ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

2

লেখক: উম্মে_হাবিবা

নিজের মায়ের মুখে এমন কথা শুনে বাকরুদ্ধ মেহরিমা। বিস্ময়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। তার মা যে এমন কথা বলেছে কথাটা বিশ্বাস করতেও শ্বাসরোধ হচ্ছে তার। মায়ের দিকে তাকিয়েই বিস্মিত কন্ঠে থেমে থেমে বললো

--মা কি..কি বলছো তুমি এসব? নিজের সন্তানের র'ক্তকে তোমার কাছে বোঝা মনে হয়?

শাহিদা নেওয়াজ আজ কঠোর হলেন। নির্দয়ের মতো বললেন

--বোঝা নয় তো কি? অন্যের সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তোর নিজের জীবন টা ধ্বংস হচ্ছে এটা কি তুই দেখছিস না।

--বার বার অন্যের সন্তান অন্যের সন্তান বলবে না মা। তুমি ভালো করেই জানো পুতুলের পরিচয়। নেওয়াজ বংশে আমাদের যতটা না অধিকার আছে তার চেয়েও হাজার গুন বেশি অধিকার পুতুলের রয়েছে।

--আমি ভুলি নি কিচ্ছু ভুলি নি আমি। সব জানি আমি। তাই বলে এই না যে দায়িত্ব নিতে গিয়ে তুই নিজের জীবনটা এভাবে হেলাফেলা করবি।

সহসা মেহরিমার চেহারা গম্ভীর হলো। পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে বললো

--এই বিষয়ে তোমার সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাইছি না মা। তুমি তোমার কাজে যেতে পারো।

শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের কথা শুনলেন না। কাছে এগিয়ে বললেন

--এভাবে আর কতদিন মেহের? এবার একটু নিজের কথা ভাব। আমি বলি কি পুতুলকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে আয়..

--মা

মেহরিমা চিৎকার করে উঠলো। চোখে মুখে রা'গের আভাস স্পষ্ট। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের রাগান্বিত চেহারা দেখে চুপ করে গেলেন। অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়ের দিকে। মেহরিমা শক্ত করে পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বললো

--দ্বিতীয় বার তোমার মুখে যেন এই কথা না শুনি। পুতুলকে আমি কোথাও দিবো না। ও আমার কাছে থাকবে। আমি না খেয়ে থাকলেও আমার পুতুল অভুক্ত থাকবে না। ওকে যেহেতু আমি ইনকাম করে খাওয়াই সেহেতু ওর সব দায়িত্ব ও আমার। তোমাদের থেকে অন্তত ওর বিষয়ে কোনো কথা শুনবো না আমি।

শাহিদা নেওয়াজের চোখে পানি জমলো। আঁচলে মুখ চেপে বললো

--আমি কি সাধে বলি। মা হয়েছি আমি। যত জ্বালা সব তো আমার। দিনের পর দিন নিজের শৌখিন মেয়েটাকে এমন বিধ্বস্ত হতে দেখে যে আমার কলিজা এফোর ওফোর হয় এটা কি কেউ বোঝে?

মেহরিমা কোনো জবাব দিলো না। উল্টো ঘুরে পুতুলকে বুকে জড়িয়ে রেখে দাঁড়িয়ে রইলো। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের থেকে উত্তর না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো। পাশের ঘর থেকে তখনও ভেসে আসছে তার কন্ঠস্বর

--এতো মানুষ মরে খোদা আমায় কেনো চোখে দেখে না। কি পাপ করেছিলাম জীবনে যার জন্য এমন কপাল হলো আমার। একজন তো ফাঁকি দিয়ে বেঁচে গেলো অথচ আমাকে দিয়ে গেলো হাজার দায়িত্ব। এক মেয়ে পাগল,এক মেয়ের সংসারে অশান্তি,এক মেয়ে খেটে মরে। ছেলেটাও কোল খালি করে চলে গেলো। খোদা আর কত পরীক্ষা নেবেন আমার।

মেহরিমা মায়ের কথা শুনে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা ছোট্ট প্রাণকে আগলে নিলো। মাথায় চুমু একে বললো

--আমার জান মাম তোমাকে কোথাও যেতে দেবে না। সুখে, দুঃখে সর্বদা তুমি মামের সঙ্গী হয়ে থাকবে। ইউ্য নো মাই বার্বিডল,মামের এই সংগ্রামী জীবনের শক্তি তুমি। তোমাকে হারিয়ে ফেললে মাম বাঁচবো না আম্মু। একদম মরে যাবো।

ছোট্ট প্রাণ কি বুঝলো কে জানে। নিজের ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মেহরিমার গলা আঁকড়ে ধরলো। বুকের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে আদুরে স্বরে বললো

--পুতু মামকে বালোপাতে।

মেহরিমা চোখে পানি নিয়েই হাসলো। বুকের ভেতর বয়ে চলা ঝড় নিমেষেই নদীর জলের মতো শান্ত হয়ে গেলো। পুতুলের ছোট ছোট চুলে হাত বুলিয়ে চোখ বুজলো। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু কণা। মনে মনে রবের দরবারে বললো

--হে আমার রব আমায় শক্তি দিন। ছোট্ট এই প্রাণটাকে সুন্দর জীবন দেওয়ার জন্য হলেও আপনি আমার সহায় হোন। জীবনের এই পথচলাকে সহজ করুন।

******************************
❝শান্তি নিবাস❞

শান্তি নিবাসে আজ হুলস্থুল কান্ড ঘটেছে। বাড়ির কর্তা মোহাম্মদ বশির আনসারী এবং তার মৃত স্ত্রী মরহুমা পদ্ম লোচন শান্তির ঊনপঞ্চাশ তম বিবাহ বার্ষিকী। আজকের এই দিনেই শান্তি বেগমকে বিয়ে করে নিজের জীবন সঙ্গীনি করেছিলেন ভদ্রলোক। নিজের থেকে বয়সে ছোট মেয়েটাকে পুতুলের মতো আগলে রেখে একটু একটু করে বড় করেছিলেন তিনি। দুজনের টোনাটুনির সংসারে ধীরে ধীরে তিনজন ছানাপোনা হলো। শুরু হলো তাদের সুখের সংসার। কিন্তু সেই সুখ সৃষ্টি কর্তা বেশি দিন রাখলেন না। বারো বছর আগে তাকে একা রেখেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলো শান্তি। বশির আনসারীকে পুরোপুরি একা করে দিয়ে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। সেই থেকে বশির আনসারীর নিঃসঙ্গ জীবন শুরু। প্রিয় স্ত্রীকে স্মরণে রেখে প্রতিবছর এই দিনটা বড় করে উদযাপন করেন তিনি। মিলাদ,দান,এতিমখানায় বাচ্চাদের নতুন জামাকাপড় দিয়ে স্ত্রীর জন্য দোয়া চান।

বশির আনসারী স্ত্রীর ছবিটায় হাত বুলিয়ে একটা চুমু খেলেন। ইতিমধ্যে তার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে উঠছে। চশমা খুলে রুমাল দিয়ে চোখটা মুছে নিলেন। নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন

--তোমাকে ছেড়ে বারোটি বছর কাটিয়ে দিলাম শান্তি। অথচ এই বারো বছরে প্রতিটা মূহুর্ত তোমার শূন্যতায় ছটফট করেছি আমি। তোমার করা ছোট্ট ছোট্ট আবদার,অভিমানে গাল ফুলিয়ে রাখা,চড়ুই পাখির মতো চাঞ্চল্যে সবকিছুর শূন্যতা আমাকে ভেঙেচুরে নিঃশেষ করেছে। এমন কথা তো ছিলো না শান্তি। তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে সারাজীবন আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে, তবে কেনো এই দূরত্ব? যে দূরত্বে তোমাকে ছোঁয়া যায় না,অনুভব করা যায় না সে দূরত্ব তো আমি কখনো চায় নি শান্তি। কিসের শাস্তি দিলে তুমি আমায় বলতে পারো।

--বুড়ো বয়সেও তোমার এই ভীমরতির কোনো শেষ নেই দেখছি। বউয়ের জন্য প্রেম একদম গলে গলে ঝোল হয়ে পড়ছে।

বশির আনসারীর আপনমনে দুঃখ বিলাসের মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা পুরুষালী কন্ঠের খোঁচা মূলক কথা শুনে বিরক্তিকে চোখ মুখ কুচকে ফেললেন। আলমারিতে যত্ন সহকারে স্ত্রীর ছবির ফ্রেমটা রেখে দিয়ে লাঠির সাহায্যে হেঁটে বিছানায় গিয়ে বসলো গোমরা মুখে। আগন্তুক বশির আনসারীকে গোমড়া মুখে বসে থাকতে দেখে মনে মনে হাসলো। হেলেদুলে এগিয়ে গিয়ে বসলো তার গা ঘেঁসে। ফোন টিপতে টিপতে বললো

--বুড়ো দেখি আবার গোসসাও করতে পারে।

বশির আনসারী কোনো উত্তর দিলো না। আগন্তুক ছেলেটাকে একটা ভেংচি কেটে উল্টো ঘুড়ে বসলো। ছেলেটা নিজের দাদুকে এমন অভিমান করতে দেখে ঠোঁট কামড়ে মুচকি মুচকি হাসলেও রসিকতা করে বললো

--বলি প্রতি বছর এই রঙঢঙ করতে বিরক্ত লাগে না তোমার? বউ মরে ভূত হয়েছে এক যুগ হলো অথচ তাকে নিয়ে তোমার মাতামাতি শেষ হলো না।

--যেদিন নিজে বিয়ে করবে এবং আমার মতো বউকে ভালোবেসে চোখে হারাবে সেদিন বুঝবে বউ মৃত হোক কিংবা জীবিত তাকে নিয়ে রঙঢঙ করতেও সুখ সুখ লাগে।

গম্ভীর কন্ঠে বশির আনসারী নিজের নাতিকে উত্তর করলো। ছেলেটা দাদুর থেকে উত্তর পেয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা দোলালো। ফোনটা পকেটে পুরে বললো

--সবই ঠিক আছে কিন্তু তোমার একটা কথা মানতে পারলাম না পার্টনার।

--কোন কথা মানতে পারো নি পার্টনার?

--এই যে আমার বিয়ে। আমি তো এ জনমে বিয়ে করবো না। সেখানে বউ নিয়ে মাতামাতি করা তো বিলাসিতা। এটা একটু বেশিই ভেবে ফেলছো তুমি।

বশির আনসারী ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। নাতির দিকে ফিরে বললো

--বিয়ে, বউ এসব নিয়ে তোমার এতো অনীহা কেনো শায়ের? তুমি জানো না বেঁচে থাকতে হলে জীবনে একজন সঙ্গীর কতোটা প্রয়োজন।

শায়ের দাদুর কথায় খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। উল্টো কথা ঘুরিয়ে বললো

--আর এক বছর পর তো শত বর্ষের সেঞ্চুরি করে ফেলবা। কেমন ফিল হবে বউ ছাড়া পঞ্চাশ বছরের বিবাহবার্ষিকী তে?

বশির আনসারী একটু উদাস হলো বোধহয়। নিষ্প্রাণ কন্ঠে বললো

--মেঘ বিহীন আকাশ আর অক্সিজেন ছাড়া বাতাস যেমন আমিও আমার গিন্নিকে ছাড়া তেমন।

শায়ের হাসলো নিঃশব্দে। এ বাড়িতে দাদুই একমাত্র তার আপনজন। তার বন্ধু। যে মানুষটা চোখ দেখেই শায়ের ভালো লাগা,খারাপ লাগা ধরে ফেলতে পারে এক সেকেন্ডে। শায়ের দাদুর হাত জড়িয়ে ধরলো শান্ত কন্ঠে বললো

--সুইটহার্টকে খুব ভালোবাসতে তাই না?

বশির আনসারী নাতির কথায় মুচকি হাসলেও মেকি গম্ভীরতা নিয়ে বললো

--খবরদার আমার বউকে সুইটহার্ট বলবে না। আমার বউয়ের ভাগ আমি তোমার সঙ্গে করবো না। পারলে নিজে গিয়ে একটা বিয়ে করে তাকে সুইটহার্ট, জান,কলিজা,ফ্যাকশা যা ইচ্ছে হয় বলো।

শায়ের দাদুর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়ি বললো

--দ্রুত বাইরে চলো। তোমার সকাল ফর্মালিটিস শেষ করে আমাকে আবার ফিরতে হবে।

নাতি চলে যাবে শুনে চেহারায় আধার নামলো তার। অসহায় কন্ঠে বললো

--আজকের রাতটা অন্তত আমার সাথে থেকে যা দাদুভাই। তোর দাদি নেই তুই ও থাকিস না। পুরো বাড়িতে নিঃসঙ্গ থাকতে আমার কেমন দম আটকে আসে তুই বুঝিস।

শায়ের তাচ্ছিল্যে হেঁসে বললো

--আমি ছাড়াও তোমাদের বাড়িতে অনেক গুনী মানুষ আছে দাদু। আমি তো বখাটে,মাস্তান। উল্টো তোমাদের সঙ্গে থাকলে তোমাদের বংশের দূর্নাম হবে। জেনে শুনে কে চাইবে নিজেদের রেপুটেশন নষ্ট করতে?

বশির আনসারী লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। নাতির কাঁধে হাত রেখে বললো

--এখনো পুরনো কথা ভুলতে পারিস নি দাদুভাই।

--যে কথা কলিজায় আঘাত করে শ্বাসরোধ করেছিলো সে কথা এতো সহজে ভুলি কেমন করে দাদু।

বশির আনসারী বলার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না। তার সব নাতির মধ্যে শায়েরকে তিনি একটু বেশিই ভালোবাসে। ছেলেটার গোটা একটা পরিবার থাকার পরও কেমন নিঃসঙ্গ দিন কাটায়। কবে যে ছেলেটার একটা গতি হবে? বেচে থাকা কালিন ছেলেটার সুখ দেখে যেতে পারলেই তার শান্তি।

শায়ের দাদুকে মুড অফ করতে দেখে হেসে হেসে বললো

--কি গো বুড়ো যৌবনের প্রেমিকার বিরহে পুরছো বুঝি? সুইটহার্ট জানতো বিয়ের আগে তোমার একটা প্রেমিকা ছিলো?

--বাবা আপনাকে বাইরে ডাকছেন।

দাদু নাতির কথার মাঝে দরজার কাছে এসে কথাটা বললেন এ বাড়ির ছোট ছেলে শফিক আনসারীর স্ত্রী দোলা। দোলা শায়েরে মা। সম্পর্কে মা হলেও মা ছেলের মধ্যে কোনো সমঝোতা নেই। শত্রুর মতোই ব্যবহার তাদের।

শায়ের দোলা বেগমে দেখে পিছু ঘুরলো। বিরক্তি স্বরে বললো

--এসে গেছেন মেলো ড্রামার কুইন।

বশির আনসারী নাতির কথা শুনে আস্তে করে বললো

--আহা শায়ের,মা হয় তোমার। চুপ করো।

--অমন সেলফিশ মা থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো।

দোলা বেগম ছেলের কথা স্পষ্ট শুনলেও কিছু বললেন না। শ্বশুরকে তাড়া দিয়ে বললো

--বাবা লোকজন বাইরে অপেক্ষা করছে।

বশির আনসারী নিজের চমশা টা ঠিক করে বললো

--তুমি যাও আমরা আসছি।

দোলা বেগম ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলা যেতেই বশির আনসারী নাতির হাত ধরে বললো

--পার্টনার আমাকে একটু ধরে ধরে নিয়ে চল তো। বুঝিসই বয়স হয়েছে। হাড়ের জয়েন্টে জয়েন্টে ঝং ধরে গেছে। নিজে নিজে আর চলতে চায় না।

শায়ের হেঁসে দাদুকে খোঁচা মেরে বললো

--এতোটুকু রাস্তা যেতে তোমার হাঁটুর ঝং ধরেছে আর প্রতিদিন যখন হেলেদুলে দোকানে যাও তখন ঝং ধরে না।

--আরে বুঝিস না কেন। দোকানে কি আমি সাধ করে যায়। সারাদিন বসে বসে তোর জন্য মেয়ে খুঁজি। বেঁচে থাকতে তোর ছেলেমেয়ের মুখে বুড়োদাদু ডাক শোনার বড় শখ আমার। আমার এই শখটা তুই পূরন করবি না পার্টনার।

শায়ের দাদুর হাত ধরে যেতে যেতে বললো

--আমার বিয়ে নিয়ে পড়ো না তো। বংশে আরো নাতি আছে তোমার। তাদের বিয়ে দিয়ে তোমার শখ পূরণ করো। তবুও আমাকে আর জ্বালিয়ো না।

বশির আনসারী মুখ ভাড় করে বললো

--ওরা আর তুই কি এক হলি পার্টনার। তুই হলি আমার পার্টনার। তোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক টাই দাদু উইথ বিয়াই বিয়াই। ওদের সঙ্গে তোর তুলনা করলে তো চলবে না।

শায়ের দাদুর দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালে কেশে উঠলেন তিনি। তাড়া দিয়ে বললেন

--কচ্ছপের মতো চলছিস কেনো? দ্রুত হাট। তোদের বয়সে আমি হেঁটে হেঁটে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতাম। আর তোরা কিনা ঘর থেকে বাহির পর্যন্ত যেতেই হাঁপিয়ে যাস। ছ্যাহ ছ্যাহ আমার মান সম্মান কিছু রাখলি না।

শায়ের মূহুর্তের মধ্যে দাদুর রূপ বদল করতে দেখে আড়ালে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। দুপাশে মাথা নেড়ে বললো

--সুইটহার্ট যে কি করে তোমার মতো নাটকবাজের সঙ্গে এতো বছর সংসার করলো খোদা জানে।

--সংসার টেকাতে একটু আধটু নাটক করতে হয় ও তুই বুঝবি না। আগে বিয়ে কর তারপর দেখবি নিজেও কেমন দক্ষ অভিনেতা হয়ে গেছিস।

--হ্যা মহা বিজ্ঞানী জ্যোতিষি তো তুমি। ভবিষ্যত বানীতে ওস্তাদ।

--বুড়ো হয়েছি বলে কি আমার কথার কোনো দামও দিবি না।

শায়ের দাদুর কথা কানে তুললো না। নিজের বন্ধু সমতুল্য প্রিয় আপন মানুষটার ভরসা হয়ে এগিয়ে চললো গন্তব্যে

***********************
রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে মাত্রই বসলো মেহরিমা। পুতুল ঘুমাচ্ছে। একটু আগে পেটে ব্যাথার জন্য খুব কাঁদছিলো। হুট করে কেনো পেটে ব্যাথা হলো ওর বুঝলো না মেহরিমা। সকালে তো সুস্থই দেখে গিয়েছিলো। কেঁদে কেটে ফর্সা মুখটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিলো ছোট্ট প্রাণের। পুতুলের একেকটা চিৎকার আর ছটফটানি সূচালো সূচ হয়ে বিধছিলো মেহরিমার বুকে। যে মেয়ের গায়ে সামান্য ফুলের টোকা লাগলেও মেহরিমা সহ্য করতে পারে না সে মেয়ের এমন ছটফটানি দেখে কলিজা ছিড়ে যাচ্ছিল তার। মেয়ের কান্নায় যেন দম আটকে আসছিলো তার।

মায়ের কথায় ঘন্টা ধরে আগুনের সেক দেওয়ার পরও যখন পেটে ব্যাথা কমছিলো না তখন আর বসে না থেকে পাশের ফার্মেসিতে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে ঔষধ এনেছে। অল্প দুধ খাইয়ে ঔষধ খাওয়ানোর পর এখন একটু শান্ত। তবুও মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে কেমন কেঁপে উঠছে।

মেহরিমা বিছানায় পুতুলের পাশে বসে মেয়েটাক মন ভরে দেখলো। ঝুঁকে আলতো করে মেয়েটার কপালে চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো

--আমার আম্মু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠো সোনা। মাম তোমার কষ্ট সইতে পারছি না।

মেহরিমা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ব্যাগ থেকে বই বের করলো। কিছুদিন পর তার এডমিশন পরীক্ষা। যে করেই হোক ভার্সিটি চান্স পেতে হবে। পুতুলকে সুন্দর একটা জীবন দেওয়ার জন্য হলেও ভালো একটা জব তার চায়। আর ভালো জবের জন্য প্রয়োজন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সঙ্গে নিজের মেধার যোগ্যতা। মেহরিমা পড়াশোনায় বরাবরই ভালো। এসএসসি, এইচএসসি দুটো পরীক্ষায়ই জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এবারের লক্ষ্য ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া। কষ্ট করে হলেও পড়াশোনা টা চালিয়ে যেতে হবে।

মেহরিমা নিজের মতো পড়াই ব্যস্ত। থেকে থেকে পুতুলের দিকেও খেয়াল রাখছে। মেয়েটাকে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেও সেই স্বস্তি মিললো না বেশিক্ষণ। ঘুমের মাঝেই হরহর করে বমি করে দিলো পুতুল। ক্লান্ত শরীরটা বমির করার ফলে আরো নেতিয়ে গেলো। নিষ্প্রাণ শান্ত হয়ে পড়ে রইলো বিছানায়।

পুতুলকে হুট করে বমি করতে দেখে বুক কেঁপে উঠলো মেহরিমার। বই পাশে রেখে দ্রুত মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলো। অস্থির কন্ঠে বললো

--পুতুল আমার আম্মু। কি হয়েছে তোমার  সোনা?

পুতুল নড়লো না। অচেতন হয়ে পড়ে রইলো তার মামের বুকে। পুতুলকে এমন শান্ত হয়ে থাকতে দেখে শ্বাস আটকে এলো মেহরিমার। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো মেয়েটা। পুতুলের নির্জীব দেহটা হাতে নিয়ে কাঁপা কন্ঠে বললো

--ও আম্মু কি.. কি হয়েছে তোমার? পুতুল আম্মু,, এই সোনা তা..তাকাও। মাম ডাকছিলো তো তোমায়।

মেয়েটাকে শান্ত দেখে আত্মা উড়ে গেলো মেহেরিমার। পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে বাইরে যেতে যেতে বললো

--মা কোথায় তুমি? বাইরে এসো। আ..আমার পুতুল কথা বলছে না মা। আমার পুতুলের কি হলো? আমার সোনা তাকাচ্ছে না কেনো? মা...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন