শেষ রাতের অতিথি
পর্ব ২: যে মেয়েটি আয়নায় দাঁড়িয়ে ছিল
রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।
ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমে গেলেও মাঝেমধ্যে বাতাসের ঝাপটায় কাঁচ কেঁপে উঠছে।
মেহজাবিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখ জানালার কাঁচে।
কাঁচের ওপাশে নিজের প্রতিবিম্ব দেখার কথা। কিন্তু সেখানে সে একা নয়।
তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মেয়ে।
একই মুখ। একই চোখ। একই চেহারা।
শুধু কপালের ডান পাশে ছোট্ট একটি কাটা দাগ।
মেহরিন!
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে। চিৎকার করতে গিয়েও তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
মেয়েটি ধীরে ধীরে হাসল।
—আপু, এত ভয় পাচ্ছ কেন?
মেহজাবিন কাঁপা গলায় বলল,
—তুমি... তুমি আমার পেছনে কীভাবে এলে?
—আমি তো সবসময় তোমার সঙ্গেই ছিলাম।
—না! এটা সম্ভব না। তুমি মারা গেছ!
মেহরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কে বলেছে?
—আরহান!
নামটা উচ্চারণ করতেই মেয়েটির চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
তার মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি।
—তুমি এখনো ওকে বিশ্বাস করো?
মেহজাবিন কোনো উত্তর দিল না।
মেহরিন জানালার কাঁচের আরও কাছে এগিয়ে এল।
—আপু, একটা কথা মনে আছে? ছোটবেলায় তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, কখনো কারও জন্য আমাকে ছেড়ে যাবে না।
মেহজাবিনের চোখে পানি জমল।
হঠাৎ তার মাথার ভেতর কয়েকটি অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠল।
দুটি ছোট মেয়ে।
একটি বড় ঘর।
একটি লাল রঙের বেলুন।
আর একজন নারী, যিনি বারবার বলছেন,
—মেহজাবিন, মেহরিনের হাত ছাড়বে না।
পরক্ষণেই দৃশ্যগুলো মিলিয়ে গেল।
মেহজাবিন মাথা চেপে ধরল।
—আমার কী হয়েছিল? আমাদের সঙ্গে কী হয়েছিল?
মেহরিন এবার খুব ধীরে বলল,
—তুমি সব মনে করতে পারবে। তবে মনে রাখবে, সত্য জানার পর তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।
ঠিক তখনই ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
মেহজাবিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে তাকাতেই দেখল, জানালার সামনে কেউ নেই।
শুধু কাঁচের ওপর আঙুল দিয়ে লেখা কয়েকটি শব্দ।
৩:১৩ — ১৩ নম্বর ঘর।
১. সকালের অস্বস্তি
সকাল সাড়ে সাতটা।
মেহজাবিন সারারাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারেনি।
বিছানার পাশে বসে সে বারবার আগের রাতের ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করছিল।
ল্যান্ডফোনে মেহরিনের কণ্ঠ।
জানালার কাঁচে তার প্রতিবিম্ব।
আর সেই অদ্ভুত বার্তা।
৩:১৩ — ১৩ নম্বর ঘর।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়।
মেহরিন যদি সত্যিই মারা গিয়ে থাকে, তাহলে সে কীভাবে ফোন করল?
আর যদি সে বেঁচে থাকে, তাহলে দশ বছর ধরে কোথায় ছিল?
মেহজাবিন ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটি আবার খুলল।
দুই বোনের সেই পুরোনো ছবি।
সে এবার ছবির প্রতিটি অংশ ভালো করে দেখতে লাগল।
মেহরিনের কপালের দাগটি স্পষ্ট।
কিন্তু ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে আগে খেয়াল করেনি সে।
একজন পুরুষ।
কালো স্যুট পরা।
মুখটা ক্যামেরার দিকে নয়, বরং দুই মেয়ের দিকে তাকানো।
মেহজাবিন ছবিটি আরও বড় করল।
পুরুষটির মুখ অস্পষ্ট হলেও তার হাতের ঘড়িটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
একটি রুপালি ঘড়ি।
মেহজাবিনের হঠাৎ মনে হলো, ঘড়িটা সে কোথাও দেখেছে।
কিন্তু কোথায়?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
টক! টক!
মেহজাবিন চমকে উঠল।
—কে?
—আমি, নওরিন।
সে দ্রুত দরজা খুলল।
নওরিন হাতে একটি ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
—আপনাকে আজ বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শরীর খারাপ?
—না, একটু ঘুম হয়নি।
নওরিন ঘরের ভেতরে ঢুকে ট্রেটা টেবিলে রাখলেন।
—আপনি কি ঠিক আছেন?
—জি।
নওরিন এবার তার মুখের দিকে ভালো করে তাকালেন।
—গত রাতের ঘটনা নিয়ে ভাবছেন?
মেহজাবিনের বুক ধক করে উঠল।
—আপনি কীভাবে জানলেন?
নওরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—এই হোটেলে নতুন যারা আসে, প্রথম কয়েকটা রাত তাদের ঘুম ভালো হয় না।
—কেন?
নওরিন মৃদু হাসলেন।
—জায়গাটা একটু অদ্ভুত।
মেহজাবিন এবার সরাসরি প্রশ্ন করল,
—মেহরিন কে?
নওরিনের হাত থেকে চায়ের কাপ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
কয়েক সেকেন্ড তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর নিচু স্বরে বললেন,
—আপনি এই নাম কোথায় শুনেছেন?
—আমার যমজ বোনের নাম মেহরিন। আপনি কি তাকে চিনতেন?
নওরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—আপনি এসব কথা আর কারও সামনে বলবেন না।
—কেন? সবাই এই নাম শুনে ভয় পায় কেন?
নওরিন এবার দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
বের হওয়ার আগে থেমে বললেন,
—আপনার মা কি জানেন আপনি এখানে চাকরি করছেন?
—জি।
—তাহলে তাকে একবার ফোন করুন। বলুন, আপনি ভালো আছেন।
মেহজাবিন অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি এমন বলছেন কেন?
নওরিন কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু দরজা খুলে বাইরে চলে গেলেন।
২. পুরোনো নথি
সকাল দশটা।
হোটেলের কাজ শুরু হলেও মেহজাবিনের মন কিছুতেই কাজে বসছিল না।
সে সিদ্ধান্ত নিল, হোটেলের পুরোনো রেকর্ডগুলো খুঁজে দেখবে।
তার মনে হচ্ছিল, দশ বছর আগের কোনো ঘটনা এই রহস্যের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু Guest Relations বিভাগের একজন নতুন কর্মী হিসেবে পুরোনো নথি দেখার অনুমতি তার নেই।
তাই সে নওরিনের কাছে গেল।
—ম্যাম, একটা অনুরোধ ছিল।
—বলুন।
—হোটেলের পুরোনো কিছু রেকর্ড দেখতে চাইছিলাম।
—কীসের রেকর্ড?
—প্রায় দশ বছর আগের।
নওরিনের মুখের হাসি আবার মিলিয়ে গেল।
—কেন?
—এমনিই। হোটেলের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাই।
—আপনার কাজের জন্য এত পুরোনো রেকর্ডের প্রয়োজন নেই।
—তবু দেখতে চাই।
নওরিন এবার একটু বিরক্ত হলেন।
—মিস মেহজাবিন, আপনাকে কি আমি আগেও বলিনি, কিছু বিষয় থেকে দূরে থাকতে?
মেহজাবিন চুপ করে রইল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
—ওকে রেকর্ড রুমে নিয়ে যান।
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
আরহান চৌধুরী।
আজ তার পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। হাতে একটি ফাইল।
নওরিন অবাক হয়ে বললেন,
—স্যার, আপনি কি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
আরহান মেহজাবিনের দিকে তাকাল।
—তবে একটা শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—যা দেখবেন, সেটা নিয়ে আমাকে মিথ্যা বলবেন না।
মেহজাবিন একটু থেমে বলল,
—আপনিও কি আমাকে সত্যি বলবেন?
আরহান মৃদু হাসল।
—চেষ্টা করব।
রেকর্ড রুমটি হোটেলের বেসমেন্টে।
লিফট থেকে নেমে একটি সরু করিডর পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়।
ঘরটিতে ঢুকতেই পুরোনো কাগজের গন্ধ নাকে এল।
চারপাশে সারি সারি তাক। প্রতিটি তাকে বছর অনুযায়ী সাজানো ফাইল।
আরহান একটি তাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—দশ বছর আগের রেকর্ড এখানে।
মেহজাবিন ফাইলগুলো দেখতে শুরু করল।
২০১৬।
২০১৭।
২০১৮।
হঠাৎ একটি ফাইলের ওপর তার চোখ আটকে গেল।
তারিখ: ১৭ নভেম্বর ২০১৬।
ফাইলের ওপর লাল কালিতে লেখা—
CONFIDENTIAL — ROOM 1307
মেহজাবিন ফাইলটি হাতে নিতে গেল।
কিন্তু আরহান তার হাত আটকে দিল।
—ওটা নয়।
—কেন?
—ওই ফাইলের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।
—আপনি কীভাবে জানেন?
আরহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফাইলটি নিজের হাতে নিয়ে অন্য একটি তাকের ওপর রেখে দিল।
—আপনি বরং এটা দেখুন।
সে আরেকটি ফাইল এগিয়ে দিল।
মেহজাবিন ফাইলটি খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।
শিরোনাম দেখে তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
বিলাসবহুল হোটেলে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড, নিখোঁজ দুই শিশু।
সংবাদে লেখা—
২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে The Grand Aurelia হোটেলের একটি নির্দিষ্ট অংশে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন নারী কর্মচারী নিহত হন এবং দুই শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
নিখোঁজ শিশুদের নাম—
মেহজাবিন রহমান।
মেহরিন রহমান।
মেহজাবিনের হাত কাঁপতে লাগল।
—আমি... আমি তো এখানে ছিলাম?
আরহান কোনো উত্তর দিল না।
—আমি এই হোটেলে ছিলাম?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমাকে কেন বলা হয়েছে আমি কখনো এখানে আসিনি?
আরহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কারণ আপনাকে এই হোটেল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
—কে সরিয়ে নিয়েছিল?
আরহান তার দিকে তাকাল।
—আপনার মা।
মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—আমার মা?
—হ্যাঁ।
—কিন্তু কেন?
আরহান এবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
—সেটা আপনার মাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
মেহজাবিন আবার সংবাদপত্রের কাটিংয়ের দিকে তাকাল।
—এখানে লেখা দুজন শিশু নিখোঁজ হয়েছিল। তাহলে মেহরিনের লাশ কোথায়?
আরহান চুপ।
—আপনি জানেন না?
—জানি।
—তাহলে বলুন!
আরহান এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
—মেহরিনের কোনো লাশ পাওয়া যায়নি।
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
৩. আরহানের গোপন কথা
রেকর্ড রুম থেকে বেরিয়ে মেহজাবিন সোজা হোটেলের ছাদে চলে গেল।
শহরের ওপর তখন দুপুরের রোদ।
দূরে উঁচু উঁচু ভবন। নিচে গাড়ির সারি।
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবকিছু থেমে গেছে।
সে নিজের ফোন বের করে মাকে কল দিল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
কেউ ফোন ধরল না।
সে আবার কল দিল।
এবার ফোন রিসিভ হলো।
—হ্যালো, মা?
ওপাশে মায়ের কণ্ঠ।
—কী হয়েছে? এতবার ফোন করছিস কেন?
মেহজাবিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
—মা, তুমি আমাকে একটা কথা সত্যি করে বলবে?
—কী কথা?
—আমার কি সত্যিই একটা যমজ বোন ছিল?
ওপাশে নিস্তব্ধতা।
মেহজাবিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—মা, কথা বলছ না কেন?
কিছুক্ষণ পর মা কাঁপা গলায় বললেন,
—তুই এসব কোথায় শুনেছিস?
—আমি সব জেনে গেছি। মেহরিনের নাম জানি। দশ বছর আগের আগুনের ঘটনাও জানি।
ওপাশে মায়ের কান্নার শব্দ শোনা গেল।
—মা, মেহরিন কোথায়?
—মেহজাবিন, তুই ওই হোটেল থেকে চলে আয়।
—কেন?
—আমি তোকে অনুরোধ করছি। আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকিস না।
—মেহরিন কি বেঁচে আছে?
মা এবার কান্না থামিয়ে বললেন,
—না।
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল।
—তাহলে ও আমাকে ফোন করে কেন?
—কী বলছিস?
—মা, ও আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি ওকে দেখেছি!
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর মা খুব ধীরে বললেন,
—মেহজাবিন, তোর বোন যদি তোকে ডাকে, কখনো উত্তর দিবি না।
—কেন?
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—কারণ তোর বোন তোকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু শেষ রাতে সে তোকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
মেহজাবিনের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
—কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল?
মা উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।
মেহজাবিন আবার কল দিল।
ফোন বন্ধ।
ঠিক তখনই তার পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেল।
—আপনার মা সব বলেছেন?
মেহজাবিন ঘুরে দাঁড়াল।
আরহান।
সে ছাদের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহজাবিন চোখ মুছে বলল,
—আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু জানেন কীভাবে?
আরহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
—কারণ আমি সেদিনও এই হোটেলে ছিলাম।
—আপনার বয়স তখন কত ছিল?
—ষোলো।
—তাহলে আপনি সব দেখেছেন?
আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমি সেদিন আপনার বোনকে শেষবার দেখেছিলাম।
মেহজাবিনের চোখে পানি জমল।
—সে কেমন ছিল?
আরহান দূরের দিকে তাকাল।
—খুব হাসিখুশি। সবসময় কথা বলত। আর আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে চাইত না।
—আমাদের মধ্যে কী হয়েছিল?
আরহান এবার তার দিকে তাকাল।
—আপনারা দুজন একটা ঘরে আটকে পড়েছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি আপনাদের বের করার চেষ্টা করেছিলাম।
—তারপর?
আরহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
—আমি একজনকে বের করতে পেরেছিলাম।
মেহজাবিনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
—কাকে?
আরহান কোনো উত্তর দিল না।
কয়েক মুহূর্ত পর সে বলল,
—আপনাকে।
৪. ঘর নম্বর ১৩০৭
সন্ধ্যা ছয়টা।
মেহজাবিন নিজের ডেস্কে বসে ছিল।
আরহানের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
সে একজনকে বের করতে পেরেছিল।
কিন্তু অন্যজন?
মেহরিন?
হঠাৎ তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি নোটিফিকেশন এল।
একটি নতুন ইমেইল।
প্রেরক: Unknown.
বিষয়: আপনার জন্য কিছু রেখে গেছি।
মেহজাবিন ইমেইলটি খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র লাইন লেখা—
যদি সত্য জানতে চাও, আজ রাত ৩টা ১৩ মিনিটে ১৩০৭ নম্বর ঘরে এসো। একা আসবে।
নিচে একটি ছবি।
ছবিতে একটি ছোট্ট মেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
চোখ বন্ধ।
কপালের ডান পাশে ছোট্ট কাটা দাগ।
মেহরিন।
মেহজাবিন ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
ছবির নিচে আরও একটি বাক্য লেখা।
"আমি সেদিন মারা যাইনি, আপু।"
তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত চারপাশে তাকাল।
কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই।
কিন্তু একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বৃদ্ধ কর্মচারী তাকে গভীরভাবে দেখছিলেন।
মেহজাবিন উঠে তার কাছে গেল।
—এক্সকিউজ মি।
বৃদ্ধ লোকটি চমকে উঠলেন।
—জি?
—আপনি কি অনেকদিন ধরে এখানে কাজ করছেন?
—জি, প্রায় পঁচিশ বছর।
—আমি একটা ঘরের ব্যাপারে জানতে চাইছিলাম।
বৃদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কোন ঘর?
—১৩০৭।
লোকটি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।
তিনি মেহজাবিনের হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গেলেন।
—আপনি এই ঘরের কথা কোথায় শুনেছেন?
—এটা কি সত্যিই আছে?
বৃদ্ধ লোকটি চারপাশে তাকালেন।
তারপর নিচু স্বরে বললেন,
—ছিল।
—ছিল মানে?
—আগুন লাগার পর ঘরটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন আর কেউ সেখানে যায় না।
—কিন্তু তেরো নম্বর তলাই তো নেই!
বৃদ্ধ এবার মেহজাবিনের চোখের দিকে তাকালেন।
—সব তলা সবার জন্য থাকে না, মা।
কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন।
মেহজাবিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
৫. মধ্যরাতের লিফট
রাত ২টা ৫৫ মিনিট।
মেহজাবিন নিজের ঘরে বসে আছে।
সামনে মোবাইল।
স্ক্রিনে সময় এগিয়ে যাচ্ছে।
সে জানে, আরহান তাকে নিষেধ করেছে।
কিন্তু এবার তার কাছে যাওয়ার অন্য কোনো উপায় নেই।
মেহরিনের ছবিটা দেখার পর তার মনে হচ্ছে, বোনটি হয়তো সত্যিই কোথাও আটকে আছে।
সে একটি কালো জ্যাকেট পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
করিডর ফাঁকা।
দূরে লিফটের ডিসপ্লেতে ৮ লেখা।
মেহজাবিন বোতাম চাপল।
লিফট খুলতেই ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সাধারণত লিফটে বারো তলার পর আর কোনো বোতাম থাকে না।
কিন্তু আজ একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
বোতামগুলোর নিচে একটি নতুন বোতাম দেখা যাচ্ছে।
১৩।
মেহজাবিনের হাত কেঁপে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড বোতামটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে সেটিতে চাপ দিল।
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ভেতরের আলো নিভে গেল।
একটি যান্ত্রিক শব্দের সঙ্গে লিফট ওপরে উঠতে শুরু করল।
১২...
১৩...
লিফট থামল।
দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
সামনে একটি লম্বা করিডর।
দুই পাশে পুরোনো কাঠের দরজা।
দেয়ালের রং উঠে গেছে। ছাদের কয়েকটি জায়গায় কালো পোড়া দাগ।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা।
তার ওপর লেখা—
১৩০৭।
মেহজাবিন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
প্রতিটি পদক্ষেপে তার বুকের ধুকপুকানি বাড়ছিল।
দরজার সামনে এসে থামল।
ভেতর থেকে কারও গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ আসছে।
একটি পুরোনো শিশুতোষ গান।
গানটি শুনতেই মেহজাবিনের মাথায় ঝাপসা কিছু স্মৃতি ফিরে এল।
একটি ছোট্ট ঘর।
দুটি বালিশ।
একটি মেয়ে আরেকটি মেয়ের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।
—আপু, তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো?
—না রে, কখনো না।
মেহজাবিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে দরজায় হাত রাখল।
দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
৬. যে সত্য কেউ বলতে চায়নি
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই মেহজাবিন থমকে গেল।
ঘরটি পুরোনো হলেও অদ্ভুতভাবে সাজানো।
এক পাশে দুটি ছোট বিছানা।
দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি।
একটি টেবিলের ওপর রাখা দুটি পুতুল।
আর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
সাদা পোশাক।
খোলা চুল।
কপালের ডান পাশে সেই পরিচিত কাটা দাগ।
মেহরিন।
মেহজাবিনের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
—মেহরিন...
মেয়েটি ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার মুখে হাসি।
—এত দেরি করলে কেন, আপু?
মেহজাবিন চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।
—তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?
মেহরিন কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে এল।
—তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে।
—আমি কিছু মনে করতে পারি না। আমার কী হয়েছিল?
মেহরিন তার হাত ধরল।
তার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।
—তুমি সব ভুলে গিয়েছিলে, কারণ সবাই তোমাকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল।
—কে?
মেহরিন এবার জানালার পাশে রাখা একটি পুরোনো ড্রয়ার খুলল।
ভেতর থেকে একটি ছবি বের করল।
ছবিতে দুই বোনের সঙ্গে আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে।
একজন নারী।
মেহজাবিন ছবিটা হাতে নিল।
তারপর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।
ছবির নারীটি তার মা।
কিন্তু মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?
একজন পুরুষ।
কালো স্যুট।
রুপালি ঘড়ি।
ঠিক সেই মানুষ, যাকে সে দশ বছর আগের ছবিতেও দেখেছিল।
মেহজাবিন ফিসফিস করে বলল,
—ইনি কে?
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
—আমাদের বাবা।
মেহজাবিনের মাথা ঘুরে উঠল।
—কী বলছ তুমি? আমাদের বাবা তো...
—যার কথা মা তোমাকে বলেছেন, তিনি তোমার আসল বাবা নন।
মেহজাবিন কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
—না! এটা হতে পারে না!
মেহরিন এবার তার হাত শক্ত করে ধরল।
—আপু, তুমি জানো আমাদের বাবা কী করেছিলেন?
—কী?
—সেদিন রাতে তিনি আমাদের দুজনকে এই ঘরে আটকে রেখেছিলেন।
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—কেন?
মেহরিনের চোখে পানি চলে এল।
—কারণ তিনি আমাদের একজনকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। আর অন্যজনকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীরে ধীরে কেউ দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
মেহরিনের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে মেহজাবিনের হাত ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—আপু, তাড়াতাড়ি লুকাও!
—কেন?
—সে এসে গেছে!
দরজার বাইরে থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।
—মেহজাবিন?
মেহজাবিনের শরীর জমে গেল।
এই কণ্ঠ সে চেনে।
আরহান!
—আমি জানি তুমি ভেতরে আছ। দরজাটা খোলো।
মেহজাবিন দরজার দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখন মেহরিন তার হাত ধরে ফেলল।
—না, আপু!
—ও আরহান!
মেহরিন মাথা নাড়ল।
—তুমি এখনো বুঝতে পারছ না? সে তোমাকে বাঁচাতে আসেনি।
বাইরে থেকে আবার আওয়াজ এল।
—মেহজাবিন, আমার কথা শোনো। ওই মেয়েটার কাছ থেকে দূরে সরে যাও!
মেহজাবিন এবার দুই বোনের মাঝখানে তাকাল।
একদিকে মেহরিন।
অন্যদিকে আরহান।
দুজনেই তাকে সাবধান করছে।
কাকে বিশ্বাস করবে সে?
ঠিক তখনই মেহরিন তার কানে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—আপু, একটা কথা বলি?
—কী?
—দশ বছর আগে এই ঘরে যে মেয়েটা মারা গিয়েছিল, সে আমি ছিলাম না।
মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—তাহলে কে?
মেহরিন ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—তুমি।
মেহজাবিনের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হলো।
ধাম!
দরজাটি খুলে গেল।
আরহান ঘরে ঢুকল।
তার হাতে একটি কালো রঙের পিস্তল।
মেহজাবিন আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
—আপনি! আপনি এখানে কী করছেন?
আরহান তার দিকে তাকাল।
তারপর মেহরিনের দিকে।
—মেহজাবিন, আমার কাছে চলে আসুন।
মেহরিন হাসল।
—দেখলে আপু? আবারও এসেছে। দশ বছর আগেও ঠিক এভাবেই এসেছিল।
আরহান এবার পিস্তলটা নিচে নামিয়ে ফেলল।
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
—মেহরিন, যথেষ্ট হয়েছে।
মেহরিন এবার অট্টহাসি হেসে উঠল।
—যথেষ্ট? তুমি কি সত্যিই ভাবো, এত বছর পর আমি সব ভুলে যাব?
আরহান চোখ বন্ধ করল।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—আমি তোমাকে মারতে চাইনি।
মেহজাবিনের চোখে বিস্ময়।
—আপনি কী বলছেন?
আরহান তার দিকে তাকাল।
—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। কিন্তু তার আগে তোমাকে নিজের একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
—কী প্রশ্ন?
আরহান ধীরে ধীরে বলল,
—তুমি কি কখনো ভেবেছ, দশ বছর আগে তোমার স্মৃতি হারানোর পরও তোমার মা কেন তোমাকে কোনোদিন তোমার শৈশবের ছবি দেখাননি?
মেহজাবিন চুপ করে রইল।
—কেন তোমার জন্মদিনের আগের দিন তোমার মা সবসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন?
মেহজাবিনের চোখে পানি জমল।
—আপনি এসব কীভাবে জানেন?
আরহান উত্তর দিল না।
সে শুধু বলল,
—কারণ তোমার মা জানেন, সেদিন রাতে আসলে কী ঘটেছিল।
মেহরিন এবার ধীরে ধীরে মেহজাবিনের কাছে এগিয়ে এল।
তার চোখে অদ্ভুত এক মায়া।
—আপু, ওর কথা শুনো না। ও সবসময় মিথ্যা বলে।
মেহজাবিন মাথা চেপে ধরল।
হঠাৎ তার চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
দশ বছর আগের রাত।
আগুন জ্বলছে।
ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেছে।
একটি ছোট্ট মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে।
আরেকটি মেয়ে তার হাত ধরে কাঁদছে।
—আপু! ওঠো! প্লিজ ওঠো!
তারপর একজন পুরুষ ঘরে ঢুকছে।
সে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিচ্ছে।
কিন্তু মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।
দৃশ্যটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
মেহজাবিন মেঝেতে বসে পড়ল।
আরহান দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এল।
—মেহজাবিন!
মেহরিন পেছনে সরে গেল।
তার মুখে এবার আর হাসি নেই।
সে নিচু স্বরে বলল,
—তুমি মনে করতে শুরু করেছ।
মেহজাবিন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
—সেদিন রাতে... আসলে কী হয়েছিল?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—সেদিন রাতে আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, আপু।
—কীভাবে?
—কিন্তু তুমি আমাকে একা রেখে চলে গিয়েছিলে।
মেহজাবিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।
মেহরিনের ঠোঁটে বিষণ্ন হাসি ফুটল।
—তাহলে আজও আমাকে একা রেখে যাবে না তো?
মেহজাবিন হাত বাড়িয়ে দিল।
—না।
আরহান হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
—মেহজাবিন! ওর হাত ধরবেন না!
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
মেহরিন মেহজাবিনের হাত ধরে ফেলেছে।
ঘরের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
একটি প্রচণ্ড শব্দ হলো।
তারপর চারদিকে অন্ধকার।
৭. সকাল ৩টা ১৩ মিনিট
সকাল ৩টা ১৩ মিনিট।
হোটেলের অষ্টম তলার করিডরে একজন নিরাপত্তাকর্মী অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে।
লিফটের দরজা খুলে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আরহান।
তার সাদা শার্টে রক্তের দাগ।
এক হাতে পিস্তল।
অন্য হাতে একটি পুরোনো ছবি।
সে দ্রুত নিজের অফিসে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
টেবিলের ওপর ছবিটা রাখল।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
আরহান।
মেহজাবিন।
মেহরিন।
তিনজনই প্রায় দশ বছর আগের।
ছবির পেছনে লেখা—
১৭ নভেম্বর ২০১৬।
আরহান ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
যদি কখনো মেহজাবিন ফিরে আসে, তাকে সত্যিটা জানাতে হবে।
আরহান ডায়েরিটা বন্ধ করে চোখ মুছল।
তারপর নিজের ফোন হাতে নিল।
একটি নম্বরে কল করল।
ওপাশ থেকে একজন বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
—হ্যালো?
আরহান নিচু স্বরে বলল,
—স্যার, সে ফিরে এসেছে।
—কে?
—মেহজাবিন।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
—তাহলে এবার আমাদের পরিকল্পনা বদলাতে হবে।
আরহান জানালার বাইরে তাকাল।
—কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।
—কী সমস্যা?
আরহান ধীরে ধীরে বলল,
—মেহরিনও ফিরে এসেছে।
ওপাশের লোকটি এবার চিৎকার করে উঠলেন।
—অসম্ভব! মেহরিন তো দশ বছর আগেই মারা গেছে!
আরহান চোখ বন্ধ করল।
—আমি জানি, স্যার।
—তাহলে তুমি কী দেখেছ?
আরহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমি দুজনকেই দেখেছি।
ফোনের ওপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বৃদ্ধ লোকটি খুব ধীরে বললেন,
—আরহান, একটা কথা মনে রেখো। এই হোটেলে দুটো মেয়ে ফিরে আসেনি।
—মানে?
—একটা মেয়ে ফিরে এসেছে। আর অন্যজন কখনো এখান থেকে যায়ইনি।
ফোন কেটে গেল।
আরহান স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা ছবির দিকে তাকাল।
ছবিতে মেহজাবিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিনের মুখে ছোট্ট একটি হাসি।
কিন্তু এবার ছবিতে আরেকটি পরিবর্তন হয়েছে।
মেহজাবিনের চোখ বন্ধ।
আর মেহরিনের হাতে একটি রক্তমাখা ছুরি।
আরহান ছবিটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—এবার তুমি কাকে নিয়ে যেতে চাও, মেহরিন?
৮. শেষ ফোনকল
সকাল সাতটা।
মেহজাবিনের ঘরে সূর্যের আলো ঢুকছে।
বিছানায় শুয়ে আছে সে।
মাথার পাশে একটি সাদা ব্যান্ডেজ।
কখন যে তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তার কিছুই মনে নেই।
সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
প্রথমে ছাদের দিকে তাকাল।
তারপর পাশের টেবিলে রাখা ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে ১২টি মিসড কল।
সবগুলোই তার মায়ের।
সে দ্রুত মাকে কল দিল।
—হ্যালো, মা?
ওপাশ থেকে মায়ের কান্নার শব্দ।
—মেহজাবিন! তুই ঠিক আছিস?
—হ্যাঁ মা। কিন্তু আমার মাথায় কী হয়েছে?
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—তুই ওই হোটেলে আর থাকবি না। আমি তোকে নিতে আসছি।
—মা, আমি সব জানতে চাই।
—কী জানতে চাস?
মেহজাবিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
—আমাদের আসল বাবা কে?
ওপাশে আবার নীরবতা।
মা এবার খুব নিচু স্বরে বললেন,
—তোর বাবা এখনো বেঁচে আছেন।
মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—কোথায় তিনি?
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুই যাকে এতদিন নিজের বাবার জায়গায় দেখেছিস, তিনি তোর আসল বাবা নন। তোর আসল বাবা...
মা কথাটা শেষ করার আগেই ফোনের ওপাশে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।
একজন পুরুষের কণ্ঠ।
—ফোনটা আমাকে দাও।
মেহজাবিনের শরীর জমে গেল।
কণ্ঠটি তার পরিচিত।
এই কণ্ঠ সে গত রাতেও শুনেছে।
লিফটের অন্ধকার থেকে।
১৩ নম্বর তলা থেকে।
পুরুষটি ফোন হাতে নিয়ে বললেন,
—কেমন আছো, মেহজাবিন?
মেহজাবিন কাঁপা গলায় বলল,
—আপনি কে?
লোকটি হালকা হাসলেন।
—আমি তোমার বাবা।
তারপর খুব ধীরে বললেন,
—আর আজ রাতেই তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছি।
ফোন কেটে গেল।
মেহজাবিন স্থির হয়ে বসে রইল।
ঠিক তখনই তার ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
টক! টক!
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল।
বাইরে থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
—আপু, দরজা খোলো।
মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কণ্ঠটা মেহরিনের।
কিন্তু এবার সে দরজার ওপাশ থেকে নয়, ঘরের ভেতর থেকেই ফিসফিস করে বলল—
—আপু, দরজা খোলার দরকার নেই। আমি তো এখানেই আছি।
মেহজাবিন ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিন।
তার হাতে সেই পুরোনো ছবিটি।
মেহরিন হাসল।
—এবার আমাদের বাবার সঙ্গে দেখা হবে।
তারপর ছবিটা মেহজাবিনের হাতে দিয়ে বলল,
—কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আপু।
—কী?
মেহরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—আমাদের বাবা আসলে তোমাকে নিতে আসছেন না।
—তাহলে?
মেহরিন খুব ধীরে বলল,
—তিনি এসেছেন তোমার জায়গায় আমাকে ফিরিয়ে নিতে।
মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ঘরের ল্যান্ডফোন বেজে উঠল।
ট্রিং... ট্রিং...
সে রিসিভার তুলতেই ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
—মিস মেহজাবিন, আপনার জন্য নিচে একজন অতিথি অপেক্ষা করছেন।
—কে?
রিসেপশনিস্ট বলল,
—তিনি বলেছেন, তিনি আপনার বাবা।
মেহজাবিনের হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিন ফিসফিস করে বলল—
—আপু, নিচে যিনি এসেছেন, তিনি আমাদের বাবা নন।
তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।
চলবে...