ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ রাতের অতিথি

পর্ব 3

লেখক: Akila faruki elma

শেষ রাতের অতিথি

পর্ব ৩: মৃত মানুষের পরিচয়

রাত ৩টা ১৩ মিনিট।

ঘরের ভেতর অন্ধকার।

জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে আছে মেহজাবিন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখও তার মতোই। একই চোখ, একই ঠোঁট, একই চেহারা। শুধু কপালের ডান পাশে ছোট্ট কাটা দাগ।

মেহরিন।

মেয়েটি ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখেছে।

মেহজাবিনের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।

সে ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল।

কেউ নেই।

আবার জানালার দিকে তাকাতেই মেয়েটিকে দেখতে পেল।

এবার তার হাসিটা আরও স্পষ্ট।

—তুমি আমাকে এত ভয় পাও কেন, আপু?

মেহজাবিন কাঁপা গলায় বলল,

—তুমি কে? সত্যি করে বলো, তুমি কে?

মেয়েটি মাথা একটু কাত করল।

—এত বছর পরেও আমাকে চিনতে পারছ না?

—তুমি কি সত্যিই মেহরিন?

—তুমি কি সত্যিই মেহজাবিন?

প্রশ্নটা শুনে মেহজাবিন থমকে গেল।

—মানে?

মেয়েটি এবার জানালার কাঁচের আরও কাছে এগিয়ে এল।

—নিজের পরিচয়টা একবার ভালো করে খুঁজে দেখো, আপু। অন্যের দেওয়া নাম নিয়ে কত দিন বাঁচবে?

হঠাৎ ঘরের লাইট জ্বলে উঠল।

মেহজাবিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।

কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখল, জানালার সামনে কেউ নেই।

শুধু কাঁচের ওপর আঙুল দিয়ে লেখা একটি বাক্য—

"৩:১৩-তে সত্যি কথা বলে মৃতেরা।"

মেহজাবিন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বিছানার ওপর বসে পড়ল।

তার মনে হচ্ছিল, মাথার ভেতর কেউ যেন একসঙ্গে অসংখ্য দরজা খুলে দিচ্ছে। প্রতিটি দরজার ওপাশে আলাদা আলাদা স্মৃতি। কিন্তু সে কোনো স্মৃতিই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে না।

ঠিক তখনই দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।

—মেহজাবিন! দরজা খুলুন!

আরহানের কণ্ঠ।

সে দ্রুত দরজার কাছে গিয়ে খুলে দিল।

আরহান ভেতরে ঢুকেই চারদিকে তাকাল।

—আপনি ঠিক আছেন?

—আপনি এখানে কেন?

—আপনার ঘরের লাইট কয়েকবার জ্বলে-নিভে উঠেছে। সিকিউরিটি আমাকে জানিয়েছে।

মেহজাবিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—আপনি কি সত্যিই মেহরিনকে মেরেছিলেন?

আরহান স্থির হয়ে গেল।

তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।

—সে আপনাকে আবার ফোন করেছিল?

—শুধু ফোন করেনি। আমি তাকে দেখেছি।

—কোথায়?

মেহজাবিন জানালার দিকে আঙুল তুলে বলল,

—ওখানে। আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরহান জানালার কাছে গিয়ে কাঁচ পরীক্ষা করল।

—সে আপনাকে কী বলেছে?

—বলেছে, নিজের পরিচয় খুঁজে দেখতে।

আরহান এবার তার দিকে ফিরল।

—আর কিছু?

মেহজাবিন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

—বলেছে, আমি আসলে মেহজাবিন নই।

আরহানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

প্রথমবারের মতো মেহজাবিন বুঝতে পারল, তার কথায় আরহান সত্যিই ভয় পেয়েছে।

—আপনি কি কিছু জানেন? মেহজাবিন প্রশ্ন করল।

আরহান উত্তর দিল না।

—আমাকে বলুন!

—আপনাকে এখন বিশ্রাম নিতে হবে।

—আমি আর বিশ্রাম নিতে পারছি না! সবাই আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে নাকি? আমার নিজের বোন কে, আমার পরিচয় কী, আমার বাবা কোথায়—কিছুই জানি না!

আরহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—কাল সকালে আপনার সঙ্গে একজনের দেখা করাব।

—কে?

—এই হোটেলে দশ বছর ধরে কাজ করছেন। সেই রাতের অনেক কিছু তিনি জানেন।

—তার নাম কী?

আরহান দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

—কবির সাহেব।

দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার আগে সে থেমে বলল,

—আর একটা কথা। আজ রাতে যদি আবার কোনো ফোন আসে, রিসিভ করবেন না।

মেহজাবিন তিক্তভাবে হাসল।

—আপনি কি মনে করেন, আপনার কথা শুনে এতক্ষণে আমার ভয় কেটে গেছে?

আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—না। আমি মনে করি, আপনার ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সকাল ৯টা।

The Grand Aurelia-র কর্মীদের জন্য নির্ধারিত ছোট্ট ক্যাফেটেরিয়ায় বসে কফি খাচ্ছিল মেহজাবিন।

সারারাত ঘুম হয়নি। চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে।

ঠিক তখনই সামনে এসে বসল রায়ান।

—গুড মর্নিং!

মেহজাবিন হালকা হাসল।

—মর্নিং।

রায়ান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, গত রাতেও ঘুম হয়নি।

—আপনি কি সবসময় মানুষের মুখ দেখে তাদের রাতের খবর বলে দিতে পারেন?

রায়ান হেসে ফেলল।

—না। তবে এই হোটেলে যারা নতুন আসে, তাদের প্রথম কয়েকটা রাত সাধারণত ভালো কাটে না।

মেহজাবিন কফির কাপ নামিয়ে রাখল।

—আপনি কি তেরো নম্বর তলার ব্যাপারে কিছু জানেন?

রায়ানের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে চারপাশে তাকিয়ে একটু নিচু স্বরে বলল,

—আপনি আবার ওই বিষয় নিয়ে পড়েছেন?

—আপনি কি জানেন সেখানে কী ঘটেছিল?

রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি এখানে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছি। যোগ দেওয়ার প্রথম দিনেই আমাকে বলা হয়েছিল, তেরো নম্বর তলা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

—কেউ কি কখনো সেখানে গিয়েছে?

—আমি নিজে দেখিনি। তবে পুরোনো কর্মীদের কাছ থেকে একটা গল্প শুনেছি।

—কী গল্প?

রায়ান কফির কাপটা হাতে তুলে নিল।

—দশ বছর আগে নাকি এই হোটেলে দুই যমজ বোন থাকত। তাদের একজন এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যায়। আরেকজনকে কয়েক দিন পর পাওয়া যায়। কিন্তু মেয়েটি তখন আর আগের মতো ছিল না।

মেহজাবিনের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

—কেন?

—কেউ বলে সে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল। কেউ বলে সে নিজের নামও চিনতে পারত না।

—আর অন্য মেয়েটা?

রায়ান একটু থেমে বলল,

—সেটাই তো রহস্য। সবাই বলে সে মারা গেছে। কিন্তু পুরোনো কর্মীরা এখনো মাঝেমধ্যে তার নাম শুনতে পায়।

মেহজাবিনের গলা শুকিয়ে গেল।

—মেহরিন?

রায়ান এবার তার দিকে সরাসরি তাকাল।

—আপনি নামটা জানলেন কীভাবে?

মেহজাবিন উত্তর দেওয়ার আগেই ক্যাফেটেরিয়ার দরজায় নওরিনকে দেখা গেল।

—মেহজাবিন, আপনাকে আরহান স্যার ডাকছেন।

মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল।

রায়ান যাওয়ার আগে খুব আস্তে বলল,

—একটা কথা মনে রাখবেন। এই হোটেলে সব মৃত মানুষকে মৃত বলা হয় না।

মেহজাবিন থমকে তার দিকে তাকাল।

কিন্তু রায়ান ততক্ষণে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সকাল ১০টা ১৫ মিনিট।

হোটেলের পুরোনো সার্ভিস ব্লকের এক কোণে ছোট্ট একটি অফিস।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরহান বলল,

—ভেতরে যান। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।

মেহজাবিন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

একজন বয়স্ক মানুষ ডেস্কের সামনে বসে পুরোনো কাগজপত্র গোছাচ্ছেন। বয়স ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুল প্রায় সাদা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

মেহজাবিনকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

—আপনি মেহজাবিন?

—জি।

লোকটি কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর অদ্ভুত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—অবশেষে ফিরে এলেন।

মেহজাবিনের বুক কেঁপে উঠল।

—আপনি আমাকে চেনেন?

—চিনব না কেন? আপনাকে তো এই হোটেলে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি।

—আমার বোন মেহরিনকেও?

লোকটির মুখে বিষণ্নতা নেমে এল।

—হ্যাঁ। আপনাদের দুজনকেই।

—তাহলে বলুন, দশ বছর আগে কী হয়েছিল?

লোকটি দরজা বন্ধ করে দিলেন।

তারপর নিজের চেয়ারে বসে ইশারা করলেন।

—বসুন।

মেহজাবিন বসল।

লোকটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

—আমার নাম কবির। আমি এই হোটেলের পুরোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলাম। এখন অবসর নেওয়ার কথা থাকলেও মালিকপক্ষ আমাকে কিছু প্রশাসনিক কাজে রেখেছে।

—আপনি সেদিন এখানে ছিলেন?

—ছিলাম।

—তাহলে আপনি জানেন মেহরিন কোথায়?

কবির সাহেব তার দিকে তাকালেন।

—আপনি কি নিশ্চিত, আপনি মেহরিনকে খুঁজছেন?

মেহজাবিন বিরক্ত হয়ে বলল,

—সবাই একই কথা বলছে কেন? আমি আমার বোনকে খুঁজছি। এতে আবার প্রশ্নের কী আছে?

কবির সাহেব ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে দুটি ছোট মেয়ে। একজনের মাথায় লাল ফিতা, অন্যজনের মাথায় সাদা।

তিনি ছবিটা মেহজাবিনের সামনে রাখলেন।

—আপনি বলতে পারবেন, এদের মধ্যে কে মেহজাবিন আর কে মেহরিন?

মেহজাবিন ছবিটা হাতে নিল।

দুই মেয়ের মুখ এতটাই এক যে আলাদা করা কঠিন।

তবে বাম পাশের মেয়েটির কপালে ছোট্ট কাটা দাগ।

সে আঙুল দিয়ে মেয়েটিকে দেখাল।

—এটা মেহরিন।

কবির সাহেব মাথা নাড়লেন।

—আপনি নিশ্চিত?

—জি। ওর কপালে দাগ ছিল।

—আর অন্য মেয়েটি?

—আমি।

কবির সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন,

—আপনি সবসময় ভুল মেয়েটিকে চিনেছেন।

মেহজাবিনের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।

—মানে?

কবির সাহেব ছবিটা তুলে আবার তার সামনে রাখলেন।

—আপনার বোনের কপালে কোনো কাটা দাগ ছিল না।

মেহজাবিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—কিন্তু ছবিতে তো—

—ছবির ডান পাশের মেয়েটিই মেহরিন। বাম পাশের মেয়েটি আপনি।

—কিন্তু...

—আপনার কপালের ডান পাশে ছোটবেলায় একটা আঘাত লেগেছিল। সেই দাগটাই এখনো আছে। আপনার বোনের ছিল না।

মেহজাবিন নিজের কপালে হাত দিল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার পড়ে গিয়ে কপালে আঘাত পেয়েছিল বলে মা তাকে বলেছিলেন।

কিন্তু সেই স্মৃতি কি সত্যি?

কবির সাহেব এবার টেবিলের নিচ থেকে একটি ছোট বাক্স বের করলেন।

—এটা আপনার জন্য রেখে গিয়েছিল একজন।

—কে?

—আপনার বাবা।

মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

বাক্সটা পুরোনো কাঠের তৈরি। ওপরের দিকে ছোট্ট একটি তালা লাগানো।

—আমার বাবা আপনাকে এটা দিয়েছিলেন?

—সেদিন রাতে।

—কোন রাতে?

কবির সাহেব তার দিকে তাকালেন।

—যে রাতে আপনার বোন নিখোঁজ হয়েছিল।

মেহজাবিন বাক্সটা হাতে নিল।

ভেতরে কী আছে, তা জানার জন্য তার আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না।

কিন্তু তালাটা বন্ধ।

—চাবি কোথায়?

কবির সাহেব পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করে দিলেন।

—আপনার বাবা বলেছিলেন, আপনি যখন নিজের পরিচয় জানতে চাইবেন, তখনই যেন এটা আপনাকে দেওয়া হয়।

মেহজাবিন কাঁপা হাতে তালাটা খুলল।

বাক্সের ভেতরে একটি পুরোনো চুলের ক্লিপ, একটি ছোট্ট কাগজ এবং একটি ফটোগ্রাফ।

চুলের ক্লিপটা লাল রঙের।

মেহজাবিন সেটি হাতে নিতেই তার মাথার ভেতর ঝলকের মতো একটি দৃশ্য ভেসে উঠল।

দুই ছোট মেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে।

একজন বলছে,

—আপু, আজ তুমি আমার ক্লিপটা পরো।

অন্যজন হাসছে।

—তাহলে তুমি কী পরবে?

—আমি তোমারটা।

মেহজাবিনের চোখ ভিজে উঠল।

সে কাগজটা খুলল।

সেখানে মাত্র একটি লাইন লেখা—

"মেহজাবিন, যদি কোনোদিন এই চিঠি তোমার হাতে আসে, তাহলে মনে রেখো—তোমার মা তোমাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলেনি। সে তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য একজনকে হারিয়েছে।"

মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল।

—এর মানে কী?

কবির সাহেব উত্তর দিলেন না।

সে এবার ফটোগ্রাফটা তুলে নিল।

ছবিতে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে তার মা। দুজনের মাঝখানে একটি ছোট মেয়ে।

মেহজাবিন ছবির মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

এটা সে।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখ দেখে তার হাত কেঁপে উঠল।

১৭ অক্টোবর, ২০১৬।

ছবির নিচে আরেকটি লাইন—

"শেষবারের মতো একসঙ্গে।"

মেহজাবিন মাথা তুলে তাকাল।

—আমার বাবা কি সত্যিই বেঁচে আছেন?

কবির সাহেব এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

—আমি জানি না।

—আপনি জানেন না, নাকি বলতে চাইছেন না?

—আমি শুধু জানি, সেদিন রাতের পর থেকে তিনি আর কখনো এই হোটেলে ফিরে আসেননি।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

আরহান ভেতরে ঢুকল।

—আপনাদের কথা শেষ হয়েছে?

কবির সাহেব দ্রুত বাক্সটা বন্ধ করে দিলেন।

—জি, স্যার।

আরহান মেহজাবিনের দিকে তাকাল।

—চলুন।

মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল।

কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই কবির সাহেব পেছন থেকে ডাকলেন।

—মিস মেহজাবিন!

সে ঘুরে দাঁড়াল।

কবির সাহেবের চোখে এবার স্পষ্ট ভয়।

—আর একটা কথা। আজ রাত ৩টা ১৩ মিনিটে যদি কেউ আপনার দরজায় এসে বলে সে আপনার বোন, দরজা খুলবেন না।

মেহজাবিন কিছু বলার আগেই তিনি আরও যোগ করলেন,

—কারণ গত দশ বছরে এই হোটেলে যে মেয়েটিকে সবাই মেহরিন বলে চিনেছে, সে কখনো আপনার বোন ছিল না।

দুপুর ১টা।

আরহানের অফিসে বসে আছে মেহজাবিন।

তার সামনে এক কাপ কফি রাখা। কিন্তু সেটার দিকে তাকানোরও ইচ্ছে হচ্ছে না।

আরহান ডেস্কের পেছনে বসে ফাইল দেখছিল।

অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর মেহজাবিন বলল,

—কবির সাহেব যা বললেন, তার মানে কী?

আরহান ফাইল বন্ধ করল।

—কোন কথাটা?

—আমার বোনের পরিচয় নিয়ে যে কথাটা বললেন।

—কবির সাহেবের বয়স হয়েছে। সবকিছু তার মনে নেই।

—আপনি কি মনে করেন আমি বোকা?

—আমি সেটা বলিনি।

—তাহলে আমাকে সত্যিটা বলুন।

আরহান চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গেল।

—মেহজাবিন, আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার ছোটবেলার কোনো ছবি কেন আপনার কাছে নেই?

প্রশ্নটা শুনে মেহজাবিন থেমে গেল।

—আছে। তবে খুব বেশি না।

—কেন?

—মা বলেন, পুরোনো বাসা বদলানোর সময় অনেক ছবি হারিয়ে গেছে।

আরহান ধীরে মাথা নাড়ল।

—আপনার মা শুধু ছবি হারাননি। আপনার অতীতের অনেক প্রমাণও সরিয়ে ফেলেছেন।

—আপনি কীভাবে জানেন?

—কারণ দশ বছর আগে আমিও সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম।

মেহজাবিন তার দিকে তাকাল।

—আপনার বয়স তখন কত ছিল?

—সতেরো।

—আপনি কি মেহরিনকে চিনতেন?

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তাকে খুব ভালো করে চিনতাম।

মেহজাবিনের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

—তাহলে আপনি তাকে ভালোবাসতেন?

আরহান হঠাৎ তার দিকে তাকাল।

প্রশ্নটা যেন সে আশা করেনি।

কয়েক সেকেন্ড পর বলল,

—কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না।

মেহজাবিন চোখ সরিয়ে নিল।

—আপনি কি তার মৃত্যুর জন্য দায়ী?

আরহান কোনো উত্তর দিল না।

তার নীরবতা মেহজাবিনের কাছে উত্তরটির চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে হলো।

ঠিক তখনই আরহানের ফোন বেজে উঠল।

সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো।

আরহানের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।

—কী বলছেন?

সে উঠে দাঁড়াল।

—ওকে কোথায় পাওয়া গেছে?

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

—আমি আসছি।

ফোন রেখে সে দ্রুত কোটটা হাতে নিল।

মেহজাবিন জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

আরহান দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

—হোটেলের পুরোনো আর্কাইভ রুমে একজনকে পাওয়া গেছে।

—কে?

আরহান থেমে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

—আপনার মায়ের পুরোনো ব্যক্তিগত সহকারী।

মেহজাবিনের বুক কেঁপে উঠল।

—তিনি এখানে কেন?

আরহান এবার তার দিকে তাকাল।

—কারণ তিনি গত দশ বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন।

সন্ধ্যা ৭টা।

হোটেলের লবিতে তখন অতিথিদের ভিড়।

কিন্তু মেহজাবিনের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে লিফটের দিকে।

আজকের দিনটা যেন শেষই হচ্ছে না।

কবির সাহেবের কথা, আরহানের নীরবতা, বাবার রেখে যাওয়া বাক্স—সবকিছু মিলিয়ে তার মাথা কাজ করছে না।

সে ঠিক করল, আজ রাতে আর ঘরে বসে থাকবে না।

যে করেই হোক, সত্যিটা বের করতে হবে।

রিসেপশনের ডেস্কে বসে সে পুরোনো রেজিস্টারগুলো দেখছিল।

হঠাৎ একটি পাতায় তার চোখ আটকে গেল।

দশ বছর আগের অতিথিদের তালিকা।

১৭ অক্টোবর, ২০১৬।

সেখানে কয়েকটি নামের পাশে লাল কালি দিয়ে চিহ্ন দেওয়া।

একটি নাম দেখে তার বুক ধক করে উঠল।

MEHRIN RAHMAN — ROOM 1313

সে কয়েকবার নামটা পড়ল।

মেহরিন রহমান।

রুম নম্বর ১৩১৩।

কিন্তু হোটেলের তেরো নম্বর তলা তো নেই!

সে দ্রুত রেজিস্টারের পাতাটা মোবাইলে ছবি তুলে রাখল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

—ওই রেজিস্টারটা আপনার দেখা উচিত নয়।

মেহজাবিন ঘুরে দাঁড়াল।

একজন মধ্যবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে কালো পোশাক। চুল পেছনে বাঁধা। মুখে অদ্ভুত এক কঠিন ভাব।

—আপনি কে?

—আমার নাম সামিরা। আমি এই হোটেলের পুরোনো অতিথি ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম।

—ছিলেন মানে?

—দশ বছর আগে।

মেহজাবিনের বুকের ভেতর কাঁপন উঠল।

—আপনি কি মেহরিনকে চিনতেন?

সামিরা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—আপনি কি সত্যিই জানতে চান, সেই রাতে কে মারা গিয়েছিল?

মেহজাবিন এক পা এগিয়ে গেল।

—হ্যাঁ।

সামিরা চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

—তাহলে আজ রাত বারোটায় পুরোনো পিয়ানোর কাছে আসবেন।

—কেন?

—কারণ আপনার মা যে সত্যিটা দশ বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন, সেটা আমি আর লুকিয়ে রাখতে চাই না।

কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন।

মেহজাবিন তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ একজন দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছে।

লবির ওপরের বারান্দার রেলিংয়ের পাশে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু তার হাতে একটি পুরোনো ছবি।

মেহজাবিন চোখ ছোট করে তাকাল।

ছবিতে দুটি ছোট মেয়ে।

একজনের কপালে কাটা দাগ।

আরেকজনের কপালে কোনো দাগ নেই।

লোকটি ছবিটা ধীরে ধীরে উল্টে দিল।

পেছনে লেখা—

"আজ রাতেই শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"

ঠিক তখনই মেহজাবিনের ফোনে একটি মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, দশ বছর আগে কে মারা গিয়েছিল, তাহলে আজ রাত ৩টা ১৩ মিনিটে ১৩ নম্বর তলায় এসো।”

মেহজাবিনের চোখ স্থির হয়ে গেল।

তারপর আরেকটি মেসেজ এল।

“এবার একা এসো। আরহানকে সঙ্গে আনবে না।”

মেহজাবিন ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

লিফটের ডিসপ্লেতে তখন বারো জ্বলছে।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা বদলে গেল।

১৩।

লিফটের দরজা খুলে গেল।

ভেতরে কেউ নেই।

শুধু মেঝের ওপর পড়ে আছে একটি লাল চুলের ক্লিপ।

মেহজাবিনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারণ ক্লিপটা হুবহু সেই ক্লিপের মতো, যেটা সে সকালে কবির সাহেবের দেওয়া বাক্সে দেখেছিল।

লিফটের ভেতর থেকে হঠাৎ একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

—আপু...

মেহজাবিন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।

—তুমি কি এবার সত্যিটা জানতে চাও?

সে কোনো উত্তর দিল না।

কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।

—তাহলে মনে রেখো, আপু...

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—

“যে মানুষটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেই মানুষটাই তোমার আসল পরিচয় চুরি করেছে।”

লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

আর মেহজাবিন প্রথমবারের মতো অনুভব করল, এই রহস্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে হলে তাকে শুধু মেহরিনকে খুঁজলেই হবে না।

তাকে নিজের মাকেও প্রশ্ন করতে হবে।

কারণ হয়তো দশ বছর আগে শুধু একজন বোন নিখোঁজ হয়নি।

সেদিন একটি পরিচয়ও মারা গিয়েছিল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন