# মেঘবালিকা
# দ্বিতীয় পর্ব
# অচেনা পরিচয়ের শুরু
লিখিকা : হুমাইয়া
সকাল।
মাহতাব ভিলায় সকাল থেকেই বেশ ব্যস্ততা। নাসরিন বেগম কাজের লোকদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। আজ স্বামীর বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা। অনেক দিন পর দেখা হবে, তাই আয়োজনের কমতি রাখতে চান না।
অন্যদিকে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে আরহাম। হঠাৎ ফোনের শব্দে বিরক্ত হয়ে চোখ খুলল। ফোনের স্ক্রিনে আদনানের নাম দেখে কল রিসিভ করল।
— কী হয়েছে?
— সুপ্রভাত, জনাব আরহাম মাহতাব!
— সকাল সকাল বিরক্ত করার কারণ?
— আজ কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না?
— হ্যাঁ, বাবার বন্ধুর বাড়ি।
— বাহ! তাহলে তো আজ নতুন কোনো অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।
আরহাম বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোর কি আর কোনো কাজ নেই?
— আছে। তবে তোর বিয়ের খবর শোনার অপেক্ষায় আছি।
— আদনান!
— আচ্ছা বাবা, চুপ করলাম।
আরহাম কল কেটে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।
অন্যদিকে খান ভিলা।
নূরাইশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় মা সুফিয়া বেগম ঘরে প্রবেশ করলেন।
— নূর, আজ কিন্তু তোমাকে বাসায় থাকতে হবে।
— কেন, আম্মু?
— আজ তোমার বাবার বন্ধু আসবেন। অনেক দিন পর দেখা করতে আসছেন।
নূরাইশা মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল,
— আমার ক্লাস আছে, আম্মু।
— একদিন ক্লাস মিস করলে কিছু হবে না। তাছাড়া তোমার বাবাও চেয়েছেন তুমি বাসায় থাকো।
— আচ্ছা, থাকব। তবে আমার রুমে কেউ বিরক্ত করতে আসবে না।
সুফিয়া বেগম মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেললেন।
— আগে অতিথি আসুক, তারপর দেখা যাবে।
কিছুক্ষণ পর নূরাইশার ফোন বেজে উঠল।
— হ্যালো, রাইসা!
— কোথায় তুই? আজকে ইউনিভার্সিটিতে যাবি না?
— না রে। বাসায় অতিথি আসবে।
— বাহ! তাহলে আজ রাজকন্যার রাজদরবার বসবে!
নূরাইশা হেসে বলল,
— বেশি কথা বলিস না। কাল দেখা হলে সব বলব।
দুপুর বারোটা।
খান ভিলার সামনে দুটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন মাহতাব সাহেব। এরপর নাসরিন বেগম। সবশেষে নামল আরহাম।
বাড়ির ভেতর থেকে ইমদাদুল খান এগিয়ে এলেন।
— আরে মাহতাব! কত দিন পর দেখা!
দুই বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন।
— কেমন আছিস, ইমদাদ?
— এই তো ভালো। আয়, ভেতরে আয়।
সবাই ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলেন। নাসরিন বেগমের সঙ্গে সুফিয়া বেগমের পরিচয় হলো।
আরহাম একপাশের সোফায় বসে ফোন দেখছিল। এসব আনুষ্ঠানিকতা তার কাছে বেশ বিরক্তিকর লাগছিল।
মাহতাব সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আরহাম, ফোনটা রেখে এখানে আয়।
আরহাম ফোন পকেটে রেখে সামনে এগিয়ে বসল।
— আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো বাবা?
— জি, ভালো।
ইমদাদুল খান ছেলেটিকে দেখে মুগ্ধ হলেন।
— তোমার কথা মাহতাবের কাছে অনেক শুনেছি। নিজের ব্যবসা সামলাচ্ছো, খুব ভালো।
আরহাম মৃদু হেসে বলল,
— জি, আঙ্কেল।
কিছুক্ষণ পর সুফিয়া বেগম মেয়েকে ডাকলেন।
— নূর! মা, একটু এদিকে এসো।
নিজের ঘর থেকে নূরাইশা বেরিয়ে এল। পরনে হালকা আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। খোলা চুলগুলো পিঠ ছুঁয়ে আছে।
— জি, আম্মু?
— এদিকে এসো। সালাম দাও।
নূরাইশা ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
নাসরিন বেগম স্নেহভরে বললেন,
— মাশাআল্লাহ! বেশ বড় হয়ে গেছো মা।
নূরাইশা মিষ্টি হেসে বলল,
— জি, আন্টি।
আরহাম তখনো ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটির কণ্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকাতেই থমকে গেল।
এ তো সেই মেয়েটা!
বৃষ্টির দিনে যে মেয়েটি তাকে একের পর এক কথা শুনিয়েছিল!
নূরাইশাও আরহামকে দেখে চমকে উঠল।
মনে মনে বলল, 'আল্লাহ! এই লোকটা আবার এখানে কেন?'
মাহতাব সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন,
— আরহাম, ও ইমদাদ সাহেবের একমাত্র মেয়ে নূরাইশা।
আরহাম ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— হ্যালো!
নূরাইশা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দিল,
— হ্যালো।
কিছুক্ষণ পর সুফিয়া বেগম বললেন,
— নূর, আরহামকে তোমাদের বাগানটা দেখিয়ে নিয়ে আসো। অনেক সুন্দর ফুল ফুটেছে।
নূরাইশা মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু বলল না।
— আসুন।
আরহাম উঠে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছিল নূরাইশা। আরহাম কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
— তাহলে আপনিই সেই মেঘপরি!
নূরাইশা পেছনে ফিরে তাকাল।
— মানে?
— কাল বৃষ্টির মধ্যে বেশ সাহস দেখিয়েছিলেন। আজ এত চুপচাপ কেন?
— আপনি কি সবসময় মানুষকে বিরক্ত করেন?
আরহাম মৃদু হেসে বলল,
— না। শুধু বিশেষ কিছু মানুষকে।
— তাহলে অন্য কাউকে খুঁজে নিন। আমাকে বিরক্ত করার দরকার নেই।
— বাহ! কথার ধার তো এখনো কমেনি।
নূরাইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— দেখুন, আপনি আমাদের বাসায় অতিথি। তাই সম্মান করছি। এর মানে এই নয় যে আপনার সব কথা শুনতে হবে।
আরহাম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— আচ্ছা, আপনার নামটা কী?
— নূরাইশা।
আরহাম নামটা মনে মনে আওড়াল।
— সুন্দর নাম।
— ধন্যবাদ। এবার ভেতরে চলুন।
নূরাইশা চলে গেল। আরহাম তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— অদ্ভুত মেয়ে একটা!
বিকেল।
অতিথিরা বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাহতাব সাহেব ইমদাদুল খানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে বিদায় নিলেন।
গাড়িতে বসে নাসরিন বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মেয়েটা বেশ মিষ্টি, তাই না?
আরহাম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— মোটামুটি।
— মোটামুটি মানে?
— মা, শুরু কোরো না।
নাসরিন বেগম মুচকি হাসলেন।
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে নূরাইশা রাইসাকে ফোন দিল।
— দোস্ত, আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে!
— কী হয়েছে?
— কাল বৃষ্টিতে যার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল, আজ সেই লোকটাই আমাদের বাসায় অতিথি হয়ে এসেছিল!
রাইসা হেসে বলল,
— বাহ! তাহলে তো কাহিনি জমে উঠছে!
— চুপ কর! আমার একদম ভালো লাগেনি লোকটাকে।
কথাটা বললেও নূরাইশার মনে পড়ল লোকটার মুচকি হাসি।
অন্যদিকে গাড়ির জানালায় মাথা হেলিয়ে বসে আছে আরহাম। তার মনে বারবার ভেসে উঠছে মেয়েটির অভিমানী মুখ।
আনমনে বলে উঠল,
— মেঘপরি!
কিন্তু আরহাম জানে না, এই ছোট্ট পরিচয় একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে।
আর নূরাইশা? সে কি কখনো বুঝতে পারবে, কারো বিরক্তির আড়ালেও কখনো কখনো মায়া লুকিয়ে থাকে?
চলবে...