ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

11

লেখক: উম্মে_হাবিবা

শতাধিক হাতের করতালির আওয়াজে ধ্যান ছোটে শায়েরের। অডিটোরিয়ামের আলো এখনো জ্বলে নি। চারপাশ আঁধারের চাদরে মোড়া। খালি চোখে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শায়ের আবারও চোখ ঘুড়িয়ে অজানা রমণীর অস্তিত্ব খুজতে ব্যস্ত হলো। কে গান গাইলো? এমন অচেনা অথচ চেনা সুর কোথা থেকে ভেসে আসলো? হাজার ও চিন্তা হুটোপুটি খেলো তার মস্তিষ্কে।

শায়ের ব্যস্ত হাতে স্টেজ থেকে নেমে গেলো। দৌড়ে গেলো রাহুলের কাছে। গিটারটা হাতে ধরিয়ে দিয়েই ছুটলো সামনে। যাওয়ার আগে ছোট করে বললো

--মাহিনকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর এক্সট্রা মাইক্রোফোন কে নিয়েছিলো?

শায়েরের আদেশ পেতেই রাহুল দ্রুত পা চালালো। মীর এখন পাশে নেই। একটু আগে বাইরে গেছে। ফলস্বরূপ তাকে একাই যেতে হলো।

শায়ের আবছা আলোর সাহায্যে সেখানে এসে পৌঁছালো যেখান থেকে ওই অচেনা মেয়েটার কন্ঠের সুর ভেসে এসেছিলো। ততক্ষণে অডিটোরিয়াম আলোকিত হয়ে গেছে। স্টুডেন্টদের মধ্যে উপচে পড়া উত্তেজনা। আসল গায়কদের দেখার জন্য মরিয়া তারা।

কিছুক্ষণ পর রাহুল ফিরে এলো। সঙ্গে সাউন্ড সিস্টেমের দায়িত্বে থাকা মাহিনকে ও নিয়ে এলো। হুট করে তাকে ডেকে আনার কারণ ছেলেটা বুঝলো না। ভয়ে ভয়ে শায়েরের পাশে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে সালাম দিলো

-- আসসালামু আলাইকুম ভাই। আমাকে ডেকেছিলেন?

তূরন্ত পিছু ফিরলো শায়ের। ব্যস্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো

--গানের মাঝে এক্সট্রা মাইক্রোফোন কে নিয়েছিলো মাহিন?

মাহিন একটু ভরকে গেলো। আমতা আমতা করে বললো

--আমি সঠিক জানি না ভাই। আঁধারের মাঝে একজন এলো। মাইক্রোফোন নিলো আর চলে গেলো। আমাকে কিছু বললোও না আর নাতো শোনার প্রয়োজন বোধ করলো।

শায়েরের ভ্রুদয়ের মাঝে ভাজ পড়লো। গম্ভীর কন্ঠে বললো

--তুমি তাকে চেনো না?

--না ভাই।

--দেখো নি।

--কিভাবে দেখবো ভাই লাইট অফ ছিলো তখন। আবছা আলোতে যতোটা বুঝতে পেরেছি উনি একটা মেয়ে ছিলো।

--উনি যে একজন মেয়ে ছিলো সেটা আমি সহ গোটা অডিটোরিয়ামের মানুষ জানে। নতুন কিছু জানলে তাই বলো।

শায়েরের ধমকে কেঁপে উঠলো মাহিন। কাঁদো কাঁদো চেহারায় রাহুলের দিকে তাকালে ছেলেটা তড়িৎ অন্যদিকে ফিরলো। দেয়ালের দিলে তাকিয়ে গোনার ভান করলো। ভাব টা এমন মাহিন কে?  ওকে ও চেনেই না জীবনে দেখে নি।

শায়ের বিরক্ত হলো। খেক করে বললো

--কিছু বলছো না কেনো?

--কি বলবো ভাই?

--আমিই যদি বলে দেব তাহলে তোমার কাছে শুনছি কেনো? নিজেই বলতে পারতাম।

মাহিনের অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি। অসহায় ফেইস বানিয়ে বললো

--আমি সত্যিই কিছু জানি না ভাই। দিব্বি করে বলছি।

শায়ের উল্টো দিকে ফিরে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। এগুলোর থেকে শোনার চেয়ে কষ্ট করে নিজের খুঁজে নেওয়ায় বুদ্ধি মানের কাজ। শুধু শুধু সময় অপচয় ছাড়া এগুলোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। শায়ের আশেপাশে নজর রেখেই শান্ত স্বরে বললো

--এখান থেকে যাও। বাকি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করবে।

মাহিন নীরবে সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। রাহুল কাছে এসে ধীর স্বরে বললো

--ভাই মেয়েটা কি তোমার পূর্ব পরিচিত?

তড়াক করে রাহুলের দিকে তাকালো শায়ের। চোখ কটমট করে তাকাতে রাহুল শুকনো ঢোক গিললো। বোকা হেঁসে বললো

--হে হে ভাই মনে হচ্ছে ভুল জায়গায় ডায়াল করে ফেলেছি। আচ্ছা থাক সমস্যা নেই এখনই কল কেটে দিচ্ছি।

বলতে বলতে রাহুল নিজেই হাত দিয়ে ফোনের মতো বানিয়ে কানের কাছে ধরে গলা খাকারি দিয়ে বললো

--দুঃখিত আপনি যে নম্বরে ডায়াল করেছেন সেটি এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাইরে আছে। অনুগ্রহ করে আর কখনো ডায়াল করতে আসবেন না। জীবনে বিয়ে করার শখ থাকলে নিজেকে সামলাতে শিখুন। ধন্যবাদ!

রাহুল ফোঁস করে একটা ফেলে বিজয়ী হেঁসে বললো

--ভাই আর কোনো সমস্যা নেই। কল কেটে দি.....

শায়েরের দিকে তাকালে দেখলো সে রা'গে ফোসফাস করছে। চোখদুটো র'ক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। খেয়ে ফেলা লুকে তাকিয়ে আছে রাহুলের দিকে। রাহুল এক পা দুপা করে পিছিয়ে গেলো। মিছেমিছি কপালের ঘাম মুছে হাত নেরে বিদায় জানিয়ে বললো

--আসছি ভাই। পরে দেখা হবে। তুমি আপাতত তোমার গোপন প্রেয়সীকে খোঁজার কাজ চালিয়ে যাও। অল দ্যা বেস্ট।

--তোকে তো আমি...

রাহুলকে আর পায় কে। শায়েরকে এগিয়ে আসতে দেখেই ছেলেটা ভো দৌড় দিয়েছে। শায়ের ওদিকে তাকিয়ে গোটা কয়েক গা'লি ছুড়লো। অতঃপর আবারও চোখের ইশারায় পরখ করলো আশপাশ। না পেয়ে হতাশার শ্বাস ফেললো। উল্টো ঘুরে বাইরে যাওয়ার সময় জুতার তলায় কিছু বিধলো তার। কৌতুহল বশত নিচে তাকিয়ে দেখে একটা নুপুর পরে আছে। শায়ের নিচু হয়ে নুপুর টা হাতে তুলে নিলো। উল্টে পাল্টে দেখে বিরবির করে আওড়ালো

--কোনো ভাবে এই নুপুর টা অচেনা রমণীর নয় তো?

***********
--হ্যালো পুষ্প কোথায় তুই? অনুষ্ঠান তো শেষের পথে। আর কখন আসবি তুই?

ওপাশ থেকে কি বললো শোনা গেলো না। ফাইজা ফোঁস ফোঁস করে বললো

--ফাজিল মেয়ে আর এসে কাজ নেই তোর। বাসায় বসে মুড়ি ভাজ। কতো বছর তোকে দেখবো অথচ এখানেও তোর লেট।

--হয়েছে আর আহ্লাদ করে কথা বলতে হবে না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন তোকে আমার সামনে দেখি নয়তো....

--সাবধানে আয় আর দ্রুত আসবি। দেরি করলেই কিন্তু ডি'ভো'র্স মনে থাকে যেন,রাখছি এখন।

ফোনের কথপোকথন শেষ করে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো ফাইজা। তার পাশেই বাবু হয়ে বসে ছিলো শায়েরী। গালে হাত ঠেকিয়ে গোল গোল চোখে ফাইজার কথা শুনছিলো। কথা শেষ হতেই বললো

--কাকে আসার কথা বলছিস তুই? তোর বয়ফ্রেন্ড নয় তো?

ফাইজা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো শায়েরীর দিকে। পাশে বসে ওর হাত থেকে চিপসের প্যাকেট নিজের হাতে নিয়ে খেতে খেতে জবাব দিলো

--এতো কিছু থাকতে বয়ফ্রেন্ড নামক প্যারার কথায় কেনো তোর মাথায় সেতু? অন্যকিছু ও তো ভাবতে পারতিস।

শায়েরী একটু ভাবুক হলো। চিন্তিত স্বরে বললো

--তুই দেখতে সুন্দরী, শিক্ষিত আবার ব্রিলিয়ান্টও। তোর বয়ফ্রেন্ড থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।

চোখ উল্টে হতাশার শ্বাস ফেললো ফাইজা। শায়েরীর মাথায় একটা ঠোকা দিয়ে বললো

--তুই সারাজীবন উজবুকই থেকে যাবি সেতু। রোহান ভাই যে কি করে তোর মতো গবেটকে পচ্ছন্দ করলো আল্লাহ জানে।

রোহানের নাম শুনে একটু লজ্জা পেলো শায়েরী। কানের পিঠে চুল গুজে বললো

--ওনি বুদ্ধিমান এই জন্যই তো আমাকে পচ্ছন্দ করেছে। ওসব তুই বুঝবি না।

--হ্যা সব তো একা আপনি বুঝে বসে আছেন ম্যাডাম। আমরা তো সবাই দুধভাত।

শায়েরী ভেংচি কাটলো। চিপস খেতে খেতে আশেপাশে তাকিয়ে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখতে লাগলো। ফাইজা একটু চুপ থেকে গুরুতর কন্ঠে বললো

--এই সেতু ভাইয়াকে কবে প্রপোজ করবি রে?

--আমি কেনো প্রপোজ করবো? আমি না মেয়ে মানুষ। আগে আগে প্রপোজ করলে আমার দাম থাকবে? রোহান ভাইয়ের কাছে ভাব কমে যাবে না।

--তাই বলে এভাবে প্রকাশ না করে থাকবি।

--হ্যা থাকবো। রোহান ভাই যদি অপ্রকাশিত রাখতে চায় তবে আমি কেনো ঢাকঢোল পিটিয়ে সেটা উন্মুক্ত করবো? উনার মতো আমিও নো জানতা হয়ে থাকবো।

--নো জানতা হয়েই হাত পা গুটিয়ে বসে থাক। পড়ে যখন অন্য পাখি এসে খাঁচা দখল করবে তখন কেঁদে কেটেও ফুসরত পাবি না। রোহান ভাইয়ের তখন অন্য ঘরওয়ালী হয়ে যাবে। তুই বসে বসে তাদের প্রেমলীলা দেখবি আর দুঃখ বিলাস করতে দাবিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বাদাম খাবি।

ঠা'স করে ফাইজার পিঠে একটা চ'ড় বসিয়ে দিলো শায়েরী। কটমট করে বললো

--বেয়াদব মেয়ে তোর মুখে বো'মা পড়ুক। নিজে প্রেম করিস না বলে অন্যকেও প্রেম করতে দিবি না। এভাবে বদদোয়া করবি?

ফাইজা মা'র খেয়েও মিটিমিটি হাসছে। শায়েরী সেটা দেখে আরো রে'গে গেলো। গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে।

--প্রমি...

অনেক বছর পর পরিচিত স্বর শুনে কিছুটা থমকে গেলো ফাইজা। শুষ্ক ঢোক গিলে সামনে তাকিয়ে দেখলো তার থেকে কিছুটা দূরেই দাড়িয়ে আছে তার বেস্টফ্রেন্ড, তার সুখ দুঃখের সাথী,তার জীবনে সবচেয়ে বিশস্ত মানুষ। যাকে শেষ দেখেছিলো পাঁচ বছর আগে। এরপর আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি। ভাগ্যের লিখনে ফাইজা চলে আসে ঢাকা আর তার সখী রয়ে যায় সুদূর সিলেটে।

মেহরিমা ফাইজাকে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এলো। সামনে দাঁড়িয়ে আমোদিত স্বরে বললো

--প্রমি,মাই পার্সোনাল ডেইজি। কেমন আছিস তুই?

এক মূহুর্তের জন্য ফাইজার কাছে মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা তার ভ্রম। ফাইজা হাসফাস করে উঠলো। তাকিয়ে থেকেই বললো

--তুই পু..পুষ্পই তো?

মেহরিমা হাসলো। মেয়েটার কপালে আলতো টোকা দিয়ে একটা কিটক্যাট সামনে ধরে করে বললো

--এবার বিশ্বাস হলো তো। নাকি আরো প্রমাণ চায়।

ফাইজার চোখজোড়া টলমল করছে। অনেকদিন পর কোনো প্রিয় জিনিস পেলে মানুষ যেমন খুশিতে কেঁদে ফেলে সেভাবেই কাঁদছে ফাইজা। উঠে দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে ম জড়িয়ে ধরেছে মেয়েটাকে। মেহরিমা দুপা পিছিয়ে গেলেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের একমাত্র সখীকে। তার চোখেও পানি চিকচিক করছে। অথচ ফাইজার মতো সে কেঁদে প্রকাশ করতে পারছে না।

ফাইজা মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে  বললো

--আমি তোকে খুব মিস করেছি পুষ্প। গোটা ধরণী ঘুরেও তোর মতো আমাকে কেউ বুঝতে পারে নি। আর নাতো আমি কাউকে তোর মতো করে আপন করে নিতে পেরেছি। তুই সবসময়ই আমার জন্য বেস্ট ছিলি পুষ্প। তোকে ছাড়া এতোগুলাে দিন যে আমার কিভাবে কেটেছে সেটা তোকে বোঝাতে পারবো না। সবসময় শুধু মনে হয়েছে আমি আমার প্রাণকে হারিয়ে ফেলেছি। আর বোধহয় কখনো দেখা পাবো না তোর। আমি তোকে ভীষণ মিস করেছি পুষ্প।

ফাইজার ফুঁপিয়ে বলা কথা গুলো শুনে মেহরিমা চোখে জল নিয়েও হাসলো। মেয়েটার মাথায় আলতো চুমু দিয়ে বললো

--হয়েছি আর কাঁদতে হবে না। দেখি দেখি কেঁদে কেটে নাদুসনুদুস মুখটার কি অবস্থা করেছিস দেখি একটু।

ফাইজা সোজা হয়ে দাঁড়ালে মেহরিমা ওর মুখে হাত রেখে আঁতকে উঠে বললো

--এ বাবা কেঁদে কেটে মুখের কি অবস্থা হয়েছে দেখো। ইশশ সব সাজগোছ একেবারে ঘেটে গেছে। এবার দুলাভাই কোথায় পাবো? আহারে! আর দুলাভাই পাওয়া হলো না রে।

ফাইজা মেহরিমার বাহুতে থা'প্পড় মে'রে বললো

--সব সময় শুধু বাজে কথা তাই না।

--তুই সামনে থাকলে আমি দুষ্টু বাচ্চা হয়ে জানিস না।

--জানবো না আবার। খুব ভালো করেই জানি।

দুজনেই হেঁসে ফেললো। পেছন থেকে শায়েরী ওদের এমন মাখোমাখো সম্পর্ক দেখে গাল ফুলিয়ে অভিমান করে বললো

--আমাকে তো এখন আর কেউ চিনবে না। নতুন পেয়েছে না এখন আমি কে? আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে তো।

দু'জনেই পিছু ফিরলো। মেহরিমা শায়েরীকে চেনো না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে ফাইজা বললো

--ও শায়েরী। শায়েরী আনসারী সেতু। আমার কাজিন। ছোট মামার ছোট মেয়ে। তুই চাইলে ওকে ব্রিজ বলেও ডাকতে পারিস। একদম মাইন্ড করবে না।

শায়েরীর দিকে তাকিয়ে বললো

--কি রে সেতু মাইন্ড করবি নাকি তুই? অবশ্য মাইন্ড করলেও কিছু করার নেই কারন আমি তোকে ব্রিজ বলেই ডাকবো।

শায়েরী কটমট চোখে তাকালো। ফাইজা মিটিমিটি হাসছে। মেহরিমা ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসে বললো

--হাই আমি মেহরিমা..

--মেহরিমা নেওয়াজ পুষ্প। ফাইজার ল্যাদা কালের বেস্টু। এখানে আমাদের সাথে মানে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছো তুমি। কি ঠিক বললাম তো।

মেহরিমা একটু অবাক হলো। ছোট করে জিজ্ঞেস করলো

--তুমি কিভাবে জানলে?

--সারাদিন কানের কাছে তোঁতা পাখির মতো তোমার নাম জপলে আমি কেনো গোটা বিশ্বই না দেখে চিনে ফেলবে তোমায়।

মেহরিমা আড়চোখে ফাইজার দিকে তাকালে দেখলো মেয়েটা ঠোঁট উল্টে দাড়িয়ে আছে। মেহরিমা ফোস করে একটা শ্বাস ফেললো। হাসি মুখে বললো

--তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো। আশা করি আমাদের বন্ডিং টা বেশ জমবে।

--অবশ্যই। জমতেই হবে। না জমলে আমি তো আছি ফর্মালিন সহ বরফ দিয়ে জমিয়ে ফেলবো।

তিনজনেই হেঁসে ফেললো। শুরু হলো তিনজনের ছোট খাটো আড্ডার আসর। অল্প সময়ের মধ্যেই শায়েরী সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো মেহরিমার। গল্পে গল্পে সময়টা যেন হাওয়ার মতো বয়ে গেলো। বাতাসে মিশে রইলো তিনজন রমণীর খিলখিলে হাসির আওয়াজ।

********
প্রিন্সিপালের রুম থেকে মাত্র বের হলো শায়ের। আজকের অনুষ্ঠানের কাজ আপাতত শেষ। একটু পরই ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যাবে সে। বাসায় গিয়ে লম্বা ঘুম দিয়ে এরপর বসবে কাজে। এমনটা ভেবেই পথ চলছে সে। মনোযোগ ফোনের স্ক্রিনে। আশেপাশের কোনোকিছুতে তার খেয়াল নেই। সোজা করিডর পার হয়ে বাম দিকে ঘুরতে নিলে সহসা একটা নরম দেহের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো তার। বেখেয়ালে হাতের ফোনটা ছিটকে পড়লো ফ্লোরে। শায়ের নিজেও পড়ে গেলো ধপাস করে। অল্প সময়ের মধ্যে কি থেকে কি হলো কিছুই বোধগম্য হলো না তার।

মেহরিমা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য একদম তৈরি ছিলো না। সে তো এসেছিলো প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলতে অথচ কোথা থেকে কোন উটকো ঝামেলা এসে তার পথ আগলে ধরলো কে জানে? মেহরিমা তড়িৎ উঠে দাঁড়ালো। হাত পায়ের ময়লা ঝেড়ে সামনে তাকিয়ে দেখলো সুঠাম বলিষ্ঠ দেহের এক পুরুষ ফ্লোরে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। নজর তার পায়ের দিকে। মেহরিমা ভ্রু কুচকে নিজের পায়ের দিকে তাকালো। আধভাঙা একটা ফোন নিজের পায়ের সামনে পড়ে থাকতে দেখে চোখ দুটো বড় বড় করে ফেললো। বিরবির করে বললো

--এই রে ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম বোধহয়। এবার কি হবে?

চিন্তায় মেহরিমার মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেলো। আড় চোখে গম্ভীর মুখের পুরুষটার দিকে তাকিয়ে ফাঁকা ঢোক গিললো। এখন যদি এই লোক ফোন ভাঙার ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসে তখন কি হবে? মেহরিমার কাছে তো আপাতত ইদুর মা'রার বি'ষ কেনারও পয়সা নেই।

মেহরিমা আগপাছ না ভেবে ফট করে নিচু হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। শায়েরের দিকে এগিয়ে গিয়ে অপরাধীর স্বরে বললো

--আমি দুঃখিত ভাইয়া। আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম তো। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।

মেয়েটার কন্ঠস্বর শায়েরের কাছে একটু পরিচিত ঠেকলো। তড়াক করে দৃষ্টি তুলে দেখলো মেয়েটাকে। শায়েরের অমন তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি দেখেই বুকটা ধক করে উঠলো মেহরিমার। সহসা মাথা নিচু করে এদিক করে তাকালো।

শায়ের তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটাকে কিছুক্ষণ দেখে হুট করেই ধমক দিয়ে বললো

--আপনি সেদিনের সেই মেয়েটা না।

কলিজা সুদ্ধ লাফিয়ে উঠলো মেহরিমার। এমন গম্ভীর স্বরের ধমক সে জীবনে খেয়েছে কিনা সন্দেহ। তুতলে বললো

--কো..কোনদিনের ভা..ভাইয়া?

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো শায়ের। প্যান্টের ময়লা ঝেড়ে বুকে হাত গুজে তাকালো মেহরিমার দিকে। ভ্রু কুচকে বললো

--ওই যে সেদিন সকালে লিফ্ট থেকে বের হতে গিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন। এরপর কিসব নামে ডেকে সরি বলে চলে গেলেন সেই মেয়েটা না আপনি?

শায়েরের কথায় বোকা বোনে গেলো মেহরিমা। চোখের ঝাপটে মনে করার চেষ্টা করলো লোকটা কোন দিনের কথা বলছে? স্মৃতির পাতা হাতরে হুট করেই মনে পড়লো কিছুদিন আগের কথা। তাড়াহুড়ো করে কাজে যাওয়ার সময় একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিলো। ব্যস্ততায় ঠিক ভাবে মুখ দেখতে পারে নি। তাহলে এটাই কি তবে সেই ছেলে?

মেহরিমার অপরাধবোধে মাথা টা নিচু হয়ে গেলো। শায়ের পুনরায় বিরক্তির স্বরে বললো

--সেদিনও আপনি আমার ফোনের বারোটা বাজিয়েছিলেন আর আজকেও একই ঘটনা ঘটালেন। বলি সব সময় আপনি আমার ফোনটার সঙ্গেই কেনো ধাক্কা খান? অবলা যন্ত্রের প্রতি কিসের এতো শত্রু'তা আপনার?

মেহরিমা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলো না। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে বললো

--আমি দুঃখিত ভাইয়া। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।

--সব সময় দুঃখিত বললেই মাফ হয়ে যায় না। আপনি বারবার আমার সঙ্গে একই ঘটনা ঘটিয়ে কঠিন অপরাধ করেছেন। তার জন্য আপনাকে অবশ্যই শা'স্তি পেতে হবে।

--বার বার কোথায় ভাইয়া? দু বারই তো ঘটলো এমন ঘটনা। আমি তো ইচ্ছে করে..

--আপনি ইচ্ছে করে করেছেন নাকি অনিচ্ছায় করেছেন সেসব দেখার বিষয় আমার না। আপনি আমার ফোনের বারোটা বাজিয়েছেন এরজন্য হয় ক্ষতিপূরণ দেবেন নয়তো শা'স্তি পাবেন। চয়েস ইজ ইউ্যর।

মেহরিমার চোয়াল ঝুলে পড়লো। এটার ভয়ই তো সে পাচ্ছিলো। এবার কি করবে? মেহরিমা চিন্তায় অস্থির হলো। ফট করে বললো

--ক্ষতিপূরণ হিসেবে কতো দিতে হবে ভাইয়া?

--পনেরো হাজার।

--কি এতো?

মেহরিমার বিস্মিত চোখ জোড়া দেখে বিরক্ত হলো শায়ের। নিজের ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে বললো

--এভাবে আঁতকে ওঠার কি আছে? দামী ফোন আমার। সার্ভিসিং এর জন্য অবশ্যই মোটা অংকের টাকা খসাতে হবে।

--তাই বলে এতো? এটা তো রীতিমতো ডাকাতি।

--এই আপনি একে তো দোষ করেছেন তারপরও প্রশ্ন করে আমাকে ডাকাত বলছেন কোন সাহসে? চ্যাপাশুকটির মতো সাইজ তার আবার বড় বড় কথা।

--কি বললেন আপনি?

--কেনো শুনতে পাননি? চ্যাপা শুঁটকি বলেছি আপনাকে।

মেহরিমা বিস্ময়ে কিংকর্ত্যবিমূর। এই লোক কোন সাহসে তাকে অমন বিচ্ছিরি একটা অখাদ্যর সঙ্গে তুলনা করতে পারলো? মেহরিমার এতোক্ষণের শান্ত ব্যবহার হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। রা'গে ফোঁস ফোঁস করে সে কটমট চোখে তাকিয়ে রইলো শায়েরের দিকে।

শায়ের থোরাই পাত্তা দিলো মেহরিমা কে। ফোনটা পকেটে পুরে তীক্ষ্ণ চোখে মেহরিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বললো

--এই চ্যাপা শুটকির মতল ফিনফিনে শরীরে মানুষকে ধাক্কা মারেন কিভাবে আপনি?

--শুনুন আমি কাউকে ধাক্কা মারি না।

--বলতে চাইছেন আমি ব্যতীত অন্য কাউকে কখনো ধাক্কা মারেন নি আপনি।

--জি না মারি নি।

শায়েরের ভ্রু সোজা হয়ে গেলো। গম্ভীর স্বরে বললো

--তারমানে আপনি আমায় ইচ্ছে করে ধাক্কা মেরেছেন?

--সেটা কখন বললাম?

--এই মাত্রই বলেছেন। আমি ব্যতীত আর কাউকে কখনো ধাক্কা মারেন নি? কি ব্যাপার মিস আপনি আমায় ফলো করছেন না তো? আমার সুন্দর চেহারা দেখে প্রেমে ট্রেমে পড়ে যান নি তো? অবশ্য যাওয়ারই কথা পুরো ভার্সিটির ক্রাশ বয় কিনা আমি।

শায়েরের শেষ কথা না চাইতেও হেঁসে ফেললো মেহরিমা। বুকে হাত গুজে তাচ্ছিল্যে করে বললাে

--যে না তার চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা। শুনুন মিস্টার আমার দিন এতোটাও খারাপ আসে নি যার জন্য আপনার মতো হাতিকে পচ্ছন্দ করবো আমি। আমি মেহের সারাজীবন সিঙ্গেল থাকলেও আপনার মতো খবিশকে পচ্ছন্দ করবো না বুঝেছেন।

এতক্ষনের হাসি হাসি মুখটা ধপ করে নিভে গেলো শায়েরের। মেহরিমার কথা শুনে চেচিয়ে বললো

--কি বললেন আপনি? আমি হাতি? আমার চেহারা খারাপ?

--অবশ্যই! শুধু মাত্র একটা সুরের অভাব। ওটা থাকলে পুরোপুরি হাতি হয়ে যেতেন।

শায়ের রা'গে কটমট করে চাইলো। মেহেরিমা পাত্তা না দিয়ে শায়েরকে ধাক্কা দিয়ে বললো

--সরুন দেখি। আপনার সঙ্গে কথা বলার কোনো ইন্টারেস্ট আমার নেই।

শায়েরকে একপ্রকার ইগনোর করে হেলেদুলে চলে গেলো মেহরিমা। শায়ের মেয়েটার গমন পথের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললো

--আমি শায়ের আনসারী নীড় আজ প্রতিজ্ঞা করছি বিয়ে করলে আপনাকেই করবো। এরপর এমন প্রেমের ফাঁদে ফেলবো যে শুধু দেখা না নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে চিপকে থাকবেন। তখন বোঝাবো হাতি কাকে বলে? বেয়াদব, চ্যাপা শুঁটকি মেয়ে একটা।

রা'গে ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে শায়ের কি বললো সে নিজেও জানে না। মেয়েটা তার চেহারা নিয়ে অপমান করেছে এটাই তার সহ্য হচ্ছে না। পুঁচকে একটা মেয়ে কিনা তাকে অপমান করে গেলো? যেখানে মেয়েরা তার জন্য পাগল সেখানে হাফ ইঞ্চির একটা মেয়ে তাকে অপমান করে গেলো? বিষয়টা শায়েরের ইগো হার্ট করেছে। এর শোধ তো সে তুলবেই তুলবে। এর জন্য যা করতে হয় সে করবে। তবুও এই মেয়েকে দেখে ছাড়বে সে। একচুলও না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন