পুতুলকে সামলে রেস্টুরেন্টে আসতে আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেলো মেহরিমার। তাড়াহুড়ো করে ব্যস্ত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েও রাস্তার অপর পাশে মানুষের কোলাহল শুনে থেমে গেলো সে। কৌতুহল বশত পিছু ফিরে দেখলো স্যুট,বুট পড়া এক ভদ্রলোক একজন বয়স্ক লোকের উপর হাত উঠাচ্ছে। অথচ আশেপাশের মানুষজন প্রতিবাদ না করে উল্টো মোবাইল বের করে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত। মূহুর্তেই মেহরিমার শান্ত মেজাজ বিগড়ে গেলো। আগপাছ না ভেবে বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে গেলো সামনে। ভদ্রলোক বয়স্ক লোকের গায়ে ফালি করে কে'টে রাখা বাঁশের লাঠি দিয়ে বারি মা-রার আগেই সেটা নিজে ধরে ফেললো। ফলস্বরূপ বাঁশের সূচালো একপাশ হাতে লেগে নরম চামড়ায় আঁ'চড় লাগলো। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো র'ক্ত। সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন মেহরিমা। ঝাঁঝালো স্বরে উক্ত ভদ্রলোককে বললো
--দেখে তো ভালো মানুষই লাগছে। অথচ এখানে নিজের থেকে বড়, বয়স্ক লোকের গায়ে হাত তুলতে লজ্জা করছে না আপনার?
নিজের কাঁজে বাঁধা পড়ায় বেশ চো'টে গেলেন তিনি। রাগান্বিত স্বরে মেহরিমার উদ্দেশ্যে বললো
--সে কৈফিয়ত এখন তোমাকে দিতে হবে নাকি?
মেহরিমা জোড় করে ওনার হাত থেকে লাঠিটা কেড়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিলেন। পরিবেশ তখন টান টান উত্তেজনার। আশেপাশের সকলে ফোনের ভিডিও অন রেখেই ফিসফিস করে মন্তব্য করছে। মেহরিমা সব কিছু সূক্ষ্ম নজরে অবলোকন করলো। আড়ালে বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ শ্বাস। পুনরায় সেই ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে শান্ত স্বরে বললো
--অন্যায় করেছেন আপনি। দেশের সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার কাছে সেই অন্যায়ের কৈফিয়ত চাওয়া আমার অধিকার। আর আপনি নিজেও সেই কৈফিয়ত দিতে বাধ্য।
লোকটা অদ্ভুত ভাবে হাসলো। নিজের দামী স্যুটের কলার ঠিক করে মেহরিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে ব্যঙ্গ করে বললো
--এখানের এতো গুলো মানুষের মধ্যে কেউ কিছু বললো না। অথচ সামান্য দু টাকার মেয়ে হয়ে আমার থেকে কৈফিয়ত চাচ্ছো তুমি? মেয়ে তোমার সাহস আছে বলতে হবে।
মেহরিমা ওনার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। দু কদম হেঁটে বয়স্ক লোকটার কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে একটা বেঞ্চে বসালো। নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিলো তার কাছে। লোকটা কিছুটা পানি খাওয়ার পর মেহরিমা নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
--এখানে কি হয়েছিলো চাচা? উনি আপনাকে মা'রতে যাচ্ছিলো কেনো?
বয়স্ক লোকটা ভয়ে ভয়ে স্যুট পড়া লোকটার দিকে তাকালো। এরপর তাকালো আশেপাশের মানুষের দিকে। মেহরিমা হয়তো ওনার অস্বস্তিতা টা বুঝলো। আগন্তুকদের উদ্দেশ্যে বললো
--আপনারা এখানে দাড়িয়ে আছেন কেনো? ফ্রী তে সার্কাস দেখছেন?
ভীড় থেকে একজন বললো
--এখানে ঝামেলা হচ্ছিলো এজন্যই এসেছি।
--এসে কোন রাজকার্য করেছেন?
--ঘটনা জানার জন্যই এসেছিলাম। জনসাধারণ হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব।
মেহরিমা তাচ্ছিল্য হাসলো। সকলের দিকে ফিরে কটাক্ষ করে বললো
--জনসাধারণের দায়িত্ব পালন করতে এসেছিলেন নাকি নিজেদের অনলাইন একাউন্টের সো কল্ড ভিউ কামাই করছিলেন?
লোক গুলো এ যাত্রায় চুপ হয়ে গেলো। মেহরিমা পুনরায় তাচ্ছিল্য করে হাসলো। সকলের দিকে আঙুল তুলে বললো
-- উনি যখন বয়স্ক লোকটার গায়ে হাত তুলছিলো তখন কোথায় ছিলো আপনাদের সেই সো কল্ড জনসাধারণের দায়িত্ব? অন্যায় ভাবে যখন লোকটার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করছিলো তখনই বা কোথায় ছিলেন আপনারা? এখানে এসে একবারের জন্যও কেউ জিজ্ঞেস করেছেন ঘটনা আসলে কি ঘটেছে? নাকি এক বারের জন্য হলেও ওই লোকটাকে আটকাছেন? উল্টো অমানুষের মতো যার যার ফোন বের করে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এই আপনাদের জন সাধারণের সো কল্ড দায়িত্ব? পরবর্তী প্রজন্ম আপনাদের থেকে এই শিক্ষা অর্জন করবে? সামান্য কিছু ভিউয়ের কাছে নিজের নীতিবোধ,বিবেক,দায়িত্ব সব কিছু ভুলে গেলেন? ভাইরাল হওয়ার নেশা এতোটা অন্ধ করে রেখেছে আপনাদের? নাকি এই যুগে এসেও বড়লোক গরীব দেখে বিচার করছেন? কোনটা বলুন?
শেষের দিকে মেহরিমা একটু জোড়েই চেচিয়ে উঠলো। লোকগুলোর মধ্যে কয়েকজন নিজেদের ফোন অফ করলেও বাকিরা এখনোও নিজেদের কাজে অব্যহত রইলো। স্যুট পড়া লোকটা সামান্য একটা মেয়ের মুখে বার বার নিজের নাম শুনে বেশ বিরক্ত হলেন। ধমকে বললেন
--এই মেয়ে বার বার আমার নামে দোষ দিচ্ছো কেনো তুমি? তুমি জানো আমি কে? আমার কতো ক্ষমতা? "পিসফুল ক্যাফে'' এর মালিক আমি। শহরের প্রতিটা ভি আই পি শাখায় আমার রেস্টুরেন্ট,হোটেল রয়েছে। আর তুমি কিনা আমাকে অপবাদ দিচ্ছো? এতো সাহস পাও কোথা থেকে তুমি?
পিসফুল ক্যাফের নাম শুনে এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেলো মেহরিমা। চোখের পলকে রাস্তার অপর পাশে অবস্থিত বিলাসবহুল ক্যাফে টাকে দেখে নিলো। অতঃপর আবার ও তাকলো স্যুট বুট পড়া লোকটার দিকে। কৌতুহল নিয়ে শুধালো
--আপনিই তাহলে পিসফুল ক্যাফের ওনার মোঃ ইমতিয়াজ পাশা।
নিজের নাম শুনে লোকট একটু ভাব নিলো। গর্ব করে বললো
--অবশ্যই। আমিই মোঃ ইমতিয়াজ পাশা। ওনার অব পিসফুল ক্যাফে।
নিজের কর্মস্থলের মালিকের সঙ্গেই ঝগড়া করছে মেহরিমা। বিষয়টা অন্য কারোর ক্ষেত্রে হলে হয়তো সে মূহুর্তেই দমে যেত। গরীব লোকটা কে ফেলে চাকরি বাচাতে নিজের মালিকের তোষামোদে ব্যস্ত হতো। অথচ এসবের কিছুই মেহরিমার মাঝে দেখ গেলো না। বরং নিজের মালিকেই কিছুটা কটাক্ষ করে বললো
--ক্যাফের নাম রেখেছেন পিসফুল অথচ এখানে সাধারণ চা ওয়ালার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করছেন। এই আপনার সো কল্ড পার্সোনালিটি?
--তোমার এতো বড় সাহস তুমি আমার পার্সোনালিটি নিয়ে অপমান করছো?
লোকটা রে'গে মেহরিমার দিকে তেড়ে আসতে গেলে সহসা থেমে গেলো মেহরিমার কথায়
--ওখানেই দাঁড়ান। নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু। ভুলে যাবেন না এখানে লাইভ টেলিকাস্ট চলছে। উনিশ থেকে বিশ হলেই আপনার ভি আইপি রেপুটেশন ডাউন।
ইমতিয়াজ পাশা ভরকে গেলেন। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেন অনেকেই এখনো মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছে। লোকটা দমে গেলেন। কিন্তু রাগান্বিত চোখে মেহরিমার দিকে তাকাতে ভুললেন না। মেহরিমা ওসবে পাত্তা না দিয়ে বয়স্ক লোকটার পাশে গিয়ে বসলো। নরম স্বরে পুনরায় প্রশ্ন করলো
--চাচা ভয় পাবেন না। কি হয়েছে নির্ধিদ্বায় বলুন।
বয়স্ক লোকটা মাথা নিচু করে ফেললেন। ভারী স্বরে বললেন
--আমি সামান্য চা ওয়ালা। সারাদিনে চা বেইচা যা কামাই করি ওই দিয়ায় আমার সংসার চলে। বাড়িতে অসুস্থ একটা বউ আছে। পোলা ডা কাজ কাম কিছু করে না। হারাদিন নেশা পানি কইরা রাইত হইলে বাড়ি আইসা আমার লগে কাইজ্জা করে। টাকা দিতে না পারলে ঘরে অশান্তি করে। আমি কিছু কইতেও পারি না। বস্তির এক কোনায় ভাঙা টিন,বাঁশ আর পলিথিনের বেড়া দিয়া একখান কুঁড়ে ঘরে কোনো রহম বউ নিয়া থাকি। আইজ সকালে কামে আওনের সময় দেহি বউডা কাশতাছে। অনেকদিন ধইরাই ও অসুস্থ। কিন্তু আমারে কই না। আমি বুইজ্জা ও কিছু করতে পারি না। ট্যাহা না থাকলে কি করমু তুমিই কও? হারাদিনে যে কয় ট্যাহা কামাই করি ওই দিয়া তো আমগো বুড়া-বুড়ির তিন বেলা খাওনের চাইল ডা হয় না। বউয়ের চিকিৎসা করামু কেমনে? হাসপাতালে যাইতে গেলে ও যেন বহুত ট্যাহা লাগবো। অতো ট্যাহা জোগাড় করার সামর্থ্য তো আমার নাই।
লোকটার চোখ দু'টো ভিজে গেছে ইতোমধ্যে। আশেপাশের লোকগুলো ও চুপচাপ সব শুনছে। কেউ কেউ আড়ালে আফসোস করছে। মেহরিমা শান্ত চোখে নীরবে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন লোকটার কথা। বয়স্ক লোকটা একটু থেমে পুনরায় বললো
--মাইয়া ডারে বিয়া দিছি দুই বছর হইছে। জামাই রে ও তেমন কিছু দিতে পারি নাই। ওই নিয়া মাইয়া ডার সংসারে ও ঝামেলা। আমার ছোডো মাইয়া ডা রোজ জামাইয়ের হাতে মাইর খায়। অকথ্য ভাষায় গালি শুনে। অল্প বয়সে আবার পোয়াতিও হইছে। ভারী প্যাট লইয়া কাম করতে পারে না। ভালো মন্দ দুইডা খাইতেও পারে না। শ্বাশুড়ি সবসময় গালমন্দ করে। আমগো লইয়া খোঁটা দেয়। একরত্তি মাইয়া আমার কিছু কইতেও পারে না সইতেও পারে না। তিন দিন আগে মাইয়ার বাসায় গেছিলাম। হাতে কইরা বেশি কিছু নিতে পারি নাই। মাইয়ার লাইগা অল্প কয়ডা কমদামি ফল আর এক কেজি মিষ্টি নিছিলাম। মাইয়া ডা আমারে দেইখা কি যে খুশি হইছিলো। সাত মাসের উঁচা প্যাট লইয়া দৌড়াইয়া আইসা আমারে জড়াই ধইরা কইছিলো " আব্বা তুমি আইছো"। মাইয়ার শুকনা মুখটা দেইখা আমার কইলজা ডা কাইন্দা উঠছিলো মা। ওর লগে দুইড কথা ও কইতে পারি নাই এর মইধ্যে ওর শ্বাউড়ি আইসা আমার বুক থেইকা মাইয়া ডারে টাইনা লইয়া গেলো। মিষ্টি, ফল সব কিছু ড্রেনরে মধ্যে ফালাই দিয়া আমারে অপমান কইরা তাড়াইয়া দিলো। আমি তহনও কিছু কইতে পারি নাই। মাথা নিচু কইরা চইলা আইছি। আইজকা সকালে যখন কামে আইতে গেলাম তহন এক লোক মারফত আমার জামাই কইয়া পাঠাইছে কালকের মধ্যে হ্যারে যদি পাঁচ হাজার টাকা দিতে না পারি তাইলে আমার মাইয়ারে বাড়ি থেইকা বাইর কইরা দিবো। আমি চা বেইচা খাই। অতো ট্যাহা কই পামু? মাইয়ার সংসার বাঁচানোর লাইগ্যা আইজকা সাহস কইরা রাস্তার ওইপাশে বড় বিল্ডিং ডার কাছে চা লইয়া গেছিলাম। যদি কয়ডা ট্যাহা বেশি ইনকাম হয় এই আশায়। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারি নাই। ওই সাহেব আইসা আমার চায়ের কেটলি,বৈয়ামের বিস্কুট সব ফালাইয়া দিছে। আমি কিছু কইতে গেলে আমারে মারছে। হের পর আইসা আমার দোকান ভাঙনের চেষ্টা করছে। আমি আটকাইতে গ্যালে ওই লাঠি দিয়া আমারেই মারতে নিছিলো। তুমি ঠিক সময় না আইলা এতোক্ষণ হয়তো আমারে মাইরাই ফ্যালাইতো। এহন আমি কি করুম মা। দোকান ঠিক করতে গ্যালেও ট্যাহা লাগবো। নতুন কইরা কেটলি কিনতে ট্যাহা লাগবো। অথচ আমার কাছে এক ট্যাকা ও নাই। জামাই রে কি দিমু? মাইয়ার সংসারও বা বাচামু কেমনে? বউডার ওষুধ ও কিনতে পারুম না। আজকা না খাইয়া থায়া লাগবো। আল্লাহ ক্যান গরীব মাইনষেরে এতো দুঃখ দিলো? ক্যান এট্টু ট্যাহা পয়সা দিলো না আমগো? এই দুনিয়ায় কি আমগো বাঁচার কোনো অধিকার নাই? গরীব বইলা এতো নি'ষ্ঠুর ভাগ্যে হওয়া লাগবো আমগো?
লোকটা কাঁদছে। মুখে হাত চেপে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। শীর্ণ শরীর কান্নার তালে কেঁপে উঠছে। মেহরিমা মনোযোগ দিয়ে তার সব কথা শুনলো। চোখ বুঁজে ভারী শ্বাস ফেলে উঠে এলো ইমতিয়াজ পাশার কাছে। সামনে দাড়িয়ে চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা স্বরে বললো
--আপনি লোকটার কর্মক্ষেত্রে বাঁধা দিয়েছেন,তাকে অন্যায় ভাবে মে'রেছেন,তার দোকান ভেঙেছেন সেই সাথে অকথ্য ভাষায় গালি ও দিয়েছেন। আপনার তো অপরাধের সীমা ব্যাপক। এতো গুলো অপরাধের হিসেব কিভাবে দিবেন বলুন তো? বড়লোক বলে তো আপনাকে মাফ করা যায় না। অন্তত আমি তো করবোই না। লোকটার প্রতি আপনার করা প্রতিটা অন্যায়ের হিসেব আমি মেহরিমা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিবো।
ইমতিয়াজ পাশা চটে গেলেন। মেজাজ হারিয়ে বললেন
--কি করবে তুমি?
--লোকটার কাছে ক্ষমা চান এবং তাকে তার ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে দিন।
--তোমার এতো বড় সাহস তুমি আমাকে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলছো?
--হ্যা বলছি। আপনি আমার বাবার বয়সী দেখে এখনো আপনার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করছি। নয়তো এতোক্ষণে মানহানির মাম'লায় আপনাকে আমি চৌদ্দ শিকে ঢুকিয়ে ছাড়তাম। সেট নিশ্চয়ই আপনার জন্য মঙ্গলজনক হতো না।
--এই মেয়ে তুমি কিন্তু এবার বেশি বেশি করছো।
ইশতিয়াক পাশা যতোটা রে'গে আছেন তার থেকেও শান্ত মেহরিমা। চোখে তার ভয়ের লেশমাত্র নেই। হিমশীতল কন্ঠের শান্ত স্বরে জবাব দিলো
--ওনার কাছে ক্ষমা চাইবেন নাকি অনলাইনে আপনাকে নিয়ে জমজমাট তথ্য ছড়াবো আমি?
মেহরিমা ওনার উত্তরের আশায় রইলো না। জনগণের দিকে তাকিয়ে বললো
--এতোক্ষণে তো বেশ এনজয় করছিলেন। এবার একটু কাজের কাজ করুন তো। এই যে উনি মোঃ ইশতিয়াক পাশা। বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টের মালিক। ওনাকে নিয়ে বেশ রসালো একটা নিউজ বানান তো। আপনারা তো সবই পারেন। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করতে ওস্তাদ। আজ একটু সওয়াবের কাজ করুন। গরীবের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার পেতে সাহায্য করুন। নাকি ভিউ কামাইয়ের পাশাপাশি টাকার প্রতিও আপনারা দূর্বল?
ইমতিয়াজ পাশা এতোক্ষণ ভালোমানুষির মুখোশ পড়ে থাকলেও এবার আর পারলো না। অত্যাধিক রা'গে মেহরিমার দিকে তেড়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মা'রতে নিলে সহসা পেছন থেকে ভেসে এলো হিমশীতল কন্ঠের সর্তক বার্তা
--ওই বুইড়া,ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টাচ হার।আদারওয়াইজ, ইউ্য উইল ডেফিনিটলি পে ফর ইট!
চলতি ক্লাইমেক্সে আরো কিছুটা উৎসাহ ঢেলে দিতে ধীর কদমে সামনে এগিয়ে এলো শায়ের। ঠিক মেহরিমার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটার নরম তুলতুলে হাতখানা নিজের শক্ত খসখসে হাতে বন্দী করে নিলো। তীক্ষ্ণ চোখে ইশতিয়াক পাশার দিকে তাকিয়ে থেকে আশেপাশের সকলের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। অতঃপর কন্ঠে কিছুটা কৌতুক মিশিয়ে বললো
--হেই ইউ্য, ইউসলেস পিপল অভ দিস কান্ট্রি! এখনোও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেনো আপনারা? প্রত্যেকের মোবাইল বের করে উঁচু করে ধরুন। আর অবশ্যই মেইন ফোকাস পয়েন্ট এই বুইড়ার তেল চুকচুকে টাকের উপরে রাখবেন। নয়তো আমি কিন্তু খুবই রা'গ করবো। নিন এবার সকলে তিন-চারটা করে মোবাইল বের করে ফটাফট ফেসবুক লাইভ চালু করুন তো। ফার্স্ট ফার্স্ট, দেরি করলে কিন্তু আপনাদেরই লস।
এতোক্ষণ মেহরিমার স্তব্ধের ন্যায় নিজের হাতের দিকে তাকালো। শায়েরের কথা শেষ হতেই নড়চড়ে দাঁড়ালো। শায়েরের দিকে ফিরে নিচু স্বরে বললো
--আপনি আবার কি শুরু করেছেন?
শায়ের আড় চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসয়ে বললো
--চলতি ক্লাইমেক্সে কিছুটা উত্তেজনা মিক্স করছি মিস চ্যাপা শুঁটকি। আপনি চুপচাপ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু উপভোগ করে যান।
মোবাইলের অগনিত ফ্ল্যাশের আলোয় ভরকে গেলেন ইমতিয়াজ পাশা। নিজের ইমেজ বাঁচাতে সকলের আড়ালে চলে যেতে নিলে সহসা ওনার স্যুটের কলার ধরে ফেললো শায়ের। নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো
--আরে আরে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আপনাকে ছাড়া এই সার্কাস ভাইরাল হবে না।
ইমতিয়াজ পাশা দাঁতে দাঁত চেপে শায়েরের উদ্দেশ্যে বললো
--বেশি বেশি করছো কিন্তু। আমার ভাই কিন্তু এমপি। এর মাশুল তোমাকে দিতে হবে।
শায়েরের কিছু এলো গেলো বলে মনে হলো না। উল্টো ন্যাকামি করে ভ য় পাওয়ার নাটক করে বললো
--সে কি আপনার ভাই এমপি? ইয়া খালিদ এই সত্য আপনি আগে বলবেন না। তাহলে কিছুটা রয়ে সয়ে বলতাম। ইশশ এখন আমার কি হবে? অন্যায় করে ফেললাম মনে হচ্ছে?
শায়েরের কথায় মেহরিমা তাজ্জব বনে গেলেও মুখে হাসি ফুটলো ইমতিয়াজ পাশার। কলার ঠিক করে দাম্ভিকতার সঙ্গে বললো
--আমার ভাই এমপি। এখন ভালোই ভালোই আমাকে যেতে দাও। আর তোমাদের এই নাটক বন্ধ করো।
শায়ের অদ্ভুত ভাবে হাসলো। হেয়ালি করে বললো
--আপনি সেই না যার ভাইপোর বিয়ের দিন কনে পালিয়ে গিয়েছিলো? ছিঃ এটা কিছু হইলো? এমপির ছেলের বিয়ের আসর থেকে যদি কনে পালিয়ে যায় তাহলে সাধারণ জনগণের কি হবে?
শায়েরের সূক্ষ্ম অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে গেলো ইমতিয়াজ পাশার। ভীড় থেকে একজন চেচিয়ে বললো
--এনার ভাইপোর বউ পালিয়েছিলো?
শায়ের সেদিকে ফিরে বললো
--হুম এনারই তো ভাইপো। আসুন আসুন ভালো করে দেখুন এনার মুখ টা।
মূহুর্তেই যেন জায়গা টা জমজমাট হয়ে গেলো। এতোক্ষণে সবাই চুপচাপ থাকলেও এখন একের পর এক প্রশ্নে জরজরিত করছে ইশতিয়াক পাশাকে। শায়ের আলগোছে মেহরিমাকে নিয়ে ভীর থেকে বেরিয়ে এলো। বেঞ্চে বসে পায়ের উপর পা তুলে উপভোগ করতে লাগলো সামনের দৃশ্য। এক পর্যায়ে ইশতিয়াক পাশা নিজের সম্মান বাঁচাতে শায়েরের সাহায্য চাইলো। শায়েরের কথামতো বয়স্ক বৃদ্ধাকে তার ক্ষতিপূরণের ডাবল অর্থ দিলো। সকলের সামনে ক্ষমা চাইলো। এমনকি মেহরিমা কে সরি বলতেও ভুললো না। পুরো ঘটনায় মেহরিমা শুধু নির্বাক হয়ে সব দেখলো। যে ঘটনা সে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলো সেই একই ঘটনা শায়ের এসেই কেমন সমাধান করে দিলো। মেহরিমার মনের এককোনে শায়েরকে নিয়ে আবারও ভালো লাগার সৃষ্টি হলো। কিন্তু প্রতিবারের মতো আজও নিজের ভালোলাগাকে বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে রেখে মেয়েটা এড়িয়ে গেলো। দিনশেষে বুক চিরে বেরিয়ে এলো একফালি দীর্ঘ শ্বাস।