#রক্ত_রেখার_আড়ালে পর্ব--৫০-৫২
#আয়েশা_শেখ
[⚠️নয় হাজারের বেশি শব্দ প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি। সময় করে মনোযোগ দিয়ে একদম সম্পূর্ণ পড়ে তারপর মন্তব্য করবেন।]
সেদিনের পর আরাফ এখন শান্তর সঙ্গেই ফ্রান্সে দিন কাটাচ্ছে। অনুভার পরিবার চাইলে হয়তো জোর করে বাচ্চাটাকে নিজেদের কাছে আটকে রাখতে পারত না, কারণ শান্তকে ছাড়া আরাফ এক মুহূর্তও কোথাও স্থির হতে শেখেনি। যদি কোনোভাবে ছেলেটা শান্তর থেকে দূরে থাকতে পারত, তবে হয়তো শান্তও জোর করে নিজের অধিকার ফলাতে যেত না। কিন্তু আরাফের এই অবুঝ জেদ আর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে শেষমেশ ইয়াসির খানও নিজের কঠোরতা কিছুটা নরম করতে বাধ্য হয়েছেন। শান্ত এখন ফ্রান্সে নিজের বাড়িতেই বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। দেখতে দেখতে আড়াই মাসের মত কেটে গেছে, অথচ অনুভার কোনো মিলেনি। বাবার কড়া নজরদারির আড়ালে যতটুকু সম্ভব শান্ত এখনো গোপনে অনুভার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইয়াসির খানের সার্বক্ষণিক পাহারা তাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে যে, নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়ির বাইরে পা রাখার স্বাধীনতাটুকুও তার নেই।
সারাদিনের বেশির ভাগ সময়টাই তাকে আরাফকে সঙ্গী করে ছাদের এক কোণে কিংবা বাসার লনে কাটাতে হয়। শান্তর একপাশের হাত আর বাহুতে গুলি লাগায় শরীরের ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি, তাই হাঁটার জন্য এখনো একটা ক্র্যাচের ওপর ভরসা রাখতে হয় তাকে। আরাফ শান্তর ছায়ায় থাকলেও নিজের মাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি। ফেলে আসা দিনগুলোতে হিসেবহীনবার সে তার মায়ের চেনা স্পর্শ খুঁজে বেরিয়েছে। যখনই অবুঝ মনে মায়ের স্মৃতি দোলা দেয়, তখনই সে শান্তর কাছে আধো-আধো গলায় আকুতি জানায়,
“পাপা, মা আছেনা? মা কোতায়? মা... নিয়ে দাও...”
এই সরল জিজ্ঞাসা শান্তর বুকের ভেতরের বেদনাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটা-ওটা মিথ্যে গল্প শুনিয়ে, খেলনা দেখিয়ে কোনোমতে বাচ্চাটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। শাহানা বেগমের নরম স্বভাবের কারণে তাঁর সাথে আরাফের বেশ একটা সখ্য গড়ে উঠলেও, খাবারের ব্যাপারে ছেলেটা বড্ড একরোখা। শান্তর হাত ছাড়া সে এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে চায় না। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময়ও তার শান্তকেই চাই। মাঝে মাঝে এসব আদিখ্যেতা দেখে ইয়াসির খান প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করেন, কিন্তু তার কিছু করার নেই।
শান্ত নিজেকে আরাফের সামনে শক্ত করে ধরে রাখলেও, আড়ালে গিয়ে অনুভার জন্য ঠিক আরাফের মতোই ভেঙে পড়ে। ফ্রান্সের আসার পর অনুভার স্মৃতিগুলো আরও বেশি তাড়া করে তাকে। বাবার চোখের আড়াল হতে পারলেই সে আরাফকে কোলে নিয়ে ছুটে যেত সেই পরিচিত পাহাড়ের কিনারায়, যেখানে অনুভা মাঝেমধ্যে তাকে না জানিয়ে একা একা গিয়ে বসে থাকত। কখনো কখনো বিষাদের মাত্রা এতই বেড়ে যেত যে, আরাফকে শাহানা বেগমের কাছে রেখে সে একাই সেই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, কাঁদত, শূন্য আকাশে মুখ তুলে চিৎকার করে নিজের হাহাকার জানাত। এভাবেই না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কেবল আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো রকমে তার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে তার। শান্তর জীবন থেকে আরাফ নামক এই অবলম্বনটুকু কেড়ে নিলে ছেলেটা যে একদম নিঃশেষ হয়ে যেত, তা এখন শাহানা বেগম আর ইয়াসির খানও মনে মনে অনুধাবন করতে পেরেছেন।
আজকের দিনটা অবশ্য অন্য দিনগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা। ইয়াসির খান ব্যবসার একটা জরুরি কাজে মার্সেই শহরের বাইরে গিয়েছেন। তাই বিকেলে শান্ত আরাফকে নিয়ে কাছের একটা পার্কের উদ্দেশ্যে বের হয়। শাহানা বেগম জোর করেই ড্রাইভারকে সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চলন্ত গাড়ির পেছনের সিটে আরাফকে কোলে নিয়ে বসে আছে শান্ত, আর সামনে মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। কোলের ওপর বসা ছোট্ট আরাফ তখন বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই একরাশ দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে, যা দেখে শান্তর বিষণ্ণ মুখেও মলিন হাসি ফুটে উঠল।
পার্কের প্রধান গেইটের সামনে এসে গাড়িটা ব্রেক কষল। ড্রাইভার দ্রুত নেমে পেছনের দরজাটা খুলে দিতেই নামার প্রস্তুতি নেয় শান্ত। এক হাতে আরাফকে সে নিজের পাঁজরের একপাশে শক্ত করে চেপে ধরে, পকেট থেকে একটা কালো রোদ চশমা বের করে পড়ে নেয়। এরপর গাড়ির বডি ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক হাতের বগলে ক্র্যাচটা চেপে, ধীরলয়ে সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ম্যাডামের কড়া নির্দেশ থাকায় ড্রাইভার পিছু ছাড়ল না, সে-ও শান্তর ঠিক পাশাপাশি তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। পার্কের ভেতরে ঢুকে কিছুটা খোলামেলা জায়গা পেতেই শান্ত আরাফকে কোল থেকে আলতো করে সবুজ ঘাসের ওপর নামিয়ে দিল। মাটিতে পা রাখতেই এতক্ষণের বন্দিদশা ভুলে আরাফ খিলখিল করে হেসে তার ছোট্ট পা দুটো ফেলে টলমল পায়ে সোজা দৌড় দিল পার্কের এক কোণে থাকা রঙিন চিলড্রেনস স্লাইড আর স্প্রিং রাইডারগুলোর দিকে। একটা লাল রঙের প্লাস্টিকের ঘোড়া আকৃতির স্প্রিং রাইডারে গিয়ে সে হাত রাখল, যেন ওটায় চড়ার জন্য তার তর সইছে না।
শান্ত একটু এগিয়ে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চিতে এসে ধীরেসুস্থে বসল। ক্র্যাচটা পাশে হেলান দিয়ে রেখে সে একদৃষ্টে আরাফের দিকে তাকিয়ে রইল। রোদ চশমার আড়ালে থাকা শান্তর চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া। আরাফ স্প্রিং রাইডারে চড়ে দুলতে দুলতে একটু পরপরই খেলা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল পাপা ঠিক জায়গায় আছে কি না। যখনই সে দূর থেকে দেখছিল শান্ত ওর দিকেই তাকিয়ে আছে, অমনি আধো-আধো গলায় ‘পাপা’ বলে চিৎকার করে হাত নাড়ছিল। শান্তও দূর থেকে হালকা হেসে হাত উঁচিয়ে ছেলেকে হাই জানাল।
ড্রাইভারটি এসে একদম দূরত্ব না রেখে শান্তর গা-ঘেঁষে বসল। এত কাছাকাছি কারো বসে থাকাটা শান্তর ঠিক পছন্দ হলো না। সে চোখের কোণে তীব্র গাম্ভীর্য নিয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকাল। তারপর একদম নিচু অথচ ভারী গলায় বলল,
_“তুমি আমার ড্রাইভার নাকি গার্লফ্রেন্ড যে, এভাবে সবসময় আমার সঙ্গে জোড়া বেঁধে থাকতে হবে?”
ড্রাইভার একটু চওড়া হাসি দিয়ে কথা ঘোরানোর ছলে শান্তকেই উল্টো খোঁচা দিয়ে বলল,
_“স্যার, এই যুগে এসেও যে আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই, এটা আমার সামনে বলতে আপনার নিজের একটুও লজ্জা লাগছে না?”
ড্রাইভারের এমন চটপটে আর ধূর্ত জবাবে শান্ত কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর আরাফের দিকে তাকিয়ে একটু হাত নাড়িয়ে ফের ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ যতটুকু তোমার ডিউটি, ততটুকুই করো। অন্তত এতটুকু দূরত্ব বজায় রেখে বসো, যাতে শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারি।”
ড্রাইভার এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একটু সরে বসল। শান্ত আবারও সেই স্প্রিং রাইডারে খেলতে থাকা আরাফের দিকে চোখ ফেরাল। কিছুক্ষণ পর পার্কের একপাশ থেকে একটা চেনা গানের সুর ভেসে এলো। কোনো এক মেয়ের কণ্ঠে বাংলা গানের কিছু লাইন। পরিচিত গানের সেই লাইন দুটো শান্তর কানে এসে আছড়ে পড়ছিল,
—“ ঘুরে ঘুরে চলা একলা মন, খুঁজে পায় প্রতি-পল...
উড়ে উড়ে করা দিন যাপন, কবে দিশা পাবে বল..
যাবে কী একা একা রাত কেটে, এভাবে ওভাবে…!
হবে কী দেখা শোনা কোনোমতে, মাঝপথে, বল কবে?”
চারপাশের ফরাসি কোলাহলের মাঝে এই চেনা বাংলা সুরের কণ্ঠটা এতই নিখাদ যে, না চাইতেও শান্ত সেদিকে তাকাতে বাধ্য হলো। পার্কের ঠিক এক কোণে, খোলা আকাশের নিচে ছোট্ট একটা কফি শপের আদলে তৈরি ক্যাফে। সেখানে একটি চেয়ারে বসে একা একা গিটার বাজিয়ে গান গাইছে এক তরুণী। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ হাতের গিটার আর সুরের ওঠানামার দিকে। মাথার ওপর একটা লেডিস ক্যাপ সামান্য বাঁকিয়ে পরা, যা তার মুখের অবয়বটাকে খানিকটা আড়াল করে রেখেছে। গায়ে জড়ানো একটা কালো রঙের ভারী লেদার জ্যাকেট।
শান্ত বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকল না। মেয়েটার পাশের খালি চেয়ারটায় আচমকা এক ক্যাপ পরিহিত পুরুষ এসে বসতেই সে নিজের চোখ জোড়া ফিরিয়ে নিল। ওই ছেলেটার চেহারা কেমন কিংবা তাদের মাঝে কী সম্পর্ক, তা দেখার বা জানার ন্যূনতম কোনো প্রয়োজনও মনে করল না সে।
দৃষ্টি ফিরিয়ে আবারও আরাফের দিকে তাকাতেই শান্তর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা! এই তো কয়েক সেকেন্ড একটু আগেও ছেলেটা চোখের সামনে মনের আনন্দে দুলছিল, এখন হুট করেই উধাও হয়ে গেছে! শান্তর মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। ক্র্যাচটা বগলে চেপে তড়িঘড়ি করে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। তখনই পার্কের অন্য প্রান্ত থেকে আরাফের চেনা কান্নার আওয়াজ এসে আছড়ে পড়ল তার কানে। শান্ত চমকে উঠে শব্দের উৎস লক্ষ্য করে পাশে তাকাতেই থমকে গেল। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জ্যাকেট পরা মেয়েটিকে জাপটে ধরে ‘মা মা’ বলে চিৎকার করে কাঁদছে আরাফ। মেয়েটিও ইতিমধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে পরম মমতায় অবুঝ আরাফকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে।
পায়ে প্রচণ্ড কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও শান্ত ক্র্যাচে ভর দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে ছুটে গেল। এক রকম ছিটকে গিয়ে সে মেয়েটির কোল থেকে আরাফকে টেনে নিতে চাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই শান্তর পুরো শরীর পাথরের মতো জমে গেল। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন তার একদম সম্মুখে, সে জ্যাকেট পড়া, গান গাওয়া মেয়েটি আর কেউ নয়, মাহভিন! শান্ত অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অত্যন্ত অস্থির আর রুদ্ধশ্বাসে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
_“মাহভিন! তুমি? তু-তুমি এখানে...?”
শান্তর পরবর্তী বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটি ওর মুখের অস্থিরতা দেখে অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক গলায় সে বলে উঠল,
_“সরি, আমি মাহভিন নই। আমার নাম মেহমিল।”
শান্ত এবার আরেক ধাক্কা খেয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।
শান্ত ঘোরলাগা চোখে চেয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে শুধাল,
_“মানে? তুমি কী বলছ এসব? মেহমিল মানে...?”
শান্তকে ওভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহমিল মুচকি হাসল। সে গিটারের বেল্টটা কাঁধ থেকে নামিয়ে চেয়ারের পাশে হেলান দিয়ে রেখে বলল,
_“মেহমিল মানে মেহমিল! আমার নাম অনামিকা মেহমিল শিকদার।”
শান্ত আরাফকে কোল থেকে নামিয়ে, তারপর এক হাতে মেহমিলের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তীক্ষ্ণ চোখে বলল,
_“ আর কত ফাঁকি দিবে আমার চোখে? অনেক হয়ছে! আমি পাগলের মতো তোমাকে খুজে বেরাচ্ছি, আর এদিকে তুমি পরিচয় গোপন রেখে চলাফেরা করছ!”
মেহমিলের হাসি নিভে গেল। কিছুই ঢুকছে না তার মাথায়। শান্ত আর কিছু বলার আগেই পাশে মেহমিলের সঙ্গে থাকা ছেলেটা মেহমিলের বাহু থেকে শান্তর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
_“ চাচ্চু বলেছিল তুই পাগল হয়ে গেছিস। কিন্তু মেয়ে দেখলেই পাগলামি করবি, এমন তো ভাবিনি!”
শান্ত এতক্ষনে পাশের ছেলেটার উপর নজর দিলো। এতে সে যেন টুপ করে আকাশ থেকে পড়ল। এটা তার কাজিন ফারহান খান ইজান। সবার কাছে ডা. ইজান খান নামে পরিচিত। কিন্তু ও মাহভিনের সাথে কী করছে সে হিসেব শান্তর মিলছে না। এদিকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফ আবারও মেহমিলের দু’পা জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। সে বারবার হাত বাড়িয়ে মেহমিলের কোলে ওঠার আকুতি জানাচ্ছে। এতদিন পর নিজের মাকে চোখের সামনে পেয়ে অবুঝ শিশুটা বড্ড অস্থির হয়ে উঠেছে। মেহমিলও আর স্থির থাকতে পারল না। সে নিজের মাথার ক্যাপটা খুলে কফির টেবিলে রেখে আরাফকে কোলে তুলে নিয়ে ওর গালে একটা চুমু খেল। মেহমিল নিজেও জানে না এই অচেনা বাচ্চাটা কেন তাকে দেখে এমন করছে। মেহমিলের কোলে ওঠার সাথে সাথেই আরাফ ওর গলাটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার ঘাড়ে মাথা দিয়ে এক গভীর শান্তিতে শুয়ে পড়ল।
ছেলের এই কাণ্ড দেখে শান্ত এবার আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে চিবুক শক্ত করে বলল,
_“ নাটক বন্ধ করো মাহভিন! কোথায় ছিলে এতদিন? তায়ান কোথায়?”
_“ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি মাহভিন নই! আর তায়ান? সেটা আবার কে? আপনি কি একটু বুঝিয়ে বলবেন আমাকে?”
মেহমিল এবারও বেশ শান্ত গলায় বলল।
_“ তুমি যদি মাহভিন না হবে, তাহলে তখন আরাফকে আদর করছিলে কেন?” আরাফকে ইশারা করে বলল শান্ত।
_“ এই বাচ্চাটার কথা বলছেন? আদর করব না কেন! এটা তো সেই বাচ্চা, যাকে তিন মাস আগে আমি বাংলাদেশের একটা হসপিটালে ব্লাড দিয়েছিলাম। এটা তাহলে আপনার বাচ্চা?”
শান্ত এবার শুধু জমে গেল না। পুরো বরফের স্তুপ হয়ে গেল যেন। মস্তিষ্কে বজ্রপাতের মতো আঘাত করছে কিছু একটা। সে নিজের মাথাটা চেপে ধরে। পাশে থাকা ড্রাইভার শান্তকে এমন অশান্ত হতে দেখে তার বাহু আগলে ধরে বলল,
_“ স্যার, আপনার কী খারাপ লাগছে? চলুন বাসায় ফিরে যাই।”
শান্ত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল ড্রাইভারের হাত। কিন্তু তীব্র মানসিক ধাক্কা আর শরীরের অতিরিক্ত দুর্বলতায় সে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছিল না, শরীরটা ভেঙে আসছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইজান দ্রুত এগিয়ে এসে শান্তকে আগলে ধরে পাশের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। শান্ত বসার সাথেসাথেই হাতের ক্র্যাচটা মাটিতে ফেলে দিয়ে ইজানের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে, রুদ্ধশ্বাসে সে বলল,
_“সত্যিটা বল আমায়! তুই ওর সঙ্গে এখানে কী করছিস? আর ও কেন বলছে ও মাহভিন না? কী করেছিস তোরা ওর সঙ্গে? পাপা... পাপা তোদের এসব করতে বলেছে, তাই না?”
ইজান শান্তর হাতটা আলতো করে নিজের কলার থেকে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
_“পাগলামি বন্ধ কর আরাফাত! তুই যার নাম বলছিস ও সে নয়। আমি মেহমিলকে খুব ভালো করেই চিনি। ও আমার প্রফেসরের মেয়ে।”
_“এটা অসম্ভব! তুই স্পষ্ট মিথ্যা বলছিস।” শান্তর গলায় তখনো তীব্র অবিশ্বাস।
মেহমিল আর কোনো কথা বাড়াল না। সে আরাফকে এক হাতে কোলে রেখেই নিজের পার্স থেকে একটা পরিচয়পত্র বের করে শান্তর চোখের সামনে ধরল। শান্ত অবিশ্বাস্য চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। কার্ডটা বাংলাদেশের নয়, এটা ফ্রান্সের এক নামী মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট আইডি। আর পরিচয়পত্রে থাকা ছবিটা বেশ কয়েক বছর পুরোনো। অবিকল অনুভার মতো দেখতে হলেও তাদের স্টাইল আর গেটআপে আকাশ-পাতাল ভিন্নতা রয়েছে। এই ছবিটা যত বছর আগের, তখন অনুভার বাংলাদেশে থাকার কথা। আর অনুভার চুল কখনোই এত ছোট ছিল না, অথচ কার্ডের ছবিতে মেয়েটার চুল কাঁধ অব্দি ছাঁটা।
সবকিছু মিলিয়েও একটা সমীকরণ শান্তর মাথায় মিলল না। মেয়েটা নিজেই বলছিল, সে নাকি তিন মাস আগে বাংলাদেশে আরাফকে ব্লাড দিয়েছে, অথচ সে দেখতে হুবহু অনুভার কার্বন কপি! শান্ত আর নিতে পারছে না। তার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। এই দুর্বল মাথায় এত জটিল রহস্য মেলানো এই মুহূর্তে তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শান্তর এমন মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা দেখে ড্রাইভার আর দেরি করল না। সে গাড়িটা পার্কের ভেতরে ঠিক ওদের কাছাকাছি এনে ব্যাক সিটের দরজা খুলে দিল এবং ইজানের সাহায্যে শান্তকে ভেতরে বসিয়ে দিল।
শান্তকে গাড়িতে রেখে ড্রাইভার মেহমিলের দিকে এগিয়ে গেল। সে মেহমিলের কোল থেকে আরাফের বাহু ধরে নিজের দিকে টান দিতেই আরাফ হুট করে পেছন ঘুরে কোনো কথা না বলে নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে ড্রাইভারের গালে ঠাস করে একটা চড় কষে দিল। বাচ্চাটার চোখ-মুখ তখন রাগে লাল। এতদিন পর নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে ও, আর এই লোক কিনা তাকে আবার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছে! চড় মেরেই ক্ষান্ত হলো না আরাফ, নিজের অবুঝ আর অস্পষ্ট ভাষায় সে ড্রাইভারকে বেশ কিছুক্ষণ ধমকে দিলো।
ড্রাইভার অবশ্য খামখেয়ালি বাচ্চার এই কাণ্ডে হাল ছাড়ল না। ছোট্ট হাতের চড়, থাপ্পড় আর নখের খামচি সহ্য করেই সে জোর করে আরাফকে মেহমিলের কোল থেকে নিজের কাছে টেনে আনতে চাইল। ড্রাইভারের এই অতিরিক্ত জোরাজোরিতে আরাফ এবার আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সে কিছুতেই তার মায়ের কোল ছেড়ে আসবে না, কোনো শর্তেই না।
বাচ্চার ওপর এমন জবরদস্তি দেখে মেহমিলের মেজাজটা এবার সত্যিই বিগড়ে গেল। সে ড্রাইভারের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে রাগত স্বরে বলে উঠল,
_“স্টপ ইট! আপনি একটা বাচ্চার সাথে এমন করতে পারেন না। দেখছেন না হি ইজ নট উইলিং টু গো? ও যেতে চাইছে না!”
ড্রাইভার কিছুটা অসহায় মুখে বলল,
_“রেখে তো আর যাওয়া যাবে না, ম্যাম। ছোট স্যারের শরীর ভালো না, এক্ষুনি বাসায় ফিরতে হবে। আর এই বাচ্চাকে এখানে রেখে গেলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পরবে।”
_“কিন্তু ও তো কোনোমতেই আপনার কাছে যাবে না। দেখছেন না ও কীভাবে কাঁদছে?” মেহমিল আরাফকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল।
_“কাঁদুক, গাড়িতে উঠিয়ে নিলেই আর কাঁদবে না।” ড্রাইভারের এমন নির্বিকার আর কাঠখোট্টা আচরণ মেহমিলের কাছে অসহ্য ঠেকল। সে বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“বাসা কতদূর আপনাদের?”
_“খুব বেশি দূর না ম্যাম, এই তো সামনেই।”
মেহমিল আরাফের কান্নার দিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“আচ্ছা, চলুন। আমিও আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি।”
মেহমিলের মুখে এই কথা শুনে ড্রাইভার যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। সে এক গাল হেসে স্বস্তি নিয়ে বলল,
_“তাহলে তো খুব ভালো হয়, চলুন! আমি আবার আপনাকে কাজ শেষ হলে আপনার বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আসব।”
মেহমিল ড্রাইভারের কথা সম্পূর্ণ শেষ হতেই দিল না। সে আরাফকে কোলে নিয়েই গটগট করে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে শান্তর পাশে বসে পড়ল। শান্ত এক পলক মেহমিলের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ ক্লান্তি আর জটিল সমীকরণ মাথায় নিয়ে চোখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। মেহমিল সিটে হেলান দিয়ে বসতেই লক্ষ্য করল, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে ইজানও এসে দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে। ইজানকে দেখামাত্রই মেহমিল আবার তেতে উঠল,
_“হোয়াট ইজ দিস? আপনি কি সব জায়গায় আমার পিছু নেবেন?”
ইজান আয়না দিয়ে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে বেশ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বলল,
_“যেখানে যাচ্ছো, সেটা আমার আপন চাচার বাসা। সো, আমি তো যাবই!”
মেহমিল আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। বিরক্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের কোলে শান্ত হয়ে আসা বাচ্চাটার দিকে মনোযোগ দিল। সে আজ পার্কের এই নিরিবিলি কোণটায় একাই একটু নিজের মতো সময় কাটাতে এসেছিল। কে জানে এই ইজাইন্না তাকে কোত্থেকে দেখে ফেলেছে! কোথাও গিয়ে যে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেবে, তার কোনো উপায় নেই। যেখানেই যাবে, কোত্থেকে যেন এসে হাজির হবেই!
শাহানা বেগমও শান্তর মতোই বিস্ময়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন মেহমিলকে দেখে। ইজান শাহানা বেগমকে সবটা বুঝিয়ে বলে। সেই সাথে শাহানা বেগমের কাছ থেকেও সে জেনে নেয় শান্তর এই মানসিক অবস্থার আসল কারণ। তার মুখ থেকে অনুভার মা’রা যাওয়া এবং শান্তর ভেতরের হাহাকারের গল্পটা শুনে মেহমিল নিজেও বেশ চমকাল । প্রথমে তার স্বাভাবিকই লেগেছিল। হয়তো তার চেহারা কারো সাথে মিলে যাওয়ায় বাচ্চাটা আর লোকটার ভুল হয়েছে। তবে দুনিয়ায় একটা মেয়ের সাথে অন্য একটা মেয়ের ঠিক কতটুকু মিল থাকলে, অবুঝ একটা বাচ্চার পাশাপাশি শান্তর মতো একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবকও এমন মারাত্মক ভুল করে বসল!
তবে এই সবকিছুর চেয়েও যে বড় একটা খটকা মেহমিলের মাথায় এসে ধাক্কা দিল, এই বাচ্চার মা যদি দেখতে হুবহু তারই মতো, আর এই বাচ্চাকেই সে তিন মাস আগে বাংলাদেশের হাসপাতালে নিজের রক্ত দিয়েছিল। যেই সেই রক্ত নয় অত্যন্ত দুর্লভ 'বোম্বে ব্লাড গ্রুপ'। তার বাবা যেখানে মেহমিলের এই বিশেষ রক্তের কারণে তাকে সবসময় সাবধানে রাখতেন এবং অন্য কাউকেই সহজে রক্ত দিতে দিতেন না, সেখানে এই বাচ্চার বেলায় মেহমিলকে প্রায় জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেহমিলের স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন উনার আচরণে কী পরিমাণ অস্থিরতা আর ছটফটানি ছিল!
তখনকার পরিস্থিতিতে এসব নিয়ে মেহমিলের মনে কোনো প্রশ্ন না জাগলেও, আজ এই পার্কের ঘটনার পর ভেতরের সন্দেহটা দানা বেঁধে উঠছে। এত কিছু কখনোই কাকতালীয় হতে পারে না। এই বাচ্চার মায়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই মেহমিলের কোনো অতীত বা রক্তের যোগসূত্র তো আছে। আর এই সত্যটা মেহমিলের বাবা খুব ভালো করেই জানেন, যা এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছে। লিভিং রুমের বসে মনে মনে ভাবছিল সে। তবে সে স্বভাবসুলভভাবেই একদম উত্তেজিত হলো না। কারণ সে জানে, এই সমস্ত রহস্যের জট একমাত্র তার বাবাই খুলতে পারবেন। মেহমিল অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের ওপর চাপ নেওয়ার মতো মেয়ে নয়। সে বেশ ঠান্ডা মাথায় সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বাবার কাছে মুখোমুখি জবাব চাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল।
বাসায় ফেরার পর লিভিং রুমে এক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়ায় নি শান্ত। কারও সাথে কোনো কথা না বলে নিজের ক্র্যাচে ভর দিয়ে সোজা দোতলায় চলে গেছে। এদিকে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসা মেহমিলের কোল থেকে নামতেই চাইছে না আরাফ। এতদিন পর মায়ের মতো কাউকে কাছে পেয়ে অবুঝ শিশুটার আনন্দের যেন সীমা নেই। সে একে একে নিজের পছন্দের রঙিন গাড়ি, প্লাস্টিকের ব্লক আর স্প্রিংয়ের খেলনাগুলো এনে সে মেহমিলের কোলের ওপর জড়ো করতে লাগল। আধো-আধো অস্পষ্ট ভাষায় সে মেহমিলকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, এতদিন সে কী কী খেলেছে, আজ সকালে কী কী মজার খাবার খেয়েছে। প্রতিটি কথার সাথে তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আর হাত-পায়ের চপলতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে নিজের মনের সবটুকু জমানো গল্প আজ একবারে উজার করে দিতে চায়।
মেহমিল একটুও বিরক্ত হলো না। সে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে আরাফের প্রতিটি ভাঙা ভাঙা কথা শুনছিল। বাচ্চাটা যখন একটা খেলনা উঁচিয়ে কিছু বলছিল, মেহমিলও তখন বাচ্চার মতোই হেসে উঠে তাতে সায় দিচ্ছিল। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাহানা বেগম কিংবা ইজানের কাছে মেহমিলকে কেবলই অনুভার অবিকল প্রতিরূপ বা আারাফের মায়ের মতো দেখতে কেউ একজন মনে হলেও, আরাফের দুনিয়ায় কোনো ‘মতো’ শব্দের অস্তিত্ব নেই। তার অবুঝ মন কোনো লজিক বোঝে না, কোনো ডিএনএ টেস্টও চেনে না। আরাফের কাছে এটাই তার নিজের জন্মদাত্রী মা, যাকে সে এতদিন পর ফিরে পেয়েছে।
——————
শান্তর রুমে ডা.রামিন শিকদার, মেহমিল, ইয়াসির খান, শাহানা বেগম এবং ইজান বসে আছে। আরাফ ঘুমাচ্ছে তবে এখনও ওর ছোট্ট মুঠোতে মেহমিলের আঙুল। বাচ্চাটার মনে ভয় ঢুকে গেছে যদি মা আবারও চলে যায়! সারাদিনেও যখন আরাফের থেকে ছাড়া পাচ্ছিল না মেহমিল, তখন ইজানের থেকে খোঁজ নিয়ে রামিন শিকদাল এ বাড়িতে চলে আসে। এসে আরাফ আর শান্তকে দেখে চমকায়। তেমনি শান্তও রামিন শিকদারকে দেখে চমকায়।
এতকিছুর পর এটা একদম স্বাভাবিকই যে তার কাছে এসবের পেছনের কারণ জানতে চাইবে। শান্তর এখানে খুব একটা আগ্রও নেই। কারণ, সে মেয়েটার পরিচয়পত্র দেখে বুঝে গিয়েছে এই মেয়েটা মাহভিন নয়। আর এই মেয়েরটার কথা চাঞ্চলতা, আচরণ অনুভার মতোও না, তবে মেহমিল তো শুনেই ছাড়বে। তাই সবাইকে নিয়ে নিজের বাবাকে মাঝখানে রেখে সে সামনে মুখোমুখি হয়ে বসেছে।
_“ বলো বাবা, আরাফাত খানের ওয়াইফ—অনুভার সাথে আমার কীসের সম্পর্ক? তার সাথে আমার চেহারার মিল, এবং তার সন্তানের সাথে আমার ব্লাড গ্রুপের মিল। তার উপর তুমি তাদের চেন।”
মাঝখান থেকে শান্তর বাবা বলে উঠল,
_“ আমার ছেলে অবিবাহিত। ওর কোনো ওয়াইফ-সন্তান কিছুই নেই। ও শুধু মেয়েটাকে ভালোবাসত। তাই তার অবর্তমানে, তার সন্তানকে নিজের কাছে রাখছে। কারণ ও একটা পাগল।”
মেহমিলের চোয়াল এবার ঝুলে এলো। ও তো এতক্ষন এটাই ভাবছিল আর এটা ভাবাই তো স্বাভাবিক! ইয়াসির খানের এই রূঢ় কথার পিঠে শান্ত একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে শুধু একবার অত্যন্ত গম্ভীর আর তপ্ত চোখে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
ইয়াসির খানের সত্যের রেশ কাটতে না কাটতেই রামিন শিকদার ঘরের থমথমে বাতাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে বিশাল এক বিস্ফোরণ ঘটালেন। অত্যন্ত ভারী আর অপরাধবোধে জড়ানো গলায় তিনি বললেন,
_“অনুভা তোমার যমজ বোন, মেহমিল!”
এই একটি বাক্য যেন পুরো ঘরের ওপর আস্ত একটা আকাশ ভেঙে ফেলল। বিশেষ করে মেহমিলের মাথায়! ও শ্বাস নিতে ভুলে গেল। স্তব্ধ হলো মস্তিষ্ক। ফ্যালফ্যাল করে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। শান্তও চমকে উঠে রামিন শিকদারের দিকে তাকালেন।
তারা কিছু বলার আগেই মেহমিলের মাথায় পরবর্তী বাজটা এসে পড়ল, যখন ওর বাবাকে বলতে শুনল,
_“ আর আমিও তোমার আসল বাবা নই।”
না চাইতেও মেয়েটার চোখে বর্ষন নামল। সে অপলক তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। তার বাবা নিজে বলছে সে তার আসল বাবা নয়। তার বাবা নিজে বলছে তার যমজ বোন আছে। যে চেহারা সে আয়নায় রোজ দেখে, তার একটা হুবহু প্রতিরূপ এই পৃথিবীতে টিকে ছিল, অথচ সে দীর্ঘ তেইশটা বছর ধরে কিচ্ছু জানত না!
_“তাহলে আমার বাবা কে? আমার আসল পরিবার কারা?” বেশ কিছুক্ষন ওর ধরা গলায় বলল মেহমিল।
_“ ওরাই, যেদিন তুমি তাদের হসপিটালে দেখেছিলে।”
_“ তাহলে আমার মা, আমার মা বেঁচে আছে?”
_“ এত মিথ্যের মাঝে আমি তোমাকে একটাই সত্য বলেছি। আর তা হলো, তোমার মা সত্যিই বেঁচে নেই।”
_“ তাহলে আমার বাবা।”
_“ সেও বেঁচে নেই।” উত্তরটা এবার শান্ত দিলো।
_“ তাকে মাহভিন মে’রে ফেলেছে।”
_“ কিন্তু কেন?”
উত্তর দিলো না শান্ত। সে রামিন শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ তাহলে আপনিই জেসমিন আন্টির একতরফা প্রেমিক?”
রামিন শিকদার সম্মতি জানাল। তারপর সে ইয়াসির খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“ আপনি একটু আগে নিজের ছেলেকে পাগল বললেন না? এবার আমাকেও আপনার পাগলই মনে হবে। কারণ আমি আপনার ছেলের মাঝে দ্বিতীয় রামিন শিকদারকে খুঁজে পেয়েছি।”
তার কথা ইয়াসির খান বুঝলেন না। মেহমিল চোখে জল নিয়েই অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
_“ সবটা জানতে চাই আমি বাবা! এক্ষুনি জানতে চাই।”
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
রামিন শিকদার লুকালেন না আর কিছু। সব বললেন। অতীতে ঘটে যাওয়া সব।
সে এক অন্য রামিন শিকদারের গল্প। জেসমিন নামের এক তরুণীকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। গরীব রামিনের চোখে তখন জেসমিনকে নিয়ে এক আকাশ রঙিন স্বপ্ন। সবকিছুই বলতে লাগলেন একে একে। সে জেসমিনকে কতটা ভালোবাসত। তাকে নিয়ে কতটা স্বপ্ন দেখত। জেসমিনের মানসিক দুর্বলতা। জেসমিনের বাবা, অর্থাৎ অনুভা আর মেহমিলের নানার কাছে আরশাদ নিজেকে এতটাই বিশ্বস্ত আর ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণ করেছিল যে, জেসমিনের পুরো গর্ভকালীন সময়টার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত চেকআপ করানো, ওষুধ খাওয়ানো। সবকিছু সে নিজেই তদারকি করত।
আর এই সুবাদেই আরশাদ আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টে এক মারাত্মক সত্য জানতে পারে। জেসমিনের গর্ভে একটা নয়, দুটো প্রাণ স্পন্দিত হচ্ছে। দুটোই কন্যাসন্তান। কিন্তু এই লোভী লোকটা সেই সত্য শুধু পুরো পরিবার নয়, স্বয়ং জেসমিনের থেকেও সুকৌশলে লুকিয়ে রাখে। মানসিক সমস্যায় জর্জরিত জেসমিনও উথাল-পাথাল দিনগুলোর মাঝে এই চক্রান্তের বিন্দুবিসর্গ টের পায়নি। জেসমিন সেই সত্য জানতে পেরেছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনে। যেদিন ডাক্তার তার গর্ভ থেকে একটা নয়, পরপর দুটো ফুটফুটে কন্যাসন্তান বের করেন। কিন্তু মা হওয়ার সেই অসীম আনন্দ উপভোগ করার আগেই জেসমিনের মুখের আলো নিভে যায়। অবশ শরীরে সে দেখতে পায়, তার প্রথম জন্ম নেওয়া সন্তানটিকে ডাক্তার এক নার্সের হাতে তুলে দিয়ে গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে! এই দৃশ্য দেখে জেসমিন যন্ত্রণায় আর চিৎকারে ফেটে পড়লে ডাক্তার রেগে গিয়ে বাইরে থেকে ডেকে নিয়ে আসে আরশাদকে।
অন্যদিকে রামিন তখন মেডিকেলের ছাত্র হওয়ায় সেই হাসপাতালে তার প্রায়ই যাতায়াত ছিল। সেদিনও এক বিশেষ কাজে সে সেখানে গিয়েছিল এবং ওটি-র বাইরের সেই অরাজকতা ও জেসমিনের কান্নার আওয়াজ তার কান এড়ায়নি। ভেতরে কী ভয়ঙ্কর খেলা চলছে, তা বুঝতে রামিনের সময় লাগেনি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ভালোবাসার শেষ স্মৃতিকে বাঁচাতে সে জেসমিনকে উদ্ধার করতে না পারলেও, সেই বিক্রি হতে যাওয়া সন্তানটিকে বুকে চেপে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। কয়েকটা দিন সে সম্পূর্ণ নিখোঁজ ছিল সেই সদ্যোজাত শিশুকে বাঁচানোর তাগিদে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ফিরে এসে জানতে পারে, জেসমিন আর এই পৃথিবীতে নেই। সেদিন রামিন শিকদার শিশুর মতো ডুকরে কেঁদেছিলেন।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
এরপরের প্রতিটি দিন তিনি জেসমিনের কবরের পাশে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন, কোলের ওপর সেই ছোট্ট ফুটফুটে শিশুটিকে নিয়ে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সেদিন জেসমিনের আরও একটা কন্যাসন্তান বেঁচে গিয়েছিল। সেই বাড়ির অন্ধকার দেয়ালে সে বড় হচ্ছে এবং তার নাম রাখা হয়েছে মাহভিন অনুভা।
তাই সে নিজের কাছে থাকা বাচ্চাটার নাম রাখে অনামিকা মেহমিল। মেহমিল তার কাছে ভালো থাকলেও অনুভাকে নিয়ে তার সব সময় ভয় হতো। কত রাত যে তিনি অনুভাকে চুরির মতন করে নিজের কাছে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সেই বাড়ির ছেলে তায়ান অনুভাকে যেভাবে নিজের ছায়ার মতো আগলে রাখত, তা দূর থেকে দেখেই রামিনের মনে এক অদ্ভুত ভরসা জেগেছিল। না চাইতেও সেই ছোট্ট ছেলেটার ওপর তিনি বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবশেষে অনুভার ভাগ্যকে তিনি একদিকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, আর অন্যদিকে ভরসা রেখেছিলেন সেই বাড়ির তায়ান আর আরমান সাহেবের ওপর।
রামিন শিকদারের মাও এক সময় মারা যায়। মায়ের মৃত্যুর পর মেহমিলই হয়ে ওঠে রামিনের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তার গোটা পৃথিবী। জেসমিনকে হারিয়ে যে বিশাল শূন্যতা তার জীবনে তৈরি হয়েছিল, মেহমিলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সেই শূন্যতা ভুলে যেতেন। মেহমিলকে নিয়েই তিনি নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবতেন। নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর হাসপাতালের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি মা-মরা মেয়েটাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। যতটুকু সম্ভব নিজের সমস্ত আদর আর যত্ন দিয়ে তিনি মেয়েটাকে আগলে রাখতেন। মহান আল্লাহ যেন জেসমিনের ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে এই মেয়েটিকে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর নেয়ামত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।
সে খুব কম সময়েই মেডিকেলের স্টুডেন্ট হিসেবে সুনাম কামায়। যে রামিন টাকার অভাবে বিদেশে পড়াশোনা করার স্বপ্ন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। তারই হঠাৎ একদিন ফ্রান্সের এক বড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ চলে আসে। তখন মেহমিলের বয়স সাত বছর। সাত বছরের মেয়ে নিয়ে সে চলে যায় ফ্রান্সে।
চলবে...