শেষ রাতের অতিথি
পর্ব ১: ১৩ নম্বর তলা
রাত তখন ১১টা ৪০ মিনিট।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল হোটেলটির সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল। হোটেলটির নাম— The Grand Aurelia।
শহরের সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেলগুলোর একটি। বিশাল কাঁচের দেয়াল, সোনালি আলোকসজ্জা আর অভিজাত অতিথিদের আনাগোনায় সবসময় মুখর থাকে জায়গাটি।
গাড়ি থেকে নামল মেহজাবিন।
বয়স ছাব্বিশ। পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। কাঁধে একটি ব্যাগ, হাতে ছোট স্যুটকেস। মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে নতুন স্বপ্নের ঝিলিক।
বাবার মৃত্যুর পর জীবনটা খুব একটা সহজ ছিল না তার। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকতে থাকতে একসময় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে। আর সেই চেষ্টার ফলেই The Grand Aurelia-তে Guest Relations Executive হিসেবে চাকরিটা পেয়েছে।
হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করতেই একজন মধ্যবয়সী নারী এগিয়ে এলেন।
"আপনি কি মিস মেহজাবিন?"
"জি।"
"আমি নওরীন। এই হোটেলের HR Manager। আপনাকে স্বাগতম।"
মেহজাবিন মিষ্টি করে হাসল।
"ধন্যবাদ, ম্যাম।"
নওরীন তাকে নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন।
"আপনার থাকার ব্যবস্থা হোটেলের স্টাফ উইংয়ে করা হয়েছে। কাল সকাল থেকে আপনার ডিউটি শুরু হবে। তবে একটা কথা, এই হোটেলের কিছু নিয়ম আছে। সেগুলো অবশ্যই মেনে চলবেন।"
"কী ধরনের নিয়ম, ম্যাম?"
"রাত বারোটার পর অযথা হোটেলের বিভিন্ন ফ্লোরে ঘোরাঘুরি করবেন না। অতিথিদের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাবেন না। আর..."
কথাটা বলতে গিয়ে নওরীন একটু থামলেন।
মেহজাবিন তাকাল।
"আর কী?"
"১৩ নম্বর তলা নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন করবেন না।"
মেহজাবিন ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
"১৩ নম্বর তলা? কিন্তু হোটেলে তো বারো তলার পরই চৌদ্দ তলা লেখা।"
নওরীন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
"ঠিক বলেছেন। এখানে তেরো নম্বর তলা নেই।"
কথাটা বলেই তিনি লিফটের বোতাম চাপলেন।
কিন্তু মেহজাবিন স্পষ্ট দেখেছিল, লিফটের ডিসপ্লেতে এক মুহূর্তের জন্য ১৩ সংখ্যাটি জ্বলে উঠেছিল।
তারপরই অদৃশ্য হয়ে যায়।
সে কিছু বলল না।
নতুন চাকরির প্রথম দিনেই অযথা ঝামেলায় জড়াতে চায় না।
পরদিন সকালটা বেশ ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই কাটল। নতুন কর্মীদের সঙ্গে পরিচয়, হোটেলের নিয়মকানুন শেখা, অতিথিদের সঙ্গে কথা বলা—সবকিছু মিলিয়ে সময় কোথা দিয়ে চলে গেল, বুঝতেই পারল না মেহজাবিন।
দুপুরের দিকে রিসেপশনে দাঁড়িয়ে অতিথিদের চেক-ইন করছিল সে।
ঠিক তখনই হোটেলের প্রধান দরজা দিয়ে একজন পুরুষ প্রবেশ করল।
কালো স্যুট, পরিপাটি চুল, হাতে দামি ঘড়ি। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই একধরনের আত্মবিশ্বাস। লোকটিকে দেখামাত্র রিসেপশনের সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
নওরীন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বললেন,
"Good morning, sir."
পুরুষটি কোনো উত্তর না দিয়ে চারপাশে তাকাল।
তারপর হঠাৎ চোখ আটকে গেল মেহজাবিনের ওপর।
কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
"তোমার নাম কী?"
মেহজাবিন পেশাদার হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
"মেহজাবিন, স্যার।"
পুরুষটির মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল।
"আবারও?"
মেহজাবিন কিছুটা অবাক হলো।
"Excuse me, sir?"
লোকটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুখ ফিরিয়ে নিল।
"Nothing."
নওরীন পরিচয় করিয়ে দিলেন,
"মিস মেহজাবিন, ইনি আমাদের হোটেলের মালিকের ছেলে, মিস্টার আরহান চৌধুরী।"
মেহজাবিন ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল।
"Nice to meet you, sir."
আরহান কোনো উত্তর দিল না। শুধু যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকিয়ে বলল,
"তোমাকে একটা পরামর্শ দিই?"
"জি, বলুন।"
"এই হোটেলে কাজ করতে হলে মানুষের মুখের চেয়ে তাদের নীরবতাকে বেশি বিশ্বাস করবে।"
কথাটা বলে সে চলে গেল।
মেহজাবিন কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটা অদ্ভুত!
কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিটা আরও অদ্ভুত ছিল। যেন সে মেহজাবিনকে আগে থেকেই চেনে।
রাত বাড়তে থাকল।
নিজের রুমে ফিরে গোসল করে বিছানায় শুয়ে পড়ল মেহজাবিন। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে একটু অস্বস্তি লাগছিল। তবুও ক্লান্তির কারণে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
ট্রিং... ট্রিং...
রুমের পাশের ছোট টেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনটি বাজছে।
মেহজাবিন ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ৩টা ১৩ মিনিট।
এত রাতে কে ফোন করবে?
সে রিসিভার তুলল।
"হ্যালো?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
"মেহজাবিন?"
"জি, কে বলছেন?"
"তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?"
মেহজাবিন বিরক্ত হয়ে বলল,
"আপনি কে? এত রাতে ফোন করেছেন কেন?"
ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
"দশ বছর আগে তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, কখনো এই হোটেলে ফিরবে না।"
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
"আপনি ভুল করছেন। আমি এই হোটেলে নতুন চাকরি নিয়েছি।"
লোকটি হালকা হেসে বলল,
"আমি জানি। তোমার চাকরির খবরও আমি জানি।"
"আপনি কে?"
এবার কণ্ঠটি আরও নিচু হলো।
"তোমার বোনকে জিজ্ঞেস করো।"
মেহজাবিনের হাত শক্ত হয়ে গেল।
তার কোনো বোন নেই। অন্তত তার জানা মতে নেই।
"আমার কোনো বোন নেই!"
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
"তাহলে তোমার ফোনে ছবিটা পাঠালাম। দেখে নিও।"
কল কেটে গেল।
ঠিক তখনই মেহজাবিনের মোবাইলে একটি মেসেজ এল।
অজানা নম্বর থেকে পাঠানো একটি ছবি।
সে ছবিটি খুলল।
ছবিতে দুজন মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একজন সে নিজেই। অন্য মেয়েটিকেও অবিকল তার মতো দেখতে।
একই চোখ, একই মুখ, একই হাসি।
শুধু মেয়েটির কপালের ডান পাশে একটি ছোট কাটা দাগ।
মেহজাবিন নিজের কপালে হাত রাখল।
তারও ঠিক একই জায়গায় একটি পুরোনো দাগ রয়েছে।
ছবির নিচে লেখা—
"তোমার যমজ বোন মেহরিন। সে দশ বছর আগে মারা গেছে। কিন্তু আজ রাতেও সে এই হোটেলে এসেছে।"
মেহজাবিনের হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।
পরদিন সকাল।
সারা রাত ঘুমাতে পারেনি সে। ছবিটা বারবার দেখেও কোনো উত্তর পাচ্ছিল না।
অবশেষে রিসেপশনে গিয়ে নওরীনকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু তার আগেই লিফটের সামনে আরহানের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
আরহান তাকে দেখে থামল।
"তোমার মুখ এমন ফ্যাকাশে কেন?"
মেহজাবিন কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
"একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
"করো।"
"এই
পর্ব ১
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব ১ শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান