সকাল ৯টা — বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আজ বেশ ভিড়। সবাই নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা পড়ছে।
মেহের তিশার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে ঢুকল।
— এই তিশা, কী হয়েছে? সবাই এমন করে দাঁড়িয়ে আছে কেন?
তিশা নোটিশটা পড়ে বলল,
— আগামী মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। প্রতিটি বিভাগ থেকে একটা করে টিম তৈরি করতে হবে।
মেহের খুশি হয়ে বলল,
— বাহ! তাহলে তো অনেক মজা হবে।
তিশা হঠাৎ নোটিশের নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আরে! আমাদের টিমের দায়িত্বে কার নাম দেওয়া হয়েছে জানিস?
— কার?
— শ্রাবণ রহমান!
মেহেরের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও।
-কি! আবার সেই কফি সাহেব!
পেছন থেকে একটা কন্ঠ ভেসে এল-
-আমাকে ডাকছেন?
মেহের ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল।
শ্রাবন দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রাফি।
মেহের হাসার চেষ্টা করে বলল,
— না না, আপনাকে না। আপনার মতো দেখতে একজনকে ডাকছিলাম।
রাফি হেসে বলল,
— ভাই, এই মেয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারলে তোর ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে যাবে।
শ্রাবন গম্ভীর গলায় বলল,
— মেহের, আজ বিকেল ৪টায় মিটিং। দেরি করবেন না।
মেহের ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমি কি আপনার অফিসের কর্মচারী?
শ্রাবণ বলল,
— না, তবে টিমের সদস্য।
মেহের মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— হায় আল্লাহ! আমার কপালে এত দুঃখ কেন!
রাফি হাসতে হাসতে বলল,
— ভাবি, চিন্তা করবেন না। ভাইকে সামলানোর অভিজ্ঞতা আমার আছে!
— ভাবি কাকে বললেন?
— ভবিষ্যতের কথা একটু আগেই বলে ফেললাম!
তিশা এবার মেহেরকে টেনে নিয়ে গেল।
দুপুর ১২টা — ক্যাম্পাসের বাগান
মেহের আর তিশা বাগানের বেঞ্চে বসে গল্প করছিল।
তিশা বলল,
— শ্রাবন কিন্তু দেখতে বেশ ভালো।
মেহের বলল,
— দেখতে ভালো হলেই কি মানুষ ভালো হয়?
— তুই তো বেশ খোঁজখবর নিচ্ছিস!
— তিশা, তোর মাথায় সমস্যা আছে।
ঠিক তখন মেহেরের ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
— হ্যালো?
— বিকেল ৪টার মিটিং ভুলে যাবেন না।
মেহের কণ্ঠ চিনে ফেলল।
— আপনি আমার নম্বর কোথায় পেলেন?
— টিমের সদস্যদের নম্বর আমার কাছে আছে।
— আচ্ছা, আপনার কি অন্য কোনো কাজ নেই?
— আছে। কিন্তু আপনাকে সময়মতো মিটিংয়ে আনার দায়িত্বও আছে।
— আমি বাচ্চা নাকি?
— আপনার কথাবার্তা শুনে তো তা-ই মনে হয়।
মেহের রেগে ফোন কেটে দিল।
তিশা অবাক হয়ে বলল,
— কে ছিল?
— বিপদ!
বিকেল ৪টা — মিটিং রুম
সবাই মিটিংয়ে উপস্থিত।
শ্রাবণ টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিচ্ছে।
— আমাদের অনুষ্ঠানে গান, নাচ, নাটক আর কবিতা আবৃত্তি থাকবে।
রাফি হাত তুলে বলল!
— ভাই, খাবারের ব্যবস্থা থাকবে তো?
শ্রাবণ চোখ তুলে তাকাল।
— রাফি, এটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিয়ের অনুষ্ঠান না।
রাফি বলল,
— খাবার ছাড়া সংস্কৃতি হয় নাকি?
সবাই হেসে উঠল।
মেহেরও হাসছিল।
শ্রাবণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— মেহের, আপনি গান করবেন?
মেহের একটু থেমে বলল,
— না।
— কেন?
— ইচ্ছা নেই।
তিশা পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
— মিথ্যা বলছিস কেন? তুই তো খুব সুন্দর গান গাস!
মেহের তিশাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল।
শ্রাবণ বলল,
— ঠিক আছে। তাহলে নাটকের দায়িত্ব নিন।
মেহের মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— নাটক করতে হলে তো আপনার কাছ থেকে অভিনয় শিখতে হবে।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাই এমনিতেই রাগী চরিত্রে অভিনয় করে। কোনো প্রশিক্ষণ লাগে না!
আবারও সবাই হেসে উঠল।
শ্রাবন রাফির দিকে এমনভাবে তাকাল যে রাফি সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
বিকেল ৫টা — একটা ছোট্ট ঘটনা
মিটিং শেষ হওয়ার পর সবাই বেরিয়ে গেল।
মেহের ফাইলগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার হাত থেকে কয়েকটা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
সে বিরক্ত হয়ে বলল,
— উফ! আজকে আমার দিনটাই খারাপ।
শ্রাবন এগিয়ে এসে কাগজগুলো তুলে দিল।
— সবকিছুতেই এত তাড়াহুড়ো করেন কেন?
মেহের কাগজ নিতে নিতে বলল
কারণ আমার সময়ের দাম আছে!
— আর আমার?
— আপনার তো অনেক দাম। আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিরো!
শ্রাবন হালকা হেসে বলল,
— আপনি সবসময় আমাকে খোঁচা দেন কেন?
মেহের একটু থেমে বলল,
— কারণ আপনি সবসময় রাগ করেন কেন?
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শ্রাবন বলল,
— চলুন, চা খেয়ে আসি।
মেহের অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি আমাকে চা খাওয়াবেন?
— না, চায়ের দোকান বন্ধ করে দেব!
মেহের হেসে ফেলল।
— আচ্ছা, চলুন।
সন্ধ্যা ৬টা — চায়ের দোকান
দুজন একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসেছে।
শ্রাবন চায়ের অর্ডার দিল।
মেহের বলল,
— আমার জন্য একটা চা, আর একটা সিঙ্গারা।
শ্রাবন বলল,
— আপনি কি সবসময় এত খান?
মেহের গম্ভীর মুখে বলল,
— জি। আমার শখ হলো খাওয়া আর মানুষকে বিরক্ত করা।
শ্রাবন হেসে ফেলল।
চা আসার পর মেহের নিজের সিঙ্গারাটা খেতে শুরু করল।
হঠাৎ সে বলল,
— আপনার একটা সমস্যা আছে।
— কী সমস্যা?
— আপনি হাসলে ভালো লাগে, কিন্তু রাগ করলে মনে হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবেন।
শ্রাবণ হাসতে হাসতে বলল,
— আর আপনার সমস্যা হলো আপনি এক মিনিটও চুপ থাকতে পারেন না।
মেহের বলল,
— আমি চুপ থাকলে পৃথিবী একঘেয়ে হয়ে যাবে।
শ্রাবন কিছু বলল না।
শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
রাত ৮টা — শ্রাবণের বাসা
শ্রাবণ বাসায় ফিরতেই তার ছোট বোন আনিশা দৌড়ে এল।
— ভাইয়া!
— কী হয়েছে?
— আজকে তোমাকে খুব খুশি লাগছে।
— আমি আবার কখন খুশি হলাম?
আনিশা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল,
— নিশ্চয়ই কোনো মেয়ে আছে!
শ্রাবন বলল,
— তোর পড়াশোনা নেই?
আনিশা হেসে বলল,
— ওহ! বুঝেছি। নাম কী ভাবির?
আনিশা
— আচ্ছা আচ্ছা, বলব না। তবে ভাবিকে একদিন বাসায় নিয়ে এসো।
শ্রাবন মাথায় হাত দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
অন্যদিকে — মেহেরের বাসা
মেহের নিজের ঘরে বসে ফোনে তিশার সঙ্গে কথা বলছিল।
তিশা বলল,
— আজকে শ্রাবনের সঙ্গে চা খেয়েছিস?
— হুম।
— কেমন লাগল?
— চা ভালো ছিল।
— আমি চায়ের কথা জিজ্ঞেস করিনি!
মেহের বালিশে মুখ গুঁজে বলল,
— তুই একদম অসহ্য!
তিশা হেসে বলল,
— আচ্ছা, একটা কথা বল। শ্রাবনকে কি একটু ভালো লাগে?
মেহের কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল-
জানি নারে,ছেলেটা অদ্ভুত!
-অদ্ভুত জিনিসই তো বেশি ভালো লাগে!
মেহের ফোন রেখে জানালার পাশে দাঁড়াল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।
শ্রাবন: বাসায় পৌঁছেছেন?
মেহের কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর উত্তর দিল—
মেহের: জি, পৌঁছেছি। আপনি?
শ্রাবণ : আমিও।
মেহের: আচ্ছা।
শ্রাবণ : একটা কথা বলব?
মেহের: বলেন।
শ্রাবণ : আজ আপনাকে হাসতে দেখে ভালো লাগছিল।
মেহেরের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সে উত্তর লেখার আগেই আরেকটা মেসেজ এল।
শ্রাবন: তবে বেশি হাসবেন না। কাল আবার কাজে দেরি করবেন!
মেহের এবার বালিশ টা হাতে নিয়ে বলল!
-অসভ্য একটা ছেলে
কিন্তু তার মুখের হাসিটা আর গেল না।
পরদিন সকাল — নতুন চমক
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে মেহের দেখল, শ্রাবন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট।
মেহের কাছে আসতেই শ্রাবণ প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
— এটা আপনার জন্য।
মেহের অবাক হয়ে বলল,
— আমার জন্য? কী আছে?
— খুলে দেখুন।
মেহের প্যাকেট খুলে দেখল, ভেতরে একটা সুন্দর কলম আর ছোট্ট একটা নোট।
নোটে লেখা—
"কফি ফেলার জন্য জরিমানা হিসেবে নয়, বরং নতুন কাজ শুরু করার শুভেচ্ছা হিসেবে।"
মেহের কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মুখ তুলে বলল!
-ধন্যবাদ
শ্রাবণ :মুচকি হেসে বলল! আজ কিন্তু কফি আনবেন না
মেহের হেসে বলল,
— কথা দিতে পারছি না!
দূরে দাঁড়িয়ে রাফি আর তিশা সব দেখছিল।
রাফি তিশাকে বলল,
— আমাদের কাজটা মনে হয় খুব সহজ হয়ে গেছে।
তিশা বলল,
— কী কাজ?
রাফি হেসে উত্তর দিল,
— এই দুজনকে এক করতে হবে!
দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মেহেরের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
"শ্রাবণকে বিশ্বাস করবেন না। ওর অতীত সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না।"
মেহেরের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে বারবার মেসেজটা পড়তে লাগল।
কে পাঠাল?
কেন পাঠাল?
আর আরিয়ানের অতীতে কি আছে যা মেহের জানে না!
চলবে... ❤️
পর্ব 2
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান