জেসমিনের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা খাঁটি আর গভীর ছিল, তা প্রমাণ করে তার পরবর্তী জীবন। জীবনের এতগুলো বসন্ত পার হয়ে গেলেও, একাকীত্বের হাজারো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, তিনি জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারীকে আনার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। আর তাকে এ বিষয়ে জোর করার বা বোঝানোর মতোও কেউ ছিল না এ পৃথিবীতে। তিনি চাইলে পারতেন নিজের একটা নতুন সংসার গড়তে, নিজের রক্তের সন্তান পৃথিবীতে আনতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। নিজের পুরো যৌবন, পুরোটা জীবন তিনি উৎসর্গ করে দিয়েছেন জেসমিনের রেখে যাওয়া সেই পবিত্র অস্তিত্ব, মেহমিলের পেছনে। এক জীবনে একজন পুরুষ একটা মৃত মানুষকে কতটা তীব্রভাবে ভালোবাসতে পারে, রামিন শিকদার তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে এই ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে রইলেন।
---
সেদিনের পর থেকে মেহমিলের মধ্যে নিজের বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মায়া সবকিছু দ্বিগুণ বেড়ে যায়। দ্বিগুণ, তিনগুণ, চারগুণ, পাঁচগুণ, দশগুণ, একশগুণ, হাজারগুণ, লক্ষগুণ, কোটিগুণ! কত বেড়েছে তার হিসেব মেহমিলও জানে না। কিন্তু একটা মানুষ যে এতটা ভালো হতে পারে তা সে নিজের বাবাকে না দেখলে বুঝত না। এমন একজন মানুষকে নিজের বাবা হিসেবে পেয়ে সে বরাবরই নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী মনে করত, তবে এখন সেই উপলব্ধিটা তার চেতনার আরও গভীরে গিয়ে ধাক্কা দেয়।
নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মেহমিলের মনে একবারের জন্যও আসেনি, আর সে কখনো যাবেও না। তার বাবা এত বছর ধরে এই সত্যটা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন কেবল একটা মাত্র ভয়ে, যদি মেহমিলের আসল পরিবার তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়! কিংবা মেহমিল নিজেই যদি সত্যটা জানার পর ছেড়ে চলে যায়! আর তাই, সেদিনের পর থেকে সে ভুলেও কখনো নিজের সেই অন্য পরিবারের কথা মুখে আনেনি, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই তার জীবনে।
আরাফের প্রতি মেহমিলের টান আগে থেকেই কাজ করত, তা এখন এক অন্য মাত্রায় রূপ নিয়েছে। এই নিষ্পাপ শিশুটি যে তার নিজের যমজ বোনের রেখে যাওয়া কলিজার টুকরো! যে বাচ্চাটা পৃথিবীর সমস্ত যুক্তি উপেক্ষা করে মেহমিলকেই নিজের জন্মদাত্রী মা বলে দাবি করে আসছে! ফলে স্বাভাবিকভাবেই, দিন বদলের সাথে সাথে আরাফ এখন মেহমিল এবং শান্ত দুজনের জীবনেরই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
আরাফ যখন শান্তর বাসায় থাকে, তখন মেহমিল নয়ম করে ছুটে আসে তার ভাগ্নে তথা নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসার এই পুচকেটার সাথে সময় কাটাতে। আবার আরাফ যখন রামিন শিকদারের বাসাতে থাকে, তখন শান্তও গিয়ে হাজির হয় ছেলের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। তবে বেচারা আরাফ এই অদ্ভুত ভাগাভাগিতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। সে কেন তার পাপা আর মা'কে আগের মতো সারাক্ষণ একসাথে পাচ্ছে না! এই অবুঝ দুঃখ সে কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে না। মা যখন কাছে থাকে তখন পাপা থাকে না, আর পাপা যখন সামনে আসে তখন মা উধাও! এই লুকোচুরি খেলায় মন খারাপ করে সে প্রায়ই কাঁদে, কিন্তু তাতেও তো বাস্তবতার কোনো বদল হয় না।
এই নিয়মিত আসা-যাওয়ার সুবাদে শান্ত আর মেহমিলের মাঝখানের সেই বরফটাও গলতে শুরু করেছিল। দুজনের মধ্যে টুকটাক সৌজন্যমূলক কথা হতে হতে একসময় জড়তা কেটে যায়। তাই মেহমিল একদিন সুযোগ বুঝে শান্তর ভালোবাসার গভীরতা জানতে চাইল। তার বিশ্বাস ছিল না শান্ত তাকে সেদিন অনুভার ব্যাপারে বলবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে অনেক কিছুই বলে।
অবশ্য এসবকিছুই মেহমিল শান্তর মায়ের মুখ থেকে আগেই শুনে নিয়েছিল। আর তখন থেকেই শান্তর ব্যক্তিত্বের প্রতি তার মনে এক গভীর মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। কেবল মুগ্ধই হয়নি, সে হয়তো নিঃশব্দে এই মানুষটার প্রেমেও পড়ে গেছে। আর এমন একটা পরিস্থিতিতে এটা হওয়াই তো হয়তো সবচেয়ে স্বাভাবিক। নিজের বাবার পর সে এই প্রথম শান্তর মাঝে এমন একনিষ্ঠ, একতরফা এক প্রেমিককে দেখল, যে কি না ভালোবাসার মানুষের অবর্তমানেও তার স্মৃতিকে উপাসনা করে চলেছে।
তার তো এটা ভেবে আফসোস হয়, তার বোন অনুভা কীভাবে এই মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা না বুঝে থাকতে পারল? এমন একজন মানুষকেও ফিরিয়ে দেওয়া যায়? দুনিয়ায় কেউ কি এতটা অবহেলা করতে পারে এমন পবিত্র অনুভূতিকে? সে তো রীতিমতো যমজ বোনের প্রতি এই লোকটার ভালোবাসার গভীরতা দেখে সে শান্তর ভালোবাসার অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ, যে ভালোবাসার কারণে সে শান্তর প্রতি দুর্বল হচ্ছে, সেই একই ভালোবাসা যে অন্য এক নারীর জন্য উৎসর্গীকৃত, তা মেহমিল খুব ভালো করেই জানে। আর তাই, বুকের ভেতর একরাশ তীব্র আকুলতা জমা হওয়া সত্ত্বেও, তা শান্তর সামনে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র সাহস বা অধিকার মেহমিলের নেই। সে এটা করবেও না কখনো।
সেদিন রাতে শান্ত তার বাবার অফিস থেকে বাসায় ফিরে ডা. রামিন শিকদারকে দেখল। গম্ভীর মুখে শাহানা বেগমের সাথে কোনো এক জরুরি বিষয়ে কথা বলছেন। শান্তকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই দুজনে হুট করে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের ভেতরের এই আকস্মিক নীরবতা শান্তর নজর এড়াল না। সে ডা. রামিনের সাথে সামান্য সৌজন্যমূলক দু-একটা কথা বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। দোতলায় ওঠার চলতি পথেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা কিছু অস্ফুট বাক্য শান্তর কানে এসে পৌঁছাল। সেই কথাগুলো শোনা মাত্রই তার পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল, সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তবে সে পেছন ঘুরে তাকাল না। আবারও নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তবে এবার তার হাঁটার গতি আগের তুলনায় অনেক বেশি।
বেশ কিছুক্ষণ পর শাহানা বেগম ধীর পায়ে ছেলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আরাফ আজ মেহমিলের কাছে থাকায় ঘরটা বেশ নিঝুম। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তার ছেলে রাতে সহজে ঘুমায় না। আর যদি কখনো চোখ লেগেও আসে, তা সামান্য কিছুক্ষণের জন্য। ঘরে ঢুকে দেখলেন, শান্ত ল্যাপটপের সামনে বসে একমনে কাজ করছে। শাহানা বেগম খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা দ্বিধা জড়ানো গলায় বললেন,
_“আমি তোকে কিছু বলতে চাই।”_
শান্ত স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
_“এখান থেকে চলে যাও।”_
_“খুব জরুরি কিছু কথা, বাবা।”_ শাহানা বেগম আরেকটু এগিয়ে এলেন।
_“চলে যেতে বলেছি!”_
_“শান্ত... শোন বাবা...”_
শাহানা বেগমের বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই ঘর কাঁপিয়ে এক বিকট শব্দ হলো। তিনি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। পরক্ষণেই চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলেন, একটু আগে সচল থাকা ল্যাপটপটা মেঝেতে আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। ভাঙা যন্ত্রাংশগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে যখন তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন, তখন ভয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। শান্তর চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। শাহানা বেগমের বুঝতে আর বাকি রইল না, সে যা বলতে এসেছে তা, তার ছেলে আগেই বুঝে ফেলেছে।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
ধৈর্যের বাঁধ হারালেন। এই ছেলের খামখেয়ালিপনার পেছনে খাটতে খাটতে তিনিও ক্লান্ত। তিনি ক্ষোভ আর হতাশা মেশানো গলায় বলে উঠলেন,
_“এমন একজনের জন্য তুই নিজের জীবনটা এভাবে শেষ করছিস, যে কি না বেঁচে থাকতে তোর দিকে কোনোদিন ভালোভাবে তাকিয়েও দেখেনি তুই আসলে দেখতে কেমন!”_
ক্ষোভ নিয়ে কথাটি বলেই শাহানা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, দুম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। মায়ের চলে যাওয়ার পর শান্ত সারাটা রাত চোখের পাতা এক করতে পারল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে তার ভেতরের হাহাকারটা আরও উগ্র হয়ে উঠল। সে কোনোমতেই, কোনো শর্তেই মাহভিনকে ছাড়া আর কাউকে নিজের জীবনে জড়াতে পারবে না। তার মন বলছে, তার মাহভিন এখনো এই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। সে কি নিজের চোখে মাহভিনের লাশ দেখেছে? দেখেনি। তবে সে কেন অন্য কাউকে তার জায়গায় বসাবে? কেন সে অন্য কাউকে বিয়ে করবে!
অসম্ভব, এটা কোনোদিন হতেই পারে না। তার এত বছরের ভালোবাসা এতটা মূল্যহীন নয়। মাহভিনের জায়গায় সে মনে মনে কাউকেই কল্পনা করতে পারে না, সেখানে বাস্তবে অন্য কোনো নারীকে বসানো তো দূর সাগরের গল্প। কাউকেই সে সেই আসনে বসাতে পারবে না! এমনকি দেখতে হুবহু মাহভিনের মতো তার এই যমজ বোন মেহমিলকেও না! দুনিয়ায় একই রকম চেহারার মানুষ তো আরও কতই হতে পারে। শুধুমাত্র দেখতে একই রকম বলে তো কেউ সেই নির্দিষ্ট মানুষটা হয়ে যায় না! অবয়ব এক হলেই কি হৃদয়ের ভেতরের সেই টান, সেই সুনির্দিষ্ট ভালোবাসা অন্য কারও প্রতি চলে আসে? কোনোদিন আসে না। মাহভিনের অভাব মেহমিলকে দিয়ে পূরণ করার এই অদ্ভুত চেষ্টা শান্তর কাছে এক অপমান বলে মনে হচ্ছে।
_
_“তোমাকে কে বলেছে মাহভিনকে ভুলার জন্য আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাইছি?”_
কয়েকদিন পর রামিন শিকদার নিজেই শান্তর সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলে।
শান্ত প্রথমটায় কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
_“কেউ বলেনি, তবে পরিস্থিতি দেখে আমার এটাই মনে হচ্ছে। দেখুন আঙ্কেল...”_
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
_“দেখো, তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে না, করো না। আমি জোর করতে আসিনি। তোমার চেয়ে হাজারটা যোগ্য আর ভালো ছেলে আমার মেয়ের জন্য তৈরি আছে। এমনকি তোমার নিজের কাজিন ইজানও মেহমিলকে পছন্দ করে। আমি তোমাদের দুজনকে এক ছাদের নিচে আনতে চেয়েছিলাম কেবল ওই ছোট্ট বাচ্চাটার কথা ভেবে। আরাফের খুশি, ওর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, সবকিছু এখন তোমাদের দুজনের ওপর নির্ভর করছে। ও তোমাকে নিজের বাবা আর আমার মেয়েকে নিজের মা জেনেই বড় হচ্ছে। ওর পুরো ভালো থাকাটা তোমাদের দুজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। একজন ডাক্তার এবং একজন মানুষ হিসেবে আমি চেয়েছিলাম এই নির্ভরশীলতা যেন সারাজীবন একটা সুন্দর আইনি পরিচয়ে টিকে থাকে।”_
_“সারাজীবনই থাকবে। আমি আমার জায়গা থেকে কখনোই ওকে বুঝতে দেব না, আমি ওর বাবা নই। আশা করি মেহমিলও ওকে নিজের সন্তানের মতোই দেখবে।”_ শান্ত বলল।
রামিন শিকদার এবার হালকা একটু হাসলেন,
_“এটা তখনই সম্ভব, যখন তোমরা দুজন একসাথে থাকবে। তুমি তো অনুভার স্মৃতি নিয়ে দেবদাস হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু আমার মেয়েকে তো আর আমি এভাবে বসিয়ে রাখব না। আজ হোক বা কাল, ওর জন্য যোগ্য পাত্র দেখে আমি ওকে বিয়ে দেব। মেহমিল তখন তার নিজের সংসার, নিজের স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর খারাপ লাগলেও এটাই সবচেয়ে বড় সত্য, আরাফের সাথে তোমার রক্তের বা বংশীয় কোনো সম্পর্ক নেই। ভবিষ্যতে আইনিভাবে আরাফের পুরো দায়িত্ব মেহমিল কিংবা ওর আসল পরিবারই পাবে। তখন তুমি কোন অধিকারে ওকে নিজের কাছে রাখবে?”_
রামিন শিকদারের এই অকাট্য আইনি আর সামাজিক যুক্তিটা শান্তর মনের ভেতরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় গিয়ে আঘাত করল। আরাফকে হারিয়ে ফেলার এই আকস্মিক ভয়ে শান্তর যুক্তি-বুদ্ধি যেন লোপ পেল।
_“যদি তেমন পরিস্থিতি আসে, তবে আমি আরাফকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চিরকালের জন্য পালিয়ে যাব! ঠিক যেমনটা আপনি একদিন করেছিলেন আপনার মেয়ের বেলায়।”_
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
_“এতে লাভটা কী হবে? তুমি নিজের জেদ পূরণ করতে গিয়ে ছেলেটাকে সারাজীবনের জন্য মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত করে দেবে। আমার আর তোমার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। মেহমিল বুঝ হওয়ার আগে কখনোই নিজের মায়ের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেনি। মা বলে আদেও কোনো অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আছে, সেটা সে শেষবে কখনো উপলব্ধিই করতে পারেনি। কারণ ওর জন্মের পর থেকেই আমি ওর মা আর বাবা, দুটোর ভূমিকাই একসাথে পালন করেছি। কিন্তু আরাফ তো অলরেডি জানে মা কী জিনিস! সে মেহমিলের মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে। তাকে কেন তুমি শুধু শুধু সেই ভালোবাসা থেকে আলাদা করতে চাইছ?”_
লোকটার প্রশ্নের সামনে শান্ত কিছুক্ষণ কোনো জবাব খুঁজে পেল না। নিজের ভেতরের ছটফটানি দমানোর চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলল,
_“আপনি আমাকে এই কথা বলছেন আঙ্কেল? আপনি নিজে একজন নারীকে ভালোবেসে, তার স্মৃতির ওপর ভর করে সারাটা জীবন একা কাটিয়ে দিলেন! আর আজ আমাকে এসে বলছেন আমি যেন আমার ভালোবাসা ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করি? আর যাই হোক, দুনিয়ার অন্য কেউ না বুঝলেও আপনি তো আমার ভেতরের এই অনুভূতিটা বোঝেন।”_
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মেহমিলের বাবা।
_“আমি তো আগেই বললাম, তোমার আর আমার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তোমার মতো কোনো বড়লোকের ছেলে যদি আমি সেদিন হতাম, তবে জেসমিনের পরিবার কখনোই আমায় ওভাবে ফিরিয়ে দিত না। আর সবচেয়ে বড় কথা, জেসমিনের মনের ভেতর অন্য কারও জন্য কোনো ভালোবাসা ছিল না। আমি ওকে পাইনি, এর কারণ এমন ছিল না যে ও আমাকে মন থেকে চায়নি। কিন্তু তুমি যাকে পাওনি শান্ত, সে তোমাকে কোনোদিনও মন থেকে চায়নি। সে-ও তোমার মতোই সারাটা জীবন অন্য একজনকে ভালোবেসে এসেছে।”_
শান্তর চোখের পাতা কাঁপল। তপ্ত গলায় বলল,
_“সে এখন আর তাকে ভালোবাসে না! ঘৃণা করে।”_
রামিন শিকদার একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি শান্তর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন,
_“তুমি কি কোনোদিন পারবে অনুভাকে তার কোনো একটা ভুলের জন্য মন থেকে ঘৃণা করতে?”_
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
শান্ত এক মুহূর্তও না ভেবে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,
_“কখনোই না।”_
_“তাহলে সে-ও হয়তো পারেনি। সব ঘৃণায় ঘৃণা থাকে না... কিছু ঘৃণা তো কেবল নিজের ভালোবাসাকে আড়াল করার এক ব্যর্থ অভিনয় মাত্র।”_ বলে সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দরজার দিকে এক পা বাড়িয়েও শেষবারের মতো শান্তর দিকে তাকালেন। উনার চোখজুড়ে তখন এক রাশ পিতৃসুলভ করুণা। তিনি শান্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
_“অপেক্ষা এমন কারও জন্য করো না, যে ফিরে এসেও কোনোদিন তোমাকে গ্রহণ করবে না।”_
কথাটি বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না, ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু দরজার হাতলে হাত দিতেই শান্তর অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর উনাকে থামিয়ে দিল। একটু আগে রামিন শিকদারের বলা সেই বাক্যটি শান্তর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে তখনো হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল ‘সে তোমাকে চায়নি... সে তোমাকে কোনোদিনও মন থেকে চায়নি।’
শান্ত খুব অসহায়, কম্পিত গলায় বলল,
_“সে আমাকে কেন চায়নি, আঙ্কেল? কেন চায়নি? আমার মধ্যে এমন কীসের অভাব ছিল, যেটা ওই পুরুষটার মধ্যে আছে? কী কমতি ছিল আমার ভালোবাসায়?”_
রামিন শিকদার দরজার হাতল ছেড়ে ধীর পায়ে পেছনে ফিরলেন। তিনি দেখলেন, শান্তর চোখ দিয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা নামছে। সে আবার শান্তর কাছে এগিয়ে এলেন। ওর কাঁধে নিজের হাতটা রাখে। উনার নিজের চোখ দুটোও তখন জেসমিনের স্মৃতিতে কিছুটা আর্দ্র হয়ে উঠেছে। শান্তর মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি অত্যন্ত গভীর গলায় বললেন,
_“ভালোবাসাও এক ধরণের রিজিক, সৃষ্টিকর্তা যদি তা নির্ধারণ করে না রাখেন, তবে হাজার অনুভূতি, হাজার চাওয়ার মাঝেও শেষ পর্যন্ত তা অপূর্ণই থেকে যায়।”_
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
একটু থেমে আবারও বললেন,
_“আমরা মানুষরা নিজেদের জীবন নিয়ে কতশত হিসাব কষি, কত নিখুঁত পরিকল্পনা করি। কিন্তু একটা কথা তো মানো, আমাদের নিজেদের পরিকল্পনার বাইরেও সৃষ্টিকর্তার আলাদা একটা পরিকল্পনা থাকে। আর শেষ পর্যন্ত উনার পরিকল্পনাই জয়ী হয়। তুমি যা চেয়েছ তা হয়তো পাওনি, কিন্তু উনার পরিকল্পনা অনুযায়ী তুমি যা পাবে, সেটাই হয়তো তোমার জন্য সবচেয়ে উত্তম। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য সব সময় উত্তম কিছুই বেছে রাখেন। বান্দা যদি ফুল চেয়ে থাকে, সৃষ্টিকর্তা তাকে আস্ত একটা বাগান করে দেন। তবে সৃষ্টিকর্তা বাগান করে দিলেও সেই বাগানের যত্ন আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কিন্তু বান্দাকেই নিতে হবে। ফুল শুকিয়ে যাবে নাকি সুবাস ছড়াবে, তা সম্পূর্ণ মানুষের ওপরই নির্ভর করে।”_
চলে গেলেন সে। ছেলেটার মতো এক সময় সেও তো এভাবে কেঁদেছে। মনে মনে অপূর্ণতা নিয়ে কত প্রশ্ন করে গেছে নিজেকে। সেই প্রশ্নের উত্তর তখন না পেলেও, সময়ের সাথে সাথে পেয়ে গেছে।
— —
শান্ত আর রামিন শিকদারের মধ্যকার দীর্ঘ সেই আলোচনার পরও শান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। রামিন শিকদারও আর কখনো এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। শান্তর সাথে দেখা হলে তিনি এমন স্বাভাবিক আচরণ করতেন যেন তাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। শান্ত আগের মতোই তার বাসায় যাওয়া আসা করত। মেহমিলও একই ভাবে আরাফের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য শান্তর বাসায় আসত। সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে চললেও শান্ত একদমই স্বাভাবিক ছিল না। লোকটার কথাগুলো বারবার সে শুনতে পেত। আরাফ যেদিন শান্তর কাছে থাকত, তখন মনের ভেতরের অস্থিরতা আরও বহুগুণ বেড়ে যেত।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
আজ অবুঝ বলে আরাফ তাকে পাপা ডাকছে। কিন্তু ও যখন বড় হবে, যখন জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জেনে যাবে যে এই শান্ত আসলে তার রক্তের কেউ নয়, কোনো বৈধ অভিভাবক নয়, বরং তার মায়ের একতরফা এক পাগল প্রেমিক মাত্র, তখন তাঁদের এই সম্পর্কের কী ভিত্তি থাকবে? আরাফের তো নিজস্ব এক বিশাল পরিবার আছে। কোন অধিকার, কোন জোর নিয়ে শান্ত তখন সমাজের সামনে দাঁড়াবে? বাস্তবতা তো এটাই যে, এখন কেবল শান্তর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে আরিজ আরাফকে তার হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন পরিস্থিতি বদলাবে, তখন কি ওর আপন চাচা হিসেবে আরিজ তাকে নিজের পরিবারে ফিরিয়ে নিতে চাইবে না? আরাফের তো মামা, চাচা, খালা সবাই আছে। তারা সবাই রক্তের সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা।
শুধু অবাস্তব এক জেদ নিয়ে বসে আছে শান্ত। কিন্তু এই জেদ আর অতীতের স্মৃতির ওপর ভর করে একটা বাচ্চার ভবিষ্যৎ সে কতটুকু সুরক্ষিত করতে পারবে? সে যদি সত্যিই আরাফকে নিজের সন্তান হিসেবে আজীবন আগলে রাখতে চায়, তবে তাকে আইনি আর সামাজিক একটা জোরদার ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আর তার একমাত্র উপায় মেহমিল। মেহমিলকে বিয়ে করা মানে শুধু একটা সামাজিক বন্ধনে জড়ানো নয়, বরং আরাফকে চিরকালের জন্য নিজের করে পাওয়ার একটা বৈধ অধিকার অর্জন করা।
ভাবতে ভাবতে শান্ত কোন পর্যায়ে চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি! সে কী ভাবছে! মধ্যে মনের ভেতর ভেঙে যাওয়া সেই দ্বিধার দেয়ালগুলো আবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে খাড়া হয়ে গেল। মাহভিন ছাড়া তার জীবনে অন্য কোনো নারী স্ত্রীর মর্যাদায় আসবে, এটা ভাবলেই তার কান্না পায়।
পরক্ষণেই তার মনে পড়ল আজকের সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে হওয়া তার মায়ের সঙ্গেকার কথা। শাহানা বেগম তখন রুটি আর অমলেট শান্তর প্লেটে তুলে দিচ্ছিলেন। উনার মুখটা ভীষণ গম্ভীর ছিল তখন। শান্তর উদাসীনতা দেখে তার বিরক্তিসীমা অতিক্রম হয়ে গেছে। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই তিনি আবারও সেই মেহমিলের প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।
_“তুই কি চাস না এই বাচ্চাটা একটা সুস্থ, স্বাভাবিক পরিবার পাক? মেহমিল মেয়েটা কতটা লক্ষ্মী, তুই কি তা চোখে দেখিস না? ও তো তোর কাছে কিছু চাচ্ছে না। শুধু আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে তুই এই জেদটা এবার ছাড়।”_
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
শান্ত তখন প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলেছিল,
_“আমি তো আরাফকে নিজের কাছেই রাখছি মম। ওর যত্নের তো কোনো কমতি হচ্ছে না।”_
_“যত্নের কমতি হচ্ছে না মানে? তুই কি সারাজীবন ওকে এভাবে একটা দয়ার সম্পর্কের ওপর বড় করবি? মেহমিলের বাবা নিজে এসে তোকে সুন্দর একটা প্রস্তাব দিয়েছেন, আর তুই নিজের এক কাল্পনিক জগতের পেছনে ছুটে সেই সুযোগটা পায়ে ঠেলছিস? তুই মেহমিলকে বিয়ে না করলে ডা. রামিন বেশিদিন আরাফকে তোর কাছে রাখতে দেবেন না, এটা তুই লিখে রাখ!”_
_“আমি আমার ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না, মম! তুমি যা-ই বলো না কেন, মাহভিনের জায়গায় অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে অসম্ভব।”_
_“সে তোর বউ ছিল না, শান্ত! আর না তো সে তোকে কোনোদিন ভালোবেসেছিল! দুটো বছর তোরা এক ছাদের নিচে একসাথে ছিলি, তবুও সেই মেয়েটার মনে তোর প্রতি সামান্য একটু মায়া ছাড়া আর কিছু তৈরি হয়নি। নিজের মনকে আর কত মিথ্যা সান্ত্বনা দিবি তুই? আচ্ছা, তোর সেই মহান ভালোবাসার বাকি সব কথা বাদই দিলাম। এই দুনিয়ায় মানুষ নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের কথা ভেবেও তো কত দ্বিতীয় বিয়ে করে, করে না? তুই না হয় আরাফের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেটাই কর! যদিও কপাল ভালো যে এটা তোর জীবনের প্রথম বিয়ে হতে যাচ্ছে, কোনো দ্বিতীয় বিয়ে নয়!”_
বিছানার এক কোণ থেকে আধো-আধো স্বরে একটা অস্ফুট আওয়াজ ভেসে এলো। ঘুমের ঘোরেই আরাফ কাকে যেন ডাকছে। এই আধো কণ্ঠের ডাকটা শোনা মাত্রই শান্তর সমস্ত ভাবনার দেয়াল ভেঙে গেল। সে ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে বসল। জিরো ওয়াটের নীলচে ম্লান আলোয় সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরাফের নিষ্পাপ, কোমল মুখটার দিকে। বাচ্চাটা যত বড় হচ্ছে, তার অবয়বে মেহমিল আর অনুভার ছাপ যেন তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদম মা আর খালার মতো চেহারা নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে এই ছেলে। মেহমিল যখন আরাফকে কোলে নিয়ে বাইরে বের হয়, সবাই একে মেহমিলের ছেলেই মনে করে। এই অনামিকা মেয়েটার জন্যই আজ তার সাজানো গোছানো একাকীত্বে এত বড় ঝড় উঠেছে! এই মেয়েটার হুট করে তাদের জীবনে এভাবে উদয় হওয়ার কোনো দরকার ছিল না। আরাফকে নিজের সন্তান পরিচয়ে বড় করতে গিয়ে তাকে আজ এই কঠিন বাস্তবতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো না।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
— —
এ সিদ্ধান্তে শান্তর বাবাও রাজি। অনামিকা তার বন্ধুর মেয়ে জেরিনের চেয়েও যোগ্য। সেও একসময় বাবার মতোই একজন ভালো ডাক্তার হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজি না হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ডাইনিং টেবিলে বসে ইয়াসির খান খাচ্ছিলেন আর এসব নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখনই হুট করে শান্তকে বলতে শুনল,
_“আমি বিয়ে করতে রাজি। তুমি আঙ্কেলকে জানিয়ে দিতে পারো।”_
ইয়াসির খান আর শাহানা বেগম দুজনেই থমকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তর দিকে তাকাল। কাঙ্ক্ষিত এই সম্মতিটুকু শোনার পর যে কোনো মায়ের মুখে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টোটা। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে উনার ভেতরের সেই ক্ষণিক স্বস্তি এক নিমেষে মিলিয়ে গেল।
শান্তর চোখে কোনো প্রাপ্তির আনন্দ ছিল না, সেখানে কেবল জমে ছিল পরাজয়ের গ্লানি।
_“তবে অনামিকাকে আগে থেকেই বলে দিও, সে যেন আমার থেকে কোনোদিন স্বামী হিসেবে ভালোবাসা না খোঁজে। এই বিয়েটা শুধু আরাফের জন্য। ওর আইনি অধিকার নিজের কাছে রাখা ছাড়া, এর বাইরে আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।”_ সে তার পরবর্তী বক্তব্য জানিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই উপরে চলে গেল।
খবরটা শাহানা বেগম রামিন শিকদারকে জানিয়ে খুব দ্রুতই বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলল। কারণ তার ছেলের মন আবার কখন ঘুরে যায় কে জানে। শান্ত নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানানোর ঠিক চারদিনের মাথায় বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেল।
এই চারটে দিনে শান্ত একবারের জন্যও মেহমিলের সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেনি। মেয়েটা আদেও এই বিয়েতে মন থেকে রাজি কি না, বা তার কোনো নিজস্ব মতামত আছে কি না তা জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ শান্তর ছিল না। সে নিজে রাজি হয়েছে মানেই গল্প শেষ, সেখানে আর কে রাজি থাকল কি থাকল না, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তার নেই।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
বিয়ের অনুষ্ঠান ফ্রান্সেরই এক নির্জন মসজিদে সম্পন্ন হয়। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো কোলাহল নেই, একেবারে সাদামাটাভাবে আকদ শেষ করে তারা এখন গাড়িতে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছে। শান্ত শূন্য, উদাসীন দৃষ্টিতে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের অচেনা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে একটা নেভি ব্লু রঙের ব্লেজার। মাঝখানের সিটটায় বসে আছে আরাফ। ওর পরনেও শান্তর ব্লেজারের অবিকল একটা ছোট সাইজ। আর তার ঠিক অন্য পাশে বসে আছে শুভ্র রঙের স্নিগ্ধ এক বিয়ের গাউন পরিহিতা মেহমিল। আরাফ আজ বেশ খুশি। চোখে থাকা কালো চশমাটা একবার খুলে ফেলছে আবার চোখে পড়ছে। সিটে দু'পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে সেটা নিয়েই খেলতে ব্যস্ত সে। মেহমিল আরাফের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা শান্তর দিকে তাকাল।
বিয়ে নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে কোনো আলাপ তো দূরের কথা, গোটা বিয়ের অনুষ্ঠান জুড়েও শান্ত তার সাথে একটা শব্দও বিনিময় করেনি। এমনকি কবুল বলার পর মেহমিলের দিকে এক পলক তাকানোর সৌজন্যতাও সে দেখায়নি। তবে মেহমিল এই উদাসীনতাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছে। এ নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ বা রাগ নেই। মেহমিলের তো ধারণাতেও ছিল না যে তার বাবা আড়ালে শান্তদের পরিবারের সাথে তাদের বিয়ে নিয়ে এতদিন ধরে কথা চালাচালি করছিলেন। বাবার মুখ থেকে প্রথম যখন সে শান্তর সাথে বিয়ের এই প্রস্তাবটা শুনেছিল, সে শুধু অবাকই হয়নি, আকাশ থেকে পড়েছিল। আর তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা সে খেয়েছিল তখন, যখন বাবা তাকে জানিয়েছিলেন যে শান্ত নিজেও এই বিয়েতে মত দিয়েছে! বুঝতে পারছিল না শান্ত অনুভার সাথে তার চেহারার এই অবিকল মিলের মোহে পড়ে রাজি হলো, নাকি শুধুই আরাফের ভবিষ্যতের কথা ভেবে? যদি শান্ত শুধু চেহারার মিল দেখে মেহমিলকে মেনে নিয়ে থাকত, তবে তা খুবই বাজে হতো। এই বাজে হতো ধারণাটা ভেঙে যায় আজ। এখন আরও বেশি ভেঙে গেছে। শান্ত কখনোই তার চেহারার মিলের জন্য বিয়ে করেনি তা মানুষটার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার ভেতরে কি চলছে সেটা হয়তো সহজেই কেউ বুঝবে না। কিন্তু মুখটা দেখে মেহমিলের মায়াই হচ্ছে।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*Ayesha sheikh Rin - আয়েশা শেখ রিন*
গাড়ির মৃদু দুলুনিতে শান্তর কপালের ওপর কয়েকটা চুল এসে পড়েছে। মেহমিল মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তর উদ্দেশ্যে অলিখিত কিছু কথা সাজাতে লাগল,
_“আমি আপনার কাছে অনুভার জায়গা কোনোদিনও দাবি করব না। আপনার হৃদয়ে ও যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। আপনি ওকে সারাজীবন, আপনার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এভাবেই ভালোবেসে যান, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ আপনার ওই একনিষ্ঠ ভালোবাসার রূপ দেখেই তো আমি নিজের অজান্তে আপনার প্রেমে পড়েছি।”_
মেহমিলের ঠোঁটের কোণে এক আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে ওঠে। সে শান্তর দিক থেকে চোখ না সরিয়েই আবারও মনে মনে বলল,
_“তবে হ্যাঁ, আজ হোক বা বহু বছর পর, আমার ভালোবাসার টান যদি কখনো আপনার মনের ওই শক্ত বরফটাকে গলাতে পারে, আর সেই টানে আপনি যদি কোনোদিন নিজে থেকে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন... সেদিন কিন্তু আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেব না। কারণ আমার বুকেও এক আকাশ ভালোবাসা জমা আছে আপনার জন্য। আমি আপনাকে এত বেশি, এত উজার করে ভালোবাসব যে, একদিন আপনিও আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবেন। আমিও আপনাকে ভালোবেসে আপনার ওই ভালোবাসার জোরকে হারিয়ে দিতে চাই।”_
— — —
_“আপনি আবারও এই রুমে এসেছেন! আমি আপনাকে এই রুমে আসতে বারণ করেছি না?”_ তায়ানকে নিজের রুমে দেখতে পেয়েই রেগে গেল অনুভা। সে তখন বিছানায় নিজের দু'পায়ের ওপর আরাফকে রেখে আলতো করে দুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিল।
_“তোর বারণ আমি কবে শুনেছি? আমার যখন ইচ্ছে হবে আমি আমার ছেলেকে দেখতে আসব।”_ তায়ান ধীর পায়ে সামনে এগোতে এগোতে বলল। অনুভা ওর দিকে রাগ জড়ানো চোখে তাকিয়ে রইল, কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না। আরাফ এখনো পুরোপুরি ঘুমায়নি। তবে ওর চোখের পাতা দুটো ছোট হয়ে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে যাবে। তায়ান বিছানার পাশে এসে ঝুঁকে গেল ছেলের দিকে। ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে অনুভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_“তোর জন্য ও এখনো আমাকে বাবা বলে ডাকে না।”_
_“আমি তো ডাকতে নিষেধ করিনি।”_ অনুভা মুখ নামিয়ে বলল।
_“ডাকতেও তো বলিস না।”_
_“বলবও না। সরুন এবার, ও ঘুমাবে।”_
তায়ান সরল না। ওখানেই বসে রইল স্থির হয়ে। একদৃষ্টিতে ছেলের ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে যাওয়া দেখতে থাকল। অনুভা তায়ানের সেই শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খুব নিচু গলায় বলল,
_“এভাবে আমরা আর কতদিন থাকব?”_
তায়ান চট করে অনুভার চোখের দিকে তাকাল। বলল,
_“আজীবন। আজীবনই থাকবি। থাকতে হবে। থাকতেই হবে।”_
_“আমার দমবন্ধ লাগে।”_
_“আসলেই লাগে?”_ তায়ানের গলায় এক অদ্ভুত শীতলতা।
অনুভা আর কিছু বলতে পারল না। তায়ানও চুপ করে রইল। ঘরের ভেতর এক গুমোট নীরবতা নেমে এলো। বেশ কিছুক্ষণ পর অনুভা আবারও নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ জড়ো করে বলল,
_“আমি আপনাকে সত্যিই অনেক ঘৃণা করি।”_
তায়ান একটু হাসল। বলল,
_“কর। আমি না হয় তোর ঘৃণার মাঝেই বেঁচে থাকি।”_ বলেই তায়ান ঘর থেকে চলে গেল।
সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙল আরাফের। অনুভা ওকে খাইয়ে দিয়ে তারপর মেতে উঠল খুনসুটিতে। বিছানায় ছড়িয়ে আছে হরেক রকম রঙিন খেলনা। মা আর ছেলে মিলে খেলছে, হাসছে। তায়ানও কোথেকে যেন এসে যোগ দিল ওদের সেই খেলায়। অনুভা মাঝেমধ্যে তায়ানের দিকে তাকাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার ছেলের দিকে মনোযোগী হচ্ছে। ছেলের মিষ্টি হাসির সাথে মিলিয়ে সেও খিলখিলিয়ে হাসছে। পুরো ঘরটা যেন এক আনন্দের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।