#নীল_আগুনের_শহর
#পর্ব_২
#অ্যানা_জাহান_মায়া
আরিশা কিছু বুঝে উঠার আগেই দরজা নিজে থেকেই খুলতে শুরু করলো। নিচে নেমে যাচ্ছে পাথরের লম্বা সিঁড়ি। গভীরে,আরো গভীরে। সিঁড়ির নিচে জ্বলছে নীল আলো। নিচে নেমেই আরিশা হতবাক।
মাটির নিচে আরেকটা শহর। পরিত্যক্ত, নিস্তব্ধ। কিন্তু হঠাৎ বাতাসে অচেনা কন্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা গেল।
"স্বাগতম.....ফিরে আসার জন্য!"
মা চমকে আরিশাকে পিছিয়ে ধরলেন,
"ওরা জেগে উঠেছে! সময় খুব কম!"
আরিশা কাঁপা কন্ঠে বলল,
"কে?"
"যাদের হাত নীল আগুনে পুড়ে অদৃশ্য হয়েছে!"
"ওরা আমাকে চায় কেন?"
মা চোখ বন্ধ করলেন।
"কারণ তোমার জন্ম এই শহরে হয় নি আরিশা..... তোমার জন্ম হয়েছে নীল আগুনে।"
____________________
ছাঁদের ওপরে দাঁড়ানো সেই নীল চোখওয়ালা লোক।
শহরের ওপরের সব কিছু সে'ই লোকই দেখছিল। তাঁর দুটি চোখ আগুনের চেয়েও নীল। সে ধীরে ধীরে বলল,
"দরজা খোলা হলো...এটাই আমি চাইছিলাম।"
হাসি চাপা পড়লো তার ঠোঁটে।
"আরিশা, তুমি ঠিক যতটা পালাবে! আমি ঠিক ততটাই তোমার কাছে আসবো!"
তাঁর হাত তুলতেই সমস্ত ছায়া তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়লো।
"যাও, তাকে খুঁজে আনো।"
____________________
ঘরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। এতটাই নীরব যে মনে হচ্ছিল বাতাসও শ্বাস আটকে রেখেছে। আরিশা তার মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে। মা তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
"ভয় নেই মা...আমি আছি।"
কিন্তু মায়ের কণ্ঠে একটা অদৃশ্য কম্পন ছিল। যা শুধু হয় যখন মন ভয় আড়াল করতে চাই। ঠিক তখনই
দরজার নিচ দিয়ে নীল আলো ঢুকতে শুরু করলো।ধীরে ধীরে আলোটা পুরো ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো।
যেন কেউ ভুল করে আকাশের রং ঘরে ঢেলে দিয়েছে।
মা আরিশাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললেন,
"ওরা এসে গেছে..."
আরিশা চমকে জিজ্ঞেস করলো,
"ওরা কারা?"
মা এবার তাঁর দিকে তাকালেন। চোখে ভয়ের সঙ্গে একটা অদ্ভুত স্নেহ।
"যাদের সম্পর্কে তোমাকে কখনো বলতে চাইনি।"
হঠাৎ করে দরজায় একটা ভারী ধাক্কা! ঠাসসস!
ঘরটা কেঁপে উঠল। দেয়ালের ছবিও কেঁপে উঠল। জানালার পর্দা নিজেরাই নড়লো। যেন বাইরে কোনো অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মা আরিশাকে পেছনে সরালেন।
তাঁর শরীর কাঁপছে কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। একটা মা যতটা ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি শক্ত হয় যখন মেয়ের সামনে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় ধাক্কা! দরজার নিচ দিয়ে ঘন কালো ছায়া ঢুকতে লাগল। ছায়া মেঝেতে পড়ে ভাঁজ খেয়ে উঠছে।
যেন জীবন্ত। আরিশা মায়ের হাত শক্ত করে ধরলো। আতঙ্কিত হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো,
"মা...কি হচ্ছে?"
মা বললেন,
"আজ তোমার জন্মের সত্যিটা ফিরে এসেছে, মা..."
হঠাৎ সব বাতি নিভে গেলো। এক মুহূর্তে ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল। মাত্র এক সেকেন্ড পর ঘরের এক কোণে নীল আগুনের একটা সরু রেখা জ্বলে উঠলো। রেখাটা বড় হতে লাগলো।
আগুনটা ছড়িয়ে গিয়ে একটি মানুষের অবয়ব তৈরি করলো। কোট পড়া একটা লম্বা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। শরীর স্থির। চোখ দুটো নীল আগুনের মতো জ্বলছে। কিন্তু আগুনে কোনো ভয় নেই। বরং দুঃখ আছে।লোকটা ধীরে বলল,
"শেষমেশ তোমরা মুখোমুখি হলে?"
আরিশা মাকে আরও শক্ত করে ধরলো। অবাক হয়ে মাকে প্রশ্ন করলো,
"মা, তুমি তাকে চেনো?"
মা নিশ্বাস চেপে বললেন,
"চিনি, মা...ও তোমার ওপর অধিকার দাবি করতে এসেছে।"
লোকটা এবার বলল,
"তোমার মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছিলে...এত বছর! কিন্তু লাভ হলো না।"
মা শান্ত গলায় বললেন,
"কারণ ও মানুষ...আমি ওকে মানুষের মতো করে বড় করেছি।"
লোকটার চোখের আগুন আরও গভীর হলো।
"না...ও মানুষ নয়।"
আরিশার বুক ধক করে উঠলো। মা তাঁর হাত আরও শক্ত করে ধরলেন। মা বললেন,
"তুমি ভুল করছো! ও আমার সন্তান!"
লোকটা প্রথমবারের মতো একটু এগিয়ে এলো। শব্দ নেই। তাঁর চলায় শুধু বাতাস কেঁপে উঠলো।
"ও আগুনের সন্তান।"
লোকটা আবার বললো,
"তোমার নয়...আমাদের।"
চলবে...