ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

30

লেখক: উম্মে_হাবিবা

কেটে গেছে দিন দুয়েক। সেদিন মেহরিমা যে ভয় নিয়ে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেছিলো ঠিক সেই ভয় টাই সত্যি হলো তার। মোঃ ইমতিয়াজ পাশা মেহরিমাকে দেখেই চটে গেলেন বেশ। কথার বাণে অপমান করলো মেয়েটাকে। বাদ রাখলো না শায়েরকেও। ছেলেটা সামনে না থাকায় সাহস যেন ফুলে ফেঁপে চারগুণ হলো তার। অবশেষে মেহরিমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়ে তবেই শান্ত হলেন তিনি।

আজ শুক্রবার। ছুটির দিনগুলোতে মেহরিমা বাসায় থাকলেও আজকে একটা বিশেষ কাজের জন্য শহর থেকে একটু দূরে এসেছে সে। গন্তব্য স্থানে এসে গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে দীর্ঘ এক শ্বাস নিলো শুধু। অতঃপর সাবধানে আশপাশ পর্যবেক্ষন করে পরনের বোরকা,হিজাব, নেকাব ঠিকঠাক করলো। অদূরে দাঁড়ানো কালো পোশাকে আবৃত পুরুষ অবয়ব দেখেও গুরুত্ব দিলো না রমণী। সাবলীল ভঙ্গিতে অগ্রসর হলো সামনের দিকে।

কিছুদূর যাওয়ার পর চাপা গলির মাঝে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা। এখানে চারপাশে চারটে রাস্তা চলে গেছে। অদূরে সেই পুরুষালি অবয়ব তখনও দৃশ্যমান। বেশ সর্তকতা অবলম্বন করেই মেহরিমার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে সে। সবটায় সূক্ষ্ণ নজরে অবলোকন করছে মেয়েটা। মনে মনে তাচ্ছিল্য করে হাসতেও ভুলছে না। লোকটা মনে করেছে মেহরিমা হয়তো তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে নি। অথচ বোকা মানবের ধারনায় নেই যে ছোট থেকেই তার ভাই আর বাবার থেকে ক্রিমিনাল সম্পর্কিত সবকিছুই আয়ত্ত করেছে সে। নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে বন্দুক চালানোয় ও মেয়েটা বেশ পারদর্শী।

মেহরিমা আঁড়চোখে লোকটার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলো। বেশ অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মতো মনে মনে কৌশল আঁকলো। অতঃপর সুযোগ বুঝে লোকটার চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেলো বাম পাশের চিপা গলিতে। ওদিকে এতোক্ষণ ধরে মেহরিমাকে চোখে চোখে রাখার পরও সামান্য বেখেয়ালের জন্য হারিয়ে ফেলায় নিজের উপরই রে'গে গেলো লোকটা। প্রচন্ড আ'ক্রোশে গাছের গায়ে লাথি মা'রলো। হিসহিসিয়ে আওড়ালো

--ফা/ক অফ। ধুরন্দর মেয়েটা আজকেও চোখে ধুলো দিয়ে পালালো।

লোকটার নিজের মতো কথা বলার মাঝে ঝনঝন আওয়াজে বেজে উঠলো মুঠোফোন। বার কয়েক শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে ফোন টা রিসিভ করে কানে ধরলো। গম্ভীর স্বরে বললো

--ড্যাড..

ওপাশ থেকে কি বললো শোনা গেলো না। অথচ চোখ বুঁজে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলো সে। দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো

--কতোদিন এভাবে ফাঁকি দিয়ে পালাবে ড্যাড? একদিন না একদিন পাখিকে খাঁচায় বন্দি হতেই হবে। আর যেদিন ওটাকে ধরতে পারবো সেদিনই হবে ওর শেষ দিন।

ওপাশ থেকে আবারও কিছু বললো। প্রতিউত্তরে বিরক্তি নিয়ে সে বললো

--মেজর সাহেব আর ক্যাপ্টেন ভালোই প্রশিক্ষণ দিয়েছে এই মেয়েকে। নয়তো মেয়ে মানুষের এতো বিচক্ষণতা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং আশ্চর্যজনক। নয়তো এই টুকু মেয়ে এগারো মাস যাবৎ আমাকেই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। বিষয়টা আমার জন্য বরাবরই অপমানের।

.....................

--কি আশ্চর্য প্রশংসা করবো কেনো? যতোই হোক নিজের র'ক্তেরই তো। এমন সাহসীকতা অবাঞ্ছনীয় নয়। বরং না দেখালেই অবাক হতাম আমি।

খট করে কল কে'টে দিলো ওপাশের ব্যক্তি। ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো মানব। ফোনটা পকেটে পুরে আবারও ফাঁকা রাস্তায় নজর বুলালো। মেহরিমার অস্তিত্ব না দেখে এবারেও বিরক্ত হলো। মনে মনে মেয়েটাকে বেশ কয়েকটা বকাঝকা দিয়ে পা বাড়ালো উল্টো দিকে।

এতোক্ষণে সবকিছুই অদূরে গাছের আড়ালে থেকে লক্ষ্য করছিলো বলিষ্ঠ দেহের এক পুরুষ। পরনে লেদার জ্যাকেট। ইয়ামামা খচিত কালো বাইক টায় হেলান দিয়ে মুখের কালো মাস্কাট টান দিয়ে খুলে ফেললো। চোখের সানগ্লাস টা খুলতেই দৃশ্যমান হলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ব্লু হ্যাজেল মিশেলের অদ্ভুত অক্ষিপট। বরাবরের মতোই গলায় ঝুলছে গিটারের সেই ছোট্ট লকেট। হাতে সিলভার রঙের চেইন ব্রেসলেট। মাথার লম্বা লম্বা অগোছালো উল্ফ কাটের চুল গুলো দুহাতে ব্যাকব্রাশ করে নিলো সে মানব। অতঃপর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের আগুন জ্বালিয়ে অদূরে ভাসিয়ে দিলো নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়া। ঠোঁটের কোণের সূক্ষ্ম বাঁকা হাসিতে অদ্ভুত রহস্য তার। সেভাবেই আওড়ালো

--স্টুপিড ব্রাউন পিপল। আমার অলক্ষ্যে আমারই পাখিকে খাঁচায় বন্দি করার দুঃসাহস দেখাও। উমম ইটস ভেরি ব্যাড। এই ভুলের মাশুল দেওয়া যে তোমার জন্য ফরজ হয়ে গেলো।

কথা টুকু বলেই নিজের মতো কিটকিটিয়ে হেঁসে ফেললো সে। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস ফেললো। বাইকে হেলান দিয়ে পকেট হাতরে বের করলো রূপার সিম্পল ডিজাইনের একটা নূপূর। নূপুর টা কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মুচকি হেঁসে বুকের কাছটায় চেপে ধরলো। অতঃপর মেহরিমার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়েই অদ্ভুত হাস্কিস্বরে স্বরে বিরবিরিয়ে গেয়ে উঠলো

                 ~হতে পারি বদনাম
                  হতে পারি ডাকনাম
                   হতে পারি সত্যি
                 তোমারই জন্যেএএ....
                 
                    হতে পারি গল্প
                 তুমি কাছে টানলে
                 হতে পারি জানলা
            এ হাওয়া ও তোমার কারণে..

এতোটুকু গেয়েই থেমে গেলো সে পুরুষ। বাইকের উপর আধশোয়া হয়ে নুপুর টা বুকে রেখেই চোখ বুঁজে কন্ঠে কিছুটা অসহায়ত্ব এনে পুনরায় সুর তুললো বিষাদের

                   শুধু তুমি চাও যদি
                  সাজাবো আবার নদী
             এসেছি হাজার বারণেএএএ
             শুধু তোমারই জন্যে এএএ
            শুধু তোমারই জন্যে এএএ......!

*******************************
পুরনো আমলের দোতলা বাড়ির সামনে এসে থেমে গেলো মেহরিমা। শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের গায়ে নেইম-প্লেট টা দেখলো একবার। বিরবির করে আওড়ালো

--এডভোকেট নুরুল ইসলাম...

নিজের কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে পা বাড়ালো বাড়ির অভিমুখে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। সেকেন্ড কয়েক পর দরজা খুলে দিলেন এক পৌড়া নারী। মেহরিমাকে দেখে চোখের চশমা টা ঠিক করে বার দুয়েক পলক ঝাপটে ভাঙা স্বরে শুধালো

--কে এসেছে? মেহরিমা?

প্রতিউত্তরে মেহরিমা মুচকি হাসলো। নেকাবটা খুলতেই দৃশ্যমান হলো রমণীর ঘর্মাত্মক ক্লান্ত মুখশ্রী। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি রেখেই সাবলীল কন্ঠে উত্তর দিলো

-- আসসালামু আলাইকুম দিম্মা। ভালো আছেন আপনি?

পৌড়া একগাল হাসলেন। বিগলিত স্বরে বললেন

--ওয়ালাইকুম আসসালাম দিদিভাই। আমি তো ভালোই আছি। কিন্তু তুমি এমন শুকাই গেছো ক্যান? খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করো না।

কিছুটা অপ্রস্তুত হলো মেয়েটা। মেকি হেঁসে বললো

--দিম্মা যে কি বলেন। আপনার কাছে আজীবন আমি শুকনাই থেকে গেলাম। মোটা আর হতে পারলাম কই বলুন দেখি?

--বুড়ি হয়ে গেছি বলে আমার চোখ ফাঁকি দিতে চাও মেয়ে। অথচ তুমি ভুলে গেছো কয়েক যুগ পাড় করে এসেছি আমি। তোমাদের থেকে এই পৃথিবীর রহস্য বেশি জানা আমার।

এবারেও শুধু হাসলো মেয়েটা। পৌড়া মেহরিমার নীরবতায় ব্যাথাতুর শ্বাস ফেললেন। মেহরিমার হাত ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে যেতে যেতে আক্ষেপ নিয়ে বললেন

--মেহরাব বেঁচে থাকতে তোমার শরীর থেকে উজ্জ্বলতার ছটাক বের হতো। কি আগুন ঝড়া রূপ তখন। মেহরাবের আদর যত্নে বড় করে তোলা শখের পুতুল ছিলে তুমি। আর এখন সেই চেহারায় কি ভীষণ মলিনতা। চোখের নিচে স্পষ্ট অবসন্নতার ছাপ। এতোটুকু বয়সে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের প্রতিই বড্ড উদাসীন হয়ে গেছো তুমি। অথচ তোমার জীবনযাপন ছিলো নবাবী আমলের শেহজাদীর মতো। সত্যি সময় খুবই বিচিত্র। কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় সেটা ধারণা করা ও মুশকিল।

মেহরিমা মনোযোগী স্রোতার মতো পৌড়ার সব কথা শুনলো। বাবার কথা শুনতেই বুকের ভেতর শূন্যতার ক্ষ'তাটা তাজা হলো। চোখের কোণে জমা হওয়া একবিন্দু অশ্রুকণা দক্ষহাতে আড়াল করে ফেললো রমণী। সোফার এক কোণে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো নুরুল ইসলামের। পৌড়া তখন গুটিগুটি পায়ে লাঠির ভরে নিজের রুমের দিকে গেলেন। যাওয়ার আগে মেহরিমাকে বার বার বলে গেছেন আমি না আসা পর্যন্ত যেন কোথাও না যায় সে।

কয়েক মিনিট বাদেই ফাইল পত্র হাতে ড্রয়িংরুমে হাজির হলেন এডভোকেট নুরুল ইসলাম। মেহরিমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন। ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে দূরত্ব বজার রেখে বসলেন পাশে। মেহরিমা তখন ব্যস্ত নিজের ব্যাগ থেকে কাগজ পত্র বের করতে। সবকিছু একে একে বের করে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখলো। নুরুল ইসলাম সব কাগজপত্র মনোযোগ দিয়ে দেখার মাঝে মেহরিমার উদ্দেশ্যে বললেন

--মেহের আম্মু আপনাকে ভীষণ চিন্তিত লাগছে। কি হয়েছে চাচ্চুকে বলা যাবে কি?

মেহরিমা তখন নিজ ভাবনায় ব্যস্ত ছিলো। নুরুল ইসলামের কথায় কিছুটা চমকে উঠলো সে। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে বললো

--চাচ্চু পেপারস গুলো তৈরি হতে আর কতো দিন লাগবে?

নুরুল ইসলামের ব্যস্ত হাত থেমে গেলো। শান্ত চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো মেহরিমার দিকে। মেয়েটার চোখ দুটো অস্থির। হয়তো কোনো কথা লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নুরুল ইসলাম মেয়েটার মনের অস্থিরতা হয়তো বুঝলো। সাবলীল কন্ঠে বললো

--পেপারস সময় মতো তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার কি হয়েছে সেটা বলুন। আপনাকে আমার মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না আম্মু। চাচ্চুকে যদি ভরসা করে থাকেন তাহলে নির্ধিদ্বায় নিজের মনের জমানো কথা গুলো বলুন। চাচ্চু সবসময় আপনার পাশে আছি।

একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলো মেহরিমা। মানস্পটে ভেসে উঠলো বাবার পবিত্র মুখ খানি। কানের কাছে ভাসলো আদুরে স্বর

--আব্বুকে ভরসা করেন তো আম্মু? তাহলে এতো দ্বিধা কেনো? আব্বুর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলুন। দেখবেন অস্থিরতা কমে মনের মধ্যে প্রশান্তির হাওয়া বইবে।

আড়ালে শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা। খুব করে চাইলো নিজের দূর্বলতা কমাতে। মাথা নিচু করে হাসফাস করলো। অস্থির ভাবে হাত কচলে নিজেকে সামলানোর ক্ষুদ্র চেষ্টা করলো। নুরুল ইসলাম নীরবে হাসলেন। মেয়েটার স্বভাব একদম ওর বাবার মতো। মেহরাব নেওয়াজও নিজের অনুভূতি লুকাতে এমন করতো। নুরুল ইসলাম নিজের চশমা টা নাকের ডগায় এনে কাগজ গুলো ফাইলের মধ্যে সযত্নে গুছিয়ে রাখলেন। মেহরিমার উদ্দেশ্যে বললেন

--মেহরাব ছিলো আমার ছোট বেলার বন্ধু। তখন আমার বাবার সবে নতুন সরকারি চাকরি হয়েছে। বাবার চাকরির সূত্রে সেবার প্রথম ঢাকা ছেড়ে সিলেট গেলাম। নতুন জায়গা হওয়ায় কারোর সঙ্গে তেমন মিশতে পারতাম না। ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের জন্য সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতাম আমি। সময় কাটাতে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতাম নয়তো বল নিয়ে একা একা খেলতাম। বর্ষার এক দুপুরের কথা। হুট করেই আমাদের বাড়িতে মেহরাব এলো। পড়নের প্যান্ট,গেঞ্জিতে কাঁদায় মাখামাখি। হাতে একগুচ্ছ পদ্মফুল। আরেক হাতে একটা ফুটবল। ছুটির দিন হওয়ায় বাবা তখন বাসায়। দুপুরের ভাতঘুমে বিভোর। মা ও নিজের কাজকর্ম সেরে ঘুমাতে গেছেন। কিন্তু আমি একা একা বিষন্ন মনে তখনও জানালার কাছে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। সেসময় চুপিচুপি মেহরাব এলো। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে আমাকে ডাকলো

--আ্যই সাইলেন্ট বয় এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? বাহিরে আসয় তোকে সিলেটের বিখ্যাত পদ্ম বিল ঘুরিয়ে দেখাবো।

আমি সেবার খুব অবাক হলাম। নতুন একটা ছেলে। সম্পূর্ণ অচেনা। অথচ কেমন নিঃসঙ্কোচে আমাকে ডাকছে। আবার তুই করেও বলছে। আমি যেন অবাক হতেও ভুলে গেলাম। অথচ সেই দুষ্টু ছেলেটা তার হাতের একগুচ্ছ পদ্মফুল আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো

--আপাতত ফুল গুলো নিয়ে আমার বন্ধু হয়ে যা। মা বলে কাউকে বন্ধু বানাতে গেলে চকলেট দিতে হয়। কিন্তু আমার কাছে এখন কোনো চকলেট নেই। তাই এই ফুল গুলোয় নে। পরেরবার ডাবল চকলেট দিয়ে পুনরায় ফ্রেন্ডশীপ অফার করবো।

আমি বোকার মতো ছেলেটার কথা শুনে গেলাম। হাত বাড়িয়ে ফুল গুলো নিতেই ছেলেটা খিলখিল করে হেসে বললো। আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম। আমি অবাক হয়ে শুধু তার প্রানচ্ছোল হাসি দেখলাম। ছেলেরা এমন হাসতেও পারে এটা আমার জানা ছিলো না। সেবার প্রথম মায়ের চোখ ফাঁকি বৃষ্টির মধ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। মেহরাবের সঙ্গে খাঁচার মুক্তো পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়ালাম এদিক থেকে ওদিক। মেহরাবের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরেই বিত্তশালী। পূর্বপুরুষের থেকে কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদ পেয়েছে। সেখানে আমি ছিলাম সাধারণ ঘরের ছেলে। আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব বরাবরই বেমানান। অথচ ওই ছেলের মাঝে এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আমাকে আপন ভাইয়ের মতো সবসময় আগলে রেখেছে। বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি আমার ইনকোর্স পরীক্ষার সমস্ত খরচ মেহরাব নিজে বহন করেছে। বন্ধুত্বের সম্পর্কে নাকি কৃতজ্ঞতা রাখতে নেই। কিন্তু ওর কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞত। এই আজকে আমি এডভোকেট নুরুল ইসলাম হতে পেরেছি তার সম্পূর্ণ ক্রেডিট আমার বন্ধুুর।

নুরুল ইসলামের গলা ধরে এলো। ঠোঁটের বিষাদের হাসি রেখে পুনরায় বললো

--দু'জনে দু পেশায় হওয়ায় মাঝে কয়েক বছর অনেকটা দূরে ছিলাম আমরা। কিন্তু সেই দূরত্ব ও মেহরাব রাখে নি। যখনই সময় পেতো আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতো। আমার সুবিধা অসুবিধা সব কিছু কেমন করে যেন সলভ করতো। আমি কখনো জানতে চাইলে শুধু হাসতো। জড়িয়ে ধরে বলতো উকিল সাহেব বেশি কৌতুহল ভালো না। মাঝে মাঝে অনেক কিছু জেনেও না জানার অভিনয় করাই মঙ্গলজনক। শেষবার যখন ওর সঙ্গে কথা হয় তখন আমি একটা নতুন কেসের জন্য সিলেটের বাইরে ছিলাম। আর ও সেনানিবাস থেকে মেহরাজকে নিয়ে ফিরছিলো। বাপ ছেলের দুজনের সে কি উত্তেজনা। চার মাস পর আবারও নিজের সন্তানকে ছুঁয়ে দেখতে পারবে। মন ভরে আদর করতে পারবে সেই খুশিতে কথাও বলতে পারছে না। তখন ছোট্ট মেহরিশের বয়স কতো আর হবে? দুইয়ের একটু বেশি। মেহরাবের থেকে ফোন নিয়ে মেহরাজ সেদিন আমায় বলেছিলো

--আঙ্কেল আমার পুতুল মা কতো সুন্দর হয়েছে আপনি জানেন? আপনি তো আর আসলেন না ওকে দেখতে। সেই ছোট বেলায় একটু দেখে গেলেন। এরপর দেড় বছরের মাথায় একবার এলেন। তারপর থেকেই আপনি লা পাত্তা। এবার আসবেন কিন্তু। আমি, আব্বু দুজনেই টানা দুইমাসের ছুটি পেয়েছি। এসে দেখে যাবেন আমার তোতাপাখি কতো মায়া নিয়ে বড় হচ্ছে। আদুরে ছানার মতো সারাক্ষণ পাপা পাপা বলে ডাকে আমায়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে পুরো বাড়ি দৌড়ে বেড়ায়। আমার মায়ের খিলখিল হাসিতে গোটা বাড়ি জীবন্ত হয়ে ওঠে। আপনি নিজ চোখে সেই দৃশ্য না দেখলে অনুভব করতে পারবেন না। সব কাজ মিটমাট করে এবার আসুন। কিছুদিন আমাদের সঙ্গে থেকে যান। নয়তো ক্রিমিনাল ধরতে ধরতে জীবনের সকল রস কস হারিয়ে ফেলবেন আপনি।

সেদিন আমি ওদের বাপ ছেলের কথায় খুব হাসলাম। কথা দিলাম এবার যে করেই হোক আসবো। তোমাদের সবার সঙ্গে লম্বা একটা সময় কাটাবো। আমিও সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। কিন্তু তার কয়েক ঘন্টা পরই খবর এলো আমার বন্ধু মেহরাবের গাড়ি সিলেট সদরের মেইন রোডের সামনে খুব বাজে ভাবে এক্সি/ডেন্ট করেছে। মেহরাজের অবস্থা আশংকা জনক হলেও মেহরাব আইসিইউর কেবিনে মৃ/ত্যুর সঙ্গে লড়ছে। নিউজটা আমার জন্য এতোটাই আশ্চর্যজনক ছিলো যে বিস্ময়ে আমি কথা বলতে পারি নি। শুধু ফোনের ওপাশে থাকা লোক টার কথা গুলো শুনতে লাগলাম। এরপর আমার কি হলো জানি না। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। বুকের মধ্যে অদ্ভুত চিনচিনে ব্যাথায় শ্বাসকষ্ট উঠলো। অল্প সময়ের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি হসপিটালে ভর্তি। অথচ আমার মাথায় তখনও ওদের বাপ ছেলের প্রানোচ্ছোল কন্ঠস্বর ভাসছে। নিজের অসুস্থতাকে আমি সেদিন গুরুত্ব দেয় নি। ছুটে এসেছিলাম বন্ধুর কাছে। মেহরাবের সঙ্গে দুদিন সময় কাটাতে পারলেও মেহরাজকে পেয়েছিলাম কয়েক ঘন্টার জন্য। ছেলেটা সেদিন আমার হাত ধরে শুধু বলেছিলো "আঙ্কেল আমার আদুরে আম্মু আর বোন টাকে দেখে রাখবেন। আমার অবর্তমানে ওদের খেয়াল রাখবেন।" ব্যস এটুকুই। এরপরে সব শান্ত। আমার নিজের হাতে ছেলেটা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। আমি শুধু নিথর দেহে বসে রইলাম। কিছু বলতেও পারলাম না। আর না তো কিছু শোনার প্রযোজন বোধ করলাম। এরপর যখন মেহরাবের কাছে গেলাম তখন ওকে এই সংবাদ আমি দিতে পারি নি। কিন্তু সেদিন হাস্যেজ্জ্বল মেহরাব শান্ত দৃষ্টিতে শুধু সব দেখে গেলো। সবার আড়ালে আমাকে দিয়ে সম্পত্তির কাগজ পত্র তৈরি করালো। আমি প্রথমে কিছু বলি নি। শুধু নীরবে সব করে গেলাম। এর আগেও ও একবার এই কাগজ তৈরি করেছিলো তখন সম্পত্তির মালিকানায় ছিলে শুধু তুমি। সেই কাগজ গুলোর আসল কপি মেহরাবের কাছে। আমার কাছে শুধু ফটোকপি ছিলো। কিন্তু হসপিটালের কাগজ গুলো দেখে আমি অবাকই হলাম। যে সম্পত্তি গুলো মেহরাজের নামে ছিলো সেগুলো ও পুনরায় তোমার নামে করে দেওয়া হলো। তোমার মা এবং জেসমিনের ভাগের সবটুকু ও তোমার বাবা তোমার নামে লিখে দিয়েছিলেন আরো আগে। জানি না শেষ মুহূর্তে ও কিসের আভাস পেয়েছিলো। শুধু আড়ালে আমায় বলেছিলো এগুলো তোর কাছে যত্নে রাখবি। সময় হলে প্রকাশ করবি। আর মেহের কে নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি জানি আমার মেয়ে কেমন। সে কখনোই কারোর হক নষ্ট করবে না। সময় মতো সবার টা সবাইকে বুঝিয়ে দেবে। সেদিন হসপিটালে যে দলিল করা হলো তার এক তৃতীয়াংশই শুধু তোমার হাতে দেওয়া হলো। বাকি সব রইলো আমার কাছে। তোমার ছোট চাচা এসবের কিছুই জানেন না। সবাই জানে শুধুমাত্র বাড়িটুকুই তোমার নামে লিখে দেওয়া কিন্তু সত্যি হলো এটাই মেহরাবের সমস্ত সম্পত্তির একক মালিকানা তোমার। এবং সবকিছু সকলের আড়ালে তোমার বাবা তোমার নামে লিখে দিয়েছেন। কাউকে জানতে দেন নি কিছুই। এমনকি নিজের বড় মেয়ে মুক্তাকেও নয়।

নিজের মতো কথা টুকু বলে থামলেন নুরুল ইসলাস। বার কয়েক জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে সামলানেন নিজেকে। পাশেই মেহরিমা নিঃশব্দে নিজের চোখের পানি ফেলছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। নুরুল ইসলামের আলগোছে মেহরিমার মাথায় হাত রাখলেন। ভরসা দিয়ে বললেন

--তুমি একা নও মেহের। তোমাকে আগলে রাখার জন্য তোমার এই চাচ্চু এখনও বেঁচে আছেন। যতোদিন এ দেহে প্রাণ থাকবে আমি আমার বন্ধুুর আমানত রক্ষা করে যাবে ইন শাহ আল্লাহ। সুতরাং কোনো সমস্যা হলে নিজের ভেতর জমিয়ে রাখবে না আম্মু। নিঃসঙ্কোচে আমাকে বলবে। আমি তোমাকে রক্ষার জন্য সদা তৎপর ছিলাম,আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকবো ইন শাহ আল্লাহ।

বাবার পরে ভরসাযোগ্য কাউকে পাশে পেয়ে মুখে হাত চেপে কেঁদে ফেললো মেহরিমা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো

--চাচ্চু ওরা আবারও আমাকে ফলো করা শুরু করেছে। ইদানীং সেই মাত্রা বেড়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়তো চব্বিশ ঘন্টায় আমার উপর নজর রাখছে তারা। আমি কোথায় যাচ্ছি, কি করছি সব,,সব কিছুর নজরবন্দী রাখছে। আজকাল পুতুলকে নিয়ে খুব ভয় হয় আমার। ওরা যদি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ওই ছোট্ট প্রাণটার কোনো ক্ষতি করে দেয় তখন আমি কি করবো চাচ্চু? আমার পক্ষে সবসময় বাসায় থাকা সম্ভব হয় না। কিভাবেই বা রক্ষা করবো আমার মেয়েটাকে? আমার ভাইয়ের আমানত কিভাবে হেফাজত করবো? যতোই নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করিনা কেনো কিন্তু দিনশেষে আমিও একজন মেয়ে। এতোগুলা শ;ত্রুর সঙ্গে কিভাবে মোকাবেলা করবো? আল্লাহ এ কোন পরীক্ষায় ফেললেন আমায়?

মেহরিমা কাঁদছে। কাঁদছে নিজের কাছের মানুষগুলোকে হারানোর ভয়ে। কাঁদছে নিজের অসহায়ত্বের কাছে। নুরুল ইসলাম মেয়েটাকে থামালেন না। কাঁদতে দিলেন মন মতো। অতঃপর সময় নিয়ে আওড়ালেন

--নিজেকে কখনো দূর্বল দেখাবে না আম্মু। মনে রাখবে তুমি মেজর মেহরাব নেওয়াজের মেয়ে এবং ক্যাপ্টেন মেহরাজ নেওয়াজের সাহসী বোন মেহরিমা নেওয়াজ পুষ্প। আর মেহরিমা কখনো হারে না। হয়তো সময়ের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে ভেঙে পড়ে তবে সঠিক সময়ে নিজেকে পুনরায় ভেঙেচুরে গড়ে তোলার ক্ষমতা মেহরিমার মনে অবশ্যই আছে। শ/ত্রু পক্ষকে তোমার দূর্বলতা নয় বরং তোমার সাহস এবং বিচক্ষণতা দিয়েই মোকাবেলা করবে। অন্তরে বিশ্বাস রাখবে মহান রব যাকে আগলে রাখেন তাকে নিঃশেষ করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর বুকে কারোর নেই। এমনকি বিষা'ক্ত বি/ষেরও নয়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 30 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন