই মাঝ রাতে কারণ ছাড়াই তুবা বাচ্চাদের মতো কেঁদেছে। ওকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করেছে কৌশিক। কত রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছে তুবার সাথে। ভাবতে ভাবতে মুচকি হাসলো তুবা। হাতের বইটা পাশে রেখে কৌশিকের নাম্বারে ডায়াল করলো। একবার রিং বাজতেই ফোনটা রিসিভ করলো কৌশিক। কন্ঠে একরাশ চিন্তা,
"কি হয়েছে জান? শরীর খারাপ লাগছে? মাকে ফোন দেবো?"
"না। আমি ঠিক আছি।"
এবার যেনো কৌশিক শান্ত হলো। ফোনের ওপাশ থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দও শোনা গেলো। কৌশিক শান্ত কন্ঠে বললো,
"আমাকে মিস করছিস?"
"হুম!"
"কতটা?"
"অনেক বেশি।"
তুবা একটু থামলো। এরপর বায়নার সুরে বললো,
"ভালো লাগছে না আমার। আপনি কখন আসবেন?"
"এই তো, আর এক ঘন্টা। তারপরই বাড়ি ফিরবো।"
"আসার সময় আমার জন্য ফুচকা নিয়ে আসবেন।"
কৌশিক থেমে গেলো। শাসন সুরে বললো,
"একদম না। এসব উল্টো পাল্টা খাবার এখন মোটেও খাওয়া যাবে না। এসব ফুচকা চটপটি অস্বাস্থ্যকর।"
কৌশিকের বারন শুনে হুট করেই মন খারাপ হয়ে গেলো তুবার। ভিষণ কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে চিৎকার করে কাঁদতে। কান্না দমিয়ে নাক টানলো তুবা। কৌশিক বোধহয় শুনতে পেলো। নিরুপায় হয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো। ক্লান্ত কন্ঠে বললো,
"আচ্ছা বেশ। বাড়ি ফিরে আমি নিজের হাতে বানিয়ে খাওয়াবো। চলবে?"
তুবার মুখে তৎক্ষনাৎ হাসি ফুটে উঠলো। সে হাসি হাসি মুখ করে বলল,
"আচ্ছা। তবে তাড়াতাড়ি আসবেন কিন্তু। তাড়াতাড়ি ফুচকা খেতে না পারলে আমি কিন্তু মরেই যাবো। তখন ভুত হয়ে সব ফুচকাওয়ালাদের জ্বালাতন করবো।"
তুবার মুখে মরার কথা শুনে রেগে গেলো কৌশিক। কষে ধমক দিতে গিয়েও নিজেকে দমিয়ে নিলো। দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা হজম করলো। কথার সমাপ্তি না টেনেই খট করে ফোনটা কেটে দিলো।
তুবা তেমন কিছু মনে করলো না। হয়তো তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করবে বলে ফোন কেটেছে। তুবাও নিজের ফোন বিছানায় রেখে শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো। বইটা হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বই পড়তে শুরু করলো। উঁচু পেটটা নিয়ে মেয়েটার হাঁটাচলা করা মুশকিল। পা টিপে টিপে কদম ফেললো তুবা। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ বইটা হাত ফসকে নিচে পড়ে গেলো। তুবা অতিষ্ট ভঙ্গিতে কপাল চাপড়ালো। বইটা এখনই পড়ার ছিলো?
সামনে ঝুঁকে বইটা তোলার চেষ্টা করলো তুবা। কিন্তু উঁচু পেটের কারণে সামনে ঝুঁকতে পারছে না। বিরক্ত হয়ে তুবা উঠে দাঁড়ালো। এরপর পন্ডিতি করে আবারও ঝুঁকলো। অথাৎ সে এই মুহুর্তে বইটা তুলেই ছাড়বে। এবং কারোর সাহায্য ছাড়া সে একাই করবে। অতিরিক্ত ঝুঁকতে গিয়ে আচমকা দুই পায়ের ভারসাম্য হারালো তুবা। স্লিপ করে পুরোপুরি সামনে ঝুঁকে উপুড় হয়ে পড়ে গেলো। পাহাড় সমান উঁচু পেটে চাপ লেগে পেটে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। সেকেন্ডের ব্যবধানে চিনচিনে ব্যথা কঠিন রুপ ধারণ করলো। সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে তুবা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো।
বাড়ির রমনীরা রান্নাঘরে রাতের খাবারের আয়োজন করছিলেন। আচমকা দোতলা থেকে তুবার চিৎকার শুনে চমকে উঠলেন সকলে। হাতের সব কাজ ফেলে তিন জা ছুটলেন তুবার ঘরের উদ্দেশ্যে। বাড়ির তিন কর্তা এবং রিয়া, নীরবও ছুটলো। সবাই মিলে তুবার ঘরের সামনে আসতেই সকলের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। তুবা ফ্লোরে শুয়ে পেট চেপে ধরে কাতরাচ্ছে। ইতিমধ্যে ওয়াটার ব্রেক শুরু হয়ে গেছে। সবার আর বুঝতে বাকি নেই তুবা কোনোভাবে পড়ে গেছে। ময়না বেগম আর্তনাদ করে ছুটলেন মেয়ের কাছে। তাওহীদ সাহেব সবাইকে উপেক্ষা করে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। তুবার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ভদ্রলোক হাঁটতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। ওনাকে সাহায্য করলো নীরব। দুজনে মিলে ধরাধরি করে ছুটলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
-
-
হসপিটাল পৌঁছানোর মাঝেই রাস্তায় তুবা দুবার জ্ঞান হারিয়েছে। ওর চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানো হয়েছে। মেয়েটা কিছুতেই জ্ঞান ধরে রাখতে পারছে না। বার বার মুর্ছা যাচ্ছে। তাওহীদ সাহেবের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে বুক কামড়ে ধরছে। একমাত্র মেয়ে তার। বয়সই বা কত? মাত্র উনিশ। এতো কম বয়সে কি মেয়েটা এতো ব্যথা সইতে পারে? একা একা কিভাবে লড়াই করবে মেয়েটা? এ যদি হেরে যায়? তাওহীদ সাহেবের কোল, বুক দুটোই যে খালি হয়ে যাবে। তিক্ত বিষাক্ত কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর গাড়িটা হসপিটালে পৌঁছালো। তাওহীদ সাহেব আবারও মেয়েকে কোলে তুলে ছুটলেন হসপিটালের ভেতরে।
তুবাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সবাই দড়জার সামনে জটলা পাকিয়েছে। শেষ মুহুর্তে ওটিতে ঢোকানোর সময় তুবা আবারও জ্ঞান হারিয়েছে। তাওহীদ সাহেবের ভয় এতে দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এমন সিচুয়েশনে বারবার জ্ঞান হারানো মোটেও ভালো লক্ষ্মণ নয়। তাকে শান্ত করতে কাঁধে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মেজো ভাই। ময়না বেগমের কাঁদতে কাঁদতে বেহাল দশা। তাকে শান্তনা দিচ্ছে দুই জা। কিন্তু মায়ের মন কি শান্ত করা সম্ভব। তিনি বুক চাপড়ে কাঁদছেন আর বিলাপ করেছেন,
"সব আমার দোষ। কৌশিক আমাকে বলে গেছিলো ওর খেয়াল রাখতে। আমার উচিত ছিলো ওর কাছে থাকা। আমি কেনো থাকলাম না? আমি থাকলে আমার মেয়েটা এভাবে পড়তো না।"
এরকম হাজারো কথা নিয়ে আহাজারি করছেন তিনি। ময়না বেগমের মুখে কৌশিককে নাম শুনে জামাল সাহেবের বুকে ব্যথা শুরু হলো। ছেলের চিন্তা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। তিনি জানেন নিজের ছেলেকে। তুবার জন্য ছেলের পাগলামিগুলো নিজের চোখে দেখেছেন। তুবার এই খবর শুনলে কৌশিক কিভাবে রিয়্যেক্ট করবে? তুবার এখনও ডেলিভারির সময় হয়নি। সময়ের আগে ডেলিভারিতে অবশ্যই জটিলতা সৃষ্টি হবে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ছেলেকে সামলাবেন কিভাবে?
ভদ্রলোক শান্তিতে চিন্তা করারও সুযোগ পেলেন না। কারণ ঠিক সেই মুহুর্তেই হসপিটালে আগমন ঘটলো কৌশিকের। ছেলেটা কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে আসছে। চুলগুলো এলোমেলো। চোখ দুটো র**ক্ত লাল। পুরো চেহারায় পাগলের ছাপ। পরিবারের কাছাকাছি আসতেই কৌশিক চেপে ধরলো নিজের বাবাকে,
"তুবা কোথায় বাবা? কি হয়েছে ওর?"
জামাল সাহেব জবাব দিতে পারলেন না। ছেলের এমন এলোমেলো অবস্থা দেখে তিনি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। নিজের বাবার থেকে জবাব না পেয়ে অধৈর্য্য হলো কৌশিক। একবার চঞ্চল নয়নে সকলের দিকে তাকালো। একটু দূরে রিয়া আর নীরব দাঁড়িয়ে। রিয়া মুখ চেপে ধরে কাঁদছে। নীরব মাথা নিচু করে রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কৌশিক নীরবের কাছে ছুটলো। এক হাতে নীরবের বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
"অর্ধেক কথা বলে ফোন কেনো বন্ধ রেখেছিস বেয়াদব? তুবাকে হসপিটালে কেনো আনা হয়েছে? ওর ডেলিভারির ডেট তো সামনের মাসে। তাহলে?"
"তুবা কিভাবে যেনো ফ্লোরে পড়ে গেছিলো ভাইয়া। এরপর লেবার পেইন শুরু হয়ে গেছে।"
কৌশিকের বুকে যেনো কেউ বিষাক্ত ছুরি বিঁধিয়ে দিলো। অদৃশ্য কোনো হাত গলা চেপে ধরলো। শ্বাস আটকে মরার কায়দা ছেলেটার। গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠলো। জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতে ধপ করে নিচে বসে পড়লো। চেহারা কেমন যেনো পাথর, অনুভুতি শূন্য লাগছে। জামাল সাহেব আঁতকে উঠলেন। ছেলের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন। ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে ভাঙা কন্ঠে বললেন,
"আব্বারে! ও আব্বা! কৌশিক! শান্ত হ আব্বা। তুবার কিচ্ছু হবে না। দু'জনের কারোর কিচ্ছু হবে না। এরা ঠিক সুস্থ হয়ে ফিরবে।"
কৌশিক রক্তলাল চোখে জামাল সাহেবের দিকে তাকালো। পুরুষত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সব পরিস্থিতিতে শক্ত থাকা। আজ সেই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বসলো কৌশিক। জামাল সাহেবকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেললো। ভিজিয়ে দিলো বাবার পাঞ্জাবির কাঁধ। ঠিক এমন সময় আগুনে ঘি ঢালতে সেখানে উপস্থিত হলেন একজন ডক্টর। তিনি পাষাণের মতো জানালেন,
"পেসেন্টের অবস্থা খুব বেশি ভালো না। আমরা হয়তো মা অথবা বেবির মধ্যে যে কোনো একজনকে বাঁচাতে পারবো। আপনারা জানান কাকে বাঁচাতে চান?"
সকলের শ্বাস এবার যেনো পুরোপুরি আটকে গেলো। তুবার গর্ভে যে সন্তান আছে সে ভুঁইয়া বংশের উত্তরসূরী। বংশের আগামী প্রজন্ম। ভুঁইয়া পরিবারের ভবিষ্যৎ। এদিকে তুবাও পরিবারের সবচেয়ে আদরের মেয়ে। দুজন প্রিয় মানুষের মধ্যে কোনো একজনকে কি বেছে নেয়া যায়? তাওহীদ সাহেব হুহু করে কেঁদে ফেললেন। মেয়েকে হারানোর শঙ্কায় ভদ্রলোকের বুক কামড়ে ধরলো। জামাল সাহেব যেনো বোধ জ্ঞান খুইয়ে বসেছেন। এমন সময় গর্জে উঠলো কৌশিক। উদ্ভ্রান্তের মতো বিলাপ করতে করতে বলল,
"আমার তুবাকে চাই। আমার শুধু তুবাকে চাই। আমার আর কিচ্ছু চাই না। কিচ্ছু না। আমার তুবাকে ফিরিয়ে দিন। ওকে ছাড়া আমি মরে যাবো। আমি বাঁচবো না। আমি সত্যিই মরে যাবো।"
কৌশিককে পাগলের মতো বিলাপ করতে দেখে পেছন থেকে আগলে ধরলো নীরব। জামাল সাহেব বুকে পাথর রেখে বললেন,
"আমাদের মেয়েকে আগে বাঁচান ডক্টর। তবে চেষ্টা করবেন, আমার নাতি অথবা নাতনি যেই হোক ওকেও বাঁচানোর।"
কথাটা বলার সময় ভদ্রলোকের গলা কাঁপছিল। আহারে! তিনি কতই না স্বপ্ন গুছিয়ে রেখেছেন নিজের নাতি নাতনি নিয়ে। তার ঘর আলো করতে বংশের প্রদীপ আসছে। যে সবার চোখের মনি হয়ে আদরে আদরে বড় হবে। তিনি কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন নিজের আগামী প্রজন্মকে। সেই বংশের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে আজ ঘোষণা দিলেন। বুকটা হঠাৎ করেই মুচড়ে উঠলো। ডক্টর তৎক্ষনাৎ একটা কাগজ এগিয়ে দিলো। জামাল সাহেব কৌশিকের কাছে কাগজটা এগিয়ে দিলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে এলোমেলো ভাবে সাইন করলো কৌশিক। সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর আবারও ওটিতে ঢুকে গেলেন।
কৌশিক এবার যেনো পুরোপুরি ভেঙে পড়লো। দুই হাতে মুখ চেপে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললো। জামাল সাহেব ছেলের কাছে বসলেন। কৌশিক মাথা নিচু রেখে পাগলের মতো মাথা নেড়ে বলল,
"তুবার কিছু হলে আমি বাঁচবো না বাবা। আমি মরে যাবো। আমি নিজেকে শেষ করে দেবো। ওর কিছু হলে এই হসপিটাল থেকে দুইটা লা*শ বের হবে। আমি নিজেকে মে*রে ফেলবো। তুবা ছাড়া আমি বাঁচতে চাই না। আমার চাইনা এমন জীবন।"
পাগলের মতো বিলাপ করতে করতে আচমকা জামাল সাহেবের ওপর ঢলে পড়লো কৌশিক। অতিরিক্ত চিন্তায় ছেলেটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। জামাল সাহেব আঁকতে উঠলেন। ছেলেকে দুই হাতে আগলে ধরে করুন স্বরে ডাকলেন,
"আব্বারে! কৌশিক! ও আব্বা চোখ খোল।"
চলবে?