ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

12

লেখক: উম্মে_হাবিবা

-এই রাহুইল্লা এদিকে আয়।

মীরের ডাকে পিছু ফিরলো রাহুল। সে এসেছিলো শায়েরকে খুঁজতে। ভার্সিটির নবীণ বরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। স্টুডেন্টরা কেউ কেউ চলে গেছে কেউ আবার জটলা পাকিয়ে আড্ডায় ব্যস্ত। অনেকে ফিসফিস করে আলোচনা করছে আঁধারের মাঝে গাওয়া গান নিয়ে। কেউ আবার বলছে সিক্রেট কাপল সং এটা। দুজনে হয়তো তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করতে চায় না। এজন্যই এমন সর্তকতা অবলম্বন করে আঁধারে গান গেয়েছে।

সবার এমন ফিসফিস আলোচনা আর মন্তব্য শুনতে শুনতে রাহুল মীরের দিকে এগিয়ে এলো। মীর গাছের আড়ালে বসে সিগারেট খাচ্ছিলো। রাহুল এগিয়ে আসতেই ওর দিকে একটা বাড়িয়ে দিলে রাহুল নাকচ করে বলে

--আমি এসব খায় না ভাই।

মীর হাসলো। সে জানতো এই উত্তরই দিবে রাহুল। সিগারেট টা পুনরায় প্যাকেটে রেখে রাহুলের কাঁধ জড়িয়ে সামনের স্টুডেন্টদের দিকে নজর রেখেই বললো

--শায়েরের সঙ্গে থেকেও তুই এমন ভদ্র কিভাবে হলি রাহুল? ওই ব্যাটা যে হারে স্মোক করে,ড্রিংক করে তাতে তো তোর এতোদিনে নেশার উপর পিএইচডি করে ফেলা উচিত ছিলো। অথচ তুই হলি একেবারে সাধু সন্ন্যাসী। নেশার জিনিস দেখলেই মেয়েদের মতো নাকমুখ কুচকে চার লাফ দিস। এটা কিছু হইলো ব্রো।

রাহুল স্বাভাবিক। পাশ থেকে একটা স্পিডের ক্যান হাতে তুলে চুমুক দিয়ে বললো

--নেশা করে ফুসফুস কালো করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে আমার নেই ভাই। এমনিতেই এতিম মানুষ। চার কুলে র'ক্তের আপন বলতে কেউ নেই। খোদা যদি দয়া মায়া করে একটা বউ জুটিয়ে দেয় তখন সে হবে আমার জীবনের সুখ দুঃখীর সঙ্গী। নেশা করে অকালে ম'রে বউকে এই নি'ষ্ঠুর দুনিয়ায় একা ফেলে যেতে চায় না ভাই। সাত জীবনে একটাই বউ হবে আমার,অকালে ম'রে বউ ছাড়া হলে আমি ভূত হয়েও ম'রে যাবো। না বাবা থাক এতো রিস্ক নিয়ে কাজ নেই।

মীর কিছু বললো না। চুপচাপ শুনলো। ঠোঁটের কোণায় এখনো তার সেই সূক্ষ্ম হাসি। সময় নিয়ে ধীর স্বরে প্রশ্ন করলো

--তোর কাছে ভালোবাসা মানে কি রাহুল?

রাহুল বোঝে নি। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো

--তোমার কথা বুঝি নি ভাই। একটু বুঝিয়ে বলো?

মীরের মধ্যে কোনো ব্যস্ততা নেই। সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া গুলো উড়িয়ে দিলো আকাশে। আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে বললো

--ভালোবাসার সংজ্ঞা বলতে কি বুঝিস তুই?

--ওহ এই কথা। ভালোবাসা বলতে আমি শুধু আমার মা'কেই বুঝি।

--আমি মায়ের কথা বলি নি। জীবনসঙ্গীনীর ক্ষেত্রে ভালোবাসা বলতে কি বুঝিস সেটা জানতে চেয়েছি।

রাহুল মাথা চুলকালো। ঠোঁট উল্টে বললো

--ভাই আমি তো কখনো কাউকে ভালোবাসি নি। কিভাবে বলবো?

--তোর মন যা বলতে চায় তাই বল। ভালোবাসার সংজ্ঞা বলতে আবার ঘটা করে কাউকে ভালোবাসা লাগে নি গর্ধব? তোর মনে জমানো অনুভূতিকে প্রকাশ কর।

--ভাই তুমি আজ কেমন জানি ভারী ভারী কথা বলছো। সব আমার মাথার উপর দিয়েই যাচ্ছে।

মীর নিরুত্তর। শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে দূরের একজোড়া কপোত-কপোতীর উপর। সবুজ ঘাসের উপর মেয়েটা বসে আছে আর তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছেলেটা। ছেলেটা হয়তো কিছু বলছে বিনিময়ে মেয়েটার মুখে লাজুক লাজুক হাসি। কখনো আবার বাতাসে উড়ে আসা চুলগুলো আলগোছে সরিয়ে গুজে দিচ্ছে কানে। নিজের নরম হাতের বিচরণ করছে ছেলেটার চুলের ভাজে। দুজনের চোখে মুখে অপার মুগ্ধতা। কি মিষ্টি আদুরে একটা মূহুর্ত। যে কেউ দেখলেই বলবে এদের মধ্যে খাঁটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। অথচ এই দৃশ্য সূচ হয়ে বিঁধছে মীরের হৃদয়ে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও মীর জানে ওর হৃদয়ে কেমন র'ক্তক্ষরণের সৃষ্টি হয়েছে। চোখের পাতায় ভেসে উঠছে এমনিই কিছু সুখের মূহুর্ত। কানের কাছে বাজছে রিনঝিনে হাসির শব্দ। যে শব্দে মীরের কাছে এখন বি'ষাক্ত হুলের মতো। সংস্পর্শে গেলে মৃত্যু অবধারিত।

মীর নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমাতে হাতের জলন্ত সিগারেট টা মুঠোয় চেপে ধরলো। আঁতকে উঠলো রাহুল। তড়িৎ উঠে বসে মীরের হাত থেকে সিগারেট টা বের করতে চাইলো। কিন্তু বাঁধা দিলো মীর। অনুভূতিশূন্য স্বরে বললো

--বাঁধা দিস না রাহুল পু'ড়তে দে। কিছু বাহিক্যে যন্ত্রনা অন্তরের র'ক্ত ক্ষরণ নিরাময়ের উপশম হয়।

রাহুল শুনলো না। ব্যস্ত হলো মীরের হাত থেকে সিগারেট ছাড়াতে। সফল হলে সিগারেট টা ছুড়ে মারলো দূরে। পানির বোতলের মুখ খুলে হাতের পো'ড়া অংশে পানি ঢাললো সময় নিয়ে। ইতোমধ্যে সেখানে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। রাহুলের চোখের কোনে পানি জমেছে। মীরের হাতটা নিজ হাতে নিয়ে বুঁজে আসা স্বরে বললো

--এটা তুমি কি করলে ভাই? এভাবে কেনো নিজেকে কষ্ট দিলে? তুমি তো এমন নও। তাহলে আজ কেনো এমন অপরিচিতর মতো ব্যবহার করছো?

--এই সামান্য আগুনের ছোঁয়া আমাকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না রাহুল।

--এটা তোমার কাছে সামান্য মনে হচ্ছে ভাই? জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছো হাতে। আরেকটু হলেই তো চামড়া উঠে আসতো।

মীর হাসলো। রাহুলের থেকে নিজের হাত টা ছাড়িয়ে নিয়ে সহসা ওকে জড়িয়ে ধরলো। দূরের ওই যুগলের দিকে নজর রেখে আওড়ালো

--তুই বড্ড সরল রে রাহুল। নি'ষ্ঠুর এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে সরলতার কোনো দাম নেই রে বোকা। কঠোর আর স্বার্থপর হতে না পারলে মানব জীবন বৃথা। ফলস্বরূপ একরাশ শূন্যতা ছাড়া কিছুই জুটবে না।

রাহুল বিস্মিত। হতবাক,হতবুদ্ধি,নির্বাক হয়ে শুনছে মীরের কথা। তার মীর ভাই ও যে এমন ভারী ভারী কথা বলতে পারে এটা তো তার জানা ছিলো না। একটু আগ পর্যন্ত ও তো সব ঠিক ছিলো। হুট করে কি হলো মীর ভাইয়ের? রাহুল নিজের ভেতরের কথা গুলো জমিয়ে রাখতে পারলো না। ফটাফট বলে ফেললো

--তোমার কি হয়েছে ভাই? শরীর খারাপ করছে নাকি? তোমার এই রূপ আমি মেনো নিতে পারছি না। দয়া করে নিজের আসল ফর্মে চলে আসো। আমার আগের মীর ভাই হয়ে যাও। নয়তো এক্ষুনি হার্ট অ্যাটাক হবে আমার।

মীর চোখ বুজে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। রাহুলকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। গম্ভীর মুখটা মূহুর্তেই বানিয়ে ফেললো হাস্যেজ্জ্বল। রাহুলের কপালে আলতো টোকা দিয়ে বললো

--স্বাভাবিক হ বুদ্ধু। তোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে আমি এলিয়েন। জীবনে প্রথম বার দেখছিস তুই আমায়। আরে বোকা আমি তো মজা করছিলাম। সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই।

রাহুল পলক ঝাপটে বললো

--তুমি সত্যি বলছো তো?

--না কমিডি করছি।

রাহুল হাফ ছেড়ে বাঁচলো। এতোক্ষনে তার দম টা গলায় এসে আটকে ছিলো। বোতলটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বললো

--তাই বলো। আমি তো আরেকটু হলে স্টোক করতাম।

--হয়েছে এখন চল নীড়কে গিয়ে খুঁজি। ব্যাটা আবার কোথায় হারিয়ে গেলো কে জানে?

--কিন্তু ভাই তোমার হাতে মেডিসিন লাগাতে হবে তো। পাগলামো করে কেনো যে এসব করতে গেলে।

--পড়ে লাগিয়ে নিবো এখন চল।

মীর রাহুলকে টেনেটুনে নিয়ে গেলো। একটা বারের জন্যও আর পেছনে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। যদি তাকাতো তাহলে দেখতো গাছের আড়ালে একজোড়া চোখ কেমন অভিমানি হয়ে দেখছে তাকে।

************
শায়েরকে বকতে বকতে ফাইজার কাছে ফিরে এলো মেহরিমা। নিজের ব্যাগটা বেঞ্চে উপর ছুড়ে ফেলে রা'গে ফোসফাস করতে লাগলো। কতোবড় সাহস তাকে অপমান করে। চ্যাপা শুঁটকির সঙ্গে তুলনা করে। ইশশ ছিঃ এতোকিছু থাকতে চ্যাপা শুঁটকিই কেনো? কথা টা মনে পড়লেই তো মেহরিমার গা গুলিয়ে উঠছে। কি এমন করেছে সে? সামান্য ফোনটাই তো ভেঙেছে। তবুও ইচ্ছে করে করেছি নাকি,অসাবধানতায় ধাক্কা লেগে পড়ে গেছে। সেজন্য এভাবে অপমান করবে?

ফাইজা চোখ ছোট ছোট করে মেহরিমাকে দেখছে। শান্তশিষ্ট মেয়েটাকে এভাবে রে'গে থাকতে দেখে সন্দিহান কন্ঠে বললো

--আমার জানুর কি হয়েছে? এমন মরিচের মতো ফুঁসছে কেনো?

তড়াক করে ফাইজার দিকে তাকালো মেহরিমা। খেক করে বললো

--কি বললি আমি মরিচ? মরিচের মতো লাগে আমাকে?

ভরকে গেলো ফাইজা। বোঝানোর মতো বললো

--আমি তোকে মিন করে বলি নি তো বেব। কথার কথা বলেছি শুধু।

--কথার কথা বলবি কেনো তুই? তার মানে মনে মনে তুই আমাকে মরিচের সঙ্গেই তুলনা করিস?

--আরে না না তুই তো আমার মিষ্টি মিষ্টি কুলফি। তোকে মরিচের সঙ্গে কেনো তুলনা করবো আমি?

শুনলো না মেহরিমা। শায়েরের রা'গ টা ঝাড়লো ফাইজার উপর। খেক খেক করে বললো

--হয়েছে আর পাম দিতে হবে না। বুঝি আমি সবই বুঝি। একজন আমাকে চ্যাপা শুঁটকি বলে অপমান করলো আর এখন তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও আমাকে মরিচ বলে অপমান করলি? তুই মরিচ,তোর জামাই মরিচ,চৌদ্দ গুষ্টি সহ চৌদ্দ প্রজন্ম মরিচ। কথা বলবো না,তোদের কারোর সঙ্গে কথা বলবো না আমি।

মেহরিমা নিজের ব্যাগটা নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো। পেছনে বোকা বোনে বসে রইলো ফাইজা। কি থেকে কি হলো কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তার আদুরে মেহের হুট করে কেনো এতো রে'গে গেলো সেটাও বোধগম্য হলো না। ঠোঁট উল্টে বিরবির করলো

--পুকি জানুটার আবার কি হলো?

***********
কাউকে কিছু না বলেই বাসায় ফিরে এসেছে শায়ের। হাতের আধভাঙা ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে রা'গে রুমের অবস্থা বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে। সুন্দর করে গোছানো রুমটা মুহূর্তের মধ্যে একটা যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়েছে। অথচ কিছুতেই রা'গ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যতোবারই চোখ বন্ধ করছে ততোবারই চোখের পাতায় ওই মেয়েটার অবয়ব ভেসে উঠছে। কানের কাছে বেজে চলেছে মেয়েটার বলা অপমানমূলক কথাগুলো।

পঁচিশ বছরের জীবনে আজ পর্যন্ত কেউ শায়েরকে চেহারা নিয়ে কটু কথা বলে নি। সবসময় সবাই প্রশংসা করেছে। মেয়েদের থেকে হাজার হাজার প্রপোজাল পেয়েছে। কখনো সেসব নিয়ে বিন্দু মাত্র আগ্রহ দেখায় নি শায়ের। মেয়ে জাতির থেকে সবসময় একশহাত দূরে থেকেছে। অথচ আজ প্রথম কোনো মেয়ে তাকে অপমান করলো। তার চেহারা নিয়ে বাজে কমেন্ট করলো। কিভাবে হাতি বলে ডাকলো।

শায়েরের মেজাজ তরতর করে বেড়ে গেলো। ধপ করে বসে ফেললো বিছানায়। ইচ্ছে করছে বেয়াদব মেয়েটাকে সত্যি সত্যিই শুঁটকি মাছের মতো ঝুলিয়ে রোদে শুকাতে। যতবড় সাইজ নয় ততোবড় কথা। শায়ের রা'গে মাথার চুল খামচে ধরলো। বিরবির করলো

--বেয়াদবের বাচ্চাকে যদি সত্যি সত্যিই রোদে না শুকিয়েছি তবে আমিও আনসারীদের র'ক্তের না। দুনিয়ায় এতো মেয়ে দেখলাম এটার মতো ফাজিল একটাও দেখি নি। কতোবড় বেয়াদব হলে সিনিয়রের সঙ্গে গলা উচিয়ে কথা বলে।

--নীড় কই তুই? সোনা মনা হুট করে কোথায় গায়েব হয়ে গেলি তুই?

মীর হেলেদুলে শায়েরকে ডাকতে ডাকতে ওর রুমে এলো। পেছন পেছন এলো রাহুলও। কিন্তু দু'জনেই রুমে এসে থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে গোছগাছ করে রেখে যাওয়া রুমটার এমন করুন পরিনতি দেখে আঁতকে উঠেছে দু'জনে। চোখ বড় বড় করে দেখছে সবকিছু। মীর ছটফটে পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো। শায়ের পাশে বসে হায় হুতাশ করে বললো

--হায় হায় এ কি অবস্থা করেছিস রুমের? এতো দামি দামি ফুলদানি,ছবি,পারফিউম সব এমন ভেঙেচুরে ফেলেছিস কেনো হতভাগা? তোর কাছে এগুলো বিরক্ত লাগলে আমাকে দান করে দিতিস তারপরও এমন করলি কেন ভাই?

শায়ের কোনো উত্তর দিলো। মাথা নিচু করে বসে রইলো। রাহুল চুপচাপ পাশে এসে দাড়িয়ে রুমের অবস্থা দেখছিলো। শায়েরকে এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বললো

--ভাই তোমার কি হয়েছে? এতো রে'গে আছো কেনো? এমপির ছেলে কিছু বলেছি কি? একবার শুধু বলো ব্যাটার হালুয়া টাইট করে দিয়ে আসি।

--রাহুল আমাকে কি হাতির মতো দেখতে লাগে?

প্রশ্নের বিপরীতে এমন প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে রাহুল। মীর নিজেও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে শায়েরের দিকে। শায়েরের মাথা তখনও নিচু। শান্ত হয়ে বসে আছে। রাহুল ভেবে পেলো কি উত্তর দিবে? জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ছোট করে বললো

--তোমাকে হাতির মতো দেখাবে কেনো ভাই? তুমি তো কতো সুন্দর, কেমন জিম করা ফোলা ফোলা মাসেল। ফর্সা চেহারা,বলিষ্ঠ দেহ। মেয়েরা তো পাগল তোমার জন্য। সেখানে এমন কথা বলছো কেনো তুমি?

শায়ের এই প্রশংসায় সন্তুষ্ট হতে পারলো না। খেক করে বললো

--একদম মিথ্যা বলে তেল দিবি না। ভালো করে দেখে বল আমার চেহারা কেমন?

হঠাৎ ধমকে ছলকে উঠলো রাহুলের বুক। মীর নিজেও শায়েরের পাশ থেকে উঠে গেলো। এই ছেলেকে বিশ্বাস নেই। যদি মে'রে টেরে দেয় তখন?

--কি রে বলছিস না কেনো?

রাহুল কাঁদো কাঁদো মুখে মীরের দিকে তাকালো। মীর নিজেও হতভম্ব হয়ে দেখছে সবকিছু। এ ছেলের আবার কি হলো? বলা নেই কওয়া নেই চেহারা নিয়ে পড়েছে কেনো? মীর ভাবুক হয়ে ভাবতে লাগলো। তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো শায়েরকে।

শায়ের মীরের এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে খেক করে বললো

--এক চ'ড় মারবো। এমন ক্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস কেনো? রূপ জেগেছে আমার?

মীরের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। অসহায় চোখে রাহুলকে দেখে নিয়ে বললো

--তুই তো বললি তোর চেহারা কেমন সেটা বলতে? এখন দেখছি বলে ধমকাবি?

--তার জন্য এমন ক্যাবলার মতো চেয়ে থাকতে হবে কেনো?

মীর বিরক্ত চোখে চেয়ে রইলো। এ ছেলের এমন মুড সুইং হচ্ছে কেনো? এসব তো মেয়েদের হয় তাও প্রেগনেন্সির সময়। তাহলে কি শায়ের? নিজ ভাবনায় তাজ্জব বোনে গেলো মীর। ফটাকসে বললো

--ভাই সত্যি করে বল তো কাহিনি কি? মেয়েদের মতো এমন মুড সুইং হচ্ছে কেনো তোর? পেটের মধ্যে আছে নাকি?

মীর চোখের ইশারায় শায়েরের পেট দেখালো। রা'গে কটমট করে তাকালো শায়ের। পায়ের জুতা খুলে মীরের দিকে মা'রতে নিবে সহসা রাহুলের হাত ধরে দৌড় দিলো সে। যেতে যেতে বললো

--ওরে রাহুইল্লা পালা রে। পাগল চেতি গেছে।

শায়ের পেছন থেকে জুতা ছুড়ে মে'রে ফোঁস ফোঁস করে বললো

--আর একবার তোকে হাতের কাছে পেয়ে নি প্রেগনেন্ট কাকে বলে,কত প্রকার সব শিখিয়ে ছাড়বো বেয়াদব বাচ্চা।

মীর দরজা দিয়ে খরগোশের মতো মাথা বের করে বললো

--ছিহ কিসব বাজে কথা বলিস। আমি তোর মতো গে নাকি। বউ ব্যতীত পুরুষের উপর ইন্টারেস্টেড নই আমি বুঝেছিস।

--মীর জাফরের বাচ্চা ধরতে পারলে জ্যান্ত করব দিয়ে ছাড়বো তোকে।

মীর যেমন এসেছিল সেভাবেই দৌড় দিলো। শায়ের সামনে ফেলা ভাঙা ছবিটায় লাথি দিয়ো হিসহিসিয়ে আওড়ালো

--মিস চ্যাপা শুঁটকির বাচ্চা আপনাকে আমি দেখে নিবো।

****************
বিশ্রী মেজাজ নিয়ে বাসায় ফিরেছে মেহরিমা। আজ আর টিউশনিতে যায় নি। সোজা বাসায় চলে এসেছে। এমনিতেই জীবনে ঝামেলার শেষ নেয় নতুন করে আরেক ঝামেলার উৎপত্তি। ওই যে কথায় বলে না পুরান পাগলের ভাত নাই নতুন পাগলের আমদানি। মেহরিমার এখন নিজের প্রতিই রা'গ হচ্ছে। কেনো যে তখন ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলো? না গেলে তো এমন বিশ্রি কাহিনি ঘটতো না। আর না তো বেয়াদব ছেলেটার সঙ্গে দেখা হতো।

মেহরিমা বারান্দায় নিজের ব্যাগটা রেখে জামা কাপড় নিয়ে কলপাড়ে গেলো। যাওয়ার আগে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো

--আম্মু ব্যাগটা নিয়ে যাও তো।

শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের ডাকে হন্তদন্ত হয়ে ঘর ছেড়ে বেড়েলো। ব্যস্ত কন্ঠে বললো

--মেহের এসেছিস। তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে আমার।

--ভালো লাগছে না মা। আগে গোসল করে আসি তারপর শুনবো।

শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের শুকনো মুখের দিকে আর কিছু উচ্চারণ করলো না। নীরবে সম্মতি দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। পুতুল বিছানায় বসে খেলছিলো। দাদিকে একা ঘরে আসতে দেখে ভ্রু কুচকে বললো

--তুমি একা কেনু? মাম তই?

--আমার কলিজার মধ্যে। আয় আমার কলিজা ছিদ্র করে নিয়ে যা তোর মামকে।

পুতুল ভেংচি কাটলো। বিছানা থেকে নেমে ছোট ছোট কদম ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো। শাহিদা নেওয়াজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে মুখ বেকিয়ে বললো

--কুতনি বুলি একতা।

এতোটুকু মেয়ের মুখে এমন পাকা পাকা কথা শুনে তাজ্জব বোনে গেলো শাহিদা নেওয়াজ। খেক করে বললো

--দুই ইঞ্চির ছাও কি বললি তুই আমায়?

--উফফ এতু তিতকাল কলছো কেনু বুলি? আস্তে কতা বুলতে পালো না। আমাল কাল দালাপালা হয়ে গেলো।

--তোর কান আজকে ছিড়ে ফেলবো আমি। বাচ্চা মেয়ে তার পামনামি দেখো। কে বলবে তুই পরিণীতার মেয়ে? আমার বউমা কতো মিষ্টি ছিলো আর তার মেয়েকে দেখো আস্তো একটা মরিচ।

--আমি পলিনীতার মেয়ে না। আমি মামের মেয়ে বুদেতো।

পুতুলের নাকের পাটা ফুলেফেঁপে উঠছে। ছোট থেকে সে মাম হিসেবে মেহরিমাকে দেখে আসছে। তার ছোট্ট মস্তিষ্ক ধরেই নিয়েছে মেহরিমায় তার মা। অন্য কাউকে সে মা হিসেবে মানবে না কখনোই না।

পুতুল দু'হাত কোমড়ে রেখে নাক ফুলিয়ে বললো

--কুতনি বুলি পতা কতা বললে তোমাল মুখ তেলাই করে দিবো আমি।

--কি বললি?

--কেনু শুনো নি। পতা কতা বললে মুখ তেলাই কলে দিবো তুমাল। আমি মামের মেয়ে। মাম আমাল সপ।

শাহিদা নেওয়াজ কিছু বলবে তার আগেই পেছন থেকে মেহরিমা গম্ভীর কন্ঠে বললো

--পুতুল বিহেভ ইউ্যর সেল্ফ। বড়দের সঙ্গে বেয়াদবি করছো কেনো তুমি? এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমায়?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 12 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন